অনুবাদ: এলহাম হোসেন
হার্ট ল্যাম্প ১২টি ছোটগল্পের সংকলন। বইটির জন্য ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার জয় করেন বানু মুশতাক। জন্ম ১৯৪৮ সালের ৩ এপ্রিল ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে। লেখেন কানাড়া ভাষায়। তিনি একাধারে লেখিকা, সমাজকর্মী, আইনজীবী। সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নানান জনহীতকর কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তারই শক্তিশালী বয়ান হার্ট ল্যাম্প নামক গ্রন্থের ১২টি ছোটগল্প। গল্পগুলো কানাড়া থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন দীপা দীপা বাশতি
তখন ঠিক এশার নামাজের ওয়াক্ত। তারান্নুম দৌড়াতে দৌড়াতে এলো। ওর ব্যাগে আরবী বই। মাথায় ওড়না। তা অবশ্য বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য। চিৎকার করে বলে,“আম্মি! আম...মি!” ওর চুল থেকে জলের ফোটা ছিটিয়ে পড়ে। রাফিয়া তখন বাগদা শুটকি কয়লার আগুনে সেদ্ধ করছিল। তাই তারান্নুমের কথার কোন উত্তর দিলো না। তারান্নুম ছুটে ভেতরে ঢুকে বলল, “আম্মি, হাসিনা আর ওর মা মসজিদে বসে আছে।”
“ওহ, কেন?”
“নিশ্চয় আজকে কোন শালিস আছে।”
“ওহ, তাই নাকি?”
রাফিকে যখন পড়াশুনার জন্য মাদ্রাসায় পাঠানো হয়, তখন ওর বেঞ্চে বসে ঝিমানোর অভ্যাস ছিল। বই-পুস্তকের কথা ভুলে যেত। টুপি যে কোথায় রাখত, তা আর মনে করতে পারত না। বাসায় ফিরলে মা অসীমা যখন ওকে মুখে তুলে খাওয়ানোর জন্য পিড়াপিড়ি করে তখন সে ওর মা’র হাতটা সরিয়ে দেয়। বলে, “আম্মি, হাসিনার সঙ্গে ওর মা সেই তখন থেকে মসজিদে বসে আছে।”
“এই সময়? কেন রে?”
“মনে হয় কোন শালিস-দরবার আছে।”
“ওহ, শালিস-দরবার।”
এক টুকরো চকের বিনিময়ে মাদ্রাসার সব ছাত্রের মধ্যে দিয়াশলাইয়ের লেবেল ও নায়ক-নায়িকার ছবি বিতরণের পর ওর প্রত্যেকটি পকেট ভরে যায়। কিন্তু হামিদ বাড়ি পৌঁছার পর সে পোঁকাধরা দাঁতের ব্যথায় কাঁদতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আম্মি... হাসিনা...”
যখন একে একে বাড়ির সবাই খবরটি পেয়ে যায় তখন মাজেদা ডান হাতে কোরআন বুকের সঙ্গে চেপে ধরে, আর বাম হাতে সালোয়ারটি কাদা-ময়লা থেকে বাঁচানোর জন্য তুলে ধরে বাড়ি প্রবেশ করে।
ও দেখে, ওর বাবা বৈঠকখানায় অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। টেবিলে রাখার পূর্বে দু’হাতে কোরআনটি দিয়ে তার দু’চোখে স্পর্শ করলো। এরপর জিজ্ঞেস করে, আব্বাজান, মসজিদে যান নি কেন?”
“হুম, এশার নামাজের সময় কি হয়েছে? নামাজ শুরু হবার আরোও সময় হাতে আছে। একটু পরে যাব,” মসজিদের মুতাওয়াল্লি আব্দুল কাদের সাহেব বললেন। তেপায়া থেকে টুপিটা তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে মাথায় পড়েন। মাজিদা বলে, “আমি তো নামাজের কথা বলছি না। ঐ যে মসজিদে হাসিনা আর ওর মা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। মনে হয়, আজকে ওর বিচার-আচার আছে।”
“ওহ, হুম, ব্যাপার আসলে তাই। একটু দাঁড়া। কী যেন বললি? ঐ মহিলা মসজিদে বসে আছে? মসজিদের কোন জায়গায়টায়?”
নিজেই কাউন্সিলের মিটিং ডেকেছেন। সে-কথা ভুলে গিয়ে নখ দিয়ে নিজের দাঁড়ি চুলকান। ভাবনার মধ্যে হারিয়ে যান।
“ওহ, আব্বাজান, আপনি...! যেখানে লোকজন লাশ রাখে, হাসিনা আর ওর মা সেখানে বসে আছে। হাসিনার দুই ছোট বোনও ওখানে আছে। আব্বাজান, আপনি তাড়াতাড়ি যান। আহারে বেচারা! সবাই শীতে কাঁপছে।”
বৃষ্টি, শীত। একটু উষ্ণতার প্রতীক্ষা! এসময় সিলোন পরাটা, মরিচ বেশি করে দিয়ে বানানো ঝোল, চিকেন কাবাব আর এর সঙ্গে একটু বেশি...
আর এর সঙ্গে আছে অলংকারের মতো আমিনা। বিয়ের দশ বছরে সাতটা সন্তানের জন্ম দিয়েছে সে। ওর পুরো শরীর, শাড়িতে শুধু রসুনের গন্ধ। গরম মসল্লারও। স্তন দুটো গোলাকার। পূর্ণ। ছোট বাচ্চাটাকে এখনও বুকের দুধ খাওয়ায়...
আমিনা নিজে দরজায় এলে মুতাওয়াল্লি সাহেবের কল্পনা একেবারে চূড়ায় পৌঁছে যায়। শাড়ির আঁচলে মসলা মাখা হাতটা মুছে নেয়। মোরগের মতো যেন যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে বলে। হালকা কেশে গলাটা ঠিক করে নেয়। মুতাওয়াল্লি ওর দিকে তাকায়।
“আমি পুরোপুরি হতাশ। কতবার যে তোমাকে বলেছি। কিন্তু তুমি কথাটা কানেই নাও নি। আমার বয়সে তো অন্যদের বিয়েই হয় না। অথচ আমি ইতিমধ্যে বুড়ো হয়ে গেছি।”
আমিনা গরগর করতে করতে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে।
“এখন আবার কী হলো?”
“কী আর হবে? আমার পীঠ তো কুঁজো হয়ে গেছে। এই বাচ্চাকাচ্চা, বাড়ি, সংসারÑআমার কি এক মিনিটও অবসর আছে? বছরে একটা করে সন্তান জন্ম দিতে থাকলে আমার আর কী হবে? তুমি কি চাওনা যে, অন্তত এই বাচ্চাদের মা হিসেবে আমি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকি?”
“চুপ করো, চুপ করো। এখন এসব নিয়ে কথা বলছো কেন? আমি কি কখনও তোমার কোন কিছুর অভাব রেখেছি? যাই হোক, তুমি যা বলছো, তা হবে না। আমি মুতাওয়াল্লি। লোকজন যদি জানে যে আমার বিবি অপারেশন করেছে, তাহলে আমি তো ওদেরকে মুখ দেখাতে পারব না।”
আলাপচারিতা আরো কিছুদূর এগোতে পারতো। কিন্তু সামনের দরজায় কড়া নাড়ানোর শব্দ হলো। আমিনা দ্রæত ভেতরে চলে গেল।
“আসসালামু আলাইকুম, মুতাওয়াল্লি সাহেব।”
“ওয়া আলাইকুম সালাম। আরে ইয়াকুব যে। কখন এলে? কিন্তু ও তো অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে। আমি কি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব, নাকি নেব না?”
“এখানে আপনি আছেন। ও কি আপনার চাইতে আইন বেশি জানে? সবকিছু আপনার সিদ্ধান্ত মতই চলুক। আপনি চাইলে আপনার খাবার এখন খেতে পারেন...”
কথাগুলো ইয়াকুবের মুখে জড়িয়ে যায়। “খাবার। বেশ। এ রকমই হবে। ঠিক আছে, আমার উপর ছেড়ে দাও।” মুতাওয়াল্লি বললেন।
“কীভাবে সেটা হবে? প্রথমে আপনার খাবারটা খেয়ে নিন। আমি অটো নিয়ে এসেছি। খাবার শেষ হলে আপনার সঙ্গে কথা বলব।”
“ওহ, কোন খাবার? এতে কী যায় আসে? কেউ একবার মুতাওয়াল্লি হয়ে গেলে তার খাবার, বাড়ি, সংসারের কথা ভুলে যেতে হয়। কেউ যদি মধ্যরাতেও চলে আসে, তবুও আমাকে তার খেদমত করতে হয়। ঠিক কি-না, বল?” গর গর করতে করতে মুতাওয়াল্লি কথাগুলো বলে ফেলে।
“ছি ছি, আমাকে ভুল বুঝবেন না! আল্লাহ পাকের বিধান আছে, একটা নয় তুমি চারটা বিয়ে করতে পারো। তাই বলে মহিলারা কি তাদের মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে মসজিদে চলে আসবে? আমি এক বছর নয়, দশ বছর অপেক্ষা করেছি। একটাও কি ছেলের জন্ম দিতে পেরেছে সে? আর ওর মুখ যেভাবে চলে রে বাবা! তওবা তওবা। কোন ভদ্র ঘরের মহিলা কি এভাবে কথা বলতে পারে? অতএব আমি আরেকটা বিয়ে করেছি। এতে কী হয়েছে? আমি কি বিয়ে করতে পারি না? যখন খুশি তখন কি আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি না? একদিন যখন আমি অটো চালাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ হাসিনাকে দেখি। আমি অটো যেখানে রাখি সেখানে ওকে একদিন নামিয়ে দিয়ে ওর হাতে দশটা টাকা ধরিয়ে দিই। আমরা কি মানুষ নই? একজন নারী হিসেবে ও যদি এটুকু মেনে নিতে না পারে...” ইয়াকুব বলে।
দরজার ওপাড় থেকে আমিনা এদের কথোপকথন শুনছিল। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ওকে অভিসম্পাত করে। “আহ, দেখ, দেখ, কীভাবে তেল মারছে। ওর নিজের লালসা চরিতার্থ করার জন্য স্বয়ং খোদাকেও নীচে নামাবে দেখছি। ও তো দেখছি কোরান-হাদিস থেকেও উদ্ধৃতি দেয়। কিন্তু ওকে যদি ঐ দরিদ্র মহিলার জন্য অন্নের ব্যবস্থা করতে বলা হয়, তাহলে দায়দায়িত্ব থেকে সটকে পড়বে। হায় খোদা, তুমি কবে যে এদের কিছুটা সুবুদ্ধি দেবে?” এরপর নীরবে সে অন্দর মহলে চলে গেল। “ঠিক আছে, বাদ দাও। একবার শুরু করলে তো তুমি থামতেই চাও না।” মুতাওয়াল্লি সাহেব কোট পরতে পরতে বললেন।
যখন সেন্ডেল পরে রাস্তায় নামতে গেলেন তখন ইয়াকুব বলে, “চলুন, প্রিন্সেস হোটেলে যাই। ওখানকার খাসকামরায় এখানকার কেউ উকি দিয়েও দেখবে না।”
“চল, চমৎকার কোন জায়গায় যাই যাতে কেউ দেখতে না পায়। অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা হলে কী করব? কে ওদের প্রশ্নের উত্তর দেবে? তুমি তো লোকজনের আচার-আচরণ সম্বন্ধে জানো। ওরে বৃষ্টি, ঠান্ডা রে বাবা। এই আমিনা, আমি বাইরে যাচ্ছি। ফিরতে দেরি হবে। দরজাটা লাগিয়ে দাও,” মুতাওয়াল্লি বলল। উত্তরে জলের পাত্র রাখার থপ করে একটা শব্দ হলো। আমিনা গর গর করতে করতে বলে, “মুতাওয়াল্লি, আবার সেই মুতাওয়াল্লি। কিন্তু সে আসলে কেমন লোক? মুতাওয়াল্লি হওয়ার পর কি সে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে? ও কি সিনেমায় যাওয়া বন্ধ করেছে? বেশ, উচ্ছন্যে যা’ক। কমপক্ষে শয়তানের মূত্র খাওয়াটা কি বাদ দিয়েছে? ওর মুতাওয়াল্লিগিরি জাহান্নামে যা’ক।
ওরা আর ওর তর্জন-গর্জনে কান দেয় না। ইয়াকুবের অটোরিক্সায় বিকট শব্দ শোনা যায়। মুতাওয়াল্লিকে নিয়ে শহরের শেষ প্রান্তের দিকে ছুটতে থাকে। আশরাফ হতভাগা নারী। এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় মসজিদের নির্জন এক কোণে ভূতের মতো বসে আছে। “আহ বেচারা। ওর দোষ কী? পর পর তিনটি কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ায় কি ওর দোষ? ব্যাপারটি কি আমরা যেমন চাই তেমন করে রুটি বানানোর মতো? থু” আমিনার ভেতরটা তিক্ততায় ভরে ওঠে।
ও পেছনের আঙিনায় চলে যায়। একেবারে মসজিদের উঁচু বাউন্ডারী দেয়ালের কাছে। দেয়ালের সঙ্গে কিছু পাথর হেলান দিয়ে রেখেছে যাতে এগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে ভেতরের আলাপ-আলোচনা শোনা যায়, আর ভেতরের জলপাত্র থেকে পানি নিয়ে কলসি দেয়ালের উপর দিয়ে পার করা যায়। আমিনা শাড়ির আঁচল টেনে মাথা ঢাকে। তারপর উঁকি দিয়ে মসজিদের অন্দরমহলে দৃষ্টিপাত। মুখটা আলতো ভাবে ঢেকে নেয়। এশার নামাজ পড়ে লোকজন বিশাল কম্পাউন্ড থেকে বের হতে থাকে। আমিনা সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। ওহ, ঐ যে। যে হলরুমটি মসজিদের উত্তর পাশে নির্মাণ করা হয়েছে সেটির সামনে আশরাফ বসে কাঁপছে। আঁচলে মাথাটা ঢেকে রেখেছে, আর ছেঁড়া শাড়ির বাকি অংশে কোলের বাচ্চাটিকে কোনমতে পেঁচিয়ে নিয়েছে। হাসিনা ওর মার পাশেই বসে আছে। ঠান্ডা মেঝেতে দু’পা ছড়িয়ে। তিন বছরের হাবিবার অর্ধেক শরীর ঠান্ডা মেঝেতে আর বাকি অর্ধেক ওর মায়ের কোলে। শরীরটা গরম রাখার প্রাণন্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
যারা নামাজ পড়তে এসেছে তারা ওর দিকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে একে একে চলে যায়। পাশের একজনের বাসা থেকে চারপাশে বিরিয়ানির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আরেকটা বাড়ি থেকে মাছের তরকারির গন্ধ আসছে। এক নতুন বউ তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছে। আরেক জনের ছেলে এই সবে হাঁটতে শিখে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। এভাবে সবাই যে যার সুখের খোঁজে বাড়ির দিকে যাচ্ছে, অনন্ত ভবযন্ত্রনা জয় করার আশায়।
আশরাফ বসেই থাকে। দু’দিন ধরে পাউডারের মতো ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ঝরতে থাকলেও ওর মনে যে বেদনার আগুন জ¦লছে, তা নিভাতে পারেনি। যে কনকনে শীত ওর হাড়ে বসে গেছে সেটিও ওর পরম শক্তি নিঃশেষ করে দিতে পারেনি। যে ক্ষুধা তার ধারালো নখর দিয়ে ওর নাড়িভুঁড়িকে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে, সেটিও ওকে দুর্বল করে দিতে পারেনি। আল্লাহর ঘরের দরজায় এসে ও আছড়ে পড়েছে। ওর নিজের জন্য নয়-- ওর তো কুকুরের পেট, যেকোন কিছু দিয়ে যেকোন ভাবে ভরাতে পারে। কিন্তু আজ এখানে এসেছে ওর সন্তানদের জন্য ন্যায়বিচার চাইতে। ও আজ একা এসে দাঁড়িয়েছে একটি প্রশ্ন করতে। ও যে দোষ করেনি, তার জন্য ও কেন শাস্তি পাবে। কিন্তু আল্লাহর ঘরের দরজা ওর জন্য খোলেনি। ওর চারপাশে বসে থাকা বাচ্চাদের মলিন মুখগুলো ওকে আজ সাহসী করে তুলেছে। ওর কথা যখন কেউই শুনলো না, তখন ও একটা ঘটনা ঘটাতে মনস্থির করলো।
ওর কোলে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাটা একটু নড়ে ওঠে। আশরাফ এতক্ষণে শক্ত হয়ে যাওয়া পা দু’টো একটু ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। শাড়ির আঁচল সরিয়ে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকায়। রোগে বাচ্চাটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আর রাতের এই ক্ষীণ আলোতে ওকে দেখতে আরো অসুস্থ লাগছে। নিশ^াস-প্রশ^াসে বাচ্চাটার পাঁজরের হাড় যখন একটু প্রসারিত হয় তখন এর পশ্চাতে দু’টি হতাশার চিত্র জেগে ওঠে। চোখ দু’টো বন্ধ। বিচুটি শুকিয়ে জমে আছে চোখের কোণায়। বাচ্চাটার শরীর জ¦রে পুড়ে যাচ্ছে। আশরাফ ওর দিকে ফ্যালফ্যাল কওে তাকিয়ে থাকে।
মুন্নি ওর সন্তান। ওর জন্মের পর আশরাফের দুর্দশা চরমে পৌঁছে। প্রথম দু’টো কন্যাসন্তানের জন্মের পর আশরাফ হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু তখনও ও ঘর ছাড়েনি। ইয়াকুব সারাদিনের উপার্জনের যে টাকা-পয়সা বাড়িতে আনতো, তা থেকে ও কিছু সঞ্চয় করেছিল। সে টাকা দিয়ে কিছু স্বর্ণালঙ্কার বানিয়েছিল। শুধু তাই নয়, দুই আঙুল মোটা রূপার নুপূরও তৈরি করিয়ে নিয়েছিল। সেগুলো পরে এদিক-ওদিক হাঁটতো। ছম ছম শব্দ হতো। যখন তৃতীয় সন্তানও মেয়ে হলো তখন ইয়াকুব হারিয়ে গেল। হাসপাতালের দিকে তাকালো না পর্যন্ত। বাড়িতেও ঢুকলো না। বরং ওর মায়ের সঙ্গে থাকতে চলে গেল। বেঁচে থাকার তাগিদে আশরাফ লাউ পাতা সেদ্ধ করে খায়। চা পাতা দুইবার ব্যবহার করে। একই চা দুই তিন দিন ধরে খায়। লিকার পাতলা হয়ে যায়। সে তার স্বামীকে ঘরে ফেরাতে যথাসম্ভব চেষ্টা করে। বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে বাজারে যায়। অটোরিক্সা স্ট্যান্ড-এ ইয়াকুবের পায়ে লুটিয়ে পড়ে। কান্নাকাটি করে। তার প্রতি রহম করার জন্য আকুতি-মিনতি করে। “তোমার ওপর আল্লাহর গজব পড়ুক”Ñএ কথা বলে অভিশাপ দেয়। কিন্তু সবই বৃথা।
যখন সে অনন্যোপায় হয়ে পড়ে তখন জুলেখা বেগমের বাড়িতে কাজ করতে যায়। বাড়ির কাজ ওর কাছে বোঝা মনে হয় না। কিন্তু কাজ থাক আর না থাক, ওখানে ওকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকতেই হয়। জুলেখা বেগমের স্বামী কোন এক অফিসে চাকুরি করেন। ওদের দু’টি সন্তান। দু’জনেই কলেজে পড়াশুনা করে। জুলেখা বেগম সারাদিন এই বই, সেই বই পড়েন।
একদিন বই পড়তে পড়তে মাথা তুলে আশরাফকে জিজ্ঞেস করেন, “তোমার স্বামী কী কাজ করে?”
“অটোরিক্সা চালায়, আপা।”
“তাহলে তো সংসার চালানোর মতো যথেষ্ঠ রোজগার করে, তাই না?”
“হ্যাঁ, যথেষ্ট,” উদাসীনভাবে আশরাফ উত্তর দেয়।
ওর সব ভাবনা তখন ছোট্ট শিশু মুন্নিকে নিয়ে যাকে বাসায় হাসিনার তত্ত¡াবধানে রেখে এসেছে। স্তন থেকে টুপ টুপ করে দুধ ঝরে। বøাউজের সামনের অংশ ভিজে গেছে। বাচ্চাটার নিশ্চয় ক্ষিদে পেয়েছে। এ কথা ভেবে ওর চোখ দুটো জলে ভরে যায়।
“তাহলে এখানে কাজ করতে কেন আসো?”
আশরাফের গল্প শুনে জুলেখা অবাক হয়ে যায়। ভেবে অবাক হয় যে, আজকের দিনে, আজকের যুগে এখনও এমন লোক দুনিয়ায় আছে।
“আশরাফ, তুমি কি জানো, যে গৃহে কন্যাসন্তানের জন্ম হয়, নবীজি সেই গৃহকে সম্মান করেন, সালাম জানান?”
“ওহ, আপা এসব কথা রাখেন। আমার মতো গরীবের ঘরে নবীজি আর কতবার সালাম ঠুকবেন?”
“তুমি একটা পাগল! নবীজির শুধু মেয়েসন্তান ছিল। অবশ্য একটা ছেলের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু শৈশবেই মারা গেছে। তুমি কি জানো তিনি তাঁর কন্যাদের কী পরিমাণ ভালোবাসতেন? এ সম্বন্ধে কোন পড়ালেখা আছে? বিবি ফাতিমা ছিলেন তাঁর কলিজার টুকরা। পিতা-কন্যার মধ্যকার সম্পর্কের উনারা হলেন জীবন্ত দৃষ্টান্ত,” জুলেখা বলেন।
আশরাফ একটা কথাও বোঝে না। ওর মনটা শুধুই মুন্নির জন্য আনচান করছে। অবশেষে জুলেখা বেগম বলেন, “এটা চরম অন্যায়। মসজিদ কমিটির কাছে বিচার দিচ্ছো না কেন? “ আরে,” আশরাফ লাফিয়ে উঠলো। “তাই তো! একথা আগে ভাবিনি কেন, আপা?” সে চিৎকার করে বলে। “দয়া করে আমাকে একটা দরখাস্ত লিখে দিন।”
দরখাস্ত হাতে নিয়ে চার-পাঁচবার মুতাওয়াল্লি সাহেবের বাড়ি যায়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে না। তাই একদিন দৌড়ে গিয়ে মুতাওয়াল্লি সাহেবের হাতে দরখাস্তটা গুঁজে দেয়। সে সময় মুতাওয়াল্লি সাহেব বাইরে যাচ্ছিলেন। অন্যমনস্কভাবে তিনি দরখাস্তটা কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখেন। তারপর চলে যান।
সেদিন সকালে সরকারী রাস্তার ধারের ট্যাপগুলোতে পানি সরবরাহ চালু হলো। হানিফা চিকাম্মা যে একটা লম্বা হাতলওয়ালা ঝাড়– দিয়ে রাস্তার মাঝখান পর্যন্ত ঝাড় দিচ্ছিল সে দ্রুত একটা মোটা দেয়ালের পেছনে অদৃশ্য হয়ে গেল। রাফিয়া যে ট্যাপ থেকে পানি নিতে কলসি নিয়ে এসেছিল সে দেখলো হানিফা চিকাম্মা তার দিকে ইশারা করে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো। অসতর্কতায় তার হাত থেকে কলসি পড়ে যায়। মহল্লার যেসব মহিলা এতক্ষণ নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত ছিল তারাও দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। এতটা সম্মান পেয়ে মুতাওয়াল্লি সাহেব ভেতওে ভেতরে খুশি হন। আঁড়চোখে দেখেন, কোন মহিলা কাজ-কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে কি-না। তারপর চোখে-মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলে চলে যান।
পনের দিনেও যখন মুতাওয়াল্লি সাহেব তার ব্যাপারটা দেখলেন না, তখন আশরাফ তাঁর বাড়িতে আবারও যায়। যথারীতি তিনি বাড়িতে ছিলেন না। যখন বসে বসে অপেক্ষা করতে থাকে তখন আমিনা বলে, “লোকে বলে, যারা জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য অপরেশন করে তারা নাকি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আশরাফ, এ কথা কি সত্য?” “সেটা যে কী, তা আমি জানি না, আম্মা। জুলেখা আপাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। উনি সবসময় মোটা মেটা সব বই পড়েন।”
আমিনা এবার ওর খুব কাছে এগিয়ে আসে। তারপর যেভাবে গোপন কিছু বলে ঠিক সেভাবে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে, “যদি তাই হয়, তাহলে উনাকে জিজ্ঞেস কওে বিষয়টা জেনে নিয়ে আগামী দিন আমাকে কি ব্যাপারটা বলবে?”
“ঠিক আছে, মা। আপা যে আরও কত কিছু বলেন! কিন্তু আমি? আমি তো একটা গর্দভ। আমি কি আর ওসব বুঝি?”
আশরাফের কথা শেষ হতে না হতেই মুতাওয়াল্লি সাহেব বাড়িতে ঢুকলেন। চোখে মুখে গুরুগম্ভীর ভাব।
“ওহ তোমার দরখাস্তটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তুমি চাইলে আরেকটা লিখে নিয়ে এসো।” এ কথা বলে অন্দরমহলে চলে গেলেন।
“যদি চাই-- ওহ, নাহ, আমি চাই না। আমার জন্য নয়। এমনকি আমার স্বামীকেও চাই না। শুধুু আমার বাচ্চাগুলোর তো খাবার দরকার।...”
শত সমস্যায় জর্জরিত থাকলেও মুন্নি খাবার ভালোই পায়। কিন্তু ওর ওজন কমতে শুরু করেছে। দুর্বল হয়ে গেছে। হাত-পাগুলো কাঠির মতো চিকন হয়ে যাচ্ছে। পেট খারাপ। সবসময় সর্দি লেগেই থাকে। সবসময় এতটাই ক্ষুধার্ত থাকে যেন গোটা দুনিয়াটাই ও খেয়ে ফেলবে। দিনরাত অনবরত কান্নাকাটি করে। কিন্তু আশরাফ একটুও বিরক্ত হয় না। বাচ্চাটাকে কখনও বোঝা ভাবে না। বাকি দুই মেয়ের চাইতে মুন্নিকে সে বেশি খাবার দেয়, বেশি ভালোবাসা দেয়। তবে মুন্নির যে জিনিসটা জরুরি, তা হলো ঔষধ। কিন্তু ওষুধ কেনার টাকা কোথায় পাবে? প্রত্যেক দিনের ইঞ্জেকশন, ট্যাবলেট, ডাক্তারের ফিস আর সবচেয়ে বড় কথা ওর পালা আসার আগ পর্যন্ত ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা করা। একবার কিছু ট্যাবলেট যোগার করে মুন্নিকে খাইয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। বরং ওর অবস্থা আরোও খারাপ হয়েছে।
যতদিন জোলেখা বেগমকে দিয়ে আবারও দরখাস্ত লিখিয়ে নিয়ে মুতাওয়াল্লি সাহেবের বাড়িতে চার-পাঁচ বার ধর্না দিয়েছে, ততদিনে সে যে গুজব শুনলো, তাতে তার ভেতরে জ¦লতে থাকা আগুনে ঘৃত সংযোগ হলো। গুজবটা হলো-- ইয়াকুব আর এই শহরে নেই। সে অন্য কোথাও চলে গেছে।
“ও কি পুরুষ মানুষ নয়? ও দায়িত্ব পালন করুক বা না করুক, ওকে কে জিজ্ঞেস করতে যাবে? ও তো পুরুষ। সবাই ওর বন্ধু। ওর অতীত নিয়ে কেউ ঘাটাঘাটি করবে না। বর্তমানও ওর টিকিটাও স্পর্শ করতে পারবে না। ভবিষ্যৎকে ও পরোয়া করে না। এটি ওর কাছে কোন রহস্য নয়। ক্ষমা চাওয়ার জন্য ওকে লজ্জা পেতেও হবে না। কারণ ও তো কখনও ভুলই করে না।
আশরাফ খুবই ব্যথিত হলো। মুন্নি ওর কোলে ধীরে ধীরে যতই ফুরিয়ে যাচ্ছিল, ততই ওর হৃদয়ের আরোও কাছাকাছি আসছিল। কিন্তু মাতৃস্নেহই তো সবকিছু নয়। ওর দরকার চিকিৎসা, সেবা। ছয় মাসের মধ্যে মুন্নি একেবারে অস্থিচর্মসারে পরিণত হলো।
ঠিক এমন সময় একেবারে শেষ আশ্রয়ের মতো সে শুনতে পেল, ইয়াকুব ফিরে এসেছে। ছুটে গেল অটোস্ট্যান্ডে। কিন্তু তাকে দেখা মাত্রই ইয়াকুব অদৃশ্য হয়ে গেল। পরেরবার সে আরো স্মার্ট কাজ করে বসলো। পেছন দিক থেকে এসে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে অটোতে বসে পড়ে। একটা কথাও না বলে ইয়াকুব অটো চালাতে শুরু করে। এবার কুঁড়ে ঘরের সামনে থামিয়ে বলে, “তুই তো মেয়েদের একটা পুরো সৈন্য বাহিনী সঙ্গে নিয়ে কুত্তার মতো ঘুরে বেড়াস। অন্ততপক্ষে সামান্য হলেও কিছু ভদ্রতা দেখানো উচিৎ।” এ কথা বলে ঘৃণায় থুথু ফেলে। বাচ্চাদের গাড়ি থেকে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। হতবিহ্বল হয়ে আশরাফ অটো থেকে নামতেই ইয়াকুব গাড়ি চালিয়ে ভোঁ ভোঁ শব্দ করে চলে যায়। ও অশ্রæসজল বাচ্চাদের বুকে টেনে নেয়।
কোন উপায়ন্তর না দেখে সে ডজন ডজন দরখাস্ত মসজিদ কমিটি ও মুতাওয়াল্লির কাছে পেশ করে। অনুনয় বিনয় করে বলে, তারা যেন ইয়াকুবকে অন্তত পক্ষে বাচ্চাটার চিকিৎসা-খরচ দিতে বলেন। শুধু একটাই উত্তর সে পায়-- “পরে এসো। অন্য দিন এসো। এখন যাও।” এতকিছুর মধ্যে একটা গুজব কানে এলো, একেবারে ফুলে- ফেঁপে। “ইয়াকুব আবার বিয়ে করতে যাচ্ছে। সে পুত্র সন্তান চায়, যে তার অবর্তমানে অটোরিক্সা চালাবে।” আশরাফের দুনিয়াদারী সব অন্ধকার হয়ে গেল। সারারাত কান্নাকাটি করে সকালবেলা মুতাওয়াল্লির দরজার সামনে গিয়ে আবার বসে পড়ে। মুতাওয়াল্লি সাহেব প্রায় সকাল নয়টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে ওকে দেখে জিজ্ঞেস করে “কী?” তাঁর চোখে-মুখে বিরক্তির রেখা ফুটে ওঠে।
আশরাফ ওর অভিযোগ বিস্তারিত বর্ণনা করে। মুতাওয়াল্লি কাশি দেন। জোরে থুথু ফেলেন। “ও আবার এখন কী এমন নিষিদ্ধ কাজ করলো রে বাবা? ও তো আবার একটা বিয়ে করেছে। এই তো, না? ও তো কারো সঙ্গে গোপনে পালিয়ে যায় নি। গেছে না-কি? বিয়ে করলে করুক। তুমি কি জানো যে, শরীয়াহ আইন মতে তোমার স্বামী চারটা বিয়ে করতে পারে? তুমি এতে হিংসে করছো কেন? তোমার মতো মহিলারা শুধু এ কাজটাই করতে পারে।” আমিনার দিকে তাকিয়ে বলে, “ওরা শুধু হিংসাই করতে পারে।” যদিও আমিনা তখন তার ছোট বাচ্চাটিকে দুধ খাওয়াচ্ছিলো, তবুও ভাবলো--“জাহান্নামে যা’ক এসব পুরুষ।” তার হৃদয়ের গভীরে একটা খোঁচা লাগে। বুঝতে পারে, সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন সারিসারি বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে আশরাফের মতো ওকেও ভিক্ষে করতে হবে।
ক্ষীণ কণ্ঠে আশরাফ বলে, একটা কেন, ও হাজারটা বিয়ে করুক। আমি হিংসে করি না। ও যদি সুখী হয় তবে সেটা আমার জন্য যথেষ্ট। আমি ওকে বিরক্ত করছি না। কিন্তু মুতাওয়াল্লি সাহেব, দেখুন, এই বাচ্চাটা মরে যাচ্ছে। অন্ততপক্ষে বাচ্চার ওষুধ... মুতাওয়াল্লি তাকে থামিয়ে দিয়ে বকা দেন, “দেখ, বোকার মতো কথা বলো না। হায়াৎ, মউত আল্লাহর হাতে। কারো মাথায় পাহাড় ভেঙ্গে পড়লেও সে মরবে না। কারণ এটি আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহপাক চান ও বাঁচুক। ঠিক একইভাবে আল্লাহ যাকে বাঁচাতে চান সে বাঁচবে। না চাইলে মরবে। এর জন্য তুমি ইয়াকুবকে বিরক্ত করছো কেন?”
এমন সব প্রশ্নের মুখে পড়ে আশরাফ নির্বাক হয়ে যায়। সত্যিই তো তাই। নিজেকে এই বলে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে যে, যা কিছু ঘটে তা আল্লাহর তরফ থেকেই ঘটে। কিন্তু বাচ্চাটার ডায়েরিয়া যে সারছেই না। ওর দিকে তাকিয়ে সব বোঝা নীরবে আল্লাহর হাওলায় ছেড়ে দিতে পারে না। সে আর কাকে জিজ্ঞেস করবে? ইয়াকুব দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন বউয়ের গ্রামে চলে গেছে।
পরের বার যখন ওর সঙ্গে দেখা হয় তখন সে ওর নখে মেহেদি দেখে। বাম হাতে যে ঘড়ি পরেছে সেটিও চকচক করছে। নতুন জুতো পরে ওর অটোরিক্সার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথার চুলের নতুন স্টাইল করেছে। ওকে চেনাই যায় না। নিজের ভাবনায় মগ্ন। আশরাফের হাতে দশ টাকার একটা নোট এমনভাবে গুঁজে দেয় যেন সে ভিখারি। তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়
এসব দেখে আশরাফ দুঃখে পাথর হয়ে যায়। কিন্তু মুন্নির জীবন-মরণ প্রশ্ন ওকে শক্ত রাখে। জুলেখা বই পড়তে পড়তে মাথা তুলে তাকায়। বলে, ‘দেখ, কেউ কেউ যে চারটা বিয়ে করে, তার পেছনে কিন্তু কারণ রয়েছে। যদি যুদ্ধ শুরু হয় এবং সেই যুদ্ধে অনেক পুরুষ মানুষ মারা যায়; স্ত্রী যদি দীর্ঘদিন দুরারোগ্য রোগে ভোগে; যদি তার কোন সন্তান না থাকে, তাহলে স্বামী আবার বিয়ে করতে পারে। আবার যদি কেউ একজন স্ত্রীতে সন্তুষ্ট না থাকে।... এসব কথা বলতে বলতে সে বাক্যটি শেষ করতে পারে না।
আশরাফ হঠাৎ রাগে ফেটে পড়ে। “আমি এর কোনটাতে পড়ি না। “আমার কি ছেলে মেয়ে নেই? ও যে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, এতে কি ওর অন্যায় হয়নি। আমাকে এবং আমার সন্তানগুলোকে দুর্দশাগ্রস্ত করে দিয়ে ও কি কোন অন্যায় করেনি?”
“দেখ, শরিয়াহ অনুযায়ী সে যদি দ্বিতীয় বিবাহ করেও তবুও দু’জন স্ত্রীর মধ্যে ও কোন পার্থক্য করতে পারবে না। উভয়ের সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে।
“তার মানে ...কীভাবে, আপা?”
“তার মানে হলো-- সে যদি তোমাকে একটা বাড়ি তৈরি করে দেয়, তাহলে অপরজনের জন্যও একই রকম আরেকটা বাড়ি তৈরি করে দেবে। সে যদি তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেয়, তাহলে অপর জনের জন্যও আরেকটা শাড়ি কিনবে। সে যদি তোমার সঙ্গে একরাত কাটায়, তাহলে অপর জনের সঙ্গেও একরাত কাটাবে।”
আশরাফের চোখ জলে ছল ছল করে ওঠে। “আপা, আমি এত কিছু চাই না। ও যদি শুধু আমার বাচ্চাটার জীবন বাঁচানোর জন্য কিছু পয়সা খরচ করে, তাহলে আমি আর কিছুই চাইব না। কিন্তু ও এখনও পর্যন্ত যা করছে, সেটা কি ভুল নয়, আপা?”
“অবশ্যই, একশ ভাগ ভুল।”
“তাহলে মুতাওয়াল্লি সাহেব কেন সে-কথা বলছেন না?”
“দেখ, ওখানেই বড় সমস্যা। প্রথমতঃ মুতাওয়াল্লি আমাদের জামা’য়াতের অনেক নিয়মই জানেন না। দ্বিতীয়তঃ সেই নিয়মকানুন বাস্তবায়িত করার ওদের ক্ষমতাও নেই। তৃতীয়তঃ কেউ ওদের কথা শোনেও না। তারপর শুধু যে নিয়মগুলো দিয়ে ওদের ফায়দা হাসিল করা যায়, ওরা শুধু সেগুলো নেয়। তোমার মতো আর মুন্নির মতো গরীব মানুষদের জায়গা শরিয়াহ আইনের ফাকফোকরে নেই।”
“তাহলে এর কি কোন প্রতিকার নেই, আপা?”
“আছে। থাকবে না কেন? মহিলাদের যে অধিকার রয়েছে, পÐিতরা সে-কথা বলেন না কেন? কারণ এরা শুধু মহিলাদের আটকাতে চান। গোটা পৃথিবী একটা রঙ্গমঞ্চ যেখানে সবাই বলছে নারী ও মেয়ে শিশুদের জন্য অবশ্যই কিছু করতে হবে। কিন্তু এই লোকগুলো কোরান-হাদিস মানে-না। এরা যদি এই গ্রন্থগুলো অনুসরণ করেও চলতো! এরা মেযেদের শুধু মাদ্রাসায় কেন, স্কুল, কলেজেও পাঠাক। কিন্তু এই খচ্চরগুলো মহিলাদের দেনমোহর তো দেয়ই না। উপরন্তু যৌতুকের উচ্ছিষ্টাংশও চেটেপুটে খায়। মেয়েদের বাবা-মা তাদের সম্পত্তির অংশ দিক। নারী-পুরুষের মধ্যে বনিবনা না হলে মেয়েদের তালাক দেওয়ার অধিকার দেওয়া হোক। যদি কোন মেয়ে তালাকপ্রাপ্ত হয় তবে তাকে বিয়ে করার জন্য ছেলেরা এগিয়ে আসুক। মেয়েরা জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পা’ক।
“আপা, আপা, এসব কী বলছেন?”
আশরাফের তো জ্ঞান হারানোর দশা। “যা বলছি সব ঠিক, আশরাফ। ইসলামে নারীর এই সবকিছুর অধিকার রয়েছে। একটা মেয়ে স্কুলে যেতে পারে, দোকানে যেতে পারে। কাজেও যেতে পারে। বাইরে কাজকর্ম করতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি আর একটা কথাও আছে, তা হলো তার শরীর ও সৌন্দর্য সে প্রদর্শন করতে পারবে না।”...
জুলেখা বেগম আবেগঘন বক্তৃতা দিতে শুরু করলো।
আশরাফ হতাশায় মাথা ঝুঁকে বসে রইলো। সে এর কোনটাই চায় না। “মুন্নির কথা আমি আর কী বলব?”
“কী জিজ্ঞেস করবে? তোমার ভাত, কাপড়, বাচ্চাকাচ্চার খরচ, নিজের একটা বাড়ি, একদিন পর পর ওর সঙ্গে রাত কাটানো--এই তো। তোমাকে ওর এই সবকিছু দিতে হবে। যদি না দেয় তবে তোমাকে সবার সামনে ওর শার্টের কলার ধরে চাইতে হবে। আর পা থেকে সেন্ডেল খুলে এই মুতাওয়াল্লির গালে মারতে হবে এবং দাবি পেশ করতে হবে। ভিক্ষা চেও না। দাবি করো। মসজিদে দরখাস্ত করো। পঞ্চায়েত ডাকো। তারপর আমাকে খবর দেবে। তখন আমি তোমার স্বামী আর ঐ মুতাওয়াল্লিকে বলব, শরীয়াহ কী, ন্যায়বিচার কী। নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যা একজন অসহায় নারীর সামনে পেশ করা ন্যায় বিচার নয়।
আশরাফ খুব ভয় পেয়ে যায়। ওর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। শুধু যদি ওর পেটের বিষয় হতো তাহলে কোন ব্যাপার ছিল না। “আল্লাহ আমার মুখ যেহেতু দিয়েছেন, আহারও দেবেন। এ কথা ভেবে না হয় চুপ করে থাকতাম। কিন্তু আমার মুন্নির কী যে হবে...
আশরাফ ন্যায়বিচার আদায় করার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ। অনুনয়-বিনয়ের পরিবর্তে। ওর কোলে মুন্নি নড়ে ওঠে। ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়েছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। গলাও ঘামে ভিজে গেছে। আশরাফ শাড়ির আঁচল দিয়ে মুন্নির গলা, বগলের নীচে মুছে দেয়। শরীরটা স্পর্শ করে। এমন পরিস্থিতিতেও ভেবে স্বস্তি পায় যে, ওর জ¦র নামছে। একটু আগে হাসিনা ক্ষুধা, ক্ষুধা বলে কেঁদেছিল। আলো-আঁধারিতে সে চারপাশে তাকায় ওর খোঁজে। আশরাফের বুকটা প্রায় ভেঙ্গে যায়। ঠান্ডা মেঝের ওপর শুয়ে থাকাটা ওর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। হাসিনা হামাগুড়ি দিয়ে মাদুরের নীচে ঢুকে পড়ে। তারপর অর্ধেকটা শরীরের সঙ্গে পেঁচিয়ে নেয়। আর কাছেই মেঝেতে হাবিবা কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে।
মসজিদের বারান্দা থেকে নিঃসৃত সবুজ আলোর মধ্যে নিঃসঙ্গতা আছে। মুষলধারে বৃষ্টির পর ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও। জনবিহীন পরিবেশের মধ্যে সে এক অদ্ভূত ভীতি অনুভব করে। সে জানে না কয়টা বাজে। ভাবে, বাইরের জগতটার সব ব্যস্ততা থেমে গেছে। ভয় ভয় লাগে ওর। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব মুসলমান পড়তে থাকে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এমন পরিস্থিতিতে স্বয়ং আল্লাহর মনটাও গলে যাবে যিনি সবচেয়ে করুণাময় ও দয়াশীল। শুধু মুন্নির জন্য উষ্ণ পোশাক ছিল। কিন্তু বাকি দুই বাচ্চার শরীর ঢাকার মতো পর্যাপ্ত কাপড়ই ছিল না। একথা ভাবতেই ওর মনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। দীর্ঘ একটা নিশ্বাস বুক ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে। ভেতর থেকেই বলে ওঠে: “ওহ আল্লাহ।” কিন্তু আল্লাহর তরফ থেকে কোন উত্তর আসে না। পেটটা একসময় চুপ করে ছিল। এবার ঠান্ডা হয়ে এলো। যেন ভেতরে একটা বরফের বল ঘুরছে। রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে। শরীরের ধমনীগুলো কম্পন-শক্তি হারিয়েছে। ও বুঝতে পারে না, কেউ একজন ডাকছে। অবশেষে দূর থেকে আমিনার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।
মসজিদ-কম্পাউন্ড-দেয়ালের অপর পাশে সে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা থালা। ডেকে বলে, ‘আশরাফ, এটা নিয়ে যাও। রুটি আছে। তাড়াতাড়ি এসো....ধর...। আশরাফ খুব ধীরে ধীরে বাস্তবতায় ফিরে আসে। বৃষ্টির কোন বিরাম নেই। যেন এই নির্মম পৃথিবীর নিয়মটাই এমন। অন্যপাশে, দূরে রয়েছে রুটি। হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ... ওর ভেতরে এক অভূতপূর্ব শক্তি ভর করে। মুন্নিকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে উঠে পড়ে। ঠিক তখনই--
মসজিদের দরজা ক্যাচ করে খুলে যায়। মুতাওয়াল্লি সাহেব চরম আনন্দে ইয়াকুবকে সঙ্গে নিয়ে আসছেন। আলতোভাবে পেটটা নাড়েন। আস্তে করে ঢেকুর তোলেন। প্যাঁচ করে লাল লাল ঠোটের ফাক দিয়ে পানের পিক ফেলেন। তারপর মসজিদের সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হন। ইয়াকুবও গা-ছাড়া ভঙ্গিতে হাটে। তারপর একটু দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে। “ওটার দিকে তাকাও”-- ওর চোখেমুখে অদ্ভ‚ত একটা অভিব্যক্তি এখনও কাটেনি। আমিনার-রুটির থালা ধীরে ধীরে পেছনের দিকে চলে যায়। মসজিদের চারপাশের বাড়িগুলোর সবাই ইতিমধ্যে রাতের খাবার শেষ করে ফেলেছে। পুরুষরা হয় টেলিভিশন দেখছে, না হয় ঘুমাতে গেছে। আর মহিলারা সারাদিনের ঘর-গৃহস্থালির কাজ শেষ হয়েছে এই অজুহাতে উঁচু কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে মসজিদের ভেজা দেয়ালে হাত রেখে তার ওপর ঠেস দিয়ে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা দেখার চেষ্টা করছে।
আশরাফ মুন্নিকে বুকের সঙ্গে ধরে আছে। সেই ওর যুদ্ধের প্রেরণা। তারপর ধীরে ধীরে লোকজনের দিকে অগ্রসর হয়। মুতাওয়াল্লি মসজিদের সবচেয়ে উঁচু সিঁড়িটার উপর বসে আছেন। আশরাফ সবার ডানদিকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ইয়াকুব এক সিঁড়ি নীচে বামদিকে দাঁড়ায়। যেহেতু এই অংশে একটা চালা রয়েছে তাই আশরাফের গায়ে বৃষ্টি পড়ছে না। কিন্তু প্রচুর জলীয়বাষ্পে ভরা বাতাসে ওর দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। ইয়াকুব একটা ক্রোধে উম্মত্ত ষাঁড়ের মতো আক্রমণ করতে প্রস্তুত হয়ে আছে। চালা থেকে পানি পড়ছে। সেই পানি আশরাফের পীঠ বেয়ে নীচের দিকে নামছে। শাড়ির আঁচল বেয়েও। ওহ! এমনকি এই বৃষ্টিও পুরুষ মানুষদের ভেজাতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতেও এরা ভদ্রোচিত এবং সম্মানজনক আচরণ করতে পারে না।
কথা শুরু করার পূর্বে মুতাওয়াল্লি সাহেবের দ্বিধান্বিত হওয়ার কারণ রয়েছে। তাঁর মুখে অনেক পানের পিক জমে গেছে। তিনি তো এই পবিত্র সিঁড়িগুলোকে অপবিত্র করতে পারেন না। পিক ফেলার জন্য তাঁকে মসজিদের সীমানাপ্রাচীরের কাছে যেতে হয়। পিক ফেলেন এমনভাবে যেন পিচকারী থেকে পানি বেরিয়ে আসে। ঠিক যেই মুহূর্তে তিনি উঠবেন বলে মনে হয় ঠিক তখনই ইয়াকুব অগ্নিউদ্গীরণের মতো করে বলে, ‘মুতাওয়াল্লি সাহেব, এই বেশ্যা মহিলা কী চায়?”
হঠাৎ করে মুতাওয়াল্লি সাহেব সজাগ হয়ে ওঠেন। যেহেতু তিনি পানের পিক গিলেছেন. তাই এক সেকেন্ডের জন্য তাঁর মাথাটা চক্কর মেরে ওঠে। তারপর নড়েচড়ে বসেন। বুঝতে পারলেন, সীমানাপ্রাচীরের চারপাশে নারীর মতো দেখতে অনেকগুলো টিকটিকি রয়েছে। সেগুলোর বড় বড় নখর রয়েছে। ওরা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। তিনি নিশ্চিত, আমিনা নামের টিকটিকিটা দেয়ালের উপর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন তাকে গিলে খাবে। এজন্য ক্ষমতা দেখানোর উদ্দেশে চাল, পান ও অন্যান্য যেসব জিনিস ইয়াকুব তাকে কিনে দেয়, সেগুলো সে তার গলার অপর পাশে রাখে।
“ইয়াকুব, তোমার এভাবে কথা বলা উচিত নয়।” মুতাওয়াল্লি বলেন।
কিন্তু ইয়াকুবের তখন কোনকিছু শোনার কোন ইচ্ছেই নেই। এই মহিলা তার জীবনটাকে নরক বানিয়ে ছেড়েছে। পায়ের সঙ্গে আটকে যাওয়া মুখগুলোর মতো! সে একটা শয়তান। তিন তিনটে মেয়ের জীবনের সব দায়দায়িত্ব তার উপর ফেলে তার জীবনটা বরবাদ করে দিয়েছে। সে একটা শয়তান। আর এই শয়তানটা তাকে কষ্ট দিচ্ছে। যখন সে তার নববধূর সান্নিধ্যে শান্তি অণে¦ষণ করছে এবং বিশেষ করে ,যদি সে একটা পুত্র সন্তানের জন্ম দিতে পারে যে তার অটোরিক্সার উত্তরাধিকারী হবে, তখন সে তাকে কষ্ট দিয়ে যাচ্ছে। সে আসলে একটা শয়তান। সে তাকে কষ্ট দিচ্ছে। গফুর, ইদ্রিস ও নাসিরেরও দুইজন করে বউ। বেশ আরামে আছে ওরা। কোন বউ ওদের ঝামেলা করছে না। ওরা নিঃশব্দে কুলির মতো কাজ করে যাচ্ছে। আর এই কুত্তি গত দুই বছর আমাকে যে শুধু কষ্ট দিচ্ছে, তা নয়। আজ এই পবিত্র মসজিদের সিঁড়ি পর্যন্ত মাড়িয়েছে। ও একটা--।” ইয়াকুব অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধের আগুনে জ¦লতে থাকে। সেই শীতের মধ্যেও। “দেখ্, যদি তোর মতো কেউ যে বসে পেশাব করে সে যদি এতটা ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে, তাহলে যে আমি দাঁড়িয়ে পেশাব করি সে তখন কতটা ক্রোধ দেখাতে পারি।” ইয়াকুব বেশ গম্ভীর ভাবে চিৎকার করে কথাগুলো বলে।
আশরাফের মুখ থেকে একটা কথাও বেরোয় না। ও জমে গেছে। এমন প্রশ্নের মুখে কী উত্তর দিতে হয়, তা জুলেখা বেগম ওকে শিখিয়ে দেয়নি। এমন প্রশ্ন সে আশাও করেনি। এমন পরিস্থিতির মুখে পড়ে সে মুন্নিকে বুকের সঙ্গে আরো শক্ত করে চেপে ধরে। ততক্ষণে ইয়াকুব রাগে গড়গড় করতে করতে দ্রুত ওর কাছে চলে আসে। তারপর সর্বশক্তি দিয়ে ওকে একটা লাথি মারে। আশরাফ একপাশে পড়ে যায়। পড়ে যেতে যেতে মুন্নিকে রক্ষা করার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যায়। কপালটা আছড়ে পড়ে মাটিতে। মুন্নি কোল থেকে ছিটকে পড়ে। একটা ভয়ানক শব্দ, এমন শব্দ কখনও মসজিদে শোনা যায়নি। আশরাফের মুখ থেকে এই শব্দটি বেরিয়ে গেল। ওর দুটো বাচ্চাই ঘুম থেকে জেগে উঠলো। এমনকি হাসিনাও যে জানাজার নামাজ পড়ার ঘরে ঘুমাচ্ছিল সে-ও জেগে ওঠে। এবার সম্ভবত যতগুলো লাশ মাটিতে মিশে যাওয়ার পূর্বে জানাজার জন্য খাটিয়ায় করে এখানে আনা হয়েছিল সবাই জেগে উঠেছে। আশরাফ অজ্ঞান হয়ে যায়।
মুতাওয়াল্লি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। তাঁর উত্তেজনা উবে গেছে। অন্ধকারের অবঘুন্ঠন ভেদ করে, পায়ে আটকে থাকা কাদামাটি ঝেড়ে ফেলে, মাথার ঘোমটা ফেলে দিয়ে অসংখ্য মহিলা কোত্থেকে চলে এলো? ওদের মধ্যে কি আমিনা ছিল? কেউ একজন আশরাফকে উঠালো। কেউ গেল মুন্নিকে উঠাতে। মুন্নির জ¦র নেমে গেছে। ওর নিশ্বাসে আর কোন ঝামেলা নেই। আর কোন কষ্ট নেই। জগতের সব দুঃখ, সব বেদনা থেকে ও মুক্তি পেয়েছে। ওর যাতনার জীবন শেষ। ওর দেহটা প্রাণ ধারণ করতে সংকল্পবদ্ধ কিন্তু দেহপিঞ্জর প্রাণ পাখিটাকে ধরে রাখতে পারে না। মৃত্যুর কালো চাদর ওকে ঢেকে নেয়।
মুতাওয়াল্লি সাহেব বসে রইলেন। নড়তে পারলেন না। হানিফা চিকাম্মা আশরাফ আর ওর বাচ্চাদের বাসায় নিয়ে যায়। মুন্নির লাশ মসজিদে পড়ে থাকে। আশেপাশের বাড়িগুলোর সব বাতি জ¦লে ওঠে। মসজিদের পিছনে পানি গরম করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ঘুমিয়ে থাকা পুরুষগুলো একে একে জেগে ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে সবাই মসজিদে চলে আসে। কোন কথা না বলে কাপড়ের দোকানের মালিক মতিন সাহেব দোকান খুলে লাশ ঢেকে দেওয়ার জন্য লাল কাপড় নিয়ে আসেন। মুন্নিকে গোসল করানো হয়। লাল কাপড়ে লাশটা জড়ানো হয়। শরীরে আতর, সুরমা লাগানো হয়। তারপর কবরস্থানে নেওয়া হয়।
কবরস্থানে আশরাফ লাশটা জড়িয়ে ধরে। পাগলের মতো কাঁদে। কিন্তু মনের গভীরের একটা অংশে শান্তি বোধ করে।
এ দুনিয়ায় তো মুন্নি সুখ পায়নি। বেঁচে থাকার কোন কারণ নেই। মুন্নি এখন সব বেদনা থেকে মুক্ত। স্বাধীন। এখন আর আমাকে ইয়াকুবের পেছনে ভিখারীর মতো ঘুরতে হবে না। অমানবিক সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। এখন আমি আর আমার দুই বাচ্চা। বেচারা মুন্নি কোনদিন নতুন একটা জামা পরতে পারে নি। খেলনা পুতুলও পায় নি। জন্মের পর থেকে শুধুই ইঞ্জেকশন আর তিতা ট্যাবলেট খেযেছে। এসব ভাবতে ভাবতে ওর মধ্যে মাতৃস্নেহ জেগে ওঠে। অঝোর ধারায় অশ্রুপাত করতে থাকে।
অজ্ঞতার কালো মুরগি ভোরের আলোর ডিম পেরে চলে যায়। অন্ধকারে ছুটে যায়। শস্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খায়।
মুতাওয়াল্লি সাহেব ধীরে ধীরে হাটতে থাকেন। হানিফা চিকাম্মা লম্বা লাঠি লাগানো ঝাড়– দিয়ে রাস্তার মাঝ বরাবর পরিষ্কার করে। ক্রোধে, রাগে ঝাড়– এদিক সেদিক নিক্ষেপ করে। কিছু ময়লা মুতাওয়াল্লির গায়ে গিয়ে পড়ে। এতে সে কোন পরোয়া করে না। ডান হাতে পাখার মতো করে ঝাড়–টা তুলে ধরে। তারপর সেটি দিয়ে বাম হাতের তালুতে আঘাত করতে থাকে। ঝাড়–র দিকে তাকিয়ে বাতাসকে উদ্দেশ্য করে বলে, “তোর ওপর আল্লাহর গজব পরুক। যেন সাক্ষাৎ শয়তান দেখছি।” রাফিয়া যে জলের ট্যাপের কাছে এসেছে কলসিতে জল ভরাতে সে একটা পাথর নিয়ে একটা কাল্পনিক কুকুরকে উদ্দেশ্য করে নিক্ষেপ করে কর্দমাক্ত নর্দমায়। “কুত্তা, ঠিক কুত্তা,” নাক সিটকে সে বলে
নাসিমা ওর মুরগিটার পেছন পেছন ছোটে। মুরগীর পীঠে সাদা, ধূসর পালক। মোটা উরু। খাটো পায়ে ভালো দৌড়ায়। মুরগীটার পালক ধরে ফেলে। ছেঁড়ে। যে মোরগটা মুরগীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে সেটির দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় বলে, “হে আল্লাহ! তোমার করুণা কি এই জঘন্য মোরগটাকে ধ্বংস করতে পারে না। তোর তো কোন লজ্জা-শরম নেই। আল্লাহর ভয় নেই। তুই কি কবরের পোকামাকড়ের খাদ্যে পরিণত হওয়ার জন্য মোটাতাজা হচ্ছিস? গাধা কোথাকার, দূর হ।” সে আঙ্গুল উঁচিয়ে যে মোরগটাকে নিজে লালন করেছে সেটিকেই সে অভিশাপ দেয়।
কোণার বাড়িটিতে কাজী সাহেবের ছেলের বউ আছে। বাড়ির প্রধান ফটকে তেমন বের হয় না। বিয়ের দু’বছরেও সে আঙ্গিনার ফটক পর্যন্ত হেঁটে যায় নি। বাড়ির ভেতর থেকে স্বামীকে স্কুটারে চেপে যেতে দেখে। মুতাওয়াল্লি সাহেবকে দেখে সে কোলের বাচ্চাটাকে সম্বোধন করে বলে, ‘বাবা, তুই কি গরিলা দেখতে চাস? দেখ, ঐ যে গরিলা! মুতাওয়াল্লি পেছন ফিরে তাকানো মাত্রই সে হাসে। তারপর মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়। দূর থেকে জমিলা উচ্চস্বরে তিরস্কার করে, যেন সে কাউকে সম্বোধন করছে। “ তোর ভালো হবে না রে। কিয়ামতের দিন তোর মুখটা হবে শুয়োরের মতো। কালনাগ তোর সারা শরীর পেঁচিয়ে রাখুক। মরার সময় তোর কালেমা নসিব না হোক।” ডিনামাইট নিক্ষেপের মতো করে সে একটা সুতো উপরের দিকে নিক্ষেপ করে।
আসিফা ময়লায় টুইটুম্বর একটা ঝুড়ি নিয়ে বাইরে আসে। সে আর তার শাড়ির আঁচলের দিকে নজর দেয় না। ঘোমটা মাথা থেকে পড়ে গেছে। সে ময়লা ফেলে। থ-ু থু - করে থুথু ফেলে। এত জোরে জোরে থুথু ফেলে যেন অত্যন্ত জঘন্য কিছু একটা সে দেখে ফেলেছে। তার থুথু মুতাওয়াল্লির গায়েও পড়তে পারে, এমন জোরে সে ফেলে।
মুতাওয়াল্লি সাহেবের লাল কাপড়ে মোড়ানো মুন্নির মুখটা মনে পড়ে। ওর চোখ জোড়া বন্ধ ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছিল মুন্নি ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চারপাশ থেকে সব কণ্ঠস্বর ওকে ঘিরে ধরেছে। মুতাওয়াল্লির বুকটা ভার হয়ে আছে। পা দু’টো চলতে চায় না। প্রতি গ্রাস বিরিয়ানি ওর কাছে লোহার মতো শক্ত মনে হয়। ভেতর থেকেই বিরিয়ানি যেন ওকে আঘাত করে। যা কিছু সে পান করে তার সবই, আমিনা যেমনটা বলে, তার কাছে শয়তানের পেশাবের মতো মনে হয়। ও ভাবে, ওর সবসময় এই পেশাবের উৎকট গন্ধ লাগে। এই গন্ধ যেন ওকে অধঃপতনে নিয়ে গেছে। ওর ভয় হয়, পেটের ভেতর কেমন জানি অস্বস্তি লাগে।
যখন বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য প্রাণন্তকর চেষ্টা করছিল তখন ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখে আমিনা তার মার সঙ্গে কোথাও যেন যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। মুতাওয়াল্লি ঘাম মোছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কথাও বের হয় না, কোন ঈশারাও করতে পারে না। কোথায় যাবে জিজ্ঞাসাও করতে পারে না।
“কোথায় আর?” আমিনা বিস্ফোরিত হয়ে বলে। “আমি তোমাকে ইতিমধ্যে সাতটা সন্তান দিয়েছি। এবার একটা অপারেশন করতে যাচ্ছি।
ওকে থামানোর শক্তি নেই। ওকে কিছু বলতে পারে না মুতাওয়াল্লি। মুতাওয়াল্লি যখন বসবে বলে ঠিক করে, তখন তার মতো করেই দৃঢ় কন্ঠে আমিনা বলে,
“দেখ, দরজা বন্ধ করে রাখবে। আর বাচ্চা-কাচ্চার দিকেও নজর রাখবে। আমার ফিরতে এক সপ্তাহের বেশিও লাগতে পারে।”


0 মন্তব্যসমূহ