ভাষা, শিল্প, সময়, ইতিহাস, নন্দন এবং সর্বোপরি কল্পনা যার সাহিত্যকর্মকে আচ্ছন্ন করে রাখে তিনি হলেন স্কটল্যান্ডের সাহিত্যিক এলি স্মিথ। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার ও সাংবাদিক। চার চার বার বুকার পুরস্কারের সম্ভাব্য বিজয়ীদের সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত হন। আইরিশ লেখক সেবাস্টিয়ান ব্যারি ২০১৬ সালে ঘোষণা করেন, “এবার নোবেল পুরস্কারএলি স্মিথের অপেক্ষায় রয়েছে।” সময় ও অসীম শূন্যতা ধূসর এক রেখায় এসে মিশে যায় তাঁর উপন্যাসের আখ্যানে। জীবনের জটিল সব অংক খেই হারিয়ে ফেলে জীবনেরই বাঁকে এবং পাঠকএলি স্মিথের লেখা পড়ার সময় এই বাঁকগুলোতে দাঁড়িয়ে পড়েন। থমকে যান। ভাবতে বাধ্য হন। জীবনের আগাগোড়া ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। নতুনভাবে। এভাবে পাঠক আগে কখনও দেখেননি। তাঁর রচনা উপভোগ করতে করতে পাঠক মুখোমুখি হন কঠোর, কঠিন বাস্তবতার। সমাজ ও মানুষের প্রতি নৈতিক দায়িত্ববোধ জাগানিয়া তাঁর সব রচনা। তাঁর রচনা পাঠকালে পাঠক ভাবতে বাধ্য হন যে, পঠন শুধু জীবন বদলে দেয় না, বরং অধিকতর ভালো জীবনের যাপনচিহ্নসমূহ ধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
২০২৪ সালেএলি স্মিথ বোডলে মেডেল লাভ করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বোডলেয়ান লাইব্রেরি এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। সাধারণত যাঁরা যোগাযোগ ও বিশ্বসাহিত্যে অসাধারণ অবদান রাখেন, তাঁদেরকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। স্যার টমাস বোডলে এই পুরস্কারের সূচনা করেন সপ্তদশ শতাব্দীতে। মাঝখানে অনেক দিন বন্ধ ছিল। ২০০২ সালে পুনরায় এই পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। কাজু ইশিগুরোসহ আরোও অনেক তাবড় সাহিত্যিক এই পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০০৭ সালেএলি স্মিথ রয়্যাল সোসাইটি অব লিটেরেচার- এর ফেলো নির্বাচিত হন। সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য ২০১৫ সালে তিনি কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০১৯ সালে নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যারয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটেরেচার ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়াএলি স্মিথ আরো অনেক পুরস্কার লাভ করেন। প্রবন্ধের শুরুর দিকেএলি স্মিথের পুরস্কারের এই বিস্তারিত ফিরিস্তি দেওয়ার কারণ সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর ব্যাপক অবদানের বিষয়টি সামনে পাঠকের সমানে আনা। এ কথা অসত্য নয় যে, আমাদের এ অংশেএলি স্মিথ ব্যাপক পঠিত লেখিকা নন। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তু, জীবনমুখিতা এবং আমাদের এ অঞ্চলের সমাজ-বাস্তবতার কাছাকাছি উপকরণ বিবেচনায় আনলে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে,আলি স্মিথ আমাদের এ অংশের, বিশেষ করে বাংলাদেশের পাঠককূলের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একজন লেখিকা।
এলি স্মিথের সাহিত্যকর্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সময়ের হৃৎস্পন্দন শোনা যায়। ব্রেক্সিট থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ পর্যন্ত, এমনকি শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাসে প্লেগের ক্রোধক্লিষ্ট বুভূক্ষু, মৃত্যুর প্রহর গুণতে থাকা মানুষের ক্ষীণ কণ্ঠস্বরও শোনা যায় তাঁর রচনায়। শুধু তাই নয়, তিনি আধুনিকতাবাদ ও উত্তরাধুনিকতার মধ্যে এমন এক সমন্বয় ঘটিয়েছেন তার বিষয়বস্তু ও রচনাকৌশলে যেটি ফলশ্রুতিতে উত্তরাধুনিকতাকে ছাড়িয়ে মেটামডার্নিজমের শীর্ষবিন্দু ছুঁয়েছে। আসলে, মেটামডার্নিজম একটি সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ ও ভাবনাব্যবস্থা, যেটি আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করে। এতে যেমন আধুনিকতার আদর্শবাদ রয়েছে, আবার একই সঙ্গে এতে রয়েছে উত্তরাধুনিকতার সন্দেহবাদ। আধুনিকতার সততা যেমন এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত, তেমনি উত্তরাধুনিকতার শ্লেষ এর চিন্তাব্যবস্থাকে করেছে ধারালো। একই ভাবেএলি স্মিথের রচনায় কল্পনা আছে বটে তবে সেটি বাস্তবতার গা ঘেঁষে চলে। আধুনিকতার আদর্শবাদ যেমন তাঁর রচনায় ধ্বনিত হয়, তেমনি উত্তরাধুনিকতার সন্দেহ ও উদ্বিগ্নতাওএলিঙ্গন করে সেই আদর্শবাদকে। আধুনিকতাবাদের সততা যেমন তাঁর রচনার বিষয়বস্তুর শরীর ফুঁড়ে বিকিরিত হয়, তেমনি উত্তরাধুনিকতার শ্লেষ দাঁত খিঁচিয়ে উপহাসও করে চিরাচরিত সব ধারণা ও ব্যবস্থাকে। উত্তরাধুনিকতার বিনির্মাণ বা ডিকন্স্ট্রাকশনও মেটামডার্নিস্ট প্ল্যাটফর্মে এসে অপর্যাপ্ত অনুভূত হয়। লিরিসিজম বা গভীর আবেগএলি স্মিথের লেখায় আছে বটে, কিন্তু তা তাঁর উপন্যাসের বিষয়বস্তুকে অবান্তর করে দেয় না। এটি একটি অনবদ্য গুণ যা তাঁর রচনাকে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায়, তিনি আধুনিকতার ভেতর দিয়ে ঢুকে-বেরিয়ে উত্তরাধুনিকতাকেএলিঙ্গন করে পৌঁছে গেছেন মেটামডার্নিজমে। এই বিষয়টির অধিকতর গভীর পর্যালোচনা করার জন্য এবার তাঁর সাহিত্যকর্মের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষণে আসা যাক।
ছোটগল্প রচয়িতা হিসেবে এলি স্মিথ অনন্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ফ্রি লাভ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, (১৯৯৫), আদার স্টোরিজ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ (১৯৯৯) এবং দ্য ফার্স্ট পার্সন (২০০৮) তাঁর অসাধারণ তিনটি ছোটগল্প সংকলনগ্রন্থ। গল্পগুলোর গাঁথুনি সুশৃংখল, সুক্ষ্ণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সর্বজনীন সত্যকে দুমড়ে মুচড়ে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে যেখানে এটিকে আমাদের জানাশোনার বাইরের আরেকটি পরাবাস্তব জগতের সত্যের নির্যাস বলে মনে হয়- এমন সব গুণের কারণে তাঁর ছোটগল্পগুলো পাঠকহৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। তাঁর ফ্রি লাভ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। এরপর এটি সলটায়ার ফার্স্ট বুক অব দ্য ইয়ার এবং স্কটিশ আর্টস কাউন্সিল পুরস্কার লাভ করে। বইটিতে বারটি ছোটগল্প রয়েছে। প্রত্যেকটি গল্প বিষয়বস্তুতে অভিনব। যৌনতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, স্মৃতিকাতরতা, না পাওয়ার বেদনা এবং অবাধ স্বাধীনতা উপভোগের বাঁধাহীন আনন্দ ও বিড়ম্বনা ইত্যাদি বিষয়বস্তু হিসেবে ধরা দেয় তাঁর গল্পগুলোতে। ফ্রি লাভ গল্পে একটি কিশোরী আম্সটার্ডামে ভ্রমণে গিয়ে যেমন অবাধ যৌনতার স্বাধীনতা উপভোগ করে, তেমনি আ কুইক ওয়ান গল্পের তরুণী একটি ক্যাফেতে বসে তার প্রাক্তন প্রেমিকের অপেক্ষায় স্মৃতির পীড়নে অস্থিরতা বোধ করে। টু দ্য সিনেমা গল্পে ব্যর্থ সম্পর্কের উপাখ্যান হাজির করা হয়েছে। আবার দ্য টাচিং অব উড গল্পে লেসবিয়ান সম্পর্কের উপাখ্যান উঠে এসেছে গল্পের প্রধান চরিত্র এক মেয়ের জবানীতে। আত্ম/অপর বাইনারী গল্পটির প্রধান উপজীব্য। গল্পের কথক এক কিশোরী তার মেয়ে বন্ধুকে নিয়ে বেড়াতে যায় স্পিনালোঙ্গা নামক একটি গ্রীক দ্বীপে। গল্পে এদের মধ্যকার লেসবিয়ান সম্পর্কের বয়ান নির্মিত হয়েছে।
দ্য ওয়ার্ল্ড উইথ লাভ গল্পে একটি মেয়ে তার পুরাতন এক বন্ধুর সঙ্গে হঠাৎ সাক্ষাৎ হলে দুজনে স্মৃতিচারণা করে। স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি মেটামডার্নিস্ট সাঁকো তৈরি করা হয়েছে। এই সাঁকো সংযোগ করে না, শুধু দু’য়ের মাঝে অনন্ত দোদুল্যমানতার সৃষ্টি করে। এখানে দাঁড়িয়ে মানুষ না পায় এই কূল, না পায় ঐ কূল। কূলহারা মানুষের কূলের সন্ধানে প্রাণন্তকর সংগ্রামের রূপকালঙ্কারিক উপস্থাপনায় গল্পটি অসাধারণ একটি ন্যারেটিভে পরিণত হয়েছে। দ্য ফার্স্ট পার্সন অ্যান্ড আদার স্টোরিজ গল্পসংকলনেওএলি স্মিথের বারটি ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে। ট্রু শর্ট স্টোরি নামক ছোটগল্পে দেখা যায় দু’জন লোক একটি ক্যাফেতে বসে উপন্যাস ও ছোটগল্পের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করছে। দ্য চাইল্ড গল্পে একটি বাচ্চাকে ট্রলিতে বসে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু কালক্রমে সে নারীবিদ্বেষী হয়ে ওঠে এবং নারীদের ব্যাপারে আজেবাজে মন্তব্য করতে থাকে। প্রেজেন্ট গল্পে উত্তরাধুনিক মানুষের অসংলগ্ন কথাবার্তার একটি আখ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। নো এক্সিট গল্পে এক মহিলার আগুন থেকে বাঁচতে সিনেমা হল থেকে পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের সত্য থেকে পলায়নের চিরন্তন প্রবণতার চিত্রই অংকন করা হয়েছে। অর্থাৎ,আলি স্মিথের ছোটগল্পগুলো মূলত মানুষের অস্তিত্ব সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, দৃশ্যত যা দেখা যায় এবং প্রকৃতপক্ষে যায় না, এই দু’য়ের মধ্যকার বৈপরীত্য, স্মৃতিকাতরতা ইত্যাদি বিষয়ের অসাধারণ সব বয়ান হাজির করে। এক একটি গল্প এক একটি লেন্স যার ভেতর দিয়ে তাকালে পাঠকের কাছে চেনা জগতও অচেনা মনে হয়। চেনা-অচেনার বাইনারী পাঠকের মনে একটি দোদুল্যমানতা তৈরি করে। বাস্তব পরাবাস্তবের সীমানা স্পর্শ করে এমন এক বিন্দুতে যেখানে পাঠক ভিন্ন এক জগতের সন্ধান পায়। এ জগত আমাদের মাঝেই ছড়িয়ে থাকা নানান অনুষঙ্গ নিয়ে তৈরি, অথচ আমরা এগুলোর সন্ধান কখনও গুরুত্ব দিয়ে করিনি। যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সেই কথাগুলো “দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...।”
রচনাকৌশলের ওপর আলোকপাত করতে গেলে দেখা যায় এলি স্মিথ তাঁর ছোটগল্পগুলোতে যে সাবলিল, কাব্যিক ও ভাবগর্ভ রচনাশৈলী ব্যবহার করেছেন, তাঁর উপন্যাসগুলোতেও ঠিক একই রকম কৌশল ব্যবহার করেছেন। তাঁর উপন্যাস লাইক দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত। দুই নারীর গল্প বিধৃত হয়েছে উপন্যাসটিতে। একজনের নাম এমি, অপর জনের নাম অ্যাশ। অ্যামি শোনকে বাহ্যত মনে হয় একজন নিরক্ষর, ভবঘুরে মহিলা। বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ নিয়েছে একটি ঘোড়ার গাড়ী রক্ষণাবেক্ষণ-স্থানের কেয়ারটেকারের। ওটি ক্যাম্পিং-এর জন্যও ব্যবহৃত একটি স্থান। অ্যামি তার আট বছর বয়সী কেট নামক মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে থাকে। বাস্তবতাক্লিষ্ট জীবন তার। জীবন সংগ্রামের অমানিশায় বর্তমানটা ঝাপসা হয়ে গেলেও তার উজ্জ্বল অতীতের স্মৃতি তাকে স্বস্তি দেয়। কোন এক সময় সে ছিল ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যার্থী। একদিন এক আকস্মিক ফোন পাওয়ার পর তার জীবনের রহস্যগুলোর জট ধীরে ধীরে খুলতে থাকে।
উপন্যাসের পরের অংশে আমরা অ্যামির পুরাতন বান্ধবী এইসলিং ম্যাককারথির জার্নাল দেখি। ম্যাককার্থি তাঁর জার্নালে অ্যামির সঙ্গে তার সম্পর্কের কিভাবে অবনতি ঘটে, তা উল্লেখ করে। এই দুই চরিত্রের টানাপোড়েনের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডের সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এই দুই দেশ বাহ্যত একে অপরের সঙ্গে আন্তঃগ্রন্থিকতায় যুক্ত। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের সঙ্গে যেমন সংশ্লিষ্ট, আবার তেমনি বিচ্ছিন্নও। আমাদের সম্পর্কগুলো মুখ আর মুখোশের মাঝখান থেকে উত্থিত হয় বলে পাশাপাশি থাকলেও প্রকৃত অর্থে প্রতিবেশী হয়ে ওঠা যায় না; পরস্পরের কথা শুনলেও ভাষা বোঝার অনেক অনেক খামতি রয়ে যায়। আর এই খামতির জায়গায় তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, অসহযোগ এবং বন্ধুত্বহীনতা।
এলি স্মিথের গল্পের মধ্যে মানুষের এই বিচ্ছিন্নতার বয়ান হাজির হয়েছে। তাঁর হোটেল ওয়ার্ল্ড উপন্যাসেও এমনই এক বিচ্ছিন্নতার বয়ান হাজির হয়েছে। এতে পাঁচটি সেকশন রয়েছে। প্রতিটি সেকশন কাহিনীর বিষয় ও ব্যাপ্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু তারপরেও এই সেকশনগুলোর মধ্যে একটি আন্তঃযোগাযোগ রয়েছে। প্রথমে ভাসা ভাসা পাঠে পাঠক ভাবতে পারে এলি স্মিথের লেখা যথেষ্ট পরিকল্পিত নয় এবং তাঁর লেখার পেছনে কোন প্রণোদনা কাজ করেনি। কিন্তু এ ধারণা ভুল। তাঁর রচনাকৌশলের মধ্য দিয়েই বিষয়বস্তুর গাম্ভীর্য বিকিরিত হয়। নারী পুরুষের প্রেম, নারীর সঙ্গে নারীর জটিল সম্পর্ক ও প্রেম, মৃত্যু, স্বজন হারানোর বেদনা, অপরাধবোধ, পরস্পরের ভুল বোঝাবুঝি তার লেখার অন্যতম বিষয়বস্তু। আন্তঃপ্রজন্ম সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যাচ্ছে। এর পেছনের কারণ পরস্পরকে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাব ও আত্মঅহমিকা। এই অহমিকা উভয়পক্ষেই দৃশ্যমান। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। এমনই এক টানাপোড়েনের মধ্যে আমাদের সম্পর্কগুলোর সরোবর শুকিয়ে যাচ্ছে। এটি বর্তমান সময়ের একটি বড় সংকট। এটিও তাঁর লেখনিতে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়,এলি স্মিথ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানান অনুষঙ্গ নিয়ে রীতিমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কাটাছেঁড়া করেছেন অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে।
প্রেম এবং যৌনতাকে তিনি তাঁর একান্তই নিজস্ব লেন্স দিয়ে দেখেছেন। তাঁর ছোটগল্প আ স্টোরি অব ফোল্ডিং অ্যান্ড আনফোল্ডিং এ একজন নৌবাহিনীর ইলেক্ট্রিশিয়ানের চরিত্রের মধ্য দিয়েআলি স্মিথ তথাকথিত প্রেমের প্রপঞ্চকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এই ইলেকট্রিশিয়ান একটি লকারে তার হবু স্ত্রীর ফিনফিনে পাতলা কাপড়ে তৈরি অন্তর্বাস দেখে। টু দ্য সিনেমা গল্পে যৌনতার-নির্ভর প্রেমের চিত্রায়ন করেছেনআলি। ‘স্কেয়ারি গল্পে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই প্রেমে মজে যায় অভিনেতা রিভার ফিনিক্সের সঙ্গে। স্কুল পড়ুয়া কিশোরী তার ফরাসি শিক্ষিকাকে দেখে প্রেমে মজে যায়। ফ্রিলাভ গল্পে এক তরুণী তার সতীত্ব হারানোর উপাখ্যান হাজির করে। নারী এবং নারীর মধ্যকার লেসবিয়ান প্রেমের উপাখ্যান হাজির করা হয়েছে এখানে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন পুরুষ সবসময়ই সুবিধাভোগী। নারী যৌন হেনস্থার শিকার হলে সেখানেও ঐ নারীকেই অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। কিন্তুএলি স্মিথ এই গতানুগতিক প্রপঞ্চকে ভেঙ্গে দিয়েছেন। অপরাধের ভারী জোঁয়াল প্রতিপ্রপঞ্চ হিসেবে পুরুষের কাঁধে চাপানো হয়েছে। তবে অন্যায়ভাবে নয়।
এ কথা সত্য, যেখানে ক্ষমতার চর্চা হয় সেখানে প্রতিরোধ বা রেজিসটেন্স বা জ্ঞানের নির্মাণ হয়। মিশেল ফুকো ক্ষমতা/জ্ঞানের ধারণায় এ কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জ্ঞান কখনই নিরপেক্ষ নয়। এটি ক্ষমতা চর্চার বা হেজেমনি প্রতিষ্ঠার একটি অ্যাপারেটাস। জ্ঞানের উৎস দৈবিক বা দৈবাৎ নয়। এটির পেছনের অবশ্যই প্রণোদনা রয়েছে, যেটি মূলত ক্ষমতা। ফুকোর এই তত্ত্বকথার সূত্র ধরে বলা যায় যে, পিতৃতান্ত্রিক হেজেমনির পীড়নে বা অভিঘাতে লেসবিয়ানিজম বা নারীর মধ্যে সমকামিতার মনোভঙ্গি তৈরি হতে পারে। এই মনোভঙ্গির বিশ্লেষণ করলে সেখানে অভিমান, ক্ষোভ, প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের উত্তাপ অনুভব করা যাবে। গতানুগতিক লৈঙ্গিক ভূমিকা বা ‘ট্রাডিশনাল জেন্ডার রোল’ বলতে যা বুঝায় তা আসলে নারীকে পুরুষের বাইনারী অপজিশন হিসেবে ক্ষমতাকাঠামোর পরিধিতে স্থাপন করে। এটি বলে- পুরুষ স্বাভাবিক ভাবেই যুক্তিবাদী, শক্তিশালী, আত্মরক্ষায় সক্ষম এবং কর্তৃত্বকারী। অপরপক্ষে, নারী স্বাভাবিক ভাবেই আবেগপ্রবণ, দুর্বল, আত্মরক্ষায় পুরুষের ওপর নির্ভরশীল এবং কর্তৃত্ববাদী পুরুষের সামনে অবনত মস্তকে প্রশ্নাতীত আনুগত্য প্রদর্শন করাই তার কাজ।এলি স্মিথ খুব চমৎকারভাবে এই গতানুগতিক প্রপঞ্চের প্রতিপ্রপঞ্চ নির্মাণ করেছেন তাঁর আদার স্টোরিজ অ্যান্ড আদার স্টোরিজ গল্প সংকলনের ব্যাংক কার্ড নামক ছোটগল্পে। এখানে দেখা যায় একদিন এক নারী কিছু ফুল উপহার পায়। কিন্তু এই ফুল কে তাকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে, তা সে জানে না। শুধু জানে, কোন ভক্ত তাকে এই উপহার পাঠিয়েছে। গল্পের শেষে দেখা যায় এই ভক্ত যে, এতদিনে তার মনে প্রেমিকের জায়গায় আসীন হয়েছে সে আসলে পুরুষ নয়; সে একজন মহিলা। মানব মনের মধ্যকার বৈপরীত্যকেও গল্পের আখ্যানে হাজির করেছেনএলি স্মিথ। ‘কাসিয়াস মার্দাস মার্দাস স্টোরিজ’ গল্পে পাঠক একজন মহিলার চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হন। ওই মহিলা ধর্মকর্মে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু গীর্জায় যান এবং সেখানে গিয়ে ক্রস চুরি করেন। কারণ, তার বিশ্বাস যে, এটি তাকে এবং তার সন্তানদের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করবে। ‘হ্যাঙ্গিং গার্ল’ ছোটগল্পে এক ধরনের রহস্যময়তা তৈরি করা হয়েছে। অনেক দিন আগে মেয়েটির কোন এক অপরাধে ফাঁসি হয়েছিল। কিন্তু কী সেই অপরাধ, তা আর কখনও জানা হয় না। এমন রহস্য ও চাঞ্চল্যআলি স্মিথ খুব দক্ষতার সঙ্গে তাঁর উপন্যাসে তৈরি করেছেন পাঠককে জমিয়ে রাখার জন্য। তাঁর হোটেল ওয়ার্ল্ড উপন্যাসের মেয়েটি কেন মারা গেল, তার সুস্পষ্ট কোন কারণ পাঠকের কাছে খোলাসা করা হয় না। এমন কৌশলএলি স্মিথের রচনায় এক ধরনের থমথমে পরিবেশ ও কাব্যময়তার সৃষ্টি করেছে। পাঠকএলি স্মিথের উপন্যাস পড়ার সময় নিজেদের মনের ভেতর একটি কল্পরাজ্য নির্মাণ করেন যেখানে অনবরত তারা নানান যোগ-বিয়োগে লিপ্ত হন। কাহিনী কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে, কী থেকে কী হচ্ছে, ঘটনার উৎসমুখ কোথায় এবং এর ফল কোথায় নিয়ে যাবে চরিত্রগুলোকে ইত্যাদি বিষয় সবসময় পাঠককে তাড়িত করে। এটিএলি স্মিথের রচনার একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর উপন্যাস আপাতভাবে অনেক অপ্রাসঙ্গিক ঘটনার বর্ণনাও রয়েছে। কিন্তু এ কথা তো সত্য, মানুষ যেসব অনুষঙ্গের সঙ্গে জীবনযাপন করে, তার কি সবই প্রাসঙ্গিক? তাঁর লাইক উপন্যাসে এর একটি মজার দৃষ্টান্ত রয়েছে। এখানে একটি তথ্য রয়েছে যে, যদি কোন ব্যক্তিকে অন্য কেউ কামড় দেয় তবে সেই ক্ষতস্থানে, এমনকি অনেক বছর পরেও, নতুন করে দাঁতের আকৃতিতেই কোষ গজাবে।
এলি স্মিথের রচনার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার রসবোধ বা সেন্স অব হিউমার। তাঁর দেয়ার বাট ফর (২০১১) উপন্যাসে মাইল্স নামে এক ব্যক্তিকে হাজির করা হয়েছে। চরিত্রটি শেক্সপীয়রের নাটকের fool বা ভাঁড়ের চরিত্রের মতো। শেক্সপীয়রের ভাঁড়েরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, জীবন-দর্শন সম্পন্ন। এরা মানুষের অহমিকার বেলুনে খোঁচা দেয়, ফুটো করে দেয়। জীবনের নানান অসঙ্গতির প্রতি গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করে। শুধু তাই নয়, এরা মানুষের আপাত সত্যগুলোর প্রতি বড় বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। যাই হোক,আলি স্মিথের উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায়, লন্ডনের এক স্থানে একটি ডিনার পার্টি চলছে। সেখানে অতিথিদের বসার ঘরে মাইল্স নিজেকে জমিয়ে রেখেছে। উপন্যাসের বেশিরভাগ ঘটনা পাঠক ব্রুক নামের এক অর্বাচীন বালকের চোখ দিয়ে দেখে। ব্রুক স্ট্রিম অব কনশাসনেস কৌশল ব্যবহার করে পাঠককে নিয়ে যায় জীবনের নানান অলিগলিতে। এ ভ্রমণে কৌতুক আছে, হেঁয়ালি আছে, চাঞ্চল্যও রয়েছে। এক ধরনের শিশুসূলভ বাৎসল্য ঘটনার বর্ণনায় ধরা পড়ে এবং এটি গাম্ভীর্য ও তারল্যকে এক পাত্রে ঢেলে ছেনে নতুন এক বয়ান নির্মাণ করে। ঠিক একই ব্যাপার অংকিত হয়েছে তাঁর গ্লিফ নামক উপন্যাসেও। অর্থ অণ্বে¦ষণে মানুষ যখন হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায় এখানে-ওখানে, তখন শেষে এসে গিয়ে সে দেখে যে, অর্থহীনতাই জীবনের অর্থ। এ এক উদ্ভট পরিস্থিতি। আশা-নিরাশার দোলাচল তার জীবনে এক বিমূর্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এই অবস্থা থেকে তার পালানোর কোন পথ নেই। সে ভাবে, সে বেঁচে আছে কারণ, সে এখনও মারা যায় নি। তাই সে বেঁচে আছে। এই বেঁচে থাকা আসলে বাঁচা নয়, বরং ফাঁদে পড়ে থাকা, শ্বাসরূদ্ধকর ভাবে আটকে থাকা। এভাবে আরী স্মিথ তাঁর রচনায় মূলত এক আমাদের গতানুগতিক ধারণার বাইরের একটি জগৎ নির্মাণ করেছেন।
তাঁর বেক্সিট উপন্যাসগুলোতেও পাঠক নিরস বাস্তবতার এক দুঃস্বপ্নের পৃথিবী আবিষ্কার করেন। গ্লিফ উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় দু’টি শিশু একটি জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হোটেলে ওদের মা কাজ করেন। ওখানে লেইফ নামক এক লোক আসেন। তিনি শিশু দুটিকে ঐ স্থান থেকে বের করে দেন। ওখানে মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা লাগানো আছে। তাই লোকটি বেশি কথা বললেন না, ধরা পড়ে যাবেন- এই ভয়ে। এই যে সার্ভিলেন্স বা মনিটরিং, তা কি মানুষকে, মানুষের সমাজকে পর্যাপ্ত পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ করতে বা বদলে দিতে পারছে? বাহিরটা হয়ত কিছুটা বদলাচ্ছে, কিন্তু ভেতরটা একদম বদলাচ্ছে না। আইন আছে, শাস্তি আছে- সবই আছে। কিন্তু অপরাধ তো ঘটছেই নানান স্থানে নানান আকারে। মিশেল ফুকোর প্যানোপটিসিজমের ধারণাও এই পর্যবেক্ষণের ব্যাপারটিই ব্যাখ্যা করে। ফুকো মনে করেন, এটি মানুষকে সুশৃংখল, ক্ষমতাকাঠামোর প্রতি অনুগত ও নিয়ন্ত্রণ করে। এটি জর্জ অরওয়েলের নাইনটিন এইটি ফোর উপন্যাসের সেই বিখ্যাত উক্তি “বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ” অর্থাৎ “বড়ভাই আপনাকে চোখে চোখে রেখেছেন”। সমাজের এইসব বড়ভাইয়েরা কাউকেই বিশ্বাস করে না। নিজেদেরকেউ না। এদের নিজেদেরও পরিমিতিবোধ নেই। এরা ক্ষমতা চায়, অর্থ চায়, প্রতাপ চায়। কিন্তু কতটুকু চায় এবং কোথায় গিয়ে থামবে, তা এরা জানে না। ভীতি ও সন্দেহের মধ্যেই এদের বসবাস। এরা সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে। সবখানে। বলে, সবার নিরাপত্তা বিধান করাই এদের উদ্দেশ্য। কিন্তু এই বয়ানের একটি প্রতিবয়ানও রয়েছে। আসলে এরা কাউকেই বিশ্বাস করে না। নার্ভাসনেসে ভোগে। তাই সবাইকে চোখে চোখে রাখতে চায়। কাজেই সিসি ক্যামেরা আছে বলে যে কেউ আক্রান্ত হবে না, তা নয়। ক্ষমতাকাঠামোই ঠিক করে কে কখন কতটা নিরাপদে থাকবে।আলি স্মিথের গিøফ উপন্যাসের বয়ান বিশ্লেষণ করণে এমনই সব তিক্ত সত্যের প্রপঞ্চ কৌতুহলী পাঠকের সামনে এসে পড়ে।
শুধু তাই নয়, এলি স্মিথ অত্যন্ত সময়-সংবেদী সাহিত্যিক। তাঁর চারটি ঋতুভিত্তিক উপন্যাসে তিনি সময়ের নাড়ি টিপে দেখেছেন। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অটাম নামক উপন্যাস। ২০১৭ সালের ম্যান বুকার পুরষ্কারের জন্য এটি দীর্ঘ তালিকাভূক্ত হয়। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মেমবারশীপ রেফারেন্ডাম এর ঠিক পরেই এই উপন্যাসটি রচিত হয়। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস উইন্টার। উপন্যাসে প্রেমের গল্প আছে, কিন্তু এখানে সম্পর্কের টানাপোড়েন এক পরাবাস্তব পরিস্থিতির চূড়ায় পৌঁছে। আবার পরিচয় সংকটও এ উপন্যাসের আখ্যানে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে অংকিত হয়েছে। ক্রিসমাস অনুষ্ঠানে একটি পরিবারের সদস্যরা কর্নওয়ালের বিশাল এক বাড়িতে সমবেত হয়। আর্ট নামের যুবক লাক্স নামের এক মেয়েকে টাকা দেয় যেন সে তার প্রেমিকা শার্লটের অভিনয় করে। আর্টেও মা মনে করেন, লাক্সই শার্লট। কিন্তু লাক্স শার্লটের জায়গায় অভিনয় করতে গিয়ে আত্মপরিচয় সংকটের মুখোমুখি হয়। এই সংকট শুধু লাক্স নয়, আর্ট, তার বোন আইরিস ও তাদেও মা সোফিয়ারও। উপন্যাসের গভীওে প্রবাহিত হয় সমসাময়িক উদ্বিগ্নতা, হতাশা ও অস্থিরতা। ঠিক এমনই বিয়য় তাঁর সিজনাল সিরিজ উপন্যাস চতুষ্টয়ের তৃতীয় উপন্যাস স্প্রিং- এও ধ্বনিত হয়। উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেফারেন্ডামের পর যুক্তরাজ্যে যে অস্থিরতার উদ্রেক হয়, সেটির প্রতিফলন ঘটেছে এই উপন্যাসে। উপন্যাসটিতে দুটি বয়ান বা ন্যারেটিভ পাশাপাশি চলে। একটিতে রিচার্ড নামের এক জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তাঁর এক ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যুতে গভীর বেদনার আখ্যান হাজির করেন। কোন গন্তব্যের কথা মাথায় না রেখে সে স্কটল্যান্ডে একটি ট্রেনে চাপেন। তিনি তাঁর মানসিক যাতনা থেকে মুক্তি পেতে চান। উপন্যাসের অপর বয়ানে ব্রিট নামের এক নারীকে দেখা যায় যিনি একটি ডিটেনশন সেন্টারে কাজ করেন। সেখানে ফ্লোরেন্স নামের একজন অভিবাসী মেয়ের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। এরাও ট্রেনে চাপেন। ঘটনাক্রমে কিংগুসি স্টেশনে এদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়।আলি স্মিথের উপন্যাস চতুষ্টয়ের সর্বশেষ উপন্যাসটি হলো সামার। প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। এর চরিত্রগলোও গভীর সংকটে আচ্ছন্ন। সাকা এবং রবার্ট দুই ভাই। সাকা জানে, তার ভাই সংকটে আছে। রবার্টও জানে, সাকা সংকটে আছে। এদের মা-বাবাও গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। তবে চ‚ড়ান্ত সংকট এখনও এদের ধরে ফেলেনি। শীঘ্রই ধরে ফেলবে।
যাই হোক, এই যে সংকট, এটি বর্তমান সময়ের বৈশ্বিক বাস্তবতা।আলি স্মিথ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এই বাস্তবতাকে তাঁর সব রচনার ক্যানভাসে নিয়ে এসেছেন্ তিনি একজন জাত শিল্পী এবং শিল্পী যখন শিল্পের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান, ঠিক তখনই তাঁর ক্যানভাস থেকে তাঁর সময়ের প্রকৃত রূপ, রং নিঃসৃত হয়। শিল্পী আসলে নিজেই তাঁর শিল্পের ক্যানভাস, আর এই ক্যাভাসে সময়ের খাঁজে খাঁজে লুক্কায়িত ইতিহাস লেখা হয়। এই ইতিহাস লুক্কায়িত এজন্য যে, এটি বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে যায়। বুর্জোয়া ক্ষমতাকাঠামো তার সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করতে নিজের মতো করে ইতিহাসের একটি ভার্সন নির্মাণ করে। উল্লেখ্য যে, সময়ের কাঁধে ভর দিয়ে যেসব ঘটনা ঘটে চলে তার সরল বর্ণনা ইতিহাস নয়; বরং ক্ষমতাকাঠামো যে বয়ান নির্মাণ করে সেটিই ইতিহাস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। কারণ অবশ্য সবার জানা। এই যে স্বীকৃতির কথা বলা হলো সেটির সব যন্ত্র এই ক্ষমতাকাঠামোর হাতেই থাকে। তবে প্রকৃত শিল্পীর কাজ এই ক্ষমতাকাঠামোর দুরভিসন্ধির মুখোশ উন্মোচন এবং প্রকৃত ঘটনাপঞ্জি পাঠকের সামনে আনা। এ কাজ এলি স্মিথ করে চলেছেন বলেই তাঁর সাহিত্যকর্মে সময়ের সত্যভাষণ শোনা যায়। ২০১৪ সালে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় তাতে শতকরা ৫৫.৩ ভাগ নাগরিক ‘না’ ভোট দেন। ৪৪.৭ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। ফলে, স্কটল্যান্ড আর স্বাধীন হলো না। এখনও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রয়ে গেছে। এই যে শতকরা ৪৪.৭ ভাগ মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিলেন, ইতিহাসে তাঁদের কন্ঠস্বরের জায়গা কোথায়? এটি একটি বড় প্রশ্ন। ভোটাভুটি করে দেশ ভাগ করা যায়, ভ‚গোল আলাদা করা যায়; কিন্তু মানুষ, মানুষের বোধ, সত্তাকে কি খÐিত করা যায়? যদি করা হয়, তাহলে পরিণতিতে কী হবে? এটি আরো বড় প্রশ্ন। এই যে খÐায়নের রাজনীতি, তা মানুষকে কি সত্যিকার অর্থেই প্রগতি, উন্নতির দিকে নিয়ে যায়? শুধুই ইটপাথরের ইমারত বা অবকাঠামো যদি উন্নতির ডিসকোর্স হয়, তবে সেই উন্নতি মানুষকে উদ্বিগ্নতা, অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে, দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিপর্যয় হোক, বেক্সিট হোক, আর কোভিড ১৯-এর মতো অতিমারী বা প্রকৃতিক দুর্যোগ হোক, সেটিকে জয় করতে যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি, সেটি হলো মানবিকতা, মনুষ্যত্ব। গোলোকায়নের যুগে ‘বর্ডারলেস মার্কেট’-এর অজুহাতে মানবিক গুণাবলীর পণ্যায়নকরণ মানুষের অস্তিত্বের জন্যই বিপর্যয়কর।আলি স্মিথ এই ইতিহাস, মানুষ ও মনুষ্যত্বের পণ্যায়ণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সত্য ভাষণ উচ্চারণ করেন। একজন সত্যভাষী, সময়সংবেদি শিল্পী ও সাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে মূল্যায়ন করতে গেলে বেন ওকরির সাহসী উচ্চারণ যথার্থ বলে প্রতীয়মান হয়। ওকরি তাঁর দ্য ম্যাজিক ল্যাম্প : ড্রিমস অব আওয়ার এজ গ্রন্থের ভ‚মিকায় শিল্পী-সাহিত্যিকের স্বরূপ উদঘাটন করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, “[ But] artist and writer alike are prisms of the eternal and the contingent, the infinite and political, myth as it is interpreted and history as it is lived.”এলি স্মিথের সাহিত্য পঠনে মনে হয়, তিনি নন, বরং সময় তার মধ্য দিয়ে নিজের বয়ান রচনা করে চলেছে।


0 মন্তব্যসমূহ