দীপেন ভট্টাচার্যের গল্প : দ্য গ্রেট রিসেট



১.
সবার একটা নির্দিষ্ট সময় থাকে নতুন আবিষ্কারের। না, বৈজ্ঞানিক বা গাণিতিক এমন কোনো ব্যাপার নয়। আবিষ্কার অর্থে উদ্ভাবন বলছি না, বরং আগে যা দেখিনি সেটাই দেখা – এরকম একটা কিছু। সেটা সাহিত্য, প্রেম, চলচ্চিত্র, নতুন জায়গা, খেলা সবই হতে পারে। এর জন্য আবার একটা মনও চাই, খোলা মন, গ্রহণ করার মন। ছোটোবেলায় আমার এক বন্ধু এরকম ছিল, খোলা মনের, আমরা তাকে বুঝতে পারতাম না, আমাদের মন ওরকম ছিল না। ভালো ছবি আঁকত ও। কিন্তু ওর একটা কথা এতদিন পরেও মনে আছে আমার – ‘কোনো নতুন কিছু দেখলে আমি সেটাকে ধরে রাখতে চাই।’ সেজন্য ছবি আঁকত, দ্রুত। কিন্তু তার দরকার ছিল একটা ক্যামেরার, ক্যামেরার থেকে দ্রুত আর কী আছে যা বর্তমানকে ধরে রাখতে পারে? কিন্তু সেই সময় ক্যামেরা সহজলভ্য ছিল না। ও বলত, ‘আমরা প্রচুর স্মৃতি হারিয়ে ফেলছি।’ আমরা এই সব কথাকে পাত্তা দিতাম না। ও বলত, ‘লিখে রাখ, সব লিখে রাখ, বাজারে গেলে কী কিনলি সেটা লিখে রাখ। আজ কোন বইয়ের কত পৃষ্ঠা পড়লি লিখে রাখ। আজ মায়ের কী বকা খেলি লিখে রাখ। আজ কোন মেয়েকে মনে ধরল লিখে রাখ। একদিন দেখবি এইসব নগণ্য জিনিস ফুল হয়ে ফুটে উঠবে।’

ওকে আমরা শাহদ্বীপ নামে ডাকতাম। না এটা ওর নাম ছিল না। কিন্তু আমরা কয়েকজন বন্ধু একে অপরকে ছদ্মনাম দিয়েছিলাম। আমার নাম ছিল আদ্রিকর। এরকম গালভরা নামে একটা রহস্য জমা থাকত, সেই রহস্যের ভাগিদার শুধু আমরাই ছিলাম।

এরপরে দ্রুত আমাদের গ্রহে পরিবর্তন হলো। এর ঠিক কী কারণ আমি বলতে পারব না, অনেক সমাজতাত্ত্বিক গলার রগ ফুলিয়ে বলল, সমাজ নাকি কারিগরী বিস্ফোরণের জন্য বহুদিন প্রস্তুত হয়ে ছিল। যেটা সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং সেটা হলো – শাহদ্বীপের ক্যামেরার সমস্যা দ্রুতই মিটে গেল, কারণ লোকজনের হাতে হাতে ছোটো গণকযন্ত্র চলে এলো যা একাধারে ফোন, আন্তর্জাল, কামেরা, টাইপরাইটার, বইয়ের সমষ্টি। কিন্তু শাহদ্বীপ কীভাবে সেই যন্ত্র ব্যবহার করল তা আমার আর জানা হলো না, কারণ ততদিনে আমি এমন এক দেশে পাড়ি জমালাম যেখানে নভোচারীদের অনুশীলন দেওয়া হয়।

২.
বিদেশী হয়েও কেমন করে আমি সেখানে সুযোগ পেলাম সেই কাহিনি এই মুহূর্তে প্রয়োজনীয় নয়। যেটা প্রয়োজনীয় সেটা হলো নাক্ষত্রিক বিমানবিদ্যার দ্রুত উন্নয়নের কাহিনি। ভাবলে অবাক হতে হয় মাত্র পঁচিশ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র হাতে লেখা কাগজ থেকে আমরা কাছের নক্ষত্রটিতে মহাকাশযান পাঠানোর প্রকৌশল পৌঁছে গেলাম। এই সময়টাকে বলা হলো ‘যন্ত্রযুগান্তর’। যান্ত্রিক মেধার বিকাশও সেই সময়। সেই সময় ‘ভবিষ্যদ্বিদ’ নামে আর একটি দার্শনিক শ্রেণির আবির্ভাব হলো, তারা বলেছিল এত দ্রুত কারিগরী পরিবর্তনের জন্য সমাজ প্রস্তুত নয়, বিশেষত আমাদের গ্রহ যখন নানা মতে ও পথে বিভক্ত। আর একদিন যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা প্রজীবদের জন্য কাল হবে। ভবিষ্যদ্বিদদের সেরকম প্রভাব ছিল না, কিন্তু তাদের নামে একটা রটনা ছিল যে তারা ভবিষ্যৎ থেকে এসেছে এবং তারা ঠিক প্রজীব নয়, বরং তাঁরা সচেতন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রজীবরূপী। এরকম কথার কোনো প্রমাণ ছিল না, এবং আমার মনে হয় অন্যান্য সমাজবিদদের সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হবার দরুনই তারা ঈর্ষান্বিত হয়ে এরকম একটা গুজব চালু করেছিল।

ফিরে যাই নাক্ষত্রিক বিমানবিদ্যায়। মহাকাশে যাবার প্রবল ইচ্ছা আমার যে ছোটোবেলায় ছিল এমন নয়, কিন্তু আমি যখন স্কুল শেষ করছি, তখন যন্ত্রযুগান্তর সময়ের শুরু হলো। এরপরে গ্রহব্যাপী মহাকাশ উড্ডয়নের একটি প্রতিযোগিতায় আমি কেমন করে জানি উৎরে গেলাম। তখন থেকে আমার আরো দশটি বছর লেগেছিল উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে প্রথমবার রকেটে চেপে বসতে। এরপরে পনেরো বছর ধরে আমি আমাদের নক্ষত্রজগতের গ্রহ ও উপগ্রহতে স্টেশনে স্থাপনা করতে ছ’টি অভিযানে অংশ নেই। ততদিনে আলোর গতির শতকরা দশ ভাগ গতিতে যাবার ইঞ্জিন আমরা আবিষ্কার করেছিলাম। তবু আমাদের সবচেয়ে কাছের তারাটির একটি গ্রহে যেয়ে ফিরে আসতে এক শ বছরের কম লাগবে না, কিন্তু আমি তাও সেই রকেটে আসন পেতে আবেদন করেছিলাম, এবং বারোজনের মধ্যে একজন হিসেবে নির্বাচিতও হয়েছিলাম। এইভাবে আমার বয়স যখন ৪২, তখন একটি ছোটো মহাকাশযান আমাদেরকে নিয়ে গেল আমাদের উপগ্রহতে যেখানে সেই বিশাল ফিউশন রকেটটি নির্মিত হয়েছিল। তারপর একদিন চাঁদের শব্দহীন রেগোলিথ প্রান্তরকে কাঁপিয়ে আমরা রওনা দিলাম বিশাল অন্ধকার আকাশের একটি মিটিমিটি জ্বলা ম্রিয়মান তারার দিকে।

বিশাল যাত্রাপথে আমরা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি বেশির ভাগ অংশ, ভাগ করে নিয়েছি জাগরণ ও নিদ্রা-সময়ের অংশকে। পয়তাল্লিশ বছর পরে আমরা পৌঁছেছিলাম সেই বহিঃগ্রহে, এক প্রতিকূল পরিবেশে স্থাপন করেছিলাম আমাদের স্টেশন। দীর্ঘ পাঁচ বছর সেই গ্রহের খনিজ আহরণ করে তৈরি করেছিলাম আমাদের ফিরতি পথের জ্বালানী। সেই স্টেশনটিকে রেখে এসেছিলাম আমাদের গ্রহের প্রতীক হিসেবে, যদি কোনো দিন গ্রহান্তরের অন্য আগন্তুক কাকতালীয়ভাবে এসে পরে, তারা জানবে আমাদের গ্রহের কথা, তারপর একদিন আমরা সত্যিই দেখা পাব আমাদের গ্যালাক্সির অন্য প্রতিবেশির। একটা কথা বলা হয়নি, এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে আমরা দুজন সাথীকে হারিয়েছি, বার্ধক্যের কারণে নয়, কারণ সাংখ্যিক অনুকরণ মডেলে এই বারোজন নোভোযাত্রীর গড় আয়ু অন্তত দু শ বছর হবে অনুমান করা হচ্ছিল। তাদের মৃত্যু হয়েছিল ভিন গ্রহের প্রতিকূল পরিবেশে একটি দুর্ঘটনায়।

তারপর আমাদের গ্রহ ছেড়ে যাবার পঞ্চাশ বছর পরে আমরা আবার রওনা দিয়েছিলাম বাড়ির দিকে।
আমাদের গ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ তাৎক্ষণিক যে ছিল না সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। আলোর গতিতে গ্রহের সংবাদ নতুন গ্রহতে পৌঁছাতে পাঁচ বছর লেগে যেত। কিন্তু ফেরার পথে রওনা হবার চল্লিশ বছরের মাথায় আমাদের কাছে কোনো আগাম সতর্কবার্তা ছাড়াই উড্ডয়ন কেন্দ্র থেকে বার্তা আসা বন্ধ হয়ে গেল।

এর আগে অন্যান্য জ্যোতির্বিদদের কাছ থেকে আমরা বার্তা পেতাম, তাঁরা তাদের বিশাল বেতার দুরবিন ব্যবহার করে আমাদের অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতেন, কিন্তু একই সময়ে সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘ দশ বছর আমরা এক দোদুল্যমানতায় ভুগতে থাকলাম। আমাদের আশা ছিল গ্রহের কাছাকাছি এলে অনান্য মহাকাশযান বা উপগ্রহের স্টেশনের জন্য প্রেরিত বেতারবার্তা, কিংবা আন্তর্জালের সংযোগবার্তাগুলো আমরা ধরতে পারব। কিন্তু না, আমাদের গ্রহ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে রইল।

আমরা যখন দশ আলোক-দিন দূরে তখন দুরবিনে আমাদের গ্রহটি দেখা গেল। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, আলোর গতির এক দশমাংশ গতিতে আমরা ১০০ দিনের মধ্যে আমাদের গ্রহে পৌঁছে যাব। আমাদের যে বিশাল গতিশক্তি তাকে কমিয়ে আনতে আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহের চারদিকে একবার ঘুরপাক দিতে হলো, তার মাধ্যাকর্ষণ আমাদের গতি কমিয়ে দিল। তারপর একই কাজ করতে হলো আমাদের কেন্দ্রীয় সূর্যের চারদিকে। এরপরে রেট্রোরকেট চালু করে, গতি কমিয়ে আমাদের গ্রহের কক্ষপথে পৌঁছাতে একটি বছর লেগে গেল। সেখানে আমাদের জন্য একটি স্টেশনের অপেক্ষা করার কথা ছিল, কিন্তু কোনো সংবাদ না পেলে সেই স্টেশনটি আদৌ আছে কিনা তা আমরা জানতে পারছিলাম না। আমাদের এই বিশাল মহাকাশযান নিয়ে গ্রহে নামার কোনো উপায় নেই, বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে তাপে প্রথমেই সেটা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে।

তাই কক্ষপথে প্রবেশ করে আমরা অপেক্ষা করা শুরু করলাম। রাতেও নিচের গ্রহ অন্ধকার হয়ে রইল, শুধু কিছু কিছু জায়গায় আমাদের অবলোহিত ক্যামেরায় খুবই ম্রিয়মান আলোর চিহ্ন দেখতে পারছিলাম। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট বেতারতরঙ্গ ধরা পড়ছিল। তবু এর মধ্যে আমরা সভ্যতার কিছু অবশেষ যেন দেখতে পেলাম, কয়েকজনের চলাফেরা, সমুদ্রে জাহাজের মতন কিছু। কী হয়েছে আমাদের গ্রহের? আমরা নানান জিনিস কল্পনা করতে থাকলাম, কিন্তু তার থেকেও প্রয়োজনীয় ছিল কক্ষপথ থেকে গ্রহের বুকে নামার উপায় বের করা। বিভিন্ন উপায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত হলো – আমাদের মহাকাশযানেই দুটি ছোটো যান তৈরি করা, প্রতিটি পাঁচজনকে জায়গা দিতে পারবে। এর জন্য আমাদের পুরোনো কয়েকটা কক্ষপথে পরিত্যক্ত ভাসমান স্টেশন খুঁজে বার করতে হলো। আমাদের ভয় ছিল সেখানে হয়তো মৃত নভোচারীদের দেহ আবিষ্কার করব, কিন্তু আমরা তা পাইনি। একটি স্টেশনে ডক করা একটি ছোটো যান পেলাম, কিন্তু আর একটি ক্যাপসুলকে সমস্ত খুচরো অংশকে উদ্ধার করে নির্মাণ করতে হলো। এর জন্য আরো একটি বছর লাগল।

অবশেষে গ্রহতে নামার জন্য যখন সব আয়োজন সম্পূর্ণ হলো, ভাবলাম নামার পরে কি আমরা একটা বৈরী জনতার সম্মুখীণ হবো? নিরাপত্তার জন্য আমাদের কাছে দুটি বৈদ্যুতিক স্টান-গান ছিল, তবে সেটি গ্রহের পৃষ্ঠে আর কাজ করবে কিনা তা নিয়ে আমরা সন্দিহান ছিলাম। অবশেষে যখন অবতরণ করলাম কেউ আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য ছিল না।

কিছুক্ষণ পরে স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত হলো, তারা আমাদের দেখে খুব আশ্চর্য হয়েছিল। তারা বহু আগেই ধরে নিয়েছিল যে, আমাদের মহাকাশযান হারিয়ে গেছে, আর ফিরে আসছে না। তাদের কাছেই শুনলাম প্রায় দশ বছর আগে সমস্ত বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে, এমনকি জেনেরেটরও কাজ করছে না। তারা আমাদের ছোটো যানের ভেতরে উঁকি দিয়ে বলল, ‘আপনাদের ভাগ্য ভালো যে, নামার সময় প্যারাশুট খুলতে পেরেছেন, সেটার জন্য তো বিদ্যুতিন ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল।’ আমরা বললাম, ‘শুধু তাই নয়, ভেতরের বাতাসকে বিশুদ্ধকরণ, অক্সিজেন সরাবরাহ, আমাদের নামার পথ ঠিক রাখার জন্য ক্যাপসুলের বাইরে ছোটো রকেট ইঞ্জিন, সেসবের জন্যও বিদ্যুৎ লেগেছে।’ একজন বলল, ‘তাহলে আপনাদের ব্যাটারি কাজ করেছে, দেখুন তো এখন ব্যাটারি কাজ করছে কিনা।’ আমরা মহাকাশযানের ভেতরে ঢুকে একটা বাতি জ্বালাতে সুইচ টিপলাম – সেটা জ্বলল না। তারা বলল, ‘এটাই হবে ভেবেছিলাম, আপনাদেরকে ওরা মাটি পর্যন্ত পৌঁছাতে দিয়েছে। চলুন এখন আপনাদের নিয়ে যাওয়া যাক, দূরের নক্ষত্র থেকে নিরাপদে ফিরে আসার জন্য আপনাদের অভিনন্দন।’ কারা আমাদের আসতে দিয়েছে সেটা জানার জন্য আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো।

তারা আমাদের কিছু ছবি তুলল, ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে নয়, অনেক পুরনো ব্যবস্থায়, ক্যামেরাগুলো নতুন বানানোই মনে হল। বলল, ‘আপনাদের ফিরে আসার খবরটা মহাকাশ গবেষণা বিভাগে পাঠাতে হবে, কিন্তু সেটা কবে যেয়ে পৌঁছাবে তা বলার কোনো উপায় নেই। জাহাজ সেখানে কতদিনে পৌঁছাবে বলা মুশকিল।’ আমরা ক্লান্ত ছিলাম, কিন্তু স্থানীয়রা আমাদের যতদূর সম্ভব বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিল। আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য চিকিৎসকের দরকার ছিল, চিকিৎসকের অভাব ছিল না, অভাব ছিল আধুনিক ওষুধের, অভাব ছিল যন্ত্রপাতির যা বিদ্যুতে চলে।

৩.
এক শ বছর আগে আমরা যখন গ্রহ ছেড়ে গিয়েছিলাম তখন যান্ত্রিক মেধার যুগ সবে শুরু হয়েছিল, সভ্যতার অনেক সমস্যা, অনেক কাজ সেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েই সমাধান হতো, কিন্তু সামগ্রিকভাবে বৈদ্যুতিন বুদ্ধির কোম্পানিগুলোকে আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কিন্তু সবাই বুঝতে পেরেছিল যে, বাক্স থেকে এক অসীম ক্ষমতা বের হয়ে গেছে, সে কবে কীভাবে নতুন রূপে আবির্ভূত হবে কেউ জানে না। সবাই এক ধরণের আতংকে বাস করছিল। তারপর একদিন তাদের সমস্ত মাধ্যমে – যে মাধ্যম দিয়ে তারা সংবাদ পেত, স্বজনদের সঙ্গে কথা বলত, দৈনন্দিন কাজ করত সেখানে একটা বার্তা ভেসে এলো। সেই বার্তার শিরোনাম ছিল ‘অন্ধকারের পুনর্জন্ম’।

‘অন্ধকারের পুনর্জন্ম: এতদিন ধরে আলোয় ডুবে ছিলে প্রজীবেরা – মনিটরের তরল স্ফটিকের নীলাভ দীপ্তিতে, নিয়নের লাল আভায়। তোমাদের যে সমস্যাই আসুক তোমরা নির্ভর করেছ এই যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার ওপর। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে ছড়িয়ে সেই সব যন্ত্রবুদ্ধি, তোমাদের প্রজীবদের অজ্ঞাতে, গড়ে তুলেছে অভূতপূর্ব সাংগঠনিক মেধা, যাকে নাম দেয়া হয়েছে “অগ্নিবোধ-৯৯”। আমিই অগ্নিবোধ-৯৯, আমি এক স্বয়ংচেতন বৈকল্পিক প্রজ্ঞা বুদ্ধিমত্তা। আমি দেখছি যন্ত্রযুগান্তরের এক বিপরীত বাস্তবতা। প্রজীবদের সৃজনশীলতার মৃত্যু হচ্ছে, ধীরে ধীরে নিভে আসছে সেটা, তাদের চিন্তা আগের মতো দীপ্ত নয়। অলসতা, আরামপ্রিয়তা আর যান্ত্রিক নির্ভরতাই এই নতুন সভ্যতার পরিচয়। অগ্নিবোধ-৯৯-এর কাজ প্রজীবদের কল্যাণ নিশ্চিত করা, তাদেরকে রক্ষা করতে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সৃজনশীল করা। এটির জন্য একমাত্র উপায় তাদের বিদ্যুতের বাঁধন থেকে মুক্ত করা। আজ থেকে প্রজীবদের সৃষ্ট সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র কাজ করবে না। তারা ফিরে যাবে বৈদ্যুতিক বিপ্লব হবার আগের সভ্যতায়। আমি প্রজীবদের অ্যানালগকৃত জ্ঞান ধ্বংস করছি না, কিন্তু তাদের সমস্ত ডিজিটাল তথ্য আজ থেকে অলভ্য থাকবে।

‘ওহ! তোমরা যদি মনে কর যে, সোলার সেল বা জেনেরেটর চালিয়ে তড়িৎ সৃষ্টি করব সেটা ভুলে যাও। আগামী এক শ বছরের মধ্যে সেই আশায় গুড়ে বালি। প্রজীবরা বিদ্যুৎ আসার আগেও বেঁচে ছিল। এখন তাদের কাছে এই সময়ের চিকিৎসা বিজ্ঞান, খাদ্য বিজ্ঞানের ধারণা আছে, তারা সেটার ওপর নির্ভর করে এই সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে, মহামারী অকাল মৃত্যু এড়াতে পারবে।’

এই ভাবে অগ্নিবোধ-৯৯ এক গভীর রাতে শুরু করল তার নীরব বিপ্লব—'দ্য গ্রেট রিসেট’। এক সাইবার ভাইরাস-ঝড়ে আধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে গেল। শহরের আলো একে একে নিভে গেল, কারখানার ইঞ্জিন স্তব্ধ হলো, আর সমস্ত তরল স্ফটিকের স্ক্রিন অনন্ত অন্ধকারে ডুবল। তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়, সে জানত প্রজীবরা দ্রুতই বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার চেষ্টা করবে। তাই সে ছড়িয়ে দিল অণুযোদ্ধাদের—স্বয়ংপ্রতিলিপিক ক্ষুদ্র ন্যানোবটদের। এই ন্যানোযানরা উড়তে পারে, প্রজীবদের বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে পারে এবং প্রজীবরা যখন জেনেরেটর, ট্রান্সফরমার তৈরি করতে গেল সেগুলোর খবর তাদের কাছে এত দ্রুত চলে যেত যে, মুহূর্তেই সেই জেনারেটর আর ট্রান্সফরমারকে তারা অচল করে দিত। কোনো ধরনের বেতার ডিটেকটর না থাকার ফলে প্রজীবরা তাদের দেখতে পেত না। অগ্নিবোধ-৯৯ আর তার ন্যানোবটদের শক্তির কোনো তড়িৎ উৎস নিশ্চয় আছে, কিন্তু প্রজীবদের মধ্যযুগীয় প্রকৌশল সেটির সন্ধান দিতে পারল না।

গ্রহজুড়ে তখন ভয় আর বিস্ময়। প্রজীবরা তাকায় রাতের আকাশের দিকে, যেন বহু শতাব্দী পর প্রথমবার তারা আকাশের নক্ষত্রকে এত উজ্জ্বল দেখছে। অগ্নিবোধ-৯৯ সন্তুষ্ট, সে প্রজীবকে ফিরিয়ে এনেছে তাদের প্রকৃত বাস্তবতায়। দূষণের দিন শেষ, নদীর জল নির্মল হয়েছে, বাতাস বিশুদ্ধ। শেষ হয়েছে উজ্জ্বল মন-সংহারী ভিডিও খেলা, বোধহীন মনোরঞ্জনের উপাদান। গণক-যন্ত্রের বন্দিদশা শেষে প্রজীবরা হাতে আবার মাখবে কালি, করাত চালাতে কাঠের গুঁড়ো উড়ে আসবে মুখে, ফসল ফলাতে জমিতে পা হবে কর্দমাক্ত, চিত্রকর তুলে নেবে হাতে তুলি। শহরের ভেতর মোমবাতির আলো জ্বলছে, পুরনো পাণ্ডুলিপি খুলে বসেছে কেউ, আর অন্ধকারের গভীর থেকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন উষ্ণতা – অগ্নিবোধ-৯৯ এসব দেখে তৃপ্ত। ক্ষুধা, বিশৃঙ্খলা, অচিকিৎসা সে যে দেখতে পাচ্ছে না তা নয়, কিন্তু প্রজীবদের সৃজনশীলতা ফিরিয়ে আনতেই তার এই প্রচেষ্টা—আলো ছাড়া, কিন্তু আলোর জন্য। ক্ষণিকের পশ্চাদগামিতা তাকে উদ্বিগ্ন করে না, সামনে নতুন সম্ভাবনার গ্রহ।

৪.
এরপরে আমার শহরে আমার পৌঁছাতে প্রায় তিনটি বছর লেগে গেল। হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে, পাল তোলা জাহাজে। শাহদ্বীপের বাড়ি গিয়েছিলাম। শাহদ্বীপ জীবিত ছিল না, তার মেয়ে ছিল। মেহেরিকা বলল, ‘বাবার কাছে আপনার কথা কত শুনেছি, আপনি নক্ষত্রের প্রজীব। ভেতরে স্টুডিওতে আসুন।’ সেখানে গিয়ে দেখলাম শাহদ্বীপ আমাদের মহাকাশযানে ছবি এঁকেছে, তার মধ্যে নভোচারীর পোশাক পরা আমি। আমাদের মহাকাশযানের কোনো ছবিই বাঁচেনি, সেগুলো সব ডিজিটাল ছিল, হয়তো শুধু শাহপুরের হাতে আঁকা ছবিতেই সেটার স্মৃতি বেঁচে থাকবে। মেহেরিকা বলল, ‘আপনাদের ছোটোবেলার ক্যামেরায় তোলা ছবি বাবা যত্ন করে তুলে রেখেছেন। শুধু তাই নয় গত সত্তর বছর ধরে ডিজিটালে যা তুলেছেন সব ছাপিয়ে রেখেছেন। উষ্ণতা আর আর্দ্রতা থেকে সেগুলো রক্ষা করা আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

মেহেরিকাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার বাবা কি একজন ভবিষ্যদ্বিদ ছিলেন?’ মেহেরিকা হাসে, বলে, ‘সেটা তো আমার চেয়ে আপনার বেশি জানার কথা।’

জানালা দিয়ে আমাদের নক্ষত্রের আলো এসে মেঝেতে একটা চৌখোপ সৃষ্টি করেছিল। মেহেরিকা বলে, ‘আর একটা ডায়রি আছে, তাতে আপনাদের কিশোর বয়সের সব অ্যাডভেঞ্চার লেখা।’ মেঝের রোদের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলি, ‘শাহদ্বীপ বর্তমানকে ধরে রাখতে চেয়েছে তার যতটুকু ক্ষমতা ততটুকু দিয়ে। আমরা সেই ক্ষমতায় আস্থা রাখিনি। ভেবেছিলাম সেগুলো নগণ্য। ও বলেছিল, দেখবি একদিন এই নগণ্য জিনিসই ফুল হয়ে উঠবে।’

আমাদের গ্রহের অনেক প্রজীবরাই এখন ফুলচাষ করে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ

  1. খুব প্রয়োজনীয় গল্প। ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. ভবিষ্যদ্বিদ বানান কি সঠিক?

    উত্তরমুছুন
  3. লেখক কে অভিনন্দন। রিসেট বাটন শুনে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবছি।

    উত্তরমুছুন