রুখসানা কাজলের গল্প: তোমার দুধের ধারা





গোরখোদক রব্বানী শেখ মৃত স্ত্রী পরিজাদীর কবরের মাটি ঠিক করে দিচ্ছিল। হঠাত ধবলী ছাগী আর তার ছানাদের সমস্বর আর্তনাদ শুনে উঠে দাঁড়ায়। দেখে বাঁশের গেট খুলে নরেন পোদ্দারের মা আর বউ এসে গেছে। কাল বিকেলে বড়বাজারে নরেনের সাথে দেখা ওর হয়েছিল। ওরা যে আসবে এটা ওকে তখনই নরেন জানিয়ে দিয়েছিল। রব্বানীর হাতে এক গ্লাস চা ধরিয়ে দিয়ে নতুন বাবা হওয়ার আনন্দে গদগদ হয়ে নরেন বলেছিল, ভাইরে ভাই, বাছুর বিয়ানো গাই গোরুর লাহান দুধ ঝরতিসে বউএর মাই থেকি। ভয় পাতিসি, দুধ খাতি খাতি ছাওয়ালডার না দম আটকি টাটকি ----

নিড়ানি দিয়ে মুথা ঘাসের একটি ঝোপা তুলে বিরস মুখে ফেলে দেয় রব্বানী। দুঃশ্চিন্তা করার মতো যেমন কিছু নয় তেমনি একেবারে নিশ্চিন্তে থাকার মতোও ব্যাপার নয়। দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ ! এই ভেবেই আইশা জুয়েলার্সের কারিগর নরেন পোদ্দারের বউ বুকের দুধ নামাতে এসেছে ওদের বাড়ি। কার কাছে যেন শুনেছে পরিজাদীর পোষা ছাগী ধবলী ছানা বিইয়েছে। এদিকে নরেনের পনেরো দিন বয়সের গ্যাদা ছেলেটা মায়ের দুধ খেতে গিয়ে ভিজে নেয়ে হাঁপসে যাচ্ছে। অদম্য ঝর্ণাধারার মত মায়ের বুক থেকে ছেলের নাকে মুখে চোখে দুধ ঝরে ঝুরে ছিটকে পড়ছে। সেই দুধ ফেলে ছেড়ে নরেনের বউএর একেবারে যাতা অবস্থা।

ধবলী বাঁধা আছে ওদের উঠোনের পাশে চালতা গাছের সাথে। গোল ছায়া ফেলে বেশ মায়াময় ঝুপসি তৈরি করেছে গাছটি। দুধের ভারে ধবলী ভালো করে হাঁটতেও পারছে না। গর্ভাবস্থাতেই পাঁজরের হাড়গুলো স্পষ্ট দেখা যেত। এখন দুধগুলো এমনভাব ফুলে উঠেছে যে ছোট ছোট রক্তলাল নালীগুলো ভেসে উঠেছে। মাত্র তিনদিন আগে চার চারটা ছানা বিইয়ে শ্রান্তক্লান্ত হয়ে পড়েছে ধবলী। এরই মধ্যে ছানাগুলো মায়ের ভরভরন্ত দুধে মুখ দিয়ে ভরপেট দুধ খেয়ে লাফাচ্ছে, ঝাপাচ্ছে, ছুটছে। কোন কোন ছানা আবার পা ভেঙ্গে বসে পড়ছে। ঢংএর খেলা খেলছে সে ! সাথে সাথে অন্য ছানাগুলো তার গায়ের উপর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে খেলার চূড়ান্ত করে ছাড়ছে। ধবলী সামনের পায়ের উপর মাথা রেখে অপত্য স্নেহে ছানাদের দিকে তাকিয়ে ক্লান্তি মায়া আর মাত্বৃত্বের আনন্দের মাঝে অল্পস্বল্প করে ঘুমিয়ে নিচ্ছে।

রব্বানী পরিজাদীর কাঁচা কবরের বেড়ার উপর লতানো ফুলের গাছটি তুলে দেয়। নীল রঙের ফুল খুব প্রিয় ছিল পরিজাদীর। বুকের ভেতর সাদা ওম নিয়ে ফুলগুলো ফুটলে খুশিতে সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাত। এমনভাবে ডাকত, যেন ঘরে চাঁদ নেমে এসেছে তোমরা দেখো গো আসিয়া।

চার মাস আগে তিনদিনের জ্বরে পরিজাদী মরে গেছে। সে সময় ওদের গ্যাদা মেয়েটার বয়েস ছিল মাত্র উনিশ দিন। রাগে দুঃখে রব্বানী আজকাল মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না। রাতে খোলা বারান্দায় রাতচরা পাখির মতো জেগে বসে থাকে। টিউ কলের পাশে একটি মোটাসোটা গিন্নি টাইপের মেহগনি গাছ রান্নাঘরের চাল ছুঁয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। তার পাশে একেবারে কোল ঘেঁষে আরেকটি মেহগনি চারা মাথা উঁচু করে বেড়ে উঠছে। জোর বাতাস বইলে ছোট মেহগনি মাঝে মাঝে ঢলে পড়ে বড় মেহগনি গাছটির উপর। পাতাগুলো কয়েক মুহুর্তের জন্য আদরে লেপটে থাকে বড়র গায়ে। রব্বানীর তখন মনে হয়, যেন পরিজাদী ঝুঁকে পড়ে দেখছে। মা চোখে তাকিয়ে আছে ছোট্ট মেয়েটির দিকে। ওর বুকটা মুচড়ে ওঠে। মেয়েকে দেখতে ঘরের ভেতর যেতে গিয়েও ফিরে এসে ধপ্‌ করে বসে পড়ে বারান্দায়।

আসলে ঘরে ঢুকতে ওর ভয় লাগে। কেবলই মনে হয় ঘরে গেলে ও দেখতে পাবে নীল শিরা জেগে ওঠা উথালপাথাল ফোলা দুই দুধ চিপে চিপে হালকারঙ নীলসাদা দুধ বের করে বাটিতে জমা করছে পরিজাদী। মুখে স্মিত হাসি। উদলা বুক। নিটোল পুষ্ট। স্ফীত পবিত্র। অসীম সুন্দরতার মায়া লেপে আছে তাতে। লজ্জাহীন এক ধরণের তীব্র ভালবাসার কালো রঙ ধরেছে দুটি বৃন্তসহ ছড়িয়ে পড়া গোলাকার পৃথিবীতে। পরিজাদী দুধে ভর্তি সেই বাটি রব্বানীর হাতে দিয়ে সতর্ক কন্ঠে বলত, শুনতিসো গো মেয়ার বাপ, খুব নিরিখ করি সাবধানে দুধটুকুন ঢালি দিবা বড় কলাগাছটার গুড়ায়। ফাইন করি ঢালি দিবা। বুঝিছো ত ! নালি কিন্তুক আমাগের মেয়াডার আলাই বালাই অকল্যেণ হতি পারে !

রব্বানী কখনো পরিজাদীর বলা নিয়মের ব্যতিক্রম করে নাই। মেয়ে তো তারও। কাছে গেলেই কেমন আপন লাগে। মেয়েও তাকে চোখের আলোয় চিনে নিয়েছে। আদরের এক ছপছপ শব্দ করে হাসে। কচি কোমল লালা ভেসে ওঠে মেয়ের ঠোঁটে। রব্বানী চুমুতে ভরিয়ে দেয় মেয়ের আঁতুড় গন্ধলাগা মুখখানি। তাই খুঁজে খুঁজে এমন একটি মা কলাগাছ বেছে নিয়েছে, যার কাঁদি ভর্তি কলাগুলো সবেমাত্র পোক্ত হতে শুরু করেছে। সে কলাগাছের লাল লাল ফোলা শরীর। গর্ভ অবস্থার শেষ দিকে যেভাবে ফুলে উঠে পরিজাদীর শরীর ছেড়ে দিয়েছিল তেমনই আলুথালু চেহারা। সেই গাছের গোঁড়ায় খুব সাবধানে দুধ ঢেলে খুশি মনেই সে ফিরে আসত ঘরে। তবু অকল্যাণ যা হওয়ার তাতো হয়েই গেলো। উনিশ দিনের মেয়ে, অনুগত স্বামী, স্নেহময়ী শাশুড়ি, বাবামা একটি ছোট বোন, গর্ভবতী ধবলী আর আত্মীয় স্বজন ঘরবাড়ি রেখে পরিজাদী হঠাত মরে গেল।

পরিজাদীর কবরে দুর্বা ঘাস লাগাতে লাগাতে রব্বানী দেখে তাজজাদী দুটি ছানা কোলে করে ঘরের দিকে চলে যাচ্ছে। ধবলী মুখ তুলে দেখে নিশ্চিন্তে রোদ্দুর পোহালেও অন্য ছানাগুলো ভয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে। তাজজাদী ছানাগুলোকে ধমকে ধামকে ঘরে ঢুকে গেল।

রাব্বানী শেখ এই নতুন গোরস্তানের গোর খোদক হিসেবে কাজ করছে মাত্র তিনমাস হল। মূল গ্রাম থেকে একটু দূরে উঁচু জায়গা খুঁজে গোরস্তানটা করা হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষা বাদলে পুরনো গোরস্তানের কবর ভেঙ্গে পচাগলা মৃত লাশের খন্ডিত কোন অংশ বেরিয়ে পড়ত। শেয়াল কুকুরে টানাটানি করে সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছেতাই করে ফেলত গ্রামের রাস্তা, জমির আইল, মাঠ এমনকি গৃহস্থের উঠোন। সে কারণে কয়েক বছর আগে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই উঁচু জায়গাটা গোরস্তানের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া মানুষ যেভাবে বাড়ছে সেই সাথে মরছেও কম নয়। অত জায়গা কোথায় নতুন কবর দেওয়ার ! একেকটি পুরনো কবরের কোলের ভেতর এখন তাই অনেকজনকে গোর দিতে হচ্ছে ।

চার মাস আগে তিনদিনের জ্বরে পরিজাদী মরে গেলে ওর কবর হয়েছে খান বাড়ির সানোয়ারা দাদির কবরের ভেতর। তখন বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই রব্বানীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, ওরে রব্বানী দেখিছিস খান দাদিজান তোগের কত ভালবাসে ! ভাগ্য বলতে হবেক তোর বউয়ের ! এই জগতে খান দাদিজান তোগের দেখভাল করিছে, ইবার পরলোকেও তোর বউকে দাদিজান দেখিশুনি রাখবেনে। চিন্তা করিস না আর । এইবার তুই গ্যাদাডার কথা ভাবতি লাগ ভাইডি।

পরিজাদীকে গোরস্তানে নেওয়ার সময় গ্যাদা মেয়েটা রব্বানীর মায়ের কোলে চোখ পিটপিট করে চেয়েছিল। কি যে হারালো মেয়েটা সে ত বুঝবে বড় হয়ে। এখন ত ওকে বাঁচানোই কঠিন মনে হচ্ছে। তবু কি এক যাদুতে রাব্বানীর মা মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে কে জানে। রব্বানী মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না। পরিজাদী মরে গেছে এটা ও ভাবতেও পারে না। যখন মনে পড়ে পরিজাদী নেই, তখন মেয়েটার উপর ওর রাগ হয়। প্রথম দিকে সমস্ত দিন রাত মরা বউএর কবরের কাছে বসে থাকত। খান বাড়ির গরু ছাগল ভেড়ার পালের বাগালিতে আর মন বসাতে পারে না রব্বানীর। তাই দেখে খানচাচা ওকে নতুন গোরস্তানের গোর খোদকের দায়িত্ব দিয়ে মন্ডল বাড়ির বড়ছেলে মন্টুকে নতুন বাগাল রেখেছে।

রব্বানী এখন মাস গেলে টাকা পায়। থাকার জন্যে খানদাদাদের পুরনো বাড়িটাও পেয়েছে। কিন্তু ওর মন ভাল নেই। ওর কেবলই মনে হয়, ঘরে ফিরলে ও পরিজাদিকে দেখতে পাবে না। খাটের উপর আসন পিঁড়ি হয়ে বসে মেয়েটাকে গুনগুণ করে গান শোনাবে না। ঘর আছে কিন্তু সেই ঘরে পরিজাদী আর নেই---

একটা ছানাকে কোলের ভেতর রেখে হাসি হাসি মুখ করে তাজজাদী অন্য ছানাটির দুধ খাওয়া দেখছে। মানুষ মায়ের বুকের দুধ খেতে কিছুতেই রাজি নয় ছাগ ছানাটি। বার বার মুখ থেকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে দুধের বৃন্ত। অস্থির রাগে মাথা দিয়ে আঘাত করছে নরেনের বৌয়ের দুটি বুকে। ব্যাথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে বউটি। চোখ ভিজে গেছে পানিতে। তবু ঠোঁট কামড়ে সহ্য করছে। বুকে দুধ জমে গেলে সেও এক মহা জ্বালা। আবার এত দুধ তার ছোট্ট ছেলেটি খেয়ে শেষ করতে পারছে না। তাছাড়া ভয়ের চেয়েও বড় ভয়, যদি রাতবিরাতে ঘুমঘোরে দুধের ভারে ছেলেটার দম আটকে যায় !

আচমকা এরকম কত দুর্ঘটনাই ত ঘটে যায়। বিশেষ করে রাতে কিম্বা ঘুমের ঘোরে। এইত উকিল সাহেবের তিন নম্বর মেয়েটা ত এভাবে মরে গেল। তাই দক্ষিণ পূর্ব বাংলার গ্রামগঞ্জে সদ্যজাত ছাগল ছানাকে দিয়ে মানুষ মায়ের দুধ খাইয়ে দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।

নরেনের বউ ছাগল ছানার মুখটা যখন জোর করে দুধের বৃন্তে গুঁজে দিবে ঠিক সেই সময়ে পরিজাদীর মেয়েটি জেগে ওঠে। রব্বানীর মা তাড়াতাড়ি কোলে নিয়ে বালিশ কাঁথার ভেতর থেকে দুধের বোতল বের করে আনে। মুখে বোতলের নিপল গুঁজে দেওয়ার সময় মেয়েটা এমনভাবে কেঁদে ওঠে যেন বিশ্ববিধাত্রীর কাছে ও নালিশ জানাচ্ছে। সেই নালিশে বেজে ওঠে ক্ষুধার সময় মায়ের দুধ না পাওয়ার অভিমান। নরেনের বউয়ের বুক কেঁপে ওঠে আর হাত ফস্কে ছুটে যায় ধবলীর ছানাটি। তাজজাদীর কুমারী চোখ আটকে যায় নরেনের বউএর বুকে। বিস্ফারিত বিস্ময়ে ও দেখে, নরেনের বউএর বুক থেকে শত সহস্র ধারায় নেমে আসছে দুধের চিকন স্রোত। ধরিত্রীর জোড়ামুখ থেকে মেঘরং নীল মায়া ঝরে পড়ছে নরেনের বউয়ের কোলে। ভেজা কোলে ফুটে উঠেছে অসংখ্য মায়াফুলের আল্পনা। উৎসারিত দুধের গন্ধ আর পরিজাদির গ্যাদা মেয়েটার গায়ের গন্ধ মিলেমিশে ঘর ভরে উঠেছে এক অপুর্ব সুগন্ধে। কিশোরী তাজজাদির নাক ফুলে ওঠে।

নরেনের বউ দুহাত বাড়িয়ে দেয় রব্বানীর মায়ের কোলের দিকে।
*****

লেখক পরিচিতি: রুখসানা কাজল-এর জন্ম তারিখ ২৩ নভেম্বর। বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর এবং ঢাকায়। বর্তমান আবাসস্হান: ঢাকা। প্রকাশিত গ্রন্থ: নুনফলগল্পগুলি, রসেবশে প্রকাশনী, কলকাতা, জলের অক্ষর নালন্দা প্রকাশনী, ঢাকা এবং অণুগল্পের বই- অনুপ্রাণন প্রকাশনী, ঢাকা।উপন্যাস: তোমার জন্যে মেয়ে, অনুপ্রাণন প্রকাশনী, ঢাকা, আহা জীবন চিত্রা প্রকাশনী, ঢাকা। আলালের আনন্দঘর, পরানকথা প্রকাশনী, ঢাকা।, এক কিশোরীর মুক্তিযুদ্ধ, ইত্যাদি প্রকাশনী, ঢাকা। ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে তার অনুবাদ গল্পগ্রন্থ 'আফগান নারী লেখকদের নির্বাচিত গল্প' প্রকাশক গল্পকার।









একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ