অনিন্দ্য ভট্টাচার্য্যের গল্প : রামরাজত্ব






মোড়ের মাথায় চোর ধরা পড়েছে।

একসময় গ্রামের সবাই জেনে গেল ব্যাপারটি। বউ-ঝি যারা বড়ো বাড়ির তাদের কৌতূহল চাপতে কষ্ট হতে লাগল। পাশেরজনের সঙ্গে পর্যালোচনায় সে কষ্ট এখনো বাড়তে লাগল, কখনো বা কমতে লাগল। বাচ্চারা মেলা বা মেলা জাতীয় কোনো কিছুর আনন্দ উপভোগ করতে লাগল। আর বউ-ঝি যারা ছোটোবাড়ির— তাদের কেউ কেউ মাথার ছেঁড়া বা ভালো— ময়লা বা পরিষ্কার কাপড়টা আর একটু সামনে টেনে দিয়ে ব্যাপার বুঝতে বা দেখতে চলে এল। কৌতূহলের তীব্রতা মুখোমুখি টানল তাদের। সামনাসামনি বেশ লাগে উপভোগ করতে।

এই দিনের ভোর এসেছিল খুব বেশি বৃষ্টি নিয়ে। বর্ষাকাল। প্রবল বৃষ্টিকেও তাই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। বৃষ্টির জল, এবং শীতার্ত। ভোরের দিকে এখন ঠান্ডা পড়ে। একটু আগে বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছিল। তারপর বড়ো বড়ো গোল গোল ফোঁটা। তার সঙ্গে ঝাপটা, মানুষটি ভিজেছিল। এবং গোরুটিও। কালো রঙের একটি গাই। গায়ে জল পড়ে ছোপ ছোপ দাগ ধরেছে। পৌষপরবে গোরু নাচানের সময় টিকি ফল দিয়ে যেরকম রঙের ছোপ দেওয়া হয়, অনেকটা সেই রকম। গা থেকে গড়িয়ে পড়া জলের রং লাল। মানুষটিরও গা থেকে কালো রঙের জল গড়িয়ে পড়ছিল।

তারপর বড়ো বৃষ্টি কমে গিয়ে একসময় শুরু হল টিপটিপ বৃষ্টি। রাস্তায় এক হাঁটু কাদা। মানুষটির এবং গোরুটির হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। দুই প্রাণীরই শরীরে এবং চোখে ক্লান্ত বড়ো মাপের জায়গা পেয়ে যাচ্ছিল। এই কারণেই হাঁটতে দেরি হচ্ছিল তাদের। তাই সময়ের মাপকাঠি টেকেনি শেষপর্যন্ত। মানুষটির পরিকল্পনায় ভুল থেকে গিয়েছিল। বুকে টিপ টিপ শব্দ। এবং একটু একটু ভয়। একরকম ধুকপুক কেমন। গোরুটির নিশ্বাসের শব্দ এবং নিজের বুকের শব্দ মানুষটির মনে বেশি করে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল। ঢিপ ঢিপ ভয়। নিস্তব্ধতার ভয়। চারপাশে কিরির-কিরির ব্যাঙের ডাক আরও ভয়ের পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। সড়কে যে সময়ে ওঠার কথা ছিল সেই সময়টি যখন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাচ্ছিল তখন মানুষটি কেমন যেন মুষড়ে পড়েছিল। সড়কে যখন ও এল তখন গ্রামের লোকেরা জেগে উঠে শারীরিক কারণে রাস্তার ওপর এসে পড়েছে। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। জড়তা মানুষটিকে এক ধরনের আচ্ছন্ন করে তুলছিল ক্রমশ। এবং একজন যখন তাকে ‘কিছু’ জিজ্ঞেস করল তখন সে কোনো সংগত উত্তর দিতে পারল না। গ্রামবাসীর কৌতূহলের সামনে শুধু তার ভয়ই খাড়া হয়ে দাঁড়াল। আর সে ধরা পড়ে গেল। কী করে কখন যে গ্রামের ভেতরে খবর চলে গেল তার হিসেব মেলাতে ব্যস্ত যখন মানুষটি, তখনই সে দেখতে পেল অনেক লোক তাকে ঘিরে ধরেছে। আর শুধু কী-সব জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে।

বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে। বাতাসে ঠান্ডার ভাবটা কমছে একটু একটু করে। তার বদলে গায়ে ঘাম দিতে শুরু করেছে অনেকের। মানুষটি গায়ে জড়িয়ে রাখা ভিজে যাওয়া গামছা খুলে ফেলেনি, কাঁপছে রীতিমতো।

ভাববার জন্য অবশিষ্ট কিছু তার আর নেই তখন। সে কিছু ভাবছে না। বা চেষ্টা করেও পারছে না। ঘুম পাচ্ছে যে— এটা ঠিক। একটু শুতে পারলে যেন বাঁচে। তার গোল গোল খয়েরি চোখ মানুষের মুখ দেখতে চেষ্টা যে করছে না এমন নয়— তবে কেমন যেন গুলিয়ে যাওয়া— কিছুই বোঝা বা বুঝে ওঠার আগেই আর-এক প্রশ্ন এসে গুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। মানুষটি তখন পায়ের কাছে জমে যাওয়া লাল জলে কালো রঙের পিঁপড়েটাকে ভাসতে দেখছে। পিঁপড়েটা ঠিক দম নেওয়ার আগেই আবার জলে ডুবে যাচ্ছে। গোরুটি জাবর টানছে।

গরমের দিনে আম ফেরি করত ও। সেকপুরার জানাঘর বিরাট গেরস্থ। তাদের অনেকগুলি গোরু। একদিন তাদের বাড়িতে আম বেচে পয়সার জন্য বসে ছিল। তখনই এই গাইটাকে দেখে সে। তার চোখের সামনেই প্রায় এক বালতি দুধ দিয়ে দিল। সাদা মোটা দুধ। দুধ দেখে আম-বেচা পয়সা নিয়ে বাড়ি ফিরল। আর রাস্তার যা-কিছু সবই সাদা রঙের দেখল— বাতাসের গন্ধে জানাদের কালো গাই-এর দুধের গন্ধ পেতে লাগল। মাস দুয়েক আগের কথা। তারপর আরও কয়েকবার গিয়েছে জানাবাড়ি। আম বেচতে আর দুধ দেখতে। তারপরে কয়েকদিন মাছ ফেরি করেছে। মাছ বেচতে জানাবাড়ি গিয়ে গাইটিকে ভালো করে দেখেছে সে।

বর্ষার রাতে ঠান্ডায় বাবুরা ঘুমিয়ে যায় অসাড়ে। বৃষ্টির শব্দও থাকে। এই রকম ভেবে নিয়ে বা কিছু না ভেবে উঠেই মানুষটি গাইটাকে আনবার জন্য গিয়েছিল ওই গ্রামে সন্ধেবেলা। জীর্ণ সহায়হীন অথচ ক্ষুব্ধ মন তার এক সময় প্রশ্রয় পেয়ে গিয়ে বাতাসের মতো জলের মতো বিস্তার পেতে থাকে। পায়ের তলাকার মাটি কাঁপে। কিন্তু সে কাঁপায় ভূমিকম্পের স্বাদ নয়— মোটা সরের ওপর পিঁপড়ের সুখানুভূতির স্বাদ কিনে ফেলতে পারে যেন। সারাদিন মাছ ফেরি করেছে। ওই বিক্রি থেকে লাভের ক'টি পয়সা। তারপর বউ বলবে কিছু। বউয়ের কোলের ছোটো ছেলেটির মাখন কোমল মুখ ননীর গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে মনের পাতলা পর্দায় আঘাত দেবে। পৃথিবীতে ঘটে গিয়েছে আগেই— অথচ তার কাছে অভূতপূর্ব এবং অদৃশ্য আশার অঙ্কিত আদল এক বোধের ভুবন গড়ে তুলবে। সব দিনই মানুষটি মন দিয়ে যে পয়সা রোজগার করে তা কখনোই নয়। এদিনটিও সেই রকম। এক অন্ধকার কালো অভিসন্ধির মূর্তি হয়ে ঘোরাফেরা করতে থাকে— এ-বাড়ি ও-বাড়ি যায় সে। সরু রেখার মতো খয়েরি চোখ জ্বলে ধিক ধিক করে। বুকের ভেতরে গরম বাতাস চাপের সৃষ্টি করে মাঝে মাঝে। মাথাটা একটু শক্ত করে চেপে ধরে সে। তারপর ঝুড়ি আবার মাথায় তুলে নিয়ে হাঁটা দেয়।

জীবনের এক মিথ্যেবাদী দিক তার তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতার সঞ্চয়কে নিষ্ফল বন্ধ্যার মতোই মাটি করে দিয়েছে। অভিসন্ধির কানাগলিতে হাঁটতে হয়েছে তাকে, তাই চুল-চেরা বিশ্লেষণ না করতে পারলেও ছক আঁকতে গিয়ে বিভিন্ন ডাইনে-বাঁয়ে তাকাতে হয়েছে। বাপের বাতলে দেওয়া সোজা রাস্তায় সন্ধান মেলেনি তার। এমনতর কৌণিক খর প্রবাহের এলোমেলোপনা যখন তার মস্তিষ্কে খিলানের মতো একটি টান দিয়ে ধরে রাখতে অক্ষম হয়েছে— তখন তার দৈনন্দিন কাজেও তার ছাপ পড়ে গেছে। বউ মুখ করেছে। সেও বউ-এর পাছায় না চড় বসিয়ে গালে বসিয়েছে। ছেলের গালে চুমু না বসিয়ে চিমটি কেটেছে নরম বাহুতে। বাবুদের বাড়িতে জিনিস আর তার দরের হিসেব মেলাতে গিয়ে ঠোঁট ফাঁক করে কৃত্রিম বোকা হাসি হেসে ভুলের খর রোদে মেঘের ছায়া ফেলেছে। এমনি করে সারাদিন কাটার পর সন্ধে হয়েছে।

তখন সে বেরিয়েছে সেকপুরার রাস্তা ধরে। ভেসে যাওয়া মেঘের ধোঁয়াটে রং গাই-এর গায়ের রঙের আদল পেয়েছে। বিরাট একখণ্ড মেঘের মতোই গাইটি। তার মোট চারটে বাঁট দিয়ে বৃষ্টির মতোই দুধ ঝরে চলেছে। যেন সেই সাদা দুধ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে তার পরে-থাকা গামছাটাকে— গায়ে জড়ানো গামছাটাকে। তার ভেজা বস্ত্র বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই মোটা খাঁটি দুধের গন্ধ। মানুষটি হয়তো তখন ঝুঁকে পড়া জাম গাছের ডাল ধরে ঝুলছে। দু'একটি পাকা কালো টক জাম মুখে পুরে অমৃতের স্বাদ পেয়েছে। বৃষ্টিঝরা ঠান্ডা হাওয়ায় স্বর্গসুখ অনুভব করেছে। যদিও মাঝে মাঝে শীতের মাত্রা ছাড়া আক্রমণে গায়ের চুল সোজা হয়েছে। চামড়াগুলো শক্ত মোটা টান টান হয়েছে। আর কখনো বা মানুষটি অসহ্য যন্ত্রণায় মাথার চুল চেপে ধরে কাদার ওপরেই বসে পড়েছে। তারপরই কালো টসটসে গাইটার রূপে ভুবন ভরে গিয়েছে। ও তখন উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত তৃপ্ত এক মন নিয়ে হাঁটতে শুরু করেছে। সারা পৃথিবী তখন তার কাছে নরম সুন্দর আর সবুজ হয়ে উঠে দুধের গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে, যে দুধের সাদা গাঢ় মন মাতানো রং। বউকে মিথ্যে কথা বলে এসেছে— সে না-কি গাঁজার আড্ডায় যাচ্ছে— যেখানে প্রায়ই যায়। একঘেয়ে! আসলে সে যে জীবনের এক নতুন স্বাদ কেনার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছে— সে-কথা বলেনি; পুরোনো না কেমন যেন হয়ে যাবে তাই। যার সঙ্গে মনের সুখটি তখনকার মেলে না মোটেই।

সেকপুরার জানাদের বাড়ির বাইরের বারান্দায় যখন হ্যারিকেনের আলোয় আর বিড়ির ধোঁয়ায় মজলিশ চলছে, তখন মানুষটি বেড়ার বাইরে একবার ‘চোরের মতো’ ভেবে নিতে বাধ্য হয়েছে। বেড়াকলমির ডালকে সাপ ভেবে চমকে উঠেছে। অন্যমনস্কভাবে তার ডাল ভেঙে দুধের মতো সাদা রস ঝরিয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে বেড়া ডিঙিয়ে খড়ের গাদার পেছনে আশ্রয় নিয়েছে। পড়ে থাকা পচা খড়ে অসংখ্য ছাতু (ব্যাঙের ছাতা) ফুটেছে। বালির ওপর বসে পড়ে বালি আর কাদা নিয়ে ‘খেলা' করেছে— আস্ত ছাতু তুলে নিয়ে নখ দিয়ে কেটে ছড়িয়েছে। অন্ধকারেই আঁক কেটেছে অনেক। ব্যাঙ বা সাপের খস খস শব্দ শুনে চমকে বুকে হাত রেখেছে। ভয় পেয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে গিয়ে বিড়ির অভাবে তৈরি মনের খুঁতখুঁতানি ভুলিয়েছে কাল্পনিক দুধের গন্ধে। তারপর সব চুপচাপ হয়ে গিয়েছে জানাদের। মজলিশ ভেঙে গেছে অনেক আগে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই নেমেছে সেই দুধ-ঝরা বৃষ্টি। মানুষটি উঠে দাঁড়িয়েছে। জিভের লালা ঘিঁটে নিয়ে পেটের খিদে ভুলিয়েছে। আরও বেশি করে লালা ঝরেছে তখন। দুধের জন্য। সাদা দুধ। প্রতিদিন এক বালতি দুধ।

তারপর একসময় এখানে। এই গাছটির নীচে। তার শরীরে যতই ক্লান্তি ঘন হয়ে নেমে এসেছে— ততই পৃথিবীটি গড়ে উঠেছে কঠিন হয়ে। এই মুহূর্তে সারা পৃথিবী সত্যিই শক্ত কঠিন হয়ে তাকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে— অনুভব করতে পারল সে।

দুধ না ঝরে অনেক কথা ঝরছে। গাইটি জাবর কেটেই চলেছে, মুখের ওপর দুধের মতো সাদা ফেনা। বিড়ির প্রয়োজন অনুভব করে। আর তখন ওপরে মুখ তুলতেই দেখতে পায়— যেন সে কোনো জাদুকর। ভোজবাজির খেলা নিয়ে বসেছে। গাঁয়ের মেলায় যেমন দেখা যায় মাঝে মাঝে। সত্যিই কি সে কোনো মারাত্মক খেলা দেখিয়ে চলেছে, যা সারা জীবনে কখনো দেখায়নি! তা না হলে এত লোক তাকে ঘিরে ধরেছে কেন! এত লোক একসঙ্গে মানুষটি যে এর আগে দেখেনি এমন নয়। তবুও এ যেন এক্কেবারে নতুন। এই ঠান্ডা সকালে সে হয়ে উঠেছে দেখবার মতো এক বিরাট কেউ বা কিছু। ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। দামি। একটু ভালো লাগে। তখন ভয় আর ভালো লাগতে দেয় না। এবং বেশি করে ঘুম পেতে শুরু করে। শুয়ে পড়লেই ঘুম। ঘুম তাড়ানোর চেষ্টার প্রয়োজন আপাতত নেই। তবুও সে উঠে দাঁড়ায় এবং গাইটার গায়ে, নরম চুলে ঢাকা গলার ঝুলে পড়া চামড়ায় হাত বুলোয়।

ইতিমধ্যে কয়েকজন যেন কেমন চেঁচিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। জিজ্ঞেস করছে সে কে, কোথায় থাকে, গোরুটি কার, গোরুর মালিকের বাড়ি কোথায়— কখন চুরি করেছে—এদিক দিয়ে কোথায় যাচ্ছে— ইত্যাদি আরও কত কী। আর এইসব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার একটু কেমন কষ্ট হতে শুরু করে। গোরুটা সে চুরি করতে যাবে কেন! ভালো লেগেছে, তাই নিয়ে এসেছে। দুধ খাবে। ঘরে রাখবে। সব সময় আদর করবে গাইটাকে। তার নিজের ছেলেটিও দুধ খেয়ে মোটা হবে। বউটারও দুধের দরকার— আবার বাচ্চা হবে তার। এতক্ষণে একটু একটু মনে পড়ে তার পোয়াতি বউ-এর কথা। আর বউ-এর ভাবনা দূরে সরে যেতে বেশিক্ষণ সময় নেয় না যখন তার পাছায় কষে এক লাথি বসিয়ে দেয় কেউ, তখন চলতে থাকে মার। লাথি। চড়। কিল। শাসন চলে পুরোদমে। চোরকে শাসন। চুরির শাস্তি। মানুষটি জানে না সেই কবে থেকে শুরু হয়ে গেছে রামরাজত্ব। যে দুনিয়ায় অন্যায় চলতেই পারে না। অন্যায়কারীকে শাস্তি পেতেই হবে। এবং এইভাবে। রামচন্দ্রের দুনিয়ায় অন্যায় ছিল না। রামচন্দ্রের ঘরে অন্যায় ছিল না। আর যে করেছে অন্যায় তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। এই মুহূর্তে মানুষটিকেও শাস্তি পেতে হবে। জাগতিক এই দিকের খোঁজ সে রাখে না। মার খাও বাবা। কোন ভুলে ঢুকে পড়েছ রামরাজত্বে। এমনি বা এমনিতর কোনো শব্দসমষ্টিও তার কানের পর্দায় কেঁপে কেঁপে চলে গেল।

মানুষটি দাঁড়িয়ে আছে। এবং তখন একটি বুড়ো মেয়েমানুষ এগিয়ে এল তার দিকে। দেখল অনেকক্ষণ। চিনতেও পারল। তার বাপের দেশের মানুষ। সন্ন্যাস পাতরের ব্যাটা নকুল পাতর। বুড়িটি যা জানত বলে গেল। বৃষ্টির মতোই ঝরিয়ে দিল।

মানুষটির বাবা ছিল ভবঘুরে মতো। কিছু জমি জায়গা ছিল। কোনো বছর চাষ হত। কোনো বছর হত না। বউ যখন ঝগড়া করত, সন্ন্যাস তখন হাসত আর পাখোয়াজটির গায়ের ধুলো ঝাড়ত। পাখোয়াজ বাজাত সন্ন্যাস পাতর। মানে শিল্পচর্চা। একটা দলও ছিল তার। বড়ো গেরস্থদের কাছ থেকে ডাক পেত। আত্মভোলা সন্ন্যাসের এইভাবেই কেটে যেত দিন। তার পেছনেও নাকি এই নকুল। সবাই যা চাইত, সন্ন্যাস পাতর চাইত তার থেকে একটু আলাদা কিছু। সবাই চাইত নকুল চাষ করবে। চাষির ছেলে খাটবে--খাবে। সন্ন্যাস চাইত শিল্পীর ছেলে হবে শিল্পী। বাপের একটি গুণ পেয়েছিল নকুল। ভবঘুরে। যুবককালে অনেকের মধ্যেই থাকে যেটা। কিন্তু বাপের মতো শিল্পচর্চা করতে শেখেনি সে। সে কচ্ছপ ধরত। পাখি মারত। আর মায়ের মুখ শুনত। মাঝে মাঝে বাপের মারও খেত।

এই সেই নকুল। বুড়ির কথা থেকে সবাই যা জানতে পারল তা হল শিল্পীর ছেলে চোর। সমাজের এক সুস্থ শিল্পিত দিক যার বাবা, তারই ছেলে বিপরীত— সমাজে ছিটকে পড়া এক ভারী উল্কা— অত্যাচার। বিষাক্ত পোকা— কেটে কুটে বিষ ছড়িয়ে সব শেষ করে দেয় এরা চোর। জমে যাওয়া লোকগুলোর মধ্যে দু'একটি অল্পবয়সি শহরে পড়া শিক্ষিত ছিল, আর প্রাজ্ঞ প্রৌঢ় জ্ঞানীও ছিল— যাদের কানে তোলা ছিল পৈতে— হাতে ছিল গাড়ু— ভুঁড়ির চুল বাতাসে কাঁপছিল— মোটা উন্নত লাল নাক কাঁপছিল রাগে। এক সময় তাদের শিল্পিত রুচির প্রকাশ রূপ পেয়ে যাচ্ছিল ঠোঁট জোড়ার অক্লান্ত কম্পনে। নকুলের আর নকুল প্রসঙ্গিত নকুলের বাবা সন্ন্যাসের উদ্দেশে ঝরছিল শক্ত-ভারী পাথরের মতোই সব শব্দ। যা নকুল তার বাপের কালেও কখনো শোনেনি। সেই সঙ্গে আবার শুরু হয়ে গেল বল পরীক্ষা। কার দেহে-মনে কত বেশি জোর— তা আজ পরীক্ষা করে নেওয়া যাক চোর-নকুলের ওপর। দুটো বাঁশ নিয়ে আসা হল। এবং একটি বাঁশের ওপর নকুলের পা-দুটি রেখে তার ওপর চাপানো হল আর একটি বাঁশ। বাঁশ দুটির মাথার দিকে চাপ দিতে ব্যাপারটা কী ঘটতে চলেছে বুঝতে পারে নকুল, যখন সে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে শুরু করেছে, ঘুম ছুটে পালিয়ে যায় তার কাছ থেকে। কোনো শব্দও করতে পারে না— সময় পায় না শব্দ করবার। তাই তার মুখ থেকে বেরোয় না কোনো শব্দ। তার মাথায় পড়ে গাছের ডালের বাড়ি। হাত দুটো চেপে ধরে রেখে কাঁটা ফোটানো হচ্ছে তার হাতে দশটা আঙুলের দশটা নখের গোড়ায়। ইতিমধ্যে নকুল নানারকম স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। তাদের জাতপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে পারে না সে। তবে গাইটার গন্ধ পায়। একবার চোখ খুলে মেঘ দেখে— গাই দেখে। দুধ হয়ে ঝরে পড়ুক না কেন এখন বৃষ্টি। তার বেশ গরম লাগতে শুরু করেছে। কেটে যাওয়া ঠোঁটের ওপর জিভ চালায় নকুল। জমে গিয়েছে রক্ত। রক্তের রং সাদা না লাল বুঝতে পারে না। গাইটার রক্ত যেমন দুধ হয়ে বালতি ভরায়— তেমনি তার রক্তও বোধহয় কখন যেন সাদা দুধের স্বাদ নিয়ে জিভের লালায় আশ্রয় চাইছে। নকুল তার ঠোঁটের জমে যাওয়া সব রক্ত মুখে ভরতে চেষ্টা করে। জিভ চালায়— জিভ চালায়— আর পিঁপড়ের গর্তে খাবার জমানের মতো আস্তে আস্তে জিভ দিয়ে মুখের ভেতরে রক্ত ভরতে থাকে। এমন সময় জিভে পড়ে এক বাবুর চপ্পলের ঘা। নকুল ধীরে জিভটি মুখের ভেতরে ঢুকিয়ে নেয়। সেখানে অনেক রক্ত। পেটে ভরতে চেষ্টা করে নকুল। কিন্তু পেটে আর জায়গা নেই। রক্তের দল থাকবে না নকুলের পেটে। নকুল ঢোকাবেই— নকুল আর তার সম্পদের মধ্যে চলতে থাকে এইরকম এক লড়াই। নকুলের পেটে বসিয়ে দিল কে এক ভারী লাথি— যার ওজন প্রায় গাইটার মতোই হবে। নকুল তখন নিজেই সব রক্ত বের করে দিতে বাধ্য হয়। অনেক রক্তের ভেতর শুয়ে থাকে সে। তার পা থেকে বাঁশগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাতের নখে কাঁটা ফোটানো বন্ধ হয়েছে। নকুল তার রক্ত ঝরা নাকের নালা দিয়ে ভেতরে বাতাস ঢোকানোর চেষ্টা করে— নিজেকে হালকা মনে হয়। উঠে বসে। যন্ত্রণায় ভারী বাঁ-হাতটা আস্তে আস্তে তুলে মুখের কষের রক্ত মোছে। তারপর চেষ্টা করে বলে, এক গিলাস গরম দুধ দিবেন বাবু—

*****

লেখক পরিচিতি: অনিন্দ্য ভট্টাচার্য লেখালেখি শুরু করেন আশির দশকের গোড়াতেই। অসংখ্য উল্লেখযোগ্য গল্পের পাশাপশি তাঁর পাঁচটি উপন্যাস ("সময়ের অপেক্ষায়", "কর্ম করম", "ক্রমপাঠ", "কথকতা", "কৈলাস খামরির জীবন ও সময়") বাংলা উপন্যাস সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। "ক্রমপাঠ" উপন্যাসের জন্য ২০০২ সালে বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছেন।







একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ