কাজী রহমানের গল্প : রাতের কাজ



রাতের টংগীর সাথে দিনের এই শহরের কোন মিল নেই। পথের পাশের বাতিগুলো যেন অনিচ্ছায় জ্বলে থাকে। সেই আলো বাতাসের শব্দের সাথে মিলেমিশে কাঁপে, রহস্য করে, হয়তো বিচ্ছিন্ন এক বিষাদময় স্বপ্নের কিংবা আনন্দের একটা জগৎ তৈরি করে। এ.জে. গার্মেন্টস লা থ্রেড গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ জামালের জন্য এটা মনের মত করে কাটাবার সময়, তৃপ্তির সময়। দিনের বেলার বহু অনিয়মের নিয়ম-প্রেমিক এই রহস্যময় আড়ালপ্রিয় মানুষটাকে সবাই এ.জে. বলে ডাকে। দিন কাটে তার গলফ কোর্সে বা দামি রেস্তোরাঁয় ব্রাঞ্চে পানাহার ও মিটিং করে। আচরণ আর যথেষ্ট সুগঠিত দেহ সৌষ্ঠবের কারণে যদিও নারী বন্ধুদের অভাব নেই তাঁর তবু যে অভাব কিছু আছে তা বুঝা যায়।

রাত দশটা হলেই টঙ্গির অফিস কাম সুইটে আসা চাই এ.জে'র। রাতের ঘড়ি চলে এ.জে'র নিজের নিয়মে। সময় কখনো থেমে যায়, কখনো আগুপিছু, অনিয়ম করে। বর্তমান, অতীত ভবিষ্যৎ সব ককটেল হয়ে যায়। স্যইটের ভেতরের ডিফিউজার থেকে ট্রাঙ্কুইলিটির গন্ধ ছড়ায় আর মন হালকা করা বাজনা বাজে, স্বপ্ন আর শব্দরা খেলা করে। সে তাঁর আপন জগতে ঢুকে পড়ে, ছায়া দেখে। এ.জে'র প্রিয় কানাডিয়ান স্ফিংস বেড়ালটিও বিশাল আধো আলো অন্ধকারময় অফিস টেবিলের উপর ঝাপসা ছায়া ফেলে খুব সাবধানে হেঁটে বেড়ায়। জানালার বাইরের লম্বা ঘাসের মত অপূর্ব প্যাম্পাস গাছগুলোতে আপন পছন্দের বিচিত্র ছায়াদের দেখে এ.জে.। রাতের প্যাম্পাসে আজ দেখা যাচ্ছে তিনটি ছায়া।

ঠিক রাত ১০টা ২৩মিনিটে নিরাপত্তা দরজার সামনে এসে গেলো ছায়াগুলো, তিনটি তরুণী। তাদের নাম জানতে চাইলো না দ্বাররক্ষী, ইন্টারকমের বোতাম টিপে তারা নিজেরাই বলে দিল:
“আমি মিষ্টি। স্বপ্ন নিয়ে কাজ, মিষ্টি।” অনেকটা যেন স্পাইদের পাসওয়ার্ড আওড়ায় সে। তারপর শোনা যায়,

“আমি লাভলী, শব্দ শুনি, নতুন ভঙ্গি সৃজন করি।” আর সবশেষে

“আমি চুমকি। আমি স্বপ্নকে ধরে রাখতে সাহায্য করি। দল বেঁধে একসাথে কাজকে ভালবাসি”।

বিশ্বস্ত নির্বিকার প্রহরী বলে উঠলো,
“স্যার বলছিলেন, তিনজন আসবে। ঠিক এই সময়েই।”

শুধু বিশেষ প্রয়োজনে যে দরজা খোলে, তরুণীরা সেই দরজার সামনে আসতেই কোন চাবি-কার্ড ছাড়া সেটা খুলে গেলো নিঃশব্দে। একটু পরেই তরুণীরা পৌঁছে যায় জায়গা মত।


চেয়ারম্যান একটু আগে একটু আগেই চেয়ারে গা এলিয়ে স্ফিংসের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
— “ওরা আসছে তো?”।

বিড়াল চোখ বন্ধ করে মাথা দোলায়। গোপন প্রকল্পটির কথা ভেবে উল্লসিত বোধ করে এ.জে.।

মেয়েগুলো চেয়ারম্যানের রুমে ঢোকে, বাতিগুলো আর একটু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এক ধরনের লালচে আভায়।

চেয়ারম্যান ক্ষণিকের জন্য চোখ তুলে দেখেন তরুণীত্রয়কে। তারপর স্ফিংসের ছায়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন,

“তোমরা এসেছো ঠিক সময়ে। শূন্যস্থান পূরণ করবে তোমরা। আমি যেমন চাই তেমনি গুণ সাথে করে এনেছ তোমরা তিনজনই, যেমন কথা ছিল। তোমাদের কাজের পুরস্কার হবে তৃপ্তি পাবার মত। খুশি হবে তোমরা। কাজ আছে, জানোই তো, রাতের কাজ। হয়তো তেমন ভালো লাগবে না প্রথমে, কারণ সবাই একযোগে অন্যরকম কিছু করবে।”

তিনি ধীরে ধীরে প্রত্যেকের দিকে তাকান। টেবিল থেকে কিছুটা দূরের তিনটি চেয়ারে বসতে ইঙ্গিত করেন তাঁদের।

ওরা বসলে পরে মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলেন, “তোমার চোখে নাকি জাদু আছে। নতুন ভাবনায় তোমার জুড়ি মেলা ভার শুনেছি। তুমি আনন্দময় স্বপ্নের কাজ দেখাবে তো”?

মিষ্টি হাসে, বলে, “নিশ্চয়, বেশি বেশি আগ্রহ নিয়ে কাজ করি। ছোঁয়া লাগাই স্বপ্নের, খুব পছন্দ হবার মত করেই।"

— "বেশ," এবার চোখ ফেরান লাভলীর দিকে,

— “তুমি একটু ছুঁয়েই নাকি বুঝতে পারো ওটি কোন ভঙ্গি, মানে কোন স্টাইলটি সবচেয়ে ভাল হবে। তোমারটা অনন্য!"

— “হ্যাঁ স্যার। আমি ছোঁয়া বুঝি, কোনটি আনন্দ দেবে, কোনটি দেবে তৃপ্তি, আমি সেগুলো বেশ ভালই বুঝি।"

সবশেষে চুমকির দিকে তাকান। দেখতে পান সে অন্য দুজনের মত কেতাদুরস্ত আকর্ষণীয় পোশাকে অথবা সাজগোজে নেই। শান্ত সুন্দর অনেকটা নিষ্পাপ মুখমন্ডল, তার গলায় ঝুলছে টারসেলের মাঝে ছোট্ট একটা লাল রুবি, কানেও রুবির টপ। ঈর্ষণীয় রকমের আকর্ষণীয়, কিছুটা বেচারি ভাব মুখে, তবে দৃষ্টি তাঁর এমন অন্তর্ভেদী যেন সবার ভেতরটা অনায়াসে দেখে নিচ্ছে সে।

চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করেন,

— “শুনেছি কামকাজে ফাঁকিবাজদের সহজেই দেখতে পাও তুমি, নজর তোমার সবখানে। মজার, কেন"?

চুমকি চোখ নামিয়ে বলে,

“কারণ, অন্য কেউ যা দেখতে চায় না তা আমি দেখি। ফাঁকিবাজি আমার অপছন্দের। আমি শুধু আনন্দ নিয়ে যে কাজটা করি তা নয়, আমি চাই অন্যরাও আমার মত আন্তরিক হয়ে তা করুক, সেজন্যই খবরদারি আমার পছন্দের।"

চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে ঘরের বাতিগুলো কমিয়ে দেন।
এবার কেবল তার ডেস্ক ল্যাম্প জ্বলে। বলেন, “তোমরা কাছে এসো”।

এক হাত দিয়ে বিড়ালটাকে কোলে নেন, অন্য হাতে টেবিলের খোপে রাখা তিনটি খাম বের করেন।
ফিসফিস করে বলে ওঠেন,
“তোমাদের তিনজনের জন্যে পারিশ্রমিক ছাড়াও বাড়তি সুবিধা আছে—

আবাসন, পোশাক ও খাবারের ভাতা, মাসে চারদিন ছুটি, আর একটা গোপন বোনাস। কাজটার মত বোনাসের অংকটাও বিশেষ। সবকিছু দক্ষতার ভিত্তিতে। রাতের কাজটা তোমরা সন্তোষজনক ভাবে করলে, আমার, মানে আমাদের স্বপ্ন আরও এগোবে।”

তারা কিছু বলে না।

শুধু হঠাৎ এক ঝলক আলোয় তিনজনের চোখে যা দেখা যায়—তা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না।
চেয়ারম্যান বিড়ালের কানে বলেন:
“তিনটা আলো এসে গেছে। বিপণন কৌশল, নকশা পরিকল্পনা আর ক্ষতি প্রতিরোধ নিয়ে ভাবতে হবে না। এবার রাত কাটবে ঠিকঠাক। ক্ষতিপূরণ, লাভ সবই হয়ে যাবে।”

বিড়াল স্ফিংস হালকা গম্ভীর স্বরে মিউ মিউ করে, যেন বোঝে—এটা কেবল দলগত নিয়োগের গল্প নয়। এটা অন্য কিছু।

ঘরের দেয়ালের ঘড়ি থেমে গেছে রাত ১২টায়। ঘড়ির কাঁটা এখন থেকে অন্য রকম নিয়ম মানবে। বাতাসে শব্দ, আলো-ছায়ারা অন্যরকম খেলা খেলবে।এ.জে'র মস্তিষ্কে শুধু ফিসফিস শব্দ,

 “তিনটি ছায়া এসেছে। আলো জ্বলতে শুরু করেছে। কেউ কি জানতে পারবে —আসলে এই রাত কার।"



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে। চমৎকার গদ্য। নির্মেদ লেখাটি পড়ে আরাম পেয়েছি।

    উত্তরমুছুন