ভাঙা মেলা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল তাকে। তার গরীব বাপ মেলা দেখতে যে পয়সা দিয়েছিল, তাতে একটা তাল পাতার ভেঁপুও হয় না, পুতুল হওয়া তো দূরস্থান। খুব মনখারাপ হয়েছিল জানকীর।
কিন্তু ভগবান আছেন, তাই মেলা ভেঙে গেলে , পটুয়াদের ফেলে দেওয়া একটা মুকুটভাঙা মাটির ধনুর্ধর রাজাকে সে খুঁজে পেল। আর কোলে করে পরম আনন্দে সে তার বাপকে পুতুলখানি দেখাতে এল।
বাপ তখন তার সাঙাৎদের নিয়ে পাশা খেলায় ব্যস্ত ছিল। পুতুলটা নিয়ে সে তার বাপের পিঠের ওপর ঝুঁকে পড়েছিল। জানকী বার বার জানতে চাইছিল, এই রাজার নাম কী? তার বাবা আদর করে বলেছিল, ওই ভাঙা রাজপুত্র কে তা আমি কী করে জানবো? আমি কি আর লেখাপড়া তেমন করেছি। তবে আমার জানকী যখন কুড়িয়েছে, তখন ও রঘুনাথ না হয়ে যায় না।
সকলেই মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিল, হ্যাঁ হ্যাঁ, ও নিশ্চয়ই রঘুনাথ। ওর সঙ্গেই তোর বিয়ে হবে রে জানকী। যা ,এখন ওকে কোলে করে বড়ো করে তোল।
আহ্লাদে আটখানা হয়ে সেই ছোট্ট খুকি সেইদিন থেকে রঘুনাথকে একবারের জন্যও চোখের আড়াল করে না। সে যা যা খায়, তাই তাকে খাওয়ায়। সে যা যা খেতে ভালোবাসে, সে যেভাবেই হোক রঘুনাথের জন্য সেগুলো জোগাড় করে দেয়।
রঘুনাথ খাবে বলে জানকী নারকেলের মালায় ছাগলের দুধ দোয়। বুনো কুল শুকিয়ে ঢেঁকিতে গুঁড়ো করে রাখে। এমনকি গাঁয়ের কারুর বাড়ি থেকে ভালোমন্দ রান্নার গন্ধ এলেও, সে রঘুনাথকে কোলে নিয়ে সেখানে গিয়ে বসে থাকে। তাদের গাঁয়ের লোক জানকীর সঙ্গে রঘুনাথকেও সমান ভালোবাসে।
জানকী খাবার সময় তার পাতের পাশে রঘুনাথের পাতটি পাড়তে কখনও ভোলে না। গাঁয়ের সবাই রঘুনাথের পাতে ভালোমন্দ দিতে কখনও দ্বিধা করে না।
জানকীর আর কোনও বন্ধু নেই, এই রঘুনাথ ছাড়া। কবে থেকে কোলে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে তার রঙ চটে গেছে। তাই জানকী তার চুলে কাজল ঘষে। গেরুয়া মাটি দিয়ে তার গা হাতপা মেজে দেয়। পুঁই মিচুরি দিয়ে তার কাপড় রঙ করে দেয়। তার ভাবী স্বামী রঘুনাথকে সাজিয়ে গুজিয়ে জানকীর আনন্দ আর ধরে না।
গাঁয়ে তার বয়সী সব মেয়েরা বিয়ে হয়ে অন্য গ্রামে শ্বশুরঘর করতে যায়। জানকীর অন্যগ্রামে যাওয়া নেই। যেসব বাড়ি থেকে ওর জন্য বিয়ের সম্বন্ধ করতে লোক এসেছে, তাদের সামনে রঘুনাথকে দেখিয়ে জানকী জানিয়েছে, এই তার আদরের স্বামী। বিয়ে তো তার এর সঙ্গেই হবে। নেহাৎ তার বাবা ভোজের পয়সা জোগাড় করতে পারছে না বলে তার বিয়ে হচ্ছে না।
পাত্রপক্ষ পাগলী মেয়েকে দেখে হাসতে হাসতে ফিরে যায়। জানকীর বাবা মা মাথায় হাত রেখে বিলাপ করে। কী মরতে যে জানকীকে তারা বলতে গিয়েছিল, এই তোর বর। তাতেই না এতো বিপত্তি।
জানকী বড়ো হয়,যৌবনবতী হয় । কিন্তু সেই ছোট্ট মাটির রঘুনাথ এখনও তার সবকিছু। একদিন জানকীর মা তার স্বামীকে বলল, এক কাজ করো। মেয়ে যখন অন্য বিয়েতে নারাজ, তখন ওর পুতুলের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দাও। আর কিছু না হোক, মেয়ে তো খুশী হবে। আমাদের একটামাত্র মেয়ে। তেমন কোনও শখসাধ পূরণ করতে পারিনি ওর, এই বিয়েতে আর কিছু না হোক, ওকে নিয়ে তো একটু আমোদআহ্লাদ করা যাবে।
বিয়ের দিন ঠিক হয়। জানকী হলুদ জলে কাপড় রঙ করে নিজে পরে, রঘুনাথকেও পরায়। মাথাতে চবচবে করে ঘি মেখে সুন্দর করে মোরগঝুঁটি ফুলের গয়না লাগায়।
তারপর জানকী আহ্লাদে আটখানা হয়ে, রঘুনাথকে কোলে নিয়ে একেবারে গরবিনী হয়ে বসে। গাঁয়ের মেয়েরা মায়েরা বৌয়েরা তাকে ঘিরে বসে ঢোল বাজিয়ে বিয়ের গান গায়।
বাইরে তখন অনেক বড়ো উনুনে পাড়ার লোকে বিয়ের ভোজ রান্না করে। কতদিন পর পেট ভরে গরম ভাত আর মাংস খাবে বলে সবাই নাচে।
জানকীর খুশী দেখে তার মায়েরও আনন্দে চোখের জল পড়ে। মা ভাবে, আহা, বাছা আমার সুখী হোক।
সেই গরীব মূর্খদের গাঁয়ের এমন বিয়ের কথা কীভাবে যে দূরে অতিদূরে একবারে রাজার রাজধানীতে গিয়ে পৌঁছায়! সেখান থেকে বাছা বাছা লম্বা চওড়া বেশ কিছু লোক জানকীর বিয়ে দেখতে সেই অজ গাঁয়ে, একেবারে জানকীদের উঠোনে গিয়ে হাজির হয়।
লোকজনকে মেরে ধরে জানকীর কোল থেকে তারা ছোঁ মেরে টেনে নেয় তার বুকের ধন, তার জীবন, মাটির রঘুনাথকে। সকলে হায় হায় করে ওঠে। জানকী বাধা দিতে গেলে এক ঝটকায় তারা তাকে ফেলে দেয়।
যে রঘুনাথ কোনওদিন জানকীর কোলছাড়া হয়নি, সে অচেনা বিজাতীয় লোকেদের ঘাড়ে চড়ে কান্না জুড়ে দেয়।
জানকীও সেই শুনে কাঁদে, তাঁর লম্বা চুলগুলো ধুলোতে লুটোয়।তার সাধের মোরগঝুটি ফুল সেই অচেনা মানুষগুলোর মস্ত ওজনদার জুতোর চাপে খানখান হয়ে যায়। তার নতুন হলুদ শাড়ি শতচ্ছিন্ন হয়ে হাওয়ায় ওড়ে।
কোথা থেকে তাতে এক ঝলক রক্তের দাগ লেগে যায়। জানকীর দুঃখে পৃথিবীতে ভূমিকম্প হয়, পাতালে ফাটল দেখা যায়।
তা সেই মত্ত লোকগুলো কি কিছু শুনতে পায়, না আসল জিনিস দেখতে পায়? তারা চিৎকার করে জানান দেয়, এই রঘুনাথ তাদের দেবতা। এই দেবতাকে এই গাঁয়ের লোক মানুষ ভেবে অসম্মান করেছে, তাকে ছোট করেছে।
জানকীর কান্না দেখে তার বাবা সমেত কয়েকজন শহরের লোকগুলোর কাছ থেকে জোর করে তাদের জামাইকে কেড়ে আনতে গিয়েছিল। বদলে পেয়েছে তারা হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো হওয়া লাঠির আঘাত ।
তারা বলেছে, রঘুনাথের মর্যাদা উদ্ধারের জন্য এখানে তারা বিশাল মন্দির করবে। এতো বড়ো মন্দির হবে, যে গোটা পৃথিবীর লোকে হাঁ করে দেখবে।
গাঁয়ের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে যায়। রঘুনাথ কোথায় হারিয়ে যায়। রঘুনাথকে খুঁজতে খুঁজতে জানকী একেবারে সত্যিকারের পাগল হয়ে যায়।
গাঁয়ে প্রচুর ইমারতি দ্রব্য আসে। রাতারাতি বিশাল মন্দির হয়ে যায়। একদিন সেখানে , সেই আকাশছোঁয়া মন্দিরে তারা সেই জানকীর বুকের ধন এতটুকুন মাটির রঘুনাথকে প্রতিষ্ঠা করে।
আর যে রঘুনাথ জানকীদের গরীবঘরে, এমনকি তাদের ছোট গ্রামটিরও জামাইরাজা ছিল, তাদের সেখানে প্রবেশটুকুও নিষিদ্ধ হল।
সকলে দুঃখ পেল। কিন্তু জানকীর মতো তো আর কেউ তেমন কষ্ট পায় না।তার তো মন মানে না। সে যে তার সর্বস্ব। সে শুনতে পায়, রঘুনাথ কাঁদছে।
সোনার সিংহাসনে, মখমলের বিছানায় তার ঘুম আসছে না। সে পরমান্ন খেতে পারছে না, খানিক নুন আর ছোট পেঁয়াজ মাখা পান্তা খাওয়ার জন্য সে আকুল হয়ে উঠছে।
রেশমের কাপড়ে তার গা কুটকুট করছে, অনেক পুরনো খুব মোলায়েম ছেঁড়া কানির আরামের জন্য সেই মাটির জামাই একেবারে কাতর হয়ে পড়েছে। জানকী দেখতে পায় বেচারা রঘুনাথের মুখখানি শুকিয়ে একেবারে এইটুকু হয়ে গেছে।
অনেকদিন সহ্য করার পর একদিন জানকী কাতর হয়ে সেই মন্দিরের পিছন দিক থেকে গিয়ে, তার স্বামী, তার চিরকালের আত্মজন সেই একরত্তি রঘুনাথকে জড়িয়ে ধরল। তার গা থেকে গয়নাগাটি খুলে ফেলে, রেশমের কাপড় ছিঁড়ে তাকে নিয়ে চম্পট দিতে চাইল।
আহারে, বেচারা রঘুনাথের জানকী ধরা পড়ে গেল।
পাহারাদার গুন্ডারা তার বুক থেকে রঘুনাথকে কেড়ে নিতে চাইল। বিজাতীয় লোকের টানাটানিতে রঘুনাথ জানকীর বুক থেকে পড়ে গুঁড়ো হয়ে একেবারে মাটির ঢেলা হয়ে গেল।
আর রঘুনাথবিহীন কি জানকী বেঁচে থাকতে পারে! সেও অমনি সঙ্গে সঙ্গে বুক ফেটে মরে গেল।
গাঁয়ের লোকের বিলাপের সুর সেই রাজধানীতে পৌঁছে কীকরে যেন মিঠে শোনালো।
সকলে নেচে নেচে সেখানে উৎসব করতে এল। মেলা বসল। দেশ বিদেশ থেকে বড়ো বড়ো রথে চেপে কত রাজামন্ত্রীরা হাজির হল। তারা বলল, এতদিনে রঘুনাথ অসভ্য নোংরা বুনোদের হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছে। এবার আর রঙচটা অপবিত্র মাটির ঠাকুর নয়, এবার সোনার রঘুনাথ স্থাপিত হবে।
তার পাশে বসবে সোনার জানকী। সে মোটেও আসল জানকীর মতো বিচ্ছিরি দেখতে নয়।
এদিকে আসল রঘুনাথ তখন আসল জানকীর সঙ্গে খড়ের বিছানার ছেঁড়া কাঁথার ওমে শুয়ে রাজধানীর লোকেদের কেমনকরে ফাঁকি দিয়েছে, সে নিয়ে খুব হাসাহাসি করছিল।
জানকী ভাবছিল, থাক বোকাগুলো পুতুল নিয়ে। সে তো সত্যিকারের রঘুনাথকে পেয়ে গেছে। তার আর ভাবনা কী!
***
লেখক পরিচিতি: অহনা বিশ্বাস। সচেতন হওয়া থেকেই হস্টেলে থাকা, কেবলই মানুষ দেখে দেখে যাওয়া। মেয়েদের দেখেছেন অবশ্য একটু বেশিই। সেই সব মানুষজনেরাই অহনাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন যাবতীয় গল্প, যেন নিজেদের বয়ান তারা নিজেরাই দিচ্ছেন--অহনা বিশ্বাসের বয়ানের ভঙ্গি অনেকটা এমন। নতুন রীতির গল্পের অন্যতম গুরু বিমল কর এবং শিবনারায়ণ রায়ের মতো মণীষী অহনার কাহিনী কৌশলের তারিফ করেছেন। গল্প-উপন্যাস মিলিয়ে অহনা বিশ্বাসের রয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ।


0 মন্তব্যসমূহ