স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীকে স্তব্ধ পুকুরে ঢিল পড়ল। একদল গবেষক কচুরিপানার মতো দিগি¦দিক ছড়িয়ে পড়লেন নারী-মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে। তারপর তাঁরা এমন একজন নারীযোদ্ধার সন্ধান পেলেন, যিনি গুঁড়ো মরিচের বহুমুখী ব্যবহার জানতেন। ১৯৭১ সালে লাল মরিচের গুঁড়ো নাকে-মুখে ছিটিয়ে তিনি অনেক পাকিস্তানি সৈন্য ঘায়েল করেছিলেন। সমস্যা হলো, মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় তাঁর নাম নেই। পরিচয়টাও গোলমেলে। স্বাধীনতার জন্মলগ্নে পাল্টাপাল্টি অ্যাকশনের দিনগুলোতে মহাখালী থানার মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার তাঁর নাম কোলাবোরেটরের লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করেন। অন্যদিকে নারী পুনর্বাসনকেন্দ্রের ফর্মে তাঁর পরিচয়ের ঘর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী পূরণ করেছেন বীরাঙ্গনা লিখে। কারণ ডাক্তারি পরীক্ষার সময় মহিলার প্রজনন অঙ্গে এমন সব ড্যামেজ ধরা পড়ে, যা একজন ধর্ষণের শিকার নারীরই শুধু থাকতে পারে। এ ছাড়া তাঁর একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বয়ান এবং এর সময়-বিপর্যয়Ñ একজন আইরিশ ডাক্তার ধর্ষণ-পরবর্তী মানসিক গোলযোগ বলে শনাক্ত করেন। এসব জরুরি তথ্য হাতের কাছে থাকা সত্তে¡ও তাঁর পরিচয় নিয়ে কেন্দ্রের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর যথেষ্ট সংশয় ছিল। তাই প্রতিবেদনের চূড়ায় ‘তিনি গুঁড়ো মরিচের ব্যবহার জানতেন’ এই বাক্যটি মোটা হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়। সেই সুবাদে কেন্দ্রের মশলা ভাঙার বিভাগে তখন তাঁর একটি চাকরিও জোটে। এর কিছুদিন পর এক গভীর রাতে উর্দিপরা দারোয়ানের চোখে মরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে তিনি নারী পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে পালিয়ে যান। কেন্দ্রের প্রাক্তন পরিচালকের কাছে গবেষক দল জানতে পারে যে তাঁর হাতের টিপ ছিল দক্ষ তীরন্দাজের মতোই নিশানাভেদী। যার ফলে দারোয়ান প্রাণে বেঁচে গেলেও চোখ দুটি চিরতরে হারায়। এমন বিপজ্জনক মহিলাকে খুঁজে বের করে পুনরায় পুনর্বাসিত করার চেষ্টা কর্তৃপক্ষ তাই আর করেনি। তারপর পুনর্বাসনকেন্দ্রটি উঠিয়ে দেয়ার সময় শুকনো চৌবাচ্চায় কেরোসিন ঢেলে হাজার হাজার ফর্মে যখন আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, তখন তাঁর বীরাঙ্গনা পরিচয়ও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তারও আগে কোলাবোরেটরের ফাইলটি গায়েব হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পর গবেষক দল পুনরায় তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। নারী পুনর্বাসনকেন্দ্রের প্রতিবেদনের নামে তাদের রিপোর্টেরও নামকরণ করা হয়, যদিও গুঁড়ো মরিচের কাহিনীটি শুরু থেকেই তাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তারপর তারা গভীরভাবে ভেবে দেখল যে, মরিচের আখ্যানভাগ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট যা থাকে, তা দিয়ে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা তো নয়ই এমনকি কোলাবোরেটরও বলা চলে না। আর তারা যদি তাঁকে বীরাঙ্গনা বলে, তবে সমগ্র বীরাঙ্গনা জাতিকেই অসম্মান করা হয়। তাহলে তিনি কে? স্বাধীনতার সিকি শতাব্দী পর এসব কিছু অবজেকটিভলি দেখতে গিয়ে তাঁর পরিচয় আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সাক্ষাৎকারটি ছাপানো গবেষকদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ ও অর্থহীন মনে হয়েছে। এই পরিত্যক্ত সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করেই আলোচ্য গল্পের অবতারণা। শিরোনামসহ সাক্ষাৎকারটি যেমন ছিল এখানে হুবহু সেইভাবেই আছে। তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো পরিচয়ে ভূষিত করার ইচ্ছা বা দায় কোনোটাই গল্পলেখকের ছিল না। তিনি এই গল্পটিতে মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার সীমা খানিকটা ভেঙে দিতে চেয়েছেন মাত্র।
এ স্বপ্নও হতে পারে
২৫ মার্চের দুই মাস পর হঠাৎ আমার স্বামী মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমি এত বোকা! ওর হাতে ধরছি, পায়ে পড়ছি, কান্নাকাটি করছি, ‘আমাকে নিয়ে চলো, আমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো।’ ‘আচ্ছা করছি’ বলে তিনি চলে গেলেন। উধাও হয়ে গেলেন। কার যেন একটা পোড়ো বাড়ি ছিল। দুদিন হয় ওখানে আছি। আমার স্বামী চলে যাওয়ার পর খাওয়ার সময় ওরা আর আমাকে ডাকছে না। কানাঘুষা করছে। ভেবেছে, আমি রাস্তার মেয়ে। কারো স্বামী কি কাউকে অচেনা বাড়িতে এভাবে ফেলে রেখে চলে যায়! হোক না তা যুদ্ধের সময়। বাড়ির পুরুষমানুষটি সকালবেলা আমাকে ঘুম থেকে তুলে জিগ্যেস করল, ‘আপনার স্বামী গেল কোথায়?’ আমি বলি, ‘কী জানি কোথায় গেল!’ ‘আপনার যাওয়ার কোনো জায়গা আছে?’ রাস্তার দিকের দরজাটা হাট করে খুলে সে আমাকে এই কথা বলে।
আমি রাস্তায় নেমে পড়ি। পায়ে সেন্ডেল নেই। পালাতে পালাতে গত দুই মাসে আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। পথে পথে এলোপাতাড়ি ঘুরতে লাগলাম। কোথায় যাব। কোথায় থাকব। রাতে খাওয়া হয়নি। খিধেয় পেট চিনচিন করছে। হঠাৎ একটা বিহারি ছেলে নাম চুল্লু, এসে বলল, ‘আরে...আপা, আপনি এখানে! চাকরি করবেন?’ যুদ্ধের সময় কেউ চাকরি করে কি না তাও আমি জানি না। আমি গত দুটি মাস এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কেবল স্বামীর সঙ্গে পালিয়ে বেড়িয়েছি। এখন উনি আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন। আমি বললাম, ‘চাকরি তো করব, চুল্লু ভাই। তা না হলে খাব কী, থাকব কই। কিন্তু চাকরি করব কীভাবে? ওদিকে তো যাওয়া যাচ্ছে না। মেরে ফেলছে।’ ওদিকে অর্থাৎ আমাদের ফেলে আসা শহর মহাখালীর দিকে। ওখানকার এক প্রাইভেট কোম্পানিতে ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত আমি চাকরি করেছি। ছেলেটি রোদ-ঝলসানো প্রায় জনশূন্য সেই শহরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার সাথে চলেন। কেউ কিচ্ছু বলবে না।’
আমি চুল্লুর সঙ্গে রিকশায় মহাখালী যাচ্ছি। হাতে একটি পয়সা নেই। মুখ ফুটে বলতে পারছি না, নতুন চাকরিতে জয়েন করার আগে চুল্লু ভাই আমাকে কিনে কিছু খাওয়ান। কেবল খালি পায়ের দিকে তাকিয়ে আহ্-উহ্ করছি দেখে চুল্লু বলল, ‘কই বাত নেহি, সব হোবে।’
একটা পরিত্যক্ত বাড়িতে আমাকে বসিয়ে রেখে চাকরির সন্ধানে চুল্লু বেরিয়ে গেল। বাড়ির সামনে-পিছে কয়েকজন পাহারাদার। আর কেউ কোথাও নেই। আমি খাবারঘরে ঢুকে ঘুরঘুর করছি। মার্মালেড, জেলি, আচারের খালি শিশি। কফির কৌটোয়, হরলিকসের বয়ামে তলানিটুকু জমে শক্ত পাথর হয়ে গেছে। ফ্রিজে কয়েকটা হুইস্কির বোতল ছাড়া কিছু নেই। পাশে মস্ত বড় পিয়ানো একটা। তার ওপর পারিবারিক গ্রæপ ছবি। পোশাকে-চেহারায় তাদের অবাঙালি মনে হলো। আমার কেমন গা ছমছম করছে। আমি বোতল খুলে আধাটাক হুইস্কি ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দিলাম। একদম র। তখন হঠাৎ চোখ পড়ল বাড়ির পাহারাদারদের ওপর। ওরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও দেখলাম আমাকে চক্রাকারে ঘিরে পাহারা দিচ্ছে। তখন প্রায় বিকেল। কী করব, আমাকে এখান থেকে পালাতে হবে এবং সন্ধ্যার আগে। একজন পাহারাদারকে একা পেয়ে ‘এ বাড়িতে কারা থাকে’ জিগ্যাস করলাম। সে না-শোনার ভান করে অন্যদিকে চলে গেল। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির সামনের লনে হাঁটছি। আমার গলা পুড়ছে, পেটের নাড়িভুঁড়ি জ্বলছে, এর মধ্যে পালানোর ফন্দি আঁটছি। লোহার খোলা গেটের ওপাশে কয়েকটা রিকশা, সওয়ারিও আছে তাতে। অথচ চেঁচিয়ে কোনো লাভ নেই। সশস্ত্র পাহারাদারদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস কারো হবে না। ওরা এখন আমাকে ঘিরে চক্রাকারে ঘুরছে। ধীরে ধীরে বৃত্তটা ছোট হচ্ছে। ‘দ্যাখেন আমার খুব খিধা পেয়েছে। সারা দিন কিছু খাইনি।’ যেন আমার কথাটা খুব মজার, ওরা মুখ টিপে হাসল। আমি নাছোড়, ‘কোথায় খাবার পাওয়া যায় বলেন তো?’ এবার একসঙ্গে সবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলাম। কথায় কথায় আমি আসলে চক্রব্যূহ ভেঙে তখন পালাতে চাইছি। একজন দারোয়ান ‘হবে হবে, সব হবে সন্ধ্যার পর’ বলে অন্যজনকে চা আনতে বলল। সে সরে যেতেই আমি রাস্তার দিকে ছুটলাম। হা-রে-রে-রে হুঙ্কারে পাঁচজন দস্যু আমার পেছন পেছন ছুটছে। আমিও ছুটছি। প্রাণটা হাতে নিয়ে দৌড়াতে থাকি আমি।
স্বপ্নে যেমন হয়, দৌড়াচ্ছি অথচ এগোতে পারছি নাÑ সেই রকম হচ্ছিল। একসময় ওরা আবার চক্রাকারে আমাকে ঘিরে ফেলল। আমি আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়ালাম। ওহ্, বলতে ভুলে গেছি, আমার কাছে লাল গুঁড়ো মরিচের প্যাকেট ছিল। একটা না, অনেক। আমি পটাপট প্যাকেটের মুখ খুলে ছুড়ে মারলাম। একবার, দুইবার, তিনবার...। মহাখালীর আকাশ সেদিন কারবালার ময়দানের মতো লালে লাল হয়ে উঠেছিল। আকাশ থেকে যেন রক্তবৃষ্টি ঝরছে। সেই সঙ্গে আসমানের ফেরেশতাদের ফটফট তোপধ্বনি। আমি একেকটা প্যাকেট ছুড়ে মারি, আর এক পা এক পা করে সরে যেতে থাকি। কোথায়? জানি না। এখন ভাবলে, স্বপ্ন মনে হয়।
আমি তখন মরতে অথবা বাঁচতে চাইছি
আমার স্বামী কুকুর পিংকিকে সঙ্গে নিচ্ছেন, আমাকে বাদ দিয়ে। দুঃখে অপমানে আমার মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, তিনি কুকুরের গলায় চেন পরাচ্ছেন, ঘরের এমাথা-ওমাথা পায়চারি করছেন। পিংকিকে অনেকদিন পর গরম পানিতে ডেটল মিশিয়ে গোসল দেয়া হয়েছিল। তিনি বারবার ঘড়ি দেখছেন, পিংকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। নিচে হর্ন বাজলে ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাবে। আমি আর না-পেরে আমার স্বামীর শার্টের কলার, টাই একসঙ্গে চেপে ধরে প্রাণপণে ঝাঁকাতে লাগলাম, আমার দাঁতে দাঁত। তা থেকে কিটকিট শব্দ বের হয়, ‘তুমি আমাকে বিয়ে করলা কেন, সঙ্গে যদি না-ই নিবা। পিংকি তোমার বউ, না প্রেমিকাÑ বলো, বলোÑ প্রেমিকা, না বউ?’ শার্টের কলার, টাই থেকে আমার আঙুলের সাঁড়াশি আলগা করে ‘আরে ভাই, তুমি আছ তোমাকে নিয়ে, এদিকে আমি...’ তিনি আবার পায়চারি করতে লাগলেন। আমি আবার ঝাঁকাব বলে তাঁর দিকে ছুটে গেলাম। এক ধাক্কায় আমাকে মেঝেতে ফেলে পিংকিকে নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। গাড়ির হর্ন কখন বেজে উঠেছিল, হট্টগোলে শুনতে পাইনি। স্টার্ট দিয়ে ধুলো উড়িয়ে সবুজ জিপটা বড় রাস্তায় পড়ার পর আমি পেছন থেকে দেখলাম, ওরা চলে যাচ্ছে। যাচ্ছ, যাও। কুকুর সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, গেরিলাযুদ্ধ হয় না। ওরা কি আর মুক্তিযুদ্ধে যাচ্ছে! আমি যেন জানি না। সব ভাঁওতাবাজি।
’৭১-এর মার্চ মাসেই তো লোকটা আমাকে বিয়ে করল ধোঁকা দিয়ে। বিশ্বাস করেন, আমি চাই নাই। বাড়ির লোকজন বললÑ কতদিন আর একা একা থাকবি। যা দিনকাল পড়ছে! কখন কী হয়! এত তাড়াতাড়ি পুরুষমানুষকে বিশ্বাস করা যায়Ñ বলেন? যার আবার পিংকি নামের কুকুরী আছে! বাড়ির লোকজনের কথায় আমি আসলে এই পাষÐকে বিয়ে করেছিলাম।
আমার স্বামী আমাকে ফেলে মুক্তিযুদ্ধে না জাহান্নামে চলে গেলেন পিংকিকে নিয়ে। রাতটা সেই পোড়ো বাড়িতে কাটিয়ে অন্ধকার থাকতে থাকতে রাস্তায় নেমে পড়লাম। আমি তখন মরতে অথবা বাঁচতে চাইছি। সকাল ১০টায় অফিসে গিয়ে হাজির হলাম। অবাঙালি বড় সাহেব আমাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, ‘আরে লারকি, তুম কাহাসে?’ অন্যেরা হইচই বাধিয়ে দিয়েছেÑ ফাঁদে শিকার ধরা পড়লে মানুষের যেমন আনন্দ হয়। ‘স্যার, আমার কিছু টাকা দরকার। মার্চ মাসের বেতনটা যদি দেন স্যার।’ বড় সাহেব পিয়ন ডেকে সঙ্গে সঙ্গে চেক লিখে দিলেন। আমি ছোঁ মেরে পিয়নের হাত থেকে চেকটা নিয়ে মুঠোয় ভরলাম। তারপর ছুট। অফিসের অবাঙালি-বাঙালি কর্মচারীরা আমার পেছনে পেছনে ছুটছে। আমি সিঁড়ি বেয়ে এঁকেবেঁকে সাপের মতো নামতে লাগলাম। সামনে মাত্র আর একটি ধাপ। আমি মরিচের প্যাকেট খুলতে যাব, কোত্থেকে চুল্লু এসে পথ রোধ করে দাঁড়াল। সেই বিহারি ছেলেটা। গতকাল যাকে ধোঁকা দিয়ে আমি সেই পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে পলিয়েছিলাম।
চেক হাতে পিয়ন ঘরে ঢুকতেই আমি চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ি। ও অবাঙালি যে, তাই এই সম্মান। তখন বড় সাহেব বললেন, ‘আজকে চাকরিতে জয়েন করো। এখন তুমি কোথাও যাবে না। দুপুরে আমার সঙ্গে লাঞ্চ খাবে। রাতে অন্য কোথাও নয়, আমার কোয়ার্টারে থাকতে হবে তোমাকে।’ আমি টলতে টলতে চেক হাতে চেয়ারে বসে পড়লাম। আমার মাথা ঘুরছে, দুদিন কিছু খাইনি। বড় সাহেব কানের কাছে মুখ এনে ফোঁসফোঁস করে, ‘জানো তো ইয়ে, আমি এখন একা, ব্যাচেলর জীবন যাপন করি। ও হববফ ুড়ঁ...।’
সহস্র এক আরব্য রজনী
অফিসে কোনো কাজ নেই। সারা দিন বোধশূন্য, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি। আর ভাবি, যুদ্ধ না থাকলে আমি এখন কী ভাবতাম, কী করতাম। ঘরের লোকজন কে কোন দিকে চলে গেল! কার ঘর কোথায়? আমি এখন বড় সাহেবের ঘর করি। হঠাৎ হঠাৎ অফিসেও বড় সাহেবের এসি রুমে টাইপরাইটারে কাগজ পরানোর ডাক পড়ে। আমি কার্বন কাগজ টাইপরাইটারে পরাই। বড় সাহেব বøাউজের বোতাম খুলে আমার বুকে মুখ ডুবিয়ে কুকুরছানার মতো কুঁইকুঁই করে। যেন তার পেট কামড়াচ্ছে। তারপর বুকের ভাঁজে যেদিন যা, পাঁচ-দশ টাকার নোট গুঁজে দেয়। রাতের পারিশ্রমিক থাকা-খাওয়া বাবদ পুরোটাই কেটে নেয়। নিজের চেয়ারে ফিরে এসে সামনের টেবিলে টাকা নয়, আমি দেখি লাল গুঁড়ো মরিচের পাহাড়।
একদিন অফিস ছুটির পর বড় সাহেব বললেন, ‘কমান্ডার সেলিম তোমার জন্য নিচে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। নেভাল কমান্ডার।’ নেভাল কমান্ডার সেলিম! যার কাছ থেকে কখনো কোনো মেয়ে ফিরে আসে না, সে যত বড় সুন্দরীই হোক, অসুন্দরীই হোক। রাত শেষে মেয়েটিকে মেরে রূপসা নদীতে ফেলে দেয় সে। এই আরব্য রজনীর বাদশাটার কাছে পাঠানো হচ্ছে আমাকে! আমি বললাম, ‘স্যার, আমি যাব না। আপনার কাছেই থাকব, আমি আপনার আর অবাধ্য হব না স্যার। আমাকে বাঁচান।’ বড় সাহেব রাজি হলো না। তার পরিবার আসবে পাকিস্তান থেকে। আমাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে ঘর-সংসার সে এবার পাক-পবিত্র করবে। এই পবিত্রতার বলি হতে যাচ্ছি আমি। মাঝবয়সী খুনি কমান্ডার ‘আইয়ে মেমসাব আইয়ে’ বলে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ায়।
গাড়ি শাঁই-শাঁই শব্দে নেভাল জেটির দিকে ছুটছে। এই আমার শেষ দিন। বাঁচা-মরা স্থির হবে আজ। লেভেল ক্রসিংয়ের সামনে আসতে সিগন্যাল পড়ল। কমান্ডার সেলিম স্টার্ট রেখে গাড়ি থামায়। সিগন্যালের বাতিটা জ্বলছে-নিবছে, নিবছে-জ্বলছে। অনন্তকাল ধরে একটা ট্রেন যাচ্ছে বুকে হামাগুড়ি দিয়ে। একসময় বাতিটা পুরোপুরি নিবে গেল। এবার ওপরে উঠছে ক্রসিংয়ের ব্যারিকেড। আমি গাড়ির দরজা খুলে লাফ দিলাম। নেভাল কমান্ডারের গাড়িটা লাল মরিচের গুঁড়োর নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। পালাতে পালাতে আমি পেছন ফিরে প্যাকেট ছুড়ছি, লাল মরিচের প্যাকেট। প্যাকেট ফুরোতেই আমি নির্ভার, রানওয়ে ছেড়ে প্লেনের মতো শূন্যে উড়তে লাগলামÑ ভয়হীন, স্বাধীন।
সেই রাতে বন্দরের জেটির ¯øটারিং হাউজে কাট কাট শব্দের আর বিরাম নেই। ভোরের দিকে দুচোখের পাতা একটুখানি বুজে এসেছে। আমার কোয়ার্টার ঘিরে অসংখ্য আর্মির গাড়ি। বাড়িটা ওরা মৌ-বেষ্টনীতে ঘিরে ফেলেছে। বাইরে তখনো অন্ধকার। সিঁড়িতে বাতি নেই। মুক্তিবাহিনী যদি ওখানে ওত পেতে থাকে, কেউ সাহস করে ওপরে উঠছে না। আমি তিনতলার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ওদের চ্যালেঞ্জ করলাম। অ্যামুনেশন পাউচ ভর্তি লাল মরিচের গুঁড়ো, আমি তাতে সুসজ্জিত। এই আমার অস্ত্র। যে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসবে, তার দিকেই ছুড়ে মারব। নিচে থেকে ডাক এল, ‘নেমে আয় কুত্তি। তুই কমান্ডার সেলিমকে খুন করেছিস। ক্যান্টনমেন্ট যেতে হবে তোকে।’ ‘তোরা আয়,’ আমি ওপরে দাঁড়িয়ে সাড়া দিই। একজন সাহসী জোয়ান দুহাত মাথার ওপর তুলে সিঁড়ি ভেঙে উঠছে। দোতলার ল্যান্ডিংয়ে এসে সে মুখ উঁচু করে নাক ফুলিয়ে কুকুরের মতো ঘ্রাণ শুকল। আমি ওর দিকে মরিচের প্যাকেট ছুড়ে মারলাম, যেমন করে ডিনামাইট, হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়Ñ তেমনি করে। সে ঢলে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে চলে গেল নিচের গ্যারেজে। তারপর উঠে আসে আরেকজন। আমি প্যাকেট ছুড়ছি। ওরা মরিচের জ্বালায় টিকতে না পেরে একে একে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ছিল, যেখানে রাতের অন্ধকারে ¯øটারিং হাউজের মড়া ফেলা হতো।
এ দুনিয়ায় কেউ তা বিশ্বাস করবে না
দেশ স্বাধীন হলো। প্রথম কদিন চলল জেরার পর জেরা। একদল বেরিয়ে যায়, আরেকদল আসে। প্রতিবার এক কথা, ‘তুমি কমান্ডার সেলিমের রক্ষিতা ছিলা। তুমি কোলাবোরেটর।’ আমারও একই জবাব, ‘গুঁড়ো মরিচের প্যাকেট কিনতে পয়সা লাগে। ওর সঙ্গে না থাকলে কে আমারে দিত?
‘কেন তোমার স্বামী দিত, সে তোমাকে টাকা দিতে পারত।’
‘ও তো মুক্তিবাহিনীতে ছিল।’
‘না, ছিল না। আমরা খবর নিয়ে দেখেছি।’
‘ও হয়তো যেতে পারেনি। যতবার বর্ডার পার হতে গেছে, পিংকি পাকিস্তানের সাপোর্টার তো, এমন জোরে চিৎকার দিয়েছে যে, ওর আর যাওয়া হয়নি।’
‘পিংকি? কোলাবোরেটরের লিস্টে তো ওর নাম নাই!’
‘নাই। কারণ পিংকি একটা মাদি কুকুর।’
ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। আমাকে পাগল ঠাওরায়। আমি তো আর পাগল না! বলতে শুরু করলাম, গুঁড়ো মরিচ ডিনামাইটের মতো ছুড়ে কীভাবে আমি পাকিস্তানিদের ঘায়েল করেছি। ওরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। আমাকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে কি নাÑ বুঝতে পারে না। এই ২৫ বছরে যতজন আমাকে জিগ্যাস করেছে, ঠিক ঠিক তার জবাব দিয়েছি। তবে মন খুলে কখনো কথা বলতে পারিনি। আমার বয়স এখন পঞ্চাশ। মুরুব্বিদের মুখে শুনেছি, ষাট বছর বয়সে বেশ্যারাও ধর্মের চোখে নিষ্পাপ হয়ে যায়। চাইলে সমাজে উঠতে পারে। আরও দশ বছর যদি বেঁচে থাকি, মন খুলে কথা বলব তখন।
যা হোক, আমি ছাড়া পেলাম। ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। তা ছাড়া আমাকে ছাড়বে না-ই বা কেন। যেসব ইন্ডিয়ান আর্মি ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমাকে উদ্ধার করেছে, তারা এর সাক্ষী, সেই মিত্রবাহিনীর লোকেরা।
ক্যান্টনমেন্টে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, ওই যে কয়েক গাড়ি পাকিস্তানি আর্মি মৌ-বেষ্টনীতে কোয়ার্টার ঘিরে ফেলেছিল, সেইদিন। তাদের অভিযোগ, আমি কমান্ডারকে খুন করেছি। লোকটা ছিল আমার বাপের বয়সী। কার্ড লেখার সময় আমি একদিন বায়না ধরলাম, ‘আমাকে পিস্তল চালানো শেখাও। দেখি, পারি কি না!’ কার্ড চালতে চালতে ওর হাত থেমে গেল। চোখের পাতা স্থির। আমি ভয় পেলে গেলাম। ‘না-না ডার্লিং, অমনি অমনি বলেছি, রাগ কোরো না, প্লিজ! এই, এইবার তোমার দান।’ আমি ঝাঁকুনি দিয়ে দিয়ে ওকে জাগিয়ে তুললাম। সেদিন কার্ড খেলা আর হলো না। চাঁদমারিতে নিয়ে গিয়ে সারা বিকেল আমাকে পিস্তল চালানো শেখাল। ও আসলে মরতে চাইছিল। বয়স হয়ে গেছে, আর এত খুন-খারাবি গত কয়েক মাসে করেছে যে, রাতে ঘুমাতে পারত না।
চাঁদমারি থেকে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে আমরা নেভাল ক্যাম্পে ফিরছি। কমান্ডার সেলিম ড্রাইভ করছে, আমি বসা পাশের সিটে। পিস্তলটা হাতে নিয়ে খেলা করছি, কেমন খেলনা খেলনা দেখতে! লেভেল ক্রসিংয়ে এসে স্টার্ট রেখে কমান্ডার গাড়ি থামায়। রাতের ট্রেন তখন শহরে ঢুকছে। এই সুযোগ। আমি গাড়ির দরজা খুলে লাফ দিলাম। লাফিয়ে পড়ার আগে এখনো মনে আছে, কমান্ডার সেলিম গুলি ঠেকানোর জন্য অন্ধের মতো এক হাত সামনে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
রচনাকাল : ডিসেম্বর, ১৯৯৭
লেখক পরিচিতি: শাহীন আখতার বাংলাদেশের একজন অগ্রগণ্য কথা সাহিত্যিক। শাহীনের জন্ম ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬২। বেড়ে ওঠা চান্দিনা, কুমিল্লায়। অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর ছয়টি উপন্যাস, ও সাতটি গল্পগ্রন্থ। তিনি গুরুত্বপূর্ণ দুটি গ্রন্থের সম্পাদনা করেছেন। সেগুলো হলো: সতী ও স্বতন্তরা: বাংলা সাহিত্যে নারী এবং জানানা মহফিল বাঙালি মুসলমান লেখিকাদের নির্বাচিত রচনা। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ এ পর্যন্ত তিনি নানা সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০২০ সালে এশিয়ান লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড। শাহীনের গল্প ও উপন্যাস ইংরেজি, কোরিয়ান ও জার্মান ভাষায় অনূদিত হয়েছে।


0 মন্তব্যসমূহ