দেখিনাই কভু দেখি নাই, এমন তরণী বাওয়া : লুতফুন নাহার লতা



ডঃ সনজীদা খাতুন, বাংলা সংস্কৃতির শিখা অনির্বাণ

তিমিরের পারে মনস্বীরা যে আলোকময়কে দেখে থাকেন তিনি সেই আলোকের জ্যোতিচ্ছটা পুঞ্জ। ডঃ সনজীদা খাতুন বাংলা সংস্কৃতির শিখা অনির্বাণ। তিনি তাঁর গৌরবোজ্জ্বল জীবন বিনির্মানের আলো জ্বেলেছিলেন শান্তি নিকেতনের গুণী শিক্ষকদের কাছে। তিনি শিষ্টাচারে নতমুখী, শান্ত, সভ্য, সুন্দর, উদার, অকৃত্রিম, অথচ অমিত তেজি, প্রতিবাদী,ও দৃঢ়চেতা মানসের এক মানবী। যিনি বাংলাদেশের বাঙালীদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ে শাশ্বত বাঙ্গালী হিসেবে গড়ে তুলতে আজীবন কাজ করে গেছেন।তিনি একজন লেখক, গবেষক, শক্তিশালী সংগঠক, সংগীতজ্ঞ ও অবশ্যই একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও শিক্ষায়তন নালন্দার প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি।

১৯৪৭ এ পাকিস্তান গঠনের মধ্যদিয়েই শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালির উপর পাকিস্তানের বৈষম্য মূলক তাবেদারি। ১৯৬৫ সালে পাক ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করে দেয় পাকিস্তানের বাঙালি বিদ্বেষী সরকার। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সংসদে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, 'রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ নয়।' পাকিস্তানের ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্য হীন হলেই সে সব গান কবিতা নাটক যাই হোক নিষিদ্ধ হবে। যে সব অনুষ্ঠানে রবিঠাকুরের গান-কবিতা থাকত, সেখানে পাকিস্তানি দোসররা ভাঙচুর চালাত নানা সময়ে। পাকিস্তানি শাসকদের মনে হয়েছিল, পাকিস্তানে আর যা-ই থাক রবীন্দ্রনাথের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই একের পর এক অন্যায় ভাবে চাপিয়ে দিচ্ছিল নানা নিষেধাজ্ঞা।

সেই তিমিরাচ্ছন্ন সময়ে তিনি ছিলেন অকুতভয় প্রতিবাদী সত্বা। সন্‌জীদা খাতুন তখন বাংলা বর্ষবরণ ও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনসহ নানা কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ছিলেন ‘মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সভাপতি ।

১৯৬০-এর দশকে বাংলা বর্ষবরণ, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ, ছায়ানটের কার্যক্রম এসব সাংস্কৃতিক তৎপরতার সঙ্গে ১৯৭১ এর বাংলার স্বাধিকার আর স্বাধীনতামুখী আন্দোলন, জাতীয় সঙ্গীত ও নানা বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন " ছায়ানটের সব কার্যক্রম বাঙালির সাংস্কৃতিক জাগরণমূলক ছিল নিঃসন্দেহে। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সাধনা তখন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে কিছু রাজনৈতিক ছিলনা। সংস্কৃতিচর্চার ‘অপরাধে’ আমাকে শাস্তিমূলকভাবে সুদূর রংপুরে বদলি করা হয়েছিল। সেখানকার কারমাইকেল কলেজে কিছু কিছু শিক্ষকের ভেতরে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেতনা জাজ্বল্য ছিল। ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে এসব চেতনা প্রকাশ পেয়েছিল একটি ঘটনায়। একজন শিক্ষক ইংরেজিতে হাজিরা নিতেন। বারবার বাংলায় ক্রমিক নম্বর বলার অনুরোধ করার পরও তিনি কথা গ্রাহ্য করেননি বলে তাঁর ক্লাসে সাড়া না দিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাঁকে ক্লাসঘরে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। তা ছাড়া ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা যেত ছাত্রদের মুখে। এসব স্বাধীনতার ঐকান্তিক আকাংখার পরিচয়।

পঞ্চাশের দশকে ঢাকার ‘কার্জন হলে পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রতিনিধিদের সামনে বঙ্গবন্ধু আমাকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাইবার জন্য অনুরোধ করে পাঠিয়েছিলেন। গানটির প্রতি বঙ্গবন্ধুর আকর্ষণ এত প্রবল ছিল যে দেশ শত্রুমুক্ত হলে এটিকেই তিনি জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দান করেছিলেন। আজ এ কথা উপলব্ধি করে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে এ গান শোনানোর সৌভাগ্য হয়েছিল মনে করে ধন্য মানি।"

জন্মেছিলেন ১৯৩৩ সালে। পিতা ড. কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি ও জাতীয় অধ্যাপক। মাসুদ রানা, কুয়াশা সিরিজের লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর ভাই। বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ফাহমিদা খাতুন তাঁর বোন সেই সাথে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশারদ, শিল্পী ও সংগঠক পণ্ডিত ওয়াহিদুল হক ছিলেন তাঁর জীবন সঙ্গী।

সনজীদা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক শেষ করেন ১৯৫৪ সালে। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৫৫তে। এর বেশ অনেক পরেই ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষক হিসেবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। তবে প্রথাগত চাকুরি আর ছায়ানট নিয়ে সে এক মহাযজ্ঞ বটে। শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ইডেন কলেজ, কারমাইকেল কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা শেষে অবসর নেন। এবং নিজেকে পুরোপুরি ঢেলে দেন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বহু পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত), দেশিকোত্তম পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)। এছাড়া কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট ১৯৮৮ সালে তাকে ‘রবীন্দ্র তত্ত্বাচার্য’ উপাধি, ২০১৯ সালে ‘নজরুল মানস’ প্রবন্ধ গ্রন্থের জন্য ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে। ২০২১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত করে।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। এরপর সাভারের জিরাব গ্রাম থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তার সাথে কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মীও ছিলো। তারা ভারতের আগরতলা শহরে কিছুদিন অবস্থান করেন। তারপর ৫ মে, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সাংস্কৃতিক কর্মীদের একতাবদ্ধ করা শুরু করেন।

২৫ মার্চ, ২০২৫ দেশ যখন এক ভয়াবহ অন্ধকারে নিমজ্জিত, শিল্প সাহিত্য, সংগীত সব কিছু যখন মৌলবাদের যাতায় নিষ্পেষিত সেই মহা বেদনার ভার আর বইতে পারলেন না । অনন্তের আবাহনে বেরিয়ে পড়েছেন অনন্তলোকের পথে। যাবার আগে পরম সন্তান ( সন্তানের সন্তান, grand child) Shayantani'র সাথে শে ষ কথোপকথন ছিল এমন।

শেষ কথাগুলো:

১০ মার্চ-

নানু (সন্‌জীদা খাতুন) স্কয়ার হাসপাতালের এইচডিইউতে ভর্তি। ভিজিটিং আওয়ারে গেলাম দেখা করতে। শেষের দিকে বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকতো, কথা ঠিক মতো বলতে পারতো না। কিন্তু সেদিন কিভাবে যেন অনেক কথা বলে ফেললো। জিজ্ঞেস করলাম যদি প্রয়োজন পড়ে লাইফ সাপোর্ট চায় কিনা। বললো চায় না- "এভাবে বাঁচার কোনো মানে নেই"। আরও বললো, "আমার অনেক দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছি না। বাংলাদেশটাতো এমন ছিলো না। কি হয়ে গেল?"

আমি বললাম, মনে আছে- তুমি আমাকে সব সময় বলতে, মন খারাপ হলেই গান করবে? এখন আমি তোমাকে বলছি দুশ্চিন্তা সরানোর জন্য মনে মনে গান চিন্তা করো। কি গান আসছে মাথায়?

নানু বললো- ঝরা পাতা গো আমি তোমারই দলে...

(ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে।

অনেক হাসি অনেক অশ্রুজলে

ফাগুন দিল বিদায়মন্ত্র আমার হিয়াতলে॥

ঝরা পাতা গো, বসন্তী রঙ দিয়ে

শেষের বেশে সেজেছ তুমি কি এ।

খেলিলে হোলি ধূলায় ঘাসে ঘাসে

বসন্তের এই চরম ইতিহাসে।

তোমারি মতো আমারো উত্তরী

আগুন-রঙে দিয়ো রঙিন করি--

অস্তরবি লাগাক পরশমণি

প্রাণের মম শেষের সম্বলে॥)

একটু পরে আবার জিজ্ঞেস করলাম, এখন কোন গান এসেছে মাথায়?

নানু: হে মাধবী...

(হে মাধবী, দ্বিধা কেন, আসিবে কি ফিরিবে কি--

আঙিনাতে বাহিরিতে মন কেন গেল ঠেকি॥

বাতাসে লুকায়ে থেকে কে যে তোরে গেছে ডেকে,

পাতায় পাতায় তোরে পত্র সে যে গেছে লেখি॥

কখন্‌ দখিন হতে কে দিল দুয়ার ঠেলি,

চমকি উঠিল জাগি চামেলি নয়ন মেলি।

বকুল পেয়েছে ছাড়া, করবী দিয়েছে সাড়া,

শিরীষ শিহরি উঠে দূর হতে কারে দেখি॥)

আমি: এখন একটু ভালো লাগছে?

মাথাটা কষ্ট করে উপরে নিচে করলো। বুঝলাম মনটা একটু ভালো হয়েছে। এই সুযোগে জিজ্ঞেস করলাম- "এবার বলো আমি কে"।

নানু হেসে বললো- তুমি আমার আল্লাদিটা।

১১ মার্চ-

এখনও স্কয়ারে ভর্তি, ডায়ালিসিস চলছে। জিজ্ঞেস করলাম কোন গান মনে পড়ছে, বললো- তোমায় নতুন করেই পাবো বলে...

(তোমায় নতুন করেই পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ

ও মোর ভালোবাসার ধন।

দেখা দেবে বলে তুমি হও যে অদর্শন,

ও মোর ভালোবাসার ধন॥

ওগো তুমি আমার নও আড়ালের, তুমি আমার চিরকালের--

ক্ষণকালের লীলার স্রোতে হও যে নিমগন,

ও মোর ভালোবাসার ধন॥

আমি তোমায় যখন খুঁজে ফিরি ভয়ে কাঁপে মন--

প্রেমে আমার ঢেউ লাগে তখন।

তোমার শেষ নাহি, তাই শূন্য সেজে শেষ করে দাও আপনাকে যে,

ওই হাসিরে দেয় ধুয়ে মোর বিরহের রোদন,

ও মোর ভালোবাসার ধন॥)

তারপর জিজ্ঞেস করলাম, জন্মদিনে কি চাও? অনেক কষ্ট করে বললো- "শুভেচ্ছা"। ৪ এপ্রিল নানুর জন্মদিন। অনেক আশা করেছিলাম জন্মদিনটা পর্যন্ত টিকবে।

১৩ মার্চ-

এইদিন আবারও বললো 'ঝরা পাতা' গানটার কথা। তারপর আমার কাছে নালিশ করলো- "আজ কিছুই খেতে পাই নি"। ভেবেছে হাসপাতালে অবহেলা করে তাকে খেতে দিচ্ছে না। বুঝতে পারছিলো না যে, মুখে খেতে পারছে না তাই নল দিয়ে খাবার দেয়া হচ্ছে।

১৮ মার্চ-

শরীরটা একটু ভালো হয়েছিল বলে ডাক্তার বাসায় নিয়ে আসতে দিল। বাসায় সন্ধ্যার দিকে জিজ্ঞেস করলাম কি খেতে ইচ্ছা করে? বললো- ফল খাবো। আমি দৌড়াদৌড়ি করে বাসা থেকে তরমুজ নিয়ে গেলাম। তরমুজের একটা টুকরা মুখে দিয়েই নেতিয়ে পড়লো। তারপর আর উঠলোই না। ১৯ মার্চ নেয়া হলো আইসিইউতে। ৭ দিন কোমায় ছিলো।

২৫ মার্চ-

দুপুরে রুচিখালার ফোন পেয়ে ছুটে গেলাম স্কয়ারে। নিথর দেহটা পড়ে আছে আইসিইউ'র বিছানায়। আর কোন কথা বললো না। নানুর সাথে আমার কথোপকথন এখানেই শেষ।"

তিনি বিদায় নিলেন তাঁর অগনিত ছাত্রছাত্রী আর প্রিয়জনের কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গানে গানে। সুরের এক ঐন্দ্রজালিক আবর্তে, সবার ভালোবাসার পারিজাত হাতে। যাবার অনেক আগেই দান করে গেছেন দেহখানি। কোথাও জেনেছিলাম আশিতম জন্মদিন উপলক্ষে, তাঁরই কণ্ঠে ছোট্ট বেলার ছোট্ট মিনু তিনি তখন মায়ের সাথে নামাজ পড়তে বসতেন, অনেক কিছু চাইতেন খোদার কাছে কিন্তু এক সময় তাঁর মনে হল "সে কি লজ্জার কথা, নিজের জন্যে চাইতে হবে কেনো! বরং অন্যদের জন্যে চাওয়া যেতে পারে,” উনি তাই করলেন। সেই থেকে অন্যের মঙ্গল কামনায় নিজেকে তৈরি করলেন! জীবনের শেষ দিনেও নিজেকে দান করে গেলেন মানব কল্যাণে।এ এমন এক সমাপন যেন কোথাও কোনো মহা সমারোহ শেষ হলো নিঃশব্দ শিশিরের বুকে।

*কৃতজ্ঞতা সায়ান্ত্বনী। অনলাইন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ