কায়েস আহমেদের গল্প: শেষ বাজি




না, আমি মরুম না ৷ 


শুয়েছিল সে। উঁচু পাড়ের চারপাশে বুনো আগাছা, আম, খেজুর নারকোল, নোন৷ আর পাড় ঝাঁপিয়ে নেমে আসা ডালপালা নিয়ে একটা ডুমুর গাছ ৷ 


সেই আগাছার ঝোপের আড়ালে, ডুমুর গাছের গোড়ায় কাত হয়ে হেলান দিয়ে সে শুয়েছিল। ডান পায়ের গোড়ালির ওপর দুঃসহনীয় যন্ত্রণা এখন দপ দপ করছে । পায়ের নীচে, ভিজে মাটিতে ক্ষরিত রক্ত যেন উপুড় করে দেওয়া দোয়াতের কালি । 


মাথা ঝিম ঝিম করে । সমস্ত শরীরে ছনিয়াজোড়া ক্লান্তি। আর তখন হাওয়ার শব্দ ওঠে। যেন একটা বিরাট বালিহাঁসের ঝাঁক পাড়ের ওপশের অবারিত মাঠ মাঠের শেষে দাঁড়িরে থাকা দিগন্ত- রেখার নিথর কালো নিসর্গের ওপার থেকে ডানায় শব্দ তুলে উঠে আসছে। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে যাওয়া মাটি, গাছপালা, ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ, পুকুরের পানি, পায়ের নীচে জমে থাকা রক্ত, তার নিঃশ্বাস আর শরীরের ঘামে একাকার হয়ে যাওয়া একটা মিশ্রিত গন্ধ ৷ 


না, আমি মরুম না । 


কাকের চোখের মতো পুকুরের পানি শিরশিরিয়ে ওঠে। 

ক্ষিদেটা এখন তার শরীরের কোথাও একটা ক্লান্ত জানোয়ারের মতো পড়ে আছে । অর ডান পায়ের গোড়ালির ওপর থেকে ভোর বেলাকার সেই ক্রুদ্ধ যন্ত্রণাটা ছড়িয়ে রয়েছে সারা শরীরে । 


সেই সাথে একটা বিপুল অবসাদ তাকে যেন হাজার হাজার ফিট নীচু খাদে একবার ঘাড় গুঁজে চেপে ধরছে, আবার ওপরে তুলে আনছে। যন্ত্রণ।, পেটের ভেতর মরে যাওয়া ভারী হয়ে থাকা ক্ষিদে ক্লান্তি, অবসাদ এই সবকিছুর মিলিত অনুভূতির ভেতর ডুবে যেতে যেতে সেই তীব্র, দুর্বিনীত ইচ্ছাটা তাকে জাগিয়ে দিচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে । ন', আমি মরুম না। 


একপাশে কাত হয়ে অনেকক্ষণ পড়ে আছে। নড়েচড়ে একটু পাশ ফিরে ডান পা'টা সরাতে চাইল, পারল না । 

সমস্ত পাট। ভারী হয়ে আছে। একটু নড়তে গেলেই যন্ত্রণায় মাথার রগ ছিঁড়ে আসতে ঢায়। ঠোঁট কামড়ে, মাটির ওপর দু'পাশে হাতের ভর দিয়ে ডুমুর গাছ থেকে পিঠ আলগা করে কোনমতে সামনের দিকে সরে এল । এখন সে সম্পূর্ণ একটা মানুষ, চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখছে । বাঁ পায়ের ওপর তা।হত ডান পা’টা তুলে দিয়েছে সন্তর্পণে। মাথা, পিঠ, কোমর, উরুতে ভিজে মাটির স্পর্শ। কিন্তু এভাবে থাকলে আহত পায়ে টান ধরে, যন্ত্রণ। তীব্রতর হয়। 


সুতরাং খুব ধীরে সাবধানে প শ ফিরে বাঁ পায়ের হাঁটু এবং গোড়ালির ওপর ডান পা স্থাপন করে। এই সংক্ষিপ্ত পরিশ্রমে তার ভ্রূর ওপর ও নাকের ডগায় বিনবিনে ঘাম জাগে ৷ 

বাঁ হাত ত্রিভুজের মতো করে করতলে মাথা রেখে ঘন আগাছার ফাঁক দিয়ে সে চেয়ে থাকে মাঠের দিকে । 

ফসলহীন রিক্ত মাঠে এখন কেবল এপ্রিলের হাওয়া, ভোর রাতে এখানে মানুষের, ক্রমাগত মানুষের ব্যাকুল পদচারণা ছিল। কুত্তার বাচ্চারা। দাঁতে দাঁতে ঘষে। ডান পায়ের ক্ষত বারুদের মতো দপ দপ করে । 

মনে মনে হিসেব করল, দশটা। 

আর দুইটা অইলে তিন হালি মানে এক ডজন । চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে। 

পুরা অইবে! ৷ মানে এক ডজন । 


পাশে পড়া স্টেনগানে হাত রাখল আর তখন দৃশ্যগুলি একের পর এক আসতে থাকে । লোকে আমারে গুণ্ডা কয়। ডরায়। হ, অ'মি গুণ্ডা, ওয়াগণ লুট করি । মানুষ খুন করি মদ খাই, জুয়া খেলি, খানকি পাড়ায় যাই । খুনের মামলার ফেরারী আসামী আমি। লোকে আমারে ডরায়। গেন্দু তরে আমি মার্ডার কইরা ফেরার। পুলিশ আমারে খুঁইজা পায় নাই। হেইবার আশরোবরে খুন কইরা কেসে ফাইসা গেলাম আর তুই আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিছিলি । তর বড় হাউস অইছিলে৷ আমারে ফাসিতে ঝুলানের। মামলা টিকলো না। আমরা দু'জন আসামী বেকসুর খালাস পাইলাম । কিন্তু মইদ্দে থেইকা তুই বেহুদা জানটা খোয়াইলি । 


হ, আমি গুণ্ডা, ওয়াগন লুট করি, খুন করি, মদ খাই, জুয়া খেলি, খানকি পাড়ায় যাই। মানুষ ডরায় আমারে। সামনে আমার ' হাইসা খাতির কইরা কথা কয়। পিছে কয় হারামীর বাচ্চা ৷ সুযোগ পাইলে চাকু হান্দায়া দিবার পারে। কিন্তু আমি মরি নাই ৷ আবার হিসেবটা মেলায়, পাঁচ দিনে দশটা, মানে একদিনে দুইট। কইরা ৷ 


কেমন একটু হাসি পেল তার । কিন্তু হাসল না। চোয়াল দুটো শক্ত হ'ল। চোখের ভেতর ক্রোধের পেছনে বেদনার ছায়া কাঁপে ৷ নিথর কালে। পুকুর পাড়ে আগাছা আর গাছপালার আড়ালে প্রায় শুকনো, ভিজে শক্ত মাটিতে গুলী খাওয়া আহত পা'র বিরতিহীন যন্ত্রণা, সারাদিনের ক্ষুধা ক্লান্তি, আর অবসাদ নিয়ে এপ্রিল মাসের এই নির্জন নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় চোখের সামনে সে এখন তার আবাল্য পরিচিত শহরের ভিন্নতর ছবি দেখছে। বিধ্বস্ত, দগ্ধ, রক্তাক্ত। 

 

দেখতে দেখতে ক্ষুধার্ত, অবসাদগ্রস্ত, যন্ত্রণার্ত শরীর থেকে শক্ত, পেটানো লোহার মতো হাত দুটো যেন এইমাত্র বেরিয়ে এসে স্টেনগান চেপে ধরল, তর মেলেটারির মায়রে বাপ ! 


তার আহত পা’র যন্ত্রণা, মাথার ভেতর বোঁ বোঁ করা শূন্যতা, শরীরময় আচ্ছন্ন ব্যথা ভুলে সে তখন উঠে বসে পড়েছে । দু’চোখের জ্বলন্ত অঙ্গারে যেন ঝুলন্ত অন্ধকারের পর্দাটা পুড়িয়ে দেবে। অথবা সামনে যেন সেই হন্যে হয়ে ফেরা নেকড়েগুলোর একজন কিংবা কয়েকজনকে স্টেনগানের গুলীতে লুটিয়ে দেবে এখনই । 

পাঁচ দু’গুণে দশ ৷ আর দুইটা অইলে তিন হালি। আমরা তিনজন আছিলাম, অহন আমি একা ৷ কিন্তু মরি নাই । 

কেমন যেন দম আঁটকানো চাপা স্বরে দাঁতে দাঁতে ঘষে, থেমে থেমে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল, তর মেলেটারির মায়রে বাপ ! আমারে ঘেরাও দিয়া ধরব । ছোঃ । 


বাড়ির পেছনে ম্যাথর প্যাসেজ দিয়ে, নদী পার হয়ে পঞ্চম দিনের রাত্রে সে সোজা এপারে চলে এসেছিল। তারপর আজ ভোর রাতে হঠাৎ এপারেও হামলা । আবার সেই কান্না, আৰ্তনাদ চিৎকার, ধারাবাহিক গুলীর শব্দ, আগুন । 


কিন্তু আমি মরি নাই । 


একখান পা জখম অইছে। তাইতে কি, হাত দুইটা অহনও তৈয়ার! আর....পরম মমতায় সে স্টেনগানট৷ স্পর্শ করে। তারপর চিৎ হয়ে শুয়ে বুকভরে নিঃশ্বাস নিল। এপ্রিলের শুকনো, পানি পাওয়৷ মাটি থেকে একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ উঠছে। সেই গন্ধ তার চৈতন্যের সর্ব অবয়বকে আচ্ছন্ন করে দিতে থাকে ৷ সেই সাথে মাথায় ওপর নিঃসীম আকাশ, চারপাশের গাছপালা, হাওয়ায় কাঁপা পুকুরের তিরতিরে স্রোতে স্বপ্নালোকিত জ্যোৎস্না, গাছপালার ফাঁকে হঠাৎ উধাও মাঠ, সেই মাঠের প্রান্তসীমায় নিষর 

 

নিবিড় প্রকৃতি, এই সবকিছুর ভেতর সে যেন জন্ম জন্ম ধরে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে । 

ছোটবেলার কথা, মা'র কথা মনে পড়ে। বুকের ভেতর কি যেন 

আঁকুপাকু করে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চায় ৷ 

আর তখন হঠাৎ শব্দটা জেগে ওঠে। 

ক’জোড়া বুট পরা পা এগিয়ে আসছে । 

উৎকর্ণ হয়ে শোনে । হ্যাঁ, 

সে উঠে পড়েছে তখন । 

উপুড় হয়ে বুকে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে আমগ ছটাকে সামনে রেখে স্টেনগানের নলটা একপাশ দিয়ে বাড়িয়ে দেয় । 

তারপর সেই আগাছার ঝোপের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে স্তব্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। মিলিত পায়ের শব্দটা ক্রমেই এগিয়ে আসতে থাকে যেন কত নদী-সাগর, কত পাহাড়- পর্বত ডিঙিয়ে, বনজঙ্গল ভেঙে লোভ, ঘৃণা আর পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা নিয়ে এগিয়ে আসছে আর সে এই পুকুর পাড়ের সোদা সোঁদা গন্ধভরা মাটিতে বুক রেখে, চার পাশের এই চিরপরিচিত পারিপার্শ্বিকের ভেতর যুগ যুগ ধরে দু'চোখে দুর্জয় ইচ্ছা জ্বেলে জেগে আছে। 

না, আমি মরুম না । 






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ