বিরহিলিও পিনিয়েরার গল্প : কয়েকটা বিয়ার



অনুবাদ: মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ


দুই দশক আগে ঘটনাগুলো ঘটেছিলো। একটা রৌদ্রদগ্ধ অপরাহ্নে, দেখতে অন্যরকম একজন পঞ্চাশোর্ধ মানুষ ফারদের বাসায় এসেছিল – সুন্দর চুল, পরিপাটি পোশাক, হাতে সিগারেট, নৈমিত্তিক সাজ, হাত ও নখগুলো প্রসাধন করা। উনি যদি গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভদ্রলোক নাও হতেন, অবশ্যই তাকে নিদেনপক্ষে আভিজাত্যপূর্ণ একজন মানুষ হিসেবে গণ্য করা যেত।

সহাস্য অভিবাদনের পর তিনি তার ওভারকোট ও দস্তানাগুলো টেবিলের ওপরে রেখেছিলেন। কয়েক পা এগিয়ে গিয়েছিলেন ফারের পোষা বিড়ালের দিকে। তারপর হালকাভাবে কেশে তিনি ফারের দিকে এমন জিগ্যাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন যে মনে হচ্ছিল তিনি বসতে চাচ্ছিলেন। বসার পর, নির্বিকারভাবে নিজের প্যান্টের এক পায়ের ভাঁজকে ঠিক করে দ্রুততার সাথে কাজের প্রসঙ্গে এসেছিলেনঃ

"আমি একটা পুরো পরিবারকে হত্যা করতে চাই," তিনি বলেছিলেন, বাক্যটিকে জোর দিয়ে উচ্চারণ করে। কৌশলীভাবে ও কন্ঠস্বরকে এমন পর্যায়ে রেখে যাতে তা কোনো ভীতির সঞ্চার না করে। একটু থেমে বলেছিলেন, "আমি একটা পুরো পরিবারকে হত্যা করতে চাই।"

ফারের কাছে তার প্রকাশভঙ্গী যথেষ্টই পরিচিত মনে হয়েছিল। সাধারণভাবে চিন্তা করতে করতেই, সে বলে বসেছিলঃ
"... পুরো একটা পরিবারকে হত্যা।"

তারপর বিরতি দিয়ে বলেছিলঃ
"কেন?"
"প্রতিশোধ," ভদ্রলোক উত্তর করেছিলেন। ক্যাসিনোতে শেষ নাচের সময়ে, আমার মেয়েকে আযুট ভাটিখানা'র (Azut brewery) মালিক ও তার পরিবারের সদস্যরা নাচতে বলেছিল। তারা মোট দশজন ছিল, বাবা-মা সহ। সবাই প্রাণবন্ত, বিভ্রান্ত ও মাতাল। অপরদিকে আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল এগারো। আমরাও ছিলাম প্রাণবন্ত, বিভ্রান্ত ও মাতাল। সুতরাং, আমি আজুত পরিবারের সবাইকে হত্যা করতে চাই। তবে নিজহাতে আমি এই দুষ্কর্ম করতে চাই না।"

তিনি তার একহাত এমনভাবে উত্তোলন করেছিলেন যাতে মনে হয়েছিল কেউ যেন তাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তারপর উত্তেজিতভাবে বলেছিলেনঃ
"আমি শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যাকারী হতে চাই!"

এসময়ে একটা নারীর কন্ঠস্বর শোনা গিয়েছিল।

"ওখানে কে?" ভদ্রলোক জিগ্যেস করেছিলেন।

"আমার স্ত্রী," ফার উত্তর করেছিল। "তুমি ভেতরে এসো।আমাদের একজন অতিথি এসেছেন।"

একজন সুন্দরী নারী কক্ষে প্রবেশ করছিল। ফার তাকে প্রচলিত নিয়মে ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলঃ
"মাড,এই ভদ্রলোক একটা পুরো পরিবারকে হত্যা করতে চান।"

মাড তার কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেছিল, "আমি পর্দার আড়াল থেকে শুনেছি।“

"আমি তাদেরকে গ্যাস দিয়ে বিষপ্রয়োগ করার চিন্তা করেছিলাম," ভদ্রলোক বলেছিলেন। "টাকার বিনিময়ে কাউকে দিয়ে রাতের বেলায় গ্যাসের লাইন খুলে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এটা তাদের জন্যে সহজ মৃত্যু হতো। কিন্তু আমি চাই তাদের মৃত্যু আরও কঠিন হোক। বন্ধুরা, তোমরা কী মনে করো?"


ফার বলেছিল যে কুড়াল দিয়ে ১০০টা কোপ দিতে পারলে মোটেই খারাপ হবে না। মাড পছন্দ করেছিল উন্মুক্ত মাঠে সবার গণ-ফাঁসি, উলঙ্গ করে নারীদেরকে ধর্ষণ ও পুরুষদের লিঙ্গ কর্তন। কফি সার্ভ করা হলে সবাই উজ্জীবিতভাবে আলাপচারিতা চালিয়ে গিয়েছিল। দুষ্কর্ম্মের পরিকল্পনা চলেছিল একটার পর একটা। হতবুদ্ধিকর গতিতে। সম্মানী নিয়েও তারা কথা বলেছিল। কারণ, ভদ্রলোক হত্যাকারীকে অনেক বড় পুরষ্কার দিতে চেয়েছিলেন। এমনকি তাদেরকে দায়মুক্তিও দিতে চেয়েছিলেন।

"দায়মুক্তি?" ফার ও মাড একসাথে বলেছিল। "সেটা কেমন করে সম্ভব?"

"তুমি কাজটা করবে, আর আমি নিজে কাজটা করতে নির্দেশ দিয়েছি বলে ঘোষণা দেবো," ভদ্রলোক উত্তর দিয়েছিলেন।

পরিশেষে পারস্পরিক সুস্বাস্থ্য কামনার পর তিনি তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করেছিলেন। ভদ্রলোক যখন সড়কের ওপরে, মাড জানালা দিয়ে চিৎকার করে বলেছিলঃ
"স্যার, স্যার, আপনি আপনার দস্তানা নিতে ভুলে গেছেন!"

অপকর্ম: ভয়ানক একটা অপকর্মের জন্যে ফার একটা বিশাল আকারের কাচের বোতল তৈরির অর্ডার দিয়েছিল। সাদা রঙের। ছয় ফুট লম্বা। দশ ডায়ামিটার। বুলেটপ্রুফ। ধ্বংসযোগ্য নয়। সমতলের ওপরে পেছনের পর্দার সাথে গিঁট দিয়ে বেধে রাখা হবে। পটভূমির মিউজিক হবে অনবদ্য। বিকেল পাঁচটা সময়ের চায়ের স্বাদও হবে খুবই পরিমার্জিত। বামপাশে, ভিডিও করার যন্ত্রপাতি থাকবে আজুত পরিবারকে অমর করার জন্যে।

সেদিন বিকেলে মৃদুমন্দ বাতাস বইছিল। বোতলের সামনে একটা ক্যানভাসের চেয়ারে মুভির পরিচালকেরা বসেছিলেন। চেয়ারের একটাতে সেই ভদ্রলোকও বসেছিলেন।

ফার ও মাডের প্রবেশ করে আজুত পরিবারের সবাইকে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছিল। একটা সংকেতে বোতলটা দুই ভাগ হয়ে গিয়েছিল। আজুত পরিবারকে এই বোতলের মধ্যে ঢুকতে হবে। তারা হাত-পা ছুড়াছুড়ি শুরু করলে ফারের চাপ তাদেরকে নিবৃত্ত করেছিল। ভদ্রস্থ অবস্থাতেই তাদেরকে বোতলের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছিল। এরপর মাড, একটা ছোট টাওয়ারের মধ্যে বসে একটা ভালভ চেপে ধরেছিল এবং বোতলটা বিয়ার দিয়ে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।

"বিয়ার দিয়ে," ভদ্রলোক পাঠককে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তারপর অসাধারণ সুন্দর একটা কেক মুখে দিয়ে মুখভর্তি অবস্থাতেই বলেছিলেন, "ক্যামেরা!" ফার ক্যামেরাটি চালাতে শুরু করেছিল। বোতলের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছিল। যেমনটা আশা করা হয়েছিলো, আজুত পরিবার মৃত্যুর অনিবার্যতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। মৃত্যু বেদনা হয়ে ঝরেছিল। কিন্তু মা তার স্বামীর কাঁধে চড়তে অস্বীকার করেছিল। অন্যদিকে, মেয়েরা, অধিকতর আধুনিক হবার কারণে তাদের ভাইদের ওপরে আরোহন করেছিল এবং ভাইয়েরা আরও বেশি আধুনিক হবার কারণে, তাদের বোনদের ওপরে উঠেছিল।

দুই ঘন্টার মধ্যে বিয়ার সেটার কাজ সম্পন্ন করেছিল। শুরুতে যেভাবে বলা হয়েছে, আমরা দেখতে পাই যে বিয়ার হত্যাকাণ্ডের দুই দশক পর ফার খুবই ধনী মানুষে পরিণত হয়েছিল এবং অপরাধের দৃশ্যপট থেকে অনেক দূরের একটা শহরে সম্মানিত জীবন যাপন করছিল।


আজ রাতে ফার ও মাড মিলে একটা রাজকীয় ভোজের আয়োজন করেছে। অতিথিদের মধ্যে আছে সুশীল আচরণের এক সুদর্শন যুবক। তার সঙ্গী হিসেবে আছেন একজন পূজনীয় বর্ষীয়ান মানুষ, যিনি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও প্রবল আত্মসম্মান ধরে রেখেছেন। কেউই অট্টহাস্য করছে না, তবে মৃদুভাবে হাসছে। অনেক সুন্দরী নারীরা অসাধারণ পোশাক পরে সেখানে আছে। পাতলা জালি কাপড় পড়ে উলঙ্গ নৃত্যশিল্পীরা ময়ূর ও টার্কি পাখির সাজে আসা-যাওয়া করছে। জীবন অদ্ভুত রকমের পরিপূর্ণ এই পরিবারগুলোতে! তীব্র স্রোতের মতো আসা-যাওয়া, শ্যাম্পেন বা সায়ানাইডের বোতলের ছিপি খোলা, মন্দতালের অসাধারণ নৃত্য, হলভর্তি কনিয়াক দিয়ে মদ্যপ হওয়া নারীদের পদচারণা……

এখন যথেষ্টই রাত। সম্মানের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সবাই, অসাধারণ সব গাড়িতে চড়ে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এখানে সারারাত থাকা যায় না। বাতাস এখানে পবিত্র। হাসি তাদেরকে মৃত্যুভাবনা থেকে বিরত রাখার জন্যে যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত সম্মানের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। খানসামা বাতিগুলোকে নিভিয়ে দিলো। শুধুমাত্র চলাচলের জন্যে নেভিগেশন লাইটগুলো জ্বালানো অবস্থায় রয়ে গেল।

ফার ও মাড দুজনেই খুব সুখী। তারা হলঘর ত্যাগ করার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বিছানায় গমনের উদ্দেশ্যে। এই সময়ে সাদা প্লাস্টার করা দেয়ালে প্রজেকশন স্ক্রীন দেখা গেল। কক্ষের কেন্দ্রে বুড়ো লোকটা ও সেই যুবক বসে আছে, মুভি দেখতে গিয়ে যেমন করে বসে থাকে। তারা ফার ও মাডকে তাদের পাশে বসার জন্যে ইশারা করল। ফার ও মাড সম্মতি জানাল ( সম্মতি জানাল কারণ বড় প্রভুরা সম্মতিই জ্ঞাপন করে থাকেন, তারা কাউকেই মান্য করেন না)।

“চমৎকার!” মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে থাকা বৃদ্ধলোকটি চিৎকার করে বললঃ
“ওটা ঘুরাও!”

অদ্ভুত একটা শব্দ। যথেষ্টই মার্জিত, কালো কিছু শব্দ দেখা গেল পর্দায়ঃ “আজুত পরিবারের মৃত্যু।“

বিশ বছর আগে অপরাধ উপস্থাপিত হলো পর্দার ওপরে। যুবকটা জোরে জোরে হাসতে লাগল। বুড়ো লোকটা ফার ও মাডের নিকট ব্যাখ্যা করলেন যে যুবকটা হলো আজুত পরিবারের একমাত্র বেঁচে থাকা সদস্য। সে সময়ে তার বয়স ছিল ৩ মাস, তাকে তিনি লোকটা লালন-পালন করে বড় বড় করেছেন। ছেলেটাই তার ছোট সুন্দর মস্তিষ্ক দিয়ে পিতা-মাতা ও ভাইবোনদের ডুবে যাওয়ার মারাত্মক, কিন্তু বিনোদনমূলক মুভি তৈরি করেছে। প্রবল রসিকতাবোধের যুবকটা বোতলের তলায় তার মা ও বাবাকে অপমানিত হতে দেখল, ছোট ছোট, কিন্তু খুবই আধুনিক ভাই-বোনদের দেখল… দেখল তার পিতামাতা কীভাবে সবকিছুই হারাল শুধু সম্মান ছাড়া এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

বুড়ো লোকটা বলল, “আমিই এই হত্যাকান্ডের বুদ্ধিবৃত্তিক রচয়িতা, আর এরা,” তিনি ফার ও মাডের দিকে নির্দেশ করে বললেন, “এরা দুজন হলো সত্যিকারের হত্যাকারী।“ ফার ও মাড তার কথায় খুবই অবাক ও বিরক্ত হলো। কারণ ঘটনাটা ঘটেছিল বিশ বছর আগে, যেটার সাথে তাদের বর্তমানের জীবনযাপনের কিছুই করণীয় নেই। তারা বুড়ো লোকটাকে ঘটনাটা ভুলে যেতে বলল। তবে তারা এটাও স্বীকার করল যে মুভিটা খুবই সুস্বাদু ও আনন্দদায়ক হয়েছে। তারা চায় মুভিটা নকল করে আরেকটা মুভি তৈরি করতে। কারণ, মুভি আমাদের জীবনে বিস্ময় বয়ে আনে।

সারাদিনের শেষে সন্ধ্যা আসে… রাত আরও বেশি ক্লান্তিকর হয়, হাঁই তোলা, তন্দ্রালু ভাব, আরও বেশি তন্দ্রালু ভাব, সতেজকারক ঘুম ও গভীর ঘুমের মধ্যে যুবক হাই তোলে, সবসময় হাসে নিজের পিতামাতা ও ভাইবোনদের বিয়ারের বোতলের মধ্যে দেখে।

ঘরে বিছানায় তন্দ্রা অপেক্ষা করে দর্শকদের জন্যে। বামে সর্পিল সিঁড়ি। সেখানে খানসামা অপেক্ষা করে, তন্দ্রালু ভাব নিয়ে হাঁই তোলে। তারা ওপরে উঠতে গিয়ে হোঁচট খায়। আগামীকাল আরেকটা দিনের শুরু।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ