ভূমিকা : ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাবে নির্মিত বর্তমান গপ্পোটিকে চাখতে গেলে এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে লাফ দেওয়ার ভঙ্গিটি স্মরণে রাখতে হবে । তাছাড়া লেখক গড়গড় করে বলে যাবেন আর রিসিভিং এন্ডে বসে পাঠক সোনা মুখ করে সব গিলে নেবেন এটা এই যুগে আর চলে না। অকথিত অংশগুলি বুনে নেওয়ার জন্যে ধীমান পাঠক সদাসর্বদা উন্মুখ থাকেন সেটাও আমরা জানি ।
( প্রথম পর্বের লেখালেখি )
গরুর গায়ে ইনজেকশন ফুঁড়ে গরুকে দুগ্ধবতী করার ঘোর বিরোধী গোবিন্দ। আমাকে বোঝাচ্ছিল সে , “ উয়াতে কি হয় বুইল্যান? মা ভগবতীর রক্তটাকে ইনজেকশন দিয়ে দুধে টেনেসফার ন কি যেমন বলে , সিটা করা হচ্ছে ! ছিঃ ! স্বপন শালা হিন্দুর ছা হঁয়ে উসব কইরচে ! উয়ার পরিণতি আপনি দেখে লিবেন ! উ শালা কুঠে হয়ে মরব্যাক ! আমি উসবে নাই। গরুর রক্ত বিচা টাকার ভাত আমার মুখে রুচব্যাক নাই।"
আমি ঘাড় নেড়ে গোবিন্দর মানসিকতার তারিফ করি। মুখে বলি, “ শুনেছিলাম বটে গরুকে ইনজেকশন দিলে পালানে দুধ বেশি আসে। ইনজেকশনটা তাহলে তোমরা কখন দাও? রাতে? নাকি সকালে দুধ দুইবার আগে?”
গোবিন্দ প্রচণ্ড বিরক্তির সঙ্গে আমাকে স্নেহ মাখানো তিরস্কার করে, “উঃ! বইললাম নাই আমি উসব ঘিন্না করি, আপনি কি কালা বঠে ন কি? উসব ইনজেকশন ফুঁড়াফুঁড়ি আমাকে কেটে দিলেও কইরতে লাইরব । ”
— দ্যুৎ! তুমি ঠিক বলছ না! তাই যদি হয়, তাহলে আমাদের কলোনির প্রায় চল্লিশটা বাড়িতে স্বপনের কাছে দুধ নিচ্ছে, অথচ মাত্র চারটে বাড়ি তোমার কাছ থেকে দুধ নিচ্ছে কেন? ওইসব ফোঁড়াফুঁড়ির ব্যাপারটা কেউ জানে না বলতে চাও ?
গোবিন্দকে তাতিয়ে দেবার জন্য মিচকে হেসে প্রশ্নটা করি আমি। গোবিন্দ আর স্বপন ছাড়াও আমাদের কলোনিতে আরো চারজন গোয়ালা দুধ দিতে আসে রোজ। একজন প্যাকেটবন্দি দুধও দিয়ে যায়। কেন জানি না আমাদের কলোনির বউরা প্রায় সকলেই রাত্রি আটটার পরে দুধ নেওয়া পছন্দ করে। হয়তো সকালের দিকে বাড়ির কত্তাদের অফিস বা ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজে রওনা দেবার ব্যস্ততায় দুধ গরম করার সময় থাকে না। তা, দুধ বিলি হয়ে যাওয়ার পরেও কলোনির গেটে বসে একটু আড্ডা দেবার ইচ্ছা স্বপন, গোবিন্দদের থাকে। বসার জন্য দুটো সিমেন্টের বেঞ্চ করা আছে। কলোনির গার্ড বিরিঞ্চি, অখিল, স্বপন, গোবিন্দ আর দু চারজন আবাসিক মিলে একটু গল্পগাছা হয়। গুরুতর প্রশ্নটা ছিল, "স্বপনের বিক্রি করা দুধের পিছনে রক্তাক্ত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও তার খদ্দের বেশি কেন?" স্বপন আজ দুধ বিলি করেই চলে গেছে, দাঁড়ায়নি, তাই গোবিন্দ একটু বেশি খোলামেলা হতে পারে। বলে, “শুনেন, জানে নাই তা লয়। কলোনির অনেকেই আনজাদ ঠিকেই করতে পারে। তবে কিনা হয় আমি, নাইলে স্বপন, লয় ত খাটাল এই তিন ছাড়া ত গতি নাই। খাটালে লাইন দিবার সময় সবাকার থাকে নাই। ওপিসারদের কথা ত ছাড়ানই দ্যান! উনারা খুবেই বিজি। আবার ধরেন, আপনার মতন মানুষ যারা কিনা ওপিসার লয় তবু বিজি ক্যানে ভগবান জানে! শুনা যায় আপনি ন কি একজন কোবি! সেই আপনিও পেকেটের দুধই কিনেন। ক্যানে কি না, হয় খাটালে যাওয়ার সময় আপনার নাই লয়ত আমাদের দুজনকেই বিশ্বাস নাই। বঠে কিনা ?”
আলোচনাটা যাতে অন্যদিকে বাঁক না নেয় তাই মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য বলি, “তাহলে তুমি বলছো যে, তুমি যেমন দুধে জল মেশাও স্বপনের তা দরকার হয় না? ইনজেকশনের দুধ তো এমনিতেই পাতলা হবে।”
গোবিন্দ মিটিমিটি হাসে। বলে, “ দাঁড়ান! শুধু ইনজেকশনে থেমে গেলে চলব্যাক নাই। ইনজেকশনের দুধ দুয়া হয়ে যাবার পর ত পথমে পাঁচ লিটার, দশ লিটার করে তুলে লিব্যাক যারা ‘জাকড়’ দিইছিল তারা । যেটুকু বাঁচব্যাক সিটাতে ত্যাখন জল বা অন্য কিছু মিশাল দিবার পশনো।”
আমার শব্দভান্ডারে ‘জাকড়’ শব্দটা নেই। বলা হয়ে থাকে, বাংলা শব্দভান্ডারে মাত্র এক লক্ষ কুড়ি হাজার শব্দ আছে। এই পরিচিত এক লক্ষ কুড়ি হাজার শব্দের মধ্যেও ‘জাকড়’ শব্দটি নেই বোধহয়। গোবিন্দকে বলি, “এই ‘জাকড় ’ না কি যেন বললে সেটা কি জিনিস?”
— কিছু লোক আছে যারা গুয়ালাদের গরু, মোষ কিনার জন্যে টাকা ধার দেয়। সুদ ফুদ লয়, উয়ারা কমদামে মানে হোলসেল রেটে দুধটা তুলে লিব্যাক। উয়াদের সামনে গরুর বাঁট থেকে টানতে হবেক দুধ । দশহাজার ধার লিলে পাঁচ লিটার কুড়ি হাজার লিলে দশ লিটার, ইভাবে উয়ারা দুধটা টেনে লিব্যাক। পোয়সা দিব্যাক, তেবে ওই হোলসেল রেটে। যদ্দিনে ধার শোধ হয় ত্যাতদিন উয়ারা দুধ লিয়ে যাবেক। এখন খুলা বাজারের রেট ধরেন ষাট টাকা লিটার। যে রেটে আপনারা দুধ কিনেন। ত যারা বিশ তিরিশ হাজার করে ‘জাকড় ’ দিয়েছে তারা চল্লিশ টাকা লিটার রেটে পাঁচ – দশ লিটার দুধ বাঁট থেকে টেনে লিয়ে যাবেক।
— ও ! যারা জাকড় দিয়েছে তারা এত দুধ নিয়ে কি করে ?
— উয়ারা আমার মতন খুচরা সেলম্যানকে পঞ্চাশ টাকা লিটার রেটে দুধটা বিচে দেয়। আমরা ষাটে বিচি । লিটারে দশ টাকা রাখি।
— ও ! তাই সেদিন স্বপন খুব হ্যাট্যা করে বলছিল বটে , ‘ গোবিন্দর কথা ছাড়ান দ্যান ত ! উ গরুর কি বুঝে ? উয়ার ঘরে একটাও গরু নাই ইদিকে গুয়ালা হঁয়েছে !’
— উ শালা শুধু গরুর গোবর ফ্যালে! সারাদিন গরুর চাকর হয়ে থাকে অথচ রেতে ঘরকে ফিরে এক কাপ দুধ খাবার উপায় নাই ! হঃ হঃ হঃ! উ ঠিকেই বলেছে আমি শুদু দুধ কিনি আর বিচে দিই। গরুর বাগাল আমি লই।
গোবিন্দর কণ্ঠস্বরে নিজের পেশার প্রতি আস্থা এবং তৃপ্তির আভাস টের পাওয়া যায়। তেতে ওঠার লক্ষণ না থাকায় আমার উদ্দেশ্য মাটি হতে যাচ্ছে দেখে কলোনির গার্ড বিরিঞ্চি বলে ওঠে, “তাইলে বলতিছো শুধুমাত্র লিটারে দশ টাকা করে পফিটই তুমার সম্বল ? কনো দু নম্বরি নাই ? তবে বাপু সারাদিনে রাতে মাত্র পাঁস লিটার দুধ তুমি বিচতে পারো কিনা সন্দ আছে। চাইর লিটার দুধ কিইন্যা জল মিশায়ে পাঁস লিটার করো তুমি।” গোবিন্দ খেপে ওঠে, “কুনু খদ্দের আমার কাছে কুনুদিন কমপ্লেন করলেক নাই! আর তুমি শালা ভগবান সব নিজের চোখে দেখে বসে আছো যে চার লিটার কে পাঁচ লিটার কইরছি আমি? এইত সামনেই ঘোষবাবুর ঘর। যাও ত ! জিজ্ঞাস করে আস !”
আলোচনা আবার ডালপালা ছড়াচ্ছে দেখে রাশ টানবার চেষ্টা করি, “তা গোবিন্দ! স্বপনের সব দুধটাই তো তাহলে যারা জাকড় দিয়েছিল তারা তুলে নিয়ে চলে গেল , তাহলে ও যে চল্লিশটা, পঞ্চাশটা ঘরে দুধ দিয়ে যায় তা কোথা থেকে পায় ?”
গোবিন্দ মিটিমিটি হাসে। বলে, “জাকড় লিয়া গরু–মোষ ছাড়াও ত কতকগুলন হাড় বেরানো গরু-মোষ আছে! জাকড়দাররা দুধ লিয়ে চলে যাবার পর উ গুলান থেকে দু লিটার, চার লিটার করে যা দুধ টানা যায় টানলেক। ইখেনেও ইনজেকশন আছে তবে যে দুদিন বাদে ভাগাড়ে যাবেক তাকে আর ইনজেকশন দিয়ে কি লাভ! ফুটা হাঁড়িতে জল ধরে রাখা যাবেক কি! ত সেই গরুর দুধ যতটা টানা গেলেক ত্যাতটা , তার সঙ্গে কেজিখানেক সস্তার পাউডার দুধ, দু কেজি আতপ চাল মিহি করে বাটা, এক পুয়া গরম ডালডা আর কুড়ি লিটার মতন জল মিশায়ে পুঁচিশ লিটার দুধ তোয়ের করা হোল –
— আতপ চাল বাটা, গরম ডালডা – কি বলছো তুমি ?
গোবিন্দ হাসে, বিরিঞ্চিকে বলে, “দেখেচ বিরিঞ্চিদা, বাবু রসিক বঠে, তবে দুনিয়াদারির কিছোই শিখেন নাই! শুনেন! এক কেজি পাউডার দুধ দুশো পঁচাত্তর টাকা থেকে আরম্ভ। ইয়ার পর যত গুড় ঢালবেন ততই মিষ্টি হবেক। এক কেজি গুঁড়া দুধকে গুলে পাঁচ লিটার আরামসে করা যাবেক।
আতপ চাল বাটাটাকে কাপড়ে ছেঁকে লিয়ে বটের আঠার মতন ঘন সাদা মালটাকে মিশালে ওই পাঁচ লিটার গুলা দুধটাকে মনে হবেক হঁ! ঘন বটে ! আর গরম ডালডা দু ফোঁটা ত ভাসন্ত ঘি বঠেই ! লয় কি ! হঃ হঃ হঃ !
— সেকি হে! তাহলে এরকম দুধ খেয়ে লোকে সুস্থ আছে কি করে ? না –না ! তুমি হিংসাতে নানান কথা বানিয়ে বলছ!
বিরিঞ্চি বলে ওঠে, “না দাদা, ও কইছে ঠিকই। ও তো নিজেই এই কারবার করতাছে আজ দশ বৎসর, স্বপনের চাইতে কম এই যা ফারাক।
— শুন বিরিঞ্চিদা! ইয়ার্কি করে কুনো লাভ নাই। তুমি শালা বাঙাল, সব নিজের চখে দেখে বসে আছো ? আমার খদ্দের কুথা যে অত কাণ্ড করতে যাব? শুনেন দাদা, রোগ অসুখের কথা যদি বলেন, হচ্ছে নাই কি? হঁ ! সঙ্গে সঙ্গে কিছু হচ্ছে নাই , তবে ধীরে ধীরে সোলো পয়জন ত হচ্ছেই , নাইলে ডাক্তারখানায় এত ভিড় ক্যানে ?
সুশ্রুত চরককে কহিলেন, “ভদ্র! মধুমেহ, রক্তাল্পতা, কর্কট প্রভৃতি ব্যাধিগুলি আপনি বহু পূর্বেই চিহ্নিত করিয়াছিলেন। এই একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পণ করিবার পর ব্যাধিসমূহের কোনরূপ বিবর্তন লক্ষ করিতেছেন কি? চরক স্মিত মুখে কিয়ৎক্ষণ নিরুত্তর রহিলেন, অতঃপর কহিলেন, “বৎস! এই একবিংশ শতকে প্রতিটি মানুষের শরীর ও মনোবিকলনের উৎসে তাহার অপরিসীম ক্ষুধা। এই ক্ষুধার্ত প্রজন্মের ব্যাধিসমূহের চিকিৎসার আগে তাহার ক্ষুন্নিবৃত্তিই জরুরী।”
( দ্বিতীয় পর্বের লেখালেখি )
"যদি হতে চান লক্ষ্ণী বউঠান তাহলে আপনার পুরো ছবি আর বায়োডাটা এই ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন! লক্ষ্ণী বউঠান, প্রযত্নে এইচটিভি, কলকাতা ৭, পাঠিয়ে দিন আর রোজগার করে নিন দশ গ্রাম সোনার হার , মাইক্রোওভেন এবং আটহাজার টাকার বেনারসি শাড়ি!" সোম থেকে শুক্র ‘লক্ষ্ণী বউঠান’। সিরিয়ালের মাঝে এবং শেষে এই ঘোষণা করা হয় , ঠিকানাটা পর্দায় ফুটেও ওঠে।
যে কোনো শহরের প্রায় প্রতিটি গৃহবধূই এই ঠিকানাটি হয় তাদের স্মৃতিতে অথবা খাতায় টুকে রেখেছে। অনেকেই তাদের ছবি আর বায়োডাটা পাঠিয়েছে তবে কল আসেনি কারোরই। এরকমই জানতো শর্মিলা তবে সেদিন মৌসুমী রাত দশটায় ফোন করে তাকে চমকে দিল , “আজকের লক্ষ্ণী বউঠান দেখলি ?”
— না রে! ডাক্তার দেখাতে গেছিলাম। ফিরে এসে যাতে ‘লক্ষ্ণী বউঠান’টা দেখতে পারি সেজন্য হিসেব কষে দুদিন আগে নাম লেখালাম এক নম্বরে। কিন্তু কপাল! ডাক্তারটাই আসতে দেরি করল! যাকগে – কেন রে? কি হয়েছে আজকে ? তোদের ওখানে ওই সময় লোডশেডিং ছিল নাকি ?
— না – না! শোন! শুনলে চমকে উঠবি! আজ লক্ষ্ণী বউঠানে যে মেয়েটা ফার্স্ট হয়েছে সেই মেয়েটা আমাদের পাড়ার!
— ওমা! তাই নাকি? তোর সঙ্গে ভাব আছে? তাহলে তো আগে থেকে জানতিস তুই! আমাকে আগে বলিস নি কেন ? তাহলে ডাক্তার দেখাতে যেতাম না !
— আরে না! শোন না! ভাব নেই। আমাদের বাড়ির বাঁদিক থেকে মাত্র ন’টা বাড়ি দূরে থাকে। তবুও ভাব নেই। মেয়েটা তো নেকী টাইপের! খুকি খুকি ভাব আছে। কবিতা টবিতা লেখে নাকি! মাসে দু চারবার পুরুষদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যায়! সেটা নাকি সাহিত্য আড্ডা ! হুঁঃ! আমরা কিছুই বুঝি না নাকি ? একটা মুণ্ডু চিবিয়ে আশ মিটছে না আরো একটা দুটো মুণ্ডু দরকার। গা জ্বলে যায়, লক্ষ্ণী বৌঠানে আবার বড় গলা করে বলল , ‘ আমি কবিতা লিখি !’
— যাকগে! শোন না! টিভিতে বউটাকে কেমন দেখতে লাগছিল রে ? যেমন নরমাল সেরকমই নাকি তার চাইতে সুন্দরী ? ওখানে তো শুনেছি আগে মেকআপ দিয়ে নেয় তারপর ক্যামেরার সামনে দাঁড় করায়! উফ! আমরা কেউ কি কোনদিন চান্স পাবো না ? আমার তো মা কালীর কাছে পাঁঠা মানত করা আছে।
— শোন না! আমার হাজব্যান্ড একটা খোঁজ পেয়েছে। যারা অ্যাপ্লাই করছে তাদের মধ্যে থেকে লটারি করে কল দেওয়া হয় বলে টিভি চ্যানেল থেকে যেটা বলা হয় সেটা নাকি নয় ! একটু দু নম্বরি আছে।
— সেকি রে! আমি তো তাহলে কোনদিনই ডাক পাবো না!
— শোন না! রেল স্টেশনের কাছে বাজারটায় একজন এজেন্টের অফিস। সে নাকি বাংলা সিরিয়ালে অভিনয়ের সুযোগ আর এসব গেম শো গুলোতে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। আমি ওকে নিয়ে আজ বিকেলে সেই এজেন্টের কাছে যাচ্ছি। তুই যাবি তো সুবীরদাকে বলে আমাদের সঙ্গে চল ! সবচেয়ে ভালো হয় সুবীরদাকেও সঙ্গে নিয়ে আয়। তোকে না জানিয়ে আবার একা একা চান্স করে নিলে তো কথা বলা বন্ধ করে দিবি। যাই করিস বাবা এই যে গোপন কথাটা বললাম এটা আবার তোর পরিচিত কাউকে বলিস না ! আগে আমি টিভিতে মুখটা দেখাই তার আগে ভিড় বাড়াতে চাইছি না।
সব শুনে সুবীর বলল, “হুম! হতে পারে। টিভি চ্যানেলগুলো এখন আর সিরিয়াল দেখাতে চাইছে না। সিরিয়ালের প্রডিউসারকে যে টাকা দিতে হয় তার চেয়ে অনেক কম টাকা একজন অ্যাঙ্করকে দিয়ে এইসব গেম শো অথবা ঢপের নাচ গানের কম্পিটিশন করিয়ে নিচ্ছে। দর্শকরা আজকাল মেগা সিরিয়াল ছেড়ে এসব দিকে ঢুকেছে। সিরিয়ালের টিআরপি এখন পড়তির দিকে, বিজ্ঞাপন পাওয়া মুশকিল, এইরকমই পড়ছিলাম সেদিন। সুতরাং এসব ‘লক্ষ্ণী বউঠান’ ‘অসভ্য ঠাকুরপোই’ চলবে এখন। তাই সুযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য ফড়েরা এসে জুটবে তা আর আশ্চর্যের কি! তবে দ্যাখো জাল এজেন্টের খপ্পরে পড়ো না আবার! টাকাও গেল, ওদিকে টিভিতে মুখ দেখানোও হলো না! তোমার শখ মেটানোর জন্য হাজার পাঁচেক টাকা অব্দি খরচা করতে পারি আমি।
— আহা! শুধু আমার শখ বলছো কেন? তোমাকেও তো টিভিতে দেখাবে!
স্টেশন বাজারে সারি সারি দোকান ঘরের মাঝে ‘মেট্রো কমিউনিকেশনের সাইনবোর্ড লাগানো অফিসটা খুঁজে পেতে ওদের সময় বেশি লাগলো না। কালো কাচ লাগানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ওরা দেখল তিনদিকে দেওয়াল ঘেঁষে গদি লাগানো বেঞ্চে পনেরো – কুড়ি জন নারী পুরুষ।
একদিকে একটি টেবিলের পেছনে চেয়ারে একটি মেয়ে। মৌসুমী এগিয়ে গেল সেদিকে, বলল, “আমি মৌসুমী। ফোন করেছিলাম , এই সময় আমাদের আসতে বলা হয়েছিল।” মেয়েটি তার সামনে খুলে রাখা খাতায় কিছু লিখল তারপর একগাল হেসে বলল, “আপনি কি একা এসেছেন নাকি পার্টনারকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন ?”
— হ্যাঁ ! ও শর্মিলা। আমরা দুজনেই বায়োডাটা পাঠিয়ে দিয়েছি তবে একসঙ্গে নয়।
— ঠিক আছে। বসুন একটু । স্যার ভেতরে অন্য ক্যান্ডিডেটকে নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আপনাদের একটু পরে ডাকা হবে।
সুবীর বুঝে নিল এই স্যারটি সেই এজেন্ট যিনি ‘লক্ষ্ণী বৌঠানে’ প্রবেশ লাভের চাবিকাঠিটি শর্মিলাদের হাতে তুলে দিতে পারবেন। কিন্তু কত টাকার বিনিময়ে ? ঘরে তো ভালোই ভিড় দেখছি , তার মানে এই এজেন্টটি প্রতারক নয়। তাহলে এর মধ্যে মার টার খেয়ে যেত। দেখা যাক! পাঁচ হাজারের মধ্যে হলে মন্দ কি! ঘন্টাখানেক বিরক্তিকর অপেক্ষা করার পরে স্যারের চেম্বারে ঢোকার সুযোগ পেলে ওরা। স্যার বললেন , “আমাদের লক্ষী বউঠান তো আপনারা দেখেনই , তাই জানেন যে ফার্স্ট হয় সে পায় একটা দশ গ্রাম সোনার হার, একটা বেনারসি একটা মাইক্রোওভেন। আর সেকেন্ড যে হয় সে পায় একটা মিক্সার গ্রাইন্ডার আর একটা ননস্টিক ফ্রাইং প্যান , জানেন তো ?" ওরা সকলে ঘাড় হেলায় ।
স্যার ওদের ঘাড় নাড়া দেখার জন্যেই সামান্য বিরতি দিয়েছিলেন যেন, আবার শুরু করেন, “যেটা জানেন না সেটা এবার বলি! সেকেন্ডকে যা যা দেওয়া হয় সেগুলো সত্যি আর প্রথমকে খালি মাইক্রোওভেনটা দেওয়া হয়। অন্য সবকিছুই দেখানো হয় টিভিতে খালি কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপনের জন্যে। কেননা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে টাকার চুক্তি আছে আমাদের প্রডিউসারের। বুঝলেন ?”
ওরা প্রত্যেকেই বেশ অবাক! না বোঝার কিছু নয়, তাই ঘাড় নাড়লো আবার। “বেশ! এবার আসল কোথায় আসি ! যে সেকেন্ড হতে চায় তার লাগে দশ হাজার টাকা আর যে ফার্স্ট হবে তার লাগবে কুড়ি হাজার। আপনারা যেহেতু দুটো ফ্যামিলি একসঙ্গে এসেছেন তাই অনুমান করা যায় যে আপনারা বন্ধু , তাই ঠিক করে নিন কে ফার্স্ট হবে আর কে সেকেন্ড হবে। কুইক! বাইরে অনেকে অপেক্ষা করে আছে।”
শর্মিলা মৌসুমীদের চোখ কপালে উঠে গেছে! তারা স্বপ্নেও ভাবেনি ব্যাপারটা এমন হতে পারে! সুবীর অবাক হয়ে বলল, “টাকাটা আপনাকে দিলেই সিরিয়ালে চান্স এবং ওই ফার্স্ট, সেকেন্ড এমন ভাবে বলছেন যেন আপনিই এসব ঠিক করেন। আপনি তো মশাই সামান্য একজন ফড়ে।”
সুবীর ইচ্ছে করেই রাগের চোটে ‘ফড়ে ’ ‘শব্দটা বলেছিল না হলে এজেন্ট ফেজেন্ট বলতে পারতো। লোকটা কিন্তু হাসিমুখেই বলল, “ফার্স্ট সেকেন্ড আমি ঠিক করি না। দশ হাজার বা কুড়ি হাজারে ঠিক করে ওটা। হ্যাঁ! আমি একজন ফড়ে। তবে এইচ টিভির ফড়ে ! অফিসিয়ালি কোথাও আমার নাম পাবেন না। ওই তিরিশ হাজারের টেন পার্সেন্ট আমার। টাকাটা আপনারা দেন না , ওটা কোম্পানি দেয়। শুনুন মশাই , শুধু ইন্ডিয়া নয় , সারা পৃথিবীর কতগুলো দেশে আপনাদের পুরো ফ্যামিলির ছবি আধঘন্টা ধরে টেলিকাস্ট করা হবে জানেন? কোম্পানি যদি টাকা নাই নেবে তাহলে টালিগঞ্জের কোন বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীর বাড়িতে গিয়ে শুটিংটা করতে পারতো। তা না করে – কিছু মনে করবেন না , হেঁজিপেঁজি ফ্যামিলির ছবি তুলে আধঘন্টা ধরে দেখাতে যাবে কেন ? দেখলে হবে! খরচা আছে। আধ ঘন্টা ধরে অর্ধেকটা পৃথিবী জুড়ে কভারেজ পাবেন তা কি বিনা খরচায় হয় কখনো? যাগগে –আসুন আপনারা ! অন্য কেউ পাবে। আমার মতন ফড়ে সারা পশ্চিমবাংলায় ছড়ানো আছে। আমি মাসে মাত্র ছটা ক্যান্ডিডেটকে ঢোকাতে পারছি । এদিকে টাকা দিয়ে বসে আছে ত্রিশ জন । যাকগে আসুন !
তখনকার মতো ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ে সুবীররা। তবে সুবীর বুঝতে পারে, আজ থেকে আরেক ধরনের হীনমন্যতা শুরু হবে শর্মিলার ভেতরে।
মিশ্র কমিউনিকেশন থেকে বেরোতে খোলা বাজার। মৌসুমী নিরস গলায় বলল , “কিছু কিনবি?”
শর্মিলা নিষ্পৃহ, “নাঃ ! চ ! বাড়ি যাই।”
বাসস্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে সুবীর ভাবছিল, দশ হাজার টাকার বিনিময়ে একটা মিক্সার গ্রাইন্ডার , আরেকটা নন স্টিক প্যান মানে হাজারদুয়েক। ওদিকে কুড়ি হাজারের বিনিময়ে একটা মাইক্রোওভেন। একটা মাইক্রোওভেনের দাম কত ? নাঃ ! শুধুমাত্র বাঁধাধরা মাস মাইনেতে আজকাল সন্তুষ্ট থাকা যায় না ! আবার বউয়ের মুখ টিভিতে দেখার জন্য ব্যাঙ্কে জমানো টাকায় হাত দেওয়াটা ঠিক হবে কি! অবাক কাণ্ড ! পাশে হাঁটতে হাঁটতে মৌসুমীর স্বামী বিজনও ওই একই কথা ভাবছিল !
বাজারের মধ্যবর্তী স্থানে গনেশ মন্দির। শ্বেতপাথরের গণেশ উন্মুক্ত দ্বার দিয়া রাস্তার দিকে চাহিয়া আছেন। দুইজনার ভাবনার সাদৃশ্য দেখিয়া বাজারদেবতা তথা গণেশ মৃদু হাস্য সংবরণ করিলেন। অন্তত সুবীরের সেইরূপ উপলব্ধি হইল।
( তৃতীয় পর্বের লেখালেখি )
মা কালীর কাছে মানত করা পাঁঠা, বাক্যটির তাৎপর্য শহরের লোকেরা বোঝেই না। তারা তো কালীপুজোর দিন অথবা একদিন আগে পাঁঠা কিনতে যায়! পাঁঠাটা কিনে ফ্লাটে বা বাড়িতে রাখবে কোথায় ? গাঁয়ে ব্যাপারটা তা নয় , পাঁঠাটির শৈশবেই তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায় । কেউ একজন কিনে তাকে বাড়িতে নিয়ে এসে পালন করে নধর না হওয়া পর্যন্ত। পাঁঠাটির কপালে বা গায়ে যে কোন একটা জায়গায় লোমের উপর গরম লোহার ছেঁকা দিয়ে দেওয়া হয়। সেই পাঁঠা সারাদিন যা খুশি তাই করে চরে বেড়ায় , সন্ধ্যেয় মালিকের বাড়ি ফেরে। মানত করা পাঁঠা তোমার সাধের সবজি বাগান তছনছ করে দিতে পারে কিংবা তোমার অসতর্ক মুহূর্তে রান্নাঘরে ঢুকে তরকারির কড়াই উল্টে দিতে পারে , যা খুশি । তুমি তাকে হ্যাট হ্যাট করে তাড়াতেও পারো, তবে তার গায়ে আঘাত করতে পারবে না ! অন্তত গ্রামীণ সংস্কারে সেটা আটকায় । ‘মা কালীর কাছে মানত করা পাঁঠা’ আহা বেচারা !
এই একুশ শতকে এসে প্রতিটি শহরের প্রতিটি পাড়ায় এরকম কিছু উচ্ছুগগু করা পাঁঠা দেখতে পাওয়া যায়। কপালে বা গায়ে চামড়ার ওপরে স্টাম্প মারা নেই , তবু এরা ঠিকই পরস্পরকে চিনে ফেলে ! এদের পরস্পরের কথাবার্তার মধ্যে ব্লক , স্টেন্ট , অ্যানজিওগ্রাম , অ্যাঞ্জিওপ্লাসটি , বাইপাস এসব শব্দগুলো ঘোরাফেরা করে। মানত করা পাঁঠাটিকে যেমন বেশি মাংস পাবার জন্য ছেড়ে রাখা হয়েছে , তেমনি এদেরকে ছেড়ে রাখা হয়েছে ঘটি বাটি এমনকি বসত বাড়িটি বেচে চার– পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করে আনার জন্য । ওষুধের দোকানের সামনে বা পান সিগারেটের গুমটির পাশে দাঁড়িয়ে এরা নিম্নলিখিত ঢঙে বাক্যালাপ করে ,“ দাদা আপনার আর্টারিতে ব্লক কটায় ? কিরকম পার্সেন্টেজ ?”
— আরে ভাই , দুটোয় ব্লক। একটায় তো বলেছেন নাইনটি নাইন পার্সেন্ট আর একটায় ফিফটির বেশি। আপনার কটায় কি কি ?
— আমারও তো দুটো ব্লক! তবে পার্সেন্টেজ এত বেশি নয়। একটায় ফিফটির বেশি অন্যটায় ফর্টির ওপরে।
— আচ্ছা আপনার তো নিশ্চয়ই অ্যাঞ্জিওগ্রাম হয়েছে ?
— হ্যাঁ ! তা না হলে তো এত নিখুঁত বলা যায় না । তা যাক - আপনি কোথায় দেখাচ্ছেন যেন ?
—আমি তো ‘বিদ্রোহী নজরুল হার্ট রিসার্চ সেন্টারে ’ এটা গড়িয়ার দিকে । আপনি ?
— আমি ভাই ‘রানার সুকান্ত ক্যার্ডিয়াক কেয়ার হাসপাতালে’ , এটা সল্টলেকে। আপনার কি অপারেশন বলেছে ? বাইপাস নয় তো ?
— না অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি। আচ্ছা , বলুন তো , এই স্টেন্টটা কি জিনিস?একজন ডাক্তার বাংলাতেই বলছিল , ঠিক বুঝতে পারিনি।
— ডট পেনের রিফিল ভরেছেন তো ? সেই রিফিল ভরার সময় একটা ছোট্ট স্প্রিংয়ের ভেতরে রিফিলটা ঢোকাতে হয় তো ! স্টেন্ট সেরকম একটা জিনিস , তবে দামি মেটালের। ছোট্ট বেলুনের মধ্যে স্টেন্টটা ভরে , ধমনীর যে অংশটা ময়লা জমে বুজে এসেছে সেখানে ঠেলে গোঁজা হল। এবার বেলুনটা ফাটিয়ে স্টেন্টটা বুজে আসা নালিটাকে ঠেলে নিজে ওখানে থেকে যায় । রিংয়ের তারগুলোর ভেতর দিয়ে রক্ত চলাচলের রাস্তা তৈরি হল। বুঝলেন ?
— হুঁ ! পরিষ্কার ! আচ্ছা , এই স্টেন্টের এত দাম ? আমার দুটো স্টেন্টের দাম পড়বে দু লক্ষ বিরাশি হাজার। হাসপাতাল , ডাক্তারের চার্জ মিলিয়ে আরো দু লাখের কাছাকাছি। আপনাকে কি এস্টিমেট দিয়েছে ?
— আমার তো একটা স্টেন্ট লাগবে। এক লাখ ছ’ সাত হাজারের মধ্যে স্টেন্টের দাম বলেছে , এবার হসপিটালের খরচা । তিন ক্রশ করে যাবে।
— দ্যুৎ ! এত দাম তো নয় ! আপনাকে ঠকাচ্ছে ! খোঁজ নিন ভালো করে —
— খোঁজ নিয়েছি , আমারটা ড্রাগ এলুটিং স্টেন্টেন, মানে যেটার জন্য আর ওষুধ টোষুধ তেমন খেতে হবে না ।
— ও !
— তিন সাড়ে তিন লাখের মধ্যে হয়ে যাবে বলেছে । অফিসে অ্যাডভান্স চাইলাম । আত্মীয়রাও কিছু কিছু ধার দেবে বলেছে । সব জোগাড় হলেই কলকাতা ছুটবো ।
ওদের কথাবার্তার মাঝে একটা মিচকে শয়তান টাইপের চ্যাংড়া ছোঁড়া ওদের পাশে দাঁড়িয়ে বেশ আয়েশ করে সিগারেট টানতে টানতে ওদের কথা শুনছিল। ওরা যেহেতু একটা সার্বজনীন বিষয়ে কথা বলছে তাই এই চ্যাংড়াটার উপস্থিতি ওদের কাছে বিসদৃশ লাগেনি। সে এবার বলে উঠলো , “আচ্ছা দাদা, আপনারা তো আর ডাইরেক্ট এই নজরুল , সুকান্ততে যাননি ,তাই না ?”
প্রথম ব্যক্তি রীতিমত অবাক ! বেশ ঝাঁঝিয়েই বললেন , “কেউ কোনদিন এসব বড় হাসপাতালে নিজের থেকে গেছে বলে শুনিনি! রোগের লক্ষণ প্রথমে লোকাল ডাক্তার ধরেছিল , পরে তার পরামর্শে ওখানে যাই । কি ভাই , তাই তো ?”
দ্বিতীয় ব্যক্তি ঘাড় নেড়ে সায় দিলে আগন্তুক চ্যাংড়াটা বলে ওঠে , “শুনন দাদা ! ওসব রবীন্দ্র , নজরুল , সুকান্ত ছাড়ুন ! ওখানে যা এস্টিমেট দিয়েছে তার থেকে পার হেড কুড়ি হাজার কমে করিয়ে দিচ্ছি ‘অ্যাপোলো ক্লিন ঈগল ’ হাসপাতাল থেকে। চলুন ! কালকেই কাগজপত্র নিয়ে , ডিলটা ফাইনাল করে আসবেন ।”
প্রথম ব্যক্তির আর সহ্য হয় না , বলেন , “দ্যাখো , চ্যাংড়ামির একটা সীমা আছে । আমরা মরছি নিজের জ্বালায় আর তুমি ইয়ার্কি মারতে এসেছ ? মারব এক থাবড়া , দাঁতের পাটি খুলে যাবে ।”
ছোঁড়াটা উত্তেজিত হয় না। বলে , “ শুনুন মশাই ! এটা সবাই জানে যে আপনাদের লোকাল ডাক্তারগুলো থার্টি পার্সেন্ট কমিশন পাবে। ওরা লাইসেন্সড এজেন্ট। এটা সবাই জানে না যে আমার মতন লাইসেন্সহীন এজেন্ট মানে আমরা ডাক্তার নই , তবে আমাদেরও রেট ওই থার্টি পার্সেন্ট।
— থার্টি পারসেন্ট কমিশন ! বাপরে !
— হ্যাঁ ! তবে আমার মতন এজেন্টরা রোগী নিয়ে গেলে তো আর ‘রেফার্ড বাই শ্রী হরিদাস পাল ’ লেখা যায় না , তাই কাগজপত্রে অন্য কোন ডাক্তারের নাম বসিয়ে দেয়। তবে কমিশনটা দেয়। এদের সঙ্গে কাজ করে সুখ আছে ,কোনো দুনম্বরী নেই । তবে আপনার অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হলো নাকি একটা জায়গা অসাড় করে কাতুকুতু দেওয়া হল সেটা যেমন আপনিও বুঝতে পারবেন না আমিও না। হ্যাঁ , কাগজপত্রে লেখা থাকবে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি হয়েছে , ডাক্তারের সিগনেচারও থাকবে। অ্যাপোলো ক্লিন ঈগলসের ডাক্তার সত্যজিৎ রায়ের কাছে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করাবেন? নাম করা ডাক্তার তো ? তাহলে চলুন , কালকেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আসবেন । টাকা তো আমার হাতে দিচ্ছেন না , ওদের রেট , কোন ডাক্তার , সবকিছু জেনে ওদের কাউন্টারে টাকা জমা করবেন। আমি সঙ্গে থাকলে কুড়ি পার্সেন্ট কমে যাবে বিলটা । টেন পার্সেন্ট ওরা আমাকে পরে দিয়ে দেবে। বড় হাসপাতালের কাজ করে এটাই সুখ ! আমার ডাক্তারি ডিগ্রি নেই তাই এরকম ফেরিওয়ালার মতো বকতে হচ্ছে আর লোকাল ডাক্তারগুলোর মুখের গ্রাস ছিনিয়ে বছরে চার-পাঁচটা রুগী পাঠাতে পারছি ! ভেবে দেখুন , আমি ভাট বকছি কিনা সেটাও যদি পরীক্ষা করতে চান তাহলে অ্যাপোলোর এই নম্বরে ফোন করুন ! এই নম্বরের নিচের মোবাইল নম্বরটা আমার । তবে অ্যাপোলোতেই যদি অ্যাঞ্জিও করান , আমার নামটা বলবেন আমি টোয়েন্টি পার্সেন্ট কমে করিয়ে দেব । ওকে দাদা ! ভেবে দেখবেন , চলি !
চ্যাংড়াটা বকর বকর করে ওদের মাথা ধরিয়ে দিয়ে গেল বটে তবে ওরা এই দোটানায় পড়ে গেল যে চ্যাংড়াটাকে গ্রহণ করবে , নাকি বর্জন ?
বাজার উন্মুক্ত করিয়া দিবার পক্ষে যুক্তি ছিল এইরূপ যে সম্ভাব্য ক্রেতার সম্মুখে একাধিক বিকল্প থাকিবে । ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলিয়া লইবার’রোমান্টিসিজিমের দিন শেষ। বস্তুত, শূকরমাংস দেশীয় কসাইয়ের নিকট অথবা ‘বৃহৎ বাজারে’ মূল্যবান কৌটার মধ্যে, দুই ভাবে পাওয়া যায়। ক্রেতা তাহার অভিরুচি অনুযায়ী ক্রয় করিবে।
উপসংহার : –
পৃথিবীর বুকে কোন প্রকৃত সরলরেখা আঁকা সম্ভব নহে। কোন মতবাদ বা তত্ত্বের সর্বজনগ্রাহ্য প্রতিষ্ঠাও তেমনই অসম্ভব। তথাপি জীবনচর্যায় ভোগের অধিষ্ঠান সংক্রান্ত বাজারসংস্কৃতির যে সমস্ত তত্ত্বসমূহ বিদ্যমান তাহা আলোচনার পূর্বে আমরা বর্তমান শতকের অর্থনৈতিক মানচিত্রে মানবজাতির অধিষ্ঠান কিরূপ একবার দেখিয়া লই।
( ক ) ২০২২ –২৩ অর্থবর্ষে যে ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করা হয়েছে তাতে দেখা গেছে প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার ভারতীয়ের সম্পত্তির পরিমাণ এক কোটি টাকার ওপরে।
( খ ) ফোর্বস 2023 সালের পৃথিবীর ধনীতম ব্যক্তিদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে সেই তালিকাভূক্ত ভারতের ১৬৬ জন ধনীর অবস্থান নিশ্চিতভাবে এটাই প্রমাণ করে যে ভারতীয় অর্থনীতির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।।
( গ ) অক্সফাম রিপোর্ট ২০২৩ অনুসারে ভারতবর্ষের মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে ভারতের ৪০ শতাংশ সম্পত্তি । আর বাদবাকি নিরানব্বই শতাংশ মানুষের হাতে বাদবাকি ষাট শতাংশ সম্পদ !
( ঘ ) ধনবন্টনের এই বৈষম্যের ফলে নৈতিক অধঃপতন এত তীব্র আকার ধারণ করিয়াছে যে জনগোষ্ঠীর বৃহদংশ যেন তেন প্রকারেণ ওঁচাগিরি করিয়াও কিঞ্চিদধিক উপার্জন করিয়া লইতে ব্যগ্র ! মুঘল যুগের শেষদিকে ভারতবর্ষে এই অবস্থা বিদ্যমান ছিল।
( ঙ ) বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২৩ রিপোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে বিশ্বের ১২৫ টি ক্ষুধার্ত দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১১১ তম । ক্ষুধার্ত নাগরিকের সংখ্যার নিরিখে নেপাল ( ৫৯ তম ) শ্রীলংকা (৬০ তম) এবং বাংলাদেশের (৮১ তম) অবস্থান ভারতের চাইতে ভাল।
সুতরাং বলা যাইতে পারে দুনিয়ার সবচাইতে বেশি সংখ্যক ক্ষুধার্ত মানুষের বাসস্থান এই ভারতবর্ষেই!!
*****
লেখক পরিচিতি: দেবাশিস সরকার জন্ম, ১৯৬১ সালে। প্রথম গল্প 'নির্মাণের যন্ত্রনা ও যন্ত্রণায় নির্মাণ' , কলকাতার 'নান্দীমুখ' পত্রিকায়। মূলত 'অমৃতলোক' , 'ভাষাবন্ধন' এ নিয়মিত গল্প প্রকাশিত হয়েছে তাছাড়া 'দিবারাত্রির কাব্য' পত্রিকায় দুচারখানা 'কলেজ স্ট্রিট' পত্রিকায় দু চারটি গল্প এবং একটি ধারাবাহিক উপন্যাস' তারপর একালের রক্তকরবী' পত্রিকায় দীর্ঘ চার পাঁচ বছর ধরে নিয়মিত গল্প প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশিত গল্প সংকলন মাত্র দুখানা -- 'হিপোক্রাতেসের বাঙালি বাচ্চা' এবং 'ঈপ্সিতা কখন আসবে'। না।কোন পুরস্কার কমিটি লেখককে পুরস্কৃত করার যোগ্য মনে করেননি।


0 মন্তব্যসমূহ