পর্ব : ১০
জলাভাবের কারণে আকবর ফতেপুর সিক্রি ছেড়ে লাহোরে চলে আসেন। জাহাঙ্গীরকে আগ্রা আর লাহোর থেকে অসুস্থ শরীরেও নানা জায়গায় বেড়াতে যেতে দেখা যায়। বাবা আকবরের মতোই তিনিও কাশ্মীরের অপূর্ব সৌন্দর্য সন্ধানে যেতেন। এক যাত্রাপথেই তাঁর মৃত্যু হল। শাজাহান তখতে বসলেন আগ্রায়। তিনি কি লাহোরে আর আসেনই না ? এর সপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। যা সু প্রমাণিত তা হল মোঘল বাদশাহদের পরিব্রাজক চরিত্র। গ্রেট মোঘলদের মধ্যে একদমই মদ-আফিং না ছোঁয়া ঔরঙ্গজেব আলমগীরকে তো সারা জীবন নানা যুদ্ধক্ষেত্রেই দেখা গেল। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজী এই বাদশাহকেও তখতে বসেই দিদি রোশেনারাকে নিয়ে কাশ্মীর বেড়াতে যেতে দেখা যায়। শুধু বাদশাহরা নয় গোটা মোঘল উজির-আমির-সেপাইসালার -জাগিরদার সবার মধ্যেই চলমানতার বৈশিষ্ট্য প্রকট।মোঘল আমলাশাহী ছিল একাধারে সামরিক আর প্রশাসনিক। শুধু দরবারে বসে হুকুমত চালানোর ব্যবস্থা ছিল না ,দরকারে এখানে সেখানে যুদ্ধেও যেতে হতো। এই করতে গিয়ে বীরবলের মতো গুরুত্বপূর্ণ সলাহকার দুর্গম উত্তর পশ্চিম সীমান্তে দুধর্ষ ইউসুফজাই যোদ্ধাদের হাতে এখনকার ভাষায় এম্বুশ বা চকিত আক্রমণে মারা পড়েন, সম্ভবত তাঁর বডিও হাপিশ হয়। আবুল ফজলের মতো রীতিমতো যুগন্ধর প্রতিভাবান দরবারীও শাহাজাদা সেলিমের বিদ্রোহের চক্করে নৃশংস ভাবে প্রাণ হারালেন।
মোঘল বাদশাহদের চলমানতা খুব সহজে পুরনো তিমুরিদ-তৈমুর বংশজ চারণকামিতা বলে ভুল হতে পারে কিন্তু আসলে গোটা মোঘল সাম্রাজ্যই ছিল প্রশিক্ষিত ভ্রাম্যমান সৈন্য সমাবেশ যার কেন্দ্রে শাহী ফৌজের সুবিশাল বহর। এমনকি দিল্লী আগ্রার মতো বড় বড় খানদানি শহরও শাহী বহরের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্থানীয় ক্ষমতা কেন্দ্রের ওপর কেন্দ্রীয় শাসনের পাকোড় বজায় রাখতে এই চক্কর কাটা দরকার।জন ওভিংটন ,সম্ভবত এক এংলো-আইরিশ সাহেব, সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে ভারতে আসেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজে চড়ে। ওই সাহেব সম্পর্কে বিশেষ জানা যায় না। তবে কোম্পানির পাদ্রি হয়ে এলেও যতদূর জানা যায় তিনি উনি স্থায়ী কর্মী ছিলেন না। একটা বই লেখেন 'এ ভয়েজ টু সুরাট ইন দা ইয়ার সিক্সটিন হান্ড্রেড এইটি নাইন ' তাতে মোঘল পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে।
জন ওভিংটন সাহেবের চোখে পড়ল মোঘল সালতানাতের কেন্দ্র আর পরিসীমার এক জটিল সম্পর্ক , (Mughal Warfare- Jos Gommons,page 107)
কোন কোন সময় সালতানাতের একদিকে জয় হাসিল করতে না করতে অন্য দিক হাতছাড়া হয়ে যায় , মোঘল চলমান শিবির কাছে থাকলে স্থানীয় রাজারা সুড়সুড় করে বশ্যতা মানে। যেই চলমান তাঁবু দূরে চলে যায় সেই রাজারাই অধীনতা অস্বীকার করে বসে। এই ডামাডোলে মোঘলদের বাড়ে ঝামেলা আর খরচের বোঝা।
একটা বিশাল ব্যাসার্ধে চলমান মোঘল দরবার ঘুরে বেড়াত। আবুল ফজল এর একটা হিসেবও দিয়েছেন। ওনার হিসেবে সালতানাতের এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরতে সময় লাগে এক বছর। দিল্লীকে কেন্দ্রে রেখে হিসেব করলে - গড় গতি ঘন্টায় আট কিলো মিটার ধরে আর মোট ঘোরার সময় ন মাসে ( বর্ষার তিন মাস বাদে) একহাজার দুশো কিলোমিটারের একটা ব্যাসার্ধ পাওয়া যায়। হিসেবটা আবুল ফজলের কাছাকাছিই।
তাছাড়া সালতানাতের মূল পথগুলো ব্যবহার যোগ্য রাখা আর পাহাড় ,জঙ্গল কেটে নতুন রাস্তা তৈরির জন্যও বাদশাহের ঘুরে বেড়ানো দরকার ছিল। পনেরোশো পঁচাশিতে আকবর ফরমান জারি করে আগ্রা দুর্গ বানানোর ওস্তাদ কাসিম খানকে কাবুলের কেল্লায় যাবার সিন্ধু নদ পর্যন্ত রাস্তা সমান করতে বলছেন , ব্রিজ বানাতে বলছেন যাতে খাইবার পাস দিয়ে হাতি ঘোড়া যেতে পারে। ওই একই বাস্তুকার পাহাড় কেটে কাশ্মীরের দুর্গম রাস্তা খুলে দেন। সে কাজে তিন হাজার পাথর কাটিয়ে , পাথর ফাটানোর মজুর আর দু হাজার গাঁইতি কোপানোর মজুরকে লাগানো হল। আগে যেখানে হেঁটে যাওয়াই দায় ছিল সেই পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে বাদশাহ বিশাল ফৌজ আর হাতি ঘোড়া নিয়ে গড়গড়িয়ে চলে গেলেন। আকবর ইরানের শাহকে চিঠি লিখে এই রাস্তা তৈরির বড়াই করছেন।
আবুল ফজল বললেন ,'' সব উপত্যকা জয় করা হয় , সব পাহাড় মাথা নোয়ায় , সব বিচ্ছিরি বাঁক সোজা হয় আর সব উঁচুনিচু পথ মাঠ করা হয়।''
পরবর্তীকালেও একই ভাবে পশ্চিম ঘাট পর্বতমালার দুর্গম অঞ্চল অথবা ওডিশার দুর্ভেদ্য টেরেনে মোঘল ফৌজ যায় আসে আর রাস্তা তৈরিও হয়ে যায় সেই সৈন্য চলাচলের পদরেখায়।
জোস গমন্স চার মোঘল বাদশাহরা কে কোথায় কতবার ছ মাসের বেশি একটানা থেকেছেন তার অঞ্চল ভিত্তিক হিসেবে দিয়েছেন ( যুদ্ধের অবরোধের সময় বাদ ) । প্রতি বাদশাহের মোট নিয়মমাফিক কার্যকালকে পাঁচ সংখ্যার স্কোয়ার রুট বা বর্গমূল হিসেবে গুনে মোটামুটি শতাংশের হিসেবে। (In round quinary percentages of the total period of regular government. -Mughal Warfare, Jos Gommons, page 102)
লক্ষণীয় যে পূর্বাঞ্চলে কোন বাদশাহই হয় আসেননি নয় ছ মাসের বেশি কখনই একটানা থাকেননি।আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুবই চোখে পড়ে তা হল অনবরত চলমান মোঘল বাদশাহদের কোন নির্দ্দিষ্ট রাজধানী না থাকা। রাজধানীতে ছ মাসের বেশি একটানা থাকার যে পঁয়ষট্টি শতাংশের গড় পাওয়া যাচ্ছে তার মধ্যে মধ্যাঞ্চল দিল্লী , আগ্রা বা ফতেপুর সিক্রিতে বাদশাহরা থিতু হয়েছেন চল্লিশ শতাংশ , উত্তরাঞ্চলের রাজধানী লাহোর ,কাশ্মীর ,কাবুল আর হাসান আবদালে দশ শতাংশ , দক্ষিণাঞ্চলের রাজধানীগুলো আজমের ,মান্ডু , বুরহানপুর বা সবচেয়ে সম্প্রাসরণকামী ঔরঙ্গজেব আলমগীরের গালগালা আর ইসলামপুরির স্থায়ী সেনা ছাউনিতে পনেরো শতাংশ। চলমান বাদশাহের তস্য নতুন নতুন রাজধানী খোঁজার চিরকেলে বাই মোঘল দরবারকেও তস্য তস্য চলমান করে তোলে।
উত্তরাঞ্চল কেন্দ্রিক সমরাভিযানের কারণে শাজাহানকে দক্ষিণাঞ্চলে কম দেখা যাচ্ছে। আগ্রা ছাড়া লাহোর আর কাবুলে তিনি বেশি সময় থিতু হলেন। তবে শাজাহান আগ্রাকেই তাঁর শাহী ক্ষমতা আর বৈভব দেখানোর কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করলেন। আর জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর একসময়ের সহ শাসক নূর জাহানকে অনবরত সালতানাতের এ কোনে সে কোনে ঘুরে বেড়ান ছেড়ে লাহোরেই মেয়ে লাডলি বেগমের সঙ্গে দিন কাটাতে দেখা গেল।মোঘল ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁর শাহী হারেমেই থাকার কথা সে ক্ষেত্রে হয়ত ক্ষমতাবৃত্তে কিছু পরামর্শ দান করার সুযোগও থাকত। কিন্তু নূর জাহান বেছে নিলেন একলা থাকার রাস্তা। শাজাহান তাঁর জন্য বছরে দু লাখ টাকার পেনশনের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া মনসবদারির হিসেবে তাঁর পদ ছিল তিরিশ হাজারি যা তাঁর বাবা গিয়াস বেগ - ইতি মদ দৌলার থেকেও বেশি , প্রচুর জমিজিরেতের নবাব ছিলেন নূর জাহান।সেসব আমৃত্যু তাঁরই মালিকানায় ছিল।ব্যবসা করেও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর বছর, ষোলোশো সাতাশের মধ্যেই অনেক টাকাপয়সাও করে থাকবেন তিনি। নানা আয়ের উৎসের দেখভাল আর গরীবদুঃখীর জন্য দানধ্যান করে লাহোরেই সময় কাটিয়ে দিলেন তিনি । নূর জাহান ছিলেন কুশলী স্থপতি, বাবা -মায়ের অপূর্ব সমাধি সৌধ বানানোর উদ্যাগ নিয়েছিলেন আগেই। আগ্রায় এই সমাধি তৈরির কাজ ষোলোশো বাইশে জাহাঙ্গীরের আমলে শুরু হয়ে শেষ হল ষোলোশো আটাশে অর্থাৎ শাজাহানের রাজত্বকালে। এর পুরো তত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন নূর জাহান এটা স্বীকৃত । এই বিরাট কর্মযজ্ঞের শুরুটায় তাঁর ভূমিকা অনুমেয় কারণ তিনি নিজেই ছিলেন সহ শাসক কিন্তু জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর সমাধি সৌধ নির্মাণের শেষ পর্যায়ে নূর জাহান কী ভাবে তাঁর ভূমিকা পালন করেন তা পরিষ্কার নয়। লাহোর জাহাঙ্গীরের স্মৃতি সৌধও তাঁর দক্ষতার সাক্ষী হয়ে আছে। ষোলোশো আঠাশ থেকে আটতিরিশের মধ্যে এই স্থাপত্যের নির্মাণ হয়।
লিখিত প্রমাণ বলে শাজাহানের সময়ই স্থাপত্য সচেতনতা চরমে যায় । যে কোন শাহী স্থাপত্য নির্মাণ ছিল বাদশাহের তত্ত্বাবধানে একদল কুশলী স্থপতি , বাস্তুকারের যৌথপ্রয়াস।তাঁদের মধ্যে ছিলেন জাহাঙ্গীর আমলের প্রধান স্থপতি মির আব্দাল করিম আর মাকরামত খান , এঁনারা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ মোঘল আমিরও ছিলেন। শুধুই স্থাপত্য কাজে নিয়োজিতপ্রাণ ছিলেন ওস্তাদ আহমদ লাহোরি আর ওস্তাদ হামিদ, প্রথমজন তাজমহল বানিয়েছিলেন বলে জানা যাচ্ছে। সে সময়ের সরকারি তারিখে সব নির্মানেরই , এমনকি সামগ্রিক সব পরিকল্পনারও কৃতিত্ব পেতেন বাদশাহ, যদিও পরে ইতিহাসকাররা নাম করেছেন অন্য অনেকেরই যাঁরা বাস্তব নির্মাণের কৃতিত্বের দাবিদার।জাহাঙ্গীরের স্মৃতি সৌধ নির্মাণেও সব কৃতিত্ব বাদশাহের বলে দাবি করা হয়েছে নূর জাহানের প্রত্যক্ষ ভূমিকাকে অস্বীকার করে। তবে এটা সত্যি যে অন্য স্থাপত্যের মতো জাহাঙ্গীরের স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা হয় শাহী অনুদানেই।
জাহাঙ্গীরের স্মৃতি সৌধ নির্মাণে নূর জাহানের স্মৃতি ও সত্তা যে জড়িয়ে ছিল তার প্রমাণ হল বাদশাহের অন্তিম ইচ্ছেকে মর্যাদা দেওয়া এর অনন্য স্থাপত্য কল্পনা। খুব কিছু ধর্মানুরাগী না হলেও জাহাঙ্গীরের ইচ্ছে ছিল এমন একটা সৌধে তিনি অন্তিম শয়ানে থাকবেন যাতে স্বর্গের সঙ্গে এক খোলা আকাশ যোগাযোগ হয়। নূর জাহান এই আকাশের প্রত্যাশা পূরণ করলেন বিশালকায় ভিতের ওপর প্রথাগত প্লাটফর্মের অনন্য কারুকাজে ঢাকা কবর তৈরি করে যার মাথার ওপর আছে ছাদ কিন্তু খোলা আকাশের মেঘ আর হাওয়া ছুঁয়ে সূর্যের তাপ নেয় চার কোনায় চারটে অলংকৃত মিনার , তারাই যোগাযোগ রাখে বাদশাহের সঙ্গে স্বর্গলোকের, ঐশ্বরিক করুণাধারা বর্ষিত হয় চার মিনারের কোল বেয়ে। লাহোরের শাহধারা বাগের ভিতরেই জাহাঙ্গীরের সৌধ ছাড়িয়ে কিছুটা খোলা জমি ধরে এগিয়ে গিয়ে নূর জাহান নিজের স্মৃতি সৌধ নিজেই বানিয়েছিলেন। সেটাও জাহাঙ্গীরের সৌধের মতো একই ধাঁচের। তফাৎ হল তা আকারে ছোট আর ওপরে চারটে মিনার নেই। লাহোর পেশওয়ার রেল রাস্তা বানানোর সময় ব্রিটিশরা জাহাঙ্গীর আর নূর জাহানের স্মৃতি সৌধ বিচ্ছিন্ন করে রেললাইন পেতে। অবশ্য আগেই ষোলোশো পঁয়তাল্লিশে আঠেরোই নভেম্বর নূর জাহান মারা গেলে তাঁর বানানো স্মৃতি সৌধে তাঁকে কবর দেওয়া হয়েছিল । মোঘল হারেমের বিদূষী ,শক্তিশালী , প্রতিভাবান , ইতিহাসে অমর নারীদের তালিকা দিন দিন বড় হচ্ছে নারীবাদী গবেষণায়। খানজাদা , গুলবদন বেগম , হরখা বাই -মারিয়াম উজ জামানি , নূর জাহান , জাহানারা ,কবি শ্রেষ্ট জেব উন্নিসা বেগম মাখফি । তবে সহ শাসকের ভূমিকায় দেখা গেছে নূর জাহানকেই। শেষমেশ এর স্বীকৃতি দিয়েছিলেন শাজাহান।
নূর জাহান সম্পর্কে শাজাহান নামায় লেখা হল
লাহোর শহরে , মহান স্বামীহারা বেগম নূর জাহান,এমন এক উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি যে যাঁর সম্পর্কে কোন স্তুতিই করার অপেক্ষা করে না, বাহাত্তর বছরে স্বর্গারোহণ করলেন। খ্যাতনামা বেগম ছিলেন ইতি মদ দৌলার কন্যারত্ন আর ইয়ামিন আল দৌলার ( আসফ খান) ভগিনী। স্বর্গত শাহেনশাহের রাজত্বের ষষ্ট বছর থেকে , যে সময় উনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন , তখন থেকেই শাহেনশাহের ওপর তাঁর প্রভাব এতটাই ছিল যে সালতানাতের রাশ ছিল তাঁরই হাতে আর সমস্ত দেওয়ানি আর আর্থিক বন্দোবস্ত তাঁর পরিচালনাতেই হত , শাহেনশাহের পুরো সময়কালে তাঁর জবরদস্ত কর্তৃত্ব বজায় ছিল।
নূর জাহানের মেয়ে লাডলি বেগম সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। লাডলি তাঁর মায়ের সঙ্গেই থাকতেন আর মৃত্যুর পর মায়ের পাশেই সমাধিস্থ হচ্ছেন।নূর জাহানের ধারাবাহিকতা , তাঁর মৃত্যুর পর ভাইঝি মুমতাজের মেয়ে জাহানারার মধ্যে সঞ্চালিত হল একটু অন্য ভাবে। জাহানারা জন্মান ষোলোশো চোদ্দতে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পিসি দিদা নূর জাহানকে নানা কার্যকলাপে নেতৃত্ব দিতে দেখে থাকবেন। সেসব তাঁকে প্রভাবিত করাই স্বাভাবিক।
লোকের মনে শাজাহান মানে আগ্রা আর লাহোর মানে শাহাদারা বাগ। আর শাহাদারা বাগ মানে জাহাঙ্গীরের সমাধি -নূর জাহানের সমাধি -আকবরি সরাই -আসফ খানের সমাধি।হয়তো কখনো মাঠ ছিল। বানজারার ছাগল চরতো। রায়ত আর তার বউ চাষ দিয়েছিল। পেশাদার সৈন্যরা , চাষ ভুলে যারা যুদ্ধই করে চলে, সেই ক্ষেতে আগুনও দিয়েছিল যুদ্ধের তরিকায়। এখনো হয়তো অপূর্ব স্থাপত্য দেখে দেখে লোকে সেই মাঠ আর ক্ষেতের কথাই ভাবে , মনে মনে কল্পনা করে কী ছিল , কখন ছিল আর কে কে ছিল -এই সবই তাদের মনে।
---- লোকের মনে তো কত কীই…..
----- কোন কিছুই এমনি এমনি হয় না।
----- তা বটে।
----- কিছু বার্তা শূন্যে রয়ে যায়।
----- মানে ?
----- মাঠ জুড়ে তারা কথা বলে।
----- আর এতো যে স্থাপত্য , এতো প্রাসাদ ,সেখানে হারেম , গুমঘর , সুড়ঙ্গ , তলোয়ার আর তার তীক্ষ্ণ ধার ?
----- সবার আগে মাঠ। যে মাঠে কিছুই হয়নি।
----- জমে গেছে ! তারপর ?
----- তারপর সে মাঠে যুদ্ধ হল , স্থাপত্য হল , বাদশাহী জমক হল , ঠমক হল ,মাঠ আর থাকল কি ?
----- কী করে থাকবে মাঠ ? ভুলে যাচ্ছ মাঠও তৈরি হয়। আর ….
----- আর ?
----- তা করেন রাজা -বাদশাহ।
----- সমান মাঠের কথা বলছি না।
-----বটে !
----- এবড়ো খেবড়ো এক মাঠের কথা বলছি , সে মাঠ রায়তের -চাষীর। সে মাঠে চাষ হচ্ছে।
----- আশপাশে কোন রাজা নেই - বাদশাহ ?
-----হ্যাঁ। একজন…
----- আছে ?
-----হ্যাঁ।
----- আছে একজনও ?
----- তাঁকে দেখা যাবে।
-----যাবে ?
-----হ্যাঁ।
----- কে সে ?
----- একজন রাজা।
----- আর বাদশাহ ?
----- একজন রাজাকে দেখা যাবে , তিনি রায়তের রাজা ।
----- আর বাদশাহ ?
----- তিনি দ্রুতগামী ঘোড়ার সওয়ার। তার ফৌজ লুকিয়েছে , এবার শুরু করবে…..
----- আর বাদশাহ ?
----- বাদশাহের ফৌজ অনেক বড় , বাদশাহ পণ্ডিত ব্যক্তি , সারাটা জীবন ধরে আইনের ব্যাখ্যা আর তার পূর্বাপর প্রয়োগ তাঁর অভীষ্ট তবু তিনি রায়তকে দেখতে পান না। কিছুতেই পান না। তাঁর অনেক আড়াল। সে সব পেরিয়ে অনেক দূর থেকে আর যাই হোক রায়তের দেখা মেলে না।
----- কী সব বলছ ?
----- রায়তের -চাষীর রাজার কথা বলছি আর আইনের বাদশাহের কথা বলছি।
----- রায়তের -চাষীর রাজার কথা আর আইনের বাদশাহের কথা ?
----- বলছি ছাত্রপতি শিবাজি মহারাজের কথা , বলছি ঔরঙ্গজেব আলমগীরের কথা।
----- তাই বল ! বাইনারি ! তুড়িতে উড়ে যায় কথা ও বার্তা !
----- এত সোজা কি ?
----- মানে ?
----- এত সোজা তাঁদের কথা বলা ?
----- কেন ?
----- রায়তের রাজার কথা বলেছিলেন গোবিন্দ পানসারে। হু ওয়াজ শিবাজি ? মারা গেলেন চাষীর রাজার কথা উচ্চারণ করায়। বুলেট ফুঁড়ে দিল।
----- কেন ?
----- দেয়।
----- কী ?
----- ফুঁড়ে দেয়।
----- কী ?
----- বুলেট।
----- আর আইনের বাদশাহের কথা বললে ?
----- ভোগীরা মানছে না ! সবাই সরিয়ত সরিয়ত করে উঠছে !
---- ভোগী ?
----- উঁহু, ভোগীরা।
----- কিসের ?
----- ধর্মের।
----- কোন ধর্ম ?
----- ধর্ম কটা ?
----- অনেক।
----- ভোগীও অনেক।
----- বলছ ?
----- যা বাব্বা ! বললে তো তুমি !
----- আমাকে দিয়েই বলাবে ?
----- ঠিক তাই !
----- তাহলে বলতেও হবে কিন্তু।
----- কী ?
----- রাজা আর বাদশাহের কি দেখা হল ?
----- বলাবেই ?
----- অবশ্যই।
----- তা হলে শোন।
----- বল।
----- দুর্গম দক্ষিণাত্যের টেরেনে রাজার দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার আর ধীরে চলা বাদশাহের বাহিনীর দেখা প্রায়ই হতে থাকে। অবশ্য সে অনেক পরের কথা।
শাজাহানের তখতে বসার ব্যাপারটা দুটো শহরের দিক থেকে দেখা যেতে পারে ক্ষমতা দখলের যাবতীয় সংঘর্ষ লাহোর থেকে পরিচালনা করেছিলেন তাঁর শ্বশুর আসফ খান। পুতুল বাদশাহ দাওয়ার বক্সও যত দিন ছিলেন লাহোরেই তখতে বসেছিলেন আসফেরই ছত্রছায়ায় । সে সময় দাক্ষিণাত্য থেকে মহবত খানকে নিয়ে, বিশাল ফৌজ সহ আগ্রার দিকে এগোচ্ছিলেন শাহজাহান নিজে।মুমতাজ ও অন্য বেগমরাও শাহী বহরে ছিলেন ধরে নেওয়া যায়। আগ্রায় শাহজাহানের পৌঁছন , তখতের দাবি প্রতিষ্ঠা ও বৈধতা আদায়ে সামরিক সমাবেশ ছাড়া আরো কিছু করার দাবি করে। যেমন উলেমাদের নিজের দিকে টানা , আমির ওমরাহদের , রাজাদের সমর্থন অর্জন। সেসব তিনি হয় দাক্ষিণাত্য থেকে তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথে, ষোলোশো সাতাশের নভেম্বরের শেষ থেকে দু আড়াই মাসের যাত্রায়, বিভিন্ন জায়গায় থেমে বা নিজস্ব শাহাজাদা মহলের রাজা বাহাদুরের মতো খাস-বিশ্বস্ত লোকেদের লাগিয়ে, সর্বোপরি বিদ্রোহের তৎপরতার সময়েই আগে থাকতে সেরে ফেলেন যা পরিসমাপ্তি পেল আগ্রায় ঢুকে । লাহোরের কেল্লায় রক্তস্নানের দিন ষোলোশো আঠাশের দোসরা ফেব্রুয়ারির অনেক আগেই আসফও লাহোর ছেড়ে তাঁর তিন নাতিকে নিয়ে আগ্রার দিকে রওনা দিয়েছিলেন কারণ বিচিত্রের আঁকা সমারোহের ছবি অনুযায়ী ঠিক তার পরের দিনই তেসরা ফেব্রুয়ারি তাঁরা শাজাহানের তখতে বসার উৎসবে আগ্রার দরবারে উপস্থিত। ছেলেদের ফিরে পেয়ে মুমতাজ , ধাত্রী মাতা সহ গোটা জেনানাও উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। তবে সেসব নিয়ে যথারীতি কোথাও কিছু লেখা নেই।
দীর্ঘ সময় ধরে বাবার বিদ্রোহের ঝড়ঝাপটা ঔরঙ্গজেব সহ অন্য শাহাজাদাদের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রশিক্ষণে নিশ্চয়ই বাধা সৃষ্টি করে। প্রায় দু বছর তো ঔরঙ্গজেবকে একরকম পণবন্দী হিসেবেই কাটাতে হয়। মোঘল শাহাজাদাদের ঠিকঠাক তৈরি করার জন্য একজন দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ করার প্রথা ছিল। প্রাচীন তিমুরিদ ঐতিহ্যে তাঁদের বলা হতো আতালিক। একজন আতালিক নিছক মাস্টারমশাই গোছের কিছু ছিলেন না , শাহাজাদাদের মোঘল সালতানাতের সামরিক আর রাজনৈতিক ভূমিকা রাখারও উপযুক্ত করে তুলতেন। এমনকি কোন শাহাজাদা ছোট বয়সে তখতে বসলে নাবালক বাদশাহের হয়ে শাসনও চালাতেন। বৈরাম খানের মতো বিরাট মাপের সেপাইসালার ,প্রশাসককেও আকবরের আতালিক হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ঔরঙ্গজেবের আতালিক কে ছিলেন ? আচার্য যদুনাথ সরকার একাধিক পারসিক ও অন্য সূত্রের মত উল্লেখ করে আবার কিছু মত খণ্ডনও করেছেন এ প্রশ্নে। ঔরঙ্গজেবের শিক্ষক হিসেবে তিনি মানলেন শাজাহানের গুরুত্বপূর্ণ উজির সাদুল্লাহ খানের কথা আর বিখ্যাত হাকিম আলি গিলানির শিষ্য মির মুহম্মদ হাসিমের কথাও -যিনি আবার আহমেদাবাদে নামকরা ইস্কুল চালাতেন , পরে কাজি হন। যদুনাথ ঔরঙ্গজেবের শিক্ষক হিসেবে ফরাসি চিকিসক , পর্যটক বার্নিয়েরর বলা মোল্লা সালিহকে খারিজ করেছেন। জীবনীকার অদ্রে ট্রুসকে ঔরঙ্গজেবের প্রশিক্ষক বা আতালিক কে ছিলেন এ ব্যাপারে কিছু বলছেন না।বোঝা যাচ্ছে হয়তো বিশেষ কেউ একজন না হয়ে সামরিক ,প্রশাসনিক, শিক্ষা , ইসলামি আইন ,ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একাধিক লোক ঔরঙ্গজেবের শৈশব –কৈশোরের প্রশিক্ষণে যুক্ত ছিলেন। ঔরঙ্গজেব দ্রুত পড়ুয়া আর মেধাবী ছাত্র ছিলেন। আরবী আর ফার্সি লিখতেন ও পড়তেন যে কোন পণ্ডিতের মতোই । এসবের প্রমাণ রয়েছে তাঁর লেখা দুহাজারের মতো লভ্য চিঠিগুলোর ছত্রে ছত্রে। ছ প্রজন্মের মোঘল শাহী খানদানের লোকজন প্রকৃত অর্থে গঙ্গা যামুনি তেহজিব -সংস্কৃতির মিশ্র ভারতীয় ঐতিহ্য বহন করত। সেসময় পারিবারিক স্তরে হিন্দুস্থানিতে কথা বলতো তারা । হিন্দিও ভালোই জানতেন ঔরঙ্গজেব , বলতে তো পারতেনই , প্রবাদের ছড়া কাটতেও দেখা গেছে। সে অর্থে সেসময়ের দেবনাগরী লিপিতে সাহিত্যিক ভাষা ব্রজভাষাও ঔরঙ্গজেবের অনায়াত্ত থাকার কথা কি ? অদ্রে ট্রুসকের মত হল –ঔরঙ্গজেব আলবাত জানতেন ব্রজভাষা।এই ভাষায় প্রথাগত শিক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। ব্রজভাষায় ঔরঙ্গজেবের কিছু লেখার কথাও বলছেন জীবনীকার । সেগুলো সম্ভবত কবিতাই হবে। এই ঐতিহ্য মোঘল বাদশাহদের ছিল। ইতিহাসকার রুচিকা শর্মার মতে বীরবল মারা গেলে আকবর দুঃখ প্রকাশ করে একটা চার লাইনের কবিতা লেখেন ব্রজভাষায়। কবিতাটা এরকম :
দীন জান সব দীন এক দুরায়ো দুসহ দুখ।সো শ্রব হমকো দীন কছু নহি রাখো বীরবর। ।পিথল সু মজলিস গই তানসেন সু রাগ।হঁসবো রমবো বোলবো গয়ো বীরবর সাথ। ।
পরে ব্রজভাষা,ওয়ধি , খড়ি বলি ,হারিয়ানভি ,দিল্লীর উপভাষা দিলভি মিলেমিশে ঘন্ট হয়েই এখনকার হিন্দিতে রূপ পায়।
----- দাঁড়াও , দাঁড়াও।
----- দাঁড়ালাম। এবার বল।
----- বলছি মোঘল আদি পুরুষদের ভাষা কী ছিল ?
----- কেন চাগতাই তুর্কি।
----- তবে ?
----- কী তবে ?
----- চাগতাই তুর্কির কী হল ?
----- কী হবে ?
----- ঔরঙ্গজেব কি চাগতাই তুর্কি জানতেন না ?
----- তাঁর পঠনপাঠনে কোন উল্লেখ নেই। তবে….
----- কী তবে ?
হিস্ট্রি অফ ঔরঙ্গজেব বইয়ের প্রথম খণ্ড তিন পাতায় আচার্য যদুনাথ সরকার ঔরঙ্গজেব আর রাজা জয় সিংহ দুজনেরই চাগতাই তুর্কি ভাষা শেখার বেত্তান্ত একই বলেছেন
‘’তিনি চাগতাই তুর্কিতে দক্ষতা অর্জন করলেন বাল্খ আর কান্দাহারে গিয়ে গিয়ে আর মোঘল ফৌজে তো প্রচুর মধ্য এশিয়রা ছিলই। একই ভাবে জয় সিংহও ওই ভাষা শেখেন।‘’
----- মানেটা কী দাঁড়াল ?
----- মানে হল ঔরঙ্গজেব আর রাজা জয় সিংহ দুই আনাড়ি ভিনদেশে পলিটিক্যাল এসাইনমেন্টে গিয়ে ঠেকায় পড়ে চাগতাই তুর্কি শিখছেন।
----- যা মোঘলরা তো ভিন দেশি। তাদের দেশ গাঁয়ের ভাষা চাগতাই তুর্কি।
----- ছ পুরুষ পরে এইরকমই তুর্কি ছিলেন আরকি ঔরঙ্গজেব !
----- কী রকম ?
----- যতটা তুর্কি কাছওয়া রাজপুত রাজা জয় সিংহ ! ততটাই চাগতাই তুর্কি মহান তিমুরিদ শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব !
----- এতো আচ্ছা গল্প!
----- দুই আনাড়িরও বটে !
----- আচ্ছা ঔরঙ্গজেবের গায়ের রঙ কেমন ছিল ?
----- অনেকটা জয় সিংহের মতোই , কালোর দিকে। তার ওপর রোদ পরে পড়ে আরো এক পোঁচ দু পোঁচ তো বটেই !
----- তাহলে কতখানি মোঘল ছিলেন ঔরঙ্গজেব ?
----- ছ পুরুষ বাদে আমির খুসরুর দেশ হিন্দুস্থানে গঙ্গা যামুনি তেহজিবের আকর্ষক পরিমণ্ডলে যতটা থাকা সম্ভব ঠিক ততটাই।
------ এতো ঘুরিয়ে সাংস্কৃতিক হেজেমনির কথা বলা হচ্ছে !
------ কেন নয় ? গঙ্গা যামুনি তেহজিবের কথা খুসরুর কথা - হিন্দুস্থানী সংস্কৃতির বাধ্যতা ,বাদশাহের জন্যও বাধ্যতা -সে ঔরঙ্গজেব হলেও।
------ ঔরঙ্গজেব হলেও ?
শাহাজাদা ঔরঙ্গজেবের সিলেবাসটা কেমন ছিল ? ইসলামী ধর্মের বই - কোরান, পয়গম্বরের বাণী হাদিস আর ধর্মগুরুদের জীবনী, অটোমান তুর্কি ভাষার সাহিত্য।মোঘল শাহজাদাদের পারসিক চিরায়ত সাহিত্য পাঠে বিশেষ জোর দেওয়া হতো যেমন সাদি,নাসিরুদ্দিন তুসি আর হাফিজের সব লেখা। শোনা যায় ঔরঙ্গজেব ‘পারস্যের কোরান’ বলে কথিত সুফি চিন্তার আকর গ্রন্থ রুমির মনসবির খুব ভক্ত ছিলেন । এইসব বইপত্তরে বলা নীতি আর মূল্যবোধের পাহাড় শাহজাদাদের মগজে ঠাসার এই প্রোজেক্ট থেকে তাঁদের ন্যায় বিধান , আদব কায়দা আর আখলাক বা নৈতিকতার বৈধ মানদণ্ড নির্মাণ হতে থাকত। আকবর প্রবর্তিত মিশ্র ঐতিহ্যের ধারায় ট্রুসকে অনুমান করছেন রামায়ন , মহাভারতের ফার্সি অনুবাদ পড়েছেন ঔরঙ্গজেব। আকবর মনে করতেন মহাভারতের কাহিনী শাহজাদাদের সমৃদ্ধ করবে। নাসিরুদ্দিন তুসির আখলাক ই নাসিরি লেখা হয়েছিল এরিস্টটলের নেকমাকিয়ান এথিক্সের প্রভাবে। ওই বইটা শাহাজাদাদের রাষ্ট্রীয় নীতিজ্ঞান ও মতাদর্শ শিক্ষার মূল কথা শেখাত আর তা ছিল সার্বজনীন সার্বভৌমত্ব যার কেন্দ্রে স্বর্গীয় আশীর্বাদপুষ্ট বাদশাহ আর যা বহুত্বকে আত্মস্থ করতে সক্ষম অথচ সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আর ন্যায় বিধানে নির্মমতম। এই শিক্ষের ফল কী হতো তার সবচেয়ে ভায়োলেন্ট নমুনা হল আকবরের চিত্তোর কেল্লা দখল।
----- কেমন ?
----- এটা বলছেন আবুল ফজল।
----- আবুল ফজল কি যুদ্ধ করতেন ?
----- আবুল ফজলকে যুদ্ধের অধিক কিছু করতে হয় চিতোরের কেল্লা দখলের সময়।
----- কী সেটা ?
----- কাতিল ই আম বা গণহত্যার পক্ষে দাঁড়ালেন আবুল ফজল।
----- যেমন এখনো দাঁড়ানো হয়।
----- যেমন এখনো দাঁড়ানো হয়। তবে চতুর্দশ শতকে চিতোরের কেল্লা দখলের সময় আল্লাউদ্দিন খিলজি কিন্তু কেল্লার ভেতর জড়ো হওয়া কৃষকদের কিছু করেন না। তাঁরা ময়দানে জংয়ে ছিলেন এটা মনে করেন না সুলতান কিন্তু মোঘল রাষ্ট্রীয় নীতিজ্ঞান আবুল ফজলকে শেখাচ্ছে
----- কী শেখাচ্ছে ?
----- কৃষকরা মোঘল ফৌজের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছিল।
----- হয়েছিল কি ?
----- হলেও বা আনপড় সেপাই কি আসলি সেপাই হতে পারে ?
----- তা কি করে হবে ?
----- আকবর মনে করেছিলেন সবাই সেপাইয়ের মতো ব্যবহার করেছে তাই কাতিল ই আমের অর্ডার দিলেন। তিরিশ হাজার মেয়ে, মদ্দ ,বাচ্চা কৃষক কচুকাটা হলেন রাজপুত ফৌজের সঙ্গে।
----- একসঙ্গে ?
----- একসঙ্গে। যাকে গণহত্যা বলে।
----- আকবর তো ভালো রাজা !
----- আকবর গণহত্যার অর্ডার দিলে নাসিরুদ্দিন তুসির ব্যাখ্যাতা আবুল ফজল তাকে সমর্থন করছেন।
----- আকবর তো ভালো রাজা। আলাউদ্দিন খিলজি খুব খারাপ।
----- আকবর গণহত্যার অর্ডার দিলে নাসিরুদ্দিন তুসির ব্যাখ্যাতা আবুল ফজল তাকে সমর্থন করছেন।
----- আকবর তো ভালো রাজা। ঔরঙ্গজেব খুব খারাপ।
----- আকবর গণহত্যার অর্ডার দিলে নাসিরুদ্দিন তুসির ব্যাখ্যাতা আবুল ফজল তাকে সম সমর্থন করছেন।
----- আকবর তো ভালো রাজা। নেহেরু বলেছেন ঔরঙ্গজেব ঘড়ির কাঁটাকে পেছনে নিয়েছেন।
----- আকবর গণহত্যার অর্ডার দিলে নাসিরুদ্দিন তুসির ব্যাখ্যাতা আবুল ফজল তাকে সমর্থন করছেন।
----- তা হলে আকবর ভালো আর ঔরঙ্গজেব খারাপ এই বাইনারির কী হবে ?
----- বাইনারির কী হয় ?
----- বাইনারির কিছু হয় না , যারা তৈরি করে তারাও জানে।
----- আকবর -ঔরঙ্গজেব বা আকবর -আলাউদ্দিন খিলজি , বাদশাহদের বাইনারিতে বাদশাহের কিছু হয় কি ?
এছাড়াও তলোয়ার , ছুরি খেলা, বর্শা ছোঁড়া, মাস্কেট-গাদা বন্দুক চালানো, যুদ্ধ কৌশল আর রাজপাট চালানর প্রশাসনিক দক্ষতা অর্জনের ব্যাপারে অন্য শাহজাদার মতো ঔরঙ্গজেবও প্রশিক্ষণ পান।
বিশেষ করে তীর চালানোর ব্যাপারটা মোঘলদের আলাদা রকমের মধ্য এশীয় পারদর্শিতা ছিল।দ্রুত গতি ঘোড়ার পিঠে চেপে বিশেষ রকমের বেঁকানো ধনুক দিয়ে অসম্ভব জোরে ছাড়া তীর ফতে করত শতেক জং। ভারতীয় প্রথাগত ধনুক যার মধ্যে মারাঠাদের ব্যবহৃত ধনুকও পড়ে , ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বাঁশ দিয়ে বানানো যা মধ্য এশীয় বা পারসিক কম্পোজিট ধনুকের থেকে কমজোরি।ভারতীয় আবহাওয়ায় মধ্য এশীয় তরিকায় বানানো ধনুক নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকত। বাবর খুবই চিন্তিত ছিলেন বৃষ্টিতে তাঁর কাঠ , জন্তুর সিং আর মাংস পেশির শক্ত টেন্ডন দিয়ে তৈরি করা দামি দামি সব বিভিন্ন ওজনের ধনুক না নষ্ট হয়ে যায়।কম্পোজিট ধনুক তৈরি করতে অনেক সময় নিত, খানিকটা মধ্য এশীয় আবহাওয়া নির্ভর এর নির্মাণ কায়দা । এক একটা ধনুক বানাতে লাগত এক বছর , জোড় লাগানোর জোরালো প্রাকৃতিক আঠা শুখতেই লেগে যায় মাস তিনেকের ঠাণ্ডা। তারপর আবহাওয়া গরম থাকতে হবে মাংস পেশির শক্ত টেন্ডন আটকানোর জন্য - অনেক ফ্যাচাং। আর্দ্রতা আটকানোর জন্য পুরো ধনুকটা চামড়ায় মুড়ে রেখে দিতে বা ভালো করে গালা পালিশ চড়াতে হতো। পরবর্তী কালে, ঔরঙ্গজেবের সময়েও, সালতানাত বড় হতে , ফৌজের চাহিদা বেড়ে গেলে মোঘলরা ইস্পাতের শক্তিশালী ধনুক ব্যবহার করে।
কেমন ছিল এই কম্পোজিট ধনুকের ভেদ ক্ষমতা ?
জোস গমন্স দূরত্ব , ধনুকের আকার-ওজন , তীরের ফলার ধরণ আর কোন এঙ্গেলে ভেদ করছে তার নিরিখে দেখাচ্ছেন - একশো মিটারের মধ্যে , তিরিশ কিলোর সাধারণ ধনুক থেকে ইস্পাতেরফলা লাগানো তীর বেরিয়ে যদি নব্বই ডিগ্রিতে সোজা মারে যে কোন বর্মের রক্ষা কবচ ভেদ করে দেবে। ধনুকের আর তীরের ওজন যত বেশি হবে ততো ভেদ ক্ষমতা বাড়বে।
ঘোড়সওয়ার -ওস্তাদ তীরন্দাজির ভয়ানক মধ্য এশীয় কায়দা সকলের কম্মো নয়। একই সঙ্গে তুখোড় ঘোড়সওয়ার আর তীরন্দাজ না হলে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে মাদারির খেল দেখিয়ে ভারী ভারী ধনুক থেকে নিখুঁত তীর মারাও সম্ভব নয়। মধ্য এশীয় যাযাবর ঘোড়সওয়ার যোদ্ধাদের দিয়েই এই বিশেষ ফৌজ গঠন সম্ভব। ঔরঙ্গজেবের সময় এই সব লড়ুয়েরা মোঘল ফৌজে ভালো সংখ্যায় ছিল। তাই শাহাজাদাদের এরকম বিশেষ যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়াটা অসম্ভব নয়। মধ্য এশিয়াতে বড় বড় সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া ঔরঙ্গজেব অত্যন্ত দক্ষ ঘোড়সওয়ার ছিলেন তা অনুমেয় , তাই মোঘল তীরন্দাজ- ঘোড়সওয়ারের কঠিনতম প্রশিক্ষণ তাঁর হয়নি বলা যাবে না।
বর্শা ছোড়ার বা তলোয়ার ব্যবহারের সঙ্গেও তুখোড় ঘোড়সওয়ারির যোগ ছিল। ইউরোপের মধ্যযুগীয় যোদ্ধাদের মতো মোঘল যোদ্ধা ঘোড়ার জিনে -রেকাবে আবদ্ধ থাকত না, ঘোড়া চালাতে চালাতে কোমর উঁচু নিচু করে তলোয়ার দিয়ে কেটে বা বর্শা ছুঁড়ে আবার সেই বর্শা তুলে যুদ্ধ করত। সেটা সম্ভব হতো ইউরোপের মতো ভারী জাবদা বর্ম ব্যবহার না করার জন্য। ইউরোপিয়ানরা ঘোড়ার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নড়তে চড়তে পারার জন্য শত্রু সেনার বর্মের দুর্বল জায়গা আড়ে কাটার থেকে ফুঁড়ে দিত সোজা লম্বা তলোয়ার বা বর্শা দিয়ে। হিন্দুস্থানের গরমে ইউরোপের মতো ভারী ধাতুর বর্ম পরে যুদ্ধ করা অসম্ভব। তাই দাক্ষিণাত্যের মোটা কাপড়ের অরক্ষিত বর্মের তুলনায় শক্তপোক্ত বর্ম মোঘল ফৌজ পরতো যা ইউরোপের থেকে কম দামি আর অরক্ষিত। তাদের তালোয়ারও চওড়া চ্যাটালো হতো যাতে আড়ে কাটতে সুবিধে হয়। সেসব বর্শা- তলোয়ারের কায়দা শাহাজাদা ঔরঙ্গজেবকেও রপ্ত করতে হয় ছোটবেলা থেকেই।
নানা দিক থেকে দেখা যাবে শস্ত্র বিদ্যের নানা ধারার সঙ্গে ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ারির যোগ আছে। মধ্য এশীয় যাযাবর গতিময়তায় ঘোড়া আর ঘোড়ায় চড়ার ব্যাপারটা জলভাত ছিল। হিন্দুস্থানে কয়েক পুরুষ থেকেও মোঘলরা অন্তর্লীন গতিময়তা হারায়নি , ঘোড়া -উট -বলদ-হাতি এই চারের শক্তিশালী গতিময়তাই ছিল যাবতীয় গতির উৎস। আধুনিক যুগে মানুষ বা চাকার এই চক্করবাজি যন্ত্রের সাহায্যে হয় আর আছে বায়ুযান।এর মধ্যে ঘোড়া বাইরে থেকে আনতে হতো অথচ ফৌজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে হেভি ক্যাভেলারি-মোঘলদের জবরজং ঘোড়সওয়ার বাহিনী ।
বাবর পনেরোশো ছাব্বিশে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে অটোমান সম্রাটদের মতো বারুদ নির্ভর যুদ্ধকৌশলের সফল প্রয়োগ করে হিন্দুস্থানে মাথা গলালেন। তাহলে কি মোঘলরাই প্রথম যুদ্ধে বিরাট আকারে বারুদ ব্যবহার করে ? একটা মত হল মোঘল , পারস্যের সাফাভিদ বা তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য বারুদ ব্যবহারে দড় সাম্রাজ্য - গান পাউডার এম্পায়ার। সাম্প্রতিক গবেষণায় বার্টন স্টেইন বিজয়নগর সাম্রাজ্যের গঠনে আধুনিক বারুদের ব্যবহারের সাফল্যের কথা বললেন। একই সঙ্গে চূড়ান্ত সামরিক কেন্দ্রীভবন করার মতো আর্থিক সঙ্গতি সাম্রাজ্যের হাতে না থেকে সম্পদের বন্টন শক্তিশালী স্থানীয় রাজাদের মধ্যে ভাগ হওয়ার অসুবিধের কথাও উল্লেখ করছেন।পনেরোশো ষাটের পরে ইউরোপে মান্ধাতার আমলের ছোটোখাটো ঘোড়সওয়ার দলকে হটিয়ে আধুনিক বারুদের ব্যবহার নির্ভর চূড়ান্ত কেদ্রীভূত আর শৃংখলাবদ্ধ বিপুল সংখ্যার ইনফেন্ট্রি ডিভিশনগুলো র আবির্ভাব এক সামরিক বিপ্লব ঘটালো। এর জন্য সাম্রাজ্যের আর্থিক সম্পদের চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণ দরকার- ভাঁড় মে যায় অর্থনীতি আর আম আদমির হাঁড়ির হালহকিকত।সে হিসেবে দেখতে গেলে মোঘল ফৌজে পুরোপুরি বারুদ নির্ভরতা আসেনি , ঘোড়সওয়ার -তীরন্দাজদের উপস্থিতি ছিল ভালো মাত্রায়। সামরিক বাহিনীর এই বিপুল রূপান্তর করার আর্থিক সঙ্গতি মনসবদার নির্ভর সামরিক কাঠামোয় মূলত বিকেন্দ্রিত আঁতাতকামী মোঘল রাষ্ট্রের কতটা ছিল সেটাও প্রশ্ন। হাতি -ঘোড়ার সঙ্গে তোপ -বন্দুক মিলিয়ে মিশিয়ে খোলা মাঠের লড়াইয়ে মোঘল ফৌজের শ্রেষ্ঠত্ব তাদের অনেক অসঙ্গতিকে ঢেকে দেয় পরে যা সমস্যার জন্ম দেবে। ইকতিদার আলম খান পঞ্চদশ শতকের ফার্সি ও মধ্য এশীয় সূত্রে কামান ই রাদ ( বজ্রপাতের ধনুক ) কথাটার উল্লেখ পাচ্ছেন। তাঁর গবেষণায় জানা যাচ্ছে তিমুরিদ আর বাহমানিরা হেভি মর্টার জাতীয় তোপ ব্যবহার করছে যা দিয়ে বারোশো কিলোর মতো ভারী পাথর ছোঁড়া যায়। বারুদের ব্যবহার শুধু বন্দুকে আটকে ছিল না ক্রস বো দিয়ে ছোঁড়া গ্রেনেড -হুককা ,রকেট -বান এসবকে অতিশবাজির সাধারণ সংজ্ঞায় ফেলা হতো এসব শত্রুর সাপ্লাই লাইন ভাঙতে ,অস্ত্রাগার উড়িয়ে দিতে কাজে লাগানো হতো। চীন থেকে এদের আমদানি করা হয় মোঙ্গলদের সাহায্যে তারপর এখানেই বানাত অতিশবাজরা। মোঘল ফৌজে রকেটের ব্যাপক ব্যবহার হতে থাকে- যুদ্ধে হাতি আর ঘোড়াদের ভয় পাইয়ে দিতে, আক্রমণ করতে। পনেরো থেকে পঁচিশ সেন্টিমিটার লম্বা আর পাঁচ থেকে আট সেন্টি মিটার ডায়ার দু থেকে তিন মিটারের বাঁশের সঙ্গে আটকে ছাড়া হতো। এই বানের কিছু উন্নত সস্করণ টিপু সুলতান ব্যবহার করলেন যা টুকে ইউরোপ বিস্ফোরক লাগানো কংগ্রেভ রকেট বানায়। ষষ্টদশ শতকে প্রথম তোপ -বন্দুকের ব্যাপক ব্যবহার ও তৈরি করা শুরু। পানিপথের যুদ্ধের আগেই পনেরোশো দশে পর্তুগিজ সূত্রে গোয়াতে এর উল্লেখ আছে। পর্তুগিজ অধ্যুষিত সমুদ্র বন্দর ছাড়াও হিন্দুস্থানের অনেক ভেতরেও এসব চালান হয়ে গিয়েছিল হয়তো। পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর ইউরোপে তৈরী তোপ ই ফিরিঙ্গি কামান আর হালকা জারবান কামান, কাজান-মর্টার ব্যবহার করেন। ম্যাচলক -আগুন দিয়ে জ্বালানো গাদা বন্দুক তো ছিলই। হুমায়ুন আর শের শাহ সুরির লড়াইয়ে জারবানের ব্যাপক ব্যবহার হয়। পর্তুগিজ আর অটোমানদের সাহায্যে গুজরাটের সুলতান রীতিমতো মাস্কেট বাহিনী বানিয়ে মোঘলদের কিছুদিন আটকে রাখেন। আকবর ম্যাচেলকের লোহার মান ইউরোপের সমতুল্য মানে নিয়ে গিয়ে ব্যারেল ফেটে যাওয়া অনেক কমিয়ে আনলেন। তবে মোঘলরা কামানের প্রযুক্তিতে ব্রোঞ্জেই আটকে ছিল, ইউরোপের মতো কাস্ট আয়রনের কামান বানাতে পারেনি। ঔরঙ্গজেববের সময় অনেক বড় তোপ বানালেও কখনই তা ইউরোপের মানের কাছাকাছি গেল না। বারুদ হিসেবে পঁচাত্তর ভাগ সোরা ,পনেরো ভাগ কাঠকয়লা আর দশ ভাগ গন্ধক মিশিয়ে তৈরি কালো বারুদই বরাবর ব্যবহার হয়ে এসেছে। আগুন না লাগানো ঘোড়া- লকের ফ্লিন্টলক বন্দুক মোঘল যুগে ছিল না। পরে ওই ফ্লিন্টলক আরো উন্নত হয়ে বারুদের বদলে কার্তুজ ব্যবহারের উপযোগী হল ইউরোপীয়দের হাতে । পিস্তল-তামাচার ব্যবহার করতে পেত অভিজাতরা যাদের হাতে বিদেশি উন্নত পিস্তলও থাকত। শাহাজাদা হিসেবে ঔরঙ্গজেবকেও ধারাবাহিক ভাবে ব্যবহৃত ও ক্রমোন্নত মুঘোল আগ্নেয়াস্ত্রের বিপুল সম্ভারের ব্যবহার শিখতে হয়েছিল।
মোঘল দরবারে আকবর থেকে শাজাহান সবাই কুস্তিগিরদের খুব সম্মান করতেন, নিজেরাও কুস্তি করতেন। এই কুস্তিগিরদের মধ্যে ইরানী ,তুরানি বা হিন্দুস্থানী সব রকমেরই লোক ছিল। দরবারে রীতিমত মাইনে করা কুস্তিগির ছিল। খুবই ইজ্জতের খেলা হওয়ায় শাহজাদারাও কোন ওস্তাদের অধীনে কুস্তি শিখতেন । ঔরঙ্গজেবও নিশ্চয় কুস্তির প্যাঁচ শিখেছিলেন। পায়রা ওড়ানোর ব্যাপারটা শুধু ছেলেখেলা ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ বার্তাবাহক হিসেবে প্রশিক্ষিত পায়রার চল ছিল ভালোই। জানা যায় বাদশাহরা সবাই বিশাল পায়রার দল রাখতেন। আকবরের বিশ হাজার পায়রা ছিল , তার মধ্যে পাঁচ শো লক্কা। ঔরঙ্গজেব কত পায়রা পুষেছিলেন কে জানে। শিকারী বাজ হাতে তাঁর একটা বিখ্যাত ছবি আছে। ছবিটা সম্ভবত মোঘল চিত্রকর বিচিত্রর আঁকা। পায়রা আর এইসব পাখিদের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তাঁর উৎসাহ থাকাটা স্বাভাবিক।
তখন ছাপার যুগ আসেনি, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির যুগ। তাই আলাদা করে সুন্দর হাতের লেখা শেখান হত মোঘল শাহজাদাদের। জাহাঙ্গীর, শাজাহান প্রত্যেকের অপূর্ব হাতের লেখার নমুনা পাওয়া যায় শাহাজাদা থাকা কালীন তাঁরা যে সব অর্ডার বা নিশান দিতেন অথবা বাদশাহ হয়ে যে সব ফরমান দিতেন তার সিল মোহর সহ দস্তখতে। এছাড়াও জাহাঙ্গীর নিজে হাতে দিনলিপি লিখতেন এটা আগেই জানা গেছে। সেই বই জাহাঙ্গীরনামার মূল পাণ্ডুলিপির সঙ্গে সঙ্গে সচিত্র প্রতিলিপিও আছে.আকবরের সময়কার সচিত্র আকবরনামা অবশ্য অন্যের লেখা। জাহাঙ্গীনামার পাণ্ডুলিপি এক মিশ্র জঁরের লেখা। একধারে সাহিত্যগুণ সম্পন্ন –আদাবিয়াত,স্মৃতিকথা-তাজকিরা , জীবনী –সনিহ, ভ্রমণ কাহিনি- সফরনামা, সর্বোপরি এক ও অনন্য সম্পূর্ণ গোত্রছাড়া প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের নোট। শাজাহান নিজে অবশ্য ওরকম কিছু লেখেন না।
ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এরকম যে সাধারণ ভাবে পাণ্ডুলিপি তৈরি আর তার সচিত্র প্রতিলিপি অলংকরণের জন্য সুন্দর হাতের লেখা দরকার হতো। বাদশাহ বা শাহজাদাদের অপূর্ব দস্তখত, ক্ষমতার বৈধতা ও জাঁকজমকের জন্য বিশেষ দরকার ছিল। এর ফলে শাহজাদাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো ওস্তাদ ক্যালিগ্রাফার বা লিপিকারদের কাছে। আকবর পরবর্তীতে এটা রাষ্ট্রীয় প্রথা হয়ে দাঁড়ায় তাতে বাদশাহের বিশেষ আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় কারণ হতে পারে এ ব্যাপারে তাঁর নিজের খামতি। এভাবেই ঔরঙ্গজেবকেও আরবি - ফার্সি ক্যালিগ্রাফির ট্রেনিং দেওয়া হয়। তিনি হয়ে উঠলেন এক ওস্তাদ লিপিকার।
ক্যালিগ্রাফির নশতালিখ কায়দা দূর্দান্ত রপ্ত করেছিলেন ঔরঙ্গজেব। এই কায়দার ক্যালিগ্রাফির উদ্ভব হয় পারস্যে , রাজ কাজ আর কোরান লেখার কাজে ব্যবহৃত ত্রয়োদশ শতকে উদ্ভূত ছোট গোল গোল আদি নকশ কায়দার লিপি থেকে।পঞ্চদশ শতকের পারসিক কবি ও ক্যালিগ্রাফির ওস্তাদ জাফর তবরিজির মত হল- পারস্যের সিরাজ শহরের লিপিকাররা নকশ লিপির চওড়া ভাবটা বেঁকিয়ে আর তলার দিকের সোজা ভাবটা ছড়িয়ে দিলেন সরু থেকে মোটা তুলির আঁচড়ের সূক্ষ্মতম কারুকাজ নশতালিখে । পারস্যে সৃষ্টি হয়ে এই অপূর্ব কায়দা ছড়িয়ে পড়ে । আর ফার্সি-আরবি ছাড়াও উর্দু, কাশ্মীরি বা পাঞ্জাবের শাহমুখি ভাষাতেও এর ব্যবহার হয়। নশতালিখের একটা অন্য ধরণ হল শিকস্তা-নশতালিখ বা কারুকার্যময় ভাঙা নশতালিখ। এই ধরণে লিখিত নশতালিখ লিপিকে ভেঙেচুরে নানা আকার দিয়ে পাণ্ডুলিপি অলংকরণ করা হয়। সেটাও ভালো রকম আয়ত্তে এনেছিলেন ঔরঙ্গজেব।
এসব তিনি কার বা কাদের কাছে শিখেছিলেন এটা জানা যাচ্ছে না। অন্য মোঘল বাদশাহরা কেউই ঔরঙ্গজেবের মতো ওস্তাদ লিপিকার ছিলেন এমন প্রমাণ নেই। পূর্বপুরুষদের মত দস্তখত নয় তাঁর অপূর্ব হস্তাক্ষরের সাক্ষী হত অসংখ্য সরকারি নথি, দলিল দস্তাবেজ সেসব তিনি গভীর রাত পর্যন্ত খুঁটিনাটি দেখে নিজের হাতে মতামত লিখতেন। এছাড়াও তাঁর নানা সরকারী বা ব্যক্তিগত চিঠির তাড়ার কথা আগেই জানা গেছে। অবসর সময় আয়েস না করে ঔরঙ্গজেব অপূর্ব প্রতিলিপি করতেন কোরানের আর বুনতেন টুপি , সেসব বিক্রি হতো বা দান করা হতো । সেসময় মুসলিম হিসেবে এক পবিত্র কাজ ছিল কোরান প্রতিলিপি করা। যদুনাথ বলছেন ঔরঙ্গজেবের নিজে হাতে করা কোরানের প্রতিলিপি রাখা আছে মক্কা , মদিনা আর হজরত নইমুদ্দিন দরগাহ আজমেরে। অন্য বেশ কিছু ছড়িয়ে আছে দেশে ,বিদেশে বিভিন্ন জায়গায়।
লিপিকার জানের সঙ্গে জবানের সেতু তৈরি করেন নশতালিখ কায়দায়। শিরাজ শহরের ওস্তাদরা সেই মারপ্যাঁচ শিখিয়ছিলেন কবেই। ঔরঙ্গজেবও লক্ষ্য করছেন ক্রমশই ওই কায়দা তাঁর জান ও জবানের সবটাই অধিকার করছে। সোজা নয় এই প্রাচীন লিপি কারণ তার দীর্ঘতম ইতিহাস আছে। নশতালিখ শিখতে শিখতে শাহাজাদাও বুঝতে পারছেন তাঁর দীর্ঘতম ইতিহাস। তিনি এখন আগ্রার কেল্লায় একদম ধারে হিন্দুস্থানের সবচেয়ে মজবুত পাঁচিলের বেঁকানো আর্চের ফাঁক দিয়ে সামনের ফাঁকা ময়দানে তাকালেন। সালতানাতের যতদূর চোখ যাওয়া বিস্তার তাঁর চোখে পড়ল। তারপর সে বিস্তারও কোন ক্ষণে শেষ হলে বুঝলেন আসলে শাহাজাদা হলেও তিনি এই কেল্লায় আটকে পড়া বহুমূল্য তৈমুর লাল স্পিনেল বা রুবিতে মোড়া সালতানাতের এক গোলাম।সামনের মাঠে খেলতে থাকা হুকুমতের অকিঞ্চিৎকর রায়তের ছেলেটার মতো যেখানে সেখানে এক ছুটে চলে যাওয়া তাঁর বারণ। তাঁর এক মাত্র ভরসা লিপিমালা -নশতালিখ আর শিকস্তা-নশতালিখ, একমাত্র সালতানাত। সেই লিপি দিয়ে দিয়ে ওয়াক্ত , আকাশ , কবুতরের দল ,কেল্লার চারপাশের গভীর পরিখা আর সেখানের কুমির- সবার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা চালান ঔরঙ্গজেব।
সুদূর দক্ষিণে সালতানাতের সীমা বাড়িয়ে তৈরি করা গালগালার স্থায়ী তাঁবুতে গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ারও অনেক পর, ফরমানগুলো থেকে আলো বেরোয় ,তারা জ্বলজ্বল করে তাকায় আর তাদের চোখের ভেতর দিয়ে অনেক কিছু দেখা যেতে থাকে। খুবই সুন্দর করে লিখে চলছেন বৃদ্ধ ঔরঙ্গজেব, ভাবছেন, আর কোন ভাই এত সুন্দর করে লিখতে পারত সালতানাতের জন্য ? এই তাঁর হাত ,হাতের আঙ্গুল যেখান থেকে লেখারা বেরোবে আর ,ন্যায় বিধান করবে লেখারা। লোকে ভাবছে বাদশাহ করছে আসলে করছে লেখারা। এই পরিণতির জন্য ছোটবেলা থেকে তৈয়ার হয়েছেন তিনি , তৈয়ার তাঁর লিপি, যে লিপি ব্যক্তিগত নয় কিছুতেই। যে লিপি আসলে তিমুরিদ- তৈমুর বংশজাত।সেই নশতালিখরা ওড়াউড়ি করছিল আগ্রার কেল্লার চারপাশে। কেল্লাকে ঘিরে যে জল তা গভীর। সেখানে কি কুমিররা থাকে ? সে কুমির এসেছে কোথা থেকে? কোন তলাও আছে জঙ্গলের মধ্যে যেখানে আদি কুমির দম্পতি ছিল তারপর তাদের সন্তান ইত্যাদিরা হয়ে থাকবে। কুমিররা আগ্রার কেল্লার চারপাশ কীভাবে সামলে রাখে তা দেখছেন ঔরঙ্গজেব একা। অনেকক্ষণ তুলির টান দিতে দিতে তাঁর হাত ও মাথা ধরে গেছে অথচ আকাশের দিকে তাকালেই তিনি অসংখ্য কবুতরদের সিকস্তা লিপিমালার মতো উড়ে যেতে দেখেন কেন? এসব কী সমস্তই ভ্রম অথবা তার কোন সংশোধন কিংবা জিনের খেলা। এইসব বলে বৃদ্ধ বাদশাহ তার নিজের ছোটবেলার আঙুলের দিকে তাকিয়ে ওঠেন কোন কারণ ছাড়াই। আশ্চর্য হয়ে আঙ্গুল সমূহ সমর্পন করেন আল্লাহতালার কাছে। এই আঙ্গুলেরাই ছোটবেলা থেকে তাঁর সাথ দিয়ে অসংখ্য লিপিমালাই তৈরি করে গেছে। তারা সমর্পিত হতে চায় না। অপূর্ব কারুকার্যময় ,ছবির মতো করে মানুষ ,পশুপাখি আর জিনদের সবার জবানকে রেখে দেবে বলে তারা প্রাচীন কাগজের ভ্রমণ সেরে আগ্রার কেল্লা ছেড়ে , শাহজাদার গোলামী ছেড়ে বেরিয়ে যাবে বলেই কবুতরের দলের সঙ্গে ঘুরপাক খেতে খেতে পবিত্র কোরানের সচিত্র প্রতিলিপি তৈরি করছে আকাশময়।প্রাচীনকালের উল্লেখ্য বাদশাহ আরো প্রাচীন নশতালিখ ও শিকস্তা লিপিমালার সঙ্গে তাঁর জান ও জবানের কী সেই সম্পর্ক তা বোঝার চেষ্টা করেন জিভ দিয়ে হওয়া চেটে যেন কথার আগের ওয়াক্ত। এসবই, সেদিন অনেক দিন আগে, আগ্রার কেল্লার পাঁচিলে হেলান দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন শাহাজাদা ঔরঙ্গজেব ও তাঁর লিপিরা, ওয়াক্তেরও আগে বেড়ে বেড়ে ।
------ সময় ছেড়ে এতটা এগোলে ?
------ কোথায় এগোলাম ?
------ সেকি !
------ এগোলাম কই ?
------ এগোলে না !
------ না।
-------বৃদ্ধ ঔরঙ্গজেব …..
------ সত্যিই চলে গিয়েছিলাম গোলকুণ্ডার কাছে গালগালার প্রকাণ্ড স্থায়ী শিবিরে ,তিন মাইল গোল করে ,কাঠের গুঁড়ি তক্তা আর লোহার গজাল ঠুকে সুরক্ষিত বেড়া দেওয়া, পাঁচ শো হাল্কা কামানের অতন্দ্র পাহারায় থাকা ওই শাহী শিবির যেখানে বাদশাহ থাকেন।
------ বল কী !
------ কমিয়েই বলেছি , সপ্তদশ শতকের ইতালিয় পর্যটক জিওভান্নি ফ্রান্সেস্কো গেমেল্লি ক্যারেরি তো আরো অনেক কিছু বলেছেন। ।
------ কী বললেন ?
সপ্তদশ শতকের ইতালিয় পর্যটক জিওভান্নি ফ্রান্সেস্কো গেমেল্লি ক্যারেরি তাঁর ভয়েজ রাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড বইতে ঔরঙ্গজেব আলমগীরের গালগালার স্থায়ী শিবিরের বর্ণনা দিলেন
শুনেছি ষাট হাজার ঘোড়সওয়ার ,এক লাখ পাদিগান-পদাতিক ,, তাদের মাল বওয়া পাঁচ হাজার উট , তিন হাজার হাতি আছে সেখানে । এছাড়া আছে শাহী বহরের সঙ্গে ঘোরা অসংখ্য কারবারি ,ব্যবসাদার , অস্ত্র শস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সারাইয়ের ওস্তাদ মিস্ত্রির দল । পাঁচ লাখ লোকের থাকার মতো এক চলমান শহর, দরকারের সবকিছু ছাড়াও আমোদ আয়েশের সব সরঞ্জাম মজুত সেখানে। আড়াই শো বাজার বসে আর সেখান থেকে আমির থেকে গরিব সবাই কেনাকাটা করে। এককথায় পুরো শিবিরটা তিরিশ মাইলের মতো পরিসীমার এক গোটা শহর ।
----- এত জাঁকজমক আর নিমগ্ন বাদশাহকে ছেড়ে আবার…..
------ আবার ?
------ আবার তো ফিরে এলাম ছোট্ট শাহজাদার কাছে।
------ আগ্রায়।
------ কোথায় ?
------ কেল্লায় , আগ্রার ……
------ এগোলেই বা কেন ফিরে এলেই বা কখন !
------ এটুকুতেই ?
------ কী ?
------ আশ্চর্য হচ্ছ।
------ হব না ?
------ কেনই বা হবে ?
------ কী বলছ ?
------ এক জটিল ঔরঙ্গজেবের কথা বলছি।
------ সহজ কর।
------ পারব না।
------ সহজ কথায় বল।
------ সহজ কথা সহজ নয়।
------ রবীন্দ্রনাথ ?
------ হতে পারে বা বাদশাহ নিজে।
------ কোন বাদশাহ ?
------ কেন ঔরঙ্গজেব আলমগীর , শিশু ঔরঙ্গজেব যিনি জটিল অথচ কারুকার্যময় লিপিমালা শিখছেন আর বৃদ্ধ ঔরঙ্গজেব……
------বৃদ্ধ ঔরঙ্গজেব ?
------ যিনি মিল করার চেষ্টা করছেন অথচ কিছুই মিলছে না, আয়ত্বে থাকছে না নশতালিখ
------ আর কারুকার্যক
------ শিকস্তা নশতালিখের অন্য , অজানা সব কারুকাজ হয়েই চলে নিজের কায়দায় ।
*****
অতিরিক্ত তথ্য সূত্র : Climate of Conquest : War,Environmemt and Empire in Mughal North India. Pratyay Nath


0 মন্তব্যসমূহ