প্রকৃতি এখানে রূঢ়। আকাশ রুগ্ন। বাতাস বিষন্ন। বৃক্ষ পত্র ধূসর। জমি অনাবাদী। মাথার উপরে কিছু ছেঁড়া মেঘ। তার ফাঁকে ক্লান্ত চাঁদ। গুমোট গরম। রাত্রি নিস্তব্ধ। সমস্ত কিছু এখানে যেন থেমে আছে।
আমরা ছিলাম তিনজন। ওরা যখন আমাদের এখানে নিয়ে আসে তখন রাত্রির শেষ প্রহর। ইঞ্জিনের শব্দ থেমে আসে অবশেষে। কিছু বুটের শব্দ এবং বেয়োনেটের খোঁচা। এই যথেষ্ট এই ক্লান্ত শরীরে আলোড়নের জন্য।
ওদের একজন ট্রাক থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়ালো। তারপর অবলীলায় প্যান্ট খুলে ছর ছর শব্দে কাজ সেরে নিল। ওর সঙ্গী কিছুটা অস্থির। রাস্তার পাশে আলো আঁধারি অন্ধকারে ট্রাক থামানোটা তার পছন্দ হয়নি। কখন কী ঘটে, তার কী কোন ঠিক আছে। আর একটু এগোলেই তো গন্তব্য। সেখানে গিয়েই কাজ সেরে নিলে কী ভালো হত না। তবে সে কিছু বলল না। দানিল বরাবরই চুপচাপ। বেশি কথা বলা ওর ধাঁতে নেই। কিন্তু ওর কাজে ও নিখুঁত। তাই বয়স অল্প হলেও সবাই তাকে কিছুটা সমীহ করে চলে।
গুজব আছে দানিলের নম্বর বিশ। অথচ ও এ কাজে যোগ দিয়েছে বছর খানিকের বেশি নয়। সবাই জানে দানিলের নিশানা অব্যার্থ। দানিল আমাদের তিনজনকে কিছুতেই চোখের আড়াল করছে না। অবশ্য আমাদের তিনজনের চোখের আড়াল হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তিনজন ট্রাকের এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছি। তিনজনের হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। দানিলের সঙ্গী একবার চোখ বাঁধার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু দানিলের তা প্রয়োজন বোধ হয়নি। দানিল চায়, কাজের সময়, সবাই যেন সব দেখতে পায়। দানিলের মতে, চোখ বেঁধে দিলে, গুলি করে আরাম নেই যদি দেখারই কেউ না থাকল। তবে দানিল বুঝতে পারছেনা, আদৌ আজকে তার কোন বুলেট খরচ হবে কী না। কারণ আমরা তিনজনই বেশ শান্ত। সন্দেহাতীত ব্যবহার এখন পর্যন্ত দানিলের চোখে পড়েনি। পড়ার কোন কারণ নেই।
ক্লান্তিতে আমাদের শরীর অবসন্ন। বারংবার শরীর বেঁকেচুরে ট্রাকের মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে চাইছে। তা করতে গেলেই বেয়নেটের খোঁচা বা বুটের লাথি জুটছে। এই ট্রাকের পিছনে আমরা কতক্ষণ আছি, তার সময় গুলিয়ে গেছে। মনে আছে কোন এক বিষণ্ণ বিকেলে ট্রাকটি এসে দাঁড়ায় আমার বাড়ির দরজায়। ওলগা ময়দা মাখছিল। উনুনে স্যুপের হাড়ি। সাপারের স্বল্প আয়োজন। ছেলে মেয়ার তখনো বাইরে পাড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। রুটি হয়ে গেলেই ওদের ডেকে আনা হবে ঘরে।
আমি রেডিওতে ৩ নম্বর স্টেশনটি ধরার চেষ্টা করছিলাম। আজ সন্ধ্যা সাতটায় প্রেসিডেন্ট এর একটি সাক্ষাৎকার পরেবেশিত হওয়ার কথা। পুরানো রেডিও কিছুতেই কথা শুনছিল না। এমন সময় হঠাৎ করেই দরজায় বুটের আঘাত। ওলগার ময়দা মাখানো হাত থেমে গিয়েছিল। রেডিওটি স্পষ্ট স্বরে বেজে উঠল। আমি জানি পালিয়ে কোন লাভ নেই। এরা পুরো বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছে। আমি বুদ্ধিমানের মত দরজা খুলে দিলাম। হাত দুটো পেছনে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলাম । তবুও মাথায় বেয়োনেটের আঘাত থামাতে পারলাম না। ওলগা গুঙিয়ে উঠল । ছেলে মেয়েরা ওলগার স্কার্টের পিছনে গিয়ে লুকালো। পিছনে একটি লাথি পড়ল এইবার। এর অর্থ করলে দাঁড়ায়, সামনে এগোও। আমি জানি বাঁধা দিয়ে কোন লাভ নেই। যেতে আমাকে হবেই। আমি চাই না ওলগা আর ছেলে মেয়েদের সাপারটা আমার রক্তাত দেহ নিয়ে কাটুক।
আমার হাতদুটোকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হল। আমি কোন আপত্তি করিনি। দুপাশে দুই শক্ত হাত ঠেলতে ঠেলতে ট্রাকের পিছনে নিয়ে গেল। ওলগা দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। ছেলে মেয়ার স্কার্টের পিছন থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ওলগা মুখ চেপে ধরে কান্না গিলছে। আমরা দুজনই জানি , এই হয়ত আমাদের শেষ দেখা। শেষ আলিঙ্গন তো দূরের কথা, ওলগার হাত দুটোই স্পর্শ করা গেল না। আমাকে ট্রাকের পিছনে ওঠানো হল। ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাকের ইঞ্জিন শব্দ করে উঠল। সবার মুখ এখন থেকে শুধই স্মৃতি।
ট্রাক যখন ধূসর বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ায় , সুর্য তখন মধ্য গগনে। চারিদিক অস্বাভাবিক নিশ্চুপ। পথে কোন জনমনিষ্যি নেই। বাড়িঘরেরে দরজা-জানলা সব বন্ধ। হঠাৎ একটা জানলা অল্প খোলা মনে হয়েছিল। সেটাও তড়িৎগতিতে বন্ধ হয়ে গেল। ট্রাক থেকে দুজন নেমে ধূসর বাড়িটির দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। একজন দরজায় বুট দিয়ে কয়েকবার আঘাত করল। ভেতর থেকে কোন সাড়া এলো না। এবার দুজন সমানতালে আঘাত করে চলল দরজায় যা প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। এবার ভেতর থেকে আস্তে ছিটকিনি খোলার শব্দ যেন শোনা গেল। দরজা খোলার সাথে সাথেই লোকটির গালে কষে এক চড় বসানো হল। লোকটির ঠোঁটের ডান দিকে কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে লাগল। ঘরের ভেতরে কান্নার রোল উঠল। লম্বা, ঢ্যাঙ্গা লোকটাকে টেনে হিঁচড়ে ট্রাকের পিছনে উঠানো হল। এর মধ্যে সে কয়েকবার বুটের লাথির স্বাদ পেয়ে গেছে। তবু তার হাউমাউ করে চিৎকার থামানো যাচ্ছেনা। দানিলের আর সহ্য হচ্ছিল না। তার বেয়োনেটের গোড়াটা ঢ্যাঙ্গা লোকটার মাথার বাম পাশে গর্জে উঠল। লোকটার নির্জীব দেহ লুটিয়ে পড়ল ট্রাকের ঠাণ্ডা মেঝেতে। ট্রাক আবার চলতে শুরু করল। এবারের গন্তব্য কোথায় কে জানে !
আমরা তৃতীয় বাড়িটিতে যখন পৌঁছালাম তখন রাত্রি গভীর। চারদিক ভয়ংকর নিশ্চুপ যেন কবরের নিস্তব্ধতা। অবশ্য কবর নিস্তব্ধ কী না তা আমার জানা নেই। এখন পর্যন্ত সেখানে যাইনি। তবে ভবিষ্যতে সেখানে পৌঁছানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা কত শীঘ্রই ঘটে সেটাই এখন দেখার বিষয়। মেঘের ফাঁকে চাঁদের আলো কিছুটা উঁকিঝুঁকি দেয়ার চেষ্টা করছিল। সেই আবছায়া আলোতে বাড়িটিকে দেখতে আটপৌরেই মনে হলো। দরজায় রং পড়েনি বহুদিন। জানালার পাল্লা ঠিকমত বন্ধ করা যায়নি। এই সাধারণের মাঝে অসাধারণভাবে সাদামাটা দরজাটির কোণায় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট একটি লাইলাকের ঝোঁপ। সেখান থেকে মন কেমন করা একটি গন্ধ সেই বদ্ধ বাতাসে আঁছড়ে পড়তে চাইছিল। আমি বুক ভরে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পাঁজরের তীক্ষ্ণ খোঁচায় মাঝপথে থেমে যেতে হয়েছিল।
আমার সঙ্গী হঠাৎ কঁকিয়ে উঠল। দানিলের সঙ্গী লোকটার পেট বরাবর বুটের তাক করতেই দানিল তার কাঁধ খামচে ধরল। লোকটা কী ভেবে পা টা নামিয়ে নিল পেটের কাছ থেকে। এরপর সোজা গিয়ে বসল সিটের মাঝখানে রাইফেলটি আমাদের দিকে লক্ষ্যস্থির করে। দানিলে ট্রাকের পেছন থেকে লাফিয়ে নামল। ওর পেছনে আরও দু'জন। সবাই মিলে লাইলাকের ঝোঁপটির দিকে এগিয়ে চলছিল। ঠিক এসময় আটপৌরে দরজাটির পাল্লা দু'টো হুট করে খুলে গেল। দানিল আর তার দুই সঙ্গীকে ছিটকে একটি লম্বা ছায়া তীব্রগতিতে সামনের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। দানিল তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়াল। তারপর সেও দিল ছুট।
পিছনের সঙ্গী দু'জনও এতক্ষণে নিজেদের সামলে নিয়েছে । দু'জনের একজন দানিলের পেছন নিল। আরেকজন ঘরের ভেতরে পা বাড়ালো। ঘটনার আকস্মিতায় আমাদের গার্ড এবং আমি দু'জনই বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। তবে কোন বোকামির আশ্রয় নেয়ার কথা আমার মাথায় আসেনি। গার্ডটি নড়েচড়ে বসল। রাইফেলটি আরও দৃঢ়ভাবে তাক হয়ে রইল আমাদের সামনে। একটুপর দূরে কোথাও রাইফেল গর্জে উঠতে শোনা গেল কয়েকবার। আমাদের গার্ডের ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল। দরজার ওপার থেকে যে নারীটি বের হয়ে আসল, তার চোখেমুখে সুস্পষ্ট আতংক। তার হাত ধরে আছে বছর দশেকের একটি বাচ্চা ছেলে। এদের পেছনে রাইফেল হাতে দানিলের ফেলে যাওয়া সঙ্গীটি। সে ওঁদের ইশারা করছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য।
ট্রাকের ভেতর থেকে সবাইকে ঠিক ভালোভাবে দেখতে পাওয়া না গেলেও মনে হল ছেলেটির চোখেমুখে আতংকের চেয়ে কৌতূহল বেশি কাজ করছিল। নারীটি এর মা হবে বলেই আশা করছি। ছেলেটি মায়ের হাত ধরে ট্রাকের ভেতরে কী আছে তা দেখার জন্য উদগ্রীব ছিল। হঠাৎ আমার সাথে চোখাচোখি হতেই তাঁর দৃষ্টি কিছুটা উৎসুক হয়ে উঠল। ওঁর মা ছেলেটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। দূর থেকে কিছু ঘষটে আসার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। কাছে এলে দেখা গেল , দানিল এবং তার সঙ্গীর মাঝখানে নিস্তেজ এক দেহ। বুঝতে বেশিক্ষণ দেরি হয় না যে , শরীরটি প্রাণহীন। দানিলের অব্যার্থ নিশানায় পিঠে বেশ কিছু ফুটো হয়েছিল সেখানে। এখনও রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে পিঠের গর্তগুলো থেকে। দানিল এবং তার সঙ্গীর চেহারা বেশ ঘর্মাক্ত। বোঝা গেছে এই শরীরটি এখান পর্যন্ত টেনে আনা খুব একটা সহজ হয়নি। নারীটির সামনে ওরা লোকটির শরীর একরকম ছুঁড়ে দিল। আর একটু হলেই লোকটির মুখ থুবড়ে পড়ত নারীটির পায়ে।
নারীটির ভয়ার্ত চীৎকার রাতের নিস্তব্ধতাকে নিমিষেই মুছে দিল। সে ছেলেটিকে ছেড়ে দিয়ে উপুড় হয়ে লোকটির গায়ে আছড়ে পড়ল। ছেলেটির অবাক বিস্ময় সবার মুখ একবার করে ছুঁয়ে দিয়ে গেল। দানিলের দুই সঙ্গী পেছন থেকে ওর কোমল দু' হাত শক্ত করে ধরে ট্রাকের পেছনে উঠানোর চেষ্টা করতেই নারীটি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। দানিল পেছন থেকে জাপটে ধরল তাকে। ততক্ষণে ট্রাকের ইঞ্জিন স্টার্ট হয়ে গেছে। দানিল নারীটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিল একপাশে। তারপর দৌড়ে গিয়ে ট্রাকে উঠে পড়ল। নারীটি কোনমতে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো। এরপর ট্রাকের পিছনে ছুটতে শুরু করল। ট্রাকের শব্দে তাঁর আর্তচীৎকার চাপা পড়ে যাচ্ছিল।
ছেলেটি তখনও বুঝতে উঠতে পারেনি কী ঘটছে। ট্রাকের স্পিড বাড়ছিল ক্রমশ। একরাশ ধুলোর আড়ালে নারীটির মুখ একসময় হারিয়ে গিয়েছিল। শুধু তাঁর চীৎকারের ভগ্নাবশেষ ঝুলে রইল কিছুক্ষণ স্তব্ধতার আড়ালে। ছেলেটির ছোট দু' হাতও বাঁধা হলো শক্ত রশি দিয়ে। ছেলেটি সেটাও খুব অবাকভাবে দেখল। কোন বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেনি অথবা বাচ্চাদের মত কাঁদতে শুরু করেনি। এবার আমি একটু অবাক না হয়ে পারলাম না। বলা ভালো ছেলেটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আবছায়া আলোতে ঠাহর করলাম যে ওঁকে আমার পাশেই বসানো হয়েছিল। ট্রাক ততক্ষণে ছুটে চলেছিল তীব্রগতিতে। দানিল ওর ফ্লাস্কের মুখে বড় এক চুমুক দিল। কিছুটা জল ওর মুখে কানে ছিটিয়ে নিল। ওর সঙ্গী দু' জনও দানিলকে অনুসরণ করলক। ট্রাক একইভাবে কতক্ষণ ছুটে চলল তার আর হিসেব করিনি। হিসেব করা সম্ভবও ছিলনা। ছেলেটি একসময় ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে গা এলিয়ে দিল। দানিলের সঙ্গীরাও যে ক্লান্ত তা বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু দানিল সটান হয়ে বসে ছিল রাইফেলের নলটি সামনে দিয়ে। ছেলেটিকে সে ঘুমোতে দিল।
আমাদের যখন এখানে নিয়ে আসা হলো তখন রাত্রির শেষ প্রহর। বেয়নেটের খোঁচায় লোকটি কুঁকড়ে গেল। আমার পেছনে শক্ত একটি ধাক্কা। এসব শব্দে ছেলেটি চোখ মেলে চাইল। সে বোধহয় ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা কোথায় আছে। আমাদেরকে এক এক করে ট্রাকের পেছন থেকে নামানো হলো। হঠাৎ মৃদু বাতাস ঘর্মাক্ত চুল আলতোভাবে ছুঁয়ে গেল। আমি সবার সামনে, আমার পেছনে ঢ্যাঙ্গা লোকটি আর তাঁর পেছনে ছেলেটি।
আমাদের সামনে এগিয়ে চলার নির্দেশ দেয়া হল। আমাদের সামনে এবং দু' পাশে গার্ড। সবার পেছনে দানিল। পেছন থেকে নিশানা করতে বুঝি বেশি সুবিধা দানিলের। এ কথা মনে হতেই আমি কিছুটা আড়ষ্ট অনুভব করলাম। মনে মনে চাইছি ছেলেটা যেন আমাদের একমনে অনুসরণ করে। নিজের ভাবনাতে নিজেই কিছুটা অবাক হলাম। আমি মনে মনে নিরুত্তাপ থাকার চেষ্টা করেছিলাম পুরোটা সময়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়ত আর থাকতে পারলাম না। পায়ের নীচের মাটি যে মোটেও মসৃণ নয়, তা জানান দিচ্ছে বারবার। অন্ধকারের অমসৃণ মাটিতে পা ফেলতে ফেলতে মনে হচ্ছে সবই যেন এক অপার্থিব দুঃস্বপ্নে আছে। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই দেখব ওলগার দু' হাত আমার গলা পেঁচিয়ে আছে।
কিন্তু এই দুঃস্বপ্ন বুঝি শেষ হওয়ার মত নয়। আমাদের পথ যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আমাদের যখন এই হলরুমটিতে নিয়ে আসা হলো, তখন দিগন্তে সূর্যের চিকন রেখা দেখা যাচ্ছে। সেই অল্প আলোয় মনে হল এই বিশাল হল রুমটিতে সারি সারি ম্যাচবাক্স সাজানো রয়েছে। বাংকের বেডগুলোকে ঠিক সেরকমই মনে হচ্ছিল আমার কাছে। আমাদের তিনজনকে কিছু বেডের সামনে এনে দাঁড় করানো হলো। বিছানা-বালিশ বলতে সেখানে যা আছে তাদেরকে ঠিক তা বলা যায় না। তেল চিটচিটে ছেঁড়া কিছু কাপড়ের দঙ্গল। বলা হলো এখন থেকে এই আমাদের বাসস্থান। বেড যেমনই হোক , তা দেখে কী না জানি না , এবার ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসতে চাইছে।
উপরের বাংকটিতে ঢ্যাঙ্গা লোকটি। নীচের টায় আমি। আর আমার ডানপাশে ছেলেটির জায়গা হলো। ওরা চলে যেতেই আমরা তিনজনই যার যার বিছানায় গা ছেড়ে দিলাম। অবশ্য তা বেশিক্ষণের জন্য নয়। হঠাৎ তীব্র শব্দে সাইরেন বেজে উঠল। ছেলেটি ধড়াক করে বিছানায় উঠে বসল। এবার ওর চোখে মুখে হতবিহ্বল দৃষ্টি। ঢ্যাঙ্গা লোকটি কোনরকমে উঠে বসল। আমারও না উঠে উপায় ছিল না। আমরা তিনজন যখন শব্দের উৎস খুঁজছি , হঠাৎ দেখলাম প্রতিটি বাংক থেকে পিঁপড়ার সাড়ির মত মানুষ নামছে। সবাই শৃংখলিতভাবে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেল। ওদের দেখাদেখি আমরাও তাই করলাম।
শৃংখলিত সারি আস্তে আস্তে চলতে শুরু করল। আমরা যেখানে এসে দাঁড়ালাম, একটু পর বুঝতে পারলাম এটা আসলে শৌচাগার। আমাদের পালা আসার জন্য এবার অপেক্ষা। ঢ্যাঙ্গা লোক এবং ছেলেটি আমার পাশেই আছে। আমরা আমাদের কাজ সেরে বের হয়ে এলাম। বেসিনে গিয়ে চোখে মুখে এবং ঘাড়ে একটু পানি ছিটিয়ে নিলাম। বেশি সময় নেয়া গেলনা। আমাদের পিছনে অনেক লম্বা সারি।আমরা যেখান দিয়ে ঢুকেছিলাম সেখান দিয়ে না বের হয়ে অন্যপাশের দরজা দিয়ে বাকী সবার সাথে বের হলাম। এই ভিড়কে অনুসরণ করতে করতে আর একটি হলরুমে এসে পৌছাঁলাম।
এখানে সারি সারি বেঞ্চ। হলরুমের একপাশে কিছু ট্রে জমা করা আছে। আর এক পাশে বড় একটা খোপ। সেখানে ট্রে নিয়ে গেলে খোপের ওপাশে থাকা কেউ একজন কিছু ট্রেতে দিয়ে দিচ্ছে। সবার দেখাদেখি আমরাও ট্রে নিয়ে নিলাম। সেই খোপ থেকে একটা বাটিতে দলা পাকানো কিছু একটা দিয়ে দিল। আমরা সেটা নিয়ে খালি একটা বেঞ্চ খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে পেয়েও গেলাম। বুঝতে পারলাম এই বস্তুটি আসলে একটি খাদ্যবস্তু। এই জিনিসই সবাই গোগ্রাসে খাচ্ছে।
আমি জিনিসটার দিকে ভালো করে তাকালাম।স্যুপের মধ্যে আটার দলা জাতীয় কিছু একটা হবে। চামচে নেড়ে একটুখানি মুখে দিলাম। সাথেই সাথেই গা টা গুলিয়ে উঠল। কিন্তু পেট জানান দিচ্ছে শরীর নামক যন্ত্রটি চালানোর জন্য রসদ চাই। তাই সেই আটার দলাই আস্তে আস্তে গিলতে শুরু করলাম। ঢ্যাঙ্গা লোকটি আমার মতই নেড়েচেড়ে দেখছিল। তারপর সেও খাওয়া শুরু করল। শুধু চুপচাপ বসে রইল ছেলেটি। আমি কিছু একটা বলতে গিয়েও কী ভেবে থেমে গেলাম। করুক যা ইচ্ছে করুক। আমার কী!
আবার সাইরেন বেজে উঠল। সবাই খাওয়া থামিয়ে দিল। নিজেদের ট্রে গুলো নিয়ে একপাশে জমা করলাম সবাই। এবার অন্য একটি দরজা দিয়ে বাইরে বের হয়ে এলাম। ততক্ষণে সূর্যের তেজ বেড়েছে। আমরা সারি দিয়ে দেয়ালের পাশে দাঁড়ালাম। হঠাৎ কিছু কিছু বড় বড় ট্রাক আসা শুরু করল। আমাদের সবাইকে আবার ট্রাকে উঠানো হলো। গন্তব্য কোথায় কিছুই জানি না। ছেলেটি জড়সড় হয়ে আমার পাশেই বসে আছে। ঢ্যাঙ্গা লোকটিও ধারে কাছেই আছে। চারপাশে দেখার কিছু নেই শুধু ধূ ধূ বিরাণ ভূমি ছাড়া। আমি খেয়াল করে দেখলাম কোথাও কোন লম্বা গাছ নেই। তাই ছায়ার প্রশ্নই আসে না।
হঠাৎ আমাদের ট্রাক থামল এরকম কোন এক বিরাণ ভূমির সামনে। সেখানেই আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো। আমাদের কাজ বুঝিয়ে দেয়া হলো। আজকের কাজ হবে মাটি থেকে পাথর সরানো। আমরা কাজে নেমে পড়তে বাধ্য হলাম। মাটিতে ছোট ছোট পাথর কণা। আবার কিছু বড় পাথরও আছে। পুরো জমিটাতে আমাদের পাহার দিচ্ছে বেশ কিছু গার্ড। এদের সবার হাতেই একটি করে রাইফেল। এখানে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলার কোন সুযোগ নেই। তবুও ঢ্যাঙ্গা লোকটি এক ফাঁকে ফিসফিস করে বলল, "আমি লিয়াম"। আমি কোন উত্তর দিলাম না। পাশ থেকে ছেলেটি বলে উঠল, "আমি মিলাভ"। আমি এরও কোন উত্তর দিলাম না। কী হবে এঁদের নাম জেনে!
হঠাৎ একটি গার্ড এদিকেই আসতে শুরু করল । ও কি দেখে ফেলেছে আমাদের কথা বলতে? শুনতে পেয়েছে কিছু?
"এই যে, এই তুমি।" আমার দিকে আঙ্গুলের নিশানা । "এপাশে এসে এই পাথরটা সরাও।" গলায় অযথাই ঝাঁঝ। আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে গার্ডটিকে অনুসরণ করলাম। সারাদিন এই করে গেল। জমি থেকে পাথর বাছাই। পাথর বাছাই যখন শেষ হলো , সুর্য তখন পৃথিবীকে আভূমি প্রণাম জানাচ্ছে। আমাদের আবার ট্রাকে তোলা হলো। আবার সেই হলরুম এবং আটার দলা। সব শেষ করে নির্ধারিত বাংক বেড। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সব লাইট অফ হয়ে গেল। ঘুটঘটে অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরম। লিয়াম নাক ডাকতে শুরু করেছে। বেচারাকে দোষ দিতে পারলামনা। ওর এই পাতলা শরীরের উপর দিয়ে ভালো ধকল গেছে। আমার শরীর বলছে ঘুমাতে কিন্তু মন দিচ্ছে না। ওলগার গোলগাল মুখটা মনে পড়ছে। ছেলেমেয়েদের ভীতসন্ত্রস্ত মুখগুলো ভুলতে পারছি না। ওলগা কীভাবে সামাল দিবে সব!
হঠাৎ মনে হলো পায়ের উপর দিয়ে কিছু একটা দৌড়ে গেল। মিলাভ ওর বিছানায় তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। ছেলেটি রাতেও আটার দলা ছুঁয়ে দেখেনি। দেখ, বিছানায় কেমন বসে আছে জড়সড় হয়ে! একটু পর ফোঁপানোর আওয়াজ শুনতে পেলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমার চোখ খোলা রাখাই দায় হয়ে গেছে। চোখ খুলতে হলো সাইরেনের শব্দে। পাশের বাংকে মিলাভ কুঁকড়ে শুয়ে আছে। এখনও ঘুমাচ্ছে। সাইরেনের শব্দ কানে পৌঁছাইনি এখন অবধি। লিয়াম উপড়ে আড়মোড়া ভাংছে। বাংক বেডগুলো থেকে সবাই আস্তে আস্তে নামতে শুরু করেছে। মিলাভকে জাগাতে ইচ্ছে করছে না। ওঁর ঘন কালো এলোমেলো চুলগুলোতে গিয়ে একটা হাত রাখলাম । ডাকতে হলো না। নিজে নিজেই চোখ মেলে তাকাল। বড় বড় চোখে একটু বিস্ময়। লিয়ামও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওঁদের দু' জনকেই এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করলাম ।
দিন হিসেব নিকেশ করে বলতে পারব না যে ক্যাম্প নম্বর বিশে আমাদের আজকে ঠিক কতদিন। দিনের হিসেব আসলে রাখতে পারিনি। শুধু জানি , এই রুক্ষ-শুষ্ক বিরাণ ভূমি থেকে পাথর বাছতে সময় লেগেছে অনেকদিন। মিলাভ এখন আটার দলা খাচ্ছে। লিয়ামের কপালের ক্ষত শুকিয়ে গেছে। ওলগার মুখ ঝাপসা হয়ে আসছে মাঝে মাঝে। দানিলের বিশ থেকে বাইশ হয়েছে। বোকা দু'জন কীভাবে জানি গার্ডদের দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পেরেছিল। কিন্তু দানিলকে পারেনি । দানিলের অব্যার্থ নিশানা ওঁদের বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে। লিয়াম আমাকে গল্প শোনায়। এঁরা দু'জন পারেনি। এঁদের ভাগ্য খারাপ। কিন্তু কয়েকবছর আগে একজন পেরেছিল সবার চোখ ফাঁকি দিতে। সুতরাং সম্ভব। লিয়াম স্বপ্ন দেখতে চায়। আমি চাইনা। আমি চাইলেও পারি না।
জমিতে গম লাগানো হয়েছে। গমের চারা উঁকি দিচ্ছে। দূর থেকে দেখলে এখন একটু হলেও সবুজের দেখা মিলছে। একদল গমের ক্ষেতে আগাছা উঠানোর কাজ করে। আর এক দলকে আবার কোন এক বিরাণভূমিতে পাথর সরানোর কাজ দেয়া হয়েছে। চারিদিকে গার্ড কড়া নজর রাখে কেউ যেন কাজে কোনরকম ফাঁকি দিতে না পারে। প্রচণ্ড দাবদাহ কারোরই সহ্য হয় না। কিন্তু কারো কারো জন্য তা হয়ে উঠে অসহ্য। হঠাৎ করেই কেউ না কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দূর্বল দেহ আর সইতে পারে না। গার্ড গুলো তড়িঘড়ি করে পড়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে কোথায় যেন চলে যায়। সেই শরীরকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
লিয়াম এবং মিলাভ এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। তবুও আমি ওঁদের উপর চোখ রাখি। আমি জানি এর বেশি আমি কিছুই করতে পারব না। আজকাল ঘুম হচ্ছে না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করি। থেকে থেকে ওলগার মুখ মনে করার চেষ্টা করি । পায়ের উপর লাফিয়ে যাওয়া বস্তুটির হদিস পেয়েছি। আমি তার নাম দিয়েছি "নিকোলাই"। আমরা বেশ বন্ধু হয়ে গেছি। সম্ভবত মিলাভও তাই। কারণ সে আগের মত তড়াক করে লাফিয়ে উঠে না। কোনদিন আটার দলার সাথে রুটি জুটে যায়। সেদিন চুপিচুপি নিকোলাই এর জন্য কিছু নিয়ে আসি। নিকোলাইয়ের সাথে আমার মিলাভ আর লিয়ামের ছোটখাটো একটা পিকনিক হয়ে যায়। লিয়াম আজকাল আমাকে স্বপ্ন দেখতে বলছে। আমারও দেখতে ইচ্ছে করছে।
মাঝে মাঝে গার্ডদের গল্প কিছু কিছু কানে আসে। সে থেকেই জানা গেল গমের ফলন ভালো হয়নি। জমি অত্যধিক অনুর্বর। জমি থেকে সমস্ত পাথর সরাতে হবে। শোনা যাচ্ছে এবার ভুট্টার চাষ করে দেখা হবে। আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। সে জন্য চাই আরও কিছু লোক। বেশ কিছুদিন পর ক্যাম্প নম্বর বিশে কিছু নতুন মুখের আগমন ঘটল। সেখানে কিশোর-যুবক সবাই আছে।
ভ্লাদিকের জায়গা হয়েছে মিলাভের উপরের বাংকে। ভ্লাদিক বছর পঁচিশেকের এক যুবক। চোখে এখনও ভাবালুতার আবেশ। পরিবারের একমাত্র ছেলে সে। ওঁকে ধরে আনা হয়েছে ওঁর বাবা মায়ের চোখের সামনে থেকে। ভ্লাদিকের বাড়ি এই ক্যাম্প থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ঘন্টা তিনেকের পথ। ওঁর এই এলাকা সম্পর্কে ভালোই ধারণা আছে। লিয়ামের গল্প শুনে ওঁর চোখ চকচক করে। এখানকার রাস্তাঘাট ওঁ ভালোই চেনে। সে সাহায্য করতে প্রস্তুত। ভ্লাদিকের বাড়ি পার হয়ে পশ্চিম দিক বরাবর ঘণ্টা চারেক হাঁটলেই অগাস্তেন শহর। সেখানে একটি ট্রেন স্টেশন আছে। আমাদের সেই স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। ঠিক হলো আমরা রাতের আঁধারেই কাজ সারব। সারাদিনের প্রচণ্ড রোদে একটানা কাজ করে সবাই মোটামুটি কাহিল থাকে এসময়। আমি কিছু গার্ডদের এইসময় ঝিমোতেও দেখেছি।
আমাদের প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে আরও কয়েকমাস লেগে গেল। আমি ভুট্টার ক্ষেত বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ভুট্টার ক্ষেত বেশ ঘন। এখানে কেউ লুকিয়ে থাকলে তা টের পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ঠিক হল পরেরদিন আমরা চেষ্টা করব। সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে, সূর্য ডুবে গেলে সেখানেই আমরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকিয়ে গেলাম। যেন ধরা পড়লে সবাই এক সঙ্গে না পড়ি। একসময় ট্রাকগুলো সবাইকে নিয়ে চলে গেল। আমরা আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম । আজ আকাশে চাঁদ নেই। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমরা চারজন ভুট্টা ক্ষতে থেকে এবার বের হয়ে আসলাম। ভ্লাদিক আমাদের আগে আগে চলল। অমসৃণ মাটিতে পা ফেলা ভার। তবুও আমরা তিনজন যতটা পারি জোড়ে পা ফেলছি। আমরা কেউই চাইনা দানিলের সংখ্যা বাড়াতে। আমরা চারজন ক্রমাগত হেঁটে চলেছি এই ধূসর প্রান্তরে। কেউ কোন কথা বলছিনা। ভ্লাদিক সবার সামনে, লিয়াম তার পেছনে, মিলাভ লিয়ামকে অনুসরণ করছে, আমি বাকী সবাইকে। আমি জানি যদি পালাতে ব্যর্থ হই, দানিলের অব্যর্থ নিশানা আমিই হব সবার প্রথম।
কিন্তু এই চিন্তা আমার চলার গতি শ্লথ করতে পারছেনা। মিলাভও আশ্চর্যভাবে আমাদের সাথে সমান তালে পা চালিয়ে চলছে। অবশেষে অগাস্তেন শহরে আমরা কোন ঝামেলা ছাড়াই পৌঁছতে পারলাম। ভ্লাদিক আমাদের সাথে চলে এসেছে । ওঁর বাড়িতে থামেনি। কারণ ওরা টের পেলে প্রথমেই ওঁর বাড়িতে খোঁজ নেবে। ভ্লাদিক ওঁর বাড়িতে মোটেও নিরাপদ নয়। আমরা ঠিক করেছি এখনই আমরা বাড়িতে ফিরে যাবনা। এই ট্রেন পশ্চিমের শহর উলান পর্যন্ত যাবে। উলান বড় শহরেরে মধ্যে একটি। এখানে লোকের ভিড়ে সহজেই হারিয়ে যাওয়া যাবে। আমরা সেখানেই নামব। লিয়ামের দূরসম্পর্কের চাচাত ভাই আছে সেখানে। আশা করি সে কিছুদিনের জন্য আমাদের জায়গা দিতে পারবে।
অগাস্তেন উলানের মত বড় শহর নয়। তারপরও মাঝ রাত্তিরে স্টেশনে লোকসমাগম একদম কম নেই। যে যেমন পারে স্টেশনে খালি জায়গা দখল করে নিয়েছে। শুয়ে আছে কোন রকমে ছেঁড়া কম্বলে গা ঢেকে। এর মধ্যে নারী এবং শিশুর সংখ্যাই বেশি। আমি জানি এঁদের বেশিরভাগের স্বামী এবং বাবা কোন না কোন ক্যাম্পে পাথর বাছাই করছে। আমরা এঁদের কোনরকম টপকিয়ে স্টেশন ঘরের দিকে ছুটলাম। জানা গেল ট্রেন আসতে আর কয়েক মিনিট দেরী। আমাদের এই কয়েক মিনিটকে কয়েকশ ঘন্টা মনে হচ্ছে। মিলাভ কখন আমার হাত ধরে আছে টের পাইনি। আমি ওঁর হাতটি শক্ত করে মুঠোয় পুরে নিলাম।
ভ্লাদিকের চোখে মুখে উত্তেজনা। লিয়াম ভীত সন্ত্রস্ত। আমি উৎকণ্ঠিত। যেভাবে হোক আমাদের এই ট্রেনে উঠতে হবে। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি , হেরে গেলে চলবেনা । ওলাগার মসৃণ গালে আমার হাত ছোঁয়াব। কোন একদিন রেডিওর তিন নম্বর স্টেশনটা চালিয়ে দিয়ে সবাইকে নিয়ে গরম স্যুপ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করব। আমার চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে হঠাৎ ট্রেনটা এসে থামল ভীড় স্টেশনে। লোকজন ঠেলে ঠেলে কে কার আগে উঠার চেষ্টা করছে। লোকজনের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে ভ্লাদিক আর লিয়াম উঠে গেছে বগিতে। আমিও অনেক কসরতের পর উঠতে পারলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার হাতের মুঠোতে মিলাভের ছোট্ট হাতটি নেই। আমার হৃদয় ধক করে উঠল। আমি ট্রেনের ভেতরে চোখ বোলালাম। ভ্লাদিক আর লিয়ামকে চীৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম মিলাভের কথা। ওঁদের কাছেও মিলাভ নেই।
ট্রেন আস্তে আস্তে চলতে শুরু করেছে। আমি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বাইরেটা দেখার চেষ্টা করছি। হঠাৎ আমার হৃদস্পন্দন থেমে গেল। পিঠ দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল । গা টা গুলিয়ে উঠল । দানিল শক্ত করে মিলাভের হাত ধরে আছে। পাশে দু'টো গার্ড। মিলাভ আমার দিকে অপলক চেয়ে আছে। চোখে অবাক দৃষ্টি। ভ্লাদিক এবং লিয়াম ততক্ষণে জানলা দিয়ে দানিলকে দেখতে পেয়েছে। ওঁরা আমার দিকে তাকাল। চোখে হতাশার দৃষ্টি। ট্রেনের স্পিড বাড়ছে। ওলগার মুখটা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। হয়ত তা ছোঁয়া হবে না আর কোনদিন ।


2 মন্তব্যসমূহ
গল্পটা খুব ভালো লাগলো, কিন্তু পরিণতি তে মন খারাপ হয়ে গেল ৷
উত্তরমুছুননিষ্ঠুর বন্দী জীবনের কাহিনী! গল্প হিসেবে ভালোই লেগেছে।
উত্তরমুছুন