বই পড়া : এলিফ শাফাকের উপন্যাস-- here Are Rivers in the Sky

 


 

এক ফোঁটা বৃষ্টির কাহিনি


রিটন খান

এলিফ শাফাকের উপন্যাস There Are Rivers in the Sky পড়ে শেষ করেছিলাম বেশ কিছু দিন হলো। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পড়ছি, কিন্তু…সেই প্রসঙ্গে পরে।

উপন্যাসটি একফোঁটা বৃষ্টির জলকে কেন্দ্র করে প্রকৃতি ও মানবসমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম আবহ নির্মাণ করা হয়েছে। একটিমাত্র জলের বিন্দু, যেন এক নিরীহ প্রতীক, কিন্তু তা বিস্তৃত করে জলবায়ু পরিবর্তন ও জলসঙ্কটের মতো বৃহত্তর বাস্তবতাকে। এই জলের ধারা যেখানে একদিকে প্রকৃতির অফুরন্ত দান বলে মনে হয়, সেখানে বাস্তবে তা হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্বেগের উৎস—বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের মতো অঞ্চলে, যেখানে পানীয় জলের সঙ্কট মারাত্মক। তিনি দেখান যে, জলের এই সঙ্কট কোনও দূরবর্তী বা বিমূর্ত সমস্যা নয়, বরং তা ঘরোয়া অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই প্রতিনিয়ত অনুভূত হয়। আর এই বোঝা সবচেয়ে বেশি বহন করে নারী ও শিশুরা—তাদের জীবনযাত্রা, দেহজ শ্রম ও দৈনন্দিন বাস্তবতার ভেতর জলসঙ্কট গেঁথে আছে।

লেখক তাঁর বয়ানে ফিরে যান প্রাচীন কাহিনিগুলির দিকে, বিশেষ করে অশুরবানিপাল নামের এক আশোরীয় রাজার চরিত্রে, যিনি তাঁর সুবিশাল গ্রন্থাগারের জন্য পরিচিত। এই রাজচরিত্র যেন মানবসভ্যতার জটিলতাকে প্রতিফলিত করে—জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ হলেও, ভেতরে লুকিয়ে থাকে নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার লোভ। তিনি এই কিংবদন্তিকে ব্যবহার করেন এটা দেখানোর জন্য যে, সাম্রাজ্য ও সভ্যতা যতই গৌরবময় হোক না কেন, তারা ক্ষণস্থায়ী। তাঁর অনুসন্ধানে প্রশ্ন জেগে ওঠে—প্রকৃতি ও জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কি টেকসই? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জলের প্রতীক তুলে ধরেন—যা যুগ যুগ ধরে ইতিহাস আর সময়ের ধারায় প্রবাহিত হলেও, আমরা সেটিকে উপেক্ষা করে যাই। সেই অবিরাম জলের ধারা যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সভ্যতার ক্ষণস্থায়িত্ব আর প্রকৃতির নিঃশব্দ ক্ষমতা।

তিনি তাঁর উপন্যাসে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের দুঃখগাথা উন্মোচন করেন—তাদের অতীতের উপর্যুপরি নিপীড়ন, আর সাম্প্রতিক গণহত্যার গভীর ক্ষত এই বয়ানে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই আখ্যান কেবল একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস নয়, বরং সংখ্যালঘুদের নিস্তব্ধ কণ্ঠস্বর ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির টিকে থাকার সংগ্রামের প্রতীক। ইয়াজিদিরা কেবল শারীরিক নিধন নয়, সাংস্কৃতিক মুছে যাওয়ার বিপরীতেও লড়ে—তাদের অস্তিত্ব এক ধরনের মৌন প্রতিরোধ। তিনি এই নিঃশব্দ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন—স্মৃতি শুধু অতীত নয়, বরং তা পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মুছে ফেলার যেকোনো প্রয়াসের বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য কিন্তু দৃঢ় প্রতিরক্ষা।

লেখকের বয়ানে ইতিহাস যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়—একটি চরিত্র এসে দাঁড়ায় জর্জ স্মিথের ছায়ায়, সেই ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ, যিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রাচীন ফলক আবিষ্কার করেছিলেন। চরিত্রটির অসাধারণ স্মৃতি আর অতীতের খোঁজে তার নিরলস নিষ্ঠা যেন আজকের জ্ঞানসন্ধানী মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি এইসব চরিত্রের মাধ্যমে তুলে আনেন হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানের প্রসঙ্গ—আর সেই জ্ঞান পুনরুদ্ধারে মানুষের ক্ষীণ কিন্তু অক্লান্ত প্রচেষ্টা। অতীত আর বর্তমানের মাঝে তিনি গড়ে তোলেন এক সেতুবন্ধ—যেখানে জল, একদিকে প্রতীক আর অন্যদিকে বাস্তব উপাদান, হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার এক অবিচ্ছেদ্য, প্রবাহমান সুতোর মতো।

উপন্যাসটি ইতিহাস ও বর্তমানকে জুড়ে দেয় জয়নাব ক্লার্ক নামের এক চরিত্রের মাধ্যমে—যিনি একজন জলবিজ্ঞানী, খুঁজে ফেরেন আধুনিক শহরের নিচ দিয়ে গোপনে প্রবাহিত হওয়া নদীগুলোর স্তর। এই লুকানো স্রোতের রূপকটি আমাদের চোখের আড়ালে থাকা সেই সব শক্তি ও ইতিহাসের কথা বলে, যেগুলো নিঃশব্দে গড়ে তোলে আমাদের বর্তমান। এলিফ শাফাক এই প্রেক্ষাপটে এনে ফেলেন পরিবেশ বিপর্যয় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার জটিলতা—আজকের শহরগুলো যেসব প্রাকৃতিক ধারার ওপর গড়ে উঠেছে, সেই পুরনো নদীখাত কিংবা জলাভূমি অনেক সময় চিহ্নহীন, ভুলে যাওয়া কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বদলে ফেলা হয়েছে। তার ফলে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায়, নগরজীবন আজ মুখোমুখি অনাকাঙ্ক্ষিত এক ভবিষ্যৎ।

এই উপন্যাসে জল যেন এক অনিবার্য বন্ধনী—যা সময় ও ভূগোলের সীমা ছাড়িয়ে বহু জীবন ও গল্পকে পরস্পরগ্রথিত করে। প্রতিটি চরিত্র যেন প্রবাহমান এক যৌথ ইতিহাস ও পরিবেশগত চক্রের অংশ—যেখানে ব্যক্তিগত আচরণও হয়ে ওঠে বৈশ্বিক প্রতিধ্বনি। এই আন্তঃসংযুক্ততার ভেতর দিয়ে পাঠক যেন মুখোমুখি হয় এক প্রশ্নের—এই বিস্তৃত নেটওয়ার্কে তার নিজস্ব অবস্থান কোথায়? পরিবেশের উপর নিজের প্রভাব কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়? উপন্যাসটি এক নিঃশব্দ আহ্বান জানায়—জলবায়ু সংকটের সমাধান শুধু প্রযুক্তি কিংবা বিজ্ঞানের হাতে নয়, এর গভীরে জড়িয়ে আছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা, যেগুলিকে একসূত্রে বোঝার প্রয়োজন আছে।

তিনি তাঁর উপন্যাসে স্মৃতিকে সমাজগত অগ্রগতির এক মৌলিক শর্ত হিসেবে তুলে ধরেন—তাঁর চরিত্রগুলো ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ইতিহাসের ভার বহন করে, যা বর্তমান বাস্তবতার গঠনকেই নির্ধারণ করে। তিনি দেখান—যতদিন আমরা প্রান্তিকদের গল্প মনে রাখি, ততদিন আমরা অতীতের ভুল থেকে শিখে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখি। আখ্যানের মাধ্যমে এলিফ শাফাক চেষ্টা করেন বিভক্ত সমাজের মাঝে সহমর্মিতা গড়ে তুলতে—ভুলে যাওয়া ইতিহাসের সঙ্গে পুনঃসংযোগ যেন এক প্রকার নিরাময়। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে কেবল সাহিত্য নয়, বরং সামাজিক ন্যায় ও যৌথ স্মৃতিচর্চার এক উপায়ে পরিণত করে।

উপন্যাসে এক গূঢ় ও প্রবাহমান থিম হল—ইতিহাস ও পরিবেশগত অবিচারের পারস্পরিক সম্পর্ক। তিনি অতীতের সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ড ও বর্তমানের পরিবেশ-অবহেলার মাঝে স্পষ্ট এক সাদৃশ্য খুঁজে পান। প্রাচীন ও আধুনিক ক্ষমতার দ্বারা সম্পদ, সংস্কৃতির নিদর্শন এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের যে ধারাবাহিকতা, তা যেন বিশ্বব্যাপী বৈষম্যের এক দীর্ঘ ছায়া। এই নিঃশব্দ চিত্রায়নের মাধ্যমে এলিফ শাফাক পাঠককে আহ্বান জানান—শুধু ইতিহাস জানার জন্য নয়, বরং তা থেকে শিখে, পুনরাবৃত্তিকে ঠেকিয়ে, একটি প্রথাগত শোষণের চক্র ভাঙার জন্য। তাঁর এই সাহিত্য-প্রয়াস আমাদের ভাবনার কেন্দ্রে আনে এক প্রয়োজনীয় প্রশ্ন—ব্যবস্থাগত পরিবর্তন ছাড়া কি আদৌ মুক্তি সম্ভব?

তাঁর আখ্যানের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন নারীদের—বিশেষত জলবঞ্চিত অঞ্চলে নারীর সঙ্গে জলের যে জটিল, প্রায় নীরব এক সম্পর্ক, তা তিনি অবারিত করে দেখান। নারীরা যেখানে জল ধরে রাখে, সেখানে তাদেরই কাঁধে চেপে বসে জলের খরা, দূরত্ব, আর ঝুঁকিপূর্ণ পথচলার ক্লান্তি। এই ভঙ্গিতে এলিফ শাফাক স্পর্শ করেন এক প্রগাঢ় উপপ্রবাহ—ইকোফেমিনিজম, যা দেখাতে চায় কীভাবে পরিবেশ ধ্বংস নারীদের উপর অনন্য এক প্রভাব ফেলে। তাঁর কাহিনি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—পরিবেশনীতি কি নারীর অভিজ্ঞতাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়? না কি এখানেও চলে পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্যের এক বিস্তৃত খেলা? এলিফ শাফাকের উপন্যাস এই প্রশ্নের ভেতর দিয়েই আহ্বান জানায় এক ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক পরিবেশ-ভাবনার প্রতি।

তাঁর বহুস্তরীয় কাহিনিচালনা কেবল সাহিত্যরসেই সীমাবদ্ধ নয়—তা এক সক্রিয় বিশ্বাস বহন করে, যে সাহিত্যই পারে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঞ্চার ঘটাতে। তাঁর বিশ্বাস, বই আমাদের শেখায় সহানুভূতি, অনুধাবন ও সংলাপ—যা জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে মানবাধিকার পর্যন্ত জটিল বিষয় বোঝার পূর্বশর্ত। পাঠকদের চরিত্র ও থিমগুলোর ভেতরে গভীরভাবে প্রবেশ করাতে চেয়ে, তিনি চান যেন এই পাঠ-অভিজ্ঞতা পরিণত হয় আত্মপুঙ্খানুপুঙ্খ অনুধ্যানে ও সচেতন পদক্ষেপে। তাঁর লেখালিখি যেন এক নীরব প্রতিবাদ, যা চিন্তাকে জাগিয়ে তোলে, অনুমানকে প্রশ্ন করে এবং আমাদের স্মরণ করায়—একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সংযুক্ত পৃথিবী গড়ার দায়িত্ব ব্যক্তির হাতেই।

এবার কিন্তুর প্রসঙ্গে আসি, বইটির সবচেয়ে বড় অসুবিধা এই যে, এর ভাষা অনেকাংশেই অকারণে ভারী হয়ে উঠেছে—যেন প্রতিটি বাক্য নিজেকে জাহির করতে চায়। সংলাপগুলো, বিশেষত কিছু চরিত্রের মুখে, এতটাই প্রাচুর্যে ভরা ও কাব্যময় যে, তাতে প্রাণের চেয়ে অলংকারই বেশি। মনে হয়, চরিত্রগুলো জন্ম থেকেই যেন দার্শনিক হয়ে উঠেছে, জীবনের প্রথম ধাপেই তারা যেন শব্দ নিয়ে ভাবতে বসেছে। এক জায়গায় এক চরিত্র বলে ওঠে, “শব্দ, তারা পাখির মতো—একবার মুক্তি দিলে উড়ে যায়…”—এই ধরণের উক্তি শুনে মনে পড়ে গাজীর গানের ছায়া, কিন্তু বর্তমান শহুরে প্রেক্ষাপটে তা যেন কৃত্রিম ও ভারসাম্যহীন ঠেকে। সবাই তো আর লালন ফকির নয়, নয়তো জীবনানন্দের পদচিহ্নে হাঁটা কোন এক বাউলচেতনা!

অবশ্য, কোথাও কোথাও এলিফ শাফাক তাঁর চিরচেনা রঙিন ভাষা ও প্রতীক ব্যবহারের জাদু ছড়িয়েছেন—নির্মাণ করেছেন এমন সব মুহূর্ত, যেখানে শব্দ ও অনুভূতির মাঝে এক অনুপম সেতুবন্ধ গড়ে ওঠে। কিন্তু সে জাদুও বারবার আটকে গেছে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ও অলৌকিক বর্ণনার অতিভারে। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের যন্ত্রণা ও ইতিহাসের তীব্রতা, যা হতে পারত এক নির্মম বাস্তবতার দর্পণ, তা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে রহস্যময়তায়—যেন কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক বেদনার কাহিনি, যার আবেগে পাঠক সম্পূর্ণভাবে সাড়া দিতে পারে না। এই ভার—যেখানে সাহিত্যিক অভিপ্রায় ও অলৌকিক কল্পনা একে অপরকে ঠেলে দেয়—তা যেন চরিত্রের রক্ত-মাংসের মানবিকতাকে ধুয়ে মুছে দেয়।

তবে যদি আপনি এলিফ শাফাকের আগের লেখা, যেমন The Forty Rules of Love বা The Bastard of Istanbul-এর প্রশান্ত অথচ আবেগময় রচনার প্রতি একধরনের দুর্বলতা পোষণ করেন, তাহলে এই বইটি আপনার পাঠ তালিকায় ঠাঁই পেতেই পারে। তার ভাষা, প্রতীক আর ইতিহাসের জাল একধরনের ধ্যানমগ্নতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি আপনি গল্পে চান একপ্রকার টানটান গতি, একটি জলধারার মতো স্মৃতিস্নাত বয়ান, যেখানে নদীর মতো বয়ে চলে ঘটনাপ্রবাহ—তাহলে হয়তো এই বই আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। তখন আপনাকে অন্য কোনও নদীর পাড়ে গিয়ে বসতে হতে পারে, অপেক্ষা করতে হতে পারে এমন একটি কাহিনির, যেটি হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তার রেশ রেখে যায় পাঠকের মনে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ