নতুন কলেবরে ফিরে এলো কল্পবিজ্ঞানের বই 'স্বাতীর কীর্তি' ও 'বার্নার্ডের তারা'





তুষার কুমার গায়েন

নেক শৈশবে, স্কুল জীবনে যখন রূপকথা পড়ার বয়স, পড়েছি দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের ঠাকুরমা-ঠাকুরদাদার ঝুলিতে রাক্ষস-খোক্কসদের শিহরণ জাগানিয়া গল্প ও কাঞ্চনমালার করুণ কাহিনী, ডুবে গেছি রামায়ন-মহাভারতের পৌরাণিক যুদ্ধবিগ্রহের আলো-আঁধারিতে, সোভিয়েত রূপকথায় বাবা ইয়াগা, ছোট্ট গোল রুটি, মালকাইটের ঝাঁপি, সমুদ্রের বেলাভূমিতে জেগে ওঠা উভচর মানব ইকথিয়ান্ডর এবং এক সহস্র আরব্য রজনীর গল্পে সিন্দাবাদ ও আলিবাবা চল্লিশ চোরের শ্বাসরুদ্ধকর কল্পনার বর্ণিল জগতে। আমরা তখন বরিশালের অক্সফোর্ড মিশন রোডের দোতলা কাঠের বাসায় থাকি, পড়ি বরিশাল জিলা স্কুলে। স্কুল থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে, দোতালা কাঠের পাটাতনে বসে স্কুলের হোমওয়ার্ক করা হয়ে গেলে ঢুকে পড়ি বিচিত্র সব বইয়ের জগতে। জন্মের পর একটু বড় হতেই দেখেছি আমাদের বাসায় আসবাব বা দামী জিনিসপত্র কিছু নেই, যা আছে চোখে পড়ার মতো একটা বইয়ের আলমারি। সেটাতে দেশ বিদেশের শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞানের নানাবিধ বই যা পড়ার বয়স তখনও হয়নি। এই বইয়ের আলমারীর সযত্নে গড়ে তুলেছেন ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড়, স্বপন কুমার গায়েন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র। বড়দা স্কুল থেকে ভার্সিটি বরাবর নামকরা ছাত্র, পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় সাহিত্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে লিখে পরিচিতি পেয়েছেন। ১৯৭৭ সাল, আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, হাতে এলো কল্পবিজ্ঞানের নতুন বই 'স্বাতীর কীর্তি', লেখক বড়দা স্বপন কুমার গায়েন। বিপুল আনন্দে আমরা পিঠাপিঠি বড় ও ছোট ভাইবোন, সবাই মিলে বইটা পড়ি। প্রচ্ছদেই বিস্ময়, ডাইনোসরের পিঠে বসা একটি বুদ্ধিদীপ্ত ছোট্ট মেয়ে স্বাতী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করে দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দেয় যার বিবরণ ধরা আছে বইয়ের ১০ টি গল্পে। বইটি শুধু শিশু-কিশোরদের মধ্যেই নয়, বয়স নির্বিশেষে সব স্তরের পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

বড়দা ১৯৭৮ সালে উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য আমেরিকায় পাড়ি জমান। এর এক বছর পর ১৯৭৯ সালে তাঁর দ্বিতীয় কল্পবিজ্ঞানের বই 'বার্নার্ডের তারা' প্রকাশিত হয় যেখানে মিশা নামের এক প্রতিভাবান কিশোর একান্ত নিজস্ব ভাবনায় মহাবিশ্বের অনন্ত রহস্য সন্ধান করে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মোট ৫টি গল্পের এই বইটিও সর্বস্তরের পাঠক মহলে জনপ্রিয় হয়। এই দুটি বই, 'স্বাতীর কীর্তি' ও 'বার্নার্ডের তারা' নতুন প্রচ্ছদ নিয়ে ১৯৮৪ সালে আবার প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে কেটে গেছে চল্লিশ বছর, পুরনো পাঠকদের স্মৃতিচারণায় বারবার এসেছে বই দু'টি এবং অনেক নতুন পাঠক আগ্রহ প্রকাশ করেছেন পড়বার জন্য। কিন্তু বাজারে না থাকায়, সম্প্রতি 'অনুপম প্রকাশনী'র শ্রী মিলন নাথ প্রকাশনার জন্য এগিয়ে আসেন এবং একুশের বইমেলা ২০২৫-এ বই দু'টি নতুন প্রচ্ছদ নিয়ে প্রকাশিত হয়। বেশ কয়েকজন প্রচ্ছদশিল্পীর সাথে যোগাযোগ করে মনমতো প্রচ্ছদ না পাওয়ায়, অবশেষে নিজেই বই দু'টির প্রচ্ছদ করি। শৈশবে আমার ছবি আঁকার ব্যাপারে বড়দা অনেক উৎসাহ দিয়েছেন, আর্টের বই কিনে পাঠিয়েছেন। আমাকে নিয়ে তাঁর স্নেহ ও প্রত্যাশার কিছুই পূরণ করতে পারিনি, তবু প্রচ্ছদ দুটোতে সেই ব্যর্থতা ঢাকার সামান্য চেষ্টা করেছি আমি।

'স্বাতীর কীর্তি' ও 'বার্নার্ডের তারা' পাওয়া যাবে 'অনুপম প্ৰকাশনীর' নিজস্ব দোকানে (৩৮/৪ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০) এবং 'রকমারি' থেকে অনলাইনে। নিচে লেখক ও বই দুটো সম্পর্কে, ব্লার্বে মুদ্রিত সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হলো।

স্বাতীর কীর্তি

'স্বাতীর কীর্তি' স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যে এক উজ্জ্বল সংযোজন। শিশু কিশোরদের কথা ভেবে লেখা হলেও, গত শতকের সত্তর দশকে প্রকাশিত বইটি সব বয়সের পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। দশটি বৈজ্ঞানিক কল্পগল্পের এই সংকলনটিকে একসূত্রে বেঁধেছে কেন্দ্রীয় চরিত্র স্বাতীর বিবিধ এডভেঞ্চার। স্বাতী একজন কৌতূহলী, কল্পনাপ্রবণ, সপ্রতিভ ও সহানুভূতিশীল দৃঢ়চেতা বালিকা ভাগ্য যার বরাবর অনুকূলে থাকে। নানাবিধ রহস্যে জড়িয়ে পড়া এবং অনুভূতি দিয়ে বিভিন্ন সমস্যা বোঝার কেমন যেন সহজাত ক্ষমতা আছে তার। তাই যেসব সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত হিমশিম খেয়ে যান, স্বাতী সেসবের সহজ কোনো সমাধান করে ফেলে।

খেতে-না-চাওয়া শিশু ডাইনোসোরকে খাবার খাওয়ায়, মৎস্যকন্যার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাকে কথা বলতে শেখায়, পিরামিডের মধ্যে হিমায়িত করে রাখা বেড়ালকে কয়েক হাজার বছর পরের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মহাকাশযাত্রায় এক ঘূর্ণিঝড়ে পড়ে স্বাতী পৌঁছে যায় উজ্জয়িনীপুরে। সেখানে ওহারুরা দ্রুত যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে। সে ভয়ংকর পরিণতি রোধ করার জন্য সখী অপরাজিতাকে স্বাতী নাচ, গান, ছবি আঁকা ও কবিতা পড়া শেখায়। আবার কালরথে চড়ে স্বাতী সময় ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে যায়, দূর এবং অদূর অতীতের চমকপ্রদ সব ঘটনাবলি দেখে: প্যালিওলিথিক যুগের আদিম মানুষ কীভাবে পাথরের মামুলি অস্ত্র গড়ত ও ব্যবহার করত, মায়া পুরোহিত দেবতাকে খুশি করার জন্য কী ভয়ানক বিধান দিত, তাঙ্গুসকার ধংসকাণ্ড কীভাবে ঘটেছিল ইত্যাদি। স্বাতীর এমনি ধারা নানা কীর্তির কথা আছে এ গল্প সংগ্রহে যা কল্পনাপ্রবণ, অনুসন্ধিৎসু পাঠককে আকর্ষণ করবে।

বার্নার্ডের তারা

বার্নার্ডের তারা' স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের সূচনালগ্নের এক উজ্জ্বল ফসল। ১৯৭৯ সালে পাঁচটি বৈজ্ঞানিক কল্পগল্পের এই সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে।

নিজ অক্ষের চারপাশে পৃথিবীর ঘূর্ণনমাত্রা খুব বেশি বাড়িয়ে দিলে কী বিপর্যয় দেখা দিতে পারে তা জেনেও বিজ্ঞানী চ্যাং ফু এমন ঝুঁকি কেন নিলেন? তাহলে কি পৃথিবী থেকে প্রাণের চিহ্ন মুছে যাবে? অসাধারণ প্রতিভাবান মিশার ধারণা কি মহাবিশ্বের রহস্য সন্ধানের নতুন পথ দেখাবে?কালবীক্ষণ যন্ত্রে কি সত্যই অতীতের ঘটনাবলি দেখা যায়? জঙ্গলবাড়ির উঁচু পাঁচিলঘেরা নিভৃতে কী ভয়ঙ্কর গবেষণা চলে? ইরা কি সেখানে বন্দী বিজ্ঞানীকে মুক্ত করতে পারবে? দূর নক্ষত্রের দেশ মিরান্ডায় এক উন্নত সভ্যতা কেন হারিয়ে গেল? জলবায়ুর চরম পরিবর্তন কি পৃথিবীর জন্যও তেমন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে?

অনুসন্ধিৎসু পাঠক সেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন 'বার্নার্ডের তারা'র গল্পগুলিতে।
*****

স্বপন কুমার গায়েনের পরিচিতি: জন্ম ১৯৫৪ সালে। পিতৃনিবাস ফুলবাড়ী, মাদারীপুর। মাতুলালয় গোপালগঞ্জ। পিতার কর্মসূত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছেলেবেলা কেটেছে। ভান্ডারিয়া বেহারী ইনস্টিটিউশনে মাধ্যমিক এবং সরকারি ব্রজলাল মহাবিদ্যালয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশুনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যানেটিকাট থেকে পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি।

বর্তমানে সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউইয়র্কের সিটি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। গবেষণার বিষয়সমূহ: কঠিন অবস্থারলেসার, লেসার স্পেকট্রোস্কোপি, অপটিক্যাল বায়োমেডিক্যাল ইমেজিং, ননলিনিয়ার অপটিক্স এবং ন্যানোফোটোনিক্স। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে ডিজিটাল শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কম্পিউটার সাক্ষরতা কর্মসূচির (সিএলপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্বেচ্ছাসেবী।

ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখির শুরু। বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় বিজ্ঞান পত্রিকাসমূহে এবং দৈনিক পত্র-পত্রিকার সাহিত্য, বিজ্ঞান ও ছোটদের পাতায় লিখেছেন। জনপ্রিয় মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী এবং বাংলাদেশ ফিজিক্যাল সোসাইটির বুলেটিন দ্য ফিজিসিস্ট-এর সঙ্গে সম্পাদনা সহকারী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

প্রকাশিত অন্যান্য গ্রন্থ: বিজ্ঞানে বড় মানুষ বড় কাজ, বিচিত্র বিজ্ঞান ও পরমাণু জগৎ, আশ্চর্য আর আশ্চর্য, কত অজানারে, জীবের কথা জীবনের কথা, এবং শান্তির সৈনিক আইনস্টাইন।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ