আমার আসলে সময়ক্ষেপণ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো কারণ ছিলো না। শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, একটা সুযোগ। আচ্ছা হাতে অগণিত টাকা থাকলে কি চারপাশের সবাইকে সুযোগসন্ধানী আর মিথ্যুক মনে হয়? মনে হয় সবাই ছলে বলে কৌশলে আমার টাকা হাতিয়ে নিতে চাইছে?
মূলত মীর মশাররফ হোসেনের চিনির দানার মতো অগণিত টাকা নিয়ে অনেক দিন আমার মাথা ব্যাথা কিংবা মাথা ঠাণ্ডা কোনো উপসর্গই ছিলো না। আমি আমার প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন,শখ আহ্লাদ,ফ্যাশন এবং প্যাশন নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু মাথা ব্যাথা শুরু হলো,বেশ ভালো রকম মাথা ব্যাথা শুরু হলো। যেমন এই মূহুর্তে আমার মনে হলো, আচ্ছা এমন কিছু যদি আমি করতে শুরু করি,অগণিত টাকা থেকে কয়েক বস্তা টাকা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে হাওয়ায় ছড়াতে থাকি তাহলে কী হবে?
আমার এই শুরু হওয়া মাথা ব্যাথা কমবে? পাভেল আর ফিরবে? পাভেলের সাথে আমার কী করা উচিত ছিলো কিংবা কী করা উচিত ছিলো না কোনো প্রশ্নের মীমাংসা হবে?না হবে না।
তবু আমার ভেতরে তৈরি হওয়া অনুতাপময় অন্তর্জালা আর নীরব দর্শকের মতো আমার নিজের বদলে যাওয়া জীবন দেখতে থাকার দমবন্ধ অসহায়ত্ব আমাকে এই মূহুর্তে প্রচণ্ড অস্থির করে তোলে। আমি ক্রমশ অচেনা হতে থাকি আমার কাছে। ভেতরে জন্ম নেয়া অনিয়ন্ত্রিত একটি ইচ্ছা আমাকে অযৌক্তিক কল্পনার মতো কিছু বাস্তবিকই করতে প্ররোচিত করে তীব্রভাবে।
আচ্ছা সত্যি আমি যদি কয়েক বস্তা টাকা লেকের ধারে দাঁড়িয়ে ছড়াতে থাকি, কী কী হবে বা হতে পারে? সম্ভাবনার ডালপালা কতোদূর যেতে পারে কল্পনা করতে করতে আমি ভাবি এতে আমার অন্তর্জালা কি লাঘব হবে?মীর মশাররফ হোসেনের টাকার গোডাউন কি জাতির কাছে উন্মুক্ত হবে?উন্মুক্ত হলে কি সচকিত জাতি এই অভিজাত পাড়ার ঘরে ঘরে গোডাউনগুলোতে হামলা করে সব টাকা লুট করে নিয়ে দেশটাকে একটা সমান পাটাতনে দাঁড় করিয়ে দেবে? যে পাটাতনে দাঁড়ালে টাকার অভাবে চিকিৎসাহীন পাভেলের মৃত্যু হবেনা আর মীর মশাররফ হোসেনের প্রাসাদে টাকারাও অলস ঘুমিয়ে থাকতে পারবেনা। আর আমার মতো মীর মশাররফ হোসেনের উদাসীন কিংবা লোভাতুর স্ত্রীদের সুখের ফানুস ফুটো করে আসল চুপসে যাওয়া চেহারা পাভেলের আয়নায় দেখিয়ে দেবে? হঠাৎ ফেঁপে উঠা টাকায় রিসোর্ট আর দামি দামি পাড়ায় ফ্ল্যাটের মালিকদের ধরে ধরে জেলে পুরবে? ফাঁসি দেবে? কী কী হতে পারে?
নিজের ইচ্ছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের মতো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠলেকল্পনা করে আর সময় নষ্ট না করে আমি আমার ইচ্ছার অনুগামী হই। রান্নাঘরের কাবার্ড খুলে একটা বস্তা নামিয়ে টেনে নিই সিঁড়ি পর্যন্ত। একটার ওজনে টের পাই আমার পক্ষে কয়েকটা নেওয়া কঠিন নয়,অসম্ভব। গোঁড়ায় এসে নিচে নামার সুদীর্ঘ সিঁড়ির শেষ মাথাটা দেখে উপলব্ধি করি, এই একটা ভারী বস্তা সিঁড়ির শেষ মাথায় আমার পক্ষে টেনে নামানোও সম্ভব না। দীর্ঘদিন কোনো শারীরিক পরিশ্রম না করতে করতে ভার বহনে অক্ষম ধনীলোকের এক অথর্ব অথচ সৌখিন ঘোড়ায় পরিণত হয়েছি আমি।
আমি আশিককে ফোন দিলাম।আশিক প্রথমটায় বুঝেনি কীসের বস্তা কোথায় যাবে। আমার টানা হেঁচড়ার কষ্ট দেখে আশিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ম্যাডাম ম্যাডাম আপনি রাখেন,আমি নিচ্ছি। গাড়িতো বের করিনি,আগে গাড়িটা বের করি,আপনি তো আগে গাড়ি বের করতে বলেন নি…ইত্যাদি। আমার বিস্রস্ত বেশভূষা দেখে সে নিশ্চিত হতে পারেনা আমি বাইরে কোথাও যাবো কিনা। নিজেই হয়তো আন্দাজ করে যাবো কিন্তু এখনো তৈরি হইনি। দীর্ঘদিন আমার গাড়ি চালানো আশিক নিজের অভ্যাসে বিশ্বস্ত থেকে বলে,আপনি তৈরি হন ম্যাডাম, আমি বস্তাডা গাড়িতে তুলে রাখি।
আমি আশিককে বিস্মিত করে বলি গাড়ি নয়,বস্তাটা লেকের পাড়ে নিয়ে যাও,আমি আসছি। লেকের পাড়ে! টলটলে লেকের জল,ফুড়ফুড়ে নির্মল বাতাস পাড়ের ডালপালা মেলা পাকুড় গাছে জিরিয়ে নিতে থাকে পুরো এলাকার পরিবেশ মোলায়েম রাখার আপ্রাণ চেষ্টায়। কিন্তু লেকের পাড়ে রহস্যময় নব্য ধনীদের বাড়ি কেনাটা অভিজাত হয়ে উঠার সাক্ষ্য হলেও এদের পরিবারের কোন সদস্য আলিশান বিল্ডিংয়ের আভিজাত্য ফুঁড়ে কখনোই লেকের বাতাস খেতে প্রকাশ্যে আসেনা। আমার হঠাৎ এই লেকের পাড়ে যাওয়ার বিষয়টির আগা মাথা কিছুই না বুঝতে পেরে আশিক আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আমি ওর বিস্ময়কে পাত্তা না দিয়ে ধমক দেই,তাড়াতাড়ি যাও।আশিক দ্রুত বস্তাটি কাঁধে তুলে নিচে নেমে যায়। আমি ওর পেছনে পেছনে সিঁড়ি ভাঙি। সেলফোনটা বাজছে। এই সময়ে কার ফোন? কে হতে পারে? অপরাজিতা,ধনীপাড়ার আদুরে সৌখিন ভাবিদের সংগঠন থেকে হতে পারে। আজ সবার নীল লেস লাগানো শাড়ি পরে খিচুড়ি আর বিফ উৎসবে একত্রিত হওয়ার কথা। সন্ধ্যায় ওয়েসিস ক্লাবে৷ এদেরই কেউ হবে। ফোন ধরে বলবে, আচ্ছা ভাবি আমার না নীল লেসের শাড়িটা মিসিং…পুলিশ প্লাজায় পাবো-জাতীয় অহেতুক গল্প জুড়বে। ফোনটা বাজছে। কোন ভাবি? আফজল ভাবি? সোহাগ ভাবি? হোক যে ইচ্ছা। আমার এই মূহুর্তে কারো সাথে কথা বলার মতো অবস্থা ইচ্ছা কোনোটাই বিন্দুমাত্র নেই।
আশিক লেকের পাড়ে বস্তাটা নিয়ে গিয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে অচেনা আমাকে দেখে। আমিতো নিজের কাছেই নিজে অচেনা হয়ে গেছি, আশিকের দৃষ্টিতে বিস্ময় দেখে আমি তাই বিস্মিত হইনা। ঠাণ্ডা মাথায়,সুস্থির হাতে আমি বস্তার মুখটা খুলে টাকা ছড়ানো শুরু করি। বাণ্ডিল বাণ্ডিল টাকা। তোড়া তোড়া টাকা। পাঁচশ টাকার নোট,হাজার টাকার নোট। বিস্মিত আশিক এবার হতভম্ব হয়ে যায়।প্রাথমিক হতভম্বতা কাটিয়ে সে পকেট হাতড়াতে থাকে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে তার স্যারকে ফোন দেয়। স্যার মানে জনাব মীর মশাররফ হোসেন।আমার হাসব্যান্ড।
ওর বারবার ব্যস্ত হয়ে ফোন দেয়ার ভঙ্গিতে বুঝতে পারি স্যার ফোন ধরছে না, আর স্যারের ফোন না ধরাতে বুঝতে পারি, ওর স্যার ঘুমাচ্ছে। এটা স্যারের ঘুমেরই সময়। বাইরে পৃথিবী ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেও স্যারের এখন মাত্র মধ্যরাত। ওর স্যার মীর মশাররফ হোসেন।
সারাদিন ক্ষেতে খামারে খেটে রাতে মুন্সী বাড়ির উঠানে বিষাদসিন্ধু শোনে কাঁদতেন মীর মশাররফ হোসেনের বাপ। একসময় নিজেই পুরা বিষাদসিন্ধু মুখস্থ বলতে পারতেন তিনি,আমি শুনেছি। ছুটিতে গ্রামে গেলে রাত গভীর হওয়ার আগে তিনি আমাকে ডাকতেন,বড় বউ…বড় বউ…। উঠানের শেষ মাথায় নিম গাছটায় একই সাথে ডাকতো কানাকুয়ো। অন্ধকারের নিজস্ব আলো বহু ব্যবহারে নরম হয়ে যাওয়া গামছার মতো শুয়ে থাকতো উঠান জুড়ে। তালপাতার পাখা নিয়ে বারান্দায় পাটি বিছিয়ে তিনি বলতে শুরু করতেন বিষাদসিন্ধু, “সীমার খণ্ডিত মস্তক বর্শায় বিদ্ধ করে দ্রুতবেগে চলতে থাকে,তখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে রব ওঠে,হায় হোসেন!হায় হোসেন!” বৃদ্ধের কণ্ঠ পুত্রহারা পিতার মতো আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসে হোসেনের মৃত্যুশোকে। যেনো তিনি কারবালার ময়দানে,যেনো কুফায় আটকে যাওয়া ঘোড়ার খুর তিনি প্রানপণে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন,যদি ঘোড়া আবার দৌড়ায়,হোসেন বেঁচে যায়,অকপট আকুল আকুতি ঝরে বৃদ্ধের কণ্ঠে।
ঘরে ঘরে ততোদিনে ঢুকে গেছে রঙীন টেলিভিশন আর ডিশ অ্যানটেনার “তু চিজ বড়ি হায় মাস্ত…মাস্ত…” এর দুনিয়া।বুঝতে পারি, দুদিনের জন্য গ্রামে বেড়াতে আসা পুত্রবধূর শালীনতা, শশুরের ডাক মুখের উপর অগ্রাহ্য করতে না পারার ভদ্রতার সুযোগটাই তিনি নেন। নইলে এই রঙীন বাক্সের আজব দুনিয়া ফেলে সময়ে অসময়ে কে আর বসে বসে তার মুখস্থ বিষাদসিন্ধু শোনার ধৈর্য দেখাবে? আমি শুনে শুনে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই বটে তার চেয়ে মুগ্ধতায় দেখি শুনিয়ে তার কী যে পরিতৃপ্তি! ভাবের সাথে কণ্ঠ উঠান-নামান,কাঁদেন হাসেন। হিন্দি সিরিয়াল দেখার মোক্ষম সময়টাকে তার পরিতৃপ্তির কাছে আমি বিসর্জন দিতাম। আহা একজন বৃদ্ধকে মানসিক পরিতৃপ্তি দেয়ার তৃপ্তি পূর্ণ করে থাকতো আমার তরুণী আবেগ।
সেই বৃদ্ধ শখ করে ছেলের নাম রেখেছেন লেখকের নামে। মীর মশাররফ হোসেন। পুরা বিষাদসিন্ধু মুখস্থ রাখা বাপের মুখস্থ বিদ্যার মাথাটাই পেয়েছে ছেলে, মীর মশাররফ হোসেন। যার গুনে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পেশাগত জীবনে একের পর এক কৃতিত্ব দেখাতে দেখাতে সে আজ এতোদূরে। বাপের আকাঙ্ক্ষা আর কল্পনা ছাড়িয়ে তার অনেক অনেক উর্দ্ধে।
আমি তোড়ার পর তোড়া খুলি,পিন ছাড়িয়ে টাকা উড়াই। আলী বাবা চল্লিশ চোরের আবিস্কৃত টাকার খনি,যতোই উড়াই, ফুরায় না।আমি মাঝে মাঝে আড়চোখে আশিককে দেখি।
আশিকের মুখের আতঙ্কিত ভাঁজ পড়া যায়। তার স্যার ফোন ধরছে না। আমি চাই ওর স্যার ফোনটা ধরুক। কিন্তু ধরবে কী করে। রাত তিনটা পর্যন্ত ঘরে পার্টি করে ভোরের দিকে ঘুমাতে গেছে মীর মশাররফ হোসেন। পাকস্থলীতে সঞ্চিত হওয়া বিদেশি তরলের প্রতিক্রিয়া শেষ না হওয়া অব্ধি তো ঘুম ভাঙবে না। আশিকের মুখে আমি ভয়-আতঙ্ক আর হতম্ভম্বতার যুগপৎ ভাঁজের উত্থান পতন দেখি আর টাকা উড়াই। বস্তা থেকে টাকার তোড়া খুলি, আবার উড়াই…। স্যাঁত করে চলে যাওয়া হাল মডেলের গাড়ি দুয়েকটা পিছিয়ে এসে বুঝার চেষ্টা করে ঘটনা কী। কিছু একটা জানতে চায় আশিকের কাছে।ঠিক কী জানতে চায় আর আশিক কী উত্তর দেয়, কোনোটাই আমার কানে আসেনা। তারা কৌতূহল গুটিয়ে নির্বিকার চলে যায়।
এবার আশিকের সন্ত্রস্ত কথা বলার ভঙ্গিতে বুঝতে পারি তার স্যার ফোন ধরেছে। ততোক্ষণে উৎসাহী পথচারী জমে গেছে বেশ কয়েকজন। কেউ কেউ আবার লাইভে চলে গেছে। কেউ এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের ভেতরে সাহস সঞ্চয় করে কম্পিত হাত এগিয়ে দিচ্ছে উড়তে থাকা, পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ টাকার দিকে। আশিকের ধমকে আবার গুটিয়ে নিচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার অভিজাত পাড়াটা এখানে এসে অচেনা হয়ে গেছে। একটা প্লটে একটাই বাসা। তিনতলার বেশি করার অনুমতি নেই। অনেকটা অতীতে ফেলে আসা পাড়ার মতো। সেই অতীতে শহরের মাঝ বরাবর যে রাস্তাটা চলে গেছে শহরকে বেকার প্রেমিকের মতো একলা ফেলে রেখে, তার ভেতরে ঢুকলেই যে পাড়াটা ছিল, তার ঠিক মাঝখানে ছিলো বাবুর দীঘি। পাড়ে দাঁড়ালে দূর থেকে দেখা যেতো ইট ভেঙে ভেঙে পড়া বাবুদের লাল দালান। পাভেল আর আমি লুকোচুরি খেলতে খেলতে সেই লাল দালানে লুকিয়ে পড়তাম। পাভেল নিজে ধরা দিয়ে আমাকে লুকিয়ে রাখতো। এই পোড়ো লাল দালানেই কিশোর কিশোরীদের দলে পাভেলের পক্ষপাতিত্বে শিহরণের সিঁড়ি ভাঙার সর্বনাশা আওয়াজ শুনতাম আমি। বিকেলের অর্থহীন খেলায় আমাকে বাঁচিয়ে কেবল নিজেকে ধরিয়ে দিয়েই আমাকে প্রেমের প্রথম পাঠ দিয়েছিল পাভেল। এখানেই পাভেল আমাকে ছুঁয়াছুঁয়ি শিখিয়ে বলেছিলো বড় হলে আমাকে বিয়ে করবে।
তারপর খেলার বেলা শেষ হলে আমার বুকে উড়না উঠলে আর পাভেলের ঠোঁটের উপরে গোঁফের উঁকিঝুঁকি যখন কেবল উঁকি দিতে শুরু করেছে তখন পাড়ার ছেলেরা কী করে টের পেয়ে আমাকে দেখলেই পাভেলকে ডাকা শুরু করতো আর পাভেলকে দেখলে আমাকে।
প্রায় পঁচিশ বছর পর পাভেলে সাথে আমার সেদিন হঠাৎ দেখা। চুল থেকে নখ পর্যন্ত পরিচর্যা করিয়ে আমি তখন লিফট ধরে নিচে নেমে ড্রাইভারের নাম্বারে ফোন করছি। হঠাৎ সামনে অপরিচিত একজন,ডায়না না?হ্যা আমি আমিই তো ডায়না। কিন্তু এই অভিজাত বাজারের শীতলে কে আমাকে ডায়না নামে ডাকে? এই নামতো অনেক আগেই ‘মীর ভাবি’ নামের দোর্দণ্ড প্রতাপে বিলীন হয়ে গেছে। আম্মা ছিলেন শেষ মানুষ, আমাকে এই নামে ডাকার। আম্মার কাছে গল্পটা শুনতে শুনতে বিরক্ত লাগতো, অসুস্থ বিছানায় মায়ের পছন্দের বিস্কুট আর পান সুপারি নিয়ে গেলে কিংবা কোনো দিন বাজারের সবচেয়ে ওজনদার রুই মাছ কিংবা হাড়িভাঙা আমের ঝুড়ি নিয়ে গেলে আহ্লাদে গদগদ হয়ে মা কেবল একটা গল্পই বলতেন, জানিস কী শখ করে আমি তোর নামটা রেখেছি, ডায়না…। জানতে জানতে আমি অতিষ্ঠ,বিরক্ত। সাদা-কালো টিভিতে রূপকথার রাজকন্যার মতো ফুটফুটে ডায়নার ছড়িয়ে যাওয়া সাদা সার্টিনের ম্যারেজ গাউনের পুচ্ছ দেখে মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পেটের সন্তান মেয়ে হলে নাম রাখবেন ডায়না। এই নামে আমাকে খুব কাছের মানুষেরা ডাকতেন। শেষ হয়ে যেতে যেতে এ নামে ডাকার আর কেউ আছে কিনা আমি তৎক্ষনাৎ মনে করতে পারিনা। আমি পাভেল…,আমার হতভম্বতা কাটাতে পাভেল দ্রুতই নিজের পরিচয় দেয়।
আমি ততোক্ষণে ডায়না নামের ফ্রক ছেড়ে সালোয়ার কামিজের স্মৃতিতে হারিয়ে গেছি অতীতের অলি গলিতে। শৈশবে কৈশোরে। বড় জেঠা ডাকছেন,ডায়না…তর জেঠীরে ক, তামুকের আগুন দিতে। কালো রঙের টিক্কায় ফুঁ দিতে দিতে দেখতাম গনগনে আগুনের ফুলকি কেমন প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে হারিয়ে যায় বাতাসে, তারপর বড় জেঠার হুক্কায় গুঁজে দিতাম যত্ন করে।যেনো তাড়াতাড়ি জ্বলে ফুরিয়ে না যায়। টিক্কা পোড়া তামুকের গন্ধটা যে কী ভীষণ প্রিয় ছিলো আমার! জেঠা কাপড় দিয়ে বাঁকানো আরাম চেয়ারে হেলান দিয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে হুক্কায় টান দিলে পানির গুড়গুড় শব্দ আর মিষ্টি একটা পোড়া যে গন্ধটা ঘরময় ছড়িয়ে পড়তো তার সাথে আমার দুশ্চিন্তাহীন জীবনও পা ছড়িয়ে পাটিতে ‘ত্রিভুজের তিন কোনের সমষ্টি দুই সমকোণ’ পড়তে বসে যেতো ভবিষ্যতের অনেক সম্ভাবনা নিয়ে। বড় জেঠার মৃত্যু সংবাদ যেদিন এলো আমেরিকার ডেট্রয়েট থেকে, আমি গুলশান ক্লাবে…আলো আঁধারী তরল আর চিকেন ফ্রাইয়ের গন্ধ ছাপিয়ে টিক্কা পোড়া তামাকের গন্ধ শেষ বারের মতো নাকে লেগেছিলো আমার। বড় জেঠার জন্য চোখের জল ফেলার ফুরসত মেলেনি আমার, মানে মিসেস মীরের, অনেক দূরে ফেলে আসা আমার জেঠার সাধ্য কি আমার ধনাঢ্য ব্যস্ততাকে ছোঁয়! আমমা মারা গেলেন এভারকেয়ার হাসপাতালে। আই সি ইউতে ঢোকানোর আগে পর্যন্ত আম্মা ডাকছিলেন, ডায়না..ডায়না…। আম্মা চলে যাবার সাথে সাথে পৃথিবী থেকে আমাকে ডায়না ডাকার মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো।।
আমি, আমাকে চিনতে পারছো না। আমি পাভেল। পা-ভে-ল!
আমি সাত আসমান পাড়ি দিয়ে সেই মূহুর্তে পৌঁছাই। যে মূহুর্তে পাভেলকে ছেড়ে এসেছিলাম। আমার চেয়ে পাক্কা বারো বছরের বড় মীর মশাররফ হোসেনের সাথে বিয়ের আগপাছতলা প্রস্তুতির কোথাও পাভেলের কোনো ছায়া পড়েনি। যেনো প্রতিষ্ঠিত পাত্র মীর মশাররফ হোসেনকে বিয়ে করে চলে যাওয়াতে পরোপকারী পাভেলের কিছুই যায় আসে না। ও যেনো তৈরিই ছিলো। কিংবা ও জানতো এমনটিই হবে। প্রেম-চিঠি-ছোঁয়াছুঁয়ি এসব নিছকই খেলা,খেলার মাঠেই রেখে আসতে হয়। মাঠ আর লাল দালান ডিঙিয়ে আমরা অন্তরে ততোটা পৌঁছাইনি,যতোটা পৌঁছালে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা যায়। গভীরে যাওয়ার রাস্তাটা আমরা তৈরিই করিনি। আমারও তেমনই মনে হচ্ছিলো। বিয়ে বাড়ির হৈ চৈ,পোলাও মাংসের তীব্র আমিষ গন্ধ, গয়নার ঝনঝনানি সব ছাপিয়ে বৈষয়িক দায়িত্বজ্ঞানহীন,এর দাফন, ওর ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ানো পাভেলের কোনো ইচ্ছাই ছিলো না আমার বিয়ের জমকালো আয়োজনে কোনো ছায়া ফেলে।
অভিজাত বাজারের শীতল বাতাসে আমি পাভেলের মুখের ভাঁজগুলি পড়ার চেষ্টা করি। তারুণ্যের ঝাঁকড়া চুল, ভরাট লাবণ্য আর পেটানো পেশিতে যে পাভেলকে আমার কাছে জ্যাকি স্রফ মনে হতো, আজ তার চিহ্নমাত্র ছায়া নেই কোথাও। আকর্ষণীয় চোখজোড়ায় নির্ঘুম রাতের কালি। মাথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েক গাছা চুল, ভেতরে ঢুকে যাওয়া চোয়াল, চোখের পাতায় ‘আর পারছি না’র ক্লান্তি। তারপরও ভাঙাচোরা, বিধ্বস্ত চেহারায় স্পষ্টই সনাক্ত করা যায়,হ্যা এটা পাভেল,পাভেলই। অস্বীকার করতে পারিনা এই পাভেলের ছায়া দেখলে একসময় আমার বুকে কাঁপন হতো,পরিবারের বাইরে যে একজন মাত্র মানুষ আমার পোশাকী নাম রেখে ডায়না নামে ডাকতো।
এই মূহুর্তে আমার মনে হলো সেই পাভেলকে আসলে আসলে পঁচিশ বছর আগেই রেখে এসেছি। এই পাভেলের মাঝে ডায়নার কিশোরী অতীত নেই। এ যেনো অন্য কেউ। এতো বছর পর দেখা হওয়ার কোনো বিস্ময় কিংবা আবেগ পাভেলের মাঝে কাজ করে বলে মনে হয়না। পাভেল খুব স্বাভাবিক স্বরে অস্বস্তিকর আবদার করে, চলো কোথাও চা খাই।পাভেলের এদিক ওদিক তাকানোতে টের পাই, রাস্তার পাশের কোনো চায়ের দোকান খুঁজছে সে।
পাভেল বোধহয় জানেনা, আমি মীর মশাররফ হোসেনের স্ত্রী। মীর মশাররফ হোসেন। পুলিশ কর্মকর্তা থেকে যে এখন বিজনেস ম্যাগনেট। ঢাকায় গোটা কয় আলিশান ফ্ল্যাট। হাল মডেলের কয়েকটি গাড়ি। গাজিপুরে ফাইভ স্টার রিসোর্ট। কানাডায় আমাদের মানে আমার আর মীর মশাররফ হোসেনের ছেলের অত্যাধুনিক ভিলা। মফস্বল থেকে ঢাকায় আসার মতোই আমাদের ছুটি ছাটায় ওখানে হলিডে কাটাতে যাওয়া ইত্যাদি পাভেল বোধকরি আন্দাজও করতে পারেনা। পাভেল জানেনা পাভেলের সাথে আমার দূরত্ব এখন আকাশ পাতাল, পাভেল জানেনা মীর মশাররফ হোসেনের স্ত্রীর এখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাওয়া খালি বেমানান নয়,অসম্ভব।
পাভেলের আবদার চা নয়, কফিতে মেটানো যায়। ড্রাইভারকে গ্লরিয়া জিন্সের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ইচ্ছে হয় পাভেলকে আমার বর্তমান অবস্থানের কথা জানাই।কিন্তু পাভেলের চেহারায় শশ্মান যাত্রীর মতো নির্লিপ্ততা। আমি কেমন আছি তা কতটা পাভেলের কল্পনা অতিক্রমকারী হলেও সেটা জানা বা শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই পাভেলের অবয়বে। শুনলেও তার মাঝে কোন ঈর্ষা কিংবা আফসোস জন্ম নেবে তেমন কোনো লক্ষনও নেই। বরং সে অনর্গল অর্থহীন এমন কিছু বকবক করে যায় মিনিট দশেক পর গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে দেখি ওর একটা কথাও আমি শুনিনি এবং শুনিনি যে এতে ওর বা আমার কারও কিচ্ছু ক্ষতিবৃদ্ধিও হয়নি।
গ্লোরিয়া জিন্সে দু কাপ ক্যাপাচিনোর অর্ডার দিয়ে আমার খুব সামান্য আগ্রহ হয়, পাভেলের খবরাখবর জানার। কী করছে, কেমন আছে? বিষয়টি তেমনও নয় যে ফাল্গুনের এক দুপুরে তরুণ পুলিশ অফিসার মীর মশাররফ হোসেনকে বিয়ে করে শহর ছেড়ে চলে আসি তারপর কোনদিন কোনো ফাঁক গলে পাভেলকে আমার মনে পড়েছে,পাভেলের খবরাখবর জানতে ইচ্ছে করেছে। তবু কথায় কথায় জানা হয়, পাভেল বলার মতো তেমন কিছুই করেনা। জানলাম পুরান ঢাকার পুরানো কোনো বাসায় থাকে। বায়িং হাউজে কম্পিউটার অপারেটর এর চাকরিটা কোভিডের সময় চলে গেলে নতুন করে আর কিছু শুরু করতে পারেনি। বউ ছেলেকে বাড়ি পাঠিয়ে নিজে ঢাকায় থেকে কাজ খুঁজছে। এখনো খুঁজছে।
আমি কেমন আছি জানার মতো বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা লুকানো প্রেমজাত কোনো আগ্রহ নয়, আমার চেহারায় উদ্বৃত্ত সম্পদের জেল্লাই দেখেই সম্ভবত সে আমার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে শুধু ধারণা নয়,নিশ্চিতই হয়ে যায়। তাই কথার ফাঁকে নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে তার কণ্ঠ কাঁপেনা একটুও,প্রাক্তন প্রেমিকাকে এই কথাটা বলা উচিত কিনা এ জাতীয় কোনো দ্বিধাও পীড়িত করেনা তাকে অথবা প্রেম, প্রাক্তন ইত্যাদি আবেগগুলো ছাপিয়ে ওর কাছে আমার আর্থিক অবস্থানটাই বড় হয়ে উঠে। বেঁচে থাকার লড়াইয়ের কাছে আবেগ বিষয়টি সম্ভবত খুবই তুচ্ছ। তোমার জামাইয়ের তো অনেক ক্ষমতা, আমাকে একটা চাকরি যোগাড় করে দাওনা।
সেই মূহুর্তে আমার মনে হয়, দীর্ঘদিন মনে না পড়া পাভেলের সাথে দেখা না হলেই ভালো ছিলো। কিংবা এতো বছর পর পাভেল ভালো আছে দেখতেই আমার ভালো লাগতো। পাভেলের এই পরাজিত, নতজানু, ব্যক্তিত্বহীন অবস্থা আমাকেও পরাজিত করে দেয়। প্রাক্তন প্রেমিকার কাছে যারা পঁচিশ বছর পর হঠাৎ দেখায় লজ্জার মাথা খেয়ে চাকরি প্রত্যাশা করতে পারে, তাদের করুণ জীবন যুদ্ধের সাথে আমার আদৌ পরিচয় নেই। আমি তো গত পঁচিশ বছর ধরে ক্রমশ সুখে থাকা থেকে আরও সুখে থাকায় উন্নীত হচ্ছিলাম। পঁচিশ বছর পর হঠাৎ পাভেল সব ভালো থাকায় কেমন মন কেমন করা ঢুকিয়ে দিয়ে আমাকে বিভ্রান্ত করে দিলো। সপ্তাহে সপ্তাহে তরল সহযোগে ব্যুফে পার্টি, মাসে মাসে সিলেট কক্সবাজারের ফাইভ স্টার যাপন, বছরে বার কয়েক ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা কিংবা মালদ্বীপ, মারিশাসে ঘোরা জীবনকে আসলে কী বলে! উন্নত নাকি অবনত। যখন মধ্য দুপুরে রাজধানীর শপিং কম্পলেক্সে দাঁড়িয়ে প্রেমিক চাকরি চায়!
এমন নয় যে পাভেলের জন্য আমার কিছু প্রেম না হোক, মায়া কিংবা পিছুটান ছিলো কিন্তু পাভেলকে ভালো থাকতে দেখলে আমার ভালো লাগতো,আমার ভালো থাকাটাকে হঠাৎ এমন অনায্য মনে হতোনা। দীর্ঘদিন পর আমার ভালো থাকায় ভালো না থাকার মৃদু ঝড়ো বাতাসের ধুলো উড়ে। সেই ধুলোতে আরও কিছু অনুকম্পার ঝরা পাতা যোগ করে, পাভেলের হঠাৎ টাকা চাওয়া। কোনো ভূমিকা ছাড়াই পাভেল আবার বলে,আমাকে একটা হাজার টাকা দেবে ডায়না,হাতটা একদম খালি। আমি এর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। মধ্য দুপুরে রাজধানীর শপিং কম্পলেক্সে দাঁড়িয়ে প্রেমিক মাত্র এক হাজার টাকা চায়! আহা মীর মশাররফ হোসেনের ক্লজেটে কত হাজার এক হাজার টাকা আছে আমি তো আমিই, স্বয়ং মীর মশাররফও কি সঠিক জানে!
কেউ হাজার টাকার জন্য হাত পাতে…আমার বুকটা কেমন চিনচিন করে উঠলো।বিস্ময় আর বেদনা লুকিয়ে এক মুঠোয় যা উঠে, হয়তো হাজার পাঁচেক টাকা হবে আমি পাভেলের হাতে দেই। পাভেলের বাবা সজীব আলী চাচার শহরে নাম হয়ে গিয়েছিলো ‘কমরেড’। হেঁটে হেঁটে একতা পত্রিকা বিলাতেন শহরে। ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালের উপর জং ধরা টিনের বেড়াওয়ালা দুটি ঘর নিয়ে থাকতেন সজীব আলী চাচারা। একটি ঘরের দেয়ালে ঠেস দেয়া ভাঙা রেক আর টেবিল ভরতি খালি বই আর বই। দেয়ালে পাশাপাশি দুটো ছবি ভাঙা জানালা আড়াল করে, মার্কস আর লেনিন। চাচাই চিনিয়ে দিয়েছিলেন দুজনকে। গেলেই কঠিন কঠিন শব্দ দেয়ালে হাতুড়ি দিয়ে পেরেক গাঁথার মতো মাথায় ঠেসে দিতেন চাচা। কীসব শব্দ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, অক্টোবর বিপ্লব। অধিকাংশই মাথার উপর দিয়ে গেলেও মুখ বুজে শুনতে হতো,নীহার রঞ্জনের বই নেয়ার আবশ্যিক শর্ত হিসাবে। টিমটিমে আলো জ্বলা ঘরে নিরস শব্দমালা আর গল্পের তোড়ে চাচার মুখ থেকে ছুটে আসা পানের পিকের ছিটা থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতো পাভেল,চল সন্ধ্যা হয়ে গেছে তোরে বাড়ি দিয়ে আসি। সজীব আলীর অনেক বইয়ের ভীড়ে আলমারি ভরতি বইয়ের একটা তাক ছিলো নীহাররঞ্জন আর আগাথা ক্রিস্টির । সজীব আলী চাচাকে শহরে ছেলেও ডাকতো কমরেড, বাবাও ডাকতো কমরেড। আজীবন কমিউনিস্ট ছিলেন তিনি। একদিন নীহাররঞ্জন, আগাথা ক্রিস্টি না দিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কির মা পড়তে দিয়েছিলেন আমাকে। সেখানেই আমি পাভেল নামটি খুঁজে পেয়েছিলাম।
হয়তো এই একবার না গোনা টাকা মুঠো করে পাভেলকে দেওয়াটাই কাল হলো আমার। মনে হলো পাভেল আমার অগণিত টাকার গন্ধ পেয়ে গেছে। তার দিন কয়েক পর থেকেই নানান অজুহাতে টাকা চাইতে থাকলো পাভেল।
মীর মশাররফ হোসেনের কাভার্ড ভরতি টাকা। খাটের জাজিমের নিচে স্তুপ স্তুপ টাকা। রান্নাঘরের কাভার্ড ভরতি টাকার বস্তা। ব্যাংকের খবর অবশ্য আমার জানা নেই। চাকরি শেষ হওয়ার পর পেনসন পাওয়া কোটি টাকা ব্যাংকে রাখা পর্যন্তই আমি জানি। মীর মশাররফ হোসেন আমাকে জানিয়েছে। তারপর থেকে টাকা কতো আসে,কনভেনশন আসে কিচ্ছু আর আমাকে জানায় না মীর মশাররফ হোসেন। একদিন মুখ খোলা বস্তায় কল্পনাতীত টাকার বাণ্ডিল দেখে চীৎকার করে ওঠলে ঠান্ডা মাথায় মীর মশাররফ হোসেন আমার মুখ চেপে ধরে শাসিয়েছিলো,চুপ…একদম চুপ। তারপর থেকে আমি একেবারে চুপ হয়ে সুখের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে রেখেছি কাগজের নৌকার মতো আর উপলব্ধি করেছি কৌতুহলের ঢেউ একটু ফুলে উঠলে আমাকে ডুবিয়ে দিতে দ্বিধা করবে না মীর মশাররফ হোসেন। আমার চেয়ে বস্তাগুলোর মূল্য অনেক বেশি তার কাছে।
আমি ইচ্ছে করলেই যে কোনো কোনা থেকে এক বস্তা টাকা নামিয়ে পাভেলকে দিয়ে দিলে মীর মশাররফ হোসেন হয়তো টেরও পেতোনা। কিন্তু আমার ভীষণ আক্ষেপ হয়। একদা খেলতে খেলতে তার কাছে শিহরণের পাঠ পেয়েছিলাম বলে সে আজ সেটার সুযোগ নিচ্ছে! নিজেকে অনুকম্পা করি এমন একটা ব্যক্তিত্বহীন ছেলেকে রাত জেগে দিস্তা দিস্তা চিঠি লিখতাম বলে। প্রাইভেট স্যারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতাম বেহায়ার মতো, তার সাইকেলের টুংটাং একবার শুনবার জন্য!
প্রথম বারের পর দ্বিতীয় বার। তৃতীয়, চতুর্থ গুনতে থাকা সময় যখন তোয়াক্কা ছেড়ে দিলো,যখন তখন পাভেল টাকা চেয়ে ফোন করতে লাগলো, পাভেলকে আমার অসহ্য লাগতে লাগলো। খুব বিরক্ত হয়ে তারপরও কয়েকবার ফোন ধরেছি। আশিককে দিয়ে টাকা বিকাশ করেছি। তারপর আবার ফোন ধরিও নি অনেক দিন।পাভেল ক্লান্তিহীন ফোন করে গেছে।
তারপর একদিন আবার হঠাৎ ফোন ধরলে খুব ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের অসুস্থতার কথা বললো পাভেল। চিকিৎসার জন্য আমি তার চাওয়া এমাউন্ট শোনে নাম্বারটা ব্লক করে দিলাম। কতো বড় প্রতারক পাভেল,দশ-বারো হাজার নয়। চিকিৎসার অজুহাতে ত্রিশ লাখ টাকা চায়।
পুলিশ এসে প্রথমে আমাকে অনুরোধ করে ঘরে ফিরে যাবার। আমি তাকিয়ে দেখি দোতালার ঢাউস গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে চিৎকার করছে মীর মশাররফ হোসেন। যার একটাও দুর্ভেদ্য নিরাপত্তার কাঁচ ডিঙিয়ে কারো কানেই পৌঁছাচ্ছে না। কয়েকজন টিভি রিপোর্টারও জোটে গেছে ইতোমধ্যে ৷ লাইভ করছে পাড়ার গুটিকয় ছেলেমেয়ে। আভিজাত্যের রীতি ভেঙে প্রতিটি জানালায় বস্তির পাড়ার মতো উৎসুক কৌতুহলী মুখ। টাকাগুলো পড়ে আছে মৃত মানুষের মতো অসহায়। মৃত মানুষের তবু সৎকার হয়, নেহায়েৎ পরিচয় না পাওয়া গেলে আন্দুমানে মফিদুল। বেওয়ারিশ টাকার কী হয়? বস্তার বাধন খুলে ছড়িয়ে পড়লে কেউ ছুঁতেও ভয় পায়। পুলিশের অনুরোধ আমার একগুঁয়েমির কাছে পরাস্ত হলে তারপর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির দিকে।
সকালে ফেইসবুক স্ক্রল করে দেখছিলাম পাভেল মারা গেছে। পাভেলের জন্য আমরা-চিকিৎসার জন্য আর্থিক অনুদান চেয়ে পেইজটা চলছিলো বছরখানেক ধরে। কারা চালাতো জানিনা। প্রতিমূহুর্তের আপডেটে চোখ রাখছিলাম আমি। খুব ধীর গতিতে হলেও টাকা সংগ্রহ হচ্ছিলো। হ্যা আমি পারতাম, তার চিকিৎসার পুরো খরচটাই দিতে পারতাম।মীর মশাররফ হোসেনকে বলেওছিলাম একবার,লোকটার চিকিৎসার জন্য চলোনা কিছু টাকা দেই। মীর মশাররফ হোসেন নেশাতুর ঘোলাটে চোখে আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়েছিলেন, যেনো আমি বলছি, চলো বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেই। তারপর মুখ ঘুরিয়ে গ্লাসে চুমুক দিয়ে উপহাস করেছিলেন, গোপন প্রেমিক নাকি! এই বলে থেমে গেলেও হতো। আমাকে ভেঙেচুরে আহত করার মতো হিসাব করে আরও কয়েকটি বাক্য যোগ করে তবে থেমেছে, আচ্ছা আমি সারাদিন বিজনেস নিয়ে ব্যস্ত থাকি আর আপনার তলে তলে এই করা হয়? আমিও ভাবি বেগম সাহেবা সারাদিন করেনটা কি! খুব রেগে গেলে মীর মশাররফ হোসেন আমাকে আপনি করে বলে। তার রাগের মাত্রা টের পেয়ে আমি চুপসে যাই। কেজানে আবার কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরিয়ে যায় কিনা!
ফাঁক খুঁজছিলাম এক সুযোগে বড় একটা বস্তা আমি দিয়ে আসবো ওকে,যেনো মীর মশাররফ হোসেন টের না পায়। পাভেলের কাছেই দিয়ে আসবো। কতো থাকে একটা বস্তায়? আমার ধারণা নাই। নিশ্চয়ই ত্রিশ লাখের উপরে। আমি অপেক্ষা করছিলাম একটা সুযোগের, উদ্দেশ্যহীন অপেক্ষা। আজ নয় কাল।কিন্তু খুব দ্রুত অবস্থার অবনতি ঘটেছে তার।কোনো চিকিৎসার সুযোগ না দিয়েই পাভেল হঠাৎ চলে গেছে আজ সকালে।
রচনাকালঃ(এপ্রিল'২৪)
***
লেখক পরিচিতি: রুমা মোদক (জন্মঃ ৭ মে ১৯৭০) একজন কথাসাহিত্যিক, থিয়েটার কর্মী এবং নাট্যকার। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১১ টি। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ থিয়েটার কর্মী ও নাট্যকার।


0 মন্তব্যসমূহ