বনমালী মালের গল্প: রামরাজাতলা থেকে




সেদিন সকালে উঠেই বাবা বললেন, আমাদের আর এখানে থাকা চলবে না। ঘুম ভাঙার আগেই দেখলাম বাবা-মা দুজনেই রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। মায়ের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল, সারা রাত বাবা যা কিছু বুঝিয়েছেন, তার কিছু কিছু মা মেনে না নিলেও মোটামুটি বাবার উপর ভরসা করে তিনি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। দুজনের চোখেই ঘুমের কোনো ভার নেই। আগের রাতটা জেগে কাটানোর জন্য এখন তাদের চোখ একটু বেশি সেঁধিয়ে গেছে শুধু এই যা – এছাড়া তাদের কথা আর চটজলদি সবরকম ঠিকঠাক গুছিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তারা একদম নির্ভুল ছিল।

আমি থ হয়ে বিছানার ভেতর শুয়ে তাদের তটস্থ হয়ে সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার দিকে নজর রাখতে লাগলাম। কিছু বলবার সাহস পেলাম না। এতদিন বদ্ধ ঘরে থাকতে থাকতে আমার মন আর মেজাজ কেমন মিইয়ে গিয়েছিল। প্রায় ছ' দিনের বসন্ত তখন আমার গোটা শরীরটাকে একটা গুটির বাসা করে তুলেছে। অবিরাম মশারির ভেতর থেকে একটা ঝাপসা ঘর আর আসবাবেই আমি অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। ভরা চৈত্রের ওই সময় – আমার গা থেকে ততদিনে গুটি খসে খসে পড়তে শুরু হয়ে গেছে। আগের দিনগুলোতে শরীরের যে যে জায়গায় গুটির বিছানা দেখেছিলাম, সেখান থেকে একটা আধটা খসে গিয়ে একটু সমতল হয়েছে। গায়ে তাপ ছিলই কিন্তু এমন নয় যে আমার স্মৃতি উবে যাচ্ছিল। আসলে ওই ছ' দিন মনে রাখার মত তেমন কিছু ঘটেওনি। কখনো বাবা-মায়ের কোনো কথাও আমার কানে এসে পৌঁছায়নি। যদিও তাদের বলার মত তেমন কথাও ছিল না। তাছাড়া ভেবেছিলাম, আমার বসন্ত রোগের জন্যই হয়তো বাবা-মা সাবধানতা মেনে চলছে।

মশারির ভেতরে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম, আর কতদিনে এই মায়ের দয়া শেষ হবে? কবে আমার নিমহলুদ? কবে দুটি ভাত খেতে পাবো? আর হয়তো এক দু'দিন বাকি ছিল, হঠাৎ সেদিন বাবা-মা সকালে এমন বললেন। তখনও ভাবিনি, এ যাত্রা আর এই অনুসরণ কতখানি কঠিন আর সমস্যার। সময় যত ঘনিয়ে আসতে লাগল, দেখলাম, বাবা মা সম্পূর্ণ প্রস্তুত, আমাকে সারা গায়ে ঢেকে নিতে বলা হল পাতলা জামাকাপড়। তখন আমি অনুভব করতে পারলাম, এই রামরাজাতলা ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হবে এবং সেটা হয়ত সারাজীবনের জন্যই। সঙ্গে কিছুই নেওয়া হল না। ওই অবস্থায় মশারির বাইরে এসেও দুর্বল নজরে দেখলাম ঘরের দেওয়ালগুলো ক্রমশ আমার সামনের দিকে চেপে আসছে কিন্তু এতদিনের ঘরবদ্ধ বাতাস আর বাবা মায়ের এমন নির্বাক নির্দেশ আমাকে বাধ্য করেছিল।

তখনও গায়ে গায়ে কিছু গুটি জড়িয়ে ছিল। ঘরের বাইরে এসে বাবা খামারে কিছু সময় দাঁড়ালেন। মায়ের মুখে আঁচলের কিছু অংশ গোঁজা। গোটা ঘাসে ঢাকা খামারটার যে যে অংশে আমরা বসতাম বা হেঁটে চলে বেড়াতাম, সেই সেই অংশগুলোকে বাবা পায়ে পায়ে ঘেঁটে দিলেন যাতে কেউ হঠাৎ এখানে এসে আমাদের অবসরের চিহ্ন না পায়। ভূতে পাওয়ার মত আমি এইসব দেখে গেলাম। দেখতেই ছিলাম।

তারপর সেই মুহূর্ত এল, যে মুহূর্তে আমরা আমাদের বংশজ বাস আর সম্পর্ক ছেড়ে হাঁটতে শুরু করলাম। আমি শুধু ওই সময়ে ওরকম শরীর নিয়েও একবার আকাশের দিকে চাইলাম। দেখতে চাইলাম, আমাদের সামনে সামনে কোনো পাখি উড়ে যাচ্ছে কিনা কারণ বাবাকে যখন ঘর থেকে বেরোনোর সময় বাঁ পা প্রথম বের করতে দেখেছিলাম, তখনই অনুমান করেছিলাম, আমাদের গন্তব্যের অনিশ্চয়তার কথা।

বসন্তের ঘোর ছিল বলেই মনে হয় কোনো পাখি দেখতে পেলাম না, অগত্যা বাবা আর মায়ের পেছন পেছন চলতে লাগলাম। স্পষ্ট মনে পড়ে, আমার গা থেকে জামার ভেতর দিয়ে একটার পর একটা গুটি খসে পড়ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছলাম রামরাজাতলার চৌমাথায়। বেলা অনেক পেরিয়ে গেলেও বাতিস্তম্ভের বাতিগুলো তখনও জ্বলছিল। যখন পৌঁছলাম, যেখান থেকে কিছুদিন আগেও দিনদুপুরে সারিবদ্ধ মানুষের চিৎকার আর গুলির শব্দ শোনা যেত, সেখানে পৌঁছেই বাবা আমাদের পা থেকে জুতো খুলে নিতে বললেন আর কোনো কথা না বলে তাঁকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত দিলেন।

সেই প্রথম আমার মাথা থেকে ঘোর ক্রমে সরে যেতে লাগল। দেখলাম, বাবা আমাদের পাকা রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেলেন না, বরং রাস্তা নেই এমন জায়গা দিয়েই তিনি আমাদের নিয়ে যেতে লাগলেন। একটা খাল পেরোলেন আর জমির পর জমি পেরিয়ে আমরা হেঁটেছি। আমি আর মা কী ভাবছি বা ওই সময়ে কী ভাবা উচিত বুঝে নিয়ে বাবা বললেন,

আমরা মানুষের বাসস্থানের মাঝখান দিয়েই পথ হাঁটবো। অন্তত সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটু জায়গা পেলেই হবে।

বুঝলাম, বাবা সেই জন্যই বাস ট্রাম বা ট্রেনের যাত্রা নিলেন না।

কতদিন ধরে গ্রাম, পাড়া, জনপদ মানুষের চোখ – যেন এমনই হওয়ার ছিল – আমরা পেরিয়ে চলছিলাম। এদিক-সেদিক চোখ চারিয়ে, কখনো কোনো জায়গায় একটু স্থির দাঁড়িয়ে বাবা কী ভেবে নিতেন – তারপর আবার চলা। প্রথম কয়েকদিন আমাদের মধ্যে কোনো কথা ছিল না, বলতেও পারিনি, মা আমার নিমহলুদটা কবে হবে? একদিন বাবা-ই নিজে একটা মহানিম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে করলেন আর আমাকে বললেন, গাছটার সবথেকে উঁচু ডালটার দিকে চেয়ে যেন আমি আমার কণ্ঠাকে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামাই। তাই-ই করেছিলাম। মনে হয়েছিল, গলায় এতদিন আটকে থাকা একটা আঁত নেমে গেল।

বাবার জামাকাপড়ে ধুলো জমছিল। মায়ের শাড়ির পাড় ক্রমশ জরজরে হয়ে ছেঁড়ার উপক্রম হতে লাগল, তবু আমাদের চলা থামল না। আমি যেহেতু ঘর থেকে বসন্ত নিয়ে বেরিয়েছিলাম, তাই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল যে আমি যেন বেশি কথা না বলি। এমনকি ঘরের প্রসঙ্গও যেন না তুলি। মায়ের মুখ থেকে ততদিনেও আঁচল খসে যায়নি।

আমার মন তবু সায় দিচ্ছিল না, আমাদের এতদিনের ঘর – এতসব সুখের আশ্রয় ছেড়ে আসার খুব কি প্রয়োজন ছিল! নাকি বাবা আরো কিছু আগাম আশঙ্কার আভাস পেয়েছিলেন! এতদিনের পথ হাঁটার ক্লান্তি ছাপিয়ে শুধু এই আক্ষেপটাই জোরালো হয়ে উঠছিল যে শেষবারের মত আমি আমার ঘরটাকে সতেজ আর স্পষ্ট চোখে দেখে আসতে পারলাম না। এমনকি দুয়ারে পাখিদের জন্য যে খাঁচাগুলো ঝোলানো ছিল, আমাদের বেরোনোর সময়ে অন্তত তিনটে পাখি সেখানে এসে ঠাঁই নিয়েছিল কিনা বা তাদের গায়ের পালকে পালকে অনেক বেশি করে বাতাস ভরা ছিল কিনা আমি পরিষ্কার দেখে আসতে পারলাম না।

ভ্যাপসা গুমোট আর ঘামের সঙ্গে অবিরাম উদ্দেশ্যহীন পথ চলতে চলতে একদিন আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। বাবাকেও দেখলাম, ঘন ঘন দাঁড়িয়ে ভেঙে পড়ার মত ভঙ্গি করছেন আর চারদিকে চেয়ে কীসব দেখে নিচ্ছেন। আমি যেমন, প্রায় কোনোকিছুই বুঝতে না পারা মুহূর্তে আকাশের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। দেখতে দেখতে মেঘ ঘনিয়ে এল আর ঠিক আমাদের মাথার উপরেই আকাশ ছেয়ে গেল নিশ্চুপ বকের ঝাঁকে। একটা বিরাট কালো মেঘের নীচে প্রতিটি বক আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল। তাদের এক একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এরকম স্থির ভেসে থাকা আসলে কোনোকিছুর প্রতি তাদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে তুলছিল।

অন্য কোনো দিকে হয়তো বৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের ক্লান্তির উপর বয়ে যাওয়া ঠাণ্ডা বাতাস – ওইদিনের রাতটা তাই আমাদের ওখানেই কাটাতে বাধ্য করেছিল। তাছাড়া বাবাও ওই গ্রামটা ছেড়ে তাড়াতাড়ি পা চালাতে চাইছিলেন না। তিনি রাস্তার প্রতিটা বাঁকে দাঁড়াচ্ছেন, ঢালাই রাস্তার ফাটল লক্ষ করছেন। দেখছেন, গাছে গাছে দলীয় পতাকার বিভিন্নতা আর ঘনত্ব।

অন্তত আমার মনে হয়েছিল, বাবা হয়তো এখানেই এই গ্রামের শান্ত সমতল মাটিতে তাঁর চাহিতি বাস পেয়ে গেছেন। এটা ভাবতে পেরেই আমি তলিয়ে গেলাম নিশ্চিন্ত শীতল ঘুমে।

পরদিন সকালে আবার হাঁটতে গিয়ে যখন আমার ঘুম ভাঙল, তখন আমরা গত রাতের গ্রামটাকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। একটু পেছনে টেনে মাকে যেই থামালাম, মা বলল, কাল রাতে ওই গ্রামে আমরা যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেখান থেকে একটু দূরেই একটা পুকুরের পাড়ে কয়েকজন এসে বিলভাত রেখে গিয়েছিল।

ততক্ষণে বাবা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর উপর রোদ আরও গাঢ় হয়ে পড়েছিল বলে আমি আমাদের পিছিয়ে যাওয়াটা অনুভব করলাম আর মাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে বাবার সঙ্গ নেওয়ার ঈশারা করলাম।

সেই সময় থেকে বাকি রাস্তাটা আমি যেন একটা নির্জন মরুভূমির ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি। আমার চারপাশে কাউকে পাওয়ার আশা নেই। উত্তপ্ত বাতাসের নিয়তি কেবল কানের দু' পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। আমার চারপাশে কাউকে পাওয়ার আশা নেই। আমার কাছে কেউ কোনো গল্প জানতে চাইবে না। আমার সামনে কেউ কোনোকিছুর জন্য হাত পাতবে না। যেখানে রাস্তা চিনে যাওয়ার মত রাস্তাই নেই, সেখানে আমি শুধু মায়ের ওই কথাগুলোর সঙ্গে রামরাজাতলার সেইসব দিনের কথা বুনছি।

রামরাজাতলা ছেড়ে আসার বছরখানেক আগে থেকে আমার ঘরে সবথেকে বেশি বার বোধহয় এই বিলভাত কথাটাই উচ্চারিত হয়েছিল। এমনই যে, বাবা প্রতিদিন হয় মা নাহলে অন্তত আগন্তুক কাউকে বসিয়ে পুরো ঘটনাটা শুনিয়ে দিতেন। শুধু আমার বসন্ত হওয়ার দিনগুলোতে আমি তেমন কোনো কানাঘুষো শুনিনি। হয়তো আমার মায়ের খেলা হয়েছিল ব'লে বাবা আমার কান থেকে দূরে গিয়ে কথা বলতেন। যত করলেও, মায়ের প্রত্যক্ষ প্রকাশের সামনে এমন একটা ঘটনা আগাগোড়া শুনিয়ে যাওয়া বাবার সাধ্যে ছিল না। কারণ এতদিন ধরে বলা-কওয়া আর শোনার ফেরে ঘটনাটায় সত্যি আর মিথ্যা মিশে গিয়েছিল।

হয়েছিল কী – আমার দাদা, ভোটের রেজাল্টের ঠিক দু'দিন পর হঠাৎ মারা গেল। দোকানের শাটার হাফ টেনে কার্পেটের উপর হাঁটু মুড়তে চাওয়ার চেষ্টায় কপালের একটা কাটা দাগের দাদাকে যখন পাশের দোকানদার আবিষ্কার করেছিল, তখন ঘণ্টা দুয়েক পেরিয়ে গেছে। বেঁচে থাকা দোকানিটা নিজের মরণ এড়াতে তড়িঘড়ি পাশাপশি দু' চারজনকে ডাক দিল আর তখুনি বাজারে রাষ্ট্র হয়ে গেল, লক্ষ্মীনারায়ণ বস্ত্রালয়ের মালিক আর নেই।

কেউ বুঝল, কেউ বুঝল না। যারা বুঝল না, তাদের আবার অন্য একটা পরিচয় দিতে হল,

"আরে যে লোকটা পার্টি করত।"

মারা যাওয়ার প্রথম দিন সবার কান্নাকাটি আর মুষল বৃষ্টি বাঁচিয়ে কীভাবে কাঠ জোগাড় করা হবে সেই চিন্তায় – মনে হয় সেই ভাবনাতেই বাবা পোস্টমর্টেম করালেন না। কিংবা দাদার কপালে ওই কাটা দাগটার আসল রহস্য বাবা হয়তো নিশ্চিত বুঝতে পেরেছিলেন।

দাদার মৃত্যু থেকে শেষ কাজ অব্দি দিনগুলোতে সবাই একটু একটু করে স্বাভাবিক হল, এমনকি আমিও। শুধু বাবা ক্রমে আরও পাথর হয়ে যেতে লাগলেন। জলে আর শোকে ভেজা মা তবুও কতবার বীজের মায়া ছেড়ে বাবাকে বুঝিয়েছিলেন। বাবা বোঝেন কিন্তু তবুও আমার মনে হত, বাবা বোধহয় কিছু একটা জানতেন, যেটা আমাদের কাউকে বলতে পারছেন না। আর সেই জমিয়ে রাখার ভিড়েই বাবা বেমালুম সেই বিলভাতের আসল রীতিটাও ভুলে গিয়েছিলেন।

কেউ বলে, ছেলেটা তো খারাপ ছিল না! তার আত্মা কী করে মৃত্যুর পর এমন সব অনিষ্ট করতে পারে? কিন্তু বাবা জানতেন, গত হওয়ার পর মানুষের নিজের নিজের দোষ-গুণ বাতাসে দ্রবীভূত হয়ে যায়। তখন দুষ্ট আত্মার অসৎ প্রবৃত্তি সহজেই এসে মিশে যায় তার সঙ্গে। বাবা মনে করতেন, বিশ্বাস করতেন, আমাদের রামরাজাতলায় এমন কত লোক মারা গেছে, যারা জীবৎকালেই অনিষ্ট করার ভাবনায় তৎপর থাকত। তারা মৃত্যুপরবর্তী জীবনে তাদের অসম্পূর্ণ কাজের এমন সহজ সুযোগ ছাড়বে কেন? বরং তারা সৎ প্রায় পবিত্র কোনো আত্মার ঘাড়ে বসে অনিষ্ট করবার হুকুম চালায়।

আলো চিনে চিনে আত্মা যে আবার নিজের ঘরের টানে ফিরে আসে, সে আমার বাবা কত কত বংশের পরম্পরায় শুনে এসেছিলেন। প্রায়ই বলতেন,

"একদা আমাদের পূর্বপুরুষদের এক রাজা তাঁর সতী স্ত্রীকে অবিশ্বাস করেছিলেন। সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা রাজার উষ্ণিষ থেকে যে জ্যোতি ঠিকরে পড়ছিল, সেইদিকে এমনকি সমবেত দেবতারাও মোলায়েম চোখে তাকাতে পারছিলেন না। ফলে অনুনয়ের সুরে কোনো ফল হল না। প্রজা সাধারণের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলেন তাদের রাণীমা। আগুন থেকে ফিরে এলেন না। সোজা হারিয়ে গেলেন দ্বিধান্বিত পৃথিবীর কুহরে।"

বাবার সেসব বেশ স্পষ্ট মনে আছে। কুশ ঘাসের কখনো না-মরা জীবন যুগের পর যুগ যেন এইসব বলার জন্যই বেঁচে আছে। বাবা হয়তো তাদেরই কাছ থেকে শুনেছেন আর বারবার বলে গেছেন –

সেইযে রাণীমা হারিয়ে গেলেন, তাঁর সৎ আর বিশুদ্ধ আত্মা দিয়ে তিনি কি পারতেন না, অন্তত তাঁর রাজ্যের আলোকিত আঁধারে যেসব নারীরা মুহূর্ত বিশেষে হাত বাড়ায় কিংবা শরীরী যন্ত্রণা নিয়ে কাতরায়, তাদের প্রতি সদয় হতে?

মাটির সব জায়গাই তো ভেদ্য। এমন যেকোনো জায়গা থেকেই তো তিনি তাঁর আত্মার প্রকাশ ঘটাতে পারতেন!

আসলে রাণীমার আত্মার সততা আর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল আর পাঁচ রকমের দুষ্ট আত্মার মলিনতায়। সবারই হয়।

নিজের ছেলের আত্মাও এখন লৌকিক ক্ষেত্রে নানা খারাপ কাজের আজ্ঞাবহ।

অথচ বাবাই যেন কেমনভাবে ভুলে গেলেন! শ্রাদ্ধের রাতে বিলভাত দিতে যাওয়ার সময় বেমালুম জ্বলে রইল আমাদের গোটা ঘর।

বাবা আর আমি যখন আমাদের বাস্তুর চৌহদ্দির বাইরে থেকে ফিরছিলাম, আমার পেছনে বাবা আরো পিছিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। একসঙ্গে অনেক ভাবনা আর পথ আগাম ভেবে নেওয়ার জন্য বাবা আরো কালো হয়ে যাচ্ছিলেন।

সেই থেকে দিন দিন বাবা কেমন মুষড়ে পড়ছিলেন। এমনকি দিনের বেলাতেও আমাদের আলো জ্বালা ঘরগুলো থেকে একধরণের সুগন্ধের উত্থান আমাদের কারো অনুভূতি এড়িয়ে যায়নি। বাবাকে প্রায়ই বলতে শুনতাম – এখন এই অবস্থায় সবাই মিলেমিশে যায়। আত্মার সঙ্গে আত্মা দল বেঁধে তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করে।

গোটা রামরাজাতলা জুড়ে সমস্ত বেঁচে থাকা মানুষের কেবল এই একটাই আশঙ্কা। যদি আমার দাদার আত্মা সবার ঘরের পথ চিনিয়ে দেয়! যে-যার বাড়ি আলাদা কিন্তু ঘরের ভাবনা তো সবারই এক! বাঁচার সব খুঁটিনাটি পদ্ধতিও!

বাবা জানতেন, বিলভাত দিতে যাওয়ার সময় যদি আমাদের ঘরটা অন্ধকার করে রাখা যেত, তাহলে অন্তত আত্মার জগৎ থেকে নিজেদের একটু নিরাপদ রাখা সম্ভব হত। কিন্তু সেটাও যখন হল না…

আমার অবিরাম হাঁটতে থাকা মরুভূমিটা বিস্তৃত একটা গ্রাস নিয়ে যেন আমারই জন্য অপেক্ষা করে আছে! স্পষ্ট দেখলাম, আমাদের ছেড়ে আসা রামরাজাতলা থেকে আরো কত কত পরিবার শুধু অজানা এক আতঙ্ক আর চারপাশে অবিরাম ঘটে যাওয়া থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতেই ঘর ছাড়ছে। তাদের দিকদর্শী কোনো পথ নেই। নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। শুধু এতদিনের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা আছে – মানুষের বেঁচে থাকার লক্ষণ বুঝে কোথাও একটা তারা ঠাঁই করে নিতে পারবে, এই তাদের বিশ্বাস।

হঠাৎ আমি কেমন ক্লান্তি অনুভব করলাম। অবসাদে আমার সারা শরীর যেন খসে খসে পড়বে। চোখে অতিরিক্ত আলো এসে পড়ছে। কিংবা এতক্ষণ ভাবনার ভেতর থাকার জন্য আমি দিনের বেড়ে ওঠা আলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি। বাবা-মা তখনও সমানে হেঁটে চলেছেন।

সেসব কতদিন – কত মাস আর মাস। বসতির ঘোরাফেরা করা লোকগুলোর চোখের দিকে একদৃষ্টিতে বাবা চেয়ে থাকতেন। প্রাথমিকভাবে বাবা এটা বুঝতে চাইতেন যে, লোকগুলো নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে কিনা। কিন্তু কখনো বাবা সেরকম ঘুমতৃপ্ত মানুষ দেখেননি। তাদের চোখের তলায় কালো দাগ কিংবা হরদম সবকিছুর মধ্যে বিরক্তিতে তাদের কপালে কপালে অজস্র ভাঁজ। রামরাজাতলার লোকগুলোর সঙ্গে যখনই বাবা কোনো মিল পেয়েছেন, ভয়ে-কুণ্ঠায় সেই বসতি থেকে এগিয়ে এসেছেন। মা এতদিন যেমন নির্বিকার – তেমনই কিন্তু দিনে দিনে ক্লান্তি আর একনাগাড়ে পথ চলা আমার হাঁটা-কে মন্থর করে দিচ্ছিল।

একদিন বিকেলের শেষ আলোয় আমরা যখন একটা বসতি পেরিয়ে দিগন্তে দেখা আরেকটা বসতির দিকে হাঁটতে লাগলাম, দেখা গেল, ডান পাশের একটা ঘাসঢাকা রাস্তা চলে গেছে আরও ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর। হয়তো কোনোদিন কিছু ঘর বা পোষ্য নিয়ে মানুষের বাস ছিল ভেবে বাবা থমকে দাঁড়ালেন। কিন্তু সেটা ছিল বাবার নেহাৎ একটা টান উপেক্ষা করতে না পারার মত থমকে যাওয়া।

বাবা আবার সামনে চেয়ে হাঁটতে শুরু করবেন, এমন সময় আমি বলে উঠেছিলাম

"বাবা, আমরা তো একবার এই রাস্তা ধরে দেখতে পারি! হয়তো কত মানুষ ওখানে বাস করছেন! তাদের জীবন এতটাই নিরুপদ্রব যে এখান পর্যন্ত তাদের কোনো স্বর শোনা যাচ্ছে না!"

বাবা মনে হয় বিরক্তই হলেন। তবু আমি আর মা যেহেতু এতদিন তাঁর সব রাস্তা মেনে এসেছি, তাই তিনি ধৈর্য ধরে পেছন ফিরলেন আর শান্ত ভাবে বললেন,

"কান পাতো, এই সময়েও এখান থেকে কোনো শাঁখের শব্দ আসছে না।"

পশ্চিমের লাল রঙের আকাশ ক্রমশ কালো শূন্যতায় আমাদের আরও কাছে এসে পড়েছিল। বাবা মা আমি তিনজনেই আমরা একে অপরের কাছে অদৃশ্য হয়ে গেলাম। আমি আন্দাজে চেয়ে ছিলাম ওই ডানদিকের ঝোপটার দিকে। হয়তো মা-ও। বাবা হয়তো চেয়েছিলেন সামনের অপরিচিত রাস্তার দিকে। হয়তো মা-ও।

তারপর রাত ঘনিয়ে এল। ভোর। দিন। আবার রাত। একদিন হাঁটতে হাঁটতে বাবা ক্লান্ত হলেন। অথর্ব শরীরে তবুও একটা নিরাপদ বাসার অর্থ তিনি ভুললেন না। বারবার মনে রাখতে বলতেন, রামরাজাতলার সেইসব সময় আর ঘটে যাওয়া দিনগুলোকে। এই নাকি আমার মাপকাঠি হতে হবে। আমার হাঁটা পথে যেসব বসতি আসবে, সেগুলোর চাল আর চলন যেন রামরাজাতলার মত না হয়।

পরে পরে তাঁর কথা হারিয়ে গেলে ইঙ্গিত আর চাউনিতে প্রতিনিয়ত আমাকে খুঁজে চলার নির্দেশ আর পরামর্শ দিতে থাকলেন। একটা নির্জন জায়গায় বাবা আর মাকে বসিয়ে রেখে আমি ঘুরে বেড়াতাম পাশাপাশি যত বসতি আর মানুষের হাবভাব। দিনে দিনে বাবা আরো বৃদ্ধ হলেন, আমি আরো বড় হলাম।

রামরাজাতলার দিনগুলো ক্রমে ভুলে যাচ্ছিলাম বলেই হয়তো আমি একটা ঘর বানিয়ে নিতে পেরেছিলাম। বাঁচতে শিখে গিয়েছিলাম, তাই সংসারে আমার কোনো বাধা আসেনি। তাছাড়া বাবা যখন গত হলেন, প্ৰথামত বিলভাত নিয়ে যাওয়ার সময় অন্ধকার করে রাখার জন্য আমার একটা ঘর খুব দরকার ছিল। এখন শুধু এই ঘরের সূত্রেই আমার সেই ঘরের কথা মনে পড়ে। কিন্তু কোনোদিন এত এত জায়গার সূত্রে আমার রামরাজাতলার কথা মনেও আসেনি। কারণ এত এত জায়গার মত রামরাজাতলা-কে আমার কখনোই আলাদা মনে হয়নি।

***
লেখক পরিচিতি: বনমালী মাল। ১৯৯০ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় বনমালী মালের জন্ম। প্রথম লেখালেখির অভ্যাস কবির লেখার চেষ্টার মধ্য দিয়ে। পরে গল্প লেখার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। তাঁর প্রথম গল্পের বই "সোনার বলদ কিংবা সবুজ সুখ" প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালে। তাঁর পরবর্তী গল্পের বই "বিরহান" প্রকাশ পায় ২০২৪ সালে। দুটি নভলেট নিয়ে একমাত্র উপন্যাসের বই প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে। 






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ