মহবত খানের হেপাজতে ছিলেন আসফ খান ও তাঁর দুই ছেলে। সব গুছিয়ে নিয়ে জাহাঙ্গীরের প্রথম কাজ হল ওঁদেরকে ফেরান। সে অনুযায়ী আদেশ করলেন বাদশাহ। ফরমানে আবার মহবতকে সুবে বাংলার দায়িত্ব নিতেও বলা হচ্ছে।
এখনো মহবতের ওপর বাদশাহ আস্থা রাখছিলেন কারণ শাজাহান আবার থাট্টায় ঘাঁটি গেড়ে বিদ্রোহ শুরু করেছেন। নিজের গুরুত্ব বুঝলেন মহবত খান, আসফ আর তার দুই ছেলেকে ছাড়ার ব্যাপারে একটু দর কষাকষি করে সময় নষ্ট করলেন উদ্দেশ্য নূর জাহানের থেকে দূরে পালানো। সেসব অবশ্য বেশিদিন চলেনি উল্টে দাবড়ানি খেয়ে সবাইকে একে একে ছেড়ে দিয়ে তাঁর রাজপুত সেনাদের নিরাপদ আশ্রয়ে মেওয়ারের দিকে কেটে পড়েন।এরপর শাহী ফরমান অগ্রাহ্য করে সুবে বাংলার দায়িত্ব না নিয়েবা থাট্টায় শাজাহানের বিরুদ্ধে লড়তে না গিয়ে উল্টে শাহাজাদার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে দেখা যাবে তাঁকে।
অপহরণজনিত সংকটের অবসানে, ষোলোশো ছাব্বিশের আঠেরোই অক্টোবর জাহাঙ্গীর আর নূর জাহান বিশাল বাহিনী নিয়ে লাহোরে ঢুকছেন। কেল্লা অবধি পুরো রাস্তায় আমির ওমরাহ , রাজা উজিরদের কাতার দাঁড়িয়ে গেল। পেল্লায় হাতির দল সোনা চাঁদির বৈভব ছড়িয়ে আসছে, পেছনের কোনের দিকগুলোয় আম আদমি যেন ঈশ্বর দর্শনের আশ্চর্য আনন্দ পেল। সেই উচ্ছাসে ভয়রাও মিশে ছিল। কোন রূপে সত্যি ঈশ্বরের মূর্তিটা জ্যান্ত হয়ে নাড়াচড়া করতে থাকলে এমন প্যানিক লেগে যেতে পারে। তবে হাতির পিঠে আরামদায়ক হায়াদায় চেপেও কেউ কেউ ভয় পায় আর তারা হল দুই বিশেষ রূপে বন্দী শাহাজাদা - দারা শুকোহ আর ঔরঙ্গজেব, দুই শিশু।কোথায় আনগা -ধাত্রীমা ? আম্মি কোথায় ? আব্বুজান ? আর কোথায় তাঁরা ? এখন কোথায় রয়েছেন ? কোথায় যুদ্ধ করছে আব্বুজানের ফৌজ ? বেঁচে আছে তো ?মরে যায়নি তো? শাহী ক্ষমতার পাঁয়তাড়ায় শিশুর অবস্থান নিয়ে ইতিহাস কি লিপিবদ্ধ করেছে , করেছে কি কিছু ?
ভ্রাম্যমান মোঘল বাদশাহদের ছেলেপুলেদের দীর্ঘ যাত্রাপথের দুর্যোগটা ছিল জলভাত। পালকির মধ্যে গুটিসুটি মেরে বা হাতির পিঠে দিনের পর দিন এখন থেকে সেখান ছোটদের ভালো লাগার কথা কি ? তবু আত্মীয় পরিজনের কাছে থাকায় তারা সামলে ওঠার চেষ্টা করত। এর থেকেই বোঝা যায় শাজাহানের জামিনদার হয়ে মা-বাপ ছাড়া দুই শিশু দারা আর ঔরঙ্গজেবের কি দশা হয়েছিল। বিদ্রোহী শাহাজাদাদের অনবরত পালানোর দৌড়ে চরম অনিশ্চেয়তার মধ্যে পড়ে শিশুদের হালত হতো অবর্ণনীয়। ষোলোশো বাইশ থেকে সাতাশ এই বছর পাঁচেকের বিদ্রোহে শাজাহানের ছেলেপুলেদেরও জীবন অতিষ্ট হয়। প্রতিটা সংঘর্ষের আগে বেগম আর জেনানার অন্য মহিলাদের সঙ্গে শিশুদেরও নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে দিতেন শাজাহান। কখনো বুরহানপুর , কখনো মান্ডু , কখনো আসিরগড় , কখনো ঢাকা , কখনো রোহতাস, কখনো নাসিক এই সব জায়গার জানা অজানা নানান কেল্লার আশ্রয়ে অথবা তাঁবুতে তাঁবুতে তাঁদের কাটাতে হচ্ছিল। সঙ্গে যেত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একদল সেপাই লস্কর , ধাত্রী মাতারা , ঝি চাকর , রাঁধুনি খানসামা , ,অপরলিঙ্গের পাহারাদাররা। বিদ্রোহের সময়ে মুমতাজ ছাড়া অন্য দুই বেগমকেও শাজাহানের সঙ্গে পালিয়ে বেড়াতে হয় । সম্পূর্ণ পর্দানশীন অবস্থায় বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের হালহকিকত জানতে তাঁদের একটা খবর আদানপ্রদানের নেটওয়ার্কও তৈরী রাখতে হতো।
মহবত খানকে বাগে এনে জাহাঙ্গীর আর নূর জাহান যখন লাহোরের পথে, শাজাহানের বিদ্রোহী ফৌজ পৌঁছে গেল থাট্টার কাছে। ঘিরে ফেলল থাট্টা শহর। তবে এই ঘেরাও অভিযান সফল হয়নি। শাহী ফৌজ শাহাজাদার বাহিনীকে তীব্র আক্রমণ করে ছত্রভঙ্গ করে দিল। উল্টে শাজাহানের বাহিনীকে ঘিরে ফেলল জাহাঙ্গীরের সেনারা । ইরানের সাফাভিদ সম্রাটও সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন না। এই সময় গর্ভবতী মুমতাজ মহলের শিবিরের কাছেই একটা বিশাল গোলা এসে পড়ে। শাহী তরিকা ভাঙার এই দুস্কর্মের জন্য শাহাজাদা শাহরিয়ারের মহলের দায়িত্বে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সেপাইসালার শরিফ উল মুলুককে কখনো ক্ষমা করেননি শাজাহান,তখ্তে বসার আগে আদেশ দিলেন ওনার গর্দান নেওয়ার , যথারীতি গর্দানটা যায়।
তবে এবারও বাদশাহ পাকড়াও করার চেষ্টা করছেন না শাহাজাদাকে। নূর জাহান কায়দা করে ভয় দেখানোর চিঠি পাঠালেন ,''শাহী বহর আলাদা থেকে করে দিতে খুবই রেগে আছেন মহবত খান ! তাঁর যা মেজাজ রাস্তাতেই না কখন যে কী করে বসেন ! ভয় হয় বাচ্চাদের নিয়ে ! '' সে সময় মহবত খানকে ঢোঁড়াসাপ করে দেওয়া হয়েছিল তাই তার পক্ষে আক্রমণাত্বক হওয়া সম্ভব ছিল না। এসব কথা বলে শাজাহানকে শাহী তদারকে থাকা তাঁর তিন ছেলে: দারা , ঔরঙ্গজেব আর এমনকি জাহাঙ্গীরের নয়নের মনি সুজার নিরাপত্তা সম্পর্কেও চিন্তান্বিত করে তোলা হচ্ছে। নূর জাহানের আরো উদ্দেশ্য ছিল মহবত খান সম্পর্কে শাজাহানের মন বিষিয়ে দেওয়া যাতে তাঁরা দুজন কোন ভাবেই জোট বাঁধতে না পারেন, পরে অবশ্য সেটাই হয়েছিল। হাদির বর্ণনায় জানা যায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন শাজাহান। অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে মুমতাজ জন্ম দিচ্ছেন এক ছেলের নাম দেওয়া হচ্ছে লূৎফুল্লাহ -মানে আল্লাহের আশীর্বাদ। ওই ছেলে দেড় বছরে মারা গেল।
ঘটনাবহুল ওই ষোলোশো ছাব্বিশের অক্টোবরেই বুরহানপুরে অসুস্থ পারভেজ মারা গেলেন । জাহাঙ্গীরের যায় যায় অবস্থা দেখে তাঁর অবর্তমানে তখ্তের দাবিদারী দুই শাহাজাদা শাজাহান আর জামাই শাহরিয়ারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছিলেন নূর জাহান কারণ হয়ত দরবারের কারু কারু পছন্দের ছিলেন মৃত খুসরুর ছেলে দাওয়ার বক্সও । সে জন্যই হয়তো অসুস্থ শাজাহানকে যেতে দেওয়া হচ্ছে। পালকি করে রওনা দিচ্ছেন তিনি , ঘোড়ার লাগাম যে ধরবেন তার তাগত পর্যন্ত নেই । সঙ্গে যাচ্ছে সদ্যজাত শিশু সহ গোটা জেনানাই।
-----কোথায় রওনা দিলেন শাহাজাদা ?
---- কোথায় যেতে পারেন ?
----- বুরহানপুর কি ?
----- মিলল না।
----- তবে ?
----- বুরহানপুরে যাওয়া মানে পারভেজের স্থলাভিসিক্ত হওয়া। সেটা করেনি মোঘল দরবার। পথে যেতে যেতে নিজস্ব সূত্রে শাহাজাদা পারভেজের মৃত্যুর খবর পেলেন শাজাহান।
-----কিন্তু গেলেন কোথায় ?
---- ইতিহাসকার হাদি আর বিদেশি পর্যটক ভেনিসিয় মনুচ্চি দুজনই একই কথা লিখলেন।
---- কি লিখছেন তাঁরা ?
---- মালিক অম্বরের ছেলে ফতে খানের আশ্রয়ে রইলেন শাজাহান।
---- এতো আবার যেকে সেই হয়ে গেল ! তখ্তের থেকে ক্রমশ দূরেই যাচ্ছেন শাজাহান!
---- যত দূর যান ততোই তখ্ত তাঁর কাছে এসেছিল।
---- কাব্য করছ , রূপক ?
---- না। মোটেই না। একদিন ,কোন এক ভোরে বা বেলায় বা সন্ধ্যায় অথবা রাতেই হবে হয়তো .....
---- আরে কী হল বলবে তো ! খালি বা আর অথবা করলে হবে !
---- হবে না , হওয়ার কথাও না কারণ বিশাল রাজপুত ফৌজ নিয়ে সেপাইসালার মহবত খান শাহাজাদা শাজাহানের মেঠো দরবারে মাফ চাইতে এলেন, সঙ্গে প্রচুর পেশকস। দামি দামি সব উপঢৌকন থেকে আলোরা চমকে ওঠে আর. .....
---- আর কী ?
---- হিন্দুস্তানের পরবর্তী বাদশাহের নামও একরকম ঠিকই হয়ে যায় ।
ব্রিটিশ পর্যটক থমাস কোরিয়াট সেসময়ের লাহোর শহর সম্পর্কে বলেছেন ,''এর হাতা কমপক্ষে ষোলো মাইল এবং বৈভবে কনস্টান্টিনোপলকেও ছাড়িয়ে যায়। '' লাল বেলে পাথরে গাঁথা লাহোরের কেল্লা পাঞ্জাবের সমতল জমিন ফুঁড়ে দাঁড়িয়েছিল। পাশ দিয়ে বয়ে যায় পাহাড় ফাটিয়ে নেমে আসা রাভি বা পৌরাণিক ইরাবতী নদী। কেল্লার অপূর্ব বাগানে নদীর জল সিঞ্চন করলে ফুল ফুটছিল আর ফলেরা বিছিয়ে থাকারইতো কথা। লাগোয়া পঞ্চাশ বর্গ একর বিশাল মাঠে ছোট তিন শাহাজাদা দারা , ঔরঙ্গজেব আর সুজা হাতির লড়াই দেখছিল। প্রথম দুজনের কাছেই লাহোর নতুন আর সুজা তো বরাবরই জাহাঙ্গীর আর নূর জাহানের কাছে থেকে মানুষ হচ্ছে সে বেশ সচ্ছন্দ। দুই ভাইকে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখায় কেল্লার সব গলিঘুঁজি। অন্ধকার সিঁড়ির শেষে কোন রাস্তা দিয়ে গিয়ে আলোময় ঝরোখা , সে সব দেখিয়ে দেয় দুই ভাইজানকে। কোথাও হয়তো নূর জাহানের নজরদারি আছে কিন্তু সে ওদের তিনজনের মেলামেশায় ততটা নয়। এই লাহোর কেল্লারই অন্য কোণে শাহাজাদা খুসরুর ছেলে ষোলো বছরের শাহাজাদা দাওয়ার বক্স আর তাঁর ছোট ভাই গার্সাসও আছে , আরো আছে জাহাঙ্গীরের ভাইপো তাহমুরাস আর হোশাং কিন্তু এদের সঙ্গে শাজাহানের ছেলেদের একদমই মিশতে দেন না নূর জাহান। তাছাড়া তখ্তের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাওয়ার বক্সের ওপর কড়া নজর রেখেছেন শাহাজাদা শাহরিয়ার। এভাবে শাহাজাদাদের দিন কেটে যায়।
লাহোরে শীত আসে সে খবর দিয়েছিল কনকনে উত্তরের বাতাস। সে প্রতি শীতে এই বাদশাহের বাসস্থান, দার আল সালতানাত , লাহোর শহরে এসে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় কয়েক মাস। তার উপস্থিতিতে অসুস্থ বাদশাহ প্রতিরাতে কষ্ট পাচ্ছেন কি ? নাকি গেলাস কয়েক মদ খাওয়ার পর তাঁর আর হুঁশ থাকছে না। গভীর রাতে বাদশাহের স্বপ্নে কি আসছে হরিণের পাল ? কে বলতে পারবে ? তাদের মধ্যে থেকে হয়তো প্রিয় কৃষ্ণসার হরিণ মনসরাজ এগিয়ে এল শাহেনশার দিকে তার গলায় তীর বেঁধা , রক্ত পড়ছে , ভুল করে তীর ছুঁড়ে ফেলেছেন জাহাঙ্গীর। সেই তীর ঘুমের মধ্যে ছুটে যায়। হরিণের পাল থেকে আগে এসে তাঁর দিকে তাকাল মনসরাজ, তাঁর কোলে মাথা রাখছে সে তারপর মরে যায়। শীতের হওয়া সেই সব কথা স্বপ্নের মধ্যে পাঠিয়ে দিল কি ? পর দিন জাহাঙ্গীর আদেশ করছেন শেখুপুরায় যাবেন তিনি। যদিও তাঁর শরীরে জুত নেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে । শেখুপুরায় আছে মনসরাজের সমাধি, হিরণ মিনার, সেখানের বারদুয়ারিতে বসে তিনি তাঁর সালতানাতের সব সীমান্ত আর হিন্দুস্তানের আশ্চর্য জীবজগত , উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল পর্যবেক্ষণ করছিলেন। শুধু পর্যবেক্ষণ নয় একই সঙ্গে চলছিল অন্তর্তদন্তও। তাঁর তিমুরিদ পূর্ব পুরুষ ফিরদৌস মাকানি -বাবরের মতো সবই লিখেছিলেন দিনলিপি জাহাঙ্গীরনামায়।
জোতিষীর গণনায় ষোলোশো সাতাশের পয়লা মার্চ এক শুভ দিনে বাদশাহ আর নূর জাহান , আসফ খান ,শাহাজাদা শাহরিয়ার আর শাজাহানের তিন ছেলেকে নিয়ে আবার কাশ্মীরে চললেন। যদি কাশ্মীরে গিয়ে শ্বাসকষ্ট একটু কমে ভাবছেন জাহাঙ্গীর।শাহাজাদা দাওয়ার বক্সকে চোখের আড়াল করা যায় না।বাদশাহের অসুস্থতার সুযোগে, তাঁর অবর্তমানে দাওয়ার বক্সকে তখ্তে বসানোর কোন খেলা না শুরু হয়। তাই ওই শাহাজাদাও চলছেন সঙ্গে। কাশ্মীর গিয়েও জাহাঙ্গীরের স্বাস্থ্যেদ্ধার হয় না। ঘোড়ায় চড়তে পারেন না , পালকিতে করে নিয়ে যেতে হয় বাদশাহকে। সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ভালো রকম অসুস্থ হয়ে পড়লেন বাদশাহ। চিকিৎসাতেও ফল দিচ্ছে না মোটেই। শ্বাসকষ্টর সঙ্গে সঙ্গে বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করছেন জাহাঙ্গীর। চল্লিশ বছরের আফিঙের নেশা তাঁর, খেলে হয়তো ব্যথা কমে কিন্তু একদলা আফিঙও মুখে তোলার রুচি হচ্ছে না। কয়েক বাটি আঙুরের উৎকৃষ্ট মদিরা পান করছেন সারাদিনে । দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নূর জাহান , মাঝেমাঝেই জ্ঞান হারাচ্ছেন বাদশাহ , অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন। এখনকার ভাষায় সিরিয়াস এজমা রুগির সব লক্ষনই আসলে ফুটে উঠছিল জাহাঙ্গীরের মধ্যে।এত কষ্টের মধ্যেই বাদশাহ কিন্তু লিখে রাখছেন যা দেখছেন। করছেন নানা মন্তব্য , তুলনা প্রতিতুলনা। নূর জাহানের চিন্তা বাড়িয়ে শাহাজাদা শাহারিয়ারও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁর শরীরের সব লোম খসে গিয়ে অঙ্গবিকৃতি দেখা দিল। এটা একধরণের গুরুতর কুষ্ঠ রোগ যাকে ফক্স ডিজিস বলে।বাজারে গুজব রটে শাহাজাদার যৌন রোগ সিফিলিস হয়েছে। হাকিমরা শাহাজাদাকে বলে কাশ্মীরের ঠাণ্ডা ছেড়ে লাহোরের গরমে চলে যেতে তাতে রোগের উপশম হবে। চুল উঠে যাওয়াটা পুরুষত্বহীনতার সমতুল তাই এই চেহারা লোকের চোখের আড়াল করতেও চাইছিলেন শাহরিয়ার। জাহাঙ্গীর অনুমতি দিলে উনি ষোলোশো সাতাশের অক্টোবরের প্রথমে লাহোরের পথ ধরলেন সম্ভবত লাডলি বেগমকে সঙ্গে নিয়ে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাহোরের কেল্লার ভেতর , আড়ালেই চলে যেতে হবে তাঁকে।
শাহরিয়ার চলে যাবার পর লাহোরের কেল্লায় নিজেও ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন জাহাঙ্গীর। পথে চলমান তাঁবু থামল বাহরামগল্লা বলে এক অপূর্ব জায়গায়। কাছেই এক জলপ্রপাত যার সফেন জল ধোঁয়ার মতো ওড়ে আর সকালে ,দিনে ,রাতে নানান রূপ বদলায়। রামধনুও দেখা যেতে পারে। সে নানান রঙ আর তার কল্পনা কি চাঙ্গা করছে শাহেনশাহের দিল ? না হলে তিনি কেন সুস্থ বোধ করবেন যাবেন শিকারে। স্থানীয় জমিদাররা ব্যবস্থা করল শাহী শিকারের। সৈন্যরা তাড়া করছে হরিণদের। সেই হরিণরা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে তাদের দল থেকে। মা হরিণ ছানাকে খুঁজে পাচ্ছে কি ? সে তখন এক ঝোপের তলায় গুটুশুটি মেরে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে , কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না হারানো মাকে। সেরকমই এ পার্বত্য হরিণ পালতে পালতে দাঁড়ালো এক পাহাড়ের কিনারে। ঠিক তার তলাতেই বাদশাহের মাচান , তিনি বসে আছেন মাস্কেট হাতে। হরিণ নাগালে এলেই গুলি করবেন , কিন্তু হরিণ তো দেখা যায় না। সে এমন ভাবে দাঁড়ায় যে দেখা যায় না। তাকে তাড়াতে যায় এক সেপাই। এমন করে তাড়াতে হবে যে হরিণ আসবে বাদশাহের নাগালে আর এই খাড়া পাহাড়ে সে হরিণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ? পা পিছলে হড়কে গেল সেপাই, শেষ ভরসায় এক ছোট গাছের গোড়া আঁকড়ে ধরতে গেল , আগের রাতের পড়া শিশিরে ভেজা গাছ থেকে হাত পিছলে যায় ,যেতে থাকে আর দেহ পতনের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল উপত্যকাময়। ভাগ্য যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে খাদের গভীরে মনে করছেন জাহাঙ্গীর। সেপাইয়ের আচমকা দুর্ঘটনায় বিচলিত হচ্ছেন। মৃত সেপাইয়ের হতভাগিনী মাকে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন।
ষোলোশো সাতাশের আঠাশে অক্টোবর এখনকার রাজোরিরতে পৌঁছে মদ চাইলেন জাহাঙ্গীর।আর ইচ্ছের বসে নেই কিছু , মদ গড়িয়ে গেল ঠোঁটের কোনা দিয়ে। দক্ষিণে পনেরো কিলোমিটার দূরে চিঙ্গিজ হালটির শাহী আরামখানায় নিয়ে যাওয়া হল তাঁকে। জাহাঙ্গীরের প্রিয় আশ্রয়স্থল সেটা , ঝারোখার ফুলকারি করিয়ে ইনাম দেন কারিগর মুরাদকে যেমন দিতেন সব শিল্পী -কারিগরদের। দেখেই বলতে পারতেন ছবিতে কার তুলির টান বা পাথরটায় কার ছেনির ঘা। এখন আর সে সবের উর্ধে চলে গেছে শরীরের হালত , প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, মারা গেলেন পরদিন উনতিরিশে অক্টোবর ষোলোশো সাতাশ ,ভোরেই।
বাদশাহ নেই তবু বাদশাহ আছেন। তিনি আছেন মনসুর আর আবুল হাসানের ছবিতে যে ছবিতে একই সঙ্গে থাকে রাজনীতি , পুরাণকল্প , বিজ্ঞান ও প্রকৃতি। এই সব মিলিয়েই জাহাঙ্গীর। তিনি এক প্রকৃতি বিজ্ঞানী , তাঁর আদর্শ ছিলেন ন্যায়পরায়ণ রাজা সলোমন আর ইতিহাসকার এব্বা কচের ভাষ্য মতো - ফ্রান্সিস বেকনের আদর্শায়িত সেই প্রকৃতি পর্যবেক্ষক ও অন্তর্তদন্তকারী শক্তিশালী সম্রাটদের একজন হলেন জাহাঙ্গীর।জাহাঙ্গীরের বরাতে শিল্পী মনসুরের আঁকা বিলুপ্ত ডোডো পাখিটিই হলেন জাহাঙ্গীর।
শাহরিয়ারের কাছে বাদশাহের মৃত্যুর খবর পৌঁছনমাত্র তিনিও আসরে নামলেন। তড়িঘড়ি ফৌজ জোগাড় করে লাহোরের শাহী তোষাখানা লুট করলেন। সেই টাকায় কিছু অভিজাতকে দলে টানলেন । তাঁরাও শাহজাদার দলে ভিড়ে দেখতে গেল শেষ পর্যন্ত কে জেতে। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর কিছুদিন আগেই অপহরণের সময়ের দোলাচলের জন্য কিছুটা পেছনে চলে যাওয়া আসফ খানকে আবার দরবারে তাঁর আগের জায়গায় পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল। শাহাজাদা শাহরিয়ার না থাকার সুযোগ পুরো কাজে লাগলেন আসফ। হাতে সময় নেই , পুরোপুরি নেমে পড়লেন শাজাহানের পক্ষে। তিনি ভাই ইরাদত খানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোনঠাসা করে ফেলছেন নূর জাহানকে। দরবারের অন্য উজির , আমিররাও যেন তক্কেতক্কে ছিল , তাঁরাও হাত মেলালেন আসফের সঙ্গে। প্রথমেই প্রায় বন্দী খুসরুর ছেলে দাওয়ার বক্সকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হল।
শাহী ফৌজের বড় অংশটা আসফের নেতৃত্বে ছিল। পথে আসতে আসতেই আসফ খানকে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নিতে হল। তিনি খবর পাঠাচ্ছেন শাহজাহানের কাছে।
---- এখানে একটা গল্প শোনা যাক।
---- গল্প ?
---- কিছু গল্প, বাকিটা সত্যি ,বাকিটা অনুসন্ধান। এরকমই চলুক না !
---- পেঁচাল না পেড়ে !গল্পে এস !
---- তাহলে বলি শাহী হাতিশালের ম্যানেজার বেনারসির কথা। আসফ খান তাকে আঙটি খুলে বললেন। .....
---- কী বললেন ?
----- বেনারসি তোমাকে যেতে হবে।
----- কোথায় যাবো হুজুর ?
----- যাবে বিন্ধ্য পাহাড় পার হয়ে অনেকদূর।
----- জো হুকুম।
----- কার কাছে যাবে শুনলে না ?
----- কার কাছে হুজুর ?
----- যাবে শাহাজাদা শাজাহানের কাছে। এই আংটি দিয়ে আমার নামে বলবে শাহেনশাহের এন্তেকাল হয়েছে। শাহজাদার ওপর নির্ভর করছে সালতানাতের ভবিষ্যত।
----- বলব হুজুর।
----- এতেই শেষ নয় , আরো বলবে তিনি যেন তুরন্ত লাহোরে আসেন। তাঁর জন্য এন্তেজার করব আমরা।
----- বলব হুজুর।
----- কত তাড়াতাড়ি যেতে পারবে ?
----- যত তাড়াতাড়ি ঘোড়া দৌড়োবে হুজুর।
----- আর তুমি থামবে?
----- না হুজুর।
----- ঘোড়া বদলে বদলে ঠিক চলে যাব হুজুর। আগেওতো গেছি হুজুরের কথায়।
----- তবে যাও।
----- বেনারসি গিয়েছিল ?
----- আলবাত। না থেমেই গিয়েছিলটা গল্প। তবে যায়। খুব দ্রুত খবর আদানপ্রদানের জন্য প্রশিক্ষিত পায়রাও ব্যবহারের উল্লেখ আছে।এরকম দ্রুত যাওয়ার জন্য নামডাক ছিল কারুর কারুর। অনেকে কম দূরত্বে অসম্ভব জোরে ছুটেও যেতে পারত।
----- রানার ?
----- তাই তো।
দূর দাক্ষিণাত্য থেকে ঝড়ের বেগে আসতেও শাজাহানের মাস কয়েক লাগবে। এতটা সময় তখ্ত খালি রাখার ঝুঁকি নেওয়া যায় না, এই ভেবে খুসরুর ছেলে শাহাজাদা দাওয়ার বক্সকে দাবার বোড়ে হিসেবে বাদশাহ হতে রাজি করালেন আসফ খান। প্রথমে তো বিশ্বাস করতেই চাইছিলেন না শাহাজাদা। তাঁকে বশ মানাতে আনুগত্যের শপথ নিতে হল আসফ খানকে। মোঘল তরিকায় নুন খেতে হতো জবান রাখার প্রতিশ্রুতি হিসেবে।হয়তো দাওয়ার বক্সের নামে নুন খেয়েছিলেন আসফ কিন্তু পরে গুনটি গাননি ! শাজাহাননামা প্রশংসা করছে তাঁর এই উপস্থিত বুদ্ধির, বলছে আসফের জন্যই শাহাজাদা শাহরিয়ারের বাদশাহ হবার সাধ আর মিটল না।
পথেই জাহাঙ্গীরের সৎকার অনুষ্ঠান -শেষ চান করাচ্ছেন আসফ ও দাওয়ার বক্স। মৃতদেহের তাড়াতাড়ি পচন আটকানোর জন্য নাড়িভুঁড়ি কেটে বাদ দিয়ে সম্ভবত ইউনানি বিধিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।পাঞ্জাবের এক মোল্লাকে দিয়ে দাওয়ার বক্সকে বাদশাহ ঘোষণা করে শুরুবারের নামাজে খুতবা পাঠ করা হল কিন্তু জনসমক্ষে ঘোষণা করা হল না।নূর জাহানও কোনও খবর পান না কী ঘটছে।আসফের ঠিক করা চারপাশের চাকর নোকর, পাহারাদাররা অনবরত নজর রেখে চলে তাঁর ওপর। হয়ত ভাবছেন শাজাহান তো অনেক দূরে, হিসেবের বাইরে তাই জামাই শাহরিয়ার ঠিক বাদশাহ হবে।তাঁর আশা পূরণ হচ্ছে না।
বাদশাহের দফনের পর , লাহোরের আশপাশের এলাকায় পুতুল বাদশাহ দাওয়ার বক্স আর আসফের শাহী ফৌজের সঙ্গে শাহরিয়ারের বাহিনীর তুমুল লড়াই হয়। শাহজাদার জোগাড় করে আনা সেনারা বেধড়ক মার খেয়ে ছত্রভঙ্গ হল। শাহরিয়ার নিজে বসেছিলেন লাহোরের কেল্লায়। খবর পেলেন পরাজয়ের। সব অভিজাতরা বেগতিক দেখে আসফের সঙ্গে হাত মেলায়। শাহাজাদা একা , কী করবেন তিনি এবার। গিয়ে লুকোলেন হারেমের এক কোনায়। সেখান থেকে তাঁকে টেনে নিয়ে এল একজন অপরলিঙ্গের প্রহরী। তাঁরই কোমরবন্ধ দিয়ে তাঁকে পিছমোড়া করে বেঁধে যখন দাওয়ার বক্সের সামনে হাজির করা হয় , তিনি দরবারের আদব মেনে তসলিম জানালেন। তাতে ভবি ভুলল না।গোপন কুঠুরিতে বন্দী হয়ে রইলেন শাহরিয়ার , দুদিন পর তাঁকে সম্পূর্ণ অন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতসব ঘটনা ঘটে অথচ তার নানা ন্যারেটিভে কোথাও উল্লেখ থাকে না নূর জাহানের। তিনি লাহোরের কেল্লায় ছিলেন না। সম্ভবত শাহদারায় রাজনৈতিক বন্দী হয়ে ছিলেন , ওখানেই কয়েক বছর পর জাহাঙ্গীরের সমাধি সৌধ বানিয়ে বাকি জীবন লাডলি বেগমের সঙ্গে কাটিয়ে দেন ।
লাহোর ফেরার পথে শাজাহানের তিন ছেলেকে চোখে চোখে রেখেছিলেন নূর জাহান। তারপর বেগমেরও কোন উল্লেখ নেই আর জানাই যাচ্ছে না দারা , সুজা আর ঔরঙ্গজেবের কী খবর। সম্ভবত শাহরিয়ারকে হারানোর পরই আসফ খান তাঁর জেনানার সঙ্গে তিন শিশুকে রাখছেন। মুমতাজ মহলের মা দেয়ানজি বেগমের উল্লেখ কখনই পাওয়া যায়নি এটা আগেই জানা গেছে তাই জোর দিয়ে বলা যায় না তিনজন শাহাজাদা কোথায় ছিলেন। এত রক্তপাত আর হাতি ঘোড়ার ডাক যে বৈভব আর ক্ষমতার সমাবেশে আটপৌরে নানান জীবনের কথাকেও অনবরত চোর কুঠুরিতে পাঠিয়ে অন্ধই করে রাখা হয় নিয়ত।


0 মন্তব্যসমূহ