মল্লিকা ধরের গল্প : পান্থ



এক

দীটা সম্পূর্ণ সাদা এখন, বরফের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে । পাড়ের ধূসর নুড়িপাথর, যা এখন বরফে ঢাকা, সেইসব পার হয়ে শীতের অরণ্য । এখন সেখানে শুধুই পাইন, ফার, স্প্রুস, সিডার, ম্যাগনোলিয়া, ইউ এইসব চিরহরিৎ গাছে পাতা রয়েছে সবুজ । বাকি যা মেপল, ওক, ওয়ালনাট ইত্যাদি পত্রমোচী গাছ আছে, তারা রিক্ত কঙ্কালের মতন পত্রহীন ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে নীল আকাশের পটভূমিতে ।

অরণ্যের মাটি ঢেকে আছে ঝুরো তুষারে, গতকাল তুষারপাত হয়েছিল গোটা দিন জুড়ে । আজ অবশ্য আকাশ পরিষ্কার, সূর্য উঠেছে । এখন বিকেল । এরই মধ্যে ছায়া কত দীর্ঘ, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। সূর্যাস্তের দেরি নেই আর ।

একদল মানুষ এসে থামে এই বরফজমাট নদীতীরের অরণ্যে । অরণ্য ও নদীর মাঝের খোলা স্থানটিতে পশুচর্মের তাঁবু খাটায় । ওরা যাযাবর পান্থ মানুষের দল । চিরদিন ওরা ঘুরে বেড়ায় দেশে দেশান্তরে । তাঁবুর মধ্যে ছোটো ছোটো গোল গর্ত কেটে কাঠকুটো সাজিয়ে তাতে আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা করে তারা । শীত থেকে রক্ষা, রান্নাবান্না সবকিছুর জন্যই আগুনের দরকার ।

এইখানে আমাদের গল্পের পর্দা ওঠে । লোমশ পশুচর্মের পোষাক পরা জটা-জটা বাদামী চুলের এক তরুণী একটা তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়ায় নদীর তীরে ।

নদীতীর ধরে হাঁটতে থাকে সে, তাঁবু থেকে ক্রমেই দূরে আরও দূরে সরে যেতে থাকে । নদীতীর থেকে অরণ্যের দিকে সরে যেতে থাকে । একসময় কোমরের বাঁধুনির কাছ থেকে বের করে আনে আশ্চর্য এক হাড়ের বাঁশি ।

ঝাঁপালো এক ইউ গাছ চারিদিকে সরু সরু সূচের মতন পাতাওয়ালা ডালপালা নামিয়ে এক কুঞ্জ রচনা করেছে । সেইখানে পড়ে আছে এক ধূসর পাথর । উপরে ঝাঁপালো গাছের ডালপাতার আচ্ছাদন থাকায় এই পাথরে বরফ পড়ে নি । যেন ছোট্টো একটা ঘর, তার মাঝখানে পাথরটি । সেই পাথরে বসে বাঁশি বাজাতে থাকে মেয়েটি ।

সূর্যাস্তের মুহূর্তে সেইখানে এসে হাজির হয় এক তরুণ । সেও ওই পান্থদলের একজন । কুঞ্জে দু’জন দু'জনের মুখোমুখি এখন । বাঁশি থেমে গিয়েছে । দু'জনের দু'জোড়া চোখ পরস্পরকে বেঁধে রেখেছে মাদক সম্মোহনে । কাছে, আরও কাছে । লোমশ পোষাক খসে পড়ে । আলিঙ্গন গাঢ়তর হয় ।

এইসময়ে ভূমিকম্প শুরু হয় । ছেলেটি মেয়েটিকে ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে ওঠে, কাঁপা গলায় বলে, "পৃথিবী কাঁপছে, রিহানা"

‘শ-শ-চুপ’ ঠোঁটে আঙুল দেয় মেয়েটি, "কথা বোলো না, আয়ুশ, চুপ করে শোনো । শুধু শোনো । আলোর শব্দ শুনতে পাও?"

পরিত্যক্ত পোশাক কুড়িয়ে নিয়ে পরতে পরতে ছেলেটি বলে,"রিহানা, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে? ওঠো, পালাতে হবে ।"

অনাবৃতদেহা রিহানা নৃত্যরত ভূমির উপরে শুয়ে পড়ে । চোখ বুজে বলে, "আহ, আমার আর ফেরা হবে না । তুমি ফিরে যাও, আয়ুশ ।"

আয়ুশের নিজের পোশাক পরা হয়ে গিয়েছিল । সে রিহানার কাছে এসে ওর পরিত্যক্ত পোশাক ওর গায়ের উপরে জড়িয়ে কোমরে ডুরি দিয়ে বেঁধে দেয় । তারপরে বলে, "পাগলামি কোরো না রিহানা, ওঠো । পালাতে হবে ।"

আর একটা কাঁপন আসে মাটির ভিতর থেকে । রিহানা চোখ বুজেই হাসে, জড়ানো গলায় বলে, "কোথায় পালাবে আয়ুশ? দিগন্ত থেকে দিগন্ত অবধি মৃত্যু ।"

কিন্তু আয়ুশ শোনে না, জোর করে রিহানাকে টেনে তুলতে চায় । রিহানা মাটি আঁকড়ে থাকে । এমন সময় দূর থেকে একটা শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায়, ঝড় আসছে বুঝি ।

সূর্যাস্ত হয়ে গেলেও আকাশে গোধূলির আলো ছিল, হঠাৎ আলো ঢেকে যায় । আকাশ যেন ধোঁয়ায় অন্ধকার । সাদা অন্ধকার । তুষার ঝড় আসছে । এদিকে ঝলকে ঝলকে মাটি কেঁপে উঠছে । গোঁ গোঁ করে আওয়াজ হচ্ছে, সে কি ঝড়ের বুক থেকে নাকি মাটির তলা থেকে, বোঝা যাচ্ছে না ।

আয়ুশ রিহানাকে টেনে তুলতে পারে নি, বরং রিহানা আয়ুশকে ধরে রেখেছিল । কানের কাছে ফিসফিস করে সে কী যেন বলছিল, ঝড়ের শব্দে আয়ুশ শুনতে পায় নি ভালো করে । রিহানা আবার বলল, আবার ।

আয়ুশ ওর মুখের কাছে কান নিয়ে গিয়ে শুনল রিহানা বলছে, “আয়ুশ, আমার আর গোষ্ঠীতে ফেরার উপায় নেই । তুমি ফিরে যাও, বোলো রিহানাকে খুঁজে পাও নি, সে হারিয়ে গিয়েছে । হাড়ের বাঁশিটা নিয়ে যেও, বোলো এটা কুড়িয়ে পেয়েছ জঙ্গলে । তাহলে সবাই ভাববে রিহানা সত্যিই হারিয়ে গিয়েছে, ফেলে গিয়েছে বাঁশিটা ।“

কুঞ্জের বাইরে ঝড় আবার শোঁ শোঁ করে ওঠে, লক্ষ লক্ষ তুষারকণা ঘূর্ণির মত ঘুরতে থাকে । আয়ুশ ফিসফিস করে বলে, “কিন্তু কেন রিহানা? তোমার গোষ্ঠীতে ফেরার উপায় নেই কেন?”

রিহানা কেমন পাগল-পাগল হাসি হেসে বলে, “এক অভিশপ্ত পরী মানুষের ঘরে মেয়ে হয়ে জন্মেছিল । একটু বড় হয়েই এক বুড়ো যাদুকরের কাছ থেকে সে বাঁশি বাজাতে শিখেছিল । একা একা সে বাঁশি বাজাতো বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে । বাঁশি শুনে আকৃষ্ট হয়ে এক মধ্যগ্রীষ্মের জ্যোৎস্নারাতে তার কাছে আসে এক রুপোলি নাগ । পাকে পাকে জড়িয়ে ধরে, সে জ্ঞান হারায় । যখন জ্ঞান ফেরে তখন সে দেখে সর্বাঙ্গ ব্যথার্ত, নাগপাশচিহ্ন বেগুনী দাগ হয়ে বসে গিয়েছে তার গায়ে, উঠতে গিয়ে উঠতে পারে না । অনেক চেষ্টায় উঠে সে ঝর্ণায় স্নান করে, তারপরে ফিরে যায় গোষ্ঠীতে । দাগ তখন মিলিয়ে গিয়েছিল । আবারও অরণ্যে সে বাঁশি বাজিয়েছে, আবারও নাগ এসে পাকে পাকে জড়িয়েছে তাকে, পিষ্ঠ হতে হতে হতে হতে জ্ঞান হারিয়েছে সে । জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখেছে সর্বাঙ্গে নাগপাশচিহ্ন রেখে নাগ চলে গিয়েছে কখন । ব্যথায় অবশ শরীর টেনে সে ঝর্ণায় স্নান করে নিদাগ হয়ে ফিরেছে তাঁবুতে । কারুকে কিছু বলে নি । সাবধানে লুকিয়ে রেখেছে সব কথা । তবু মাতৃগণের কেউ কেউ সন্দেহ করেছে । গোপণে সেই মেয়ের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থাও করেছে তারা । কিন্তু তাতেও দোষস্খালন হয় নি । হেমন্ত পার হয়ে মধ্যশীতে এসে সে দেখছে আর সে লুকোতে পারবে না নাগচিহ্ন । এতদিন চিহ্নগুলো শুধু সাময়িকভাবে দেখা দিত, কিছু পরে মিলিয়ে যেত । এইবার এইসব চিহ্নগুলো ফুটে উঠবে, স্থায়ী হয়ে যাবে । গোষ্ঠীপতি জানলে মৃত্যুদন্ড । তাই সে তার হৃদয়সখাকে শেষবারের মত বাঁশিতে ডেকে এনে ...."

আয়ুশ বলে, “এসব কী বলছ রিহানা? পাগল হয়ে গেলে নাকি? সবাই জানে তুমি কল্পনায় নানা জগতে ঘুরে বেড়াও । এসব তারই ফল ।”

আয়ুশের ডানহাত নিজের অনাবৃত নাভির উপরে চেপে ধরে রিহানা বলে, "বুঝতে পারছ কিছু? টের পাচ্ছ তরঙ্গ? সে আসছে, সে আসছে ।"

গুমগুম করে একটা আওয়াজ আসে দূর থেকে । যেন অনেক দূরে পৃথিবীর অভ্যন্তরে এক গোপণ গুহায় এক বিরাট দৈত্যাকৃতি নাগ গোঙাচ্ছে । গোঙাতে গোঙাতে গড়াগড়ি দিচ্ছে । মাটি আবার কাঁপতে থাকে । রিহানা আর আয়ুশ উপুড় হয়ে মাটি আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকে । ভূমি আজ নৃত্যরত, কেজানে এ প্রলয়নৃত্য কিনা ।

গুমগুম শব্দটা বেড়ে উঠছে । কোথায় যেন কিছু ভেঙে পড়ছে, বিশাল কিছু । মাটি কাঁপা একটু কমেছিল, আবার দ্বিগুণ বেড়ে ওঠে ।

ওরই মধ্যে রাত নামে । কাটতে থাকে প্রহরের পর প্রহর । তুষারপাত, ভূমিকম্প আর ভাঙনশব্দ চলতে থাকে ।

শেষরাত্রে সমস্ত কিছু থামে । ভীতিকর নৈঃশব্দ্য ভরিয়ে তোলে চরাচর । আকাশ পরিষ্কার হয়ে তখন দেখা দিয়েছে ক্ষয়া চাঁদ । চরাচরব্যাপী সাদা তুষারের উপরে তার অল্প জ্যোৎস্না এসে পড়ে অনাসক্ত অনুরাগীর মত ।

ইউগাছের ডালপাতার আচ্ছাদনের নিচে তখন আয়ুশ আর রিহানা দু'জনেই ঘুমন্ত । দীর্ঘ মানসিক টানাপড়েন আর লড়াইয়ের পরে তারা আর জেগে থাকতে পারে নি ।

।।দুই।।

আঁ আঁ আঁ । উড়ে যেতে থাকা একদল পাখির তীক্ষ্ণ ডাকে আয়ুশের ঘুম ভাঙল । সে উঠে বসে ডালপাতা সরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল । উপরে তাকিয়ে দেখল আকাশ পরিষ্কার । পুবের আকাশ লাল-গোলাপী, সূর্যোদয় আসন্ন । তারপরেই হাওয়ার স্পর্শে সে কেঁপে উঠল, হাওয়া প্রচন্ড ঠান্ডা। সে নিজের লোমশ পোশাক ঘন করে জড়াল ।


তারপর ঘুমন্ত রিহানাকে না জাগিয়ে নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে রওনা হল তাঁবুর দিকে । রিহানা এত গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন যে কিছু টেরও পেল না । হয়তো ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের অলিগলিতে সে তখন ঘুরে ঘুরে পথ খুঁজছে ।

কিছুদূর গিয়েই আয়ুশ বুঝল বদলে গিয়েছে সব । বিরাট ভাঙন গভীর দীর্ঘ খাত তৈরী করেছে, পার হওয়া অসম্ভব । ভাঙনের পার থেকে সে দেখল দূরে নদীটা দেখা যাচ্ছে, এখন সেটা অনেক চওড়া, তার পারে যাযাবরদের তাঁবুগুলো নেই । হয়তো ওরা গত রাত্রেই তাঁবু গুটিয়ে পালাতে পেরেছে, নয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে ।

সে রিহানার ঘুমন্ত শরীর কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে শোয়াল । তারপর জোরে ঝাঁকানি দিয়ে দিয়ে ডাকল ওকে । ঘুমেলা সুরে রিহানা বলল, "উঁ?" তারপর পাশ ফিরে শুতে গেল । পরক্ষণেই ঘুম ভেঙে গেল ওর, " অ্যাঁ, কে?" বলে ত্রস্ত হয়ে উঠে বসল ।

আয়ুশ সামনেই বসে ছিল, বলল, "আমরা দু'জনে ছাড়া আমাদের দলের আর কেউ রক্ষা পেয়েছে কিনা জানিনা । বিশাল ভাঙন, পার হওয়া যাবে না । এবারে কী করি?"

রিহানা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেয়ে দেখল চারপাশ । তারপর বলল, "ভাঙন পেরোনো যাবে না । উল্টোদিকেই যেতে হবে, জঙ্গলের দিকে । সব যাযাবর নিরুদ্দেশ, বাকী আছি দুই যাযাবর । হয়তো কোনো অন্য দলের সঙ্গে দেখা হতে পারে । চলো ।" উঠে দাঁড়ায় রিহানা, হাত বাড়িয়ে দেয় আয়ুশের দিকে ।

আয়ুশ অবাক হয়ে তাকায় । কালকের রিহানা আর আজকের রিহানায় কত তফাৎ ! কালকে রিহানা পাগলের মত আচরণ করছিল, আজকে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ, সেই আগের মতন বুদ্ধিমতী, সাহসী, বাস্তববাদী ।

রিহানার বাড়ানো হাত ধরে আয়ুশ উজ্জ্বলমুখে উঠে দাঁড়ায় । তারা চলতে থাকে অরণ্যের দিকে । প্রথমে হালকা জঙ্গল, তারপরে ঘন হয়ে ওঠে অরণ্য । ওরা খাদ্যোপযোগী কিছু কন্দ আর বাদাম পায়, জলের বদলে তুষার তুলে মুখে নেয় । সারাদিন চলার পরেও অরণ্যের শেষ নেই । ওরা গাছে উঠে রাত কাটায় । পরদিন আবার চলা ।

এইভাবে কতদিন চলেছিল ওরা জানে না, হয়তো তিন-চার দিন কিংবা হয়তো দিন সাতেক । বা আরও বেশি । ওরা একদিন দেখতে পেল এসে পৌঁছেছে বিরাট এক পাহাড়ের পায়ের কাছে । আর সেখানে খোলা জমিতে কাঠের বেড়ায় ঘেরা আশ্চর্য এক বসতি । একদল মানুষ এখানে স্থায়ী বসতি তৈরী করেছে !

এতকাল ওরা যাযাবর মানুষই দেখেছে, স্থায়ী বসতি সেই প্রথম দেখল । বাসিন্দারা বেশ শান্তশিষ্ট মানুষ । আয়ুশ আর রিহানাকে নিঃসহায় আর আশ্রয়প্রার্থী দেখে নিজেদের বসতিতে আশ্রয় দিল, খেতে দিল নানারকম ফল আর বাদাম, মাছপোড়া, কন্দ পোড়া । বসতির কাছেই একটি হ্রদ, সেই হ্রদে এরা মাছ ধরে । তাছাড়া জঙ্গলে শিকার করে আর ফল বাদাম কন্দ মূল কাঠকুটো ইত্যাদি সংগ্রহ করে । ওদের ভাষা সহজসরল, সামান্য চেষ্টাতেই রিহানা আয়ুশ শিখে ফেলল । কাঠের খুঁটি আর শুকনো ডাল-পাতার ছাউনি দিয়ে রিহানাদের থাকার জন্য একটি ঘরও বানিয়ে দিল ওরা । দিনকতক যেতে না যেতে যেন এদেরই হয়ে গেল আয়ুশ রিহানা ।

তারপরে চলে গেল কত দিন কত দিন । বাঁকা চাঁদ কতবার পুরুষ্টু হতে হতে গোল হয়ে উঠল, আবার ক্ষইতে ক্ষইতে নেই হয়ে গেল । একদিন আয়ুশ-রিহানার সংসারে এসে গেল নতুন অতিথি, তাদের পুত্র । তারা ওর নাম রাখল রিহাশ ।

রিহাশের যখন বছর দুই বয়স, তখন থেকেই রিহানা ক্রমশ উদাসীন আর শীতল হয়ে পড়তে থাকে । আয়ুশ আকৃষ্ট হয় আহিলা নামে এক তরুণীর দিকে, সেই মেয়েও আয়ুশকে পছন্দ করে । আয়ুশ আহিলার প্রণয় ক্রমে জানাজানি হয়ে যায়, কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল রিহানা কোনো আপত্তি করেনা । সেই বসতিতে তো বটেই, তাদের যাযাবর গোষ্ঠীতেও বহুবিবাহ প্রচলিত ব্যাপার ছিল । তবু কেন যেন আয়ুশ মনে করত হয়তো রিহানা তাকে একান্ত একলার জন্যই চায় । তাই তার গ্লানিবোধ হত । সে রিহানাকে বলেওছিল যে রিহানার যদি আপত্তি থাকে তাহলে সে আহিলার কাছে আর যাবে না । কিন্তু রিহানা বলেছিল তার কোনো আপত্তি নেই , আয়ুশের বরং উচিত আহিলাকে বিবাহ করে ঘরে আনা । তবুও আয়ুশের মনের দ্বিধা দূর হয় নি । রিহানার ঘরে সতীন এনে তুলতে পারেনি ।

তারপর একদিন, রিহাশের তখন বছর চারেক বয়স, সকালে উঠে আয়ুশ দেখল ঘরে সে ছাড়া আর কেউ নেই । শয্যার পাশে একখানি বড় পাতার উপরে যত্ন করে রিহানার সেই হাড়ের বাঁশিটি রাখা । আর ক্ষুদে ক্ষুদে শুকনো বীজ সাজিয়ে সাজিয়ে মেঝেতে আঁকা আছে এক নারী একটি শিশুকে কোলে নিয়ে চলেছে, শিশুটিকে হাত বাড়িয়ে দেখাচ্ছে দূরের কিছু । ছবির মাধ্যমে রিহানা বুঝি বলে গিয়েছে চিরকালের পান্থ সে, ঘর তার জন্য নয় । তাই পথে বেরিয়ে পড়েছে সে আবার।

আয়ুশ বাঁশিটা তুলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে বসে থাকে । মনের চোখে দেখতে থাকে কোন দূর মাঠ বন পাহাড় পার হয়ে চলেছে রিহানা, যে সমুদ্রের কথা তারা শুনেছিল জাদুকর রুক্কলের কাছ থেকে, সেই সমুদ্রের দিকে ।
***

লেখক পরিচিতি: মল্লিকা ধর। জন্ম ছিন্নমূল উদ্বাস্তু পরিবারে, পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার কোন্নগরের নবগ্রাম অঞ্চলে । পূর্বজদের আদিনিবাস ছিল বাংলাদেশের ঢাকা জেলার শিমূলিয়া গ্রামে । পিতামহ ছিলেন পেশায় শিক্ষক ও নেশায় সাহিত্যিক । হয়তো সেই সাহিত্যকর্মের কিছু উত্তরাধিকার পৌত্রীতে বর্তেছে ।

মুদ্রিত মাধ্যমে প্রথম ছোটোগল্প ছাপা হয় ২০১০ সালে, 'দেশ' পত্রিকায় । তারপরে আরও বেশ কয়েকটি ছোটোগল্প ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে 'দেশ' ও 'আনন্দমেলা' পত্রিকায় । দু'টি নভেলা ও একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে । নভেলা দু'টির নাম 'অশেষ আকাশ' ও 'অনন্ত আগামী'। উপন্যাসটির নাম 'অমৃত আশাবরী'। একটি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশের 'প্রকৃতি পরিচয়' প্রকাশনী থেকে । প্রবন্ধগ্রন্থটির নাম 'কণাজগৎ ও মহাজগৎ' ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক । যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন মিসিসিপি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স ও কণাপদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট । পেশা ইস্ট টেনেসী স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষকতা । কিছুদিন জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষকতাও করেছেন । অবসরে কবিতা ও গান শোনা, ছবি তোলা আর ছবি আঁকা পছন্দ ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ