তৃষ্ণা বসাকের গল্প : নৌকো


মাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে ওই দৃশ্যটা। তুমি ফিরে আসছ। একটা হালকা জোছনার চাদর পড়ে আছে আলগোছে বাস রাস্তার ওপর। বাস রাস্তা । ঠিক এই নামেই ডাকতাম বড় রাস্তাটাকে। ৮৯ রুটের বাস যেত সেসময়, এছাড়া ছিল ভ্যান রিকশা, যাতে ছাগল আর মানুষ একসঙ্গে অনায়াসে যেতে পারত। আর ছিল গাড়ি। আমরা বিকেলে এই বাস রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম অনেক দূর। কানপুর পার হয়ে, এমনকি দলনঘাটা পর্যন্ত। রাস্তা দীর্ঘক্ষণ ফাঁকা থাকত, এতটাই দীর্ঘক্ষণ যে আমরা সেই পিচঢালা মসৃণ রাস্তায় বসে পড়তে দ্বিধা করতাম না। বিকেলের রোদ পড়ে এলে গরম ভাপ ওঠা পিচের রাস্তায় যে না বসেছে, সে বুঝতেই পারবে না এর মর্ম। খাদি মন্দিরের ওপর দিয়ে, পাত্র পুকুর ছুঁয়ে, কুলপি, করঞ্জলি, শ্যাম বোসের চক পেরিয়ে বিকেলশেষের হাওয়া আমাদের জুড়িয়ে দিত। আমরা বুঝতে পারতাম এই পৃথিবীটা আমাদেরই, আমরা বছর বছর পুজোয় এখানে আসব, মণ্ডপের সামনে ওড়া প্রতিটি বেলুনে, পিস্তলে ফাটানো প্রতিটা ক্যাপের শব্দে, নন্দীদের শিবমন্দিরের পেছনে জন্মানো প্রতিটা ফণীমনসার ফুলে আমাদের আমাদের নাম লেখা থাকবে। আর সেই নামের পেছনে তো তুমি। কখনো আমাদের কাঁধে করে হাট দেখাতে নিয়ে যাচ্ছ, কখনো উঠোনে জাল রেখে বিশাল মাছ বার করে আনছ। আমরা ভাবতেই পারিনি যে তুমি এখান থেকে চলে যাবে। এতটাই চলে যাবে যে আর কোনদিন ফিরবে না, ফিরতে পারবে না।

কিন্তু আমি যে দেখলাম তুমি ফিরে আসছ। হেঁটে হেঁটে একা। রত্নেশ্বরপুর, গাববেড়িয়া দলনঘাটা ধরে একা একা। একটা নীলচে আভা ঘিরে আছে তোমার শরীর। হরর মুভিতে যেমন কোন রহস্যময় চরিত্র আসে, তেমনই একটা ছাই ছাই হুডি মাথায় তুমি হেঁটে আসছ। রাস্তায় একটাও লোক নেই। গ্রাম ঘুমোচ্ছে দুপাশে। নদী মাঠ খেত সব ঘুমোচ্ছে।

স্বপ্নের মধ্যে কোন প্রশ্ন তোলা যায় না। আমি তো স্বপ্নই দেখছিলাম। নইলে আটলান্টা থেকে আমি আমিনগঞ্জের বাস রাস্তা কী করে দেখতে পেলাম? স্বপ্নে কোন তর্ক করা যায় না, প্রশ্ন করা যায় না, নইলে আমি তো ঠিক জিজ্ঞেস করতাম তুমি এত গভীর রাতে এইভাবে হেঁটে হেঁটে গ্রামে ফিরছ কেন? আসলে আমি তো জানিই না অনেক কিছু। তুমি ওখানে থাকো না আর জানি, টাউনে নদীর ধারে বাড়ি করেছ, কিন্তু প্রতিদিনই তুমি আসো আমিনগঞ্জ। বাইকটা উঠোনে দাঁড় করিয়ে নিজেদের পুরনো ঘরটায় ঢোকো, ধরাচুড়ো ছেড়ে যখন লুঙ্গি পরো কি পাজামা, তখন বড়দি এসে জিজ্ঞেস করে ‘অমি, টিপিন করে এসেছিস? না খাবি? দুধ রুটি দি?’ বড়দি বিয়ে করেনি, এতবড় সংসারটাকে দাঁড় করিয়েছে। বাবা মার মৃত্যুর সময় বড়দি ছাড়া কেউ ছিল না পাশে। সাতটা ছেলেমেয়ে সাত জায়গায় ছড়িয়ে আছে। তুমি কাছে থাকো, কিন্তু কী অদ্ভুত, সেই মুহূর্তগুলোয় তুমি পাশে ছিলে না। গ্রামের লোক এইসব নিয়ে চর্চা করে, সাত সাতটা ছেলে মেয়ে, শুধু বড় মেয়ে ছাড়া গালে জল দেওয়ার কেউ ছিল না।

বড়দির কথার উত্তরে বেশিরভাগ দিনই তুমি দাঁত খিঁচোও। ‘ছেঁড়া পরোটা খেয়েই এসেছি’ কোনদিন বলো। কোনদিন বলো ‘দে, ও ছাড়া তো আর কিছু শিখিসনি’ ফিরিস্তি দেবে পলি একেকদিন একেকরকম টিফিন বানায়। সুজির পোলাও, চাউমিন, সাবুর খিচুড়ি, লুচি পরোটা তো আছেই।

এসব বলো, আবার দুধ রুটির বাটি টেনে নাও। আসলে যখন বেরিয়ে আসছ, পলির তখনো ভালো করে ঘুম ভাঙেনি । নদীর ধারে হরির দোকানে বসে চা খেয়ে নাও তাই। কোনদিন ইচ্ছে হলে ছেঁড়া পরোটা বাজারে মান্নার দোকানে। একদিন ইচ্ছে হয়েছিল বড়দির জন্যেও কিছু নিয়ে যাই, নিয়েছিলে ছেঁড়া পরোটা একদিন, একদিন জিলিপি। ও দোকানে পিঁয়াজের অব্দি পাট নেই, তবু বড়দি সে ছেঁড়া পরোটা ছুঁয়েও দেখেনি। হারুর মা, বাইরের কাজ সারে, তাকে দিয়ে দিয়েছিল। হারুর মা যখন এ বাড়ি কাজ করতে এসেছিল, কি দুর্ভিক্ষের চেহারা। আর এখন খোলতাই দেখো! বড়দির রোজ ভাত বেশি, গোছা গোছা রুটি বেশি। হাতের কোন মাপ নেই। বললে বলবে, ‘আজ ভাবলাম পুণ্যিরা আসবে, তাই দুমুঠো চাল বেশি নিলাম।’ কিংবা ‘তুই বললি না রাতে থাকবি এখানে? তোর জন্যে কটা বেশি রুটি বেললাম।’

শুনলে ঝাঁট জ্বলে যায়। পুণ্যিরা থাকে বজবজের আখড়া। বিজয়া সারতে ছাড়া কেউই এ মুখো হয় না। তার জন্যে হুতাশে উনি চাল বেশি নিচ্ছেন। কেন, এলে কি করে দেওয়া যায় না? রোজ গাদা গাদা খাবার বেশি। পলি যতদিন এ সংসারে ছিল, রেগে কাঁই হয়ে যেত। ‘তোমাদের কাজের লোকেরা তেলিয়ে গেছে বড়দির জন্যে। কেউ একটা বাড়তি কাজ করে না। অথচ বড়দি তাদের গিলিয়ে যাচ্ছে।’ কাজের লোকেরাও যখন ভাত তরকারি নিয়ে যেতে চায় না, তখন তা চলে যায় পুকুরে। পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায় জলের নিচে কালো পুরুষ্টু মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে নিজের মনে। সে মাছ বাড়াই সার। তাদের কেউ ধরে না। কে খাবে? বড়দি সেই কবেই মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। মাংস তো কোন দিন খেত না। খেলেও প্রসাদী মাংস। চিকেন কিছুতেই না, গন্ধ লাগে। মাছটা খেত ভালবেসেই। পলি ছেলেমেয়ে সুদ্ধ টাউনের বাড়িতে চলে যাবার পর থেকে মাছটাও ছেড়ে দিল। একা বাড়িতে নাকি গলায় কাঁটা ফুটলে কে দেখবে? এতেও রাগ হয় তোমার। কে দেখবে মানে? পলি তো নিজের আর বাচ্চাদের খাবার থালা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিত। তুই মরে পড়ে থাকলেও সে আসত নাকি? তখন পান থেকে চুন খসলেই আগুন হয়ে যেত পলি। ছেলেমেয়েগুলোকে চোরের মার মারত। তখন সবাই ভেবেছিল নিজের বাড়ি, নিজের সংসার হলে বোধহয় পলি শান্ত হয়ে যাবে। দাদারা বলল, বিশেষ করে বড়দিই বলল বেশি করে, চোখের সামনে ছেলেমেয়েগুলোর মার খাওয়া আর দেখতে পারছিল না সে, বলল ‘অমি, তুই টাউনে একটা দু কামরা করে নিয়ে যা ওদের। ছেলেমেয়েদুটো বাঁচুক।কপাটেহাটের জমিটা তো পড়েই রয়েছে।’

এই কপাটেহাটের জমিটার একটা ইতিহাস আছে। বাবা এ জমি কিনে গিয়েছিল বড়দির নামে। তখন জলের দরেই একরকম। মেয়েটা বিয়ে করল না, ওর একটা ভবিষ্যৎ আছে। আমিনগঞ্জের বাড়ি তো সাতজনের।

বড়দি তো চাকরিটা পেল বুড়ো বয়সে। প্রাইমারি স্কুল। প্রথমে অনেক দূরে ছিল। কুলপি পেরিয়ে কাঁটাপুকুর। তারপর অনেক লেখালেখি করে বাড়ির পাশে চলে এল। বাড়ি থেকে হাঁটাপথ।

সেসময় দু-একদিন ইস্কুল থেকে ফিরলে বড়দি দেখত পলি দুধ পাঁউরুটি কি সুজি করে রেখেছে। একেদিন পরোটা, সাদা আলুর তরকারি পর্যন্ত। তারপর দিন দিন পলির রাগ বাড়তে লাগল। বড়দির সেবা যত্ন তো দূরের কথা, দেখলেই ক্ষেপে উঠত। ওর মনে হতে থাকল বড়দি তার সংসারটাকে গিলে খেয়েছে, এ বাড়ির সব সিদ্ধান্তই বড়দি নেয়। কবে পুকুরে জাল দেওয়া হবে, কবে সুপুরিগাছ ছাড়াতে দেওয়া হবে, পেয়ারা গাছের পিঁপড়ের ডিম কাকে বেচা হবে, পুজোয় কাকে কী দেওয়া হবে থেকে নারায়ণের শীতল ভোগ, প্রতিদিনের রান্না, বিশেষ করে নিরামিষ রান্না, তাতে কী ফোড়ন পড়বে, কতটা মিস্টি পড়বে, সংক্রান্তিতে পিঠেপুলি কী হবে না হবে—সব বড়দির হাতে। সে কি সারাজীবন বড়দির হাততোলা হয়ে থাকবে না কি? তার বাবা মা ভাই বোন এলেও বড়দি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের আদর যত্ন করবে। কে কী ভালবাসে, কী পাতেই নেয় না একদম—সব তার মনে থাকে। এসব দেখে সবাই মুগ্ধ। মার ভয় ছিল, শাশুড়ি নেই সত্যি, কিন্তু কাঁটকি ননদ আছে। ননদ জ্বালা বড় জ্বালা। বিয়ে না করা থুবড়ি ননদ সংসারে ভারি অশান্তির কারণ। কিন্তু বড়দিকে দেখে তারা এসব কথা ভুলে গেল। পলিকে তো নড়ে বসতে দেয় না। সকালের চা অব্দি ঘরে দিয়ে আসছে। বাচ্চাদুটোকে পলি জন্ম দিয়েই খালাস। বড় করল তো বড়দিই। বড়পিপি বলতে ছেলেমেয়ে দুটো অজ্ঞান। এত সুখ আর কোথাও পেতিস? বড়দি মরে গেলে তো এই এত বড় বাড়ি পুকুর, পুকুরপাড়ের গাছ—সব তোর হবে। মা বোঝায় মেয়েকে সুযোগ পেলেই। তাতে আরো ফোঁসে পলি। বড়দি যে কি ধড়িবাজ মহিলা, তা কেউ বুঝতে পারছে না। নিজের মাও না। সাদা জমির শাড়িতে হালকা ফুল বা বুটি- তা দেখেই সবাই সন্ন্যাসিনী ভাবে। ঐ মিস্টি মিস্টি কথা বলা, কেউ এলেই তাকে জল মিস্টি এগিয়ে দেওয়া, বেরোনোর সময় নারাণের প্রসাদী ফুল চুলে গুঁজে দেওয়া—এসবই বড়দির ভেক। এর আড়ালে সাংঘাতিক এক কুচক্রী মহিলা লুকিয়ে আছে। লোভী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মহিলা। যে সবার চোখে মা সারদা, মাদার টেরেসা। আসলে সে চায় সব কিছু তার হাতে থাকুক। সে-ই সব্বাইকে ওঠাবে বসাবে। বাকি ভাই বোনেরা চিনে গেছে বড়দিকে, তাই বছরে একবারের বেশি এদিক মাড়াতে চায় না। বড়দি যতই ফোনে ‘আয় আয়’ করুক। চিনল না শুধু পলির বর। বড়দি ওকে গ্রাস করে রেখেছে। টাউনে বাড়ি করে নিয়ে গিয়েও রক্ষা নেই। তুমি তো রোজ আসো আমিনগঞ্জ। বললে বলো ‘আরে আমার ব্যবসার সব কিছুই তো ওখানে। প্রতিদিন মাল সাপ্লাই দিতে হয় দোকানে দোকানে। ওরা তো মেশিনে মাল চাপিয়ে দেখে সুতো ফুরিয়েছে, কলার নেই, জিপ নেই, বোতাম নেই। অমনি ছুটে আসে। বড়দি চোখে ভালো দেখে না, কী রঙ দিতে কী রঙ দেবে, তাছাড়া টাকা পয়সাও বুঝে নিতে পারে না বড়দি।’

যত ন্যাকামির কথা। আগে তো দিব্যি পারত। সংসারের মতো ছোট ভাইয়ের ব্যবসাও একাই সামলাত, ভাই তখন ক্লাবে ক্যারাম পিটোত কি দূর দূরান্তে ফাংশন করতে যেত, কি মড়া পোড়াতে বিষ্টুপুর শ্মশানে চলে যেত, কিংবা কোন বন্ধুর বন্ধুর বন্ধুর বোনের বিয়েতে গিয়ে সাতদিন কাটিয়ে আসত। সে নিয়ে কোনদিন বড়দি মৃদু অনুযোগও করেনি। এমন ভাব যে সংসারটা বড়দিরই আর তারা সব বড়দির খেলনার বাক্সের পুতুল। বাব্বা বাব্বা, বিয়ে না করে সংসারের এমন আঠা আর কারো দেখেনি পলি। ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিল এখানে। কাজের লোক থেকে পড়শি, নিজের পেটের ছেলেমেয়েগুলো অব্দি মহিলার বশ। এ আর সহ্য করতে পারছিল না সে।

জিনিস ছুঁড়ে ফেলা, চিৎকার, আফসাল ঝাপসাল চলছিল। যেদিন দরজার খিল খুলে ছেলেটাকে মারতে ছুটল, সেদিন বড়দির বুক কেঁপে গেল। রাতেই তোমাকে ডেকে কপাটেহাটের জমিতে ঘর তুলতে বলে দিল। এখানে থাকলে পলি কোনদিন না কোনদিন বাচ্চা দুটোকে মেরেই ফেলবে।

এখানে এসে কী লাভ হল ভাবে পলি। আমিনগঞ্জে রান্নার লোক ছিল, এছাড়া আরো দুটো ঠিকে লোক। বাচ্চারা ছোট ছিল যখন, বাচ্চা দেখার লোক ছিল আলাদা। আর এই নতুন বাড়িতে একটা লোক কোনোরকমে রেখেছে পলি। সে একগাদা টাকা নেয়, আর গোনা বাসন মাজে, ঘর মোছে। জল আনার জন্যে আলাদা টাকা নেয়। আর সব পলির ঘাড়ে। প্রায় বাজার করতে হয়। তুমি উদাসীন এ ব্যাপারে।পলির মনে হতে থাকে, এটা যে একটা সংসার, একটা বাড়ি, যে বাড়ির কর্তা তুমি—এমন বোধই তোমার নেই। একে তো বড়দি তোমার অভ্যেস নষ্ট করে দিয়েছে। তুমি ওখানে দেখেছ যা করার বড়দি করে, তুমি নিজের মতো বেড়িয়ে চেড়িয়ে বেড়াও, বেশি ভ্যানভ্যান করলে ছিপ নিয়ে বসে যাও। বড়দি অবশ্য ভ্যানভ্যান করার লোক নয়। তার কাজ করার অনেক লোক আছে। মাইনে করা লোক ছাড়াও, তার দরকারে গাঁয়ের ছেলেপুলে ছুটে আসে। বড়দি বলেছে মানে সে আদেশ। তবু ইদানীং ঘাটের সিঁড়িগুলো সারানোর জন্য বড়দি সমানে বলে যাচ্ছে। বাঁধানো ঘাট নয়, তালের গুঁড়ি ফেলা, অতীতে ওপরের দু চারটে ধাপ ইঁট বাঁধানো ছিল, সে ক্ষয়ে ভেঙে গেছে। দিনের মধ্যে পঞ্চাশবার বড়দি এই ঘাটে নামে। এখন তো ছাদে ট্যাংক বসিয়ে ঘোরানো কল করে নেওয়া হয়েছে কলঘরে। তবু পুকুরে না নামলে তার শান্তি হয় না। লম্বা শীর্ণ চেহারায় কোন বাড়তি মেদ নেই। তুরতুরে পায়ে দিব্যি ওঠানামা করে সারাদিন। যেন সেই তেরো বছরের কিশোরী। যাকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল হানিফ। হানিফ আসত বাবার কাছে গান শিখতে, ওদের বাড়িতে খুব আপত্তি ছিল এই গান শেখা নিয়ে। কিন্তু হানিফের আগ্রহের কাছে তা হার মেনেছিল। বড়দি আসত বারবার চা দিতে, খালি কাপ নিয়ে যেতে। যেতে আসতে গুনগুন করত সুর। গায়ের রঙ খুব চড়া নয়, কিন্তু মুখের ডৌল পানপাতার মতো, আর তেমন দুটো চোখ, আর এক ঢাল চুল। হানিফ মুগ্ধ হয়ে দেখত শুধু, এর বেশি কিছু করার সাহস তার ছিল না। অনেক পরে বড়দি যখন কলেজে পড়ে, তখন একদিন ফেরার সময় বাস স্ট্যান্ডে নেমে বড়দি দেখেছিল হানিফ দাঁড়িয়ে আছে, উৎসুক চোখে। তারপর থেকে রোজ দাঁড়াত। ভয় পেয়ে মাকে বলে দিয়েছিল বড়দি। সেখান থেকে জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। গ্রামের মাথারা ডেকে কড়কে দিয়েছিল হানিফকে।

প্রেমের উল্টো পিঠেই কি ঘৃণা থাকে? হানিফ শুধু বড়দিকে নয়, এই পরিবার, এমনকি সব হিন্দুদেরই ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। খিড়কি পুকুরের ওপারেই তাদের বাড়ি। আগে ও বাড়ির মেয়েরা সবসময় এ বাড়ি আসত। তাদের মাথায় ঘোমটা থাকত শুধু। এখন হানিফের কড়া শাসনে বাড়ির মেয়েদের বোরখা পরে বাইরে বেরোতে হয়। এ বাড়ির কোন নিমন্ত্রণেই তারা আসে না। হানিফ রাস্তায় দেখা হলেও মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার চেয়েও বড় কথা পুকুরপাড়ের ধারের অনেকখানি জমি সে আস্তে আস্তে দখল করে নিচ্ছে। এমন ভাবে চলতে থাকলে একদিন সে ভটচায্যি বাড়িটাই দখল করে নেবে। বড়দি আজকাল প্রায় এই ভয়ের কথা বলে। তোমার তখন রাগ হয়। ‘এসবের জন্যে তো তুইই দায়ী। একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করলি! ছেলেটার দিকে একটু হাসলে কী হত?’ পুকুরপাড়ে ছিপ নিয়ে বসে হানিফের উঠোন দেখো তুমি। বাতাবিলেবু ফুলের গন্ধ নাও। পুকুরে খসে পড়া শিরিশ ফুলের চূর্ণ দেখো। দূরে নেতড়ার দিকে চলে যাওয়া পথ দেখো। পুণ্যিরা বেশিরভাগই এই পথে গিয়ে কলকাতার ট্রেন ধরে। বড়দি এই পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়, যতক্ষণ না ভ্যান ওদের নিয়ে দূর দূর গ্রামের কুটীরগুলির আড়ালে একেবারে অদৃশ্য হয়ে না যায়। জলে ছিপ ফেলে সেই পথের দিকে দেখো তুমি। বড়দি যে কী দেখে অত নির্নিমেষ নয়নে! পুণ্যি তো আসতেই চায় না আমিনগঞ্জ, অথচ এখানে ইলেকট্রিক আছে, টিভি আছে, জল পাম্প করতেও হয় না, শুধু যা এসি নেই, তা সারাদিন গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে যা হাওয়া দেয়, এসির বাবা! তবু আসে না ওরা, তবে রোজ ফোন করে পুণ্যি, আসলে সিরিয়াল দেখে আর কত সময় কাটে? পলিকে নিয়ে রসালো খবর চায় ওরা বড়দির কাছে। তবে তাতে খুব সুবিধে হয় না, বড়দির মুখে ওরা কেবলই পলির শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ শুনে বিরক্ত হয়ে যায়। ‘তুই একটা বিশ্বন্যাকা বড়দি, যাই বলিস। তোকে এখানে যা হুড়কো দিল, তারপরেও তুই ওকে নিয়ে ভেবে পাগলা হয়ে যাচ্ছিস!’

সত্যিই ভাবে বড়দি পলিকে নিয়ে। একা কী করে রান্নাবান্না, ছেলেমেয়ের টিফিন, স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা সামলাচ্ছে মেয়েটা! রোদ লাগলেই তো মাইগ্রেনের যন্ত্রণা। তখন বমি হয়, দুদিন বিছানা থেকে উঠতে পারে না, বড়দি ছেলেমেয়েগুলোকে এখানে আনিয়ে নেয়, তোমার হাতে টিফিন কেরিয়ার ভর্তি খাবার পাঠায়। তবু পলি বড়দিকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। সে মনে করে তার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে এই মহিলা। পুকুরপাড়ে বসে ভাবছিলে তুমি, সত্যিই হানিফ অনেকটা দখল করে নিয়েছে, সব তো বড়দিরই দোষ। একটু হেসে কথা বললেও কি জাত যেত? মার কাছে বলার তো দরকার ছিল না।

বড়দি তখন রান্নাঘর থেকে চেঁচাচ্ছে ‘অমি, তোর দুধরুটি কি ওখানে দিয়ে আসব? না এখানে আসবি? আর শোন, নারানের বাতাসা ফুরিয়েছে। একটু এনে দিবি লক্ষ্মী ভাই আমার?’

সে এখানে এলে বড়দি খুব খুশি হয়, কিন্তু মুখে বলে না, ফেরার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার মুখ দেখে বুকের কাছটা ভারি লাগে। তবু পলির মুখের ভয়ে ফিরতে হয়। আবার সকালে আসো। কিন্তু সে আসা বন্ধ হয়ে গেল। চেন সুতোর ব্যবসা সুবিধে হচ্ছে না। সব টেলারিং শপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। টাউনে দু দুটো শপিং মল। রেডিমেড জামা প্যান্টের ঢেউ। কেউ আর জামা প্যান্ট বানায় না। সেই বাপি মণ্ডলের বাবা নিতাই মণ্ডলের দোকানটাই যা টিকে আছে টিমটিম করে। খালের ধারে একটেরে দোকানটা। এই খালে কতবার ডিঙি নৌকা চড়েছ একসময়। পূর্ণিমা হলেই নৌকা চড়তে সবাই মিলে। একবার কত গুলে মাছ ধরা হয়েছিল। সে কথা আজও বলে বড়দি। বড়দিও তো থাকত সেইসব নৌকাযাত্রায়। আর থেকে থেকে বলত ‘অমি, জল থেকে হাত তুলে বোস। খালে কুমীর আছে’ আর সেটা শুনে সবাই হাসাহাসি করত, আর তত রেগে যেত তুমি। বাড়ি ফিরে বলতে ‘আর কোনদিন যদি তুই নৌকো চড়তে যাস, দেখে নিস’ এই করে করে নৌকা চড়া বন্ধ হয়ে যাবে বড়দির। একসঙ্গে কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে, বিয়ে পৈতে অন্নপ্রাশন—সব জায়গাতেই যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে বড়দির। যাবে না, বারবার বললেও যাবে না, খুব এড়াতে না পারলে সকালে গিয়ে উপহার দিয়ে শুধু একটা সন্দেশ, একটা রসগোল্লা খেয়ে চলে আসবে। তারপর ধীরে ধীরে বড়দি মাংস খাওয়া ছেড়ে দেবে, তারপর মাছ, এসবে নাকি গন্ধ লাগে। এসব তুমি কোনদিন লক্ষ্যই করবে না, ভাবতেও পারবে না এসবের মূলে তোমার সেই বড়দিকে নৌকায় চড়তে না দেওয়া। নৌকো থেকে নামিয়ে দেওয়া। অথচ গুলে মাছ পেয়ে বড়দি কি খুশিই না হয়েছিল। বলেছিল পরেরবার আবার যাবে। বাড়িতে এনে সর্ষে দিয়ে অপূর্ব ঝাল রেঁধেছিল, সেই বড়দি আর নৌকো চড়তে পারল না। কারণ এমনসব কথা বলে বড়দি, যে লোকের সামনে ছোট হয়ে যাও তুমি। বিয়ের পরেও পলির সামনেই বড়দির কাছে কাচা আন্ডারপ্যান্ট চাইতে তুমি, বড়দিও দিয়ে দিত অবলীলায়। পলি রেগে অস্থির হত ‘বাবা রে বাবা, এমন অদ্ভুত বাড়ি তো দেখিনি। হলই বা সবার ছোট ভাই, ছেলের বয়সী, তা বলে একটা দামড়া ছেলের আন্ডারপ্যান্ট কেচে গুছিয়ে রাখবে তার দিদি, বিয়ের পরেও? আমাকে কীসের জন্যে বিয়ে করা হল তবে? এ তো বড়দির সংসার, এখানে আমি কী করছি? ওঁরা গান গাইবেন আর আমি বসে বসে খঞ্জনী বাজাব?’ এ তো তাও ভালো কথা, আরো কত যে কুৎসিত কথা বলত পলি, কি নিচু ওর মন। কিন্তু পলির মুখের জন্যেই তো ওকে আলাদা বাড়ি করে দিতে হল, আর আলাদা সংসারের খাঁই আর চেন সুতোর ব্যবসায় মিটছিল না। তখন হঠাৎ তুমি আশ্চর্য প্রদীপের সন্ধান পেলে। একা পেলে হয়তো ভালো হত, কিন্তু তুমি চাইলে সব্বার হাতে সেই প্রদীপ ধরিয়ে দিতে।সবাই ভেবে দেখল পয়সা ঘরে রাখলে বাড়ে না, তার চেয়ে চিরাগ ফান্ডে রাখা ভালো।

বড়দি বলেছিল একদিন ‘পুণ্যি বলছিল এসব নাকি লোকের টাকা মারার কল। সেই পুরনো বাংলা সিনেমার ব্যাংকের মতো ফেল মারবে আর রাজ্যের লোক বাড়ি এসে চড়াও হবে দেখে নিস’

পুণ্যির যে কথাটা বড়দি তোমাকে বলেনি তা হল বড়দিই তো অমির সংসার টানছে সবাই জানে, তবে ওর আবার এসব করার দরকার কী? সংসারের চাল ডাল থেকে বাচ্চাদের ইস্কুল টিউশন সবই তো বড়দি দেয়, অমি শুধু রোজকার বাজার খরচ, তাও অনেক অশান্তি করে ওকে বাজার পাঠাতে হয়, আজকাল বেশিরভাগ দিন পলি দরজা থেকে মাছ সবজি কিনে নেয়।

সেসব কথা ঢেকে যেটুকু বলেছিল সেটুকুই ঝাঁট জ্বলে যাবার জন্যে যথেষ্ট। তুমি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেছিলে ‘পুণ্যিকে বলিস ওর এসব নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। আমি মার খেলে ওকে তো ঠেকাতে আসতে বলছি না’।

কেউ আসেনি ঠেকাতে সত্যি, বড়দি কাঁদতে কাঁদতে সব ভাই বোনদের ফোন করেছিল যদিও। সবাই যথারীতি বড়দিকেই দোষ দিয়েছিল। সেই নষ্ট করেছে ভাইকে, পলিও একই কথা বলেছিল, যদিও তার স্বর অনেক মৃদু। তোমাকে যেদিন ওরা মারতে এসেছিল, সেদিন বাবার নাম আর হানিফ-এই দুজন তোমায় বাঁচিয়েছিল । কিন্তু তার পর আর আমিনগঞ্জে আসতে পারোনি তুমি।

আজ তুমি আসছ। এখন রাত অনেক। একটু পরেই চাঁদ হেলে পড়বে। তুমি হেঁটে হেঁটে আসছ, একা একা। নীলচে ছাই ছাই হুডি মাথায় তোমাকে রহস্যময় লাগছে। তুমি আসছ, কারণ এই প্রথম বড়দি তোমাকে ডাকেনি। তুমি আসছ, আমিনগঞ্জের খালে বড়দিকে, শেষবারের মতো নৌকায় চড়াবে বলে। ·


লেখক পরিচিতি : তৃষ্ণা বসাক কবি ও কথাসাহিতিক্য। পেশাগত জীবনে তিনি ভারত সরকারের মুদ্রণ সংস্থায় প্রশাসনিক পদে কর্মরত। বসবাস করছেন কলকাতায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ