আদিম জোছনার পেলব লাবণ্যে ডুবে আছে পাহাড়ের পৌরুষ। ঘন, কালো, অনড় অচল। শুধু মেঘেদের সন্তর্পণে চলাচল এক ধরনের অলীক গতি দিয়েছে এসব আদিম পর্বতশ্রেণীকে। কোল ঘেঁসে ধোঁয়াটে অন্ধকার কুয়াশার চাদর জাপটে ধরে স্থির হয়ে আছে বনভূমি। তারও নিচে রূপসী যুবতীর মতো রূপালি কুলুকুলু নদী- বিলাসছড়া।
আমরা চারজন এগিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারের চাদর গায়ে। চাঁদের আলোর চেয়েও নিঃশব্দে। আমাদের অবয়ব অস্পষ্ট- আঁধারের সিলোয়েট। কেউ কাউকে স্পষ্ট দেখতে না পেলেও অনুভব করতে পারি অনায়াসে। আমরা কথা বলছি অন্তরঙ্গ ভাবনার শব্দহীন তরঙ্গে। চেতনার গুহায় ঝুলে আছে স্মৃতির কালো বাদুড়। একটু আলোড়নেই শুরু হতে পারে উত্তাল ডানার ঝাপট। আমরা তা চাই না কারণ নীরবতাই আমাদের অস্তিত্ব। ভেঙে গেলেই লুপ্ত হয়ে যাবো। শব্দের মতো নৈঃশব্দেরও সমারোহ আছে। স্তব্ধতা বিশাল- আদি অন্তহীন। আমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শব্দভুক নীরবতার তরলে দ্রবীভূত। যেমন জলের মধ্যে জল মিশে থাকে।
আমরা নদীর ধারে এসে পড়লাম। এখন শীতকাল। ক্ষীণকায়া বিলাসের মৃদু জলের দেহ ছেড়ে উঠে যাচ্ছে কিছু কুয়াশার উপাদান। আমরা এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াবো। ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে জেনে নেব ওপারের অন্ধকারের গোপন ইতিবৃত্ত। তারপর ভেসে যাব। মকবুলের ভাষায় হাওয়ার ঘোড়ায় সওয়ারি হয়ে। এত বছরেও এই এলাকায় কিছুই বদলায়নি। প্রকৃতি এতো সহজে বদলায় না। মানুষ বদলে যায় দ্রুত। ডারউইনের মতবাদের চেয়েও দ্রুত পশু ও মানুষের ব্যবধান ঘুচে যায়। নদী পেরিয়ে একটুখানি বালিয়াড়ি, তারপর নুয়ে পড়া বুড়ো বট। তার ঝুরির খাঁচায় বন্দি নিরাপদ অন্ধকার। এখানে আমরা কিছুক্ষণ থামবো। এখানে ছড়ানো ছিলো গুটিকয় স্মৃতিমন্দির। ভালোবাসার মতো দৃপ্ত অথচ জৌলুষহীন অবয়ব নিয়ে। মন্দিরগুলো সময়ের সাথে পাশা খেলছিলো। এখন নেই। পাশা খেলায় বুঝি হার হয়েছে। তাদের দেহবিচ্ছিন্ন কিছু ইট এখন ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তার ভাঙন ভরাট করছে। আর ক'খানা শেওলার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে বিলাসের বুকে। শ্বেতপাথরের স্মৃতিফলক, যাতে লেখা ছিলো- “ওঁ পরম পূজনীয়া মাতা শ্রীমতী শৈলবালা দাসির পুন্যস্মৃতিতে... তদীয় পুত্র শ্রী কেশব চন্দ্র দাস..." এখন ভেজা লাল সালু আর পানের গাদার নিচে মুখ লুকিয়ে আছে কেরামত আলীর পানের দোকানে।
এই প্রাচীণ বটের গহ্বর থেকে এ্যামবুশ করেছিলো কমান্ডার ইলিয়াস। রকেট লঞ্চার আর এলএমজির ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো মিলিটারি কনভয়। গনি, শওকত, মেজবাহ এবং আরো দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছিলো সেদিনের যুদ্ধে। তাদের চিহ্নহীন কবরও এখানেই আছে কোথাও। আমরা চারজন এখন পাশাপাশি দাঁড়াবো। পাহাড়ের মতো মৌনতা ভেঙে মন্দ্রসুরে আবৃত্তি করবো :
"আমরা স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী। মানবিকতার পরাভবকে আমরা মানি না- অশ্রু, রক্ত, ক্ষোভ আর হতাশার দূর্গম সিঁড়ি ভেঙে একদিন পৌছে যাবে অভীষ্ঠে। হৃদয় ছিন্ন করে মশাল জ্বালিয়ে আঁধার বিদীর্ণ করে পথ খুঁজে নেবো। ভোরের আলোর সাথে পথে পথে বুনে যাব নতুন ফসল। ফিরে এসে বার বার হব ইতিহাস।”
আমাদের প্রার্থনা আঁধার থেকে আলোর দিকে ছড়িয়ে যাবে। আমাদের কেন্দ্রীভূত,চেতনার শক্তি অকস্মাৎ রংমশালের মতো জ্বলে উঠে ছুটে যাবে ঊর্ধ্বকাশে। প্যারাস্যূট বম্ব। তার উদ্ভাসে ভেসে যাবে চন্দ্রমুখী অন্ধকার বনভূমি। হাওয়ার ঘোড়ায় দৃপ্ত, চঞ্চল আমরা চারজন ছুটে যাবো আরো দূরে। উদালিয়া বাগানের দক্ষিণে চাকমা গ্রামটির কাছাকাছি এসে মকবুল ও বশর শিস দেবে তীব্র সুরে। তার প্রতিধ্বনি পাহাড়ে পাহাড়ে মিলিয়ে যেতে যেতে ফিরে আসবে। কিন্তু প্রতিসংকেত আসবে না। হিরু চাকমা আজ নেই ওখানে। বহুকাল আগে ছিলো। আমরা সেদিন হিরুর বুড়িমার রান্না করা ঝাল শুটকির শুরুয়া দিয়ে আকাড়া লাল চালের ভাত খেয়েছিলাম বাঁশের মাচার ঘরে। চারদিন পর ঘরের রান্না খেতে পেলাম। বুনো আমলকী আর ঝর্নার জল খেয়ে কাটাতে হয়েছিলো গত দিনগুলি। অমৃতের স্বাদ ছিলো সে রান্নায়। চৈত্রের মাঠের মতো চৌচির বৃদ্ধা অবয়বে স্নেহের বৃষ্টি দেখেছিলাম সেদিন। একবার পাহাড়ী কুয়াশায় অন্যবার নরম জোছনায় আমাদের হৃদয় ধুয়ে যাচ্ছিলো।
হিরুচাকমাদের গ্রামটি এত বছর পর আবার পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাসের আকাশজুড়ে শুধু মুক্তিকামী মানুষের ঘরপোড়া ধোঁয়া। উদালিয়া ছেড়ে আমরা এগিয়ে যাবো সন্তর্পণে জোছনাপ্লুত শুনশান পাহাড়। আমাদের হৃদয়ে শোকাচ্ছন্ন মেঘ নেই, অনুকম্পাহীন ঘৃণাও নেই। নদীর ভেতরে মৌন আকাশের মতো শূন্যতায় ব্যাপ্ত আমাদের মন। সাপমারার প্রাচীন গোরস্তানের পাশে আমরা দাঁড়াবো কিছুক্ষণ। পুরোনো গানের মতো হাহাকার ছুঁয়ে যাবে আমাদের মন। একাত্তরের গণকবরে শুয়ে আছে কিশোরী অঞ্জলি, নমিতা, সালেহা এবং আরো অনেক নাম-না-জানা তরুণী। পাকিস্তানি নরপশুদের পাশবিক অত্যাচার সইতে না পেরে ওদের অনেকেই আত্মহত্যা করেছিল। তিন মাসের গর্ভবতী সমিরুনের গর্ভপাত ঘটেছিলো লেন্স নায়েক শমসের পাশার বুটের লাথিতে। তারপর মৃত্যু ঘটেছিলো উপর্যুপরি ধর্ষণে। তার রক্তাপ্লুত দেহ বয়ে এনে কবর দিয়েছেন বৃদ্ধ বাবা। কাফন পায়নি সে, জানাযাও হয়নি। শুধু মাটির সাথে মাটির মিশে যাওয়া। শহীদ নারীদের শরির মাটিকে দিয়ে গেছে ফসলের উর্বরতা। ধর্ম মানুষকে বাঁচায় না- মানুষই ধর্মকে আগলে রাখে।
গোরস্তানের নরম কুয়াশা ভেজা মাটির নিচে এইসব অভিমানী তরুণীরা ঘুমিয়ে আছে। যারা সংসার চেয়েছিলো- সন্তান চেয়েছিলো। আবহমান কাল ধরে যারা সাজিয়ে দিয়েছে কৃষকের- শ্রমিকের ঘর; অনুরাগে, স্নেহে, প্রেমে। আজ আর কোনো দাবি নেই। নামাজ, রোজা, পূজা-পার্বণ সব ভুলে গোরস্তানের ঘাসের সংসারে বুনোফুল ফোটাচ্ছে ওরা। বিদ্বেষ, ঘৃণা অথবা ক্রোধের প্রতিশ্রুতি দেয়নি কেউ ওদের। কোনো পৌরুষ ওদের অপমানের বিপক্ষে দাঁড়ায়নি কোনোদিন। নূরুন্নাহার পাগলী পঞ্চাশ বছর পরেও মধ্যরাতে আজো আর্তনাদ করে ওঠে হাটখোলার বটতলায় শুয়ে। দুচোখে আগুন নিয়ে আজো অভিশাপ দেয় সেইসব নরপশুদের যারা তার কুমারী তারুণ্যকে ক্লেদাক্ত লালসায় লুটেপুটে ছত্রখান করেছিলো। বুভুক্ষা অপ্রকৃতিস্তা রমণী রাতের কুকুরের সাথে সুর মিলিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ওঠে: বাজান, ও বাজান, মা-মা রে। মুখ লুকাতে চায় কোনো স্নেহময় বুকে।ক্ষোভের রুদ্র কালবৈশাখীর সাথে মিশে যায় শোকাচ্ছন্ন মেঘ, সন্তুর আর বাঁশরীর পুরিয়া কল্যান।
কাউখালি বাজারের পাশে কালীবাড়ির কাছে এসে আমরা চারজন বসে পড়বো ধান ক্ষেতের আলে। রমেশ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করবে। মন্দিরের ভাঙা অলিন্দে এখনো লেগে আছে যুদ্ধ দিনের বীভৎস আগুনের কালিঝুলি। নাটমন্দির ধুলিসাৎ। একপাশে ইটের দেয়াল অন্য পাশে বাঁশের চাটাই দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। তার ওপরে খড়ের চালা। বৃষ্টি বাদলের দিনে পচা খড়ের চালা ভেদ করে ভেতরে ও বাইরে সমানে বৃষ্টি ঝরে। মন্দিরে দেবীমূর্তির সামনে জ্বলছে দুটি ধূপকাঠি। দু-চারটা বাসি জবাফুলের নিঝুম শিয়রে ম্রিয়মাণ মোমের রুগ্ন আলো। পূজো দিয়েছেন রমলা মুখার্জী। বাইশ বছরে কয়েক হাজার বার এই পূজো দেয়া হয়েছে শক্তিময়ীর সামনে, কিন্তু মুখুজ্জে বাড়ির রমেশ আর ফিরে আসেনি। দেবীর আরক্ত জিভে শুধু দুঃখী মানুষের হৃদয়চেরা রক্তের তৃষ্ণা।
স্বেচ্ছাচারী বাতাসের মতো আমরা ছুটে যাবো দূরে। লক্ষীছড়ি ফটিকছড়ি, হাটহাজারী গ্রাম, হাটখোলা, আড়ৎ, দোকান, পথঘাট, সাঁকো, ব্রিজ, নদী, জলা-জমি, বিল, শাপলা, শালুক, সব ছুঁয়ে আমাদের ব্যাকুল বাহুর স্পর্শে জেগে উঠবে বৃক্ষলতা, মাঠ, গোরস্তান, শ্মশান আর জলবতী মেঘ। আমাদের অন্তর্গত অরণ্যে ঝরে যাবে পুরানো দুঃখের মতো কিছু পাতা-পল্লব। এভাবেই অরণ্য পবিত্র হয়। ঋতুচক্র এভাবেই সময়ের মাকড়সার মসৃণ জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে বিজয়ী পতঙ্গের মতো।
হাটহাজারীর বদিউল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। টিনের চালায় পরপর দুবার দুটো নুড়ির শব্দ হতেই গলা খাঁকারি দিয়ে বেরিয়ে আসবে বদিউল। পুকুর পাড়ে বাঁশঝাড়ের পাশে আমরা মিলিত হব। দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি ভুলে জেনে নেবো দালাল অপারেশনের খুঁটিনাটি খবরাখবর। রাত শেষ হবার আগেই 'শান্তি কমিটির' চেয়ারম্যান ইয়ার মাহমুদের বৈঠকখানা ঝাঁঝরা করে চারটি স্টেনগান গর্জে উঠবে ঠা- ঠা-ঠা-ঠা। হাই এক্সপ্লোসিভ হ্যান্ড গ্রেনেডের মুহুর্মুহু দুধুম্ দুধুম্ শব্দে চাপা পড়ে যাবে শয়তানদের আর্ত চিৎকার। মলোটভ ককটেলের বিস্ফোরণে দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে বিশ্বাসঘাতকদের শেষ আশ্রয়।আমরা তখনো জানবোনা বদিউলের যুবতী বোনটিও মারা যাবে সেই আগুনে পুড়ে। রাজাকারেরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো পাকিস্তানি দস্যুদের পাশবিক ভোগের জন্যে।বদিউল কি জানতো? রাত শেষ হবার আগেই আমাদের সরে যেতে হবে নিরাপদ দূরত্বে। পেছনে চেয়ারম্যান মাহমুদের জ্বলন্ত বাড়ি। আমরা ছুটে চলবো চারজন প্ল্যান মতো।শেষ মুহূর্তে বদিউলকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার অপারেশন এ্যাকশন সম্পুর্ণ হয়নি।
আমজাদ চৌধুরীর ঘাট পেরিয়ে গেলেই মুক্ত এলাকা। কিন্তু তার আগেই আমাদের গতি থেমে যাবে অকস্মাৎ এলএমজির শব্দে। মকবুলের আর্তচিৎকার মিলিয়ে যাবার আগেই আমরা পজিশন নেবো ধানক্ষেতের আল ঘেঁষে। বৃষ্টির মতো মেশিনগানের গুলি শিস্ কেটে উড়ে যাবে মাথার ওপর দিয়ে। টু ইঞ্চ মর্টারের গোলা খুবলে নেবে আশেপাশের নরম ধানক্ষেতের বুক। আমাদের এ্যমুনিশান সীমিত। গামছায় বেঁধে কোমরে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম দু-বাক্স বুলেট। তিনটে ম্যাগজিনের মধ্যে দুটোই খালি করেছি গত অপারেশনে। বাকিটাও অর্ধেক খালি। রিলোড করার অবকাশ নেই। রমেশের কোমরে ঝোলানো আছে শেষ সম্বলের মতো দুটো গ্রেনেড। মকবুলের কোনো সাড়া নেই। বশরের অবস্থাও আমরই মতো। বৃষ্টির মত গুলি আসছে শত্রুর মেশিনগান থেকে। রমেশ চিৎ হয়ে শুয়ে গ্রেনেড দুটোর সেইফটি পিন দুটো খুলে নেবে দাঁতে কামড়ে। উন্মাদের মতো সোজা উঠে ছুটে যাবে শত্রুদের বাঙ্কার লক্ষ্য করে। তাকে কাভার দেবার জন্যে মরিয়া হয়ে ষ্টেনগানের ট্রিগারে চাপ দেবো আমি। রমেশ চিৎকার করে স্লোগান দেবে - জয় বাংলা। তার স্লোগানের প্রতিধ্বনি আর বুলেট ও বিস্ফোরনের শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাবার আগেই অকস্মাৎ অলীক স্বপ্নের মতো সবকিছু মিলিয়ে যাবে।
যেমন দুঃস্বপ্নের শেষে জেগে উঠতাম মায়ের পবিত্র কোরান পাঠের সুরে অথবা পিতার স্নেহময় ঋজু কণ্ঠে। ঠিক তেমনি আমরা উঠে দাঁড়াবো। হারানো ঠিকান খুঁজে পাবার মতো মন্দ্রিত উল্লাসে আমরা চারজন এগিয়ে যাবো শ্বেত শুভ্র অলৌকিক পর্দা সরিয়ে সম্মুখে।আমাদের সামনে যদিও অনন্তকাল তবু আমরা আবার ফিরে আসব অনির্বান স্মৃতির মত বার বার।

0 মন্তব্যসমূহ