ক্লাস থ্রি তে পড়ি তখন। বয়স নয়। মাথাভরা মায়ের মতো চুল, শরীরভরা মায়ের মতো রোখ। শুধু চোখ দুটো বাবার। সেই চোখ দিয়ে আমি বাবার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বলি, “আমাকে অফিসে নাও! নিতে হবে!”
বাবা ভয় দেখান। অফিসে প্রচুর ধূলা। বাবার সহকারী আছে একজন, ফাতিমা, যখন ফাইলের ধূলা ঝাড়েন, ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। বাবার ঘর পার হয়েই অফিসারের ঘর। ভীষণ বদরাগী তিনি। টেলিফোনে সারাক্ষণ ধমকান সবাইকে। এবং সবচে যেটা ভয়াবহ, বাচ্চাদের দু চোখে দেখতে পারেন না। একবার বাবার বন্ধু অনীল কাকু তার ছেলেকে এনেছিল, ছেলের নাম বিনয়। বিনয় একটা কাচের বোতল থেকে কিছু জেমস ক্লিপ বের করে ফেলেছিল দেখে অফিসার এমন চিৎকার করল, দেয়াল থেকে একটা টিকটিকি থুপ করে পড়ে তার লেজ আলাদা হয়ে গেল। বাবার চা নিয়ে আসেন যে আয়া, নাম রুবিনা, সে আরো ভয়ংকর।
ছোট বাচ্চারা অফিসে গেলে সবার চোখের আড়ালে তাদের খাবারের ভেতর ‘পেট গুটিকা’ ছেড়ে দেয়। ওটা পেটে গিয়ে একটা মাকড়শার আকার নিয়ে ঠিক নাভি বরাবর কামড়ে ধরে। খুব যন্ত্রণা হয়। আর যদি কোনো বাচ্চাকে ভালো লেগে যায়, সেরেছে। ওকে খাইয়ে দেয় ‘মন গুটিকা’। ওটা খেলে বাচ্চারা নিজের বাবা মাকে চিনতে পারে না। রুবিনার হাত ধরে তার বাড়ি চলে যায়। ওষুধের ক্রিয়া যতদিন থাকে, ততদিন কোনোভাবে তাদের ফিরিয়ে আনা যায় না। একবার নজরুল নামে এক কলিগের মেয়ে জুঁইকে রুবিনা মনগুটিকা খাইয়ে দিয়েছিল। জুঁই রুবিনার হাত ধরে চলে গিয়েছিল, কেউ ফেরাতে পারেনি। নজরুল কাঁদতে কাঁদতে অফিসের ফটক পর্যন্ত গেছে, মেয়েকে কত অনুনয় করেছে। লাভ হয়নি। সাত দিন পর তার ওষুধের ক্রিয়া কাটলে যখন জুঁই ফিরে এলো, দেখা গেল, তার মাথাভরা উঁকুন, কাপড়ভরা ছারপোকা, আর শরীরময় হলুদ এক ধরনের ছত্রাক। মিটফোর্ট হাসপাতালের একজন ডাক্তার ওকে একমাস এসে এসে ওষুধ দিয়ে গেছেন। তারপর ও ঠিক হয়েছে।
“তোমরা তাহলে রুবিনাকে বাদ দাওনি কেন অফিস থেকে?”
“সরকারি অফিসের কিছু জটিলতা আছে। রুবিনাকে ওর আটষট্টি বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিতে রাখতে হবে। এর ভেতর কোনোভাবেই ওকে বরখাস্ত করা যাবে না।”
“এখন ওর বয়স কত?”
“বায়ান্ন না তিপ্পান্ন যেন। না, এমনিতে রুবিনা খুব ভালো। শুধু হঠাৎ কোনো বাচ্চাকে পছন্দ করে ফেললেই সমস্যা।
এককথায় বাবা আমাকে বিভীষিকা দেখাতে চাইছিলেন। সবমিলিয়ে আমার আগ্রহ দ্বিগুণ হলো।
এক রবিবার, স্কুল বাদ দিয়ে আমি বাবার সঙ্গ ধরলাম। খুুব সুন্দর করে সেজেছিলাম। একটা টিশার্ট ছিল―পালতোলা মাছধরা নৌকার ছবিওয়ালা। নীল সাগরের ওপর এক হাফপ্যান্ট পরা মাঝি সেই নৌকা নিয়ে ভাসছে। গেঞ্জিটা আলনার ভাঁজ থেকে বের করে একটা কালো গ্যাবার্ডিনের প্যান্টের সাথে পরেছিলাম। প্যান্টের উরুর কাছে হলুদ এম্বুশ করে লেখা ছিল উইনার, মনে বিজয়ী। পায়ে ছিল সাদা রঙের ‘পাওয়ার’ কেডস। কেডসের সোলটা ছিল কমলা, রঙটা যেন দূর থেকে কটকট শব্দ করত! আমি প্যান্টের ভেতর টিশার্ট ইন করে সাদা কেডস পায়ে দিয়ে বাবার অফিসের পথে বেশ দাপটের সঙ্গে হাঁটছিলাম।
প্রথম বিস্ময় লিফট। একটা ঠান্ডা রুপালির রঙের বন্ধ দরজার সামনে সবাই সারি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, লিফট আসবে। লিফটে ঢোকার আগমুহূর্তে আয়নায় মুহূর্তের জন্যে যা দেখলাম, তাতে বুঝে গেলাম, আজকের অফিসে মি. পারফেক্টটা কে।
আমার আরো প্রস্তুতি ছিল। কাঁধে ছিল স্কুলব্যাগ। ব্যাগটা যদিও দুই কাঁধে ঝোলানোর জন্যে ছিল, সেটাকে এক কাঁধে নিয়েছিলাম। ভেতরে ছিল এক তাড়া সাদা কাগজ। আর রঙপেন্সিল। যদি ভাব এসেই যায়, নিজেকে বাধা দেবো না। একটা ডেস্কমতন কিছু কি আর পাব না, এতো বড় অফিস? আমি আমার মতো ছবি আঁকব। বড়রা তাদের মতো কাজ করতে পারে চাইলে। চাইলে আমার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়েও থাকতে পারে।
বাবার অফিস বাংলাদেশ সচিবালয়। সেখানে শিল্প মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। পদ জানি না, তবে বড় অফিসার যিনি, যার নাম বড় সোনালি অক্ষরে লেখা থাকে, বাবা তার হয়ে টাইপ করেন, তার ভুলগুলো শুদ্ধ করেন। তারপর কাগজগুলো জায়গামত পাঠান। বাবারও একজন সহকারী আছেন, তিনি যখন তখন শব্দ করে আলমারি খোলেন। সেই যে ধূলায় ঘর অন্ধকারিনী, মিস ফাতেমা।
লিফটের দরজা খুলে গেল। আমার সামনে লাল গালিচা। দূরে দেয়ালের সাথে লাগানো একটা কাচের শোকেসের ভেতর সোনালি ধাতুতে তৈরি নগর, পথঘাট, কারখানা- এসব। আমি বাবার হাত ধরে লাল গালিচা দিয়ে হাঁটতে থাকলাম।
অফিসটা আমার পছন্দ হলো। বড় বড় জানালা একপাশে। আলোর বন্যা এসে দেয়ালে বাড়ি খাচ্ছে। পুরুষদের পোশাকআশাক মোটের ওপর একইরকম। সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো স্যুট, কারো কারো নীল। তবে মহিলাদের শাড়িতে লাল থেকে সবুজ, উজ্জ্বল নানারঙ। তাঁদের বেশি ভালো লাগছে।
দেখতে দেখতে আমি বাবার অফিসরুমের সামনে চলে এলাম। দেয়ালে একটা ছোট সোনালি ঘর কাটা, তাতে লেখা- ড. শাকুর রশিদ, উপসচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়। বদরাগী লোকটার মুখোমুখি যেন না হতে হয় খোদা, এই ভাবছিলাম। আবার, যদি হতে হয়, কী করব তখন? এই ভেবে একটু ভয়মাখানো রোমাঞ্চ অনুভব করছিলাম।
ঢুকে পড়লাম বাবার ঘরে। একটা টেবিলের পেছনে মন খারাপ করে বসে আছেন বেগুনি রঙের শাড়ি পরা একজন। চুলের একপাশে সিঁথি। মনে হলো আমাকে নয়, তিনি যেন ক্যাপ্টেন প্লানেটকে দেখেছেন হঠাৎ। লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আঁচল সামলে দ্রুত এলেন আমার কাছে। “তুমি হামিম?”
কী বোকা প্রশ্ন। তবে ভদ্রমহিলা এতো মিষ্টি যে বোকা প্রশ্নের উত্তরে খুব মিহি করে বললাম, “জি।”
বাবা বললেন, “ফাতেমা। স্যার হলুদ ফাইলটা দিয়েছেন?”
“সেটা নিয়েই তো গণ্ডগোল, স্যার। আমি কিছু জায়গায় লাল মার্ক করেছি। দেখবেন প্লিজ?”
“এখনই।”
“আজও বড়স্যারের মেজাজ ভালো না।”
“কী আর করা যাবে।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ড. শাকুরের কথা বলছে বোধয়। মেজাজ ভালো না আজো মানে? আজও চিৎকার করে দেয়াল থেকে টিকটিকি ফেলে দেবে নাকি!
আমি ব্যাগটা পিঠ থেকে নামিয়ে মিস ফাতেমার ডেস্কের পাশে রাখলাম। আহ, শান্তি!
আমি রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দার ‘রুপালি মাকড়শা’, জ্যাক লন্ডনের ‘অরণ্য যখন ডাকে’, অজানা কারো লেখা ‘খাঁটি খোক্কস’, রঙপেন্সিল বাকশো, আর ছবি আঁকার একতাড়া কাগজ নিয়ে ব্যাগ যথেষ্ট ভারি করে তুলেছিলাম।
না, ব্যাগ আসলে ভারি করেছে “ব্যবহারির বাংলা অভিধান”।
অভিধান নিয়ে আমার কিছু দুর্বলতা তৈরি হয়েছে তখন। যখন কেউ মনে করে ওটা আমি পড়ার ভান করতে সঙ্গে নিয়েছি, কষ্ট পাই। আসল ব্যাপার হলো, রুপালি মাকড়শা, অরণ্য যখন ডাকে, আর খাঁটি খোক্কস না হলেও তখন আমার চলে, যদি শুধু সঙ্গে থাকে ওই ডিকশনারীটা। তখন বুঝতাম না, অচেনা শব্দ দেখে আমি এতো আনন্দ পাই কেন? যেন অচেনা কোনো জগতে একটার পর একটা অদ্ভুত ফুল বা পতঙ্গ তুলে তুলে দেখছি। এই পুলক আমি বাবা ছাড়া আর কারো সঙ্গে ভাগ করতে পারতাম না।
ব্যাগ যখন এতোখানি ভারী হয়েই ছিল, সেখানে আরো এক লিটারের পানির বোতল আর টিফিন বাকশো ভরা নুডলসের দরকার ছিল না। মাকে বারবার বললাম, “অফিসের ক্যান্টিনে খেয়ে নেবো চিন্তা কোরো না,” শুনলই না। মনে হচ্ছে এতোক্ষণ কাঁধে শিলপাটা বয়ে বেড়াচ্ছিলাম।
বাবা আর ফাতেমা মিস এর ভেতর ফাইল নিয়ে আলাপ করে যাচ্ছে। দুজনের খারাপ থেকে আরো খারাপ হচ্ছে। একবার থামল ওরা। আমি বললাম, “ফাতেমা ফুপি, আমি কি তোমার ডেস্কে বসতে পারি?”
প্রথমে ভেবেছিলাম খালা ডাকব। পরে ভাবলাম যেহেতু তিনি আমার বাবার বন্ধু, ফুপিই ডাকি। আর আমার মা শিখিয়েছে, অনুমতি নিতে হয়। হয়ত আমি কোথাও একটা কিছু নিয়ে নিতেই পারি। কিছু করে ফেলতেই পারি। কেউ কিছু বলবে না। তবু আশপাশে বড় কেউ থাকলে তাকে আগে জিজ্ঞেস করাটা সুন্দর।
ওরা কথা থামিয়ে আমার দিকে তাকাল। ফাতেমা ফুপি বলল, “আল্লা, কী মিষ্টি! নিশ্চয়ই হামিমসোনা! তুমি বসবে না তো কে বসবে?”
আমি আড়চোখে ডেস্কের উল্টো দিকের চেয়ারটার দিকে তাকালাম। চেয়ারটার বসার জায়গাটা প্লাস্টিকের নেট দিয়ে তৈরি। আর সেই নেটের এখানে ওখানে খুলে গেছে। ফাতেমা মিস বললেন, “তোমাকে ওটায় বসতে হবে না। তুমি বসবে এই এখানটায়।” আমাকে ধরে তার গদিআঁটা আর্মচেয়ারে বসিয়ে দিলেন। তিনি বোধয় ভাবতে পারেননি আমি এতো ভারী। মায়াই হলো।
যখন তিনি আমাকে তুলে বসালেন, নতুন শাড়ির একটা চাপা সুগন্ধী পেলাম। আমাদের আলমারি খুললে মায়ের র্যাকে যে আলাদা গন্ধ পাওয়া যায়, এ ঠিক তা নয়, তবু একই। ফাতেমা ফুপির এক গোছা চুল পাট থেকে আলগা হয়ে কপালের সামনে চলে এলো। ফুপি সেটাকে কানের পেছনে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
টেবিলটা কাচে ঢাকা। পুরু সবুজাভ কাচ। তার দিকে তাকালে নিজেকে আবছা দেখা যায়। কাচের নিচে একটা ক্যালেন্ডার। বাঁকানো ধনুকের মতো লেখা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সরকারি ছুটির তালিকাসহ বর্ষপঞ্জি ১৯৯৫। আমি চেয়ার থেকে পিছলে নেমে গেলাম। আমার জিনিসই তো নেওয়া হয়নি।
ব্যাগটা টেনে টেনে বড় চেয়ারের কাছে নিয়ে এলাম। একটা একটা করে বের করলাম বইগুলো। সবশেষে আমার অভিধান। মনে হলো একে কোথাও লুকিয়ে ফেলা উচিৎ। ছবি আঁকার সাদা কাগজের তাড়ার নিচে তাকে লুকিয়ে রাখলাম।
মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি, এ মুহূর্তে আঁকতে বসব নিনজা টার্টেলের কোনো দুরন্ত মারপিটের ছবি। কাগজ টেনে নিয়ে পেন্সিলে লাইন আঁকা শুরু করে দিলাম।
আমি যখন আঁকি তখন আশপাশে যারা থাকে, মুগ্ধ হয়ে নানারকম শব্দ করতে থাকে। আমি শুনেও শুনি না। অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার এক বন্ধু আছে হ্যারিস। গোটা পাড়ার ভেতর ওরা এক পরিবারই খ্রিস্টান। হ্যারিস এখনো ভর্তি হয়নি স্কুলে, আমারই মতো। জিভ বের করে আঁকে আর মোছে, আমার পাশেই। ওর মা মাঝে মাঝে বাজার করতে গেলে রেখে যায় ওকে। তখন যখন আমরা ছবি আঁকি, দেখি ও যেটা অনেক কসরৎ ক’রে করে, আমার সেটা এক আঁকেই হয়ে যায়। হ্যারিস গম্ভীর হয়ে দেখে। দমে না। আবার আঁকে। আবার মোছে। মুছতে মুছতে পাতা ছিঁড়ে ফেলে। আমি হেসে ফেললে মা বকে। “হামিম, ও যে চেষ্টা করছে এটাই বড় কথা। মনে রাখবে, চেষ্টাই বড় কথা।”
চেষ্টাই বড় কথা। আমি চার নিনজা টার্টেলকে এঁকে ফেললাম। চেষ্টা করলাম ভিন্ন কিছু আঁকতে। এমনি এমনি দাঁড়িয়ে আছে এমন আঁকতে ভালো লাগে না। আমি ওদের একটু কাজে লাগিয়ে দিলাম। লিও, রাফ, মিকি, ডন (লিওনার্দো, রাফায়েল, মিকেলএঞ্জেলো, দোনাতেল্লো) ওরা নিজেরা মারপিট করে না। তবু আমি আঁকলাম ওরা তা করছে, হঠাৎ যেন পরস্পরের শত্রু হয়ে গেছে।
রংপেন্সিল বের করতে গিয়ে দেখি, বাবা আর ফাতেমা ফুপি আলাপ শেষ করে যার যার টেবিলে বসতে যাচ্ছে। বাবা বোধয় ভুলেই গেছে আমি এসেছি। আর ফাতেমা ফুপি মুখ নিচু করে হেঁটে আসতে আসতে হঠাৎ আমার চেয়ারের কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। আমি টার্টেলদের গায়ে সবুজ রঙ বসাতে বসাতে দেখলাম, ফুপি ওই বাজে চেয়ারটা টেনে নিয়ে টেবিলের উল্টো পাশে বসে পড়ল। কিছু বন্ধ ফাইল টেনে নিলো নিজের কাছে।
মা মায়ের মূর্তিটা কল্পনা করলাম। “হামিমসোনা, চেয়ারটা ছেড়ে দাও। এটা তোমার ফুপির চেয়ার।”
বাবার দিকে তাকালাম। টেবিলের নিচে পানির বোতল ছিল। তুলে ঢকঢক করে খাচ্ছেন। খাওয়া শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন। আমিও হাত নেড়ে হাসলাম। বাবাকে ব্যস্ত করতে চাই না। এমনিতেই আমাকে আনতে চাননি। যদি দেখেন নিজে নিজে ছবি আঁকছি, বই পড়ছি, তাহলে হয়ত ভাববেন, “না, ওকে তো আনাই যায়, একা একা ভালোই থাকে।” আমি চাই বাবা এমন ভাবুক। কারণ আমি আসতে চাই আরো।
গোটা অফিসে একটা শীতল বাতাস বইছে। মাথার ওপর পাখাটা বাতাসটাকে পুডিঙের মতো কেটে কেটে নিচে নামাচ্ছে। আমি মাঝে মাঝেই মুখ তুলে হা করে হাওয়া খাচ্ছি। হাওয়ায় পেট ভরে না, কিন্তু বুক ভরে যায়।
যে আলমারিটা থেকে বের করা ফাইল ঝেড়ে ফাতেমা ফুপি ঘর অন্ধকার করে দেয়, সেটা তার পেছনে। একটা রঙ ওঠা স্টিলের আলমারি। মনে হচ্ছে ওটা থেকেও বুঝি ঠাণ্ডা আসছে।
আমার খানিক গলা শুকিয়ে গেল। ব্যাগ থেকে বোতল বের করে পানি খেলাম। ভাগ্যিস মা দিয়েছিল। খুব ইচ্ছে করল নুডলসটাও বের করে খেয়ে ফেলতে। এখানে হয়ত এখনো খাওয়ার সময় হয়নি।
ঘরে মোট তিনটা টেবিল। একটায় বাবা বসেছে, আরেকটা ফাতেমা ফুপির। তৃতীয় টেবিলটা দরজার পাশে ফাঁকা পড়ে আছে। এটাই তাহলে অনীল কাকুর টেবিল। বাবার বন্ধু অনীল কাকু, যার ছেলেকে একদিন অফিসে নিয়ে এসেছিল। ছেলেটা জেমস ক্লিপ বের করে ছড়িয়ে ফেলেছিল, আর ড. শাকুর দিয়েছিল এক চিৎকার। কোথায় ড. শাকুর? ফাতেমা ফুপির কথা শুনে মনে হয়েছে অফিসে এসেছে। তারপর গেছে বোধয় কোথাও। খবরদারি করছে। অথবা রাস্তায় অনীল কাকুকে পেয়ে গিয়ে বকাঝকা করছে।
অনীল কাকু আর বাবা খুব বন্ধু। দুজন একসঙ্গে হেসে হেসে ক্যান্টিনে খেতে যায়। মাংসের ভালো টুকরা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। কারো বাসায় ভালো কিছু হলে পরদিনে অফিসে বন্ধুর জন্যেও নিয়ে আসে। টাকা লাগলে ধার দেয়।
অনীল কাকুর একটা তোতা পাখি আছে বাসায়। কেউ যদি বারান্দা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “অনীল বাড়ি আছ?” তোতাপাখিটা বলে, “অনীল অফিশো! অনীল অফিশো!”
কোথায় অনীল কাকু? ঘরে একটা ঘড়ি আছে। তাকিয়ে দেখি দশটা। আমি এ ঘরে ঢুকেছি যখন, তখন পৌনে নয়টা, ঘড়িতে দেখেছি।
কিছুদিন আগেমাত্র ঘড়ি দেখা শিখেছি পাশের বাসার জুনু দিদির কাছ থেকে। জুনু দিদিকে খুব ভালো লাগে আমার। জুনু মানে “ভগবানের উপহার”। আল্লাহ ওদের পরিবারে দিদিকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। স্বপ্নে দেখা দিয়ে তার বাবাকে বলেছেন, “গৌতম! সারদাকে দেখে রেখো। আর এই নারকেলটা নিয়ে বাড়ি যাও। উত্তর-পশ্চিম কোণে লাগাবে।” সারদা জুনু দিদির মা।
মাঝে মাঝে মনে হতো, জুনু দি’ যদি হতো আমার বড় বোন, খুব ভালো হতো। জানি না, সত্যি সত্যি হলে অতো ভালো লাগত কিনা। সন্দেহের কারণ জনমেজয়ের অশান্তি। জনমেজয় জুনুদি’র ছোটভাই। এই নামে অনেক দিন আগে বিখ্যাত এক রাজা ছিলেন। তো, এই জনমেজয় দিদিকে খুব ভয় করে, কথায় দিদি কথায় কথায় ওকে খিমচি কাটে। জনমেজয় ওর একবার দেখিয়েছিল ওর গালে খিমচির দুটো তাজা দাগ! তারপর চোখ মুছে বলেছিল, “ভাইবোনে একটু এমন করেই।”
কথাটা মনে হয় সারদা মাসির ছিল। ওর মনের কথা ছিল না। সেই থেকে জুনু দিদিকে আমিও একটু একটু ভয় করি।
দশটা বাজে মানে খুব দ্রুত অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। ছবি আঁকতে থাকায় টের পাইনি। দশটা বাজে মানে অনীল কাকু আজ অফিসে লেট করছে। কারণ অফিস শুরু হয় নয়টায়।
২.
হঠাৎ খল খল খল হাসির শব্দে ঘুম কেটে গেল। টেবিলের ওপর মাথা রেখে কখন ঘুমে ডুবে গেছি নিজেই জানি না। কে হাসল?
গোল গোল চোখের চোখের একটা মানুষ। চোখ দুটোই সবার আগে চোখে পড়ল আমার। বড় বড় চোখ দুটোর কারণেই বোধয় সব কিছুর ভেতর থেকে হাসির জিনিসটা খুঁজে বের করতে ভদ্রলোকের কোনো কষ্ট হয় না। যেমন চোখ তেমনই মুখ। গোল। নাকটাও একটা আকার দেওয়া ছোট আলুর মতো। নাকের নিচে গোঁফ আছে। মানুষটা আমাকে আঙুল তুলে দেখিয়েই হাসছে। এই মানুষগুলো ভালো না। লজ্জা দেয়।
আমি ঠোঁটের কোণ থেকে লালা মুখে নিয়ে প্যান্টের পাশে হাত ঘষে ফেললাম। মানুষটা তার বগলের নিচ থেকে একটা ক্রাচ বের করে দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখল। আর তখনই আমি খেয়াল করলাম লোকটা পঙ্গু। বাঁ পা-টা নিশ্চয়ই কাঠের পা।
“হামিম, তোমার অনীল কাকা,” বাবা বললেন।
অনীল মানে বাতাস। এই তাহলে অনীল কাকা। বাবা কোনোদিনও বলেননি অনীল কাকার একটা পা নেই। যেন এই না থাকাটা স্বাভাবিক। আমার বারবার চোখ চলে যেতে চাইছিল সেই খোঁড়া পা-টার দিকে। কষ্ট করে চোখ দুটো তার মুখের দিকে ধরে রাখলাম। যে করেই হোক এটা আমি জানি। বলে দেওয়ার জন্য এখানে মা না থাকলেও জানি।
এদিকে আমার ঘুম ভাঙতে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন ফাতেমা ফুপি। “এই যে আমার বিদ্বান বাবা! ঘুম কেমন হলো?”
ঘাড় ব্যথা করছে। ফাতেমা ফুপি এগিয়ে এসে আঁচলে আমার লালাটা মুছে দিলেন। কী লজ্জার ব্যাপার।
“বাব্বাহ, এতো পড়তেও পারে আমার বাবাটা!”
শুরু করেছিলাম ‘রুপালি মাকড়শা’ দিয়ে। রবিন কোথায় রাখল মাকড়শাটা সেটা ধরতে পারছিলাম না। না পেরে ভালোই লাগছিল। রকিব হাসানের কাছে কৃতজ্ঞ হচ্ছিলাম। ওটা বিশ পাতা পড়ে, এরপর ধরলাম জ্যাক লন্ডনের “অরণ্য যখন ডাকে।” অনুবাদ, ময়ূখ চৌধুরী। বাবারে এটা একটা মাথা খারাপ করা বই। বাক্ এখন স্লেজের আধা-বন্য কুকুরগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কী ভদ্র কুকুর এই বাক! পড়ার সময় নিজেকে বাক বলে ভাবতে ইচ্ছে করে। বন্য কুকুরগুলোর বিশ্রি ব্যবহারের শিকার হচ্ছে ও। এটা যতো মানতে পারছি না, ততো ওকে ভালোবাসতে ইচ্ছা করছে। যখন বাক হাস্কি কুকুরগুলোর একটাকে উচিৎ জবাব দিলো, আমি শান্ত হয়ে বইটা রাখলাম। এবার খাঁটি খোক্ষস। বইটা মিরপুর গোল চত্বরের ফুটপাথ থেকে কেনা। বইটা কে লিখেছে নাম লেখা নেই। প্রচ্ছদটা ভালো না। নীল দেহের একটা খোক্ষসের ঠোঁট ঠেলে দুটো দাঁত বের হয়ে আছে। ওর নাম খাঁটি। খাঁটির মায়ের অসুখ। হঠাৎ দ্রুত বুড়ি হয়ে যাচ্ছে খোক্ষস ভদ্রমহিলা। এ অসুখ সারাতে প্রয়োজন সিরা নামে এক রাক্ষসের উঠানে শুকাতে দেওয়া হরিতকির গুঁড়া। কে যাবে সিরার আস্তানায়? সিরা রাক্ষস বড় ভয়ানক। ওর আস্তানায় গেলে কেউ ফিরে আসে না। খাঁটি মাকে বড় ভালোবাসে। মা জানলে ওকে যেতে দেবে না, তাই একরাতে লুকিয়ে রওনা হয়ে গেল।
এই পর্যায়ে আমি অভিধানে এলাম। ও অনেকক্ষণ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমার স্বপ্নের বই। শব্দগুলো, অর্থগুলো খানিকটা বুঝি, খানিকটা বুঝি না। যেটুকু বুঝি না সেটুকু নিয়ে গল্প সাজাই। এতো ভালো লাগে! সেদিন প্রথমে পাতা ওল্টাতেই একটা শব্দ পেলাম, ইরম্মদ। আগে কখনো শুনিনি। ইরম্মদ- একবার উচ্চারণ করলাম। আমার মুখটা হাসি হাসি হয়ে উঠল। এর ১ নম্বর মানে হলো, বিদ্যুৎ, বজ্রাগ্নি (যুঝিতে লাগিল দোঁহে, ইরম্মদ বেগেÑ কায়)। বন্ধনীর ভেতরের বাক্যটা রহস্যকে অনেক বেশি জাগিয়ে দিলো। “কায়” কি? পাতা উল্টে দেখলাম, কায়- কায়কোবাদ। একজন কবি। কারা যুঝিতে লাগিল? যুঝিতে, শব্দের ভাব থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওরা যেন বুঝতে চাচ্ছে একটা কিছু দুজন মিলে, মিল হচ্ছে না। বিদ্যুতের বেগে!
ইরম্মদ শব্দের তিন নম্বর মানে হাতি। আমি এক নম্বর মানের সাথে তিন নম্বর মানের একটা যোগসূত্র খুঁজে পেলাম না। রোমাঞ্চের শুরু!
পরেরবার পাতা ওল্টাতে একটা শব্দ পেলাম কালাপাহাড়। এর এক নম্বর মানে, বিরাটাকায় ও ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লোক। এর তিন নম্বর মানেটা চমকে দিলো আমাকে। তুর্কি আমলের একজন সেনাপতি, যিনি প্রথমে হিন্দু ব্রাহ্মণ ছিলেন, পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হিন্দুদের বহু দেবমন্দির ও দেবমূর্তি ধ্বংস করেন। কালাপাহাড়। শব্দটা আগে কোথায় শুনেছি?
চট্টগ্রামে আমার নানাভাইয়ের সঙ্গে বাজারে গিয়েছিলাম, গত মাসের কথা। একটা কাপড়ের দোকানে বসেছিলাম। সেখানে এক লোক কালাপাহাড়ের প্রশংসা করছিল। কথাগুলো এখনো বাজছে আমার কানে। লোকটা বলছিল, “উচিৎ শিক্ষা দিছে কালাপাহাড়ে।” প্রতিবাদ করে উঠেছিলেন আমার নানাভাই। “তুঁই ঠিক কইলা না। মন্দির মসজিদ গড়ে মানুষ, ভাঙে অমানুষ। মন্দির ছাড়া মসজিদ অচল। মসজিদ ছাড়া মন্দির ব্যর্থ।” শুনে লোকটা হাসতে হাসতে বলেছিল, “কী কন ভাইসা বুঝি না।”
নানাভাইয়ের কথাটা আমিও পুরো বুঝিনি। কথাটার ভেতর জোছনার মতো নরম কিছু ছিল। হয়ত দুজন মারপিট করছে, তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর কিছু ছিল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল ওটাই সত্যি কথা।
একটা শব্দ দেখলাম শম্পা। চমকে উঠলাম, শম্পা মানেও বিদ্যুৎ, বিজলি। আমার কাছে মনে হলো ইরম্মদ পুরুষ বিদ্যুৎ। আর শম্পা মেয়ে বিদ্যুৎ।
মনে পড়েছে। এরপরই বই নামিয়ে মাথাটা কাত করেছিলাম। স্বপ্নে দেখছিলাম একটা বেগুনি রাত। আকাশে সাদা সাদা ‘ইরম্মদ’ আর ‘শম্পা’ চমকাচ্ছে। প্রথমে মনে হচ্ছিল ওদের খুব রাগ। পরে মনে হলো ওরা কাটাকুটি খেলছে। স্বপ্নের সেই মাঠে বিদ্যুৎ চমকালেও মেঘের কোনো শব্দ ছিল না।
আমি একদিন সত্যি সত্যি এমন দেখেছিলাম। রাতে আম্মুর সাথে বাসায় ফিরছি রিকশায়, আকাশে ইলিক ঝিলিক বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল। কোনো শব্দ নেই! তবে একটা ঠাণ্ডা বাতাস এসে আমার আর আমার মায়ের শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছিল।
এখনো তাই। একটা ঠাণ্ডা বাতাস আসছে, আর বাতাসের সাথে ধুলা। একবার যেন বজ্রপাতের শব্দ শুনেছিলাম আকাশে। ফাতেমা ফুপি মনে হয় আলমারি খুলছিল তখন। আমাদের পুরনো আলমারিটাতেও অনেকসময় কড়কড়াৎকড় শব্দ হয়। চট্টগ্রামে নানুবাড়ির জং ধরা আলমারিটাতেও।
“ওর ভাবের জগতে হারিয়ে গেছে,” বাবার কণ্ঠ। বাস্তবে ফিরে এলাম। বাবা বললেন, “ও এমনই। প্রায়ই হারিয়ে যায়।”
ফাতেমা ফুপি বললেন, “ওর ছবিগুলো দেখেছেন স্যার!”
“হুম, সারাদিনই তো দেখছি।”
‘কী সুন্দর! কোথাও শিখেছ তুমি বাবা?”
‘না।”
আমার কান গরম হতে শুরু করল। বাবা বাঁচিয়ে দিলেন। “না ও কোথাও শেখে নাই। ছোটবেলা থেকেই এমন। একবার দেখলেই হুবহু এঁকে ফেলতে পারে টুকটাক ডিটেলসহ।”
অনীল কাকা বললেন, “ইউ হ্যাভ গট এ ভেরি স্পেশাল চাইল্ড, কামাল। টেক কেয়ার। ইনফ্যাক্ট, ডিকশনারি পড়া কোনো বাচ্চা আমি আজতক দেখিনি।”
বাবা বলল “আরে কী বলো, এঁঁচড়ে পাকা ছেলে একটা। এঁচড়েই পেকে গেছে। ওকে নিয়ে কী করব আল্লা মালুম।”
ফাতেমা ফুপি বলল, “এঁচড়ে পাকা! অসম্ভব স্যার। ওর চোখ দেখেছেন? এমন হতেই পারে না।”
বাবা বললেন, “ব্যাপার তো ওখানেই! চোখ দেখে বুঝতেই পারবে না আমার ছেলে কী জিনিস।”
ফাতেমা ফুপি ভুরু কুঁচকে বলল, “জিনিস! কী বলছেন স্যার এসব?” ফুপি সত্যিই আহত হয়েছে।
বাবা মুখ ছুঁচাল করে আমার দিকে তাকাল। আমি চোখ দিয়ে বুঝিয়ে দিলাম, “আজ বাসায় যাবে না? বুঝবে মজা।”
অনীল কাকা হা হা করে হাসতে থাকল। তিনিও অনেকটা আমার বাবার মতোই। তবে কাকা পা হারাল কী করে তা জানতে ইচ্ছে করছিল। ফাতেমা ফুপি বলল, “আমার বাবাটার কোনো যত্ন হচ্ছে না। কী খাবে তুমি?”
“ওর ব্যাগে নুডলস আছে,” বাবা বলল, “ওর মা দিয়ে দিয়েছে। আমার ছেলে নুডলসের পোকা।”
“বাহ! খাবে এখন?”
আমি দুদিকে মাথা নাড়লাম। নুডলস তো কোথাও চলে যাচ্ছে না। দেখতে চাই ওরা আমাকে কী খাওয়াতে পারে।
“চা খাবে, চা?” বললেন ফাতেমা ফুপি। “আধঘণ্টার একটা ঘুম দিয়ে উঠেছ। এখন এক কাপ চা পেলে বোধয় দারুণ হয়, তাই না?”
আমি মাথা হেলিয়ে সায় জানালাম। ফাতেমা ফুপি বলল, “কী লক্ষ্মী করে মাথা নাড়ল!”
বাবা বলল, “তুমি দেখছি যা দেখছ তাতেই মুগ্ধ হচ্ছ।”
“সত্যিই তাই, স্যার।”
বাবা ঠা ঠা করে হাসল। “তোমার কোনো ধারণাই নেই ফাতেমা।”
“লাগবে না ধারণা। আপনারা কেউ চা খাবেন? আমি ওর আর আমার জন্য চা করব।”
বাবা বলল, “না ফাতেমা, ধন্যবাদ। একটু পর নিচে গিয়ে খাব।”
বাবা পৃথিবীতে ঘরের চা বলতে শুধু মায়ের বানানো চা খায়। এছাড়া তার যত ঝোঁক, বাইরের চায়ে। বাইরে চা খাওয়ার ভিন্ন আমেজ। কে কী বলছে, কী কিসে হাসছে, রাগছে, এইসব দেখতে দেখতে চলে বাবার চায়ে বিস্কিট ভিজিয়ে ধীরে সুস্থে খাওয়া। আমি দেখেছি, মানুষ দেখতে বাবা ভালোবাসে। কেন?
অনীল কাকা বলল, “কামাল নিচে গিয়ে খাবে। আর আমি নিচ থেকে খেয়ে উঠেছি ফাতেমা। হা হা হা হা!”
মানুষটা অদ্ভুত। আমার ধারণা তার তোতাপাখিটাও এমন করে হাসে। কেউ যখন বারান্দায় এসে জিজ্ঞেস করে, “অনীল বাড়ি আছ?” তোতাপাখিটা বলে, “অনীল অপিশো! টা টা টা টা!”
বাবা বলল, “ফাতেমা। রুবিনাকে ডাকো। ও চা বানিয়ে দিক।”
রুবিনা! আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। কেমন দেখতে সে? আমার মনে চোপসানো চোয়াল, হাড় বের হওয়া গলা, পাটের মতো চুল আর মার্বেলের মতো একজোড়া চোখ ভেসে আছে। ও যদি চা বানায় তো আমি শেষ। বাবা জেনেশুনে আমাকে কেন এমন ফাঁদে ফেলল? কোনো শাস্তি?
“ওর জন্যে আমি চা বানাব স্যার, প্লিজ।”
বাঁচা গেল। ফাতেমা ফুপি বেরিয়ে গেছে। ওনার সুঘ্রাণটাও বেরিয়ে গেছে তার সঙ্গে। রান্নাঘরটা বোধয় কাছেই। একবার ইচ্ছে হলো ফাতেমা ফুপির সাথে সাথে যাই। ভাবতে ভাবতেই একটা কাগজ টেনে নিয়ে তোতাপাখির ছবি আঁকতে শুরু করলাম।
পাখিটা খাঁচায় নেই। তেমন পাখি দেখতে আমার ভালো লাগে না। একটা আড়াআড়ি লাঠির ওপর বসে ও দোল খাচ্ছে। তার পেছনে শিকবিহীন খোলা জানালা। চাইলেই সে উড়ে চলে যেতে পারে। যাচ্ছে না। হয়ত এ বাসার মানুষদের ভালোবাসে।
চা পাতার ঘ্রাণ ভালো লাগে আমার। মা যখন চায়ের পানি বসায়, সেখানে দুটো লবঙ্গ দেয়। কখনো একটা তেজপাতা ছিঁড়ে অর্ধেকটা। পানি যখন উথলে উথলে ফুটতে শুরু করে, একটা টেবিল চামচ ভরে চা পাতা ছাড়ে মা। গুনে গুনে দশ সেকেন্ড চা-টা ফোটে। এরপর দপ করে মা চুলা নিভিয়ে দেয়। পাত্রটা ঢেকে দেয় তারপর। ঢাকা থাকে আরো দশ সেকেন্ড। তারপর যখন সরানো হয়, গোটা ঘরটা চায়ের ঘ্রাণে এমন ম ম করতে থাকে!
সেই ঘ্রাণ পেলেই আমার প্রাণ নাচে। মনটা চনমনে হয়ে যায়। হয়ত ফাতেমা ফুপির চা থেকেও এমন সুবাস বেরিয়ে আসছে।
ছবিটা শেষ হয়ে এসেছে এমন সময় ফুপি একটা রুপালি ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। ছোট ট্রে। সেখানে দুটো চিনেমাটির কাপে চা, আর একটা পিরিচে বড় দুটো নিমকি। আমার সামনে ট্রে-টা যখন নামাল, আমি যে শুধু কাঁচা চাপাতার ঘ্রাণ পেলাম তাই না, তাজা ঘিয়ের ঘ্রাণও পেলাম। ওটা আসছে উজ্জ্বল সোনালী, তেলচকচকে দুটো নিমকি থেকে! আমার ক্ষুধা লেগে গেল।
মায়ের মতো রং চা না এটা, দুধ চা। ভাজা চিনাবাদামের মতো রং। লোভ হলো। পা দুটো নাচতে থাকল আনন্দে। মন তো নাচছে আগেই।
অনীল কাকা বললেন, “এহ্হে রে!”
“কী হলো?”
“চা-টা না চেয়ে ভুলই হয়ে গেল।”
“এখন আর বলে লাভ নেই,” ফাতেমা ফুপি বললেন। “হামিম তোমাকে ঠাণ্ডা করে দেবো চা?”
ফুপি তার ড্রয়ার খুলে দুটো ফেসিয়াল টিস্যু বের করে পিরিচ মুছে নিলো। তারপর চা ঢেলে ছোট ছোট ফু দিতে থাকল।
“এখানে কি আ-বারও বেবিসিটিং হচ্ছে!”
ফাতেমা ফুপির হাত থেকে চা ছলকে পড়ল টেবিলের ওপর।
৩.
আমি দরজায় দাঁড়ানো বিরাট মাথার বেঁটে লোকটাকে দেখতে পেলাম। অবজ্ঞায় কুঁচকে থাকা মুখ। দেখে সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করলাম। এই তাহলে অফিসার ড. শাকুর রশিদ?
লোকটার মুখের নিচে একটা চর্বির স্তর মালার মতো ঝুলছে। পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, ইন করা। একটা ক্লাস সেভেনের ছেলে হঠাৎ বুঝি মোটা আর বয়স্ক হয়ে গেছে।
বাবা দাঁড়িয়ে পড়ল। ফাতেমা ফুপি পিরিচটা রেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। অনীল কাকু চেয়ারে একটু আরাম করে বসেছিল। সোজা হয়ে দেয়ালের দিতে হাত বাড়াল তার ক্রাচটার দিকে। ধরতে পারল না। ক্রাচটা কাত হয়ে অফিসারের গায়ে পড়ে পড়ে প্রায়! অফিসার সেটা ধরে ফেলে বলল, “কী আশ্চর্য, মারবেন নাকি!”
ক্রাচটা ফেরত দিয়ে গটগট করে হেঁটে যেতে থাকল লোকটা। ভেবেছিলাম তাকাবেই না আমার দিকে, কিন্তু চোয়াল শক্ত করে চোখে বিরক্তি নিয়ে তাকাল। পলকে দেখে নিলো আমার আঁকা ছবি, গল্পের বই, খোলা অভিধান। থমকে দাঁড়িয়ে বলল, “ডিকশনারিটা কি অফিসের?”
বাবা বলল, “জি না স্যার। এটা ওর।”
লোকটা ঝুঁকে এসে মলার উল্টে নিশ্চিত হতে চাইলো। বাবাকে লোকটা বিশ্বাস করে না।
অফিসের সবকিছুতে অসংখ্য অবলিক চিহ্ন দেওয়া একটা লম্বা নম্বর থাকে, আসার পর থেকে দেখেছি। এ নম্বর আছে আলমারিতে, টেবিলে, চেয়ারে, মেঝেতে দাঁড়ানো পাখায়, দরজায়, জানালায়। শাকুর রশিদ হয়ত তেমন একটা নম্বর খুঁজছিল।
আমি লক্ষ্য করলাম লোকটার চুল যে নেই ভেবেছিলাম তা নয়। আছে। তেল দিয়ে লেপ্টে পেছনদিকে আঁচড়ানো।
নম্বরটা পেল না। কড়া চোখে তাকাল আমার দিকে। আমি বুঝতে পারলাম না। এখন তো তার নরম হওয়ার কথা ছিল!
লোকটা দরজা বন্ধ করে দিলো তার ঘরে ঢুকে। দড়াম!
ফাতেমা ফুপি আমার দিতে ফিরে বলল, “হামিম, আব্বু তুমি ভয় পেয়ো না, কেমন?”
“জি।”
‘উনি কিন্তু মানুষ ভালো। একটু বকেন, সেটা ভালোর জন্যই।”
আমি নড়েচড়ে বসলাম।
“তুমি চা খাবে না?” বলল ফুপি। “দেখো তো, মনে হয় চা-টা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।”
নিজেই এগিয়ে এলো। “এই রে, তোমার চা-টা অনেকখানি কমেও গেছে। স্যরি বাবা! তুমি আমারটা খাও।”
ফুপি তার কাপটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। একটা টেনিস বল বড় হতে থাকল আমার গলার কাছে। বললাম, “আমি অল্পটাই খাব।”
পিরিচের দিকে হাত বাড়ালাম।
“ঠাণ্ডা হয়ে গেছে যে বেশি!”
“আমি ঠাণ্ডাটাই খাব।”
বাবা বলল, “ফাতেমা! যেটা চাচ্ছে, থাক।”
ফুপি আর কিছু বলল না। অনীল কাকা বলল, “কামাল, তোমার হলুদ ফাইলের ভেজাল শেষ হয়েছে?”
“বেড়েছে।”
“তাই নাকি! সেরেছে।”
বেল বেজে উঠল বাবার টেবিলে। ফুপি ঝট করে তাকাল বাবার দিকে। “স্যার, আমি শেষবার একটু দেখে দিই?”
“না ফাতেমা। যা দেখার দেখেছ। কাজ হলে এতেই হবে।”
একটা হলুদ ফাইল হাতে নিয়ে বাবা অফিসারের দরজায় একজোড়া টোকা বাজিয়ে ভেতরে চলে গেল। এক মিনিটও হয়নি দরজাটা খুলে গেল, কিন্তু বাবা বের হলো না।
যদি জানতাম এরপর কী হবে, আমি বহুদূর পালিয়ে যেতাম।
ভেতর থেকে অফিসারের আওয়াজ এলো, “থাকুক কামাল সাহেব, দরজাটা খোলা থাকুক। সবার শোনারও দরকার আছে।”
বাবা চাপা গলায় বলল, “আমার ছেলেও আছে স্যার।”
“থাকুক ছেলে!” গর্জে উঠল অফিসার। “এনেছেন কেন ছেলে? এটা ডে কেয়ার সেন্টার? শিশুসদন? ডে কেয়ারে রেখে আসেননি কেন। লাইব্রেরিতে রেখে আসেননি কেন?”
বাতাস থমকে আছে।
“ও আমার অফিস দেখতে চেয়েছিল।”
“এটা সচিবালয়! রমনা পার্ক না যে রঙিন রঙিন ফুল দেখাবেন! এটা রমনা পার্ক? উত্তর দিন!”
আমি কেন এলাম? বাবা আমাকে এজন্যে আনতে চায়নি। কত বুঝিয়েছে, আমি বুঝিনি। ভেবেছি বাবা ঠকাতে চাইছে। এখন?
অনীল কাকু আমাকে শুনিয়ে মৃদু স্বরে হাসার চেষ্টা করল। ফাতেমা ফুপি জমাট মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। আমার ইচ্ছে হলো লাফিয়ে উঠে ছুটে গিয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠি। এতো জোরে যেন ওর ছাদ ভেঙে যায়। ইচ্ছে হলো আমার সমস্ত পশুপাখি বন্ধুদের ডেকে জড়ো করি। চিড়িয়াখানা ভেঙে এসে ওরা হাজির হোক। গর্জনে ফাটিয়ে দিক অফিসের দেয়াল। এ লোকটার আত্মা উড়ে যাক। আমার বাবাকে ছেড়ে দিক।
আমি তর্জনি দিয়ে প্রাণপণে বুড়ো আঙুল খুঁটছি। চোখে ভাসছে আমার একরোখামো। মায়ের হাত থেকে ছুটে বাবার দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছি। বাবার জুতা লুকিয়ে রাখছি, কলম লুকিয়ে রাখছি। অবশেষে আজই প্রথম বাবা অসহায় চোখে একবার মায়ের দিকে তাকাল। শেষে মৃদু হেসে বলল, “ঠিকাছে আব্বু, চলো!”
“ভেবেছেন কী?” অফিসারের গলা। “ছেলেকে নিয়ে এলে কিছু বলতে পারব না, তাই না?”
“আমি কিছু ভাবিনি স্যার।”
“ভাবার চর্চা আছে আপনার? আপনাদের মতো ভাবনাহীন লোকগুলোর কারণেই আমাদের লজ্জায় পড়তে হয়।”
“স্যার―”
“কী সমস্যা।”
“স্যার আমি কিছু বদলাইনি।”
“মিথ্যা কথা!”
“স্যার কিছু বদলানোর ক্ষমতা আমার নেই।”
“বোঝেন? সে কথা বোঝেন?”
বাবা আবার নিজের হয়ে লড়ল। “স্বাক্ষর আমি দিইনি স্যার।”
“তাহলে কি ভূতে দিয়ে গেছে? রাবার স্ট্যাম্পের সিল কোথা থেকে এলো?”
“আমি জানি না।”
“কে জানে?” দাঁতে দাঁত চেপে বলল অফিসার। “অনীল বাবু জানে?”
“মোটেই না।” বলল বাবা।
“তাহলে কি। মিস ফাতেমা জানে?”
“কখনই না।”
“তাহলে জানে টা কে, জিনের বাদশা?
এক জিনের বাদশা ছাড়া আর কাউকে তো পাচ্ছি না তাহলে একিউজ করার!”
ওরা আসলে ঠিক কী নিয়ে কথা বলছে? বাইরের করিডোরে ঘড়ঘড় শব্দ করে একজন বৃদ্ধা নারী ফাইলপত্রের ঠেলাগাড়ি বয়ে নিয়ে গেল।
ড. শাকুর রশিদ বললেন, “কামাল সাহেব, আপনি দোষ করেছেন, তারপরও নিজের সাফাই গাইছেন, এবং অন্যদের চার্জ করতে বাধা দিচ্ছেন। আপনি নিজের স্পর্ধা নিজেই দেখুন।”
“স্যার আমি আমার ব্যাপারে নিশ্চিত।”
বাবা পিছিয়ে এসে ঘরের বার হলেন। মাথা নিচু করে নিজের টেবিলে বসলেন। ফাতেমা ফুপি বললেন, “হামিম, আব্বু তুমি আমার সাথে একটু বাইরে বেড়াবে?”
“কেউ কোথাও যাবে না!” ভেতর থেকে বলে উঠল ড. শাকুর। “কামাল সাহেব, ভেতরে আসুন।”
বাবা উঠে আবার ভেতরে গেলেন। মনে হলো তার হাঁটুর ভাজে জড়তা। পা দুটো ঠেলে নিতে চাচ্ছেন।
“বসুন। না, দরজা খোলা থাক।”
চেয়ার টানার শব্দ শোনা গেল।
ড. শাকুর তার প্যাড টেনে নিয়ে কলমের খাপ খুলল। বাবার কিছু কাগজপত্র তার হাতের কাছে ছিল। পাতা উল্টে কিছু একটা দেখে নিয়ে বলল, “আমি এখন একটা কাজ করতে যাচ্ছি এবং আপনার সামনেই।”
খসখস করে একটা কোনো নির্দেশনা লিখতে থাকল ড. শাকুর। তথ্যের প্রয়োজনে বাবার সেই ফাইলটা দু’বার দেখল। তারপর লেখা শেষ করে, সিগনেচার করে, রাবারস্ট্যাম্প খুলে সিল বসিয়ে, এগিয়ে দিলো বাবার দিকে। “দেখুন।”
বাবা একবার চোখ বুলিয়েই সরিয়ে নিলো। “আপনি কী করতে পারেন আমি জানি স্যার। আমাকে বসিয়ে এ কাগজ দেখানোর দরকার নেই। তবে স্যার, আমার শুধু একটা কথা বলুন।”
“কী কথা?”
“আপনার কি আপনার সাবঅর্ডিনেটের ওপর বিশ্বাস নেই?”
“এটা তো ভ্যারি করে। কোন সাবঅর্ডিনেটের কথা বলছেন আপনি কামাল সাহেব?”
“স্বাক্ষরটা আমি করিনি।”
“ঠিক কত টাকা নিয়েছেন জানতে পারি?”
“এনাফ!”
“কার সঙ্গে চিৎকার করছেন আপনি মিস্টার কামাল?”
“ঠিকাছে, বন্ধ করে দিন পেনশন ফান্ড।”
বাবার পেনশন স্থগিত করে দেওয়ার কাগজ তৈরি করেছিল ড. শাকুর। পেনশন কী তাই বা তখন কে জানে।
“কনফিডেন্সের জয় সবসময় হয় না কামাল সাহেব।”
“বন্ধ করে দিন। যতদূর আপনার ক্ষমতা, আপনি দেখান স্যার।”
“দেখতে চান আমার ক্ষমতা?”
“আপনি দেখাতে চাচ্ছেন। আমি আপনার অধঃস্তন। দেখা ছাড়া আমার আর উপায় নেই।”
“তাই?”
“জি, তাই।”
“কতদূর বাড়লেন আপনি কামাল সাহেব! ঠিক আছে। পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে।”
বাবা বেরিয়ে এলেন। অনীল কাকা বললেন, “কী, বন্ধ করে দিলো পেনশন?”
“তুই কত টাকা পাস যেন আমার কাছে অনীল?”
“নয় টাকা পাই। চাকরি ছাড়বি নাকি?”
“আব্বু?” আমি সংকুচিত হয়ে, কুঁকড়ে থেকে এতোক্ষণ কি এই ডাকের অপেক্ষা করিনি? পিছলে চেয়ার থেকে নেমে গেলাম। “চলো।” জানি না কোথায় যাব। কোনো কথা না বলে বাবার হাত ধরলাম।
ফাতেমা ফুপি ওই বাজে চেয়ারে বসে কিছু টাইপ করা কাগজে অকারণেই চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। আমি পাশ কেটে যাওয়ার সময় ছোট করে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। কিন্তু কাগজের কোণে লেখার, পেপারওয়েটের কোনো নকশার যোগ্যতা ছিল না তার চোখকে আশ্রয় দেয়। বাবা ও আমার সমস্ত অপমান ফুপি যেন অন্তর দিয়ে অনুভব করেছে। ড. শাকুরের কথা ভাবলে মনে হচ্ছিল এই অফিসে আর কোনোদিন না। কিন্তু ফুপির কথা ভাবলে মনটা নরম হয়ে আসছিল। এই মমতাময়ীর চেয়ারে যদি আবার বসতে পারি, ওই চোয়াড়ে লোকটার আরো অনেক চিৎকার আমি মন বুজে সহ্য করতে পারব। তবে আমার বাবার অপমান? যদি আবার এমন দিন আসে, আমি আমার বন্ধু কোনো বনের পশুকে ঠিক ডেকে আনব। নয়ত আমি নিজে হয়ে উঠব তেমন। আমার চোয়ালে, পেশিতে, রক্তে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছিল। আমি যে কত ছোট একটা দেহে আটকে প’ড়ে তখন, সে কথা আমার একবারও মনে পড়ল না।
৪.
বাইরে বের হলাম আমরা। পায়ের নিচে সবুজ গালিচা, হাঁটায় কোনো শব্দ নেই। আমি ওপরে তাকিয়ে বাবার মুখ দেখলাম। মেঘ করেছে। কিন্তু বৃষ্টি নামতে দেখিনি কখনো বাবার চোখে। দেখেছি সে আরো বহুপর।
যখন বড় হয়েছি, যখন একদিন রাগ করে চলে গেছি ঘর ছেড়ে। বাবা পিছু পিছু কিছুদূর এসেছিল আমার। তারপর হঠাৎ থেকে গেল। আমি একমাইল পেছন থেকেও যেন দেখেছি তার চোখের জল। সে অন্য গল্প।
মাদুরের ওপর হাঁটতে হাঁটতে আমরা লিফটের কাছে গেলাম। নিচে নামতে হবে।
তারপর চা খাওয়া হলো, হাঁটা হলো সচিবালয়ের ভেতরে এদিক ওদিক। চমৎকার সব বিদেশি গাছপালা, যাদের অনেকগুলোর নাম তখনো জানি না আমি। একটু পরপর বাবার পরিচিত মানুষজন কুশলাদি জিজ্ঞেস করছে। বাবা মলিন হাসছিলেন। যেখানে কথা না বললেই নয়, ছোট করে উত্তর করছিলেন। অবাক হচ্ছিল সবাই। যেখানে আমরা থাকি, সেখানে বাবার কাছ থেকে শীতল অভ্যর্থনা পেতে কাউকে দেখিনি কখনো। এখানেও নিশ্চয়ই বাবা একইরকম ছিলেন।
আমরা সচিবালয়ের ফটক পেরিয়ে গেলাম। কজন পুলিশ নীল শার্ট আর খাকি প্যান্ট পরে হেলে দুলে দাঁড়িয়ে আছে। দানবের মতো আকার প্রত্যেকের। বাপরে, এই নাহলে পুলিশ? পিঠে কালো কালো বন্দুক, দেখেই ভয় হয়।
ফটক ছেড়ে রাস্তা পার হয়ে আমরা একটা বটগাছের ছায়ায় বসলাম। নিচেই একটা চায়ের দোকান। তার টিনের বেড়ায় টকটকে লাল রঙ করা। চা-ওয়ালা তার কাচের কাপটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গরম পানিতে ভিজিয়ে নিলো। পানির এই যে পাতলা একটা পর্দা পড়ে কাচের ওপর- এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বুঝি কমই আছে।
গরম চায়ে চুমুক দিচ্ছে বাবা। চা আমি অফিসে খেয়েছি, তাই এখানে আর নিইনি। আমাকে বসিয়ে পাশের কনফেকশনারি থেকে একটা ঠাণ্ডা সেভেন-আপ নিয়ে এসেছিল বাবা। আমি তাতে সুড়ুৎ সুড়ুৎ টান দিতে থাকলাম। দোকানে লোকজন তেমন নেই। একজন ক্লান্ত রিকশাওয়ালা গামছায় মুখ মুছছে। ঘন ঘন সিগারেট ফুঁকছে আর থেকে থেকে সচিবালয় ভবনটার দিকে তাকাচ্ছে কালো সানগ্লাস পরা একটা লোক। গাড়ির শব্দ, রিকশার টুংটাং ছাড়া মানুষের কথা তেমন নেই।
আবার অফিসের উঠানে ঢুকলাম। এটার পর একটা বিরাট দালানের নিচের ছায়া ছায়া অন্ধকারে হাঁটলাম দুজন। হাঁটতে হাঁটতে অল্প ক্ষুধা পেয়ে গেল। মনে পড়ল ব্যাগের ভেতর টিফিনবক্সে আমার হলুদ হলুদ ফোলা ফোলা নুডলসগুলোর কথা। হঠাৎ বাবা বলল, “লাইব্রেরি দেখবে? একটা সুন্দর লাইব্রেরি আছে।”
“লাইব্রেরি!”
আমার দু চোখে লোভ লকলক করে উঠল। পরমুহূর্তে ড. শাকুরের কথা মনে এসে মন তেতো হয়ে গেল আবার। লোকটাও বলছিল লাইব্রেরির কথা।
কোন ভবনে পেয়েছিলাম লাইব্রেরিটাকে আজ আর মনে নেই। সিরামিকের ইটের অদ্ভুত ফুলের নকশাকাটা ছিল দেয়ালে।
ছোটদের কর্ণার আছে। সেখানে বড় এক টিয়াপাখির ছবিওয়ালা একটা বই তুলে নিলাম। ছবিটায়, দূরে অনেক গাছে আগুন জ¦লছে। বোধয় টিয়াপাখির ঘরবাড়ি পুড়ে যাচ্ছে।
তাকিয়ে দেখি বাবা পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছে। যদিও তার মন কোনো কাগজে বা কোনো খবরে নেই। একসময় ভাঁজ করে উঠে দাঁড়াল বাবা। “তুমি থাকবে আব্বু?”
বাবার ভেতরটা অস্থির। তার হয়ত মন চলে গেছে কাজে। আমার এখানে একা থাকার প্রশ্নই আসে না।
“থাকবে তুমি?”
“না।”
“তাহলে চলো, আরেকদিন আসব?”
“ঠিকাছে।”
“অনেকটা সময় বাইরে কাটাচ্ছি। তাছাড়া তোমার ক্ষুধাও পেয়েছে।”
একেই তো বাবা। পায়ে পায়ে এগোতে থাকলাম আবার। সেই বিকট বিরাট দালান, বিরাট লিফট। লিফটে চড়ে আগেরবার উঠতে গিয়ে মাথা বোঁ করে উঠেছিল। এবার বোঁ-এর পরিমাণ হলো আরেকটু কম। লিফটের ভেতর তলার সংখ্যাগুলোর পাশে টুল নিয়ে বসে আছে একটা শুকনো ছেলে। মাথা কালো ক্যাপ। আমার দিতে তাকিয়ে চোখ টিপল। মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
ভয়ে ভয়ে ঢুকলাম ঘরটায়। বাবার অফিসরুম। ড. শাকুরের ঘরটা বন্ধ। অনীল কাকু ফাতেমা ফুপি দুজনেই মুখ তুলে তাকাল। বাবা বন্ধ দরজার দিকে আঙুল তুলে বলল, “আছে?”
“না। বাইরে। তোমাকে কাজ দিয়ে গেছে,” বলল অনীল কাকু।
“কী কাজ?”
“আবার গোটা ফাইল শুরু থেকে করবে। এবং আজকের ভেতরই।”
“অসম্ভব চিন্তা।”
“হুম। কিন্তু কে বলবে তাকে সেই কথা। ওটুক বলে, গট গট গট।” অনীল কাকু আঙুল দিয়ে দেখাল কিভাবে শাকুর রশিদ বের হয়ে গেল।
বাবা নিজের চেয়ারে বসল। ফাতেমা ফুপি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “হামিম তুমি আমার চেয়ারে বোসো।”
আমি যাওয়ার পর ফাতেমা ফুপি নিজ চেয়ার ফিরে পেয়েছিল।
আমি বললাম, “ফুপি আমি এই চেয়ারেই বসব।” নাইলন-খোলা চেয়ারটা দেখালাম।
ফুপি ঝুঁকে এসে বলল, “সেটা ফুপি কখনই হতে দেবো না। ওকে?”
তারপর আলমারিটা খুলতে গেল । কবাটে বুঝি দুটো হাতি ঢুকে গেছে। পুরো খুলতে যেতে সেকি ঐরাবত চিৎকার! এরপর একের পর একে ফাইল বের করতে থাকল ফুপি। সবকটা মেটে খয়েরি রঙের ফাইল। তাদের ভেতর থেকে অক্টোপাসের পায়ের মতো বেরিয়ে এসেছে লম্বা লম্বা সাদা সুতা। সুতার মাথায় রুপার প্রলেপ পরানো। গুনলাম। একে একে চৌদ্দটা ফাইল বেরিয়ে এলো।
ফাইলের স্তম্ভটা কসরৎ করে তুলে বাবার টেবিলের একপাশে নামিয়ে রাখল ফুপি। বাবা একমনে পড়ছে সেই হলুদ ফাইলটার বিশেষ একটা পাতা।
আমি ক্ষুধা ভুলে গেছিলাম। বাবাকে যেন এদিকে আর মন দিতে না হয়, এই ভেবে ঠিক করলাম, নিজের মতো খেয়ে নেবো। কিন্তু ঘরে আরো দুজনকে রেখে আমি একা কী করে খাব? ফিসফিস করে বললাম ফুপিকে, “নুডলস খাবে?”
ফুপি জোরে হেসে উঠল।
“তোমার নুডলসে ভাগ বসাব না।”
আমার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকল। এতো জোরে বলার দরকার ছিল?
আমি বাকি টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললাম, “অনীল কাকু?”
অনীল কাকু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন। “উঁহু উঁহু!”
মনে মনে আমিও এমনই চাইছিলাম। নুডলস ভাগ করতে আমার খুব কষ্ট হয়।
কাঁটাচামচ কেটে যতটা পারা যায় নিঃশব্দে খেতে শুরু করলাম। তবে নুডলস কথা বলে তার ঘ্রাণে। মা শেষমুহূর্তে টেলে গুঁড়া করা গোলমরিচ দেয় নুডলসে। আমাকে লজ্জায় ফেলে দিয়ে সারা ঘর ঘ্রাণে ম ম করতে থাকল।
খাচ্ছি আর চোরা চোখে বাবার দিকে তাকাচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম বাবা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। চোখে চোখ পড়তেই ভুরু নাচাল। তারপর ডানহাতের কাছে হাতে বেল বাজাল, এলো রুবিনা।
এই মহিলার বয়স পঞ্চাশের মতো। বলেছিল বাবা। তাকে আটষট্টি বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিতে বহাল রাখতেই হবে। কী সাংঘাতিক। তার বাম গালে প্রায় আমলকির সমান একটা তিল। চোখ দুটো দেখে মনে হলো তীব্র আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। পিটপিট করে ঘরের সবাইকে দেখছে।
বাবা বলল, “কেউ কিছু খাবে?” সবাই না-সূচক।
“তাহলে রুবিনা আপা! শুধু আমার জন্যে বিরাট মগে আপনার স্পেশাল তেজপাতা চা। যেন চায়ের ঘ্রাণে সব পাগল হয়ে যায়, কেমন?”
রুবিনার হাসিটাও অদ্ভুত। যেন ঠোঁটের ফাঁকে অদৃশ্য কিছু কামড়ে ধরে আছে। এমন হাসি দেখে আমার বুঝতে বাকি থাকল না, ওর বাসায় আটকা পড়া জুঁই কী অবস্থায় দিন কাটিয়েছে। আমার প্রেমিক মন মুহূর্তে আর্ত হয়ে উঠল। চোখে ভেসে উঠল, লাল ফ্রক পরা, কোমরে সাদা বেল্ট প্রজাপতির নকশায় বাঁধা জুঁই মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলছে। কারণ একটু একটু স্মৃতি ফিরে আসছে ওর। এই মহিলা যেন কিছু কামড়ে ধরে আছে- এইভাবে হেসে হেসে দরজার কবাট বন্ধ করে ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
রুবিনা সত্যিই আড়াল হয়ে গেল অফিসরুমের দরজায়। এবং মিনিট পাঁচের ভেতর ফিরে এলো। বাবার আঙুল ফোটানো গেল থেমে। আবার সেই রুপালি ট্রে। পিরিচটা সরাতেই, আমার নুডলসের ঘ্রাণ ছাপিয়ে যে চায়ের ঘ্রাণ নাকে আসতে পারল, তা নিশ্চয়ই যা-তা চা নয়।
অনীল কাকু বলল, “একটা অফিস চলে তো চায়ের ওপর। এমন ঘ্রাণ না হলে চলে? রুবিনা। যদি কষ্ট না হয়...”
বাবা একবুক শ্বাস নিয়ে নিঃশ্বাসটা ধীরে ধীরে পুরো বের করে দিয়ে চায়ে চুমুক দিলো, এবং প্রথম খয়েরি ফাইলটা হাতে নিয়ে অক্টোপাসের শুঁড় খুলে ফেলল।
সেই ছিল শুরু।
এরপর ফাইলের ঠেলাগাড়ি নিয়ে বহুবার করিডোরে আগপিছ করল সেই বৃদ্ধা, নিজ সমস্ত কাজ সেরে ক্রাচ হাতে কিছুক্ষণ বাইরে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে এলো অনীল কাকু, ফাতেমা ফুপি কিছু ফাইল নিয়ে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ফিরেও এলো। বাবা তখনো একমনে কাজ করে যাচ্ছে।
দেখতে দেখতে দুপুরের খাওয়ার সময় এলো। আমার নুডলসে উঁচু হয়ে থাকা পেট ধীরে ধীরে সমান হয়ে এসে আবার খিদে পেতে শুরু করেছে, কী বিপদ। দেখলাম থেকে থেকে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে ফাতেমা ফুপিও।
“হামিম? চলো আব্বু, আজ আমার সাথে খাবে।”
বললাম, “বাবার জন্যে আরেকটু অপেক্ষা করি?”
ফুপি আমার কাছে এসে বললেন, “তুমি এতো লক্ষ্মী কেন? কোনো ছেলেকে আমি এতো লক্ষ্মী দেখিনি। খোদা, তোমার মতো একটা ছেলে যেন আমার হয়!”
ফাতেমা ফুপি কিছু একটা ভাবল। “চলো, আমরা তোমার বাবার জন্যেও খাবার নিয়ে আসব।”
এ প্রস্তাব পছন্দ হলো। “আচ্ছা।”
ফুপি রুবিনাকে ডেকে বলল, “আমার মিলটা তুমি নিও। বা যদি মনে করো নেবে না, তো আর কাউকে দিও। আমি বাইরে খাচ্ছি।”
রুবিনা মনে হয় খুশি হলো। আমার দিকে সেই অদৃশ্য পাউরুটি কামড়ানো হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকল, একদৃষ্টে। খোদা না করুক, আমাকে কি তার পছন্দ হয়ে গেছে?
“ফুপি!”
“রুবিনা কেমন মহিলা?”
“ভালো তো।”
“খাবারে যে ওষুধ মিশিয়ে দেয়?”
“কই, ব্যাপারে তো কিছু জানি না! তুমি কার কাছে শুনেছ!”
অবাক হলাম। জুঁইয়ের মতো একটা ফুটফুটে মেয়ের সঙ্গে এমন হলো, আর ফুপি জানেই না!
ফুপিও রুবিনার সাথে হাত মিলিয়েছে ভাবতে আমার বাধল। তবু যেন দেখতে পেলাম, ফুপি একটা বদ্ধ ঘরে জুঁইকে খাইয়ের দিচ্ছে। “সোমামণি, একটু খেয়ে নাও! এই তো, ল-ক্ষ্মী।” জুঁই সোনামুখ করে খেয়ে নিচ্ছে তার হাতে। ঘি দিয়ে ভাজা বেগুন আর সাদা ভাত। ঘিয়ে ভাজা বেগুন জুঁইয়ের খুব প্রিয়।
আমার কিশোর পাশা-মন বলল, কেউ সন্দেহের বাইরে নয়। নিচের ঠোঁট কামড়াতে শুরু করলাম।
আমরা নিজেরা ঘেমে ঘেমে কাচ্চি খেলাম। কাচ্চির পর ভরপেট পেপসি। কী শোরগোল ক্যান্টিনে! তাকিয়ে তাই দেখতে দেখতে মিষ্টিপান মুখে দিলাম। তারপর হেলেদুলে ফিরলাম অফিসে।
বাবার জন্যে আনা প্যাকেটটা টেবিলে রেখে ফুপি বলল, “স্যার, খেয়ে নিন।”
দুপুরের খাওয়া সেরে ওপরে উঠে এসেছে অনীল কাকা। বলল, “এই পাগলা, খেয়ে নে।”
বাবা কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “কী এনেছ ফাতেমা? ঘ্রাণেই তো অর্ধভোজন হয়ে গেছে।”
“কাচ্চি, স্যার।”
“বেশ, আপাতত একটু সরিয়ে রাখতে পারো? আমি কাজে মন দিতে পারছি না।”
“খেয়ে নে রে পাগলা খেয়ে নে।”
“রাগ করে পেটে ক্ষুধা নিয়ে কাজ করতে থাকলে কিন্তু ভুল হবে স্যার।”
বাবা কলম থামিয়ে ফাতেমা ফুপির দিকে তাকাল।
“ফাতেমা, তোমার কি মনে হয়? কাজটা আমি করেছি?”
ফুপি বলল, “কপালে পিস্তল ঠেকিয়েও কেউ আপনাকে এ কাজ করাতে পারবে না।”
বাবা এক ঢোক পানি খেয়ে কাচ্চির অর্ধেকটা দ্রুত সাবাড় করে দিয়ে বলল, “এ অনীল! বাকিটা খা।”
“ওদের সাধছিস না কেন?”
“আমার ছেলে নিশ্চয়ই খুব ভালো খেয়ে এসেছে। ঠোঁটের কোণে পানের মধুও লেগে আছে। আর ফাতেমাকে সাধলেও খাবে না। তাই তোকে বলছি।”
অনীল কাকু এমন ছোঁচাবেড়ালের মতো জিভ কেটে হাত বাড়িয়ে নেবে, আমি চিন্তাই করিনি। বলল, “এই জিনিস আসলে একা খেয়ে আনন্দ নেই। কী আর করা, কপালের লিখন। ধন্যবাদ মিস ফাতেমা!”
আমি টিস্যু পেপারে ঠোঁটের কোণ মুছে আবার অরণ্য যখন ডাকে খুলে বসেছি। বাক্ প্রাণপণে স্লেজগাড়ি টানছে। চলছে নিবিড় তুষারপাত। ছোটবড় খাদে পড়ে যাচ্ছে একেকবার স্লেজটা। ওদের টেনে তুলতে হচ্ছে। কী কষ্ট!
বইয়ের পাতায় অন্ধকার পর্দার সামনে শুভ্র তুষারপাতে স্লেজ গাড়ি টানছি আমিও। আমার সারা গায়ের গিঁটে গিঁটে অসহ্য ব্যথা। আমার মাথার ওপর মগজটা জমাট বেঁধে গেছে। কান দুটো ঠাণ্ডায় এমন চুলকাচ্ছে যে এখনই ফেটে বেরিয়ে আসবে রক্ত। আঙুলের ডগা ঠাণ্ডায় পাথর হয়ে আছে। সেই পাথর দিয়ে আমি কাঁটাওয়ালা ছেনির মতো বরফের মাটি আঁচড়াচ্ছি। জিরিজিরি জিরিজিরি পড়ছে তুষার।
তুষারের গন্ধ যে এমন জমাট ধুলোট আমার জানা ছিল না। বহুদূরে কারা কথা বলছে। স্পিটজ? আমার যেন একটু ঘুমিয়ে ওঠা দরকার। কেউ বলল, “বাকের বাকল খুলে দাও! ও একটু ঘুমোবে।” একটা হাস্কি কুকুর বরফের গর্তে আমাকে জায়গা করে দিলো। “এসো বন্ধু! তোমাকে আমার ভালো লেগেছে।” আমি ওর পাশে হাত আড়াআড়ি করে তাতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম।
হঠাৎ পিঠে চাবুক বসাল কেউ। অবশ্য কোনো ব্যথা পেলাম না। যদিও ব্যথা পাব পাব- এমন একটা ভাব হলো খুব। যেন আমার শরীরে গভীর করে চিড়ে গেছে। আমি সেই চিড়ের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছি কখন ব্যথা পাব। অপেক্ষাই সার। পেছনে লোকটা বলল, “চল, চল! পাজি কোথাকার! পেট ভরে খাবে, আর পড়ে পড়ে ঘুমাবে। আজ তোকে মহাসাগর পার করিয়ে ছাড়ব। এর নাম আর্কটিক মহাসাগর!”
আমি বহুকষ্টে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম লোকটা এই তুষারপাতের ভেতর শুধু একটা সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট পরনে। যেন একটা ক্লাস সেভেনের ছাত্র হঠাৎ ফুলে বুড়ো হয়ে গেছে। ওর থুতনির নিচে একটা চর্বির মালা। লোকটা আবার চাবুক ওঠাল। ঠিক সেইমুহূর্তে আমার হুড়মুড় করে পায়ের নিচে ভেঙে পড়ল মাটি! একটা অশেষ খাদের ভেতর সবাই সরসর করে নেমে যেতে, ফাতেমা ফুপির টেবিলের ওপর আমি ধড়মড় করে জেগে উঠলাম।
তাকিয়ে দেখি বিকাল চারটা বেজে গেছে। কী সাংঘাতিক, বাবা তখনো একমনে লিখছে। বাম পাশ থেকে অক্টোপাস ফাইলগুলো চলে যাচ্ছে ডানে।
চৌদ্দটা ফাইল গুনেছিলাম মনে আছে। মনে হলো বাবা অর্ধেক শেষ করেছেন। আরো অর্ধেক বাকি।
ঠিক এই সময় ড. শাকুর রশিদ এসে ঢুকল। লোকটা এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। এয়ারকন্ডিশনার ছেড়ে দিলো, আমরা শব্দ পেলাম। আমি উঠে দাঁড়ালাম। “ফুপি, আমি কি একটু বাইরে যেতে পারি?”
“কেন বাবা! বাথরুমে যাবে?”
কেন এই চিন্তা তার মাথায় এলো? আমি তো শুধুই হাঁটতে চেয়েছিলাম। এখন তো আমাকে বাথরুমেও যেতে হবে। বাথরুমের কথা শুনলে আমার যেতেই হয়। প্রথমে দুদিকে মাথা নাড়লাম আগের পরিকল্পনাবশত, পরমুহূর্তে ওপরনিচ মাথা নাড়তে বাধ্য হলাম। ফুপি হাসতে হাসতে শেষ।
“চলো! আজ তুমি না এলে কী যে হতো!”
করিডোরের একেবারে শেষপ্রান্তে ওয়াশরুম। সারি সারি ঘর, অনেক উঁচুতে উঁচুতে ছাদ। একটার দরজা ঠেলে দেখি ছাদের কাছাকাছি ফ্ল্যাশের কালো বক্স। জিনিসটা বোধয় লোহার তৈরি। মাথার ওপর পড়তে পারলে, শেষ। ফুপি বলল, “একটাতে ঢুকে পড়ো। দেখো কোনটা ভালো লাগে।”
দুই মিনিট পর বের হয়ে এলাম।
“একটু হাঁটব আমি ফুপি।”
“তাই! আহারে, আমার তো কাজ পড়ে আছে বাবা!”
“একাই হাঁটব।”
“যদি হারিয়ে যাও?”
“হারাব না। এই একটু এদিক ওদিক হাঁটব। আর জানালার পাশে একটু দাঁড়াব।”
বললাম আরকি। আমার যে উচ্চতা তাতে জানালার পাশে দাঁড়ালেই যে বাইরের ঢাকা দেখতে পাব না তা নয়। কোনোক্রমে উঁকি পারব হয়ত।
যে দুয়েকবার জানালা দিয়ে বাহিরটা দেখেছি, মনে হয়েছে এরচেয়ে সুন্দর শহরের দৃশ্য আর হয় না। রোদের ভেতর পুরো শহরটা গান করছে। রিমঝিম রিমঝিম! শুধু বৃষ্টির ভেতরই রিমঝিম শব্দ নাই, রোদের ভেতরও আছে। কথাটা মনে পড়ায় আমি চমকে উঠলাম। এই কথাটা লিখে রাখতে হবে। অবশ্য তবুও কেউ বিশ্বাস করবে না কথাটা আমার। আমি আড়াই বছর বয়সে যখন কথা বলতে শিখেছি একাধটু, বলেছিলাম, “আমার আকাশের মতো খেলা থাকবে।” বাবা সেটা লিখে রেখেছিলেন, তাতেও লাভ হয় নাই। যে-ই দেখে, হাসে। “আড়াই বছরের একটা বাচ্চা এটা বলতে পারে নাকি!” মা বোঝাতে চেষ্টা করে, “ও সত্যিই এটা বলেছিল!” “তাই বুঝি, হা হা হা!” মা মরিয়া হয়ে ওঠে। “ও একটু অন্যরকম! তোমরা ওর সাথে কথা বলেও বোঝো না?” বাবা বলে, “আরে বাদ দাও নদী! লাভ নেই।”
আমার মুখের সামনে একটা ছোট তালি বাজাল ফাতেমা ফুপি।
“গেছে, হারিয়ে গেছে। হা হা হা!”
ধ্যান ভাঙল।
ফুপি বলল, “কোথাও হারাব না বলার দেরি। তোমাকে রেখে যেতে তো আমার চিন্তাই হচ্ছে!”
আমার সামনে ফুপি হাঁটু ভেঙে বসল।
“দুষ্টুমি করলাম। আমি জানি আমার বাবাটাকে নিয়ে চিন্তার কো-নো কারণ নেই। ওই তো দেখা যাচ্ছে আমাদেরটা রুমটা। তাই না? কাছে কাছে থেকো।”
সকালের ঘ্রাণটা অনেকখানি চলে গেলেও, মায়া মায়া একটা রেশ এখনো রয়ে গেছে তাঁর শাড়িতে। গলায় মালার মতো ঝুলতে থাকা হলুদ পরিচয়পত্রটা খুলে আমার গলায় পরিয়ে ফুপি বলল, “এটাও সাথে রাখো। কেমন?”
আমি হাতে তুলে দেখলাম জিনিসটা। চুল ছেড়ে দেওয়া আরো খানিক কমবয়েসি একটা মেয়ের ছবি। একটু নজর করলেই কে তা চেনা যায়। ফুপি বলল, “ঠিকাছে। এবার তাহলে আমি যাই?”
আমি ফাঁকা করিডোরে জানালার পাশে দাঁড়ালাম। মোজাইকের মেঝে। রোদে উজ্জ্বল হয়ে আছে গাছের টবগুলো। আমি একটা পাতাবাহারের পাতায় হাত রাখলাম। পাতার ছোট ছোট ফোঁটাগুলো কী অদ্ভুত! আকাশের নক্ষত্রের মতো লাগে।
আমি জানালা থেকে জানালার পাশে দাঁড়াতে থাকলাম, কী সুন্দর বাতাস! একটু একটু ঘামছিলাম। বাতাসে কপাল ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সাদা মেঘ আকাশে। মেঘের ভাঁজগুলো এমন, যেন এখনই একটার আড়াল থেকে কেউ হাসতে হাসতে উঁকি দেবে। খুব সুন্দর কেউ।
পাঁচটা বেজে গেছে। আমি ফাতেমা ফুপির চেয়ারে বসে আছি। বাবা একমনে কাজ করছে। বাবা এতো কাজ করতে পারে আমার জানা ছিল না। ফাতেমা ফুপি ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে থেকে থেকে। বোধয় অফিস ছুটির সময় হলো।
৫.
মা আমাকে বলেছিল, সবচেয়ে খারাপ মানুষটারও একটা কোনো ভালো দিক থাকে, আর সেটার জন্যে সে প্রশংসা পেতে পারে। এই ড. শাকুর লোকটার কোন ভালো দিক থাকতে পারে ভেবে কুল না পেয়ে আমি খাঁটি খোক্ষসে মন দিলাম।
লেখকের নামটা ছিল না মলাটের ওপর। স্কুলে আমি অনেককে জিজ্ঞেস করেছি পরে, এটা কার লেখা। কেউ বলতে পারে না। নামও শোনেনি কেউ কেউ। গল্পটা কী যে ভালো লেগেছিল আমার!
সে দেশে খোক্ষসের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল সিরা নামে এক রাক্ষস। তার জিভ থেকে সারাক্ষণ লালা ঝরত। সেই লালা ভীষণ মিষ্টি! অবিকল যেন চিনির সিরা। সিরা খেতে লাখ লাখ পিঁপড়া এসে ভিড় করত, আর ওদের আটক করেই সিরা-রাক্ষস তার সেনাবাহিনী সাজাত। পিঁপড়েরা খুব ভালো সেনা। শক্তিশালী, অল্প খাবারে অনেকদিন বাঁচে, আর সুশৃঙ্খল। দরকার শুধু তাদের মন ভোলানো। ওটা আপনাতেই হয়। পিঁপড়ারা যখন সিরা পান করে, ওদের আর সংসারজ্ঞান থাকে না। ওরা সিরা-রাক্ষসের দাস হয়ে যায়। তার নির্দেশে ওরা যে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় ।
সিরার উঠানে শুকাতে দেওয়া হরিতকি বীজের গুঁড়া খোক্ষসদের বার্ধক্য রোগের মহাওষুধ। কেন সেই গুঁড়ো এমন মহৌষধ?
রাক্ষসের নিশ্বাসে একটা আশঁটে বাষ্প থাকে। সেই বাষ্প হরিতকির শুকনো বীজের কোষের গভীরে গিয়ে জমে। বার্ধক্যরোগে আক্রান্ত কোনো খোক্ষস এই গুঁড়া পানির সাথে মিশিয়ে পান করলে, তার শরীরে রাক্ষসের জীবনীশক্তি খানিক ভর করে। ফলে আয়ু বেড়ে যায়। বৃদ্ধ বাবামায়ের আয়ু বাড়াতে তাই প্রচুর খোক্ষস এই হরিতকির লোভে আসত। তাদের লোভ জিইয়ে রাখতে সিরা রাক্ষস কখনো তার উঠানে হরিতকি শুকানো বন্ধ করত না। জীবনের প্রলোভন দিয়ে ডেকে এনে, সিরা-রাক্ষস তাদের জীবন কেড়ে নিয়ে, নিজের আয়ু বাড়াত।
এতো যে খারাপ, তারও একটা ভালো গুণ ছিল। কোনো মুমূর্ষু রাক্ষস যদি কখনো এসে অসুস্থ কারো জন্যে তার আয়ূ ভিক্ষা চাইত বলত, সিরা-রাক্ষক তখনই তার ধমনি কেটে এক হাড়ি রক্ত ঝরিয়ে, সেই রাক্ষসটিকে দান করত। কাটা শিরার ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যেত। কাটা ধমনির ক্ষত ছিল ভয়ানক। আয়ু দিতে গিয়ে চারবার সিরা-রাক্ষস নিজেই মরতে বসেছিল। তবু সে কাউকে ফেরাত না।
শাকুর লোকটার ধারণা, বাবা তার কোনো একটা কথাকে নিজের মতো বদলে দিয়েছে, এবং এর জন্যে বস্ত্র, শিল্প- আলাদা আলাদা দুটি ক্ষেত্রে, বেসরকারি খাতের কাছে সরকারি খাত খুব বেকায়দায় পড়তে যাচ্ছে। বাবা বলেছে এটা করেনি, তবু ড. শাকুর তা বিশ্বাস করেনি, চূড়ান্ত অপমান করেছে। পেনশন স্থগিত করেছে। তার বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল কারণ, তার ঘরে, ফাইলের তাকে, একমাত্র কারো যদি দায়িত্ববলে প্রবেশাধিকার থাকে, তবে তা বাবার। একটা পেনশন মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক ভরসার জায়গা। শুধু অপরাধ স্বীকারে বাবাকে বাধ্য করতে কোণঠাসা করার ইচ্ছা থেকেই না, যেহেতু তার চোখে বাবা অসৎ, সুতরাং সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না- এটাই ছিল ড. শাকুরের হিসেব। সেদিন আমার সামনে বাবাকে ওভাবে অপমানের দিকটা ড. শাকুরের চরিত্রের অন্ধকার দিক। তাৎক্ষণিক তেতে ওঠা, দুর্ব্যবহার, ক্ষমতা চর্চা- এসব তার বরাবর। তবে কখনোই সেসব, অন্য অনেক সচীবের মতো, নিজের ভান্ডার সাজিয়ে তোলার অস্ত্র হয়ে ওঠেনি। আচরণের অন্ধকার দিকটুকু বাদে ড. শাকুরের ছাব্বিশ বছরের দীর্ঘ সাচিবিক ইতিহাস স্বচ্ছ ও পুণ্যময়।
সেই রবিবার তা ছিল আমার পুরোপুরি আড়ালে।
যদিও দিনের একেবারে শেষভাগে, অন্ধকারের ফাঁক গলে নক্ষত্র উঁকি দিয়েছিল।
সে গল্পে পরে আসছি।
বাবা মুখ গুঁজে কাজ করছে। আমি করুণ চোখে তাকিয়ে আছি। ফাতেমা ফুপি ধীরে ব্যাগ গোছাতে থাকল। ঘড়ি দেখছে একটু পরপর। বাবা বলল, “তোমার আর কাজ নেই ফাতেমা! শেষ বাসও ছেড়ে দেবে। তুমি এসো।”
“আমার খুবই খারাপ লাগছে স্যার।”
“আমি আনন্দ নিয়ে করছি ফাতেমা। আমার রাশিটা এমন। ক্লাস টেনের প্রি টেস্ট পরীক্ষায়, আমাদের স্কুলের কালীবাবু স্যার ভাবলেন, আমি নকল করছি। নকলটা করেছিল শিবু। ওর মুঠো করা কাগজগুলো ঠেলে দিয়েছিল আমার পায়ের নিচে। কালীবাবু স্যার আমাকে মারতে মারতে, একসময় নিজেই জ্ঞান হারালেন। আমাকে এতো ভালোবাসতেন। তুমি যাও।”
ড. শাকুর চলে যাওয়ার জন্যে আমি প্রাণপণে প্রার্থনা করছিলাম। অনীল কাকার মতো ডক্টরও রাত ন’টা পর্যন্ত নিজ টেবিলে আড়ালে বসে অস্থির পা দুলিয়ে গেল।
আর আমি দেখলাম সরকারি অফিসের হলুদ রাত।
সবুজ কার্পেট আর সাদা দেয়ালের ওপর একটা অতীতের হলুদ, রাতের ঘন পর্দার ওপর ঝরে ঝরে পড়েছিল। ফাতেমা ফুপি আইডি কার্ড নিতে ভুলে গেছে। আমি সেটা গলায় করে অফিসের করিডোরে করিডোরে হাঁটলাম। জানালার বাইরে তাকালাম। অবাক করা শহরের রাত। ঝলমলে আলো আর ভাঁজ ভাঁজ মেঘ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম দুপুরে। রাতে মুগ্ধ হলাম আকাশের মতো তারাখচিত আরেকটা আকাশকে মাটিতে দেখে, সেটা আমার শহর। রাতে অফিসে হেঁটে হেঁটে ঘরগুলো যখন দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল, দিনের বেলায় দেখা কঠিন নিঠুর অফিসটাকে রাতের বেলায় কেমন নিরহংকার, আপন-আপন লাগছে।
একা একা আরো একবার বাথরুমে গেলাম। ফ্ল্যাশের শেকল টানার পর মনে হয় মাথার ওপর আস্ত দালান ভেঙে পড়বে। একটানা অনেকক্ষণ ঘড়র ঘড়র শব্দ হতে থাকল। এ শব্দ শুধু যে ভয় জাগায় তাই না। গোটা শূন্য অফিসে খবর করে দেয়, কে এক খোকাবাবু বাথরুম সেরে এখন বের হচ্ছে। ভাগ্যভালো মানুষজন নেই। তবে ভূতেরা জানতে পারছে।
করিডোরে কয়েকবারই দেখা হয়েছে এক শুকনোমতো লোকের সঙ্গে। দেখা হলেই, “বাবু ভিতরে যাও, ভিতরে যাও!” আর্দালি এ ভদ্রলাক রুবিনার বদলি।
যখন রাত ১০টা ২০, বাবা কলম বন্ধ করে হাসিমুখে অনীল কাকার দিকে তাকাল।
“আজ তোর তোতাপাখিটা অনীল অফিশো-অফিশো বলতে বলতে পাগল হয়ে গেছে। নারে?”
ড. শাকুরের ঘরে বেশ কয়েকবার করে ফোন বেজে উঠেছিল। ড. শাকুর তো এমনিতেই গলা এমন উঁচিয়ে কথা বলে যে বন্ধ দরজার এপার থেকে এয়ারকণ্ডিশনারের শব্দ ছাপিয়ে শোনা যায়। সেই ডক্টর, কণ্ঠ এমন নামিয়ে কথা বলছিল, যে আদৌ বলছিল কিনা আমি দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিলাম।
দ্বন্দ্বের নিরসন হয়েছিল বাসায় পৌঁছে। অনীল কাকাদের বাসা থেকে কাকিমা আর আমাদের বাসা থেকে মা ফোন করছিল। কাকিমা ফোন করেছে একবার। মা ফোন করেছে তিনবার।
রাত এগারটায় আমরা চারজন লিফট থেকে বেরিয়ে এলাম। ড. শাকুর, বাবা, অনীল কাকু আর আর্দালি, কালাম। এর ভেতর রাতে বাসি ভাজাপোড়া খেয়ে আমার পেট জ¦লছে। জ¦লুনিটা হামাগুড়ি নিয়ে গলার কাছে উঠে আসছে। কখন বাসায় যাব আর নরম নরম ডালভাত খাব, একটা কড়কড়ে ডিমভাজা দিয়ে, সেই অপেক্ষায় আছি। গ্যারেজ থেকে একটা বিরাট নীল পাজেরো বেরিয়ে এসে আমাদের সামনে গমগম করতে করতে থামল।
ড. শাকুর বলল, “সবাই উঠুন।”
বাবা বলল, “দরকার নেই স্যার, আমরা বাসে চলে যাব।”
“খামোশ!”
সবাই উঠলাম। ভেতরে এসি ছাড়া হলো। মনে হলো আমার আত্মা বুঝি শীতল হয়ে গেছে। বুকে পিঠে আরাম, উরুতে, মাথার চাঁদিতে আরাম! বুকের খাঁচার ভেতর যেন একটা ঠাণ্ডা শাপলা ফুটেছে। এসি চললে এমন লাগে, আগে বুঝিনি।
প্রথমে এজিবি কলোনিতে কালাম চাচ্চুকে নামিয়ে, গাড়ি গেল শান্তিনগর। সেখানে অনীল কাকু নামল। এরপর গাড়ি ইস্কাটনে একটা বিরাট সাদা দালানের সামনে থামল। স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে দেখলাম, দালানের সামনে কালো ফটকজুড়ে আনন্দে থৈ থৈ করছে মাধবীলতা। ড. শাকুর ড্রাইভারকে বলল, “জাকির, মিরপুরের রাস্তা খারাপ। গাড়িতে বাচ্চা আছে। সেভাবে চালিয়ো।”
“আপনি চিন্তা করবেন না স্যার।”
ড. শাকুর আমার দিকে ঘুরে বললেন, “আজ তোমার প্রথম দিন ছিল অফিসে। আমি ক্ষমা চাচ্ছি বাবা। অভিজ্ঞতাটা ভালো হলো না।”
গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে একটা বই বের করল ড. শাকুর। বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। আমি একবার বাবার দিকে তাকালাম। বাবার সায় নিয়ে হাত বাড়িয়ে নিলাম বইটা। ড. শাকুর গাড়ির ভেতরের বাতি জ¦ালাল।
বইটা দেখে আমার বুক ভরে গেল। উজ্জ্বল বাদামি মলাটের ওপর হলুদ চুলের একটা ছেলে, গোল একটা কিছুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশে ছোট বড় তারা। বড় করে ইংরেজিতে লেখা “দ্য লিটল প্রিন্স”। লেখক, নামটা তখন একটু জটিল।
“অ্যানটো...”
ড. শাকুর বলল, “আঁতোয়ান দ্য সান্ত এক্সুপেরি।”
আমি হা করে তাকিয়ে।
“ফ্রান্সের লেখক।”
আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। বইটা কি আমার জন্য?
ডক্টর বলল, “আমার খুব প্রিয় বই। আমি একটু বড়বেলায় পড়েছিলাম। ভাগনের জন্যে কিনেছিলাম এটা। কিন্তু বের করতেই ভুলে যাই। আমার মনে হয়Ñ”
পেছনে একটা হর্ন বাজাল। জাকির বলল, “দাঁড়ানোর সুযোগ নাই স্যার।”
“-আমার মনে হয় এটা তোমার কাছে যাবে বলেই আমার ভাগনেকে দিতে পারিনি। ওর জন্য আমি আরেকটা কিনে নেবো। এটা তোমাকে উপহার।”
“ধন্যবাদ!”
“আমার ধারণা, এটা তোমার খুব ভালো লাগবে। কী বলো কামাল?”
বাবা বলল, “আমারও তাই মনে হয়, স্যার।”
“তোমার ছেলের মতো বইপড়া শিশু আমি অনেকদিন দেখিনি। অভিধান রীতিমতো! আমি নিজেও তো হাতে নিতে ভয় করি। বিদ্বান ছেলে তোমার।”
“দরকার ছিল না স্যার।”
“কামাল। পরে বাইরে গেলাম যে, কিছু কথা কানে এসেছে। কাল আলাপ করব।” আমার দিকে ফিরে বলল, “আজ তোমার আব্বুকে অনেক বকেছি। তুমি নিশ্চয়ই আমার ওপর রাগ? আমি তোমার আব্বুর কাছে স্যরি।”
“স্যার এসব কী বলছেন!” বাবা হেসে ফেলল।
ড. শাকুর বাবার কথা যেন শুনতেই পেল না।
“আমি তোমার কাছেও স্যরি। আমাকে ক্ষমা করে দিও, হামিম।”
একজন বড়ো মানুষ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আকুতি নিয়ে আমার দিকে আছে। আমার নামও যে কোনো এক ফাঁকে শুনে মনে রেখে দিয়েছে। পেছনে আরো জোরে হর্নের শব্দ হলো। জাকির আরো খানিকটা সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে বলল, “স্যার! ছোট করেন!”
ড. শাকুর নামার সময় মাথায় ঠুক করে একটা চোট পেল। বাবা বলল, “স্যার লেগেছে?”
“একটু।”
গাড়ির দরজা বন্ধ করে হাসতে হাসতে হেসে হাত নাড়ল ডক্টর আমাদের দিকে। অজান্তেই আমিও হাত নাড়লাম।
আধঘণ্টা পর আমাদের একতলা বাড়িটার সামনে থামল গাড়ি। মা শব্দ শুনে জানালার পর্দা সরিয়ে একবার দেখেই দরজা খুলে দিলো।
“যাক, উনি কথা রেখেছেন।”
ভেতরে যাওয়ার পর মা আমাকে জড়িয়ে ধরল।
“অফিসে যাব, অফিসে যাব, কান ঝালাপালা! হলো?”
বাবা প্রাণভরে হাসল। ‘হলো’র চেয়েও যে বেশি কিছু ঘটে গেছে!
বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে বাবা বলল বিস্তারিত।
ড. শাকুর যেভাবে উল্লেখ করেছে ঠিক সেভাবেই ফাইল দাঁড় করিয়েছিল বাবা। শিল্প থেকে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে গেলে ফাইলটা বিশেষ একজনের হাতে পড়ে, আর গোলমালটা সেই করে। শিগগির একটা নতুন নীতি করে এমন হওয়ার পথ বন্ধ হবে। ব্যাপারটা শিল্পমন্ত্রী পর্যন্ত গড়ানোয়, যেই চাপ বাড়ল, মূল গোলমালকারীর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সহকারী সব স্বীকার করে গেল। চাকরি স্থগিত হয়েছে ওদের। ড. শাকুরের সিদ্ধান্তে বাবার সেদিন দ্বিতীয়বার হলুদ ফাইলটা দাঁড় করানোয়, সময়ের ভেতর পুরোপুরি রাশ টানা গেছে ক্ষতির।
বাবার পেনশন তো শীতল করে দিয়েছে ড. শাকুর। ওই আদেশ তুলে নিতে বাবাকেই একটা আবেদনপত্র লিখতে হবে, তাতে সই করে দেবে ড. শাকুর, কলমের খাপ খুলে তৈরি। বেঁকে বসেছে বাবা। বাবা লিখবে না কোনো আবেদনপত্র।
“কামাল! আমার কথা শোনো! এপ্লিকেশনটা লেখো বললাম!”
“না স্যার।”
“ওরে- নিয়মরক্ষার ব্যাপার শুধু, আর কিছু না!”
“আমি লিখব না।”
“খোকা, বুড়ো হবে না? অবসরে চলে যাবে, টাকা তুলতে পারবে না।”
“সেটা স্যার আপনার মাথা ব্যথা,” বাবা হেসে বলল।
“কামাল!
“স্যার, ভুল আমার না।”
“ভুল আমার, কামাল। স-রি!”
ড. শাকুর বাবার হাত ধরল।
এবং শেষমেশ বাবা আবেদনপত্র লিখল। ড. শাকুর ঝরনা কলমের নীল কালিতে করল স্বাক্ষর, আর তার ওপর পড়ল দুটো সিলমোহর।
বাবা আর ড. শাকুর পরে বন্ধুর মতো হয়ে গিয়েছিল। তবে তাঁর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি কোনোদিন।
০.
আরো পাঁচ বছর চাকরির পর অবসরে যান ডক্টর। পৃথিবীকে বিদায় জানান তারও চার বছর পর। অনীল কাকুর সঙ্গে বাবার কী নিয়ে যে পরে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল, জানা নেই। আমার স্মৃতি থেকে কাকু হারিয়ে গিয়েছিল । যেদিন কাকুর মৃত্যুসংবাদ পেল বাবা, তার সাদা দাড়ি জলে ভিজে উঠেছিল। বাবার ভেজা গাল মুছে দিচ্ছিল মা। অবসরের আট বছর পর অনীল কাকুর পথ ধরল বাবাও। তাঁকে যেদিন কবরে রেখে ফিরছি, অচেনা নম্বর থেকে এক বয়স্ক মহিলার ফোন।
“তোমার ফাতেমা ফুপিকে মনে আছে?”
ক্লাস সেভেনে আরো একবার বাবার অফিসে গিয়েছিলাম। তখন শুনেছিলাম ফুপি বদলি হয়ে বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে। ওই মন্ত্রণালয় একই ভবনে ছিল যদিও, তবু দেখা হওয়ার অবকাশ ছিল না। রুবিনা ফুপির চা খেয়েছিলাম সেবার। পৃথিবীতে মায়ের চায়ের পরই ওটার স্থান।
জুঁইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেনাকুঞ্জে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে। বাবা যেতে পারছিল না, তাই উপহার দিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিল।
জুঁই ছিল সেই বিয়ের কনে। তার সঙ্গে আলাপের ইচ্ছে ছিল। সুযোগ হলো কই। ·
লেখক পরিচিতি : হামিম কামাল কথাসাহিত্যিক। গল্প ও উপন্যাস লেখেন। থাকেন ঢাকায়। সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত।


0 মন্তব্যসমূহ