সম্পাদকীয় : সাংস্কৃতিক প্রতীক ও আত্মবিস্মৃতি

 


দীপেন ভট্টাচার্য
১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

১. 
কিছুদিন আগে আমার জার্মানির লাইপজিগ শহরে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিল। লাইপজিগ একসময়ে পূর্ব জার্মানিতে ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয় প্রভাবে। সেই সময়কার বড় কোন চিহ্ন এখন বর্তমান নয়, হয়তো শুধুমাত্র তখনকার গোয়েন্দা পুলিশ স্টাসির কার্যালয়টি ছাড়া – যেটা এখন একটি মিউজিয়াম। কিন্তু লাইপজিগে যাবার অন্যতম কারণ ছিল অতীতে এই শহরের সঙ্গে সংযুক্ত দুটি মানুষ, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন ইয়োহান সেবাস্টিয়ান বাখ (১৬৮৫ – ১৭৫০)। বাখ লাইপজিগের সেন্ট টমাস গীর্জার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। বাখের দুটি অনন্য যন্ত্রসঙ্গীত Toccata and Fugue in D minor এবং Air on the G String তিন শ বছর পরেও আমাদের মনে এক অদ্ভূত আধ্যাত্মিক অনুরণন জাগায়। প্রথমটির অর্গানের গাঢ় গম্ভীর শব্দ এক বিশাল প্রাসাদে অজানা ঈশ্বরের আবির্ভাবের প্রাকধ্বনি রচনা করে, এটি এক বিশাল সঙ্গীত স্থাপত্য যাকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমাদের সমস্ত শ্রবণ অনুভূতি শিহরিত হতে থাকে। আর দ্বিতীয়টি – Air – এমন একটি ব্যাপার যা বলে বোঝানো যাবে না। বেহালার শান্ত, কিছুটা বিষন্ন সুর, আপনাকে নিয়ে যাবে এক ইন্দ্রিয়াতীত উত্তরণে – মনে হবে সময় থেমে গেছে, কোনো এক শীতের নিসঙ্গ সন্ধ্যায়, জানালার বাইরে পেঁজা হাল্কা তুষার বাতাসে ভেসে নিচের মাটিতে ঠাঁই পাচ্ছে। হয়তো ঘরের ভেতরে রয়েছে মোমবাতির আলো, সেটার কম্পমান শিখায় এই চরাচরে আমাদের অস্তিত্বের আয়তনকে আমরা তখন এক বিশাল বেদনায় ধারণ করতে চাইছি। এই সঙ্গীত আমাদের স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় সময়, স্থানীয় সাহিত্যের গণ্ডী পেরিয়ে এক কালোত্তীর্ণ মহাজাগতিক অনুভূতি সৃষ্টি করবে, তার জন্য ভাষা জ্ঞানের প্রয়োজন নেই।

সঙ্গীতের এই যে চাহিদা তা আমাদের মনোজগতের চাহিদা, আমাদের বাঁচার অন্যতম অনুষঙ্গ। সেই কবে, চল্লিশ হাজার বছর আগে, মানুষ যে সঙ্গীত চর্চা করত তার প্রমাণ পাওয়া গেছে হাড়ের তৈরি বাঁশিতে। হয়তো তারও আগে – পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার বছর আগেই – মানুষ গান গাইত, হয়তো ঢাকের মতো ঘাতবাদ্য বাজাত। এটি মানুষদের একটি মজ্জাগত বিশেষত্ব, তাকে কোনো ধর্মীয় অনুশাসন দিয়ে খর্ব করা সম্ভব নয়। আজ যখন দেখি বাংলার গ্রামে গ্রামে সঙ্গীত নিষিদ্ধ করার একটি আন্দোলন দানা বাঁধছে তখন মনে হয় মানব সভ্যতার বিবর্তনে এক আন্দোলনকারীরা অংশগ্রহণ করেনি। আর যে বিশাল সঙ্গীত ভাণ্ডার বাংলার মাটিতে শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে – জয়দেব, চণ্ডীদাস, লালন, পঞ্চকবি, সলীল চৌধুরী – তাকে বিসর্জন দিয়ে এই সঙ্গীতবিরোধীরা বাঙালীর মনকে পুরোপুরি খর্ব করে দিতে চাইছে। সন্ধ্যার অপস্রিয়মান আলোয়, সেন্ট টমাস গীর্জার পাশে বাখের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কী করে এক শ্রেণীর মানুষ সঙ্গীত ছাড়া বাঁচার কথা ভাবতে পারে। তিন শ বছরের ওপার থেকে সেবাস্টিয়ান বাখের অর্গান যখন আমাকে ডাক দেয়, চল্লিশ হাজার বছর আগের আমাদের কোনো পূর্বপুরুষের তৈরি করা বাঁশির ছবি দেখে যখন আপ্লুত হই – তখন ভাবি মানুষের এই যে মহৎ কর্ম তাকে কে হেলায় হারাতে চায়। যে জাতি সেই পথে যাবে তার মানসিক পক্ষাঘাত অনিবার্য।

২. 
আর এক জার্মান মনীষী, লাইপজিগের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, তিনি হলেন অন্যজন হলেন ইয়োহান গ্যোটে (১৭৪৯ – ১৮৩২)। বাখের মৃত্যুর এক বছর পর যাঁর জন্ম। লাইপজিগের বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েছিলেন আইন নিয়ে। এই শহরেই তখন ছিল একটি রেস্তোরাঁ, নাম Auerbachs Keller। ধারনা করতে পারি সেখানে গ্যোটে যেতেন একদিকে খাবার ও ওয়াইন এবং অন্যদিকে কবিতা আর দার্শনিক আলোচনায় নিজেকে মগ্ন করতে। ‘আওয়ারবাখ কেলার’ রেস্তোরাঁ তাঁকে এতই প্রভাবিত করেছিল যে, তাঁর মহাকাব্য ‘ফাউস্ট’-এর একটি দৃশ্য এই নামের রেস্তোরাঁতেই সংঘটিত হয়। আওয়ারবাখ কেলারে মেফিস্টোফিলিস ফাউস্টকে নিয়ে যায়। মদ্যপ ছাত্রদের সাথে বসে মেফিস্টো জাদু দেখায়, ফাউস্টকে বোঝাতে চায় পার্থিব জীবন এইভাবে উপভোগ করতে হয়, কিন্তু সেই রাতে ফাউস্ট উপলব্ধি করেন যে, মানুষের প্রকৃত অভিশাপ তৃষ্ণাহীনতা নয়, বরং ভুল জিনিসের তৃষ্ণা।

২৬০ বছর পরেও ‘আওয়ারবাখ কেলার’ সেখানেই আছে। গ্যোটে যে রেস্তোরাঁয় খেয়েছিলেন, যেখানে তিনি ‘ফাউস্ট’ লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, সেখানে বসে খাবার অভিজ্ঞতা আমাদের হলো। রেস্তোরাঁর দেয়ালে ছিল ‘ফাউস্ট’-এর বিভিন্ন দৃশ্যের তৈলচিত্র, পর্যটকরা মাঝে মধ্যেই তাদের খাওয়া ছেড়ে সেগুলোর ছবি তুলছিলেন। আমি ভাবছিলাম ওই পর্যটকরা এবং আমি, যারা নিসন্দেহে সাহিত্যের অনুরাগী, তারা কেন ‘আওয়ারবাখ কেলার’-এ বসে একটি সন্ধ্যা কাটাতে চায়। আমরা কি এই পরিমণ্ডলে গ্যোটের ফাউস্ট আর মেফিস্টোর উদ্দেশ্য ও কার্যকে পুনর্গঠন করতে পারছি? সেটা না করতে পারলেও আমি এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করলাম, ভাষা ও সংস্কৃতির উর্ধে উঠে ওই পর্যটকদের সঙ্গে একটা নৈকট্য অনুভব করলাম। আমরা সবাই একটি কারণেই ওখানে নৈশভোজে এসেছি, সেটা হলো ইয়োহান গ্যোটের সান্নিধ্য পাওয়া। ‘আওয়ারবাখ কেলার’ একটি প্রতীক, এমন যেন গ্যোটে সেখানে তাঁর শরীরের ছায়া রেখে গিয়েছেন, সেই অদৃশ্য অধরা ছায়া আমাকে অন্য অচেনা পর্যটকদের সাথে একাত্ম করেছিল।

এর দু সপ্তাহ পরেই আমি সাহিত্যিক আনিসুজ জামানের আমন্ত্রণে মেক্সিকো গিয়েছিলাম। সেখানে তিনি আমাকে হালিস্কো প্রদেশের গুয়াদালহারা শহরের একটি রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেটির নাম ছিল ‘ক্যাফে মাদোকা’। ‘পেদ্রো পারামো’ উপন্যাসের লেখক হুয়ান রুলফো (১৯১৭ – ১৯৮৬) এই ক্যাফেতে আসতেন এবং মনে করা হয় ‘পেদ্রো পারামো’র আদি চিন্তাটির সূত্রপাত এখান থেকেও হতে পারে। আনিস আমাকে রুলফো, এগারো থেকে চৌদ্দ বছর পর্যন্ত যে স্কুলে পড়তেন – ‘কলেয়িও লুইস সিলভা’ – সেখানেও নিয়ে গিয়েছিলেন। আনিস স্প্যানিশ ভাষা থেকে দক্ষতার সঙ্গে ‘পেদ্রো পারামো’র বাংলা অনুবাদ করেছেন, তাঁর জন্য এই জায়গাগুলো রুলফোকে বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

‘পেদ্রো পারামো’ (১৯৫৫) উপন্যাসটি কলেবরে ছোটো, কিন্তু সেটি জাদুবাস্তবতাকে এমন মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল যে, গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেসকে তা নতুনভাবে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। উপন্যাসটির মূল চরিত্র তার মৃত মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে কোমালা গ্রামে যায় তার পিতা পেদ্রো পারামোকে খুঁজতে, কিন্তু পৌঁছে সে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করে যে, পুরো গ্রামটাই মৃত। উপন্যাসটি সময়ের অরৈখিক বর্ণনায়, জীবিত আর মৃতদের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে, ধীরে ধীরে উন্মোচন করে পেদ্রো পারামোর অত্যাচারী চরিত্র এবং পরিশেষে কোমালার ধ্বংসের করুণ ইতিহাস। হালিস্কো প্রদেশের সামাজিক ও ভৌগলিক পেক্ষাপট কোমালাকে সৃষ্টি করেছিল, আর ‘কলেয়িও লুইস সিলভা’ আর ‘ক্যাফে মাদোকা’ হুয়ান রুলফোর অদৃশ্য অধরা ছায়া আমার মনে মূর্ত করেছিল, যেমনটি করেছিল ‘আওয়ারবাখ কেলার’ গ্যোটেকে মূর্ত করতে।


ফিরে যাই আবার লাইপজিগে। ‘আওয়ারবাখ কেলার’-এ ঢুকতে হলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে হবে। সেই নামার মুখে রয়েছে ফাউস্ট আর মেফিস্টোর মূর্তি, মেফিস্টো ফাউস্টকে বিপথে প্ররোচিত করছে। একদল জাপানি পর্যটক সেই মূর্তিদুটির সামনে ছবি তুলছে। আমরা অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবলাম এই ভাস্কর্য আমাদের মধ্যে কত ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি করছে, এটির উপস্থিতি যেন লাইপজিগে আমার আসাটা সার্থক করল। এর কয়েকদিন পরে প্রাগে রবীন্দ্রনাথে আবক্ষ মূর্তি দেখতে ছুটে গিয়েছি তাঁরই নামঙ্কিত রাস্তায়, ভিয়েনায় দেখতে চেয়েছি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী লুডভিগ বোলৎজমানের সমাধিতে উৎকীর্ণ তাঁরই সৃষ্টি পদার্থবিদ্যার একটি বিখ্যাত সমীকরণ। আমরা কেন এটা করি? কারণ একটি মানুষের মূর্তি যেখানে স্থাপনা করা হয় – সেই জায়গাটি ওই মানুষটিকে ধারন করে, মূর্ত করে, এটি একটি আইডিয়া যার মাধ্যমে ওই মানুষটির কর্মকে আমরা স্মরণ করি। সেই মূর্তমান আইডিয়াটির প্রভাব আমরা সচেতনভাবে চিন্তা করি না, কিন্তু আমাদের অবচেতন মনে সেটি দৃঢ়ভাবে বাসা বাঁধে।

কিছুদিন আগে বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিন পালিত হলো। অনেকেই আবিষ্কার করলেন পশ্চিম বঙ্গের পানিহাটিতে ওনার সমাধি আছে এবং সেখানে তাঁর একটি সুন্দর আবক্ষ মূর্তি রয়েছে। এই ভাস্কর্যটি রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে আমাদের কাছে মূর্ত করে – সামাজিক মাধ্যমে এই মূর্তিটির ছবি বেশ কৌতূহল ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়, বিশেষত যখন দেখা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রোকেয়ার ভাস্কর্য ও ছবিকে হয় বস্তাবন্দি অথবা বিকৃত করা হয়েছে।

পাঁচই আগস্ট, ২০২৪-এর পরে বাংলাদেশের বহু ভাস্কর্য, বহু মূর্তিকে ধ্বংস করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে, শহীদ মিনারের কাছে, শামীম শিকদারের সৃষ্টি এক শ’টির ওপর ভাস্কর্যকে ভাঙচুর করা হয়েছে, বিকৃত করা হয়েছে। ভেঙে দেওয়া হয়েছে দেশ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। ময়মনসিংহের শশীকান্ত আচার্যের যত্নে গড়া শশীলজের বাগানে রাখা এক শ’ বছরের পুরোনো গ্রীক দেবী ভেনাসের মূর্তিটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

একটি সমাজ যখন তার নিজের প্রতীকগুলোকে ধ্বংস করে, তখন সে কেবল পাথর বা ধাতু ভাঙে না সে আসলে ভাঙে তার নিজস্ব সম্মিলিত স্মৃতির ধারাবাহিকতা। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মবিস্মৃতি, যার উৎস হলো সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের অভাবে। যে সমাজ সাংস্কৃতিকভাবে বিভ্রান্ত, যার আত্মপরিচয় নিয়ে দ্বিধা আছে, সে তার অতীতকে হুমকি হিসেবে দেখে। এই দ্বিধা থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক নিগ্রহবাদ – যেখানে নিজের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা হয় কোনো কাল্পনিক বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যায় সভ্যতার ধারাবাহিকতা যা কিনা চল্লিশ হাজার বছর ধরে মানুষকে গুহা থেকে মহাকাশ পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। যে গুহামানবেরা চল্লিশ হাজার বছর আগে বাঁশি তৈরি করে গিয়েছিল, গুহার দেওয়ালে তাদের তখনকার জীবজন্তুদের চিত্র অঙ্কন করে গিয়েছিল তারাও মনে হয় সাংস্কৃতিকভাবে এই নিগ্রহবাদীদের থেকে অগ্রসর ছিল। এটি একটি অবিশ্বাস্য উচ্চারণ – কিন্তু সত্য হয়তো এর থেকে খুব বেশি দূরে নয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ