অধ্যায় ১

নেক অনেক বছর পর, এই পথ দিয়েই সফর আলী আরেকটা সফর করবে, যেখান থেকে এখন সে চলেছে--এই যে একটা ভারী নৌকা, নৌকায় ভরে আছে তার পরিবার--তাদের জ্বলজ্বলে চোখ--কৌতুহল আর উৎকণ্ঠা; সেদিনও, এমনই এক নৌকায়, পরিবার নিয়েই সে ফেলে আসা জগতটার দিকে ধেয়ে যাবে, শুধু ততদিনে মুখগুলো পালটে যাবে সংসারের, সম্পর্কগুলো হয়ে থাকবে আরও বেশি স্পষ্ট, বয়স্ক কাঁধে দায়িত্ব চেপে থাকবে পাহাড়ের মতো; তখন আজকের স্মৃতি কিছুটা হলেও মনে আসবে তার। তবে সেটিও আসবে অনেকটা বিদ্যুৎ চমকের মতোই। এবং এসেই মিলিয়ে যাবে তৎক্ষণাৎ। যেন কখনও ছিল না। যদিও আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতোই তার আবারও মনে পড়বে একটা নৌকায়, পুনর্ভবা নামের নদীর তীর ঘেঁষে ঘেঁষে, ১৯৪৮'এর হিম নভেম্বরের রাতে উজানের দিকে ধেয়েছিল তারা--চলে এসেছিল এপারে। পেছনে, কালো আর গাঢ় অন্ধকারের ভেতর পড়ে ছিল জগন্নাথপুর। পড়ে ছিল ১২ বছরের বেড়ে ওঠা। লাল শান বাঁধানো উঠান, উঠান উজিয়ে বড় দোতলা বাড়ি। মাটির মোটা কিন্তু বুরুশ করা দেয়াল, ওপরে টিন; টিনের কোল ঘেষে কবুতরের ঘর; উঁচু কোঠার খোপের ভেতর বাস্তুসাপের কুণ্ডলি। নিচে চারকোনা ঘরের সারি। এক ঘরের ভেতর দিয়ে অন্য ঘরে যাওয়ার প্রশস্ত পরিসর। বড় বড় জানালাগুলোকে আটকে রাখা লম্বা লম্বা লোহার শিক। ময়ূরপালঙ্ক থেকে সিঁড়িভাঙা খাট, দেয়ালে কাবা শরিফের ছবি থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে এমন কি ক্ষুদিরামেরও বিন্যাস। ওদিকে বারান্দায় মেলে রাখা সফর আর তার ছোট ভাইয়ের খয়েরি হাফপ্যান্ট। একরঙা ফুটবল আর ঠেস দিয়ে রাখা ছিপের মিছিল। উঠানে ঝুলন্ত জালের নড়ে ওঠা কাঠকড়ি। গাঁদাফুলের থোক সমাহার। হলুদ গাছের স্নিগ্ধ কাঁপন। লাঠি দিয়ে ঠেলে বেড়ানো লোহার রিঙ--এমনকি আমপাড়া তরুণ ঠুসিও।

এক পাশে ইঁদারা।
গ্রামের সবচেয়ে বড় আর গভীর। চারপাশে চারটা তেলটে কাঠের ওপর বালতি নামানোর আটটি চাকা। শ্যামল শ্যাওলা জমা পাড়। পা পিছলে যেতে না যেতেই কাচামিষ্টি আমগাছ। তাতে পাটের ছালা বিছানো দোলনা। ছোট ভাই শেফু তাতে দোলে সকাল-সন্ধ্যা। কিশোর স্মৃতিতেই তার বিপুল হাতছানি। তবে আজকের এই স্মৃতিটুকুও সেদিন বিস্মৃত হবে শুধু বয়সের ভারে নয়, শুধুই নিউরনের অনুৎপাদনে নয়, বরং তারও চেয়ে বেশি অনিশ্চিত অনাগ্রহ ও নিবিড় উৎকণ্ঠায়।

পুনর্ভবা বড় নদী নয়। শীতের ভেতর এমনিতেও মরার শরীর তার। কুয়াশা আছে। তাতে বেশি দূর নজর যায় না জন্য মাঝে মাঝে নদীটাকে বিস্তৃত বলে বিভ্রম হয়। কিন্তু ওই অতটুকুই। সফর বুঝল এ নদী চাইলে সে একটানে পার হতে পারে। এমন কি এক ডুবে এপার-ওপার যাওয়ার বাজিও লাগা যায় যে কোনো সময়--শীতে তো বটেই, ভরা বর্ষাতেও। সফর একরত্তি ছেলে--কিন্তু বাজি লাগায় তার জুড়ি ছিল না জগন্নাথপুরে। এ নিয়ে কতবার তার বাবার কাছে হয়েছে একশ নালিশ।

বাবা এক মাথাপাগল লোক। কেউ এসে সফরের দুর্নাম করলেই বলতো--বাজিতে হেরেছিস বলেই তো এসেছিস। নাহলে কি টিকিটাও দেখাতি!

বাবার মুখটা খুব স্পষ্ট সফরের মনে। মাত্র একটা বছর আগে মরলেন যে! মা যেমন কবে যে মরেছে কীভাবে মরেছে চাইলেও কিছুতে মাথায় আনতে পারে না সফর, বাবারটা তেমন নয়। ছোটখাটো শ্যামলা মানুষ বাবা। মুখে সবসময়ের হাসি। বাবাসুলভ যে গাম্ভীর্য থাকতে হয় মানুষের, বাবার তা ছিল না। সফর ওই বয়সেই বুঝত বাবা যত না বাবা, তারচেয়ে বন্ধু বেশি। এ নিয়ে বাড়িতে কি হাটে বাবাকে একটু আলগা কথাও শুনতে হতো। দস্তুরই ছিল তাই।

'মঞ্জু, তুই কি ছেলে দুটাকে উচ্ছনে দিবি বলে পণ করেছিস? এতটুকু শাসন নাই, এতটুকু তরাস নাই, এ কেমনতর বাপগিরি তোর?'

মঞ্জুর আলী হাসত বড়জোর। খুব কেউ চেপে ধরলে বলত, তোমরা তো আছো। তোমরা শাসন করো। মা মরা এতটুক দুইটা মানুষ। তাদের শাসন করি কী করে?

'আগেই মানুষ বলছিস? এই মানুষের বাচ্চাই শুধু একা একা মানুষ হতে পারে না। তাদের মানুষ করে গড়ে তুলতে হয়। তার জন্য বাবার সোহাগ না, দরকার শাসন। তুই না করলে আমরা হাজার দোহাই দিলেও লাভ নেই। ছেলেরা মানুষ হবে না, কিছুতেই হবে না!'

'না হলে না হোক। এত ভেবে কী হবে?'

সবাই এবার চুপ। যে লোক এত উদাসীন, তাকে আর নতুন করে বলে কিছু লাভ নেই। কেউ কেউ বলত বউ অকালে মরার পরই এমনদশা হলো মঞ্জুরের। সংসারে আর মন থাকল না। পুকুরপাড়ে বুক বাজিয়ে গান গাওয়া, কি কবিগানে গিয়ে গিয়ে কথার লড়াই করা, থাকল এসব বাউণ্ডুলেপনা নিয়ে। ছেলেদের নাকি বন্ধু হবে সে! বললেই হলো? ছেলের ইয়ারবন্ধু হওয়া যায় নাকি কখনও! তাছাড়া বাপে যদি বন্ধু হয় তাহলে বন্ধুর আর কী দরকার বাপু? বাপকে বন্ধু নয়--অভিভাবক হতে হয়।

তা সফরদের বাড়ির অভিভাবক বাবা ছিলেন না, ছিলেন কাকা ওসমান আলী। ওসমান আলী বাবার চেয়ে পাক্কা পাঁচ বছরের ছোট, কিন্তু দেখলে মনে হয় দশ বছরের বড়। কয়লার ইস্ত্রী চাপা পাঞ্জাবি-পাজামা আর উঁচু মোজার সাথে কালো পাম শু পরে কাকা যখন বের হয় বাড়ি থেকে তখন তাকে জমিদারের চেয়ে কম কিছু যে লাগত, তা না। দুজন চাকর তার সামনে-পিছে সব সময় সসব্যস্ত। একজনের হাতে ছাতি, অন্যজনের হাতে পালবাড়ির ইয়াব্বড় গামছা। এলাকা গরম নিশ্চয়, কিন্তু কাকার গরম তারও চেয়ে বেশি। একটু ঘামলেই, সেই ঘাম, চাকর গিয়ে মুছিয়ে দেয় তোড়েজোড়ে।

ওসমান আলীর এই বাবুগিরি কলকাতা থেকে পাওয়া হলেও গাম্ভীর্যটা পৈত্রিক। তার বাবা করিম আলী পণ্ডিত ছিলেন নাকি এমন ধারার। লোকমুখে সফর এসব শুনেছে। কোথা থেকে কেউ জানে না, করিম আলী পণ্ডিত এসে এই জগ্ননাথপুরে বসতি গড়েছিল। ক্ষয়িষ্ণু কোনো জমিদারের মহলাও কিনেছিল নাকি। টোলে পড়াত সেই গম্ভীর লোক। সংস্কৃত আওড়াত নাকি হিন্দু পণ্ডিতদের থেকেও মুখরভাবে। স্বভাবের সাথে পাণ্ডিত্য আর নামের সাথে পণ্ডিত জুড়ে গিয়েছিল এভাবেই। শীতগ্রীষ্ম সারা বছর পরনে থাকত ধুতি আর গেঞ্জি। মুখে আদার কুচি। টোলে পড়ানো ছাড়া সারাদিন তাকে বাক্যখরচ করতে তেমন কেউ দেখত না। আশ্চর্য জ্যোতির্ময় দুটো চোখ--অথচ ঠোঁটের কোনা দুটো সুপারির মতো শক্ত।

ওসমান আলী এই গাম্ভীর্যটুকু পেয়েছে। তাতে গ্রামে কি কলকাতায় তার সম্মানটুকুও বজায় আছে সুলভে। একদা ছোটলাটের দপ্তরে কাজ করা এই লোক ইংরেজি বলে ফটফট করে, ওদিকে উর্দুতে দখলও অনবদ্য। কংগ্রেসের ভেতর কিছুদিন থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মুসলিম লীগে। সভা-সমিতি, মিটিং-মিছিল এসবেই সময় কেটেছে। দেশভাগে, কিঞ্চিত হলেও, তারও কিছু দায় থেকে থাকবে।

তা দায় যদি বলতে হয় সেটা একটু হলেও শুধু সফরেরই লাগে। হঠাৎ করেই শুনল দেশটা নাকি দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এর আগে কয়েকবার স্বরাজের কথা শুনেছিল সে। স্বরাজ কি তা-ই জানা হয়নি, তার আগেই দেশভাগ আর আগুনের গল্প। বাবা এসবের আগেই অবশ্য গত--কাউকে যে কচিমনের জিজ্ঞাসাগুলো পূরণ করে নেবে তার সাধ্যও ছিল না।

১৯৪৭ এ দেশভাগ হলো। আর ৪৮ এ ভাগ হলো সফররা। জগন্নাথপুর থেকে রহনপুর। মাত্র ১৭ ক্রোশ। কিন্তু তাতেই দুটি আলাদা দেশ, আলাদা নাম, আলাদা পরিচয়। ভারত আর পাকিস্তান।

সফর আর তার ভাইয়ের বাবা-মা বলতে কেউ নেই পৃথিবীতে। অভিভাবক কাকা ওসমান আলী আর কাকী রুমালী বেগম। তাদের তিন ছেলে এক মেয়ে। সাথে আরও দুই দুর্সম্পর্কীয় কাকা ও তাদের পরিবার--চাকর-বাকর মিলে বেশ লম্বা বহর। তিনটা নৌকায় তারা পাকিস্তানে ঢুকছে। মালামাল মোষ আর গরুর গাড়িতে আরও তিনদিন আগে থেকে ঢুকছে পাকিস্তানে। তবু কিছু না কিছু থেকেই যায়। সংসার উচ্ছেদ গাছের চেয়েও কঠিন। শুধু শেকড় বা জমিনে না, টান লাগে আঁতেও। বিষাক্ত হয়ে ওঠে চতুর্দিক। অথচ সফর খেয়াল করে দেখে কারও মনেই সেই বিষ-সংসয় নেই। কাকা নৌকার সামনে বসা। কাঠের ভারী হাতলওয়ালা চেয়ারটা মাঝির ওঠাতে দম বেরিয়ে গেছে। ওসমান আলী ওটাতেই বিরাজমান। মুখে অদ্ভুত প্রভা। পাকিস্তানই তো চেয়েছিল তারা। সম্পদ বণ্টনসহ আরও ঝুটঝামেলায় প্রায় একটা বছর কাটল। নিজের গ্রাম ছেড়ে এবার তারা নিজের দেশে ফিরছেন--'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান' তার জীবনে আজকে এসে তবে হতে যাচ্ছে সার্থক।

রুমালী বেগম আজম্ম নির্ভরশীল ওসমান আলীর ওপর। স্বামীটি অনেক শ্রম দিয়েছেন এই দেশ তৈরিতে। কলকাতার এক মিছিলে নাকি মারও খেয়েছেন। পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে ছোটলাটের দপ্তরের পরিচয় তার কাজে লেগেছিল সেসব দিনে; কিন্তু কথাগুলো লোকটি কোনোদিন মুখ ফুটে বলে না। শুধু বলে, মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। আমরা ভাই ভাই হয়ে এবার একটা দেশে থাকব।

রুমালী বেগমেরও সেই ইচ্ছা। ইতর হিন্দুদের দেমাগ দেখার দিন ফুরালো। ওদের সাথে ঘেঁষাঘেঁষির সময়ও শেষ। একটা দেশে প্রাণভরে আল্লাহর বন্দেগি করাও তো চাট্টিখানি কথা নয়!

সফরের পাশেই বসে ছিল শেফু। সফরের চেয়ে সাড়ে ছ বছরের ছোট। সফরের যদি মায়ের ছবি মনে নেই তো শেফুর মনে নেই বাপ-মা কারোরই ছবি। সে মানুষ হয়েছে কাকীর কাছে। কাকীকে সে কাকী ডাকে ঠিকই, কিন্তু ওই ডাকে মায়ের মমতা মিশে থাকে ঢের বেশি। কাকীও তাদের নিজের সন্তানদের থেকে আলাদা করে দেখে না কখনও। এক পঙতিতেই খাওয়া-দাওয়া, এক গড়া খাটে ঘুমানো, এক সকালের একই মুড়িগুঁড়। এই গুঁড়ে শেফুর চোখেও সফর দেখছে কৌতুহল। নতুন জায়গায় যাওয়ার উত্তেজনা। কিছুক্ষণ পরপরই জিজ্ঞাসার উচাটন--ওই দেশে লাট্টু আছে দাদা?

থাকবে না কেন?

আর মন্ডা?

মন্ডাও আছে।

কাক ডাকে, না দাদা?

ডাকে নিশ্চয়।

বিষ্টি হয়, নারে?

তুই একটু ঘুমা ভাই। মাঝি বলছিল ঠিক ভোরে নাকি পৌঁছাব।

ঘুমাব না। দেখব না আমাদের নতুন দেশ?

সফরেরও ঘুম আসে না। তবে তা নতুন দেশ দেখার উত্তেজনায় না। তার মন পড়ে আছে জগন্নাথপুরে। তার গ্রাম তার স্কুল তার দিঘীর জলে গোসল... বিলে মাছ ধরতে যাওয়া কি বাটুল দিয়ে পাখি শিকারের ঘূর্ণি ছোটা দিন!

একদিন সাতটা চড়ুই মেরে এনেছিল সফর। বাটুল দিয়েই। লাল মাটি খুঁজে খুঁজে সেগুলোকে ছোট ছোট বল বানিয়ে চুলার আগুনে পুড়িয়ে গুলি বানাত বাটুলের। এত শক্ত। ঠিক করে কপালে লাগলে কপাল ফেটে রক্ত গড়াত। এদিকে হাতের টিপ সফরের খারাপ না। একবেলা ঘুরে সাতটা চড়ুইয়ের এন্তেকাল। কাকী দেখে হেসে বলেছিল, একেই বলে রক্ত!

ও কথার যদিও কোনো মানে পায়নি সেদিন সফর। কিন্তু রাতের বেলা ঘুমাতে যাবার সময় শেফু গল্প শোনার বায়না ধরলে সফরও জানতে চেয়েছিল চড়ুই মারার বৃত্তান্ত। তাতে রুমালী বেগম বলেছিল, এ পরিবারের একমাত্র শিকারী তুই কিন্তু না... তোর বাপ ছিল ঘোরেল শিকারী। বন্দুক আর গরুগাড়ি নিয়ে যেত পাখি শিকারে। গাড়ি বোঝাই করে ফিরত পাখি নিয়ে। সে সব কত আগের কথা!

বাবা শিকারী ছিল?

নামকরা শিকারী।

তারপর?

তারপর ছেড়ে দিলো একদিন।

কেন?

সে তোর বাবাই বলতে পারত। এখন তো আর নেই!

আর বন্দুকটা?

কী জানি!

বন্দুকটা সফর পেয়েছিল কোঠাঘরের ভেতরে। গোখরা সাপের বাসা উদ্ধার করতে গিয়ে শনের ভেতর ডুবে থাকা অস্ত্রটা দেখল সফর। জংধরা নল। লালচে কাঠের বাঁট। আর কী যে ভারী!
কাউকে বলেনি সফর, কাউকে দেখায়ওনি। কেন যেন মনে হয়েছিল এ বন্দুক দেখালেই সবাই হোই-হোই করে উঠবে। তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে। কিন্তু বাবার বন্দুক তো তারই বন্দুক। বন্দুকটা সে যত্ন করে লুকিয়ে রেখেছিল।

আজও রেখেছে। নৌকার পাটাতনে। পুরনো লুঙ্গির ছেঁড়া কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে। বাবার বলতে নতুন দেশে সে শুধু এটিই নিয়ে আসছে। আর আসছে কিছু কথা--যা তার বাবা তাকে বলেছিল মুখে রক্ত উঠে মরার কিছু দিন আগে!

সফরের মনে হয় নতুন দেশে তার এইটুকুই সম্বল। বন্দুকের ওপর আলতো করে হাত রাখে সফর। সে জানে না, তার পরের জীবনে কীভাবে ফিরে আসবে এই নৌক, এই যাত্রা, এই রাত আর এই প্রিয় বন্দুক!

নৌকা এগিয়ে যেতে থাকে নতুন দেশে।


অধ্যায় - ২

অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ১১টায়। কিন্তু এখন প্রায় পোনে ১২টা বাজে। অনুষ্ঠানের কোনো নামগন্ধ নাই। এ অফিসে কিছুই অবশ্য সময়মতো হয় না। অবশ্য শুধু সময়মতো না, অনুষ্ঠানটা কখনোই না হোক তাই চায় জামিল। কিন্তু তার ইচ্ছার ওপর এখন আর কিছু নির্ভর করে না। কখনো কোথাও করত কিনা সে ভাবনাও চাইলে করা যেতে পারে।

কনফারেন্স রুমের সবচেয়ে পেছনের এবং একেবারে কোনার চেয়ারে জামিল বসে আছে। আহমেদ জামিল। লম্বাটে গড়ন। বয়স ৪৩ কি ৪৪ হবে। চট করে জিজ্ঞেস করলে জামিল নিজেই নিজের বয়স গুলিয়ে ফেলে। কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দেয়। অথবা দেয় না। তাকিয়েই থাকে। শুধু একটা লাইন মনে আসে--বুটের পায়ের তলায় পিষ্ট যখন আমার দেশ, সানগ্লাস আর মরীচিকায় যখন ভরে উঠেছে দশদিক, তখন আমার জন্ম!
নিজের জন্মের কথা লিখতে শুরু করেছিল সে একবার। তখন লাইনটা লিখেছিল জামিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। খেয়াল করে দেখেছে নিজের কথা সে আসলে লিখতে পারে না। লিখতে গেলে শক্ত কোনো হাত, নাকি থাবা, তার হাতের ওপর চেপে বসে। জামিলকে তখন খুঁজতে হয় আড়াল। জীবন লেখার আবডালপনা তাকে ব্যথিত করে হয়তো। না হলে সাতটা ডায়েরি শুরু করেও শুধুই শূন্য পাতার মকারি করত না সে।

থাইগ্লাস ঠেলে বেলা চড়ার রোদ এসে আছড়ে পড়ছে জামিলের কোলে। এসি না চলায় ঘরটা হয়ে আছে বদ্ধ গুমোট। রোদটুকু তাতে আরও উত্তাপই বাড়াচ্ছে, জামিলের ফরসা কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও সেটা খুব বেশি কষ্ট যে তাকে দিচ্ছে, তা মনে হয় না। বরং জানালার ওপারে, রাস্তায়, জামিল তার চোখ বিদ্ধ করে রেখেছে একটা কুকুরের ওপর। নেড়ি কুকুর। তার ওপর পা ভাঙা। পেছনের পা-টা অর্থহীন ঝুলে আছে শরীরের সাথে। জামিলের আগ্রহ কিংবা চেয়ে থাকা ওই অর্থহীনতার দিকেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডজুড়ে এমন অর্থহীন কত কিছুই তো ঝুলে আছে। কিছু শরীরের সাথে কিছু মনের সাথে। কিছু সময়ের সাথে কিছু সম্পর্কের সাথে।

নিজেকে ঠেলে ঠেলে কুকুরটা রাস্তার অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে আসতে পারছে। যতটা তিন পায়ে সম্ভব, ততটাই। এর পর, রাস্তার মাঝ বরাবর, যখনই তার বেশ একটু গতি প্রয়োজন, তখনই তার ওই চতুর্থ অর্থহীন ঝুলে থাকা পা-খানি তাকে কোনো সাহায্য তো করছেই না বরং উল্টো এক বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দুপাশ থেকে ছুটে আসা প্রাইভেট কার, পাবলিক বাস আর নাগরিক অটো মন্ত্রীর গাড়ির মতো তেড়েফুড়ে আসতেই অর্থহীনতাসহ বেচারাকে ফিরে যেতে হচ্ছে ফেলে আসা রাস্তার প্রান্তে।

বাবাকে যতটুকু মনে পড়ে জামিলের, ওই রোগে ভোগা ক্লান্ত চোখ দুটোজুড়ে বেচারার একটাই গান ছিল--ফিরে যাওয়া খুব কষ্টের রে বাপধন!
ঠিক কী সে ফিরে যাওয়া তখন বোঝেনি জামিল। তার বাবা জোয়ানকালে একবার শৈশবে ফিরে গিয়েছিল সত্যিই, কিন্তু সে তো দায়ে পড়ে--৭১-এ। ক' মাসের মাথায় ফিরেও এসেছিল আবার; এরপর আর কবে কোথায় কেন বাবাকে ফিরতে হয়েছিল জামিল জানে না। কিন্তু এখন তার মনে হয়, যে কোনো কারণেই, যে কোনোভাবেই, যে কোনো সময়েই ফিরে যাওয়া কষ্টের--বা কষ্টের চেয়েও বহুগুণ গ্লানির মতো কোনো কিছু।

'কী ব্যাপার, ঘামতেছেন দেখি আপনি?'

জামিলকে উদ্দেশ্য করেই বলা। নোরা। অফিসের ঝকমকে তরুণী। লম্বা না খুব। তবে আকর্ষণীয়। চোখ দুটো দারুণ প্রাঞ্জল। অদ্ভুত এক ভাবে কাজল দেয় নোরা। চোখের ওপরের ধারে সে কাজল দুর্গার মতো আঁকা হয়, অথচ নিচেরটা ধুধু সাহারা। এতে নতুন কিছু হয় নিশ্চয়। হয়তো ফ্যাশনই হয়। জামিল অত বুঝতে পারে না। মেয়েটার দৃষ্টি ক্ষুরধার। নজর ওপরে। এবং বলা যায় সে সবার চোখের মণি। 'সেলসের মেয়ে এমন চটকের না হলে চলে না'-- মনিরুল বলছিল সেদিন। স্মোকিং জোনে। কষে সিগারেট টানতে টানতে। অনেকটা আফসোসের সাথে। জামিলের চাইতে বেশ জুনিয়র মনিরুল। অ্যাসিস্টেন্ট প্রোডিউসার হিসেবে ঢুকেছে। এ বছর প্রোডিউসার হয়ে যাবে বলেই ধারণা করছে। তার টিমের বানানো বিউটি সোপের বিজ্ঞাপন এখন হিট। পদন্নোতি আটকায় কীভাবে! অথচ মনিরুলের সেদিকে চোখ নেই। বেচারা পড়ে আছে নোরাকে নিয়ে। যেদিন নোরা শাড়ি পরে আসে মনিরুল স্মোকিং জোনে যায় ঘন ঘন। বলাই বাহুল্য, নোরাও স্মোকার!

নোরা আজও শাড়ি পরেছে। আজকের এই অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যেই কিনা কে জানে! অবশ্য সেলস টিমের অফিসের বাইরে বাইরে মিটিং-সিটিংও থাকে। নোরাকে তখনও শাড়ি পরতে হয়। ওদিকে কারণ জানতে চাইলে নোরা এসব কিছুরই উল্লেখ করবে না। নাকের ওপর চড়া মেজাজের পরত তুলে বলবে, আমি শাড়ি পরি আমার জন্যে। নিজের জন্যে। আর কিছুর জন্যে না!

নোরা একটু একরোখা, জামিলের তাই মনে হয়। মনে হয় এই একরোখামিটা তার ঢাল। নাহলে তাকে কবেই এই মিডিয়াপাড়া ভাসিয়ে নিত। নোরা সুন্দর। শাড়িতে নোরা মনোলোভা ও আকর্ষণীয়।

'কী দাদা, এমন ভ্যাবলার মতন তাকিয়ে আছেন ক্যান?'

আশ্চর্য কোনো কারণে নোরা জামিলকে দাদা বলে ডাকে। দাদা ডাকে জামিল অবশ্য পরিচিত। সে তার বড় ভাইদের দাদা বলেই ডাকত। সেও মনে হয় অন্য কোনো জীবনে। জামিল হাসার চেষ্টা করে। হাসিটা জমে না অবশ্য।

'উফ, রুমটা তো হট চেম্বার হয়ে আছে। আলম... আলম... এসি ছাড়ো নাই ক্যান এখানে?'

কানের ভেতর হিলের শব্দ তুলে বেরিয়ে গেল নোরা। আবার ঢুকেও পড়ল চটপট। হাতে এসির রিমোট। টুক করে এসিটা খুলেই বলল, আর সব কই?

আর সব যে কই তা তো জানে না জামিল। কিন্তু ব্যাপারটা অন্যভাবে উত্তর দেয়াটাকেই ঠিক মনে করল। বলল, বোধয় মিটিংয়ে।

কী বলেন দাদা! এইটাই তো মিটিংরুম!

সেও ঠিক।

আপনার ফেয়ারওয়েল, এদিকে আপনি এসে বসে আছেন। অন্যদের কোনো খবর নাই। অফিসটা যে ছাড়ছেন দাদা খুব ভালো করছেন। শুধু...

নোরা আর শেষ করল না। এই শুধুটা যে কী জামিল তা জানে। এর মধ্যে হাজার খানেক বার শুনে ফেলেছে। আগামী মাসটা পার করতে পারলেই ১৫ বছর হয়ে যাবে জামিলের। তাতে গ্রাচুইটিটা এক লাফ দেবে। এসব বেসরকারী অফিসে ওইটুকুই তো সম্বল। এখন যা পাবে এক মাস পর গেলে তার প্রায় দেড় গুণ পেতে পারে জামিল। একটা মাস পর গেলে কী হবে এমন?

জামিল প্রত্যেকের উপদেশেই হেসেছে শুধু। এইটুকুই তার বলা। মনিরুল পর্যন্ত বলেছে, জয়েন করার আগেও আপনার কথা শুনছিলাম ব্রো। আপনি নাকি টু কুল টু ডিল। লেকিন, এইটা কুল হইল না। নাকি অন্য কোথাও বিরাট চান্স পাইছেন? ট্রিপল স্যালারি? ফ্ল্যাটগাড়িসহ? তেমন হইলে কিন্তু আপনার এই ব্রোকে টাইনা নিতে হইব। কথা দেন ভাই, কথা দেন... প্রমিজ?

'অন্য কোথাও জয়েন করছি না তো।'

'ধুর্বাল! তাইলে? নিজের ভালো তো পাগলেও বুঝে ব্রো। আপনি বোঝেন না?'

জামিল হাসতে হাসতে বলেছিল, নিজের ভালো বুঝেই তো যাচ্ছি!

যাচ্ছি বললেও যাওয়া এত সহজ হয় না মানুষের জন্য। একটা চাকরি মানে নানান জায়গার নিশ্চয়তা। আবার নানান জায়গার দায় ও দায়িত্ব পূরণ। জামিলের সুবিধা এই দায় ও দায়িত্ব তার কোথাও নেই। কোনো সম্পর্কের বন্ধন, কোনো টানাপোড়েন, কোনো পিছুটান, কিচ্ছুটি নেই তার। তাই, যেদিন সে ভাবল আর না, সেদিনই সে রিজাইন দিতে পারল। এক মাসের নোটিশে। সেই নোটিশের আজকে শেষ দিন। কাল থেকে সিনিয়র কপিরাইটার জামিল আহমেদ চিরদিনের জন্য বেকার। অথবা এক অর্থে স্বাধীনও বলা যায়। রেস ছেড়ে দিলেই না রেসের ঘোড়া মুক্ত হয়। তবে তুলনাটা জামিলের পছন্দ হয় না ততটা। সে কোনোকালে রেসে ছিলই না। রেসে দাঁড়ানোর অনন্যতা নেই তার।

নোরা জামিলের পাশের চেয়ারেই বসল--আমাকে কেমন লাগছে দাদা বললেন না?

'সুন্দর দেখাচ্ছে।'

'না দেখেই বললেন তো।'

জামিল আসলেই দেখেনি। তার দৃষ্টি রাস্তার ওদিকেই ছিল। কুকুরটা তার ঝুলে থাকা অর্থহীন পাখানি নিয়েই রাস্তা পেরিয়েছে। ব্যাপারটা আনন্দের নিশ্চয়। জামিলের মনে যদিও আনন্দ নেই। এভাবে অর্থহীনতার সাথে রাস্তা পেরিয়ে যাবারও কি কোনো মানে আছে?

নেই।

তখনই দরজা ঠেলে পিয়ন আলম ঢুকল। বলল, আইজকা প্রোগ্রাম হইব না। চিয়ারম্যান স্যার বোড মিটিংয়ে আটকায়া গেছেন। তিনি বলছেন ফেয়ারওয়েল পরে হইব।

নোরার ভ্রুটা কু্ঁচকে গেল মুহূর্তেই। ব্যাপারটা স্পষ্টই অপমানের। জামিল এত দিনের পুরনো লোক। পদেও সিনিয়র। এই অ্যাড এজেন্সিটা যে কজন মিলে দাঁড় করিয়েছিল জামিল তাদের একজন। এখানে জয়েন করার পর নোরা এসব শুনে শুনে জেনেছে। অসন্তুষ্ট নোরা বলেই বসল, এসবের মানে কী! এখন না হলে বিকালে হবে, তাই না?

নাহ। আইজ হইব না। সার বলে দিছে!

নোরা বলল, ফাক!
জামিল বলল, বাঁচলাম।

জামিলের বুক থেকে স্পষ্টই পাথর নেমেছে। এসব আচার অনুষ্ঠানকে জামিল বরাবর ভয় পায়। এমনিতে অফিসের এ রকম কোনো অনুষ্ঠানে পারতপক্ষে জামিল উপস্থিত থাকে না। আজকে নিজের অনুষ্ঠান বলেই থাকতে হচ্ছিল। আর মনে মনে এই বলে খুব চিন্তা হচ্ছিল সবাই যখন বেদনাবিধুর মুখের ভান করতে করতে কথা বলবে তখন জামিলের কেমনটা লাগবে। সবার কথার উত্তরেই বা সে কী বলবে... এরচেয়ে এটাই ভালো। বেশ ভালো।

জামিল উঠে দাঁড়াল। নোরাও উঠল--দাদা, কই যান?

'দুটো মেইল করার আছে। এরপর বেরিয়ে যাব। আজকে পাঁচটায় একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।'

কীসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নোরা সেটা জিজ্ঞেস করল না। সে ধরেই নিলো জামিল মিথ্যা বলছে। অপমান ঢাকতে বানিয়ে বানিয়ে বলছে। কিন্তু জামিলের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সত্যিই রয়েছে। ডক্টর আশরাফ রওশনের কাছে। এটিই শেষ। এরপর কখনও তার ডাক্তারের কাছে যাবার প্রয়োজন পড়বে না জামিলের। ডাক্তার তাই বলে দিয়েছে। জামিলও তাই জানে।
বড় জোর আর এক মাস, এই কটা দিনই বেঁচে আছে জামিল।


অধ্যায় - ৩

পাথর ঘাটে নৌকা ভিড়ল।

রাত প্রায় ফুরিয়ে যাচ্ছে। পুবের আকাশ লালচে হয়ে উঠছে। শেফু ঘুমিয়ে কাদা। সফরের কোলে মাথা দিয়ে হা করে আছে। ফোকলা দাঁতের ভেতর দিয়ে লালা গড়িয়ে সফরের পা ভিজিয়ে দিয়েছে। জায়গাটা চটচট করছে এখন। সফর তবু নড়ছে না। ভাইয়ের ঘুম না ভাঙুক।

সফরের আর তিন চাচাত ভাই ও বোনও ঘুমের ভেতর। বড়রা ঘুমায়নি। বেশ লম্বা সময় চুপচাপ থাকলেও এখন টুকটাক কথা শুরু করেছে তারা--বাতাসটা কী দারুণ! একেবারে হিমহিম! প্রাণ জুড়িয়ে যায়!

ওসমান আলী গর্ব করে বলল, পাকিস্তানী পাক বাতাস। গায়ে লাগলেও নেকি!

সবার কণ্ঠে সম্মতি।

ছোটদের মধ্যে ঘুম নেই কেবল সফরের। ১২ বছর বয়সেই হয়তো সে একটু বড় হয়ে উঠেছে। অথবা হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছে।

মাঝি হাঁটু পানিতেই লাফ দিয়ে নেমে গিয়েছিল। গলুইটা ঘাটে ভেড়ালো আলতো করে। এতটুকু ঝাঁকি লাগল না কারও। একটু দুলল শুধু নৌকা। ওতে শেফুদের ঘুম ভাঙতে বয়েই গেছে। ঝটপট নামতে যাচ্ছে অন্যরা। তখনই অনেক দূর থেকে মিহি আজান ভেসে এল। মোয়াজ্জিনের কণ্ঠ অপার্থিব। ওসমান আলী ঠাই মেরে শুনল। আজান শেষেই বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল--সুভানআল্লাহ!

সফরেরও প্রাণটা জুড়িয়ে গেছে। আহা!

জগন্নাথপুরেও একটা মসজিদ ছিল। শুক্রবার শুক্রবার জুম্মা পড়তে যেত সে। বাবা বেঁচে থাকতে বাপের আঙুল ধরে, বগলে জায়নামাজ গুঁজে, এরপর কাকার পিছু পিছু--সারি সারি পিঁপড়া হয়ে। মতি মোয়াজ্জিনের কণ্ঠ মিসরির দানার মতো মিষ্টি। এই আজানও সেই আজানের চাইতে কম কিছু না। ভোরের পুনর্ভবাকে আরও পবিত্র করে তুলল যেন আজানটা। সফর ভাবল, দুই দেশ হলে কী হবে, আজান একই!

ওসমান আলী নামাজ কাজা করতে চান না। নদীতে ওজু সেরেই নৌকাতে দাঁড়িয়ে গেলেন কাতারে। তিনি ইমাম। অন্যরা পেছনে। সফরও দাঁড়িয়েছে। দুইটা সুরা মুখস্ত তার--সুরা ফাতেহা আর সুরা কাউসার। এ দুটি দিয়েই সে নামাজের কাজ সারে। কিন্তু কাকা বলেছে আরও সুরা মুখস্ত করতে। সাথে সুরার অর্থও জানতে হবে। সুরা জানলে এক সওয়াব, কিন্তু অর্থসহ সুরা জানলে ডাবল সওয়াব। সফর ঠিক করেছে সব কটা সুরা আর তার অর্থ সে জানবে। বাবা বলত, যা পারিস শিখিস, যা পারিস জানিস। যত শিখবি যত জানবি ততই গভীর ইন্দারা হবি। যত গভীর ইন্দারা হবি তত ভিতরে ধরবি জল!

জল না বাবা, পানি।
বাবা হাসত। বলত, এইটাও একদিন জানবি রে বাপধন!

বাবার বেশিরভাগ কথার অর্থই সফর জানে না। তবে কথাগুলোকে সে মনে রেখেছে। একটা রুলটানা খাতায় কিছু কথা লিখেও রেখেছে। বড় হতে হতে সে সব কথার অর্থ আবিষ্কার করবে। নিশ্চয়ই করবে!

নামাজ শেষে একটু মুড়িগুঁড় খাওয়া হলো নৌকাতে বসেই। মাঝি চুলা জ্বালিয়েছিল। কাকী তাতে চা বসাল। ওসমান আলী কলকাতা থেকে চায়ের তেষ্টা নিয়ে এসেছিলেন। তিনবেলা ছয়বার চা খেতে হয় ওসমানকে। সাথে অন্যরাও। অনেকটা সঙ্গদোষের খাওয়া। অবশ্য ছোটরা চা থেকে সাত হাত দূরে। তাদের জন্য চা কঠিন ধরনের নিষিদ্ধ বস্তু। সে নিষেধ অমান্য করলে শাস্তিও বড় রকমের। শেফুরা এটা গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু সফরের নিজেকে এখন বড়ই লাগে। চায়ের দিকে সে তাই তাকিয়ে থাকে জুলুজুলু চোখে। আর কত বড় হলে তাহলে চা জুটবে কপালে?

দুইটা লণ্ঠন জ্বলছে। দুই ক্রোশ হাঁটতে হবে এবার। এক অতিকায় আমবাগানের ভেতর দিয়ে রাস্তা। রাস্তা আর কোথায়? আমবাগানের ভেতর দিয়েই হেঁটে চলা।

ঝিঁঝিঁ ডাকছে। একটু আগে পুনর্ভবার পাথরঘাটে যে ভোর দেখেছিল সফর আলী তা দূরীভূত। আমবাগানের ভেতর যেন চিরতমসার কাল। বয়স্ক সব গাছ। এক গাছ অন্য গাছকে এমনভাবে জাপটে ধরে আছে, আলো আসা দূরে থাক--আকাশই দেখা যায় না। কাকী বলল, বাপরে বাপ! গা একদম ছমছম করছে। নিশ্চয় বাগানের মধ্যে জ্বিনভূত আছে!

ওসমান আলী কাফেলার আগের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে বলল, জ্বিন থাকতে পারে। কিন্তু ভূত বলে কিছু হয় না। তুমিও যদি ছেলেভুলানো কথা বলো, তাহলে ছেলেপুলেরা কী বলবে?

কাকী চুপ করে গেল খানিকক্ষণের জন্য। তারপরই আবার বলে উঠল, আর কতদূর গো?

ওসমান আলী জবাব দিলো না। কাকী স্পষ্টই ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে সফর আলীও। একটাই ভরসা লণ্ঠন। লণ্ঠনে আগুন আছে। আগুন থাকলে জ্বিনভূত কাছে আসে না। জ্বিন অবশ্য আগুনেরই তৈরি, তবু তারা আগুনকে কেন ভয় পায় সফরের মাথায় আসে না। একবার মতি মোয়াজ্জিনকে এ প্রশ্ন করেছিল সফর। মতি বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বলেছিল, ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। পরে আর ইমামকে জিজ্ঞেস করেছিল কিনা কে জানে! তবে সফরের মনে প্রশ্নটা থেকেই গেছে। কই, ইনসান মানে মানুষ তো মাটির তৈরি--তারা তো মাটিকে ভয় পায় না!
এ রকম সময়ে সফরের বাবার কথা মনে আসে। যে কোনো প্রশ্নের জবাব বাবার কাছে পাওয়া যেত। অবশ্য একটার জবাব চাইলে আরও পাঁচটা জিনিস বলে বসত--তাতে সফরের ছিল আরও মজা!

'দাদা, কোলে...'

এমনিতে সারাদিন শেফু হাজার ক্রোশ দৌড়াবে, শুধু হাঁটার সময় তার নানা নয়-ছয়। সেটাই বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকিয়ে দেখল দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছে শেফু। এক হাতে নিজেদের কিছু বাক্সপেটরা ধরে ছিল সফর, সেগুলোর ভেতরেই আড়াল করে রেখেছিল বন্দুকটা, অন্য হাতে এবার শেফুকে উঠিয়ে নিলো সে। ভার বাড়ল। কিন্তু এ বয়সেই সফর বুঝে নিয়েছে এইসব ভার জীবনেরই অংশ।

বাগান পেরোলে আবার একটু আলোর মুখোমুখি হলো তারা। কেউ একজন বলল, পুরা এক বাগান, শুধুই ফজলি আম। এত আম খায় কে?

শেফু কোল থেকেই বলল, বাগদুরে!

সবাই তাকাল ওসমানের দিকে। গম্ভীর ওসমান হঠাৎই একটু হেসে উঠল। তাতে অন্যদেরও হাসির বাঁধ ভাঙল। কাকী লজ্জা লজ্জা হাসি দিয়ে বলল, শেফুটা এমন চিলকা হয়েছে...

হাসি প্রলম্বিত হতে থাকল। তবে এ হাসি শুধুই শেফুর চিলকামির জন্য না। এ হাসি পেছন ফেলে সামনে এগিয়ে আসার হাসি। সফর শেষে গন্তব্যে পৌঁছানোর হাসি। এ হাসি আবর্তন পূরণ হওয়ার হাসি।

কাফেলা এগিয়ে চলল। পথ আর নেই। এখন হাঁটা গন্তব্যের ভেতরেই। সকালের তেরছা আলোয় সফর দেখল এলাকাটা বেশ উঁচু। পায়ের নিচের মাটির রঙ কালচে বটে, কিন্তু আশপাশটা জুড়ে আছে লাল মাটির ঢিপিতে। আরেকটু এগোলে বুঝল এলাকার মাটিই আসলে লাল। জবর ব্যাপার!

উঁচু দেয়াল ঘেরা এক গেটের ভেতর ঢুকে পড়ল সফররা। ঢুকেই চমকে উঠল সফর। এটাই তাদের বাড়ি? দোতলা দালান। বরফিকাটা দরজা। উঠানটা যেন চাতাল। কোনো টিন না, কোনো মাটির ঘর না। এ যে আস্ত জমিদার বাড়ি। জগন্নাথপুরে এমন বাড়িতে রমারা থাকত। তাদের ঘোড়াগাড়িও ছিল অবশ্য।

শেফু ফিসফিস করে বলল, দাদা, এটা কাদের বাড়ি রে?

কাকাদের।

মানে আমাদের?

হ্যাঁ।

এই বাড়িতেই থাকবি তুই?

তুইও থাকবি।

কেউ বকবে না?

কেন বকবে? কাকা তো এ বাড়ি কিনে নিয়েছে।

শেফুর ঠিক বিশ্বাস হয় না। কেমন চোখ ছোট করে তাকিয়ে থাকে বাড়ির বড় বড় দালানগুলোর দিকে। তারপর, হঠাৎই, কোল থেকে সরকে নেমে, দিলো এক ছুট। ফটাফট সিঁড়ি বেয়ে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ!

আবারও সবাই হাসল। বাড়ি সবার পছন্দ হয়েছে। চাকর-বাকররা গরু-মহিষের গাড়ির সাথেই এসেছিল। কাকীর সামনে কাঁচুমাচু দাঁড়িয়ে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে গেল। বালতি বালতি পানি দিয়ে ঘরদোর সব পরিস্কার করেছে। দেয়াল মুছেছে। চুনকামও হয়ে গেছে। এদিক-ওদিক যত মূর্তি ছিল সব একটা বস্তার মধ্যে ভরে রেখেছে। হিন্দুদের কোনো চিহ্ন বাড়িতে আর নাই।

কাকীর মুখে খুশি। তার নাকফুলটা সোনা রোদে ঝিলিক মেরে উঠল। বলল, পানির ব্যবস্থা কী?

চাকরদের মধ্যে জাহাঙ্গীরই বয়স্ক। বলল, ভেতর বাড়িতেই ইন্দারা আছে। ওই বাড়ির সমান চওড়া না বুবু, কিন্তু ম্যালা গভীর। খুবই মিষ্টি পানি।

ওসমান বলল, হতেই হবে। পাক পানি!

পাক না-পাকের ধারণা সফরের টনটনে। কালোখাসি মানে শূকর নাপাক, খাওয়া যাবে না। চোখের সামনে পড়ে গেলে না দেখাই ভালো। এসবের থেকে একশ হাত দূরত্বে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। আবার গরু হলো পাক। কিন্তু হিন্দুদের জন্য গরু হলো নাপাক। না, গরু নাপাক না... গরুর মাংস খাওয়া নাপাক। রমা বলেছিল, তোরা শালা মুসলি, গরু খাস!

এত ঘৃণা নিয়ে রমা কথাগুলো বলেছিল যে সফর বেশ ভড়কে গিয়েছিল। তাদের বাড়িতেও যে খুব গরু খাওয়া হয় সে তো না। বছরে দু-বছরে এক আধবার। সেও কোনো গরু গ্রামের ভেতর অসুস্থ হলে তখন জবাই করা হতো। এছাড়া গরু কত কাজের জিনিস... তাদের খেয়ে শেষ করে ফেললে হাল বাইবে কে, দুধই বা দিবে কে?

কিন্তু পানিরও তবে পাক না-পাক আছে, এও তো সত্য। মইদুলের দাদা জাহাজে চড়ে হজ করতে গিয়েছিল। ফিরে এসেছিল জায়নামাজ, তসবি আর জমজমের পানি নিয়ে। সেই পানি এক চুমুক খেতে পেয়েছিল সফর। কলিজা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। খেয়েই বুঝেছিল পাক পানি--আবে জমজম!

কাকার কথা শুনে বাড়ির ইন্দারার পানি খাওয়ার জন্য বুকটা শুষে উঠল সফরের। এতটা পথ আসার পর পিপাসাও এমনিতে কম পায়নি তার। ভেতরে যাব যাব করছিল তখনই ওসমান ঘোষণার মতো বলে উঠল, আলহামদুলিল্লাহ। আজ হইতে এই বাড়ি আমাদের। এই বাড়িতেই আমরা থাকব। নগদ টাকা দিয়ে এই বাড়ি আমি ক্রয় করেছি। কেউ যেন না ভাবে এটা হিন্দু খেদানো বাড়ি। এ বাড়িতে যারা থাকত তারা কোলকাতা চলে গেছে। ভালো দাম দিয়েই তাদের কাছ থেকে আমি কিনেছি। সফর...?

সফর চোখ নামিয়ে বলল, জ্বি কাকা?

এই বাড়িতে রাসুদের যা অধিকার তোর আর শেফুরও সেই অধিকার। দাদা শুধু আমার ভাই ছিল না, বাপের মতোও ছিল। তার কাছেই আমার সব ওজর-আবদার ছিল। দাদার ভাগ এখন আমার কাছে। সেই ভাগ শুধু জমিপুকুরের না, তোদেরও। লায়েক না হওয়া পর্যন্ত সেই ভাগ আমার কাছেই থাকবে। তারপর তুই যদি মনে করিস জুদা হবি, তখন না হয় বণ্টন হবে। ততদিন পর্যন্ত রাসুও যা, এ বাড়িতে তুইও তা।

ওসমানের বক্তৃতা দেয়া গলা। চারিদিকটা গমগমিয়ে গেল। সফরের চোখে পানি। টপ করে এক ফোঁটা পড়লও। শেফু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকল সফরের ফিকে। তারপর ফিচিক করে হেসে বলল, দাদা কান্দে দাদা কান্দে!

শেফুর এ ফিচলামিতে এবার কেউ হাসল না। প্রায় সবার চোখেই পানি। যাদের চোখ খালি তাদেরও বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছে। ওসমান আলীর মহত্ব এমনিতেই জনে জনে ফেরি হয় না। বাড়িতে ঢোকার আগেই এতিম দুটিকে যেভাবে উজার করে দিলো, আজকের জমানায় কজনই বা এমন করে?

চোখ মুছতে মুছতেই সবাই অন্দরে গেল। যেতেই কাকী চেঁচিয়ে উঠল, এটা কী?

সবাই দেখল সেই ভয়ংকর জিনিসটা। জবা গাছ। ঝাঁকড়া গাছটা ভরে আছে লাল ঝুমকো জবায়। ওসমান বলল, সরাসনি এটা এখনও?

জাহাঙ্গীরের জিব সাত হাত বেরিয়ে এসেছে। কোনোমতে বলল, ছাদ পরিস্কার করতে করতে আসলে... পরশুই তো তুলসিতলা ভেঙেছি.. এইটাই শুধু... রহমত?

রহমত দা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল গাছটার ওপর। গাছের প্রাণ আছে এটা স্কুলে জেনেছিল সফর, এ বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে জানল গাছের ধর্মও আছে!