শিঙি মাছে হরিমতি আলগোছে খাবলা খানেক নুন ছিটায়। বিষকাঁটাগুলো চুপসে ধুরন্ধর জিওল মাছগুলো মিইয়ে পড়ে থাকে। টোস খাওয়া ড্যাগের ভিতর খলবলানি শেষ। মাটির ঢাকুন দিয়ে ডেকচির মুখ বন্ধ করে হরিমতি। খানিক বাদে দাওয়ায় রসে ফোলা পা টা রাখে ‘বাপরে বেল্ তো ম্যালা হইলো।’
এহনই রামকুমার, বিশু ঘরে ফিরবে। পাত পেতে বসবে। ওরা সব বড়বাবার ধানখেতে বিছন ছিটায়ে হয়রান হয়ে আসতেছে। ননদিনী কৃষ্ণপ্রিয়া বড়মায়ের নকশি কাঁথায় ময়ূরের ল্যানজায় সোনামুখি সুঁই ফুটায়। মনে হয় ধ্যানে বসছে।
তড়িঘড়ি পানের বাটার তলানি থেকে দুইটা পান সাজায় হরিমতি। হাকিমপুরী জর্দা, কাঁচা সুপারি ভরে গাল ফোলায়। একলাই কথা কয়, ‘কি গো জিওল কাঁটা। হইছে নি? তোমার দশা ঠান্ডা!’ গাদা খানিক ছাই মাখামাখি। শিঙিগুলান মরনের কাল। কাটাকুটি শেষ। পাটায় ঘষে সাদা করা লাগবে এবার। বিরাট ঝামেলা।
একবার শিঙির বিষকাঁটা আঙুলে ফুটে কী হাল! দুই সপ্তা দিনরাত কোঁকানি, গায়ে নামলো থরথরানি জ্বর। রানধা বাড়া প্রায় বন্ধ। দেবোত্তরের কাশেম কম্পাউন্ডারে পোষালো না। রামকুমার স্ত্রীকে খগেনের রিকশায় চড়িয়ে আটঘরিয়া নিয়ে গেল। আসির উদ্দিন মোল্লা। এমবিবিএসের সুঁই আর জম্মের তিতা বড়ি গিলে সে যাত্রা রক্ষা। বিশু মাঝে মধ্যে বড়বাবার ধান খেত হাতড়ে শিঙি ধরে। বড়বাবাকে খলুই শুদ্ধ দেখাতে যায় বিশু। দয়ার শরীর বড়কর্তা আধাআধি বিশুর খলুইয়ে ভরে দেন।
কার্তিকের হিমেল বাতাস। বিশুর পিসিমণি কমলা রঙের রংজ্বলা চাদরের উপর কুন্ডলি পাকিয়ে পড়ে আছে। খানিকটা যেন নুন মাখা শিঙি মাছ। কোন বোধ শক্তি আছে বলে মালুম হয় না। কেমন বেকে বেকে শক্ত হয়ে যাচ্ছে!
কৃষ্ণপ্রিয়া দেবোত্তরের সবার চোখের মণি। কত বিদ্যা বুদ্ধি তার। মুখের হাসির নড়চড় নাই। দাদাবৌদির সংসারে এসে সর্বদাই নিজেকে ঋণী ঠাওরায়। এটা তার একরকমের ভ্রম! দাদাবৌদি ভাইপো তাকে ভালোবাসে। কোন ফাঁক রাখে নাই। বিশুর কত না গর্ব! সে পিসির গর্বে সিনা টানটান করে হাঁটে। পিসিমণি ধাত্রীবিদ্যার শিক্ষা নিয়েছেন কিছু। কবরেজি জানেন। খনার বচন তার ঠোঁটের ডগায়। বিশু কিছু কিছু মুখস্হ করেছে। ‘আগে খায় মায়ে/ তবে পায় পোয়ে।’ ‘কোল পাতলা ডাগর গুছি/ লক্ষ্ণী বলে ঐখানে আছি।’ ‘যদি বর্ষে পুষে/কড়ি হয় তুষে।’...
প্রাইমারি বৃত্তি পাওয়া পিসিমণি তার। মায় কয়, পিসি নাকি জন্মদুঃখী। মায় কী কয়! বিশু বত্রিশ পাটি বের করে হাসে! মাত্র ষোল বচ্ছর বয়স তার। নারীর অর্ন্তজ্বালা বোঝার ক্ষমতা তার নাই। পিসিমণির এত্ত গুণ, হাতযশ! মহল্লা, এ পাড়া ও পাড়া সব মানুষ তারে ভালোবাসে। তার আবার কিসের দুঃখ!
দেবোত্তরের গরীবগুবরা মানুষগুলা তার পিসিমণিকে আসতে যেতে গড় হয়ে প্রণাম করতে চায়। সে কী এমনি! পিসি তাদের দুহাতে জাপটে ধরে। ‘এত ভক্তি কিসের জন্যি দাদা দিদিমণিরা? আমি তো একটা বাবলার কাঁটা গো।’ ওরা দুই হাত কানে আঙুল দেয়। কৃষ্ণপ্রিয়ার বিয়ে হয়েছিল সম্পন্ন গেরস্থ ঘরে। ময়রা বাড়ির পুত্রধন বিজয় দাসের সঙ্গে। কণের বয়স তেরো বছর দুই মাস। বরের বয়স তার আড়াইগুণ বাড়তি।
তবু হারাধন দাস কন্যা সম্প্রদান করে খানিক আশ্বস্ত হয়েছিলেন। ওদিকে মা সুরবালার মুখ আন্ধার। এমন গুণবতী কন্যা তার। রংটা একটু চাপা। এইযা। নাক নকশা রাজরানির মতো। ভ্রু দুইটা উড়াল পানকৌড়ির ডানা। ঝকঝকে চোখ দুটো কাজলাদিঘীর নেশা। পালা পার্বনে উঠোন জুড়ে আলপনা আঁকে। চালের গুড়ি দিয়ে ছোট ছোট আঙুল ঘুরিয়ে কল্কা আঁকে। ফুল-লতার বাহারি ঢেউ। পাক্কা শিল্পী স্বভাব।
বছর ঘুরতে না ঘুরতে বিজয় দাস চোলাই মদের বিষক্রিয়ায় ভবলীলা সাঙ্গ করলো। একাদশ দিনে শ্রাদ্ধ শান্তি হলো। পাড়া পড়শি ও আত্মীয়স্বজন সমাবেশ হলো। অন্নজল দান চললো দিনভর। ননদিনী তিন সন্তান নিয়ে এসে কৃষ্ণার শোবার ঘরের পালঙ্কে পা তুলে বসলো। নিজ হাতে ‘বিধি’ মোতাবেক কৃষ্ণার লম্বা কালো চুলের গোছা ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে কেটে দিয়ে মহা দায় সারলো। এক বেলা নিরামিষ। সাদা থান জড়াতে হলো শরীরে। যে স্বামীর সঙ্গে এক বেলা মন খুশি করে কথা বলতে পারে নি, সেই পতি দেবতার জন্যে বিধি ব্যবস্থা। অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। ননদিনী মঞ্জুরি দাস কৃষ্ণার আঁচল থেকে চাবির গোছা খুলে নিজের আঁচলে পোক্ত গেড়ো দিল।
পৌষের দুধসর কুয়াশা মাথায় নিয়ে হেঁটে চলেছে কৃষ্ণপ্রিয়া। শিয়াল কাঁটা মাড়িয়ে। চৌদ্দ বছরের বিধবা। নাড়িপোতা গাঁ দেবোত্তরের উদ্দেশ্যে। পাখ-পাখালির কলকাকলির মিঠে সুরে অচিন মন্ত্রগুপ্তি। কিশোরী মুক্তবিহঙ্গ। ভেসে ভেসে ভিটার চৌকাঠে ভারাক্রান্ত দেহলতা লুটিয়ে দিল। বৌদি সবার আগে কৃষ্ণাকে জাপটে ধরে বুকে টেনে নিল। সেই থেকে কৃষ্ণা রামকুমার হরিমতির সংসারের লক্ষী প্রতিমা। সে নিরামিষ খায় বটে তবে পিঁয়াজ, রসুন, মসুরের ডাল খেতে বাধ্য হয়। সাদা থান ছাড়তে হয়েছে! কৃষ্ণা এখন এ গাঁয়ের পূণ্যের প্রাপ্তি। কৃষ্ণারও যেন এ জীবনে আর কোন আসক্তি নেই। আসক্তি শুধু স্নেহ ভালোবাসার। দাদার এ দরিদ্র গৃহ তো সেই স্নেহসুধার রাজবাড়ি। বড়বাবা রামকুমারকে একান্তে শলা দেন, ‘রাম রে কচি বোনটার আবার বিয়ে দে। বিদ্যাসাগর মহাশয় তো সে ব্যবস্থাা চালু করেই গেছেন’। রাম মাথা নত করে থাকে। সে জানে বোনটি আর ও পথে হাঁটবে না।
বড়বাবার দান করা জমিনের সাথে পৈতৃক ভিটে বাড়ি যুক্ত করে রামকুমারের ঘরদোর বেশ সুন্দর। ঝোপভরা হাসনাহেনা, কামিনী আর পূজার জন্যে ঝুমকো জবা, মরিচ জবা থরে থরে ফুটে থাকে। উঠোনটা এমনই, সূঁচ পরলেও খুঁজে পাওয়া যায়। সুপারি গাছের অভাব নেই। আর আছে বারোমাসি আম। জাম, জাম্বুরা, লটকন।
দুখে সুখে কেটে গেল এক যুগ কিংবা তার কিছু বেশি। কৃষ্ণাপ্রিয়া দাদার বৌদির অন্ন বস্ত্রে জীবন কাটাচ্ছে! এ কথা কেন যে ভাবে কৃষ্ণা! ভাবে এতো ঋণ! কৃষ্ণা কত কাজ জানে। কিছু কিছু পয়সা কড়ি হাতে আসে।
ধুতিখান দিতে গেলে চোখের জল ফেলেন দাদা। কৃষ্ণা বিশুকে নতুন ধুতি চটিজোড়া কিনে দিয়েছে। বৌদিকে এক খানা টাঙ্গাইল নীলরঙা শাড়ি দিয়েছে। বৌদিও কপট রাগে হৈ হৈ করে ওঠে। লক্ষ্ণী পূজার আয়োজনে রামকুমারের টিনের ঘর ঝমঝম করে। সেদিন আকাশে ছিল কোজাগরী পুর্ণিমার নিদারুন ঢল। লক্ষ্ণী পূজার আয়োজনে রামকুমারের টিনের ঘর ঝমঝম করে। ধুপ ধুনো মন্ত্রপাঠ, পায়েস। নারকেলের তক্তি।
দিন কয় হলো আজব কাহিনি শোনা যায় দূর দূরান্তে। ক্রমে সব ভয়াবহ বার্তা কপালে ঠেকলো। রাজাকার, আলশামস, কত না চেনা মুখ এই গাঁয়ে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এই মাতৃভূমিতে থাবা বসায়েছে পাকি হায়নার দল। বাঙ্গালি হিন্দু মুসলমান সবাই শত্রুপক্ষ। কেবল ওদের চ্যালা রাজাকারেরা দুশমন নয়, দোস্ত। জানি দোস্ত। সনাতন ধর্মীদের বাগে পাওয়া মাত্র ঝাঁঝরা! এই তো গত শনিবার। রাতবিরাতে খগেন কাকার বাড়ি মাস্তান রাজাকার ঝন্টু, তোতলা মোনাব্বর আগুন দিল। চালার গোছা গোছা ছন ধুপ ধুপ করে খসে পড়ল। কালা অঙ্গার। গোয়ালের দুধেল কালা গাইটাও পুড়ে অঙ্গার। দাউ দাউ আগুনের ফুলকি। এরই মধ্যে চিটকা তোতা কাসার বদনা, পানদান পিতলের, কষ্টিপাথরের রাধাকৃষ্ণ মূর্তি এমন কি হামান দিস্তাটাও লুট করে নিয়ে গেল। খগেন কাকা শেষরাতে বর্ডারে নিরুদ্দেশ। সোমত্ত দুই মেয়ে জবা, কুসুম, কাকিমা চিররুগ্ন সুখলতাকে নিয়ে। বিরান পোড়া বাড়িটায় তখনও তুলসিতলায় একটা মিটমিটে মাটির প্রদীপ খামোখা জ্বলছিল। তাই দেখে কৃষ্ণপ্রিয়া ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে। ‘ভগবান গো, তুমি কী কিছু দেখ না। ভগবান গো…’ তড়িঘড়ি হরিমতি কৃষ্ণার মুখ চেপে ধরে। ‘চুপ যা পোড়াকপালী। চুপ’...
পাবনা সদর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটারের দূরত্ব দেবোত্তরের! কাল রাত ২৫ মার্চ যে আগুন, বারুদের পোড়া গন্ধ বাংলার বাতাস তপ্ত ফানাফানা করল, সেই আগুন জ্বলল নয় মাস। গভীর রাতে পাকি হায়েনা তান্ডব চালাল আরো কাছে। তিন কিলোমিটার দূরত্বে টেবুনিয়া হাটে। ছোট বড় দোকানপাট গোডাউন পুড়িয়ে ছাই ভষ্ম করে দিল। কতো তাজা প্রাণ মুহূর্তে শহীদ হলো। হাটের ধুলাবালি ভিজে গেল লাল রক্তের পিচকারিতে।আগুনের ফুলকি জোনাক পোকার মতো উড়ে আসে। জন মানুষের দূরাগত ক্রন্দণ, পাখ-পাখালির ডানা ছাপটানি, বাঁশঝাড় ফেটে যায় গুলির আচানক আঘাতে। কৌরব নরক বাস!
এই ভষ্মরাশির মধ্যেও কৃষ্ণা বড়মার দীঘল নকশি কাঁথায় ফুল, পাখি জাঁতি আঁকে। বড়মার ফরমাস। কথা দিয়েছে-জবান ঠিক রাখতে হবেই। অন্যমনে কৃষ্ণা কিছু স্বপ্নও এঁকেছিল সোনামুখী সূঁইয়ের ফোঁড়ে। সে যেন কবেকার দিবাস্বপ্ন! বড়বাবার বর্গাচাষী রামকুমার। বটবৃক্ষের ছায়ার মতো আগলে রেখেছেন হরিমতির ঘর গেরস্তি। ভালো মন্দ। মানুষটা যেমন সাক্ষাৎ দেবতা।
বিল্লাল প্রামাণিকের মাস্তান পুত্র কিসলু বিশুর থলে ভরা সদাই পাতির দিকে নজর করে খ্যাক খ্যাক করে হাসে,
‘ওই মালাউনের বাচ্চা মালাউন। এহনো বুক চিতায়া বাজার হাট কচ্ছিস ইখানে। কাল যদি একবার দেখবার পাই তো জানে মাইরা ফেলবোনে। বহুতই দালালি করছিস এ্যাদ্দিন। তোর জমিদার বড় বাপের। এইবার হুঁসিয়ার হেঁদুর ছাও। ইবার তোর জমিদার কুথায় যায় দেখবানে। হেই বড়বাপের ভুঁড়িডা দো-ফাট্টা হইলো বইল্যা।’ চিটকা তোতা কল্লা নাচায়, ‘তোগেরে দেখলি পারে ঘিন্না লাগে। কাছামারা বেজিডা। কাছাডা একটান টান মারলে সাড়ে সব্বোনাশ। চক্ষুর সামনে থেক্যা দুর হ কলাম-সুমুন্দির পুত’। ওরা জটলা পাকায় প্রেতের মতো হাসে। বাতাস সরগরম। বিশুরে কালা বোবা ধরছে বুঝি। কথা কয় না।
ও বড়বাবার দহলিজে ছুটতে থাকে। পা জোড়া কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। বিল্লাল প্রামাণিক থানাওয়ালাদের সাথে জোট বেঁধে শান্তি কমিটি করেছে। শয়তানের আঠি বিল্লাল ‘ঘাতক’ কমিটির সভাপতি!
বড়বাবা সৈয়দ নাসির সাহেব আদ্যোপান্ত শুনলেন!
বড়বাবা মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলেন পাকঘরের সাথে একটা ঘর আছে। ওখানেই বিশুরা থাকবে। নিরাপদ আস্তানা!
সকাল সকাল বড়বাবা বিল্লালকে ডেকে পাঠান। ‘বিষয় কী বিল্লাল? কয়ডা কথা কানে আসলো’ চতুর শৃগাল বুঝে গেছে ব্যাপারখান! হাত কচলে বিনয়ের অবতার হয়ে বলে উঠল, ‘বড়হুজুর আপনি আমাগের মাথার মুকুটখান। বিপদে আপদে কি না করছেন। ঐখানে চাঁন তারা মসজিদ খান আপনের দানের জমিডার উপরে। রমজানে খতম তারাবী হয়। হাজার মুসুল্লি জুম্মাবারে সিজদায় পইরা থাকে। আল্লাহপাক আপনেরে আরশ থাইক্যা দেখভাল করতাছে। আপনার এলাকায় একখান কাকপক্ষিও যাবে নানে হুজুর। রাতভর কমিটির ভাই বেরাদার পাহারা দেবানে। চিন্তার কোনই কারণ নাইক্যা বড় হুজুর।’
২৬ মার্চ পাবনা শহরে তান্ডব। ডিসি নুরুল কাদের খান পুলিশ লাইনে ছাত্র শিক্ষক আমজনতা নিয়ে সভা করেছেন। হাতে হাতে কিছু অস্ত্র দিয়েছেন।
প্রতিদিন অটোমেটিক রাইফেলের ট্যা ট্যা আওয়াজে বড়বাবার কানও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সৈয়দ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা ডাল ভাত খেয়ে যায়। আপাদমস্তক চাদর জড়িয়ে রহস্যমূর্তি, অন্ধকারে মিশে যায়। বড়বাবার বাড়ির লজিং মাস্টার মন্টু তার মামা শান্তি কমিটির দালাল। মনের কষ্টে মন্টু নাগ-ডেমরা পালিয়ে মুখ লুকায়।
বড়বাবার নির্দেশ বিশু আর হাটবাজার করবে না। এমন কি ঘর থেকেও বেরুবে না। বড়বাবা নিজে থলি হাতে যৎসামান্য সব্জি তেলনুন কিনে আনেন। বৈঠকঘরের আরামচেয়ারে শুয়ে খানিক হাঁপান।
পিসিমণি দিনরাত পূজার ঘরে গড় দিয়ে পড়ে থাকেন। হরিমতি সন্ধ্যায় খানিক ধূপ ধুনো জ্বালায়। রামকুমার নিরুচ্চারে গীতা পাঠ করে। হারিকেন জ্বলে নিবু নিবু। চারটি প্রাণী অন্ধকারে দিন কাটায়।
সেদিনও সুবিমল প্রভাতে আবছা আলোয় ভেতর বাড়ির দীঘির ছোট ছোট ঢেউগুলো নেচে উঠতে চেয়েছিল। কৃষ্ণপ্রিয়া এক পাজা বাসি কাপড় আর এঁটো থালাবাটি নিয়ে ঘাটলায়। সতর্ক আর ভীরু ছিল তার ভ্রু পল্লব। আচমকা শৃগালের থাবা। পাঁচ প্যাচে মুখ বান্ধা। কারা তাকে তুলে নিয়ে গেল! কাসার থালা বাটি ঘাটলায় উল্টে পাল্টে ছড়িয়ে পড়ে রইল। বাসন্তী রঙের শাড়িটা শান্ত জলের ঢেউয়ে হলুদ আভা ছড়িয়ে কাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে?
অন্ধকার খাঁমচে ছিন্নভিন্ন করলে ঝরে বিন্দু বিন্দু রক্ত! গড়িয়ে যায় অন্তরের গভীর খাদে। বোধের ঘরে ঝুলে থাকে মরচে পড়া তালা।
বড়বাবা স্থির থাকতে পারেননি। ন্যুব্জ দেহভার সামলে গেছেন আটঘরিয়া আর্মি ক্যাম্পে। তাঁর বিচলিত কথাগুলো ক্যাম্প ঘরে আছাড়ি পিছাড়ি খেয়েছিল। ‘অফিসার ওরা নিরীহ মানুষ। যুগ যুগ ধরে আমার বর্গাচাষী। মেয়েটাকে ছেড়ে দিন। আমি তাকে নিতে এসেছি। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক।’
অফিসারের ক্রুর হাসি ঝোপালো গোঁফের ফাঁকে। সে খরখরে গলার স্বর যথাসম্ভব বিনম্র করার কসরত করে। ‘নাসির সাব আপ বহুত রেস্পেক্টেড আদমী আছেন। ডোন্ট ওরি। সবকুছ বিলকুল সহি হো গিয়া। ঘাবড়াও মাত সৈয়দ সাব।’
বৈঠকঘরে বসে থাকেন বড়বাবা খানিকক্ষণ। তারপর এশার নামাজ আদায় করেন। এখনি বড়মা খানার টেবিলে তলব করবেন। এখন এ বাড়িটাও থম মেরে গেছে। ইতু, টিটু মায়ের পালঙ্কে বসে দিনমান খেলা করে। কখনও অঙ্ক কষে। ঘরের বার হওয়া নিষিদ্ধ। জেল হাজতের আলামত।
সৈয়দ সাহেবেরে হাতে তসবির দানা জ্বলজ্বল করে। তার গলায় মোহাম্মদ রফি-‘ঈশ্বর আল্লাহ তেরে নাম। সবকো সম্মতি দে ভগবান। রঘুপতি রাঘব রাজারাম পতিত পাবন সীতারাম। ঈশ্বর আল্লাহ তেরে নাম.... সাব কো সম্মতি দে ভগবান!'...
সৈয়দ সাহেবের দুই চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে!
বিশুকে চেনা মুশকিল। দাড়ি গোঁফে অন্য বিশু। হরবোলা পাখিটারও জবান প্রায় বন্ধ। পায়জামা পরনে। হরিমতি স্নান সেরে কপালে সিঁদুরের সূর্য আঁকে না। সিঁথির অন্ধকারে একটু ছোঁয়ায় মাত্র। রামকুমারের গীতা পাঠে শব্দ হয় না। ফিসফিস শব্দ।
পাঁচ দিন পর রাজাকার ক্যাাম্প থেকে কৃষ্ণাপ্রিয়ার অচেতন দেহখানা ঘাটলায় পড়ে থাকতে দেখা গেল। অমাবস্যার রাত ঘন হলে পিসিমণির মৃতপ্রায় দেহখান ঘরে তুলে আনে বিশু। হরিমতির চোখদুটো কৃষ্ণার দিকে। সেবা-যত্নের বিরাম নাই। স্নান করায় সাবান ডলে। ট্রাঙ্ক খুলে পূজার তোলা শাড়ি বের করে পরায়। কৃষ্ণা কথা কয়না। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
হরিমতি ফিসফিস করে, ‘গায়ে-গতরে বেদনা তর কৃষ্ণা রে। চুলার ধারে আয় দিদি। আগুন পোহা। কালিজিরা রসুন ভর্তা বাইট্টা দিবানে।’ প্রিয়া ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। প্রিয়ার চাহনি দিগন্তে খুঁজে ফেরে ধুধু শূন্যতা!
দিন পনেরো বাদে কৃষ্ণাপ্রিয়া আত্মস্থ হয়। কি যেন খুঁজে বেড়ায়? কি যেন খুঁজে পায় সংসারের কাজে। পূজার ঘরে গড় হয়ে প্রণাম করে মা কালির চরণে। মন্ত্র জপে। তবুও বাক বন্ধ, কথা বলে না। কথার ফুলঝুরি ছিল এই কৃষ্ণার ঠোঁটে!
চারদিকে সুসংবাদ বাতাসে ভাসে। মুক্তিসেনারা ঘায়েল করেছে পাকি হায়নাদের! যত রাজাকার-আলবদর গা ঢাকা দিচ্ছে। ডিসেম্বরের পয়লা। এতদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বড়বাবা ভয় ভয় করে শুনতেন। এখন আর ভয়নেই। বডবাবা বিশুকে আশ্বাস দেন,‘দেশ স্বাধীন হইবে রে বিশু। কৃষ্ণারে আমি বড় ডাক্তার দেখাবো। কৃষ্ণা পুরোপুরি ভালো হয়া যাবেরে দেখিস তুই।'
বড়বাবার বাড়ির চারপাশে কত যুগ-যুগান্তরের রানীপছন্দ আমগাছ, জাম, জামরুল, কদবেল, আর গুবাক তরুর সারি। পাখপাখালির আড্ডাখানা। বাদুড় হুতোম প্যাঁচার ঘর-সংসার।
সেদিন ঘোর অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। রাত তখন শেষভাগে। গাছগাছালি ভরা বড়বাবার বনেদি বাড়িটা ঘুমে ঢলে পড়েছে। পাখপাখালি ঘন রাতের খবর রাখে না। বেকুব।
আচমকা বিশুর দিগন্তব্যাপী হাহাকার। হরিমতি রামকুমারের বিলাপ! উঠোনটা কাঁপছে। বড়বাবা তাহাজ্জুদ শেষ করেছেন মাত্র।
কৃষ্ণপ্রিয়া বিশ্বাসঘাতক! সে কেন স্নেহ ভালবাসার শেকড় শুদ্ধ শ্মশানের অগ্নি আলিঙ্গন করে স্বেচ্ছায়।
ঔষধি গুণে ভরা বাবলা গাছ বাকলে তার কতগুণ। হলুদ ফুলে মিষ্টি সুবাস। ঘরের লাগোয়া প্রিয় বৃক্ষ কৃষ্ণার। গুণবান বৃক্ষের পূজারী গুণবতী। কচি পাতায় বদহজম, কফ, শ্লেষ্মা প্রদাহ দাঁতের মাড়ির যন্ত্রণায় মহৌষধ। সে বৃক্ষ কণ্টকময় কিন্তু যাদু জানে। ওই বাবলার ডালে আঁচল পেঁচিয়ে কৃষ্ণা আত্মহনন করেছে। মহাপাতকী! বাল বিধবা যুবতী সুন্দর নারী কি করল! সুন্দর নারী কি করল! গুণের নারীধন।
নগদ দানে কৃষ্ণপ্রিয়া বাংলার মাটি খরিদ করে দিয়ে গেল?বড়াবাবা বনেদি বাড়ির প্রত্ন থাম্বা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তখন দূরের মিনারে ফজরের আজান কেঁপে কেঁপে ছড়িয়ে পড়ছে।
***
লেখক পরিচিতি: দিলারা মেজবাহ। জন্ম: ২৮ আগস্ট, ১৯৫০ সালে পাবনার বিখ্যাত লোহানী পরিবারে। পিতা তাসাদ্দুক হোসেন লোহানী শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান সাহিত্যিক। মা বেগম বদরুননেসা লোহানী। স্বামীর কর্মসূত্রে দেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থানগত কারণেও তার অভিজ্ঞতার পরিস্ফুটন ঘটে নানাভাবে। আর অনিবার্যভাবে তা তার লেখার জগৎকে করে প্রসারিত। তাই কখনো ঢাকা বেতারের টকার, স্ক্রিপ্ট রাইটার, সদালাপী ছদ্ম নামে রম্যরচনা, সাপ্তাহিক রোববারে দীর্ঘদিন 'প্রিয়দর্শিনী' নামে কলাম লিখেন তিনি। ১৯৬৫ সালে 'সবুজ পাতা'য় কবিতা প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তার লেখালেখি শুরু। বর্তমানে ছোটগল্প, নিবন্ধ, শিশুতোষ রচনায় তিনি নিরন্তরভাবে মগ্ন। পাশাপাশি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালে তাকে 'রত্নগর্ভা মা' ক্রেস্ট ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। দিলারা মেসবাহর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে রয়েছে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য মিলে ৩৮টি গ্রন্থ। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য: কবিতাগ্রন্থ, কষ্টের কাঠঠোকরা (১৯৮৬), শুকনো পাতা মানিব্যাগে (২০০), উপন্যাস : স্বপ্নলোকের চাবি (২০০০) নাগরদোলার দিন (১৯৯৩)। ছোট গল্প : পলাতকা ছায়াগুলো (১৯৯০), অন্ধকার ও অপরূপ ডানা (১৯৯৩), ভাতের গল্প (১৯৯৭), বায়োস্কোপ (২০০৫), এক জোড়া পয়মন্ত ইলিশ ( ২০২০)। শিশুসাহিত্য : কিশোর উপন্যাস- আরো ভূতের গল্প (২০০২), এক যে পিঁপড়া (২০০৫), ওপেনটি বায়োস্কোপ( ২০০৫), রিনির ভুবনখানি (২০১৪)। কিশোর গল্প : টাইগার (২০০৫), ভূত ও ভেনট্রিলোকুইজম (২০০৮), আমেরিকার গল্প ( ২০০৮), ইষ্টিকুটুম মিষ্টিকুটুম, সোনালি মাঠের গল্প (২০১৮), অভিমান (২০১৮), কিশোর সমগ্র-১, কিশোর সমগ্র-২, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক: লাল মলাটের একাত্তর (২০২০)। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি উলেস্নখযোগ্য সংকলন সম্পাদনা করেন তিনি। আশরাফ সিদ্দিকী সাহিত্য পদক, লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক, জসীমউদ্দীন স্বর্ণ পদক, নন্দিনী সাহিত্য পদকসহ ১০টির মতো বেসরকারি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন তিনি।


0 মন্তব্যসমূহ