অবশেষ সে প্রলয়কে ন্যাংটো হতে বাধ্য করল।
ছুরির ডগায় মাখন। প্রলয়কে বলল চেটে নাও।
একটা শিশুও জানে এক্ষুণি ওর জিভ কেটে যাবে। রক্তারক্তি কান্ড। বিল্বদলের রক্ত সহ্য হয় না।
ছুরির ডগা থেকে প্রলয় কখনো মাখন চেটে খায়নি। সে এতই সাবধানি। শৈশব থেকে এভাবেই তার বড়ো হওয়া। বিল্বদলের ঝুঁকি নেওয়ার ছেলেমানুষি দেখে সে হাসল।
এখানে সকালে বাজার বসে। বিকেলে তাসের আড্ডা, রাতে চোলাই মদের কারবার। কতগুলো ঝুপড়ি আছে। সুযোগ সুবিধায় সেখানে দেহ বেচা।
বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ সন্ধে থেকে। ট্রান্সফর্মার ফেটে গেছে। মাটির নিচের তারে জল ঢুকেছে।
অন্ধকার প্রলয়কে ন্যাংটো হতে সাহায্য করেছিল।
কী হ’ল, চেটে নাও?
আমাকে মেরে ফেল আপত্তি নেই। কিন্তু অপমান কোরো না।
আমি কি একটু চিনি ছড়িয়ে দেব?
প্রলয় হাসল। তুমি যা চাইছ আমি কোনদিন করব না। রক্তপাত তোমার সহ্য হয় না জানি।
বিল্বদলের মনে হয়, কোথায় যেন টুকরো টুকরো কান্না ভেসে বেড়াচ্ছে। আজকাল বড়ো দুর্লভ এই কান্না। চেষ্টা করেও সে চোখে জল আনতে পারে না।
প্রলয় বলে,আমার বড়ো হয়ে ওঠার মধ্যে সবটুকু সংগতিপূর্ণ।
এবার তবে চেটে নাও।
মাখনে আগ্রহ না দেখিয়ে প্রলয় বলে, চল না, একটু ঘুরে আসি। সামনেই খেলার মাঠ। মাঠ পেরিয়ে নালা। নতুন ব্রিজ। ওপারে কী সুন্দর হয়েছে শহরটা। বাড়িগুলো টাটকা সবজির মতো সতেজ। ভীষণ হাসিখুশি ওখানকার মানুষেরা। সুখে জীবন উপচে পড়ছে।
এই অন্ধকারে?
ক্ষতি কী? অন্ধকারই ভালো। কেউ দেখবে না।
তোমার পোশাক?
সে তো কেড়ে নিয়েছ।
আমি?
নিশ্চয়ই। যদিও স্বেচ্ছায় পোশাক ছাড়ার অভ্যাস আমার চিরকালের। অনুরোধ করলেই খুলতাম। জোর করার দরকার ছিল না।
তোমার এই নগ্ন শরীরটা বিশেষত্বহীন, অন্ধকারের চাইতেও কুৎসিত তোমার এই দেহ।
তাতে কী এসে গেল? আমি কখনোই চাইনি আমার শরীর দেখে কেউ সৌন্দর্য উপভোগ করুক। তোমার মতো সুপুরুষ আমি নই। কিন্তু আমার মন, ছুটন্ত ঘোড়ার মতো। এই বয়সেও আমি টগবগে। জীবন উপভোগের জন্য আমি কি না করেছি। এত রোজগার। এত সুন্দর বাড়ি। বিলাসের জিনিসপত্তর সব মজুত। বৌ ছেলে মেয়ে সবাই সুখী। গাড়ি নিয়ে পাড়া থেকে যখন বের হই, নিজেকে রাজা মনে হয়।
অথচ তুমি সৎ?
একশো ভাগ। কোথাও কালির আঁচড় নেই।
তাহলে মাখনটুকু চেটে নাও।
দয়া করে অন্য কথা বল। তোমার ভালোর জন্যই বলছি।
তুমি অন্যের ভালো চেয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলে?
এখন যদি হঠাৎ আলো চলে আসে?
বিল্বদল চমকে তাকাল আকাশের দিকে। আজ কি অমাবস্যা?
যারা ট্রানসফর্মার সারাচ্ছে তাদের মধ্যে আমার এক বন্ধু আছে। এক ক্লাসে পড়তাম। ফার্স্ট বয় ছিল। ইঞ্জিনিয়ার।
মাছের আঁশে মাঝেমাঝেই পা ঢেকে যাচ্ছে। পা থেকে আঁশ ছাড়াতে ছাড়াতে বিল্বদল বলল, জায়গাটা পরিষ্কার করে না।
তোমার সুবিধা। তবে আলো চলে এলে লাভ হবে না।
কী বলছিলে? ফার্স্ট বয়?
ও হ্যাঁ। প্রলয় উৎসাহ দেখায়। সেই বন্ধু, বুঝলে,খুব কাজের ছেলে। খুব মেধাবী আর চিরকাল অঙ্কে একশোয় একশো।
আর তুমি?
গড়পড়তা। সাধারণ।
অথচ গাড়ি,বাড়ি, সুন্দরী বৌ। বিলাসের চূড়ায় দিন কাটাচ্ছ। তোমার মুখে একটু থুতু ছেটাই, এ্যাঁ?
বিল্বদল একদলা থুতু ছুঁড়ে মারে প্রলয়ের মুখে। প্রতিক্রিয়ার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে রুমাল এগিয়ে দেয়।
তোমাকে কিছুতেই সুন্দর লাগে না।
শরীর তো ইশ্বরের দান। সৌন্দর্য মনে।
ইশ্বরে বিশ্বাস আছে?
তিনিই তো ভরসা।
বিল্বদলের বুক উথাল-পাতাল করে। ধূপের গন্ধ! আরতি! মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি কতদিন শুনিনি! শীর্ণ শরীরে জড়ানো উপবীত। বাবা পূজো করছেন।
সহবাস কর?
এসব কথা? এত সরাসরি? এতক্ষণে প্রলয়কে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়।
ছুরি এগিয়ে দেয় বিল্বদল। মাখনটুকু চেটে নাও।
সহবাসের কথা বলছিলে না? প্রলয় অন্য প্রসঙ্গে যাবার চেষ্টা করে। এছাড়া তো জীবন অসম্পূর্ণ। যতদিন যৌবন ততদিন —
বাতাবি ফুলের গন্ধমাখানো সন্ধের হাওয়া বিল্বদলকে নিয়ে যায় একটা লাল রকে। ওপাশে জানলায় একটা মুখ। কাঁধের দুপাশ দিয়ে বিনুনি নেমেছে বুকে। স্থিরচিত্রের মতো সেই মুখ জানলার ফ্রেমে।
তুমি কিন্তু এখনও মাখনটুকু চাটলে না।
তোমার সঙ্গে শত্রুতার কোন কারণ নেই। অথচ আমরা মুখোমুখি। আমি উলঙ্গ, সব কেড়ে নিয়েছ।
বিদ্যুৎ চমকালো। লোমশ নগ্ন শরীরে প্রলয়কে মনে হয় আদিম গুহামানব।
মানুষ তো এরকম। পাকা ডুবুরির মতো ডুব দাও। মনের গভীরতম প্রদেশে। দেখবে কী কুৎসিত কদর্য।
কী ভাবছ?
বিল্বদল ছুরির মাখনে চোখ রাখে। গলে যাচ্ছে না। বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি। চেটে না নেওয়া পর্যন্ত একরকম থাকবে।
বলছ না কী ভাবছ?
কদর্য হওয়া ছাড়া মানুষের অন্য কোন পরিণতি নেই। হত্যা করা অথবা নিহত হওয়াই তার নিয়তি।
সে তো গুহামানবের কথা। তখন ছিল অস্তিত্বের লড়াই।
এতটুকু বদলায় না। এই অন্ধকার, তোমার নগ্নতা আর আমার হত্যার লিপ্সা।
প্রলয় তার বৌ-এর মুখ মনে করতে চেষ্টা করল। সন্তানদের নাম। অকারণ এক মৃত্যুর মুখোমুখি সে। লোকটার সঙ্গে শত্রুতা নেই। তাকে চেনে না পর্যন্ত। অনেককে সে চাকরি দিয়েছে। অনেকের চাকরি খেয়েছে। তার অভিযোগে অনেকে আজও জেল খাটছে। কিন্তু এই লোকটার সে কোন ক্ষতি করেনি।
আঁশ, মুরগির পালক আর ফুলকপির পাতায় পা ডুবিয়ে বিল্বদল আকাশের দিকে তাকাল। মাঠের শেষে দূরে দিগন্তে পাহাড়ের সারি। কালো কালো গাছ সারিবদ্ধ হেঁটে চলেছে দূরের অন্য এক পাহাড়ের দিকে।
তাহলে সেরে ফেলি —
প্রলয় হাসে। ফ্যাকাশে হাসি। এইভাবে হাসার জন্য মানুষের জন্ম হয় না। বিল্বদলের কান্না পায়। কান্নায় চুরমার হয়ে যেতে চায়।
একটা সত্যি কথা বলবে?
বিল্বদলের কথায় ফুল ঝরে যাওয়ার শব্দ। প্রলয় অবাক চোখে তাকায়। মাছের আঁশে বিল্বদলের কোমর ঢেকে গেছে। মাথায় মুরগির পালক। শরীরের ঊর্ধ্বভাগ কপি পাতায় ঢাকা।
বল,কী জানতে চাইছ?
কাউকে কোনদিন ভালো বেসেছ?
রোদজ্বলা হলুদ ফ্যাকাশে হাসি প্রলয়ের মুখে ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে বিল্বদল মুখ ফিরিয়ে নিল। এই হাসি হাসতে হবে জানলে হয়তো মানুষের সৃষ্টিই হত না।
ভালোবাসতে চেয়েছি।গভীরভাবে ভালোবাসা চেয়েছি।
প্রশ্নের উত্তর দাও।
বিল্বদল অধৈর্য হয়।
নাহ্ — ভালোবাসা কথাটাই অর্থহীন।
অর্থপূর্ণ তবে কী?
জানি না,তবে জীবনগুলো ভালো হতে পারত। শুরুটা তেমনই ছিল। প্রথম উইকেটে সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ। অথচ আনপ্লেয়বেল পিচ, অসমান বাউন্স। হেলমেট নেই। চেষ্টগার্ড ছিল না।
বাঃ, এটা ভালো বলেছ। বিল্বদল মাথা থেকে একটা পালক ছুঁড়ে দিল।
প্রলয় দেখল ওর মাথার চুলগুলো সাদা পালকে ভরে গেছে।
ব্রয়লার, তাই না?
বিল্বদল হাসল। লাল,খয়েরি মুরগিরা কোথায় গেল! গলা ফোলানো চকচকে মোরগ?
ব্রয়লার স্বাস্থ্যসম্মত। প্রচুর উৎপাদন। এখন হ্যাচারির যুগ।
সব সাদা। বিল্বদল বিষণ্ণ স্বরে বলল। একদম সাদা। একরকম। কোথাও অমিল নেই।
তুমি কাঁদছ? প্রলয় অবাক হয়।
বিল্বদল ছুরিটা এগিয়ে দিল। মাখনের চকচকে ভাবট এখনও বজায় আছে।
কিন্ত রক্ত যে তোমার সহ্য হয় না।
তবু চেটে নাও।আদেশের সুরে বিল্বদল বলে।
মনে হচ্ছে আলো এসে গেল।। আমার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুর সঙ্গে তোমার আলাপ হল না। ফার্স্ট বয়। যে কী দারুণ ব্যাপার।
সারাজীবন ফার্স্ট থাকা কী চাট্টিখানি ব্যাপার?
তার থেকেও দারুণ ব্যাপার হল সারাজীবন একজনের প্রেমে বিশ্বস্ত থাকা।
তুমি! প্রলয় হো হো করে হেসে উঠতে চাইল। কিন্তু তার হাসির ফ্যাকাশে রঙে সেই ভাবটুকু ফুটল না।
তবু সে চেষ্টার কসুর করল না। প্রেমের তুমি কী বোঝ?
দুপুর রোদে খালি মাঠে খালি গায়ে ফুটবল খেলেছ কখনো? একা। একদম একা। এগারো এগারো বাইশজনের বদলে তুমি একা। সবার খেলা খেলে দিচ্ছ। মাথার উপরে মাঝ দুপুরের সুর্য।
এর সঙ্গে প্রেমের কী সম্পর্ক? প্রলয়ের গলায় শীতঘুম জড়ানো স্বর।
কিছু নেই। নিরবচ্ছিন্ন সুখ যেমন হয় না, প্রেমও সেরকম, অবয়বহীন কিছু একটা। অথবা কিছু না হয়ে ওঠা। কিছু হয়ে ওঠার বিরোধিতাই প্রেমের ধর্ম। আর সে জন্য প্রেম অবাস্তব।
এবার শুরু কর। আলো এসে গেছে। প্রলয় দু'হাতে গোপনাঙ্গ ঢাকে।
এখনও লজ্জা — বিল্বদল অবাক স্বরে বলে। দেখ হত্যার আগে কী কী করতে হয় আমও জানি না। সাহায্য কোরো কিন্তু।
প্রলয় আশ্বাসের সুরে বলে, সে নিয়ে ভেব না। তবে ন্যাংটোর পদ্ধতিটা বেশ। শিরদাঁড়া আগেই ভেঙে যায়।
আর কিছু? স্ফটিকের মাখনে চোখ রেখে বিল্বদল বলে।
আমার বৌ তোমাকে ভালোবাসে। তোমাকে অথবা অন্য একজনকে। সুবিধার জন্য তোমার কথা ভাবছি।
কপি পাতার সজীবতায় বিল্বদল যেন যৌবন ফিরে পেল। নারী সান্নিধ্যের সম্ভাবনা তাকে প্রাণময় করে তোলে। সহবাস এক অমোঘ প্রবৃত্তি। নারী সম্পত্তি বিশেষ। হাত বদলের সম্ভাবনায় সে উত্তেজিত হয়। মাছের আঁশের গন্ধ ছিল শান্তনুর কামনার কারণ। সত্যবতী সহবাসে সাহায্য করেছিল।
সেই আঁশগন্ধ পৃথিবীর অর্ধাংশ জুড়ে। কোটি কোটি মানুষ প্রেমের ভুবন তৈরির কাজে ব্যস্ত। একমাত্র মৃত্যুই পারে তাদের এই কাজ থেকে বিরত করতে।
অনেক ভালো মৃত্যু। প্রলয় বলে। যেখানে বিশ্বাস নেই। বাঁচা মানে অভ্যাসের দাসত্ব।
কপি পাতায় বসন্তের দোলা। বিল্বদল দু'কলি গান বেঁধে নেয় গলায়।
আলো আসছে। চাঁদ নয়, বিদ্যুৎ নয়, এবার তাঁর উদয়। প্রলয় হাততালি দেয়। নেচে ওঠে। দু'হাত তুলে শূন্যে লাফ দওয়ার মুহূর্তে টের পায় তার শিশ্ন অদৃশ্য। ফাঁকা। শূন্যস্থান পূরণের জন্য মরিয়া চেষ্টায় সে তার সন্ধানী চোখ রাখে বিল্বদলের হাতে।
ছুরিটা এগিয়ে আসে নোনা রক্তের স্বাদে জিভ ভিজে যায়।
লজ্জাস্থানে হাত রেখে প্রলয় ঘুমিয়ে পড়ে।
***
প্রথম ছাপা গল্প: অনীক পত্রিকা
গল্পগ্রন্থ সংখ্যা: ৬টি
উপন্যাস: ৪টি
তপনকর ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যা:
নান্দীমুখ পত্রিকা
২০২৪ গল্পমেলা পুরস্কার প্রাপক।


2 মন্তব্যসমূহ
একেবারে অন্যরকম লেখা। প্রতীকী এবং রহস্যময়।
উত্তরমুছুনপ্রতিভা সরকার।
অন্যরকম ভালো লাগলো গল্পটা।
উত্তরমুছুন