অনুবাদ: অনামিকা বন্দোপাধ্যায়
মাংস
ঘটনাটা এক্কেবারে সাদামাটা ভাবেই ঘটল, একদম কোনরকম কোন ভনিতা ছাড়াই । যে কারণগুলোর জন্য ঘটল, তাও তেমনভাবে বলবার মত কিছুই নয়, যা হচ্ছিল তা হল এই— যে শহরে মাংসের ভয়ানক সংকট দেখা দিয়েছিল। আর তাতে সবাই অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, রাগে-ক্ষোভে সবাই গলা ফাটাচ্ছিল, এমনকি প্রতিশোধ-টতিশোধও নেওয়া হবে, এমন সব কথাবার্তাও শোনা যাচ্ছিল । কিন্তু, চিরকালের নিয়ম মতো, এই প্রতিবাদগুলো শেষমেশ শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকল। আর অচিরেই শহরের ক্ষুধার্ত লোকেরা নানা কিসিমের সব আনাজ-পাতি চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া ধরল।
কেবল মিস্টার আনসালদো এই নিয়ম মানলেন না। এক অদ্ভুত শান্তিময়তা নিয়ে একদিন তিনি বিশালাকার এক রান্নার ছুরি নিয়ে তাতে শান দিতে শুরু করলেন, তারপর নির্লিপ্তভাবে প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত নামিয়ে নিজের বাঁ দিকের নিতম্ব থেকে এক টুকরো সুন্দর একখানা ফিলে কেটে নিলেন।
তারপর তিনি টুকরোটি পরিষ্কার করে তাতে লবণ ও ভিনেগার মাখালেন, তারপর সেটাকে প্রথমে গ্রিলে চড়ালেন, এরপর একখান ইয়া বড় ফ্রাইপ্যানে সেটাকে ভাজলেন, যেটা তিনি সাধারণত প্রতি রবিবার করে টর্টিয়া বানানোর সময় ব্যবহার করতেন। এরপর তিনি আরাম করে গিয়ে টেবিলে বসলেন, এবং তারপর পরম আস্বাদে তার নিজস্ব মাংসের টুকরোটাকে খেতে শুরু করলেন।
ঠিক তখনই দরজায় কে যেন কড়া নাড়ল—পাশের বাড়ির এক প্রতিবেশী এসেছেন ক্ষোভ প্রকাশ করতে। আনসালদো, এক চমৎকার অসামান্য ভঙ্গিতে, প্লেটে রাখা টুকরোটির দিকে ইশারা করলেন।
প্রতিবেশী তো বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী?”
আনসালদো তাকে কেবল তার বাঁ নিতম্বের দিকে তাকাতে বললেন। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল।
প্রতিবেশী, হতবাক ও গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে, কোনো কথা না বলেই চলে গেলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এলেন শহরের মেয়রকে সঙ্গে নিয়ে।
মেয়র বললেন, “আমাদের প্রিয় শহরের জনগণও যেন তোমার মতোই তাদের ব্যক্তিগত রিজার্ভ থেকে নিজেদের পুষ্টির যোগান দেয়!”
মামলা-মোকদ্দমার কোনো প্রশ্নই উঠল না, বরং কিছু সামান্য অত্যন্ত মার্জিত তর্ক-বিতর্কের পর, আনসালদো শহরের কেন্দ্রীয় স্কয়ারে গিয়ে জনসাধারণের জন্য এক খোলামেলা “ডেমনস্ট্রেশন” উপস্থাপন করলেন।
সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করলেন যে, প্রতিটি মানুষ তার বাঁ নিতম্ব থেকে দুটো ফিলে কেটে নিতেই পারে। তিনি দেখালেন, কীভাবে একটির বদলে দুটো টুকরো নিতে হবে—কারণ, তিনি যেহেতু নিজে একটা ফিলে ইতিমধ্যেই কেটেছেন, তা হলে অন্যরা যেন এর চেয়ে কম না পায় বা খায়।
যখন বিষয়টি সবাই পরিষ্কার করে বুঝে গেল, তখন সবাই তাদের বাঁ নিতম্ব থেকে দুটো করে ফিলে কাটতে শুরু করল।
এটি ছিল অভূতপূর্ব একটি দৃশ্য—কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া অনুচিত।
এরপর গণনা করা হলো—শহরের লোকেরা কতদিন নিজেদের শরীরের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকতে পারবে।
একজন নামকরা চিকিৎসক হিসেব করে দেখালেন, যে একজন ১০০ পাউন্ড ওজনের ব্যক্তি (ভেতরের অখাদ্য অংশ-টংশ বাদ দিয়ে) প্রতিদিন আধা পাউন্ড হারে ১৪০ দিন পর্যন্ত মাংস খেতে পারবে। তবে এই গণনা একটু বিভ্রান্তিকরও ছিল।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একটাই—তা’হল সবাই যেন তাদের নিজস্ব মাংস খেয়ে অন্তত টিকে থাকতে পারে।
শীঘ্রই মহিলারা আনসালদোর এই মডেলের সুবিধাগুলি নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করলেন।সুবিধা বলতে যেমন, যারা তাদের নিজেদের স্তনগুলি খেয়ে ফেলেছিল, তারা আর কাপড় দিয়ে দেহ ঢাকার কোন প্রয়োজনই অনুভব করছিল না, ফলে তাদের পোশাক মাত্র নাভির ওপরে এসে ঠেকলেও চলছে। কোন সমস্যা নাই । কিছু কিছু নারীরা—যদিও সবাই না—আর কথাই বলছিল না, কারণ তারা নিজেদের জিভ চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছিল (যা, বলাইবাহিল্য উল্লেখযোগ্যভাবে, রাজাদের অন্যতম প্রিয় খাবার)।
শহরের রাস্তাগুলোতে মজার সব দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল—যেমন, দুই বহু পুরোনো বান্ধবী, যারা বহুদিন পর একে অপরের সঙ্গে দেখা করল, কিন্তু একে অপরকে চুমু খেতে গিয়ে আর পারল না—কারণ তারা দুজনেই তাদের ঠোঁট দিয়ে দারুণ দারুন সব ফ্রিটারস বানিয়ে খেয়ে ফেলেছে!
শহরের কারাগারের প্রধান জল্লাদও এক মজার সমস্যায় পড়ল—সে এক অপরাধীর মৃত্যুদণ্ডের কাগজে সই করতে গিয়ে আর পারল না, কারণ সে নিজের আঙুলের ডগাগুলো খেয়ে ফেলেছিল! আর সেই সময় থেকেই “ফিঙ্গার-লিকিং গুড” কথাটার উৎপত্তি!
কিছু ছোটখাটো প্রতিরোধ দেখা দিয়েছিল। মহিলাদের পোশাক নির্মাতা সমিতি কড়া প্রতিবাদ জানাল, কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল, মহিলাদের তাদের দর্জিদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো উপযুক্ত স্লোগান তৈরি করা সম্ভব নয়।
তবে, এই প্রতিরোধ খুব তেমন একটা গুরুতর কিছু ছিল না এবং বলাই বাহুল্য জনগণের নিজেদের মাংস ভক্ষণে তাতে কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি।
কিন্তু শহরের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ছিল— প্রধান ব্যালে নর্তকের তার নিজের দেহের শেষ টুকরো মাংটি ভক্ষণ করার দৃশ্য। তার শিল্পের প্রতি অসীম শ্রদ্ধায়, সে তার পায়ের সুন্দর আঙুলগুলো সর্বশেষ সংরক্ষণ করেছিল।
তাকে অনেকদিন ধরেই বেশ অস্থির দেখাচ্ছিল।শেষের দিকে, যখন তার একমাত্র অবশিষ্ট মাংস বলতে ছিল তার বড় পায়ের আঙুলের সামান্য খানিকটা অংশ, তখন সে তার বন্ধুদের একদিন আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল—“এসো, আমার শেষ পারফরম্যান্স দেখে যাও!”
এক ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত নীরবতা এখন, এর মধ্যেই, সে নিজের পায়ের শেষ অংশটি কেটে নিল, এবং একটুও গরম না করেই, তার মুখের গভীর গর্তে, যা একসময় সত্যিই সুুন্দর ছিল, তার মধ্যে ফেলে দিল।
চারপাশে থাকা সবাই মুহূর্তের মধ্যেই ভয়ঙ্কর গম্ভীর হয়ে গেল।
কিন্তু জীবন থেমে থাকল না। আর সেটাই তো আসল কথা।
কিন্তু… যদি?
এটা কি কাকতালীয় বা কোন সমাপতন — সেই নৃত্যশিল্পীর জুতো আজ Museum of Illustrious Memorabilia-তে রাখা আছে?
একমাত্র নিশ্চিত তথ্য হলো, শহরের সবচেয়ে যে মোটা মানে স্থূলতম লোক—যার ওজন ছিল ৪০০ পাউন্ডের কিছু বেশি—সে লোক মাত্র ১৫ দিনেই নিজের পুরো শরীরের মাংস খেয়ে শেষ করে ফেলেছিল। সে আবার ছিল খাবারের ব্যাপারে অত্যন্ত দুর্বল মানে খুবই খাদ্যরসিক ও লোভী যাকে বলে, বিশেষ করে মিষ্টি আর স্ন্যাক্স জাতীয় খানা-পিনার প্রতি তার দুর্বলতা ছিল সাংঘাতিক।
তো—এরপর, কেউ আর তাকে খুঁজে পায়নি।
হতে পারে, সে কোথাও হয়ত একটা লুকিয়ে-টুকিয়ে ছিল…
তবে, বিষয় হল— সেই একমাত্র ব্যক্তি না—এরপর অনেকেই কিন্তু এই একই কাজ করতে শুরু করল।
এরপর একদিন এক সকালে, মিসেস ওরফিলা তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন—“ওই জিনিসটা কোথায় রেখেছিস?”
ওই ছেলেটি, যে তখন তার নিজের বাঁ কান খানা কামড়ে কামড়ে খাচ্ছিল, সে কোনো উত্তর দিল না।
অনুরোধ, হুমকি—কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হলো না। নিখোঁজ ব্যক্তিদের, বিশেষজ্ঞদের সব ডাকাটাকা হলো, কিন্তু সে ছেলে কেবল মাটিতে এক ছোট্ট একক্খান পিণ্ড মত কী দেখাতে পারল, আর ঠিক সেইখানটায় বসেই মিসেস ওরফিলা শপথ করে বললেন—“ঠিক এই জায়গাতেই একটু আগে আমার ছেলে বসে ছিল!”
তবে এসব ছোটখাটো অস্বস্তি শহরের এই নতুন সুখ, এই আনন্দে তেমন কোনো ছাপ-ফাপ ফেলতে পারেনি।
কারণ, একবার যদি টিকে থাকতে পারার একটা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, তাহলে আর অভিযোগের কী দরকার?
যে মাংসের অভাব একসময় এতো অশান্তি, কষ্ট তৈরি করেছিল, তা তো একেবারে মিটেই গেছে!
হ্যাঁ, শহরের জনসংখ্যা ক্রমাগত কমে আসছিল ঠিকই, কিন্তু তা তো মূল সমস্যার টানা-বানায় শুধুই একটা ছোট্ট প্রাসঙ্গিক ঘটনা মাত্র।
তবে শুধু প্রশ্ন একটাই—প্রত্যেকটি মানুষের শরীর- তাদের দেহ কি তাদের কাছ থেকে একেবারে সার্বিক, চূড়ান্ত কোনো মূল্য আদায় করে নিচ্ছিল?
কিন্তু এসব অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা সত্যিই এখন আর ঠিক হবে না, কারণ শহরবাসীরা এখন পরিপূর্ণ, ভরপেট খেয়ে তারা বেশ বহাল তবিয়তেই আছে!
পাখিদের মৃত্যু
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া পাখিদের গণমৃত্যুর ব্যাপারটি সম্পর্কে দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে: প্রথমটি, গণআত্মহত্যা; দ্বিতীয়টি, হঠাৎ করে বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব কমে যাওয়া।
প্রথম ব্যাখ্যাটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। শকুন থেকে হামিংবার্ড—সব পাখি যদি একসঙ্গে (দুপুরবেলা, বিভিন্ন উচ্চতায়) উড়তে শুরু করে, তবে তা কেবল দুইভাবে সম্ভব: হয় তারা কারোর কোনো নির্দেশ মানছিল, নয়তো ইচ্ছে করেই আকাশে উঠে মাটিতে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সাধারণ যুক্তি বলে, মানুষ এমন কোনো নির্দেশ দিতে পারে না, আর পাখিরা যদি নিজে থেকে এমন কিছু করে, তবে সেটাকে যুক্তিসঙ্গত বলা কঠিন।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিও খণ্ডনযোগ্য: কারন, যদি বায়ুমণ্ডল যদি সত্যি-সত্যিই পাতলা হয়ে যেত, তবে উড়তে থাকা সব পাখিরাই মারা যেত।
অতএব, আরেকটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে, তবে সেটি এতটাই কল্পনাপ্রসূত যে সামান্য বিশ্লেষণেই ভেঙে পড়ে—সে অনুযায়ী এক অজানা ভাইরাস হয়তো মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে পাখিদের এত ভারী করে তুলেছিল যে তারা আর উড়তেই পারেনি।
যদিও কোনো ব্যাখ্যাই ঠিক ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়, কিন্তু প্রতিটি ঘটনাই বাস্তব। ভাষ্যকারের ভেতরে এক ধরণের সৃষ্টিশীল শক্তির আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে। তার অহংকারের শাস্তি হল পুনরুক্তি। পাখিদের এই গণমৃত্যুর অনিবার্য সত্য থেকে একমাত্র মুক্তি পাওয়ার উপায় হল, আমরা এটিকে স্বপ্ন বলে কল্পনা করি। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে এটিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়, কারণ এটি কোনো প্রকৃত স্বপ্ন হতে পারে ন।
অতএব, তা কেবল প্রতিস্থাপিত সত্য হয়েই রয়ে যায়। আমাদের চোখের সামনে পাখিগুলো মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। এই গণহত্যার ভয়াবহতা আমাদের আতঙ্কিত করছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভীত করেছে আমাদেরকে আমাদেরই ব্যর্থতা—এমন এক বিপর্যয়ের কারণ খুঁজে বের করতে না পারার অসহায়তা। আমাদের পাগুলি অসংখ্য মৃত পাখির পালকে জড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ, দাবানলের শিখার মতো, সমস্ত পাখি যদি একসঙ্গে উড়ে ওঠে- তখন লেখকের কল্পনা বাস্তবতাকে মুছে দিয়ে তাদের নতুন জীবন দেবে। এবং তাই সাহিত্যের মৃত্যু ঘটলেই তারা আবার পৃথিবীতে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে থাকবে।
১৯৭৮
(অনুবাদ: থমাস ক্রিস্টেনসেন থেকে বাংলা ভাষান্তর)
ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
*****


0 মন্তব্যসমূহ