সেদিন শেষ বিকেলে অফিস থেকে ফিরে রুমের মধ্যে বেশ পরিবর্তন দেখতে পেলেন শাহিনুর রাহমান। তার আলমারি একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার। গ্লাসগুলো চকচক করছে। বই আর ডিভিডির এলোমেলো কালেকশন পরিপাটি সাজানো। স্পষ্ট দেখা যায় টাইটেল। শখের এই জিনিসগুলো কত বছর অবহেলায় পড়ে ছিল। লুইপা এসব করেছে। সে বসে থাকতে পারে না। কলেজ ছুটির দিনে এটা-ওটা করতে থাকে। একেবারে মায়ের মতো স্বভাব। উত্তর দেয়ালের সোনালি ফ্রেমে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে হাসে রাঈনা। শাহিনুর কেন জানি বড় নস্টালজিক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। কত বছর চলে গেল! রাঈনা নেই। আজকাল সব সহনীয় হয়ে গেছে। সেই সন্ধেয় আকস্মিক বুকের মধ্যে খাঁ-খাঁ বেজে উঠল। তিনি বাসায় পরার নরম্যাল পোশাক চেঞ্জ করার কথা ভুলে বেডের একপাশে বসে পড়লেন। রাঈনা বুঝি কাছে এসে বসল। শাহিনুর বিড়বিড় করলেন, -
‘রাঈনা! রাঈনা দেখতে পাচ্ছ, মেয়ে অবিকল তোমার মতো হয়েছে।’
রাঈনা কোথায়? ফ্রেমবাঁধা ছবি আরও একবার জেগে উঠে হেসে দেয়। শাহিনুর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন। জীবনের এপিঠ-ওপিঠ কোনেদিকেই সুখ পেলেন না। একে একে কেটে গেল একুশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে এমনভাবে আজকের মতো বুক শূন্য শূন্য লাগেনি। আজকের তারিখেই ঘর শুরু করেছিলেন। সেও অনেক কষ্ট নিয়ে। সেই বেদনার কথা একান্ত তার। আজ সে-সব মনে করা কেন? আজ আনন্দের একটি দিন। তখন দরজায় আলোছায়া ছড়িয়ে এসে দাঁড়ায় লুইপা। শাহিনুর চমকে উঠলেন। লুইপা দেখতে অনেকখানি তার মায়ের মতো।
‘বাবা এই নাও তোমার চা। আমি নিজে বানিয়েছি। আর এখনো ফ্রেশ হওনি? চা তো ঠান্ডা হয়ে যাবে।’
‘আচ্ছা চা দাও। তোমার ফুপিকে দেখছি না। সে কোথায়?’
‘পাশের বাসায়। ওই বাড়ির ভাবীর সিজার হবে। অ্যাম্বুলেন্স এসেছে। আমিও দেখে আসি।’
লুইপার দিকে তাকিয়ে আনমনা হন শাহিনুর। তিনি যেন ক্লিনিকের উজ্জ্বল করিডোরে দাঁড়িয়ে আছেন একাকী। অস্থির নিঃসঙ্গ। কী হয় কী হয় ভাবনা-দুর্ভাবনা জমে যাচ্ছে চারিদিক। অপারেশন থিয়েটার থেকে একজন নার্স বেরিয়ে আসে। হাতের গ্লাভস টেনে নিতে নিতে খুব ব্যস্ত এদিক-ওদিক তাকিয়ে পুনরায় ফিরে যায়। শাহিনুর এক পা এগিয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে গেলেন। কথা বলতে পারলেন না। কী-ইবা বলবেন? এখন অপেক্ষার সময়। রাঈনাকে যখন স্ট্রেচারে শুইয়ে অটিতে নিয়ে যাওয়া হয়, কেউ কাচের দরজা খুলে ধরে; শাহিনুরের প্রাণে একঝলক হিমশীতল বাতাস ধাক্কা দেয়। অচেনা বিষাদে বুক জমে যেতে থাকে। এই তো তার কপালে-কপোলে আঙুলের নরম স্পর্শ দিয়েছেন। রাঈনার চোখে-মুখে কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বা অস্থিরতা নেই। একেবারে শান্ত। শাহিনুর যেভাবে আশ্বস্ত করবেন, সাহস দেবেন, তেমন আর কি, কীভাবে বলেন; বরং মৃদু গলায় কথা বলে উঠে রাঈনা।
‘ভয় পেয়ো না, আমি তোমায় ছেড়ে যাব না।’
‘এসব কী বলছ? মনে সাহস রাখো রাঈনা।’
‘আচ্ছা। তুমি টেনশন করো না। আজকাল অহরহ সিজার হচ্ছে। তুমি সাহস দাও আমাকে শাহিন। শাহিন।’
‘নিশ্চয়ই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘আমাকে মাফ করে দিয়ো।’
স্ট্রেচারের পাশে পাশে হেঁটে এমনই আলাপ হয়েছিল। এই একটি কথায় চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে শাহিনুরের। অনেক কথা মনে পড়ে। তিনি কি রাঈনাকে মানসিক নির্যাতন করেন? তিনি তো ভালবাসেন। সেটি দায়িত্ববোধ, সেখানে হয়তো তেমন আবেগ নেই; আবেগহীন প্রেম। প্রগলভ উচ্ছ্বাস নেই। আচমকা জড়িয়ে ধরে ঠোঁটের উপর ঠোঁট নেই। নেই অভিমান, রাগ কিংবা শক্ত আলিঙ্গন। রাঈনা তার দ্বিতীয় প্রেম। প্রথম প্রেম হলো আবেগ...দ্বিতীয় দায়িত্ব। তখন রিমুর চেহারা ভেসে ওঠে। সে এখন কোথায়? কোন্ অভিমানে হারিয়ে গেল? শাহিনুর অটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর কিছু ব্যস্ততা উহ্য শব্দের মতো অটি থেকে বেরিয়ে আসে। ডাক্তার সুজানা পলি কয়েক সেকেন্ড পর দরজার কাছে এসে বলে, -
‘তবে কাজ শুরু করি। অনুমতি দিন। তার জন্য প্রার্থনা করুন।’
অস্থির অপেক্ষায় কেটে গেল চল্লিশ মিনিট। শাহিনুর একসময় নবজাতকের কান্না শুনতে পেলেন। ডাক্তার-নার্সের ব্যস্ত ছুটোছুটি। রাঈনার রক্ত কম। রক্তের গ্রুপ এ মাইনাস। সেই গ্রুপের রক্তের ব্যাগ ম্যাচ করে এনে রাখা হয়েছে। তখন কেন জানি অন্য জটিলতা। ক্লিনিকের ব্লাড ব্যাংকে সেই গ্রুপ নেই। শাহিনুর কাকে পাঠায় মেডিকেলে? আদৌ পাওয়া যাবে কি না? তিনি এখানে-ওখানে মোবাইল করেন। তখন মন অটির কাচের দরজা দিয়ে এক নজর দেখার জন্য উতলা হয়ে আছে। কেউ একজন বেডের উপর খুব কাঁপছে। সে কি রাঈনা? গভীর রাতে চলে গেল রাঈনা। শাহিনুর স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন অনেকক্ষণ। আয়োশি এলো। কোথা থেকে খবর পেয়েছে কে জানে। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে অভিযোগ করে, -
‘আমাকে জানাবি না ভাই। কত দূর থাকি?’
শাহিনুর কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন না। রাঈনার সম্ভাব্য তারিখ এখনো আসেনি। শাহিনুর রুটিন চেক করতে ক্লিনিকে নিয়ে এসেছিলেন। রাঈনা আগের সন্ধেয় বারবার বলে, -
‘বেবির নড়াচড়া টের পাচ্ছি না। কেন বলো তো?’
‘সে কি!’
সকাল এগারোটায় ক্লিনিকে আসা হয়। ফরমালিটি মেইনটেইন করতে করতে কেটে যায় বেশ সময়। আলট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট পেতে পেতে বেলা দেড়টা। ডাক্তারের পরামর্শ আসে। বেবি নাড়ির মধ্যে জড়িয়ে গেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য ইমিডিয়েট সিজার করা দরকার। শাহিনুর আর রাঈনা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। কাউকে জানানোর ফুরসত কোথায়? আয়োশি সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দেয়। সবকিছুই কি নিয়তির লিখন? শাহিনুর জানাল না কেন? মোবাইলে এক মিনিট কথা বলা এতই কি কঠিন?
সকালে অফিস যাওয়ার আগে আগে নস্টালজিক হয়ে গেলেন শাহিনুর। নাশতার সময় এককাপ চা নেন। আয়োশি রুমে এসে দ্বিতীয় কাপ চা দিতে দিতে বলে উঠে, -
‘ভাই লুইপা গতরাতে একটি প্রশ্ন করেছিল। সে জানতে পারল কীভাবে?’
শাহিনুর চায়ে চুমুক দিয়ে বিস্মিত চোখে তাকালেন। কিছুই বুঝতে পারলেন না। লুইপা যখন আড়াই-তিন, আয়োশি ফিরে এলো। শাহিনুরের সিদ্ধান্ত, না ঠিক তা নয়; পরামর্শ। রাজিউরের টর্চার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। একজন মেয়ে বুকে কত আশা-প্রত্যাশা-স্বপ্ন নিয়ে বউ হয়ে পরের বাড়িতে যায়, সেখানে ভালবাসা না পেলে জীবনে আনন্দ থাকে না; আয়োশির আনন্দ দূরে থাক, দু-বেলা দু-মুঠো ভাত খায়; সেখানেও খোঁটা। কখনো মারধর। রুমের মেঝেয় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া। শাহিনুর আর সহ্য করতে পারলেন না। একদিন চরম কথা শুনিয়ে দিলেন, -
‘তুই ও বাড়ি ছেড়ে চলে আয়। ওখানে থেকে কী হবে?’
‘কোথায় যাব ভাই? বাবা পছন্দ করে বিয়ে দিয়েছে। কপালে যা লেখা আছে, সেটা হবেই।’
‘কপালের মুখে ঝাড়ু মারি। বাবা তোর জন্য টেনশন আর অশান্তিতে মরে গেল। এবার চলে আয়। তোর ভাবীও চলে গেল। লুইপাকে দেখে-শুনে মানুষ কর।’
‘তুই বিয়ে কর ভাই। বউ না হলে চলে?’
‘ওসব কথা বলিস না। আমার কথামতো চলে আয়। রাজিউরের স্বভাব ভালো হলে চলে যাস। অবশ্য তেমন মানুষের চরিত্র সহজে পালটায় না।’
আয়োশি চলে এলো। এর দু-মাসের মাথায় অ্যাক্সিডেন্ট করল রাজিউর। স্পট ডেড। উগ্র মানুষের জীবন এমনই খোলামকুচি। একদিক দিয়ে ভালো হলো। লুইপাকে মানুষ করতে প্রতিদিন নিত্যনতুন সমস্যায় পড়েছিলেন শাহিনুর। অফিসে পারফরম্যান্স ডিক্রিজ হচ্ছিল। বড় সাহেব সহানুভূতিশীল, তারপরও এক দুপুরে তিক্ত দু-চার কথা শুনিয়ে দিলেন। সেটি রেগুলার হতে শুরু করে। এখন অনেক ভালো আছেন। জীবনযাপন রুটিনের ছন্দে চলে যাচ্ছে। লুইপা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। ওর পড়াশুনা শেষ হলে ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন। এই তো জীবন।
শাহিনুর চায়ের কাপ পিরিচে রেখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। আয়োশি কী বলতে চায়? লুইপা কী জানতে চায়?
‘কী?’
‘নন্দিতা কে?’
শাহিনুর স্তম্ভিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। নন্দিতা। হায় কত বছর সেই নাম মনে আসেনি! জীবনের আষ্টেপৃষ্ঠে যে মুখছবি জড়িয়ে রেখেছিলেন, সেই চেহারা নেমে এলো। সকালের জানালা দিয়ে রোদ এসে একেবারে চোখের সামনে বিষাদ জাগিয়ে তুলল। কত দিন কত বছর দেখেন না রিমুকে। কোথায় আছে সে? এখনো কি ফ্লোরিডায়? দিনে দিনে বয়স বাড়ল। কেমন আছে সে? এখনো রয়ে গেছে মায়াবী চেহারা? পারিজাত কণ্ঠস্বর?
‘কী বললি তাকে?’
‘আমি আর কী বলব? একসময় বিয়ে হতো তোদের। এ-সবই। মেয়ে বড় হয়েছে। ওতেই বুঝে নেবে।’
শাহিনুর উপলব্ধি করলেন, লুইপা সত্যি সত্যি বড় হয়েছে। গতকাল আলমারি গোছাতে গোছাতে তার ডায়রি পড়েছে নিশ্চয়। নীল নোটবুক। কবিতার খাতা। এ ছাড়া সেই নাম জানবে কী করে? শাহিনুরের মন বড় উদাস হয়ে গেল। এরমধ্যে রাঈনার চেহারা জেগে উঠল। অটির বেডে থরথর করে কাঁপছে সে। আধবোজা চোখ। রাঈনা ফিরে এলো না। তার হাতদুটো তবু উষ্ণ। তখনো শ্রুতিতে বেজে চলে, ‘ভয় পেয়ো না, আমি তোমায় ছেড়ে যাব না।’ রাঈনা তাকে ছেড়ে যায়নি। সে যেতে পারে না। লুইপার মধ্যে বেঁচে আছে। শাহিনুরের ভালবাসার বন্ধন। সে ভালবাসায় আবেগের চেয়ে ঘনীভূত দায়িত্ববোধ। শাহিনুরের চোখ ভিজে উঠল। সে বড়ই হতভাগা।
‘সে আমার ডায়রি পড়েছে নিশ্চিত। ঠিক করেনি মেয়েটা।’
‘তুই লক করে রাখবি না? আর কী-ইবা লুকোনোর আছে! মেয়ে একদিন সব জানবে। জীবনের ধর্মই তো তাই।’
‘লুইপা আছে নাকি কলেজে চলে গেল?’
‘সে বেরিয়েছে।’
শাহিনুর রাস্তায় নেমে পুব আকাশে তাকিয়ে দেখেন, ইলেকট্রিক লাইনের উপর অসংখ্য চড়ুই; এগুলোই তবে প্রতিদিন কিচিরমিচির করে! তিনি তেমনভাবে খেয়াল করেন নাই। আজ কেন জানি একটি নাম সবকিছু এলোমেলো করে দিতে শুরু করে। ফিরে পেতে চায় হারিয়ে যাওয়া দিন। শত শত বছর দেখা হয় না। অনেক অনেক দিন পড়া হয় না কোনো কবিতা। লেখা হয় না দুটো লাইন।
কলেজে পা রেখে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন শাহিনুর। অন্য দশজন কিশোরের মতো একজন স্বপ্নের রানি জেগে ওঠে। সে হলো পাশের বাড়ির রিমু। তাকে নিয়েই লেখা যত কবিতা। রাত জেগে জেগে কত ভাবনা আর আবেগে লিখে যান, যে কথা বলতে চাই অথচ বলা হলো না; তার খেরোখাতা খতিয়ান। তিনি মুখে বলতে পারলেন না, ‘রিমু তোমাকে ভালবাসি।’ মেয়েদের মন তারপর সবই বোঝে। কোন্ পুরুষের চোখের দৃষ্টিতে পাপ আর কার তাকানোয় মুগ্ধতা মেয়েরা খুব সহজে অনুধাবন করে নেয়। তাই হয়তো চোখ যে মনের কথা বলে বলতে বলতে একেবারে কাছে আসে রিমু।
সেদিন সন্ধেয় মডার্ন সিনেমা হলে ম্যাটিনি শো শেষ হয়েছে। শাহিনুর চকবাজার হয়ে বাসায় ফেরায় ব্যস্ত। আবছায়া পিঙ্গল বিকেল। একজন আরেকজনকে লাভ ইউ বলার সুযোগ এসে গেল বুঝি। রিমু হল থেকে বেরিয়ে থমকে দাঁড়ায়। ওর বান্ধবীরা একে একে চলে গেছে। শাহিনুরের হাতে ক্যানভাস পেপার। কখনো কখনো ইজেলে ঝুঁকে পড়েন। জলরঙে ছবি আঁকার চেষ্টা চলে। মনের আয়নায় যে ছবি ভেসে ওঠে, ক্যানভাসে আঁকার চেষ্টা; সুন্দর বিমূর্ত ছায়া ফুটে উঠে। সেই তো স্বপ্নের রানি। শাহিনুর রাস্তার দক্ষিণ পাশ থেকে উত্তরে এসে দাঁড়ান। একেবারে তার কাছে।
‘বাসায় ফিরবে?’
‘হুঁ! একটা রিকশাও নেই।’
‘একটু অপেক্ষা করো। ডেকে আনছি। আমিও যাব।’
‘আচ্ছা।’
এভাবেই রিকশায় পাশাপাশি বসে যাওয়া থেকে জীবনপথ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন শাহিনুর। রিমু চমৎকার গান গায়। অদ্ভুত সুন্দর কণ্ঠ। শাহিনুর জানেন, অমন গলা পৃথিবীতে কারও নেই। সেই একমাত্র...একমাত্র তার আপন মানুষ। একদিন পার্কের বেঞ্চে একাকী গান শুনেছিলেন। ‘বকুলের মালা শুকাবে, রেখে দেব তার সুরভি।’ শাহিনুর মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তার নন্দিতা। শাহিনুর কখনো কোমল হাতটি হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় নিজের কবিতা শোনান। রিমু মনোযোগ দিয়ে শোনে। মন্তব্য করে। তারপর একদিন ইউনিভার্সিটি চলে গেলেন শাহিনুর। চিঠি লিখতেন। সেই চিঠির জবাব পেতেন না। রিমুর কাছে সেই চিঠি কি আদৌ পৌঁছেছে? গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পাগলের মতো ছুটে এলেন শাহিনুর। রিমুদের বাহির বারান্দায় গিয়ে দরজায় নক করতে গিয়ে বারবার ফিরে এলেন। রিমুর বাবা পছন্দ করেন না তাকে। বড়ভাইও অদ্ভুত চোখে তাকায়। একদিন সত্যি সত্যি দরজায় নক করলেন। বেরিয়ে এলেন রিমুর বাবা। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়।
‘এই যে ছোকরা কোন ক্লাসে পড়ো?’
‘জি আঙ্কেল অনার্স ভর্তি হয়েছি।’
‘কোন সাবজেক্ট?’
‘বাংলা।’
‘আর্টস ফ্যাকাল্টি? ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার লক্ষ্য নাই?’
‘জি!’
‘ওই বাংলায় পড়ে কী হতে পারবে? খুব জোর স্কুলের মাস্টার। কোনো ফিউচার নাই। বোগাস!’
‘রিমু আছে আঙ্কেল?’
‘ওকে আবার কী দরকার? দেখো হে ছোকরা, পড়াশুনা করছ করো, মন লাগিয়ে পড়ো। ওর পেছনে ঘুরঘুর করো না। নিজের ওজন কত আর কোথায় হাত বাড়াতে চাও, পরিমাপ করতে শেখো। বুঝলে হে ছোকরা।’
‘আপনি বারবার ছোকরা বলছেন কেন? শালীনতা শেখেন নাই নাকি?’
‘কী বললে হে ছোকরা?’
‘ডিসগাস্টিং!’
শাহিনুরের মন খারাপ। রাতের গহিনে টেবিল ল্যাম্প অন করে কবিতা লিখতে বসেন। বুকের খাঁ-খাঁ শূন্যতার যন্ত্রণা কলমে আসে না। চোখে ভেসে ওঠে রিমুর হাসিমাখা চেহারা। বিমূর্ত হাসি। নীল নোটবুকের নকশি আঁকা পাতায় পাতায় শুধু রিমু। কোনো অক্ষর সেখানে বসতে চায় না। আহা! রিমু কেন তোমার দেখা পাই না? রিমু আমার নন্দিতা। কোথায় তুমি?
শাহিনুরের ঘুম আসে না। লেখাপড়া ভালো লাগে না। জীবনযাপনের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। অনার্স তৃতীয় বিভাগ এসে গেল। তখন রিমু ডাক্তারি পড়ছে। শাহিনুরের বাড়ির সামনে দিয়ে চলে যায়। একদিনও মন ভুলে তার দরজায় নক করে না। একবারও চিঠি লেখে না। একটি কথাও বলে না। শাহিনুর নীল নোটবুকে অভিমানের কবিতা লিখে লিখে বুকের অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করে। নন্দিতা, আমার নন্দিতা, কেন তুমি আমায় ভুলে গেলে? কী দোষ আমার?
শাহিনুরের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। উজ্জ্বল রোদের দিন ম্লান-মেদুর হতে থাকে। তিনিও কি অভিমান, বুকচাপা অভিমানে নিজেকে সরিয়ে রাখেন নাই? আজ কেন হাহাকার বুকের কোণায় কোণায় দগদগে ক্ষত তৈরি করে? শাহিনুর সেই ক্ষত লুকিয়ে রেখেছিলেন। আজ যখন লুইপা জিজ্ঞেস করে বসে, দমকা বাতাসে শুকনো পাতা উড়ে উড়ে দূরে হারিয়ে যেতে যেতে ফিরিয়ে আনে ফেলে আসা সময় আর দিনকাল। উপযুক্ত সময় আর সংযোগের অভাবে সব খুইয়ে বসেছেন শাহিনুর। কে জানে রিমুর অভিমানী দৃষ্টিতে কিছু লেখা ছিল কিনা, যার পাঠোদ্ধার করতে পারেন নাই; হতভাগা মানুষ! একদিন শোনেন সে ইউএস চলে গেছে। শাহিনুর বিয়ে করলেন। রাঈনা তৃতীয় দিনেই বুঝে গেল। যে পুরুষের হাতে হাত রেখে অচেনা ভুবনে এসে দাঁড়িয়েছে, তার মনে নিজের জায়গা নেই, সেখানে অন্য কেউ; সে একটি শব্দ করল না। এমন মানুষকে ভালবেসে ফিরিয়ে আনবে। নিজের করে নেবে। রাঈনা পেরেছিল। শাহিনুর আজ জানেন, রাঈনা তার দ্বিতীয় প্রেম...শেষ ভালবাসা। তার বুকের কোণায় যুগপত রিমু আর রাঈনা জেগে আছে। তিনি কাউকে ছোট বা বড় করে দেখতে বা বুঝতে পারেন না। জীবন এমনই।
ওইদিন রাতে অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটল। লুইপা রুমে এসে কিছুক্ষণ উসখুস করতে করতে বলে, -
‘বাবা, একটি কথা বলব?’
‘কী? বলো?’
‘রাগ করবে না তো?’
‘রাগ করার হলে রাগ করব মা। তুমি নির্ভয়ে বলো।’
‘বাবা আমাদের নতুন একজন ম্যাম এসেছেন। তিনি ইউএস থাকতেন। তাকে আমার কেন জানি চেনা চেনা লাগে। তোমার ডায়রিতে তেমন ছবি দেখেছিলাম। তুমি ওই ম্যামকে দেখেছ? চেনো তাকে?’
‘আমি কীভাবে চিনব? আশ্চর্য! আমি কি তোমার কলেজে যাই, নাকি ক্লাস করি?’
‘কী বলছ বাবা! আমি সিরিয়াস এক টপিক নিয়ে কথা বলছি আর তুমি...।’
‘বেশ বলো। তার নাম কী?’
‘তিনি রিমু আকতার।’
শাহিনুর স্থির হয়ে গেলেন। চোখ থেকে চশমা নামিয়ে মুছে নিলেন বারকয়েক। সে কীভাবে হতে পারে? বিচিত্রই-বা কী? তিনি অনেক দিন হলো আগের বাড়ি ছেড়ে এখানে বসবাস করছেন। এখান থেকে অফিস কাছে হয়। পুরোনো জায়গায় ফিরে যান নাই। প্রয়োজন পড়েনি। রিমু কি তবে ফিরে এসেছে? এই রিমু কি সেই যাকে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন? শাহিনুরের বড় বুকচাপা অভিমান। কাঙালের মতো তাকিয়ে ছিলেন কতদিন। কত রাত জেগে জেগে আকাশের তারাগুলো ঝাপসা করে ফেলেছিলেন। রিমুর দেখা পান নাই। সেই রিমু?
‘বাবা, আগামীকাল আমার সাথে যাবে? আমি ওনার সাথে কথা বলেছি। তোমাকে চেনেন। যাবে তো বাবা?’
শাহিনুর স্তম্ভিত হয়ে বসে আছেন। তার দৃষ্টি কি ঝাপসা হয়ে গেল? উত্তর দেয়ালে আগের মতোই হেসে হেসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে রাঈনা। রিমু এত বছর পর কি চিনতে পারবে? দেখা হলেই-বা কি ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া দিন? তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। বুকের গভীরে হাজারও কথা সমুদ্রের জোয়ারভাটার মতো ঢেউ তুলে যেতে শুরু করল। লুইপা আর একটিও কথা না বলে চলে গেল।
শাহিনুর কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে থেকে কী ভেবে আলমারি খুললেন। তার কবিতার নীল নোটবুক কোথায়? খসড়া খাতা? তিনি অস্থির এপাশ-ওপাশ খুঁজে খুঁজে পেলেন না। কে জানে নিয়ে গেছে লুইপা। সেখানেই নাম জেনেছে। রিমুকে নন্দিতা বলে ডাকতেন। হায় নন্দিতা! রিমু...তুমি কোথায়? তুমি কি ফিরে এসেছ? শাহিনুরের রাতে ঘুম হলো না, যেমনভাবে কৈশোরবেলায় রাতের পর রাত জেগে জেগে কাউকে নিয়ে জীবনের জলছবি আঁকতেন, উচ্ছ্বাসে হাজারও কথা বলতেন, কবিতা লিখতেন; তিনি সে-সবের আজ বিপ্রতীপ নিশ্চুপ বসে থাকলেন। তার কবিতা লেখার খাতা নেই। কী লিখবেন? কীভাবে? তার মন নিঃশব্দে ডুকরে উঠল।
তখন অনেক অনেক দূর আকাশের দেয়ালে জেগে থাকা তারাগুলো মিটমিট জ্বলে কথা বলতে শুরু করে।
*****
লেখক পরিচিতি: মাহবুব আলী। পিতা: মো. আবদুল মজিদ (অ্যাডভোকেট), মাতা: মেহের নেগার।
দিনাজপুর শহরে জন্ম। সেখানেই স্কুল-কলেজ। রাজশাহি ইউনিভার্সিটি থেকে রাস্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন স্থানীয় এক দৈনিকে সম্পাদকীয় ও সাহিত্য বিভাগ পরিচালনা। বিভিন্ন পায়োনিয়ার উন্নয়ন সংস্থায় ডকুমেন্টেশন, সম্পাদনা, গণযোগাযোগ উপকরণ উন্নয়ন ও প্রকাশনা, প্রতিবেদন, প্রকল্প প্রস্তাবনা, পলিসি ম্যানুয়াল প্রণয়ন, গবেষণা ও কনসাল্টেন্সি। শেষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক প্রভাষক।
প্রকাশিত প্রথম লেখা ‘একটি ছড়া’ অর্ধ-সাপ্তাহিক দেশবাংলা-র শিশু-কিশোর পাতায় নভেম্বর ১৯৭৩। প্রকাশিত প্রথম গল্প `The SlaveÕ ইংরেজি দৈনিক The Daily Observer-এর Young Observer বিভাগে সেপ্টেম্বর ১৯৭৪।
পুরস্কার: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার-এর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধীন সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগ-এর ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক লাইব্রেরির ‘অমর একুশে’ সাহিত্য প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে ‘কবিতা’-য় ১৯৮৭, ‘ছোটগল্প’ ও ‘প্রবন্ধ’-এ ১৯৮৯ এবং ১৯৯১ সালে একক পুরস্কার।
সম্মাননা: কথাসাহিত্যে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ গুণিজন সম্মাননা। রংপুর বিভাগীয় লেখক পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখা হতে ২০২১, স্মৃতি সংঘ ও সাহিত্য সংসদ, কাহারোল-দিনাজপুর থেকে ২০২১, শব্দশর সাহিত্য সংগঠন, বীরগঞ্জ-দিনাজপুর থেকে ২০২৩ এবং উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পর্ষদ-দিনাজপুর থেকে ২০২৩।


0 মন্তব্যসমূহ