কুলদা রায়ের গল্প : একটি হত্যাকাণ্ডের নিষ্পত্র ডানা





ছোট পিসির ঘরটি ছোট। বড় একটি ঘরের একপাশে বাড়তি তোলা চাল। মাটির মেঝেতে হোগলার পাটি আর কয়েকটি কাঁথা বিছানো। ছোট বোনটি ঘুমিয়ে পড়েছে। দাদা মুড়ি চিবুতে চিবুতে বলল, খাবি?

সারাদিন ভাত খাওয়া হয়নি। পিসি ভাত তুলে দিয়েছে। বলল, কাল চাল কুটব। পিঠা খাবি।
মা বোন দুটির পাশে একটু চোখ বুজেছে। বড়দিদি পিসির সঙ্গে রান্না ঘরে। বুড়ি দিদি ডাল বাছছে পা ছড়িয়ে। বলছে, পিসি, ডালের বড়ি আছে? পিসি হেসে মাথা নাড়ল। আছেরে মাইয়া। আছে। সব আছে।

উঠোনের মাঝখানে মাটির প্রদীপ জ্বেলে পিসে মশাই নৌকাটির গায়ে হাতুড়ি বাটাল চালাতে শুরু করেছে। আর কিছুদিনের মধ্যেই নৌকাবাইচ। বাবা হাই তুলতে তুলতে বলল, বেশ বড়ই মনে হচ্ছে।

পিসেমশাই হেসে উঠল। হাতুড়ি ঠুক ঠুক করে বলল, হ্যা। বেশ বড়ই হবে। এত বড় বাইচের নাও- কেউ আগে দ্যাখে নাই। কেউ পারবে না এর সাথে।

প্রদীপটা আরও উসকে দিয়ে বলল, সারা জনমের এইডাই হাউস। সবচে বড় নাও বানামু। বাইচে নামমু।

চাঁদের টুকরো আলো এসে পড়েছে আধুবুড়ো পিসেমশাইয়ের গালে। গভীর তৃপ্তির ছাপ লেগে আছে। জলের শীতল হাওয়া ভেসে আসছে। আসছে ঢাকের মৃদু বোল। কে একজন নারীকণ্ঠ চোখের জলে ভেসে ভেসে গান গাইছে। মৃত স্বামীর প্রাণ দাবী করছে সুরে সুরে। মা বলল- এইটা রয়ানী গান। পিসি কপালে হাত ছোঁয়াল। ঠাকুর, ঠাকুর। রক্ষে করো সবাইকে।
প্রভাত সময়কালে
শচীরাণীর আঙিনা মাঝে
কার গৌর নাচিয়া বেড়ায় রে-

প্রভাতে উঠিয়া ডাকে শচী মাতা। শচীমাতা বিমলানন্দে সবাইকে ডাকছেন। ঘুমিয়ে থাকা যায় না।
উঁকি দিল একটি সুখী সুখী মুখ। কপালে তিলক। চুল চূড়ো করে বাঁধা। পরণে কমলার শাড়ি। নাকে রসকলি। কাকে বলল, হ্যাগো ছোট বৌ, আমার রাধামাধব দ্যাও।

পিসি উঠোনে গাই দোয়াচ্ছিল। বলল, যাও না ঠাকুরঝি তোমার রাধামাধবরা সব ঘরের মৈদ্যে। যাও না ঘরের ঢুইকা।

ছোট বোনটির ঘুম টুটে গেলেই কেঁদে ওঠে। আজ কিন্তু কাঁদল না। মুখের মধ্যে তর্জনিটি পুরে চুষতে চুষতে বড় বড় করে তাকাল। মা উঠে বসেছে। মাথায় ঘোমটা সামান্য টেনে দিল। ঠাকুরঝি বলে উঠল, আমি তোমাগো কমলা ঠাকুরঝি, বউমণি। আমার রাধামাধবদের দ্যাও। কীর্তনের সময় চৈলা যায়।

দাদা বড়দিকে ঠেলে ডাকল, দিদি ওঠ। দিদি ওঠ। দিদির আগে মেঝদি- বুড়িদি উঠে পড়ল। তৃতীয় বোনটি দৌড়ে ঠাকুরঝির খঞ্জনিটি হাতে তুলে নিল। ঝুন ঝুন করে বাজানো শুরু করল। ঠাকুরঝি হেসে দিল। বলল, চল, চল- বেলা বয়ে যায়।

ঠাকুরঝি খঞ্জনি বাজাতে বাজাতে গান গাইতে শুরু করল।
একে গোরার নবীন বেশ
মুড়াইয়া চাঁচর কেশ
সোনার অঙ্গ ধুলাতে লুটায় রে-

তার পেছনে আমার ছয় ভাই বোন। উঠোনে শান্ত আলো। নম্র বাতাস। পিসি গাই দুয়ে রান্না ঘরে ঢুকে পড়েছে। উঠোন নিকোন হয়েছে সূর্য ওঠার অনেক আগেই। ঘরের চালে এক কুড়ি জালালি কবুতর গলা ফুলিয়ে বলছে, বাক বাকুম, বাক বাকুম।

শিউলি গাছে ফুল ফোটেনি। কদম গাছে কদম ফুটেছে। বেলি ফুলে সাদা হয়ে গেছে। ঠাকুরঝি প্রণাম করল শিউলি গাছটিকে। কদম গাছটিকে। নত হয়ে বেলি ফুলের পাতা কপালে ছোঁয়াল। বুড়িদি ফুল তুলতে শুরু করে দিল। তৃতীয় বোনটি নাকে চেপে ধরে গন্ধ শুকছে। একদম ছোটটি বলছে, দিদি, আমালে দে। দিদি, আমালে দে। আলু থালু চুল। পরীর মত পোষাক পরা। লাফিয়ে লাফিয়ে বলছে, আমালে দে না। আমালে দে না।

বড়দি নীচু স্বরে গাইতে গাইতে ছোট বোনটির হাতে বেলি ফুল তুলে দিল। হাতে না রেখে কোচড়ে রাখল। জবা এল। টগর এল। অপরাজিতা এল। দাদার হাতে কদম ফুলের তোড়া। সূর্য উঠছে পূব দিক থেকে। ধীরে ধীরে। ঠাকুরঝি সূর্য প্রণাম করে নিল। এই কুড়ি ঘর বাড়িটির দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে প্রভাত সঙ্গীত পৌঁছে দিয়ে চলেছে। সব ঘর থেকে ছেলে মেয়ে বেরিয়ে এসেছে। রাধা মাধবের মন্দির নেচে গেয়ে মুখর করে তুলল। ঘাটে জল থৈ থৈ করছে। কোন নৌকা নেই। দূরে ধান ক্ষেত-ঘন সবুজ হয়ে উঠেছে। নূয়ে পড়তে শুরু করেছে পাতা। ঠাকুরঝি এই ঘাট, জল, ধানক্ষেত, আকাশ, মাটি, জল ও হাওয়াকে প্রণাম করল। গানে গানে জেগে উঠল মাটির পথটি। খাঁ বাড়ির বড়ো মিয়া হেঁটে যাচ্ছিলেন। একবার দাঁড়িয়ে গেলেন। মুখে হাসি। নদীটিও বাদ গেল না। সূযের্র সাথে সবাই জেগে উঠল।

শোনোনি গো শচীমাতা
গৌর আইল প্রেমদাতা
ঘরে ঘরে হরির নাম বিলায় রে-

বাবা বাড়ি নেই। ভোররাতে পিসে মশাইর সঙ্গে গভীর বিলে চলে গেছে। মাঝিগাতির ওহাব মুন্সী খবর দিয়েছিল- দিনের বেলা পুরুষদের সরে থাকতে হবে। বুড়ো-বুড়ি, মহিলা ও শিশুদের কোন অসুবিধা নেই।

মা খাচ্ছে খুব ধীরে ধীরে। পিসি বলছে, খাও বউ, খাও। দুপরে সোনামুগ রানবোনে। সোনামুগ দাদা ভালবাসে।

বড়দি মেজদি নারিকেল কোরা নিয়েছে ভাতের সঙ্গে। একখণ্ড মুছি গুড়। আর গরম গরম দুধ। দুতিনটে মাছি উড়ে এসে ভন ভন করছে। ছোট বোনটি খাওয়া রেখে একটি মাছির পিছনে ছুটতে শুরু করেছে।

বাড়ির বউ-ঝিরা ভিড় করে এসেছে। মাকে দেখছে। মা একটু লজ্জা পেয়েছে। ঘোমটা টেনে দিল। মাঝ বয়েসী হারাধনের বউ বলল, এ যে লক্ষ্মী ঠাইরেনগো। শ্যামলী নামের মেয়েটি ছুটে গেল তাদের ঘরে। সুগন্ধি তেলের শিশিটা আনতে হবে। মায়ের চুল বেঁধে দেবে। দুটি বউ ঢেঁকির দিকে ছুটে গেল। চাল কুটে দেবে। দিদিরা উঠোনে এক্কা দোক্কা খেলতে চলে গেল। মেজ দিদি একবার বলে উঠল, বাবা কখন আসবে?

কে যেন ভাঙা ভাঙা গলায় ডাকল, কেডারে? নতুন মানুষ কেডা যায়?

ছোট মন্দির। চালের উপরে অপরাজিতার ঝাড়। ফুটে নীল হয়ে আছে। ভেতরে হরি ঠাকুর। শান্ত চোখে চেয়ে আছেন। একটি ঢোল, করতাল, কাসি আর মৃদঙ্গ। গান শেষে সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
এর মাঝে জড়সড় হয়ে শুয়ে আছে খুনখুনে এক নিলয় বুড়ি। শনের মতো চুল। পরনে শাদা ধুতি। দুচোখ বন্ধ। শিয়রের কাছে একটি বিড়াল। কান খাড়া হয়ে উঠল। আর একটি টিয়া পাখি- একটি কাঠির উপরে বসে আছে। বলছে, হরি আইছে, বসতি দাও।

টিয়া পাখি উড়ে বুড়ির কানের কাছে বসল। বুড়ি চোখ বন্ধ করে বলল, অ হরি, কবে আইলি। বিড়ালটি পায়ের কাছে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ল।

হাপরটা একবার ফুলে উঠছে- আরেকবার চুপছে যাচ্ছে। কয়লার মধ্যে আগুনের আঁচ ফিনকি দিয়ে ঊঠছে। তার মধ্যে কি একটি গুঁজে দিয়ে কেলে কামার বলল, বোজলা, আমরা হৈলাম এই লোহার লাহান। আগুনে ফেলাও। বাড়ি মার। যা মঞ্চায় তাই গড়াও। লোহার নিজির কুনো হাউস নাইকা। হা হা হা।

তিনটা কুকুর উঠোনের মাঝ দিয়ে হাউ হাউ করতে করতে দৌড়ে গেল। পশ্চিম দিকে আকাশে কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। কেলে কামারের বিড়িটা ঠোঁট থেকে খসে পড়ল জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে। দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। সাগরেদ লালচাঁনের হাত থেকে হাতুড়িটা নিচে নেমে এল না। দড়ি টানা থেমে গেছে। হাপরের মুখ থেকে ফস-স করে শব্দ হল। এক ঝাঁক কাক চক্রাকারে উড়তে শুরু করেছে।

ঢেঁকিতে পাহার থেমে গেল। পিসির মুখটা বন্ধ হয়ে গেছে। মা শাকভাজি মেখে নিয়েছে। খুব ধীরে ধীরে পোড়া মরিচ ঘষচে থালার উপরে। মাথাটা একদিকে সামান্য হেলানো। শেফালি ঢেঁকির নোট থেকে হাত উঠিয়ে বলল, খুড়িমা- যাইয়া দেহি, কী হৈচে।

শেফালি দৌঁড়ে বেরিয়ে গেল। পায়ের ধাক্কায় দুধের ঘটি উল্টে গেল। মায়ের খাওয়া থেমে গেছে। শাকে ভাতে মাখামাখি। পিসি সোনামুগের ডালাটা নিয়েই বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে বলল, দেহি, আমার ধলি গাইটা গেল কই?

মদন মোহনের বুড়ি বউটা অন্ধকার কোনে একটি পুটলী গোছানোর চেষ্টা করছে। ছেলে সাধনকুমার গতকাল কাজুলিয়ার হাটে গিয়েছিল। ফেরেনি। রূপোহাটি শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকতে পারে। কচি বউটা সারারাত ছটফট করেছে। এক ফোঁটা ঘুমায়নি। এখন কাঁদতে বসেছে। মদন মোহনের বউ জোরে জোরে বলছে, অলো অবাগীর বেটি, গুছাইয়া ল। দেরি করিসনা। তর শউর আইতাছে।

একহাত গোমটা টানল সাধনকুমারের বউ। টিনের সুটকেসটা টানতে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। ছড়িয়ে পড়ল পুঁতির মালা, একটা তিব্বত স্নো। একটা আড় বাঁশি। আর কৃষ্ণের শতনাম পাঁচালী। তিনটি শুকনো পুইপাতা। আরেকবার সত্যি সত্যি তার বুক কাঁপিয়ে কান্না পেল।

শিবুর মা দৌড়ে এল। কোলের ছেলেটা ধপ করে নামিয়ে দিয়ে ছুটল- বড় ছেলে শিবুকে খুঁজতে। শিবুর এক চোখ কানা। কিছু তার মনে থাকে না। হাঁটতে হাঁটতে যেখানে যায় সেখানেই থাকে। ফিরে আসতে পারে না। বলে, তুমরা জানো- আমার বাড়ি কুথায়? তুমরা জানো আমার বাড়ি কুথায়? খ্যান খ্যান করে বলতেই থাকে। কোন লোকজনকে চিনতে পারে না। কেবল মাকে পেলে হাসে। গো গো করে হাসে। মাথায় জটা নেমেছে। কোলের ছেলেটা মদন মোহনের মায়ের কাছে হামাগুড়ি দিয়ে গেল।

হরিপদর বাবা বারান্দায় খুক খুক করে কাশছে। একখানি ময়লা নেংটি পরা। খালি গা। হাড় জিরজিরে। সাদা দাড়ি আর সাদা চুলে মাখামাখি। থালায় কিছু মুড়ি আর গুড়। মাছি এসে বসেছে। হাতড়ে হাতড়ে ঘটিটা হাতে নিল। কাঁপা কাঁপা হাতে উঁচু করে তুলে মুখের কাছে আনল। এক ঢোক জল ছিল। মুখের মধ্যে যতটুকু গেল- তার চেয়ে বেশি বাইরে পড়ে গেল। দাড়ি আর বুক ভিজে গেল। চেঁচিয়ে উঠল, অ মালতি মালতি, এক ঘটি জল দে রে।

ঘরের মধ্যে কেউ নেই। ছড়ানো ছিটানো দুএকটা শাড়ি, চালের সরা আর কাঁথা ও বালিশ। বাইরে কুকুরটি ঘেউ করে উঠল।

মেজো মণ্ডলের বউ রত্নবালার ব্যথা উঠেছে। ভোররাতেই আমেনা বেওয়া এসে পড়েছে। হালকা গরম তেল মালিশ করছে। রত্নবালা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। বড় বড় শ্বাস ফেলছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বড়ো মেয়ে শান্তি দরোজার কাছে দাঁড়ানো। তাকে ঘিরে আছে আরও চারটি বোন। রত্নবালা ফ্যাস ফ্যাস করে বলল, যা মা। অগো লৈয়া যা। দেরী করিসনি।

-কার লগে যামু?

-হগগলেই তো যাইতাছে। দেরি করিসনি। যাগো পাবি- তাগো লগেই যা শান্তি।
আমেনা বেওয়া ওদের হাত ধরে তাড়াতড়ি বাইরে নিয়ে এল।

উঠোনে তখন মানুষের ছুটোছুটি কোলেকাখেঅগ্রেপশ্চাতেনিকটেদূরত্বে মানুষ ছুটে চলেছে উর্ধ্বশ্বসে ছুটছে জননীরা আঁচল খসে পড়েছে পোটলাপুটলি নেই কে একজন গরুটিকে নিতে চেষ্টা করছে তাকে ধাক্কা মেরে এগিয়ে গেল কারা যেন পথের উপর গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে তালগোল পাকিয়ে উঠে বসে ছুটল তাদের পিছনে গরুটি দড়ি ছেড়া হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে ব্যা ব্যা করে ডাকছে একপাল ছাগল পাখা ঝাপটাচ্ছে ঝাকে ঝাকে কবুতর ..

আমিনা বেওয়া ওদেরকে ছেড়ে দিয়ে বলল, ফি আমানুল্লাহ।

শান্তি চারটি বোনকে নিয়ে ছুটে গিয়ে আবার ফিরে এল। জানতে চাইল- তুমি যাবা না?
-না। আমি গেলি তর মারে দেখপি কেডা।

তখন অনেক কাজ। তার বাড়ির নিজের ছেলেটা মেয়েটা অথবা স্বামীটা কি করছে তা চিন্তা করার সময় নেই। রান্না ঘরে ঢুকে গেল। চুলায় গরম পানি চাপাল। নতুন শিশুটি আসবে তার হাত দিয়ে। উঁচু করে ধরবে । প্রথমবারের মতো শব্দ করে উঠবে। শব্দটি কান্নার। পৃথিবীর প্রথম আলোটি দেখবে। এই আলোতে বড় হয়ে উঠবে। আসমান সমান হয়ে উঠবে। তিনি কোন জন কে জানে। হিন্দু কী, মুসলিম কী নাসারা কী কাফির কী সাধু কী দুশমন কী ফেরিশতাৃতাকে বরণ না করে কি যাওয়া যায়? হাসল আমেনা বেওয়া।

আর তক্ষুণি মন্দিরের ভিতরে বিড়ালটি নড়ে চড়ে বসেছে। টিয়া পাখি দুবার ঠোঁট ঘষল। গুটি শুটি পায়ের শব্দ হল। নিলয় বুড়ি বলে উঠল, অ হরি, আইলি।

বাতাসে ঘর পোড়া গন্ধ। আগুনের তাপ উড়ে আসছে। অসংখ্য বজ্রের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আকাশটা ফেটে পড়ছে। তীক্ষ্ণ দাঁত গৃধিনীরা মুখ ব্যাদান করে চিৎকার করছে।

তখন ধুলিবৃষ্টি রক্তবৃষ্টি ও উল্কাপাত হল, যক্ষ রাক্ষস ও পিশাচগণ অন্তরীক্ষে কোলাহল করে উঠল, ঘোর দর্শন কবন্ধসকল নৃত্য করতে লাগল। আর হরি এসে অশক্ত অক্ষম অশিতিপর বুড়িটার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

নদীতে তরঙ্গ উঠিয়াছে। নবজলধারা খল খল করিতেছে। খরসান বাতাস।

তরুণতর বড় দাদার কাঁধে আজ বাবার কাঁধের বড় পোটলাটি। আর মেজ দিদির কাঁধে দাদার পোটলাটি। বড়দিদি সেজ বোনটিকে নিয়ে জলে ঝাপ দিয়ে পড়ল। মা হায় হায় করে উঠল। ছোট বোনটিকে কোলে নিয়ে বড়দিদিকে টেনে ধরেছে। জলে ভেসে যেতে যেতে একাবার আকাশের দিকে তাকাল। ছোট বোনটি চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।

এ সময় খাঁ বাড়ির বড়ো মিয়া আর সনাতন মিস্ত্রির সবল হাত এগিয়ে এল। ওদেরকে জল থেকে টেনে তুলল। তারপর আবার ওরা টুপ করে ঢুকে পড়ল পাট ক্ষেতে। বলে উঠল, মরে গেলিও কেউ কিন্তু শব্দ করতি পারবা না।

পাটক্ষেতে তখন অনেক লোক। কে মেয়ে কে পুরুষ ঠিক নেই। মাটি আকড়ে পড়ে আছে। কেউ কারো দিকে চেয়ে নেই। কোন ফাঁকা নেই।

.. পাট ক্ষেত পেরিয়ে.. পাশের ধানক্ষেতে জলের ভিতরে ঢুকে যেতে যেতে ..নাক জাগিয়ে .. মাছের ঘ্রাণ নিতে নিতে .. বয়স্ক সাপের মতন উৎসাহী মৃত্যুর দিকে চেয়ে চেয়ে .. কয়েকটি সাদা বক উড়ে উড়ে এসে মাথার উপরে বসতে বসতে ..জলের দিকে কেঁপে কেঁপে .. শব্দের বৃষ্টির মধ্যে নেয়ে নেয়ে ..

সবাই এই প্রথম আকাশ এবং মাটির মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে লাফিয়ে দাপিয়ে উঠল। ভেঙে পড়ল শান্ত শীতল সবুজ পাট গাছ। ছিন্ন ভিন্ন হল পাতা। নদীর মধ্যে গড়িয়ে গড়িয়ে মিশল উষ্ণ জলধারা। কালো জল শাদা জল লাল জল মিলে গেল ধীরে ধীরে। কেউ কোন শব্দ শুনতে পায় নি। কারো মুখ থেকে কোন শব্দ উচ্চারিত হয় নি। সবাই ছিল মৌন- মুক।

মাছির ডানায় ভর করে রাত্রি এল। সারি সারি গাছগুলো স্তব্ধ। বাতাসও কংকালের মতন নিষ্পলক। অসুস্থ দগ্ধ চাঁদ ধুকতে ধুকতে একটু একটু করে ঝুলে পড়েছে। আধখানা আলোর মধ্যে পোড়া মাংসের গন্ধ আর অনাদি অনন্ত ছাই বেয়ে কখনো হেঁটে কখনো খুড়িয়ে খুড়িয়ে কখনো হামাগুড়ি দিয়ে যে অস্থানে পৌঁছে গেল মা আর তার একপাল ছেলে মেয়ে সেখানে একটি শিউলি গাছের তলায় একটি কাঁসর ঘণ্টা পড়ে আছে- আর আছে ভাঙা খঞ্জনিটি আর সুধামুখ রমনীয় হাত- শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা- চুপ চুপ করে গেয়ে উঠছে- 
প্রভাত সময়কালে/ 
শচীরানীর আঙিনা মাঝে / 
কার গৌর নাচিয়া বেড়ায় রে-

উঠোনের এখানে ওখানে কয়েকটি দড়ি ছেড়া গরু, একটি বকনা বাছুর লাফিয়ে উঠতে গিয়ে থেমে আছে। আর কালো কালো ছাগলগুলো- ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শেফালি, শান্তি অথবা সাধনকুমারের কচি বউটি- ছিটকে পড়েছে হাত থেকে এক কৌটা সিঁদুর।

কিছু হাঁস জলে ভাসছে। কিছু ঘাটের উপরে। কিছু বাড়ি ফেরার পথে। পিঁপড়ের সারি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

মায়ের হাত ধরে আছে শিবু। বিস্ফোরিত একটি মাত্র চোখ। লাল হয়ে আছে। জাম গাছ পেরিয়ে উঠোনে কেবল এই নুলো ছেলেটিকে নিয়ে পা রেখেছে।

হাপরের আগুন টেনে নিয়েছে কেলে কামারের পা। শাকরেদ লালচাঁনের বুকের নিচে হাতুড়ি।
বারান্দা থেকে ছিটকে পড়েছে হরিপদর বাবা। মুখটা আরেকটু ছোট ছোট লাগছে। কাঁসার থালার পাশে এক খণ্ড গুড়।

কালো হয়ে গেছে বাশেঁর খুঁটি। কয়লা আর ছাইয়ের মধ্যে রত্নবালা- পাশে নির্ভার আমেনা বেওয়া- হাসি হাসি মুখ। তার হাতের ভিতরে একটি নতুন শিশু। চোখ বন্ধ। মাথার পিছন দেখে বোঝা যায় তার এক মাথা কালো চুল হয়েছিল।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ