১
“সেখানে পাখিরা সকলে বোবা” এটুকু বলে চুপ হয়ে যেত কুমু দি। রূপা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকত তার দিকে বাকিটা শোনার আগ্রহে। “ডানা ঝাপটানো বাদে আর কোনো সাড় তাদের নেই”।
“তবে সকালে ঘুম ভাঙে কীভাবে?”
“ভাঙে না। মানুষ সেখানে নিশাচর। সন্ধ্যার শৃগালের ডাক শুনে তারা একে একে জেগে ওঠে,” রূপার গায়ে নাইটি গলিয়ে দিতে দিতে কুমু দি বলতো, “হয়তো এই কারণেই সেখানে পাখিরা কথা কইতে জানেনা। অথবা পাখিরা মূক তাই মানুষ নিশাচর। কে যে কখন কীসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কে-ই বা বলতে পারে”
কুমু দি উঠে বাথরুমে চলে যেত। লেডিস হোস্টেলের ঘরে শুয়ে রূপা বাথরুম থেকে আগত আলোয় দেখত কুমু দির ডানার ছায়া মেঝেতে হামা দিচ্ছে। কুমু দি ডানা ধুয়ে ফেলছে ধীরে ধীরে। মুছে ফেলছে রূপার লালা নিজের শরীর থেকে ঘষে ঘষে।
রূপা ফ্যানের হাওয়ায় কল্পনা করার চেষ্টা করতো দত্ত পাড়া। কুমুদির কথায় কথায় দত্ত পাড়ার গন্ধে ভরে আছে ঘর। শেয়ালদা দক্ষিণ হতে দিনে তিনটি ট্রেনের একটিতে চেপে সে একদিন সেখানে গিয়ে পড়বে, কে যেন কবে একথা রূপাকে জানিয়েছিল। যেখানে সে যায়নি এতদবধি, রূপা সেই দত্ত পাড়ার গন্ধ বুক ভরে টেনে নিত লেডিস হোস্টেলের ঘরের বাতাস হতে। এ গন্ধ কুমু দিরও। বালিশে মুখ চেপে প্রাণপন শ্বাস নিত রূপা। অস্থির লাগত, মনে হত দুহাতে চেপে ধরে বালিশটাই ছিঁড়ে ফেলে। রূপা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে থাকলে, বিছানায় ফিরে এসে কুমু দি বুকে টেনে নিত রূপাকে। কুমু দির চুল একটানে খুলে দিলে ভিতরে লুকিয়ে থাকা গোলাপি চুলগুলি উঁকি দিত। দত্ত পাড়ার মানুষদের বয়স বাড়লে চুল গোলাপি হয়ে যায়। রূপা একটা একটা করে গোলাপি চুল বেছে দিতে দিতে বলতো, “দত্ত পাড়ার গল্প বলো!”
“গল্প তো নয়, সব সত্যি” কুমু দি দাঁত বের করে হাসে।
সুপুরির ছোপ ফেলা সেই দাঁতের ফাঁক দিয়ে রূপা নিজের চারটে আঙুল তার মুখে ঢুকিয়ে দেয়।
২
ছাদের রোদে রূপার নাইটি শুকোচ্ছে। আচার শুকোতে দিয়ে গেছে লেডিস হোস্টেলের কে যেন। এরাই বোধহয় অন্য ঋতুতে বড়ি শুকোতেও দেয়। রূপা আর কুমু দি সেই আচারের বয়াম থেকে চুপচাপ খান কতক কুল বের করে মুখে পোড়ে। আশ্লেষে চোখ বুজে আসে তাদের।
“রাতে মানুষের ভয় করে না?”
“ধুর, ভয় করবে কী, ভয়গুলো সব পেট থেকে বেরিয়ে গেছে কবে!”
“মানে?”
“তোর সবথেকে ভয় কীসে?”
“হারিয়ে যাওয়ার ভয়, চারপাশ অচেনা ঠেকার ভয়…”
“দত্তপাড়ার লোকজন একবারই ভয় পায়। তুই দত্তপাড়ার মানুষ হলে যেদিন তুই হারিয়ে যাবি, সেদিন প্রচণ্ড ভয়ে তোর তলপেট থেকে একটা ডিম বেরিয়ে আসবে। আর ডিমটা বেরিয়ে গেলেই দেখবি কোথাও কোনো ভয় নেই। তুই স্বেচ্ছায় হারিয়ে যাবি তারপর। হারাবিই হারাবি।”
“ভয়ের ডিম?”
“হ্যাঁ”
“একাধিক ভয় হলে?”
“একাধিক ডিম।”
“সেই ডিম ফোটে?”
“কেন ফুটবে না?”
“ডিম ফুটলে ভয় বেরিয়ে আসে?”
“ভয় নয়, দুর্গা টুনটুনি। কুচকুচে কালো, আলো পড়লেই ময়ূরকণ্ঠী।”
“সেও বোবা?”
“সেও বোবা।”
অবাক হয়ে যায় রূপা। একটু পরে বলে, “তুমি তোমার সমস্ত ডিম পেড়ে ফেলেছ?”
কুমু দি চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“কুমু দি?”
“জানিনা”, একটা দীর্ঘশ্বাসের ডিম বেরিয়ে আসে কুমু দির পেট থেকে। দুর্গা টুনটুনিদের মা কুমু দি উড়াল দেয়। দুপুরের ছাদে বসে লেডিস হোস্টেলের আকাশে কুমু দির পাখসাট দেখতে থাকে রূপা।
৩
কুমু দি আসার আগে রূপার ঘরে থাকতো খালেকা। তার কোনো গল্প নেই। রূপা রাতে একা একা খালেকার বুকে পেটে হাত বুলিয়ে গল্প খুঁজত। খাঁ খাঁ স্তন তার, ঊষর তলপেট, শুষ্ক যোনি। একরোখা, নাস্তিক খালেকা। কুমু দি আসার সাত দিন আগে সে রহিম শেখকে নিকা করে লেডিস হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে জামালদহ। বছরে তিনটে চিঠি সে রূপাকে লেখে,- শরতে, বসন্তে ও বরষায়। প্রতি পত্রে খালেকা বিশদে লেখে রহিম ও তার বিচিত্রধর্মী রতিক্রীড়ার ঘটনা। রহিমের শিশ্নের বর্ণনা লিখতে সে প্রতি চিঠিতে পাঁচশো শব্দ ব্যয় করে। রূপা খালেকার চিঠি বিছানার নিচে সবুজ ট্রাঙ্কে ভরে রাখে। বছরে তিনবার রূপাও খালেকাকে উত্তরচিঠি পাঠায়। সেখানে সে কুমু দির কথা লেখে, দত্ত পাড়ার কথা বলে। কল্পনা করে, দত্ত পাড়ায় জন্মালে খালেকার সমস্ত হোমোফোবিয়া ডিম ফুটে দুর্গা টুনটুনি হয়ে উড়ে চলে যেত। খালেকা কুমু দিকে দুচক্ষে দেখতে পায় না। “ওই শাউয়ার মাগীর কথা লিখবি না আমায়।”- লিখে পাঠায় সে তার তিন চিঠিতেই।
কুমু শাউয়ার মাগী দির হাত ধরে রবীন্দ্র সরোবরে হাঁটতে যায় রূপা। কুমু দিকে সে চ্যুইংগাম সাধে। কুমু দি চ্যুইং গাম খায় না কোনোদিন।
সেই রাতে কুমু দির বুক টিপলে অসংখ্য বুদবুদ বেরিয়ে আসে, ঘর ভরে যায়। নীল দেওয়ালে বুদবুদের ছায়া পড়ে। রূপা হাঁ করে খেতে যায় বুদবুদ।
“খাসনে! খাসনে!” কুমু দি খপ করে রূপার হাত চেপে ধরে। রূপা ততক্ষণে গোটাকতক বুদবুদ গিলে ফেলেছে।
“তোর নেশা হয়ে যাবে!”
“বুদবুদ কেন?”
“আমাদের বুকে দুধ হয় না, বুদবুদ হয়।”
বুদবুদের কথা শুনে রূপা চমকে ওঠে। ঘুম পায় তার, বোঝে নেশা হচ্ছে।
কুমু দি বলে, “বাচ্চারা মানুষের বুকের বুদবুদ খেয়ে বড় হয় দত্ত পাড়ায়।”
“বুদবুদ কখনো ফোরায় না?”
“কখনো না।”
“মরে গেলেও না?”
“মরে গেলেও না। তবে মৃত মানুষের বুকের বুদবুদে নেশা নেই।”
“দত্ত পাড়া এমন কেন?”
“দত্ত পাড়া এমনই।”
জানালা দিয়ে দত্ত পাড়ার আলো এসে পড়ে লেডিস হোস্টেলের বিছানায়। কুমু দি রূপার হাত ধরে ছাদে চলে আসে। রাতের বাতাসে শীত করে রূপার। দূরের আকাশে গোল সাদাটে দত্ত পাড়া জ্বলে আছে। কুমু দি মায়াময় চোখে দত্ত পাড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। শেয়ালদা দক্ষিণ হতে দিনে তিনটি ট্রেনের একটিতে চেপে সে একদিন সেখানে গিয়ে পড়বে, কে যেন একথা রূপাকে ফিসফিস করে বলে দেয়। রূপা কুমু দির মাথা থেকে গোলাপি চুলগুলো বেছে দিতে থাকে।
৪
“আমাদের এখানে বৃষ্টি হলে আকাশ থেকে হেলে সাপ ঝরে পড়ে”, খালেকা লিখেছে তার শ্রাবণী চিঠিতে। রূপা চুপ করে বসে থাকে চিঠি হাতে। পরশু সকালে কুমু দি ছাদ থেকে উড়াল দিয়ে কোথায় চলে গেছে কাউকে না জানিয়ে। লেডিস হোস্টেলের সুপার তিনদিনে চারবার এসে কুমু দির খোঁজ নিয়ে গেল।
ছাদে বসে রূপা টের পায় খালেকা মিছা কথা লিখেছে তার চিঠিতে। রূপা এও টের পায় যে খালেকার সমস্ত চিঠিই মিথ্যে, কল্পনা। রহিম শেখ বলে কেউ নেই। এমনকি হয়তো খালেকা বলেও কেউ হয়না। কেবল খালেকার চিঠি আছে। চিঠি ব্যতীত খালেকা, খালেকার রূপার কোনো অস্তিত্ব নেই।
খালেকা লিখেছে,
“আমাদের এখানে বৃষ্টি হলে আকাশ থেকে হেলে সাপ ঝরে পড়ে। একদিন সন্ধ্যেবেলা বাসন মেজে ফেরার পথে দেখি কী মেঘটাই না করেছে আকাশে। এক ফোঁটা বৃষ্টি আর সঙ্গে সঙ্গে আমার কাঁধে একটা হেলে সাপ পড়ল আকাশ থেকে। ডরে আমি রহিম রহিম বলে চিক্কুর দিয়েছি আর দেখি সাপটা মাটিতে পড়ে নড়তে নড়তে চলে গেল কলতলার দিকে।”
খালেকার গল্প পড়তে পড়তে রূপা ভাবে কুমু দি একথা শুনলে কী বলতো… দত্ত পাড়ার হেলে সাপও কি মেঘের ভেতর থাকে? মুখ তুলে আকাশ দেখে রূপা। কুমু দি উড়ে গেছে তিন মাস হল। রূপার ঘরে এখন অঘোরে ঘুমোয় অজন্তা। অজন্তার সামনের একটা দাঁত কালো রঙের। অজন্তা কথা বললে রূপা হাঁ করে ওই দাঁতটার দিকে চেয়ে থাকে।
৫
সন্ধ্যেবেলা পাখির ডাকে ঘুম ভাঙল রূপার। লেডিস হোস্টেলের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অন্ধকারের মধ্যেও সে কুচকুচে কালো পাখিটাকে দেখতে পেল। সন্ধ্যার আঁধারে ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সে আলো ফেলল পাখিটার গায়ে। ময়ূরকণ্ঠী- দুর্গা টুনটুনি। আলোয় পাখি চমকে গেল না। স্থির হয়ে বসে একইভাবে ডাকতে থাকলো। যেন সে রূপাকে জানাতে এসেছে শেয়ালদা দক্ষিণ হতে দিনে তিনটি ট্রেনের একটিতে চেপে রূপা একদিন দত্ত পাড়ায় গিয়ে পড়বে। রূপা ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদে চলে আসে। আকাশে ফুটফুটে একটা দত্ত পাড়া ফুটেছে। ছাদ ভিজে গেছে দত্ত পাড়া লেগে। ছাদ পিচ্ছিল। পা হড়কাতে হড়কাতে রূপা ছাদের রেলিং এর ধারে এসে দাঁড়ায়। এইখান থেকে কুমু দি উড়ে গেছে দেড় বছর আগে। কাউকে কিছু না বলে কুমু দি ফিরে গেছে দত্ত পাড়ায়।
রূপা চুপ করে দত্ত পাড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। আড়াল আবডাল থেকে দুর্গা টুনটুনির গলা তখনো শোনা যায়।
“আজ আকাশে কী সুন্দর গোটা দত্ত পাড়া উঠেছে!”, রূপার পিঠে হাত রেখে বলে অজন্তা। কখন সে ছাদে উঠে এসেছে রূপা টের পায়নি। সেও রূপার মতো দত্ত পাড়ার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর কী কারণে যেন হতাশ স্বরে বলে, “চল, নিচে মুড়ি মাখা হচ্ছে, তোর জন্যও মাখতে বলেছি। আয়।”
৬
আট বছর পর রূপা একদিন লেডিস হোস্টেল ছেড়ে দিল। অজন্তা চলে গেছে আগেই। খালেকাও চিঠি দেয় না অনেক দিন। রূপা বিউটি পার্লার খুলেছে বাজারের মধ্যে, তারই দোতলায় সে ঘর ভাড়া নিয়েছে এখন। ছেলে মেয়েরা চুল, দাড়ি, চোখ, মুখ, নাক, কান, গলা, বুক, পিঠ, ডানা, পেট, যৌনাঙ্গ, পাছা, ঊরু, হাঁটু, জঙ্ঘা, পায়ের পাতা সব শোধরাতে আসে রূপার পার্লারে।
ইদ, পুজো, বড়দিনের আগে ভিড় হয় বেশি। সামলাতে নাজেহাল হয় রূপা। আজকেও জনা কুড়ি এসেছে, তাদের মধ্যে দুয়েকজন ডানাও ছাঁটাতে চায়। এই কাজটা সবচেয়ে সময় সাপেক্ষ, ছ ফুটের একেকটা ডানা, প্রতিটা পালক অনুযায়ী সমানভাবে ছাঁটা বেশ কঠিন। ছাঁটতে ছাঁটতে ছোট বাচ্চার কান্না শুনতে পায় রূপা। তাকিয়ে দেখে একজন বাচ্চাসমেত পার্লারে এসেছেন। বাচ্চাটা কাঁদছে। তার মা তাকে নানাভাবে ভোলাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন। “আহা, খিদে পেয়েছে বুঝি…” একজন পাশ থেকে বলে। বাচ্চার মা একটা দুধ বের করে অল্প চাপ দেন আর রূপা অবাক হয়ে দেখে বুদবুদ বেরিয়ে আসছে তার বুক হতে! সেই বুদবুদ খেতে খেতে বাচ্চাটা ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।
ডানা ছাঁটা হয়ে গেলে ভিড় পাতলা হয় অনেকটা। রূপার সামনে চেয়ারে একসময় এসে বসেন সেই বাচ্চাটার মা।
“কী করাতে চান,”
“চুলে রঙ করাতে চাই”
মহিলার চুলে হাত দিয়ে রূপা দেখে এদিক ওদিক থেকে অসংখ্য গোলাপি চুল গজিয়েছে, “কী রঙ?”
“কালো”
রঙ লাগাতে লাগাতে রূপা জিজ্ঞেস করেই ফেলে, “আপনি দত্ত পাড়া থেকে আসছেন, তাই না?”
“হ্যাঁ, আপনি বুঝলেন কীভাবে?”
“আমি দত্তপাড়ার একজনকে চিনতাম। আপনি চিনতেও পারেন, কুমুদকণা মজুমদার।”
মহিলার মুখে কোনো ঢেউ ওঠে না, “এই নামের কাউকে তো চিনি না…”
চুলে রঙ করানো হয়ে গেলে মহিলা সন্তানসমেত পার্লার থেকে বেরলেন। বাকিরা বিদায় নিতে নিতে রাত বারোটা বেজে গেল। একটা রুটি আর দুটো ঘোড়ার ডিম খাওয়া হলে রূপা একটা খাতা আর পেন নিয়ে বসল।
সে লিখলো,
“প্রিয় খালেকা,আমি দত্ত পাড়া যাচ্ছি। কাল।ইতি,রূপেশ্বরী”
৭
শেয়ালদার মতো বড় স্টেশন শহরে দুটো নেই। আগে হাওড়া ছিল, কিন্তু দত্ত পাড়া অবধি রেললাইন পাতার পর থেকে শেয়ালদাই সবচেয়ে বড় স্টেশন হয়ে উঠেছে দেশের পূর্বপ্রান্তে।
অসংখ্য মানুষের ভিড় কাটিয়ে দত্ত পাড়াগামী দিনের দ্বিতীয় ট্রেনে চেপে বসলো রূপা। স্টেশনে লোকমুখে সে জানতে পেরেছে যত মানুষ দত্ত পাড়া থেকে শেয়ালদায় আসে, তত মানুষ ফেরত যায় না। তাই ট্রেন একেবারেই ফাঁকা। সোনারপুর, ডায়মন্ডহারবার, ক্যানিং পার করে ট্রেন সমুদ্রের উপর দিয়ে ছুটে চলে দত্ত পাড়ার দিকে। রেলের কামরার ভেতরে অনাবিল হাওয়া খেলে আর রূপার ঘুম পায়।
ঘুম ভাঙার পর রূপা দেখে ট্রেন থেমেছে। বাইরে প্ল্যাটফর্মে দুয়েকটা দোকান। সন্ধ্যে নামবে এমন সময়। কোথাও জনমানব নেই। রূপা ট্রেন থেকে নামে।
দত্ত পাড়ার প্ল্যাটফর্ম জনবিরল। কাছে দূরে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। রূপা স্টেশন থেকে বেরিয়ে এলে একটা চায়ের দোকান দেখতে পায়। দোকানে কোনোক্রমে একটা উনুন জ্বলছে। তাতে দুধ চাপিয়ে গেছে কেউ। রূপা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে। একটু পরে একজন মানুষ এসে ফুটন্ত দুধে চায়ের পাতা ঢেলে দেন।
“বিকেলের ট্রেনে এলেন?”
“হ্যাঁ”
“চা খাবেন তো?”
“দিন এক কাপ।”
হাঁই তুলতে তুলতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে দোকানি বলেন, “কেউ তো ফেরে না এখানে, আপনি কী মনে করে?”
“আমি কলকাতার মানুষ, একজনের সন্ধানে এসেছি, তিনি থাকতেন এককালে আমার সঙ্গে, বহুবছর হল কোনো খবর নেই”
“কী নাম?”
“কুমুদকণা মজুমদার”
“ও বুঝেছি, এখান থেকে সোজা হেঁটে গেলে একটা মোড় পাবেন, শনি মন্দির পড়বে, সেখান থেকে বাঁ হাতে একটু এগোলেই একটা মাঠ, মাঠের পাশের একতলা বাড়িটা”
চায়ের দোকানদারকে ধন্যবাদ জানিয়ে রূপা হাঁটতে শুরু করে। সাইকেলে করে পেপার বিক্রেতা পেপার ছড়াতে ছড়াতে যায়। শনি মন্দিরের সামনে এসে রূপা বাঁ দিকে ফিরতেই দেখে একটা শেয়াল। রূপাকে দেখামাত্র শেয়ালটা একটা ডিম পেড়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
রূপা অবাক হয়ে পথে পড়ে থাকা ডিমটা দেখে। হাতে তুলে দেখবে কি না ভাবার আগেই ডিমটা ফাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে একটা দুর্গা টুনটুনি। নিশ্চুপে পাখিটা উড়ে চলে যায়।
৮
ঘরগুলো সবুজ রঙের, গোল গোল। আলমারিতে অনেক বই রাখা। দত্ত পাড়ার গন্ধ ভরে আছে সারা ঘরে। রাত বাড়তে বাইরে মানুষের, সাইকেলের, রিক্সার চলাচলের আওয়াজও বাড়তে থাকে। রূপা সবুজ ঘরে কুমু দির মায়ের সামনে বসা। কুমু দির বাবা গেছে রূপার জন্য খাবার আনতে। এখানে এসে রূপা জানতে পেরেছে আট বছর হল কুমু দি বাড়ি ফেরেনি।
“তোমার নিশ্চয়ই ঘুম পেয়েছে, তুমি খেয়ে দেয়ে ওঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমাদের তো রাতজাগা স্বভাব”
“হ্যাঁ, কুমু দি বলেছিল”
কুমু দির মা রূপার হাতে দুটো নারকেলের নাড়ু তুলে দিয়ে বলেন, “তুমি ওর কেমন বন্ধু? কীভাবে পরিচয়?”
“হোস্টেলে এক ঘরে থাকতাম”
“আর কিছু নয়?”
“আর কিছু না।”
কুমু দির বাবা খাবার নিয়ে ফিরে এলে রূপাকে ভাত বেড়ে দেওয়া হয়। এতটা পথ এসে কাহিল রূপার খেতে খেতেই প্রবল ঘুম পায়। কুমু দির মা রূপাকে কুমু দির ঘর খুলে দেয়।
ঘরের ভিতর অবিকল কুমু দির চুলের গন্ধ। এত বছর পরেও তা এমন জ্যান্ত যে রূপার সারা গা শিরশির করে। আলো জ্বালাতে সে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ট্রফিগুলো দেখতে পায়। একশো মিটার, পাঁচশো মিটার উড়াল রেসের ট্রফি।
“স্কুলে জিতেছিল” কুমু দির মা বলেন।
শো কেসে পারিবারিক ছবি, স্কুলবেলার কুমু দি, মা বাবার সঙ্গে।
“আপনারা সত্যিই জানেন না কুমু দি কোথায়…?”
কুমু দির মায়ের চোখ ছলছল করে উঠলে রূপা থেমে যায়। পারিবারিক ছবির পাশে কুমু দির ছোটবেলার খেলনা পুতুল, রান্নাবাটি রাখা।
“আমি ঘুমিয়ে পড়বো, আপনার চিন্তা নেই”
কুমু দির মা চলে যান।
ঘরের দরজা বন্ধ করে রূপা ঘুরে ঘুরে ঘরের আনাচ কানাচে কুমু দিকে খোঁজে। বইয়ের তাক থেকে কবিতার, গল্পের বইগুলো বার করে উলটে পালটে দেখে যেন পাতায় পাতায় কুমু দি লুকিয়ে আছে, যেখানে অক্ষরে অক্ষরে কুমু দির লুকিয়ে থাকার কথা। বইয়ের তাকে খোঁজার পর খাটের তলায় সে একটা সবুজ ট্রাঙ্ক আবিষ্কার করে। ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে খালেকাকে পাঠানো রূপার সব চিঠি।
কুমু দি এই চিঠি কীভাবে পেল? ভেবে পায় না রূপা। খালেকা সেজে কুমু দিই কি তাকে চিঠি পাঠাতো এতদিন? খালেকা কি তবে কখনো রূপাকে কোনো চিঠি লেখেনি?
রূপার চোখের জ্যোতি ম্রিয়মাণ হয়, সে কুমু দির ছোটবেলার বিছানায় শরীর মেলে দেয়।
৯
সকালে আলো ফুটতে ঘুম ভাঙে রূপার। সে দেখে তার দু পায়ের ফাঁকে একটা দুর্গা টুনটুনি বসে আছে। পাখিটা ঠোঁট দিয়ে রূপার যোনিতে থেকে থেকে আদর করছে আর নিজের কুচকুচে পালকে ঠোঁট ঘষে দিচ্ছে।
রূপা পাখিকে বাধা দেয় না।
পাখিটা একটু পরে উড়ে গেলে রূপা বাইরের ঘরে এসে বোঝে কুমু দির বাবা মা এখন ঘুমোচ্ছেন।
দত্ত পাড়ার সবাই এখন ঘুমে। বাইরের চড়া রোদে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রূপা। কুমু দির স্কুল, কুমু দির কলেজ, কুমু দির খেলার মাঠ, কুমু দির প্রিয় বোতল ব্রাশ গাছ, হলুদ ছাতা মাথায় একে একে সবাইকে দেখা দেয় রূপা। কুমু দি কোথাও নেই। অথচ কুমু দি দত্ত পাড়ার সবখানে। উন্মাদের মতো, মদ্যপের মতো টলতে টলতে রূপা দত্ত পাড়া চষে ফেলে। দত্ত পাড়ার নির্বাক পাখি, দত্ত পাড়ার ভীড়ু শেয়াল, দত্ত পাড়ার ঘুমন্ত জনমানব সবাইকে তার একান্ত আপন বলে মনে হতে থাকে। মনে হয় এখানকার হাওয়া বাতাসে কুমু দির নিঃশ্বাস খেলে বেড়াচ্ছে। মনে হয়, হাত বাড়ালে হাতে আলো নয়, কুমু দির নজর এসে পড়বে। নির্বিঘ্ন দত্ত পাড়া দিয়ে আচ্ছন্ন রূপা কুমু দির সমস্ত চিহ্ন ছুঁয়ে ছুঁয়ে স্টেশনে এসে পৌঁছোয়।
স্টেশন মাস্টার রূপাকে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। ভদ্রলোকের সমস্ত চুল গোলাপি।
“আপনি গতকাল বিকেলের ট্রেনে এলেন না?”
“হ্যাঁ”
“যে কাজে এসেছিলেন, সে কাজ হয়েছে?”
রূপা উত্তর না দিয়ে অল্প হাসে।
“আসলে কেউই প্রায় ফিরে আসে না, খালি চলে যায়, স্টেশন ফাঁকাই থাকে সবসময়”
রূপা মাথা নাড়ায় কেবল। ট্রেন ঢুকছে দত্ত পাড়া রেলওয়ে স্টেশনে।
“যে কারণে এসেছিলেন, তা মিটেছে তো? নাইলে আবার এতটা পথ আসতে হবে ফিরে”
“কে যে কখন কীসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় কে-ই বা বলতে পারে”, স্টেশন মাস্টারকে পিছনে ফেলে রেখে রূপা দত্ত পাড়া শেয়ালদা লোকালে উঠে পড়ে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা যায় স্টেশন মাস্টারের মুখ, “আপনি আবার আসবেন?”
রূপা অল্প হাসে। শেয়ালদা দক্ষিণ হতে দিনে তিনটি ট্রেনের একটিতে চেপে রূপা বার বার এখানে এসে পড়বে, একথা এখন সে জানে। ট্রেন ছেড়ে দেয়। হাত নেড়ে সে বিদায় জানায় স্টেশন মাস্টারকে। ট্রেন দত্ত পাড়া ছাড়িয়ে গেলে ধাবমান ট্রেনের জানালা দিয়ে আকাশে তাকায় রূপা। সেখানে নীল পৃথিবী জ্বলে আছে।
*****
লেখক পরিচিতি: অলোকপর্ণা। ঔপন্যাসিক, গল্পকার। তার প্রকাশিত গ্রন্থের ভেতর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, ঝিঁঝিরা, যাহা বলিব সত্য বলিব, দাস্তানগো, রণ বিশ্ববাস করো নাম নয়, সবুজ অন্ধ করেছে, হাওয়া শহরের উপকথা, ইত্যাদি। লেখক বর্তমানে বেঙ্গালুরুে থাকেন।


0 মন্তব্যসমূহ