য়জুল ইসলাম সুমন আমার বড়ভাই। আমরা পিঠোপিঠি ভাইবোন। মাত্র এগারো মাসের ছোট বড়।
ভাইয়া ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম,একটু আলাদা.... আর সবার মতন নয়। একই পরিবারে আমাদের বেড়ে ওঠা।একই নিয়মে,শাসনে আমরা বড় হতে থাকি। আমরা চার ভাইবোন। ছোটভাই ফাহিমুল ইসলাম শোভন। ছোট বোন ফারহিদা ইসলাম নীতু।

আব্বা প্রচুর গল্পের বই পড়ত। আমাদের বাসায় সকালে আকাশবাণী কলকাতার রবীন্দ্রসংগীত বাজত। আম্মা পুরাদস্তুর গৃহিণী এবং অসম্ভব কড়া একজন মা। ভাইয়া আড্ডা দিতে পছন্দ করত। আর কবিতা লিখত।আমাদেরকে আব্বা বছরের শুরুতেই ডায়রি কিনে দিত।আমরা রোজ ডায়রি লিখি। ডাকটিকিট এলবামে সেঁটে রাখি। কয়েন জমাই,পাখির পালক জমাই। 

স্কুলে ভাইয়ার প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। ভাইয়া আর আমি পালা করে গল্পের বই পড়ি।ইঁচড়েপাকা আমরা যেন সর্বখাদক.... আব্বার বইগুলো লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ি। বঙ্কিম, নীহার রঞ্জন, শরৎচন্দ্র, নিমাই, আশাপূর্ণা, প্রতিভা বসু,বুদ্ধদেব.... সব পড়ি।

এরপর ভাইয়া কোথা থেকে নিয়ে আসতে শুরু করল দস্যু বনহুর,মাসুদ রানা, কুয়াশা।
একরাতের মধ্যে দুজন মিলে পড়ে শেষ করি।কারণ সকালে স্কুলে যাবার সময় বই নিয়ে যেতে হবে ফেরত দিতে।

একবার ১৯৭৭ সালে ভাইয়া আর আমার টাইফয়েড হলো।প্রায় পৌনে দুইমাস ভুগলাম। ভাত খাওয়া বারণ ছিল তখন।কতরাত আমরা মিটসেফটা খুলে ভাতের দিকে তাকিয়ে থেকেছি। আমাদের পথ্যি ছিল সাগু,বার্লি। সে বছরই ভাইয়ার ক্লাশ এইটের বৃত্তি পরীক্ষা। ক্লাশ ফাইভে বৃত্তি পেয়েছে। এইটে শুয়ে শুয়ে পরীক্ষা দিলো এবং বৃত্তি পেলো। ভাইয়ার এইসব লেখালেখি নিয়ে আম্মা,আব্বা ভীষণ চিন্তিত। কারণ পড়ত কম।

পাবনার কবি কণ্ঠের সদস্য ভাইয়া।সপ্তাহান্তে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে। স্কুল,কলেজে অনেক পুরস্কার পায়। আরও আরও ব্যস্ত হয় ভাইয়া।চমৎকার আবৃত্তি করে,বিতর্ক করে। এসবের জন্য পুরস্কার পায়।

আব্বার খুব ইচ্ছে ছিল ভাইয়া ইঞ্জিনিয়ার হবে। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেখে মুগ্ধ ভাইয়া আর কোথাও পড়বে না বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়।বুয়েটের এডমিশন টেষ্টে সাদা খাতা জমা দিয়ে আসে।কারণ চান্স পেলে আব্বাকে মানানো সম্ভব নয়। আব্বা ভাইয়ার ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিতে বাধ্য হয়।ভাইয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনোমিক্সের ছাত্র। ক্যাম্পাসে আড্ডা আর হুটহাট বাসায় চলে আসা...স্বননের সদস্য ভাইয়া।দরাজ কণ্ঠে আবৃত্তি করে। তাকে তখন অনেকেই চিনতে শুরু করে।
আড্ডাবাজ সুমন কখনও কখনও মধ্যমনি হয়ে ওঠে।

আমাদের ছোটবোন নীতু অনেক ছোট। ওর জন্য বই কিনে আনে ভাইয়া। আর ঈদ এলে ঈদ সংখ্যা পত্রিকা খুঁজে খুঁজে কেনে। পূজোর গানের লিস্ট করে ক্যাসেট করতে দেয়। আমরা ভাইবোনেরা সেইসব ঈদসংখ্যা পড়ি।পূজোর গান শুনি।

রাজশাহীতে কবিতা লিখতে গিয়ে ওর মনে হয় কবিতা লোক সে নয়।বন্ধুরাও বলে কবিতা তো হচ্ছে না ভালো। গদ্য হাতছানি দেয়। রাজশাহীর পাট চুকিয়ে ভাইয়া তখন ঢাকায়।সিদ্ধেশ্বরীতে আমার নানাবাড়ীতে থাকে। আর শাহবাগ, আজিজ সুপারমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোডে চলে তুমুল আড্ডা। ওর বন্ধুদের সাথে আমাদের পারিবারিক বন্ধন তৈরি হয়।

সবার সাথে মিশে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে এসেছিল ভাইয়া। কে ওর বন্ধু নয়? যার যার সাথে তার তার মতো করে মিশে যায় ভাইয়া।

শোভন আর আমার হোষ্টেলের পাট শেষ হলে আমরা তিন ভাইবোন পেয়ারাবাগে বাসা নিয়ে থাকতে শুরু করি। ততদিনে ভাইয়া গদ্য লেখা শুরু করেছে।বড়চাচার একটা টেবিলে বসে ভাইয়া লিখত। বড়চাচি টেবিলটা দিয়েছিলেন।

ভাইয়ার লেখার প্রথম পাঠক ছিলাম শোভন আর আমি। এরপরে নীতু বড় হয়। তখন থেকে শেষ পর্যন্ত প্রথম পাঠক নীতু।

১৯৯৬ সালে প্রথম প্রকাশিত বই নক্ষত্রের ঘোড়া। এরপর ভাইয়া সেবা প্রকাশনীতে কাজ শুরু করে। নিজের লেখায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলেই দীর্ঘ বিরতি নেয়। তখন কেবলই পড়ে আর পড়ে।

আবার লিখছে ভাইয়া। ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ... খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক।
এ যেন অন্য এক ফয়জুল ইসলাম। শুরুতে সে সুমন ফখরুল নামে লিখত। পরে ফয়জুল ইসলাম নামেই লিখেছে।

একদিন বাসায় এসে বলল.... নীলা ঘটনা তো ঘটে গেছে। অবাক হয়ে বলি... আবার কী?
একটা পুরস্কার তো মনে হয় পেয়েই যাব... ভাইয়ার এই কথায় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। এরপর দেখি সত্যি সত্যি প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরষ্কার পেয়েছে খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক। অনুষ্ঠানের দিন আমরা সবাই যাই। স্টেজ থেকে নেমে পুরষ্কারটা ভাইয়া আব্বার হাতে দেয়। কী আনন্দ আমাদের বাবা মায়ের।

এরপর ভাইয়া আর থামেনি। বখতিয়ার খানের সাইকেল, আয়না,নীলক্ষেতে কেন যাই,জমিন,ঘুমতৃষ্ণা, উপন্যাস বয়েজ স্কুল ব্যান্ড.... ভাইয়ার কলম চলছে।

গল্প সমগ্র প্রকাশের সময় খুব দ্বিধায় ছিল। এখনই কি সময়? আরও লিখতে হবে। বললাম... হোক না। সমগ্র তো হতেই পারে। চৈতন্য থেকে এলো দু-খণ্ডের গল্পসমগ্র। বাসায় এসেই কাগজ কলম নিয়ে কী জানি সব টুকে রাখত। কথা বলতে বলতে হুট করে নাই হয়ে যেত। আম্মার ঘরে,ডাইনিং টেবিলে,বর্ষার ঘরে.... ভাইয়া লিখছে।

২০২৩ সালের ১৪ জুলাই আমাদের এইসব রাত্রিদিনের ছন্দপতন শুরু হয়। ৩১ জুলাই ভাইয়ার অপারেশন। ৩১ অগাস্ট থেকে কেমোথেরাপি শুরু। আমাদের যুদ্ধ চলছে। আটটা কেমোথেরাপি আর অফিস.... ভাইয়া বিধ্বস্ত। ২৮ মার্চ ২০২৪ ভাইয়ার দ্বিতীয় অপারেশন।

এরপর থেকে সুস্থ হতে থাকে। আবার লেখা শুরু। এবার প্রবন্ধ লিখবে বলে পড়াশোনা করে। অনেক যত্ন নিয়ে লিখল আধুনিক গদ্যভাষার সন্ধানে। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত বইটির পাঁচ কপি হাসপাতালে পেলাম আমরা। ভাইয়ার কেমোথেরাপি চলছে একহাতে। কারণ ক্যান্সার ফেরত এসেছে। আরেক হাতে ভাইয়া আমাদের লিখে দেয় বইগুলো। শোভন কলম এগিয়ে দেয়। ভাইয়া লিখছে আর বলে...দ্যাখ আমার হাত কাঁপে। চোখের পানি লুকিয়ে বলি ধীরে ধীরে লেখো। বইটা একটু নেড়েচেড়ে দেখছে। বইটার সবকিছু নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।

হাসপাতাল থেকে বাসায় গিয়ে একদিন মেইল করল দুটো গল্প দুটো ঈদসংখ্যার জন্য। শেষ গল্পটি বাবলি প্রকাশিত হয়েছে সিল্করুটে। আরেকটি গল্প প্রকাশিত হলো ইজেলে। এগুলো ভাইয়া জানে না।দেখে যায়নি। তার আগেই তো অনন্ত যাত্রার পথে ভাইয়া।

ভাইয়া কখনও ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে চায়নি। অসুখের নির্জীব জীবন চায়নি। কিন্তু যোদ্ধার মতন যুদ্ধ করেছে প্রতিদিন। এরমধ্যে ওর লেখা থামেনি।

শেষ গল্পটা একটা প্রেমের গল্প। ভাইয়া মানুষকে হৃদয়ে নিয়ে চরিত্রে ফুটিয়ে তুলত। একবার হাতে একটা সেলাই শিক্ষা বই নিয়ে বাসায় এলো। আমি খুব হাসাহাসি করে বললাম... পেশা বদলাবে নাকি?
ভাইয়া মুচকি হেসে বলল গল্প লিখছি। বাবলি গল্পটা লেখার জন্য দাবার বোর্ড কিনে এনেছিল। চাল দিত, ভাবত আর লিখত।

চর্যাপদ নিয়ে সেবার লেখাপড়া করে ভাইয়া। আমি অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত শেখাই। আবার নিয়ে আসে.... পয়ার,মহাপয়ার এসব মিলে গেলে বাচ্চাদের মতো হেসে ওঠে। সনেট নিয়ে পড়ে। যদিও কবিতার মানুষ নয় সে তথাপি কবিতায় তার পূর্ণ দখল ছিল। সুন্দর কবিতা লিখত।

সবসময়ই এসব বিষয়ে পারফেকশন চাইত। নিজে সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত চলত তার কাটাকুটি।

ভাইয়ার পাঠক একটু ভিন্ন।সবাই হয়তো ওর লেখা পড়েননি বা পড়বেন না। তবে কথাসাহিত্যে হয়তো একদিন তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে। আর না পাওয়া গেলেও বা ক্ষতি কি? নিজের আনন্দে, নিজের বেদনায় লিখেছে ভাইয়া।

পরিবারের বড় সন্তান হয়েও যেন সবার ছোট ছিল ভাইয়া। হুলুস্থুল করে মাতিয়ে রাখত সবাইকে। আমাদের ছয় বাচ্চার সাথে ওর খাতির ছিল ভীষণ। আব্বা আম্মাও কোনোদিন ওকে বোধ করি বড় হতে দেয়নি। মাঝখান থেকে শোভন আর আমি বড় হয়ে উঠলাম। ভাইয়া আর নীতু... সারাজীবন ছোটই থেকে গেলো আমাদের সবার কাছে।

ভাইয়াকে যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন,চিনেছেন.... তাদের মধ্যে যেন ভাইয়াকে পাই। ভাইয়া আর কখনও লিখবে না।এতো অল্প সময় লেখার জন্য পেলো যে কতকিছু বাকি থেকে গেলো। তবু বিশ্বাস করি.... ওর লেখাই ওকে বাঁচিয়ে রাখবে।ওর লেখাই কথা বলবে।

আমাদের ভাই হারানোর ব্যথা কিছুতেই কোনোদিন যাবে না। ভাইবোনের এই বন্ধন যাবার নয়।আমাদের ক্ষরণ,দহন... আমাদেরই থাক।

পাঠক পড়ুক একজন ফয়জুল ইসলামকে। পাঠক চিনুক একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাকে যে কীনা মাটিতে নেমে মাটির মানুষের কথা বলে,যে জীবনের কথা বলে। যার চরিত্রগুলো নির্লিপ্ত চোখে গল্পের শরীরে বাসা বাঁধে। যার সৃষ্টি সমাজের সকল স্তরে চষে বেড়ায়।

ভাইয়া আমাদের শুধু আদরই করে গেছে। এই জীবন যে মায়ার সেটা বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। শুধু শিখিয়ে যায়নি ওকে ছাড়া এই জীবন কাটবে কীভাবে?


ফারহানা নীলা
০৮/০৪/২০২৫