রাগ ও আয়না
যদ্দুর মনে পড়ে বাবা একটা আয়না কিনে আনল একদিন দুপুরে। মা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে পেল না। মা বলল আয়নাটা এক্ষুনি বদলে আনতে। বাবার হঠাৎ মাথা আগুন হয়ে গেল। আয়না আয়নার জায়গায় রইল। বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেল।
সেলাইকল ও খিদে
মা সারাদিন সেলাইকলে বসে থাকত। পা দিয়ে প্যাডেলে চাপ দিত। হাত দিয়ে চাকার হ্যান্ডেল ঘোরাত। আমাকে একদিন মূক ও বধিরদের অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করে দিল।
এই সময় এল খিদে।
স্কুলে শেখাত খিদে একটা প্রবৃত্তি। ছোটমাসি আমাকে ভোলাবার জন্য বলত খিদে একটা মরা নদীর নাম। বাচ্চাদের ছবির বইয়ে দেখেছিলাম খিদে একটা ছোট্ট ছাইরঙা পাখি যে অ্যাকাশিয়ার বনে রাত্রিবেলা ঘাপ্টি মেরে থাকে।
কিন্তু মা বলত অন্য কথা। খিদে একজন দেবতার নাম। সবাই রোজ ওঁকে তুষ্ট করে। আমরা রোজ পারি না। যেদিন পারি না সেদিন ওঁকে দূর থেকে প্রণাম করে ঘুমিয়ে পড়ি। মা’র সব কথা আমি চোখ দিয়ে শুনতাম।
জেদ ও মৌমাছি
বাবাকে আমি খুঁজতাম। সবসময় খুঁজতাম। কেন ফিরে আসো না? অত জেদ কীসের তোমার? আয়নার ওপর যে জেদ দেখায় তাকে আমি ঘেন্না করি। তুমি এসো শিগগির। আমি আর পেরে উঠছি না।
একদিন দেখলাম অঞ্জু জুয়েলার্স-এর পাশে পাথরের ওপর একটা চোট পাওয়া মৌমাছি যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমি তক্ষুনি মৌমাছিটাকে একটা কাচের বোতলে পুরে ফেললাম। তারপর দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি এলাম। মাকে দেখালাম। দেখলাম অনেক বছর বাদে মা’র চোখে জল।
‘ওঁকে কোথায় খুঁজে পেলি?’ জিজ্ঞেস করল। আমি ইশারায় সব বললাম। বাবার শোবার ঘরে মৌমাছিটাকে মা খুব যত্ন করে শোয়ালো। রাত্রিবেলা মা ওঘরে মৌমাছিটার পাশে শুল।
মা রোজ খুব কাঁদে। আর মৌমাছিটার ওপর রাগ অভিমান দেখায়। আবার যত্নও করে। অপমান করে। আবার কাঁদে।
এক শীতের ভোরে মা’র ধাক্কাধাক্কিতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ওঘরে দৌড়ে গিয়ে দেখলাম মা থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। মৌমাছিটা টানটান হয়ে খাটের ওপর শুয়ে আছে। নিথর, নিস্পন্দ। মা’র চোখ দুটো আরও অতল হয়ে যাচ্ছে।
মা বলল ‘একটু আগে উনি চলে গেলেন। ওঁকে প্রণাম করো।’
মনকেমন ও দাঁড়কাক
বাবা, সবসময় আমি তোমার কথা ভাবি। আর অন্য কথা ভাবি না। সব কিছুর মধ্যে তোমাকে দেখতে পাই। আর অন্য কিছুর মধ্যে অন্য কিছু দেখতে পাই না। একদিন দেখলাম এক ঝাঁক কাক একটা খাবারের টুকরোকে ঘিরে চিৎকার করছে। তার ভিড়ে একমাত্র একজন দাঁড়কাক। আমার যেন খুব চেনা। আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, যে তোমার কথা ভাবে সে আমি নয়। অন্য কেউ। আমার পাশে সবসময় বসে আছে। সে ভাবে, আমি কাঁদি। আমি ভাবি না, সেও কাঁদে না।
আচ্ছা এমনও তো হয়! হয় না?
আমার সারাদিন মনকেমন হয়ে থাকে।
স্যালোঁ ও বেইমানি
আমাদের মফঃস্বল শহর খুব দ্রুত বদলে যেতে লাগল। ধু ধু মাঠপাড়া, সন্ন্যাসীর দীঘি, মন্দিরের চৌকো চাতাল সব উধাও হয়ে যেতে লাগল। মাথা চাড়া দিয়ে উঠল শপিং মল, প্রকাণ্ড সব লিফ্ট লাগানো বাড়ি, আলোয় আলো হয়ে থাকা ঝাঁ চকচকে গয়নার দোকান, কম্পিউটার পয়েন্ট, রোকোকো স্যালোঁ, ক্যাফে আর ট্যাটু সেন্টার। সন্ধেবেলা রাস্তাগুলো সব নদী হয়ে গেল।
ভাবলাম আমাদের এই পুরনো চাররাস্তার মোড়ে যদি কোনোদিন বাবা এসে দাঁড়ায়, দাঁড়াবে তো একদিন, চোখ ধাঁধিয়ে যাবে না তো? আমার মনে হল শহর বেইমানি করছে শুধুমাত্র বাবাকে ফেরত দেবে না বলেই।
চিরকুট ও জিরানিয়াম
একদিন নাচের স্কুল থেকে ফেরবার পথে সন্ধের মুখে মোড়ের নকল ফুলের দোকানের সামনে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। একরাশ স্টারডেইজি, গ্ল্যাডিওলা, জিরানিয়ম আর বুনো অর্কিডের স্বপের পিছনে বাবা বসে আছে। অবিকল সেই একই চেহারা! আমি দৌড়ে গেলাম বাবার কাছে। বাবা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে চিনতে পারল। হাসল। সেই চওড়া হাসি। আমি ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাড়ি ফেরো না কেন?’ বাবা পকেট থেকে একটা চিরকুট বার করে তার ওপর কী একটা লিখে আমার হাতে দিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরকুট নিয়ে বাড়ির দিকে ছুট লাগালাম। চিরকুটে লেখা ছিল ‘রাস্তা চিনতে পারি কই?’ মা’কে দেখালাম। মা থম মেরে গেল। চিরকুটটার অপর পিঠে ফুলের দোকান থেকে আমাদের বাড়ি অবধি একটা ‘রুটম্যাপ’ এঁকে দিল। তার পাশে গোটা গোটা হরফে লিখল ‘এসো’। সেটা নিয়ে বাবার কাছে আবার ছুটে গেলাম। বাবা এবার চিরকুটের অপরপিঠে লিখে দিল ‘না’। মা’র কাছে গেলাম। মা লিখল ‘কেন?’ তারপর তার পাশে সাতটা প্রশ্নচিহ্ন (‘???????’) এঁকে দিল। বাবার কাছে দৌড়ে গেলাম। বাবা অনেকক্ষণ অনামনস্কভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে লিখল ‘ইচ্ছে মরে গেল যে।’ আবার সেই চিরকুট নিয়ে মা'র কাছে দৌড়ে গেলাম। মা অনেকক্ষণ অন্যমনস্কভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে লিখল ‘আমারও’। সেই চিরকুট নিয়ে দৌড়ে এসে দেখি বাবা নেই। বাবা কোথাও নেই।
দোকানভরা এত প্লাস্টিকের ফুলের সামনে দাঁড়িয়ে আমার ভয়ঙ্কর কান্না পেয়ে গেল।
রেবেকা ও অন্য গল্প
চারদিকে আলো-অন্ধকারে পাগলের মতো বাবাকে খুঁজতে লাগলাম। অলি-গলি, বড় রাস্তায়, বাড়িগুলোর পাশের অন্ধকারে, অন্ধকারে পাশের বাড়িগুলোতে, বাবাকে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ দেখি ‘রেবেকা : ট্যাটু অ্যান্ড ক্যাফে’র সামনে ভাঙা শার্সির নিচে বাবা একটা কাঠের টুলের ওপর বসে আছে। সিগারেট খাচ্ছে। দৌড়ে গিয়ে চিরকুটটা দিতে যাবো বাবাও আমায় দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে এসে হাত বাড়িয়ে ওটা নিতে যাবে হঠাৎ...।
হঠাৎ কী হলো তা পরে আমি অন্য একদিন অন্য একটা গল্পে বলব।


0 মন্তব্যসমূহ