১৯৭১: সাহসী মানুষদের অন্যরকম যুদ্ধ

 

সালেক খোকন



উনিশশো একাত্তরের মার্চ-ডিসেম্বরের স্বাধিকার ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের যুদ্ধটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন প্রশস্ত বুকে, ভয়শূন্য চিত্তে। এই যুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানাভাবে অংশ নিয়েছিলেন সাধারণ মানুষও। একাত্তরের এমন কিছু মানুষের সাহসী ঘটনার কথা তুলে ধরছি আজ।

।।এক।।

প্রথমেই জানাচ্ছি ফেরদৌসী হক লিনুর কথা। তাঁর বাবার নাম কাজী ইউসুফ আলী এবং মা জোহরা কাশেম। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার আজিমপুর সরকারি কলোনিতে হলেও পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের নয়নপুরে। বাবা চাকরি করতেন পাকিস্তান সরকারের এস্টাবলিশমেন্ট ডিপার্টমেন্টে। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি আজিমপুর স্কুলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন দশম শ্রেণির ছাত্রী।


মেয়েবিচ্ছু ফেরদৌসী হক লিনু, ছবি: সালেক খোকন

১৯৭০-এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে আওয়ামী লীগ। তবু বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা দিতে টালবাহানা করতে থাকে পাকিস্তান সরকার। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকেও স্থগিত করে ইয়াহিয়া খান। ফলে সারা দেশে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ওই সময় ছাত্রলীগ ও ডাকসুর সমন্বয়ে ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। প্রতিবাদে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান তাঁরা। এছাড়া এই সংগ্রাম পরিষদ থেকে প্রতিটি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কমিটি করে দেওয়া হয়। আজিমপুর এলাকায় এই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন শহীদুল ইসলাম সানু। মূলত স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থেকেই একাত্তরে নানা কাজ করেছেন ফেরদৌসী হক লিনু। সঙ্গে ছিলেন শিরীন আখতার, কে এ এম আজিজুল হক, শফিকুল ইসলাম, নিজামি, এফ এম জিয়াউল হক ফারুক, শামীম বানু, সালাউদ্দিন আহমেদ বাবলু, শফিউদ্দিন, আব্দুল হক, কাইয়ুম, এনায়েত কবির, বেবী, আব্দুল হাই প্রমুখ।

তাঁদের কাজ কী ছিল? লিনু বলেন : ‘একটা কিছু ঘটবে – এটা নিশ্চিত ছিলাম। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদে ডামি রাইফেল দিয়ে ট্রেনিং করানো শুরু হয়। ৭ মার্চের পর আমিসহ শিরীন আপা, শামসুন্নাহার ইকু আপা, ফোরকান আপা, সাকি আপা, রাবেয়া আপা, মমতাজ আপা ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে আসা ছাত্রীরাও ওই ট্রেনিংয়ে অংশ নেন। আমরা ট্রেনিং করি দুদু ভাই ও পেয়ারু ভাইয়ের কাছে। ২৫শে মার্চ পর্যন্ত চলে এই ট্রেনিং।’

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিল মাস থেকেই আজিমপুর কলোনির ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে যেতে থাকে। লিনুরাও যুদ্ধে যাওয়ার জন্য গোপনে নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কথা ছিল সহপাঠী রোজী ও তার ছোট বোন বেবীর সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার। তাঁদের নিয়ে যাবেন ছাত্রলীগের রফিক ভাই (‘লিটল কমরেড’ বলে পরিচিত)। কিন্তু সেটি আর সম্ভব হয় না। নেতাদের কাছ থেকে খবর আসে, দেশে থেকেই কাজ করতে হবে তাদের। শুনে কয়েকদিন খুব মন খারাপ থাকে লিনুদের।’

কী কাজ করবেন – এমন কোনো নির্দেশনা ছিল?

তার ভাষায়, ‘সেটা ছিল না। এর মধ্যে শিরিন আপাদের নিচতলায় আসে ফৌজিয়া খালাম্মারা। তিনি প্রবলভাবে ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে। আমাদের নানা কাজে যুক্ত থাকেন খালাম্মাও। পাশের বাসাতেই ছিলেন আফজাল সাহেব। আমার খালাতো ভাই আলী হায়দার তখন পুলিশে চাকরি করেন। আমাদের বাসায় থেকেই লেখাপড়া করে মানুষ হয়েছেন। উনিও তখন পাকিস্তানিদের পক্ষে কাজ করেন। পাকিস্তানপন্থী পরিবারগুলি ক্রমেই কলোনিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেসব বাসা থেকে ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে গেছে তাদের বাড়িতে দু-একজন দালাল গিয়ে হুমকি ও ভয় দেখানো শুরু করে। ঠিক তখনই আমরা কলোনির পাকিস্তানপ্রেমী ও দালালদের শায়েস্তা করার পরিকল্পনা আঁটি।’

কীভাবে?

‘নিজেরা মিলেই চিঠি লিখলাম। লাল চিঠি। লেখা থাকত – ‘তোমরা যে দালালি করছ, এ খবর চলে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। তোমাদের শায়েস্তা করা হবে।’ শিরীন আপা, আমি আর ফৌজিয়া খালাম্মা চিঠিগুলি লিখি। শিরিন আপার ছোট বোন বেবী ও ভাই নিলুর বয়স তখন বারো বা তেরো বছর হবে। ওদেরসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেটারবক্সে চিঠি ফেলে আসতাম। পরদিন সকালবেলায় নানা অজুহাতে ওইসব বাসায় ঘুরতে যাই। তখন দেখতাম চিঠি পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে তাদের রান্না হয়নি, নাওয়া-খাওয়াও বন্ধ। এটা আমাদের খুব আনন্দ দিত। মনে হতো শায়েস্তা করতে পেরেছি। বিচ্ছুদের মতো এভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা শুরু হয়।

এর মধ্যে সানু ভাই ট্র্রেনিং থেকে ফিরে আসেন। উনি সেক্টর টু-র অধীনে কাজ করতেন। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সজীব ভাইদেরও। সানু ভাই চিঠির কথা শুনে বললেন, ‘এভাবে তো হবে না, লিফলেট করতে হবে।’ লিফলেট কেন? বাড়ি বাড়ি মুক্তিযুদ্ধের খবর পৌঁছাতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধজয়ের খবর, পাকিস্তানিদের গণহত্যার খবর মানুষকে জানাতে হবে। আজিমপুর কলোনির বেশিরভাগই তখন সচিবালয়ে চাকরি করেন। তাই কলোনির বাড়ি বাড়ি লিফলেট পৌঁছাতে পারলে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগের খবরগুলি দ্রুত সচিবালয় হয়ে পাকিস্তান সরকারের কানে পৌঁছাবে। শুনে আমরা রাজি হয়ে যাই।

তিনি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের তৃতীয় শ্রেণির এক কর্মচারীকে দিয়ে গোপনে সাইক্লোস্টাইল করে লিফলেট বানিয়ে আনেন। কলোনির কাছের বিল্ডিংগুলিতে বেবী ও নিলু আর দূরের বাড়িগুলিতে আমি, লিটু (শিরীন আপার ভাই) আর শিরীন আপা সন্ধ্যায় হাঁটার নাম করে দরজার নিচ দিয়ে লিফলেট ফেলে আসতাম। এই কাজে ভয় ছিল; কিন্তু ভয়কে জয় করেই কাজ করেছি আমরা।

একবার পরিকল্পনা করি আজিমপুরের রাস্তায় পোস্টারিং করার। কারণ ওখানকার সড়কে পাকিস্তানি আর্মিদের চলাচল ছিল বেশি। ফৌজিয়া খালার পরামর্শে রংতুলি দিয়ে পাকিস্তানি সেনা আর মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি এঁকে পোস্টারে লেখা হয় – ‘পাক আর্মি সারেন্ডার করো।’ লিটু ও সানু ভাই মিলে পাইওনিয়ার প্রেস থেকে গোপনে পোস্টার ছাপিয়ে আনে।

ওই পোস্টার গোপনে দেয়ালে লাগাতে হবে। কীভাবে সেটা করব? সে চিন্তাতেই রাত পার। অতঃপর আমি আর শিরীন আপা ফজরের আজানের পরপরই আটা দিয়ে আঠা তৈরি করে পোস্টার নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কলোনির গেটের বাইরের রাস্তায় পোস্টার লাগিয়ে দৌড়ে গেটের ভেতর ঢুকে যেতাম। মসজিদে যাওয়ার মানুষ যেন না দেখে, এ-কারণে বিল্ডিংগুলির সিঁড়িঘরে লুকিয়ে যেতাম। সকালে দেয়ালে পোস্টার দেখে কলোনির সবাই অবাক হয়। তারা আলোচনা করতে থাকে, কলোনিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি রয়েছে।

পোস্টারিং হওয়ার কিছুদিন পরই আজিমপুর কলোনির রাস্তার পাশের বাড়িগুলিতে পাকিস্তানি আর্মিরা তল্লাশি চালায়। ওরাও বুঝে যায়, কলোনির ভেতর থেকেই কেউ এটা করছে। কিন্তু কেউ চিন্তাও করেনি, এগুলি কলোনির মেয়েদের কাজ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে কাজ করেছি আমরা। স্বাধীনতালাভের পর ওই পোস্টারের একটি কপি বাংলা একাডেমির আর্কাইভে জমা ছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের পর সেটি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

একাত্তরে ঈদ উদযাপন না করার নির্দেশ দিয়ে রোজার সময়ে আজিমপুরের মেয়েবিচ্ছুর দল কলোনির বাড়ি বাড়ি চিঠি বিলি করেছিলেন। কীভাবে তা করেছিলেন তাঁরা? সেই পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত শুনি মেয়েবিচ্ছু ফেরদৌসী হক লিনুর মুখে।

‘বান্ধবী মলি থাকত ধানমণ্ডি ৫ নম্বরে। তার বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা খুব ভালো ছিল। ওকে ডেকে এনে শিরিন আপার বাসায় বসিয়ে চিঠি লেখাই। চিঠির মূল বিষয় ছিল এমন – ‘দেশের মানুষকে পাকিস্তানিরা হত্যা করছে। তাই জাঁকজমক করে ঈদ উদযাপন করা যাবে না, নতুন জামাকাপড় পরা থেকে বিরত থাকতে হবে, পরলে তার কাপড় নষ্ট করে দেওয়া হবে। পশ্চিম পাকিস্তানি পোশাক বর্জন করতে হবে, মুক্তিবাহিনীকে সব রকম সহযোগিতা করতে হবে। তা না হলে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ শেষে লেখা হলো – জয় বাংলা, জয় শেখ মুজিব। বিনীত – স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংগ্রামী বোনেরা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আজিমপুর কলোনিতে ঈদ উদযাপন না করার অনুরোধ জানিয়ে মেয়ে বিচ্ছুদের বিতরণকৃত চিঠির একাংশ, ছবি: ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত

কিন্তু ওই চিঠিতে ছবি আঁকতে হবে। সেটা কীভাবে করি?

সানু ভাইকে বলতেই তিনি চারুকলার অধ্যাপক শামসুল ইসলামকে দিয়ে ডাস্টবিনে খাবার খাচ্ছে মানুষ, দেশের অবস্থা মুমূর্ষু এবং অস্ত্রহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকিয়ে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ওই চিঠি তৈরি করে দেন। একাত্তরের পুরো রোজার মাস আজিমপুর কলোনির বাড়িগুলিতে গোপনে আমরা ওই চিঠি বিলি করেছি। সানু ভাইদের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও এই চিঠি বিলি করা হয়েছিল।
আজিমপুর কলোনিতে ঈদ উদযাপন না করার অনুরোধ জানিয়ে মেয়ে বিচ্ছুদের দেওয়া চিঠির আরেক অংশ, ছবি: ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত


চিঠিতে কি কাজ হয়েছিল?

‘অবশ্যই। শুধু চিঠি বিলি করেই আমরা থেমে থাকিনি। কেউ যদি ঈদে নতুন কাপড় পরে তাহলে তার কাপড় নষ্ট করতে হবে। সানু ভাই অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ের ল্যাব থেকে সালফিউরিক অ্যাসিড চুরি করে এনে দেন। সিরিঞ্জ কেনা হয় ফার্মেসি থেকে। সিরিঞ্জে অ্যাসিড নিয়ে কাপড় নষ্ট করার অস্ত্র তৈরি করেছিলাম আমরা। সাতাশে রমজানের সময় নতুন কাপড় পরে ঈদে আনন্দ প্রকাশের কথা বলেছিল কলোনির কয়েকজন। অ্যাসিড দিয়ে গোপনে ওদের কাপড়গুলি ছিদ্র করে দিই। এ-খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কলোনিতে। ফলে ভয়ে ঈদের দিনও নতুন কাপড় পরে কেউ আর বের হয়নি।’

ফেরদৌসী হক লিনুর মতো মেয়েবিচ্ছুরা একাত্তরে যা করেছেন তা ছিল অন্যরকম এক মুক্তিযুদ্ধ। ঢাকার ভেতর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানকে জানান দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মানুষকে সাহসী করে তোলার কাজটি তাঁরা করেছিলেন গেরিলাদলের মতোই। তাঁদের কাজে জীবনের ঝুঁকি ছিল অনেক বেশি। তবু বুকের ভেতর স্বাধীনতার স্বপ্নকে লালন করে একাত্তরে এমন যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন আজিমপুরের মেয়েবিচ্ছুরা। তাই একাত্তরে তাঁদের অবদান অস্ত্রধারী মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

।।দুই।।

মুক্তিযুদ্ধ চলছে তখন। নিরীহ নিরাপরাধ বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যা করছে পাকিস্তানি সেনারা। ফলে দলে দলে মানুষ আশ্রয় নেয় সীমান্তের ওপারে, ভারতে। খোলা হয় শরণার্থী শিবির। প্রায় এক কোটি বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ে ইন্ধিরা গান্ধী সরকারের ওপর। ভারতের কিছু রাজ্যের মানুষ এতে নাখোশ হয়। শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিতে আর মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য নাকরতে নানাভাবে তারা সরকারকে চাপ দিতে থাকে।

ঠিক ওই সময়েই পরিকল্পনা হয় বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ আয়োজনের। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বাংলাদেশের ৩৮জন শিক্ষিত যুবক। পদযাত্রীরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জনসভা করতেন। গণহত্যা সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আহ্বান জানাতেন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর। তাদের সকলের হাতে হাতে শোভা পেত- ‘আমাদের এক কথা-বাংলাদেশের স্বাধীনতা’, ‘মুজিবের মুক্তি চাই’, সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ও জাতীয় পতাকা।
শান্তিনিকেতনের পথে বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রার দল ( কামরুল আমান-সামনে বাঁ থেকে তৃতীয়), ছবি: ব্যক্তিগত অ্যালবাম থেকে সংগৃহীত


১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রাটি চলে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত । দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হতে থাকে ওই পদযাত্রার খবর। এভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়তে ‘বিশ^ বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

ইতিহাসের ওই বীরেরা আজ প্রায় বিস্মৃত। ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’য় অংশ নেয়া যুবকদের দলটির একজন ডিপুটি লিডারের জীবন কাটছে নিভৃতে। এমন খবরটি পাই এক বন্ধুর কাছ থেকে। অতঃপর এক বিকেলে পা রাখি কালের সাক্ষী কামরুল আমানের পল্লবীর বাড়িতে।

বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে পদযাত্রাটি এগিয়ে নেওয়ার সার্বিক পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল ‘অখিল ভারত শান্তি সেনা মণ্ডল’ নামের একটি সংগঠন। এদের সহযোগিতা করে ‘গান্ধী পিচ ফাউন্ডেশন’। পদযাত্রার মূল উদ্যোক্তা ভারতের অহিংস সর্বদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ এবং আহ্বায়ক ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দীনেশ চন্দ্র মুখার্জি।

কামরুল আমান জানালেন, পদযাত্রী ৩৪ জনকে বাছাইয়ের পর বনগ্রাম থেকে ১৪ অক্টোবর দলটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে পৌঁছে। সেখানে ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তরের মাটি ছুঁয়ে স্বাধীনতার জন্য তারা শপথ নেন। বাকি চারজন পরে এসে যোগ দেন মুর্শিদাবাদে। দলের লিডার ছিলেন আবদুল খালেক। কামরুল ছাড়াও আরেকজন ডেপুটি লিডার ছিলেন একরামুল ইসলাম।

স্মৃতি হাতরে কামরুল আমান বললেন যেভাবে, ‘১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে র্যা লিসহ একটি জনসভায় আমাদের অভিনন্দন জানানো হয়। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সভাপতিত্বে ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গান্ধীপন্থি লেখক মৌলভি রেজাইল। পরদিনই বাংলাদেশের পতাকা, ফেস্টুন ও ব্যানারসহ আমরা বহরমপুর থেকে গোকর্ণর দিকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করি।

পদযাত্রার আগাম কর্মসূচি ইংরেজি ও হিন্দিতে গণমাধ্যমগুলোতে জানিয়ে দিতেন উদ্যোক্তারা। প্রায় দেড় মাস দলটিকে প্রতিদিন গড়ে ১৫-১৬ মাইল পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হতো। বিকেলের দিকে আয়োজন করা হতো জনসভার। উঠোন বৈঠকও হয়েছে অগণিত। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে চলত মতবিনিময়। এভাবে আমরা মুর্শিদাবাদ, সেইনথিয়া, সুরি, শান্তিনিকেতন, ককশা, দুর্গাপুর, রানীগঞ্জ, আসানসোল, নিয়ামতপুর, কুলটি, চিত্তরঞ্জন ও বিহার, পাটনা, লখনৌ, আগ্রা প্রভৃতি জায়গায় পদযাত্রা করি।’

পাটনাতে বিশাল একটি মাঠে মিটিং হয়। বক্তৃতায় লিডার খালেক রাজশাহীর আর কামরুল আমান তুলে ধরেন ঢাকার গণহত্যার বর্বরতার কথা। বর্ণনাগুলো যখন হিন্দিতে অনুবাদ করে বলা হচ্ছিল তখনই ওখানকার মানুষ হু হু করে কাঁদতে থাকে। লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের বক্তব্য শুনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কণ্ঠ মিলায় ছাত্র-ছাত্রীরাও। এসব স্মৃতি কামরুল আমানের হৃদয়ে এখনও জীবন্ত হয়ে আছে।
পদযাত্রী দলের ডিপুটি লিডার (০২) কামরুল আমান এখন, ছবি: সালেক খোকন

৩০ জানুয়ারি ছিল গান্ধী প্রয়াণ দিবস। ওইদিন দিল্লির রাজঘাট গান্ধী সমাধিতে পদযাত্রাটি শেষ হবেÑএমনটিই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু তার আগেই স্বাধীনতা লাভ করায় ১৭ ডিসেম্বর ভারতের উত্তরপ্রদেশে এসে পদযাত্রাটি শেষ হয়।

১৮ ডিসেম্বর লখনৌতে বিশাল আয়োজনে উদযাপিত হয় বিজয় দিবস। ভারতীয় বিমান, সেনা ও নৌবাহিনী, ক্যাডেট, স্কাউট, গার্লস গাইড ও জনসাধারণের সঙ্গে বাংলাদেশের ডেলিগেট হিসেবে জাতীয় পতাকাসহ অংশ নেয় কামরুল আমানসহ পদযাত্রার দলটি। ১৯ ডিসেম্বর স্বাধীন দেশে ফিরে আসেন তারা।

স্বাধীনতার জন্য পদযাত্রা দলটি ভারতে হেঁটেছিল ১৪০০ মাইল। মুক্তিযুদ্ধটা কেন ন্যায় যুদ্ধ- সেটি ভারতীয়সহ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাই ছিল তাঁদের মুক্তিযুদ্ধ।

কামরুল আমান দুঃখ নিয়ে বলেন, ‘আজ যদি দেশ স্বাধীন না হতো তাহলে পত্রযাত্রী ৩৮জনকে গুলি করে মারা হতো। আমাদের কোনো আফসোস নেই, কিন্তু কষ্ট আছে। যেসকল ভারতীয় নেতারা ‘বিশ্ব বিবেক জাগরণ পদযাত্রা’র আয়োজনে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছিলেন বিগত সরকার তাদের এনে সম্মাননা দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য যারা প্রত্যক্ষভাবে পদযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন রাষ্ট্র তাদের ইতিহাসটুকুও সংরক্ষণ করেনি।’

স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরও কন্ঠযোদ্ধা বা ফুটবল যোদ্ধাদের ন্যায় ৩৮জন পদযাত্রীদের কাউকেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বা কোনো সম্মান প্রদান করা হয়নি। যা প্রত্যাশিত ছিল। বুকে জমে রাখা এমন কষ্ট নিয়েই চলে গেছেন অনেকেই। ফলে গৌরবের এ ইতিহাস আজ প্রায় বিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে।

শুধু অস্ত্র হাতেই নয়, একাত্তরে নানাজন নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, ত্বরান্বিত করেছিল স্বাধীনতা অর্জনকে। এ-কারণেই মেয়েবিচ্ছু ফেরদৌসী হক লিনু ও পদযাত্রী দলের কামরুল আমানরা অন্যরকম মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন দেশে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, একাত্তরকে কর্তব্যকর্ম ভেবেই তৃপ্ত হন তাঁরা। তাই তাঁদের গৌরবের ইতিহাস প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাঁদের অর্জনের ইতিহাসটুকু পাঠ করে এ-প্রজন্ম মাতৃভূমিকে ভালোবাসার তীব্র আনন্দটুকু অনুভব করতে শিখবে। তাঁদের কথা ভেবে একদিন তারা বলবে, তোমরা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলে সেই বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলবই। শুধু এতটুকুই চাওয়া।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ