স্মৃতি ভদ্রের সাক্ষাৎকার : লেখালিখির আখ্যানজুড়ে নিজেকে লিখে চলেছি



স্মৃ
তি ভদ্র কথাসাহিত্যিক। তাঁর লেখায় সুখের ভেতরও গভীর বেদনায় বেজে যায় সাতচল্লিশ, একাত্তর, ধর্মান্ধ সময়, আপাত জীবনে পরাস্ত মানুষ কিংবা আটপৌড়ে দাম্পত্যের নড়ে ওঠা ফাঁপা সংসারের পদাবলী। তাঁর গল্পেরা হাত ভরে একচেটিয়াভাবে আনন্দ দেবে বলে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয় না, সেসব কাহিনি পাঠকদের প্রশ্নবিদ্ধ করে, পাঠকরা ভাবিত হয়। তাঁর আখ্যানের স্মৃতি-বিস্মৃতির ধারাভাষ্য পড়ে পাঠকেরা পড়ে যায় অস্বস্তিতে। স্মৃতি ভদ্র একজন সমাজ ও রাজনীতি-সচেতন লেখক। তাঁর লেখাজুড়ে সেই সচেতনতা চোখে পড়ে। দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, জঙ্গিবাদ এবং মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে বর্তমানের অসুয়া উল্লাস ইত্যাদি বিষয় তাঁর লেখায় আবর্তিত হয়। 

শুধু গল্পে নয়, গদ্য রচনাতেও যে স্মৃতি সিদ্ধহস্ত, সেই প্রমাণ তাঁর রসুইঘরের রোয়াক বইটি। দুই খণ্ডের জনপ্রিয় এ বইতে তিনি সময় উজিয়ে বিগত দিনের সমাজ, সংস্কৃতি, জীবন তথা আত্মগত ধারাবিবরণী উপস্থিত করেছেন শিল্পিত ভাষায়। রসুই ঘর এখানে নারীর একান্ত নিজের থাকেনি, রোয়াক ছাড়িয়ে লেখার পরতে পরতে উঠে এসেছে হারানো দিন, ঘর-মন ভরতি মানুষের আন্তরিক সহাবস্থানের পাঁচালি। তাই এটিকে শুধু ‘বাঙালির হাজার বছরের শান্ত সিগ্ধ, সুখী গার্হস্থ্য গাথা’ বলা যাবে না, বরং বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বইটি গুরুত্বের দাবিদার। 

সম্প্রতি স্মৃতি ভদ্র তাঁর প্রথম উপন্যাস রচনা শেষ করেছেন। গল্পপাঠের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়। তিনি সেগুলোর উত্তর দিয়েছেন। প্রশ্ন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য ।


গল্পপাঠ :
রসুইঘরের রোয়াক—পাঠকপ্রিয় এ বইয়ের আগে আপনি গল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আপনার প্রথমদিকের বইগুলো নিয়ে কিছু বলুন।

স্মৃতি ভদ্র : 
আমার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ অলোকপুরীর ডাক। পেন্সিল-জাগৃতি প্রতিভা অন্বেষণ পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ হিসেবে বইটি প্রকাশিত হয় অমর একুশে বইমেলা ২০১৮-তে। অন্তর্গত নিষাদ ও পায়রা রঙের মেঘ এবং পার্পল জলফড়িং আমার পরবর্তীতে প্রকাশিত গল্পসংকলন। বইগুলোতে সংযোজিত গল্পগুলোর অধিকাংশই সামাজিক-রাজনৈতিক গল্প।

গল্পপাঠ : 
লেখালিখিতে বিশেষত গল্পের ক্ষেত্রে এমন কোনো শহর বা জায়গা আছে কি, বাস্তবে হোক বা কাল্পনায়, যা আপনার লেখাকে প্রভাবিত করে?

স্মৃতি ভদ্র : 
দীর্ঘদিন আমি প্রবাসে বসবাস করছি। প্রবাসে বসবাস করা অধিকাংশ লেখকের মধ্যেই এক অদ্ভুত দ্বৈততা কাজ করে। লেখক অস্তিত্ব দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। চারপাশের স্বতঃসিদ্ধ জীবনের সাথে সংযোগ ঘটিয়েও আমরা নিজেদের অভ্যন্তরে আলাদা একটি জগৎ তৈরি করি। যে জগতে লেখকের লালন করা দেশের স্মৃতি আর বর্তমানের শেকড়হীন জীবন, দুটোরই সমন্বয় ঘটে। আমার একান্ত বিশ্বাস, প্রবাসী প্রতিটি লেখকের কাছে এই অভ্যন্তরীণ জগতই তাদের সকল লেখার প্রেরণা কিংবা আপনার ভাষায় লেখায় প্রভাব বিস্তার করে।

গল্পপাঠ : 
যদি বলা হয় আপনার অধিকাংশ গল্পে সমাজ সচেতনতা, ইতিহাস ও সমসাময়িক রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষণীয়—এই পর্যবেক্ষণটিকে কীভাবে নেবেন? আপনি কি মনে করেন উল্লেখিত অনুষঙ্গগুলোর প্রতি লেখকের দায়বদ্ধতা থাকা দরকার? একজন লেখকের ক্ষেত্রে রাজনীতি সচেতনতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

স্মৃতি ভদ্র :
আমি একটি কথা সচরাচর বলে থাকি, প্রতিটি লেখাই আসলে লেখকের অসম্পাদিত প্রতিচ্ছবি। আমরা যে কোনো লেখকের লেখা মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করলেই দেখতে পাবো লেখক আসলে তাঁর অভিজ্ঞতাই বয়ান করে গেছেন। সেই অর্থে বলতে গেলে লেখক নিজেকেই লিখে যান। আমার লেখায় আমার বিশ্বাসই প্রবলভাবে উঠে আসবে এটাই স্বাভাবিক। আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশই আমাকে তৈরি করেছে। তাই সমাজ, ইতিহাস এবং সমসাময়িক রাজনীতির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ অবস্থান, সবসময়ই আমার লেখায় উঠে আসে বা আসবে। এবার আসি প্রশ্নের দ্বিতীয় ভাগে, উল্লেখিত বিষয়ের প্রতি সকল লেখক তখনই দায়বদ্ধ হবেন যখন তিনি মানসিকভাবে এসব বিষয়ের সঙ্গে একাত্মবোধ করবেন। তাই আমি ঢালাওভাবে বলতে চাই না সকল লেখকই সমাজ এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবেন। তবে লেখকদের উত্তরণের জন্য অবশ্যই উল্লেখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে আমি বিবেচনা করি, তবে দায়বদ্ধ বলে আমি লেখকের স্বাধীনতাকে গণ্ডিবদ্ধ করে দিতে চাই না।

গল্পপাঠ :
সচরাচর আমরা দেখি সাহিত্যিকেরা লেখালিখির অনেকটা সময় পেরিয়ে আত্মজৈবিক বা স্মৃতিকথনমূলক লেখা লিখে থাকেন। যদিও এক্ষেত্রে স্বতঃসিদ্ধ কোনো নিয়ম নেই। পাঠক হিসেবে জানার আগ্রহ হচ্ছে—গল্প থেকে রুট পরিবর্তন করে স্মৃতিকথন লেখার অনুপ্রেরণা কীভাবে আপনার ভেতর অঙ্কুরিত হলো?

স্মৃতি ভদ্র 
আচ্ছা, এই প্রশ্নের উত্তরে আসলে নিজেকেই বিশ্লেষণ করতে হচ্ছে। আমি আসলে খানিক হেঁয়ালি মানুষ। নিয়মভাঙা শব্দটা অত্যন্ত প্রবল, সেটাকে পাশ কাটিয়েই আমি বলতে চাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি নতুন পথে হাঁটার লোভটুকু সংবরণ করতে পারি না কোনোভাবেই। আপনি রসুইঘরের রোয়াক বইটি নিয়ে বলছেন তো? সেই বইটি যতটা আত্মজৈবনিক আমার মনে হয়ে তার চেয়েও অনেক বেশি ৮০ এবং ৯০ দশকের বাংলাদেশের সামাজিক চিত্রণ। কিছুটা গল্পের ধরণেই লেখা হয়েছে সেই বইয়ের দুটি খণ্ড। তবে হ্যাঁ, বইটি লেখার আগে খুব বেশি পরিকল্পনা আমার ছিল না। নেহাতই ফেসবুকের পোস্ট হিসেবেই লেখা শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে লক্ষ করলাম নিজের অজান্তেই আমি সেই বাংলাদেশকে লিখে যাচ্ছি যে বাংলাদেশ প্রতিটি বাঙালির অন্তরে সুপ্ত হয়ে আছে। এরপর আর কলম থামেনি।

গল্পপাঠ : 
রসুই ঘরের রোয়াক-এর নরম স্মৃতি ও খাদ্যভিত্তিক আত্মজৈবনিক বয়ান থেকে আপনি এবার চলে এলেন মুক্তিযুদ্ধের মতো এক তীব্র ইতিহাসে—এই বিষয়বস্তু বদলের পেছনে কী প্রেরণা কাজ করেছে?

স্মৃতি ভদ্র :
দেখুন, আমি আগেই বলেছি আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশই আমার লেখকসত্তা এবং আমার কলমকে তৈরি করেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা এটাই আমার প্রথম নয়। আমার সকল গল্পগ্রন্থেই মুক্তিযুদ্ধের লেখা প্রবলভাবেই আছে। তাই রসুইঘরের রোয়াক থেকে মুক্তিযুদ্ধের মতো তীব্র ইতিহাসে উত্তীর্ণ হওয়া নয় বরং আমি বলতে পারি নিজের ভেতরে লালন করা মুক্তিযুদ্ধকে পুনরায় লিখেছি। আমরা সকলেই জানি আমাদের দেশ এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। মুক্তিযুদ্ধকে অপাংক্তেয় করে দেবার একটা অভিলাষী প্রচেষ্টা খুব দৃঢ় হয়ে উঠছে আজকাল। মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা প্রতিটি লেখকের কলম এইসময় মুক্তিযুদ্ধকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইবে নির্দ্বিতায়, এটা বলা মনে হয় অত্যুক্তি হবে না।

গল্পপাঠ : 
নিহিত আগুনদিন উপন্যাসের পুরুষ চরিত্রগুলো প্রায়শই দুর্বলতা, আদর্শের পতন বা অনুপস্থিতির প্রতীক। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নারীর ট্র্যাজেডি তুলে ধরবার জন্য পুরুষ চরিত্রগুলোকে কি ইচ্ছে করেই কিছুটা একমাত্রিক বা অসহায় হিসেবে উপস্থাপন করেছেন?

স্মৃতি ভদ্র : 
নিহিত আগুনদিন উপন্যাসে প্রতিটি চরিত্রই এসেছে আখ্যানের পথ ধরে। আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আখ্যানের মূল চরিত্র দুটি নারীচরিত্র। মুক্তিযুদ্ধের বীরাঙ্গনার জীবন এই উপন্যাসে বিস্তার লাভ করেছে আশেপাশের সকল চরিত্রের সমান সহায়তায়। তবে যদি পাঠকের মনে হয় মূল নারী চরিত্রের সঙ্গে সমান্তরালভাবে পার্শ্বচরিত্র ততটা বহুমাত্রিক হয়ে ওঠেনি, তবে এটাকেও আমি আখ্যানের প্রয়োজনীয়তাই বলবো।

গল্পপাঠ : 
মুক্তিযুদ্ধ ও বীরাঙ্গনাদের নিয়ে এমন একটা উপন্যাস লিখবার আগে আপনি কী ধরনের গবেষণা বা তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন? এই ঐতিহাসিক পটভূমিকে বিশ্বস্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে কোন কোন দিক আপনাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে? কার কাছে কী অনুপ্রেরণা পেয়েছেন? প্রাণশক্তি, দেশপ্রেম বা জেদ কী আপনাকে বেশি তাড়িত করেছে?

স্মৃতি ভদ্র :
আমরা প্রায়শই একটা কথা শুনে থাকি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকৃত কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি আজও। বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা অধ্যায়ই তেমনভাবে গদ্যে উঠে আসেনি। তাই নিহিত আগুনদিন লেখার আগে আমি বেশকিছু ইতিহাসের বই পড়েছি এবং ডকুমেন্টারি দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে সেইসব বই বা ডকুমেন্টারির প্রভাব বেশ স্পষ্টভাবেই এসেছে এই লেখায়। আমার লেখার অনুপ্রেরণা আমার ইচ্ছাশক্তি। আমি চেয়েছি মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের এই ক্রান্তিকালে মুক্তিযুদ্ধের যে ব্যাপকতা সেখান থেকে খানিক অংশে আলোকপাত করতে। আর এই সৎ চাওয়া থেকেই তৈরি হয়েছে নিহিত আগুনদিন উপন্যাস। হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধকে সর্বোপরি ভাবা আমিও অন্য অনেকের মতই এই সময়ে ব্যথাহত। তবে এই ব্যথাকে অন্তর্গত না রেখে আমি চেয়েছি এই দু:সময়ের প্রতিকার খুঁজতে। আর মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নিয়মিত লিখে যাওয়াই যে এর প্রতিকার সেটা বিশ্বাস করি বলেই নিহিত আগুনদিন উপন্যাসের জন্ম।

গল্পপাঠ :
রসুই ঘরের রোয়াক-এ যে ভাষা ছিল ঘরোয়া ও উষ্ণ, ইতিহাস নির্ভর আপনার প্রথম উপন্যাসের ক্ষেত্রে কি আপনি ইতিহাসের ভার সামলাতে ভাষা ও বর্ণনার টোনে কোনো পরিবর্তন এনেছেন?

স্মৃতি ভদ্র : 
প্রতিটি লেখকেরই সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার ভাষা। কেউ নিজের লেখার ভাষা তৈরি করেন আর কারো লেখার ভাষা তৈরি হয়ে যায় অবচেতনভাবেই। এই অবচেতনতার জন্ম হয় তখনই, লেখার সঙ্গে যখন লেখক একাত্ম হয়ে যান। আমি দ্বিতীয় গোত্রের লেখক। আমার লেখার ভাষা তৈরি করে আমার লেখার চরিত্র। গল্প বা উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে যে ভাষা অবধারিত, সেই ভাষাই আমার কলমে স্পষ্ট হয়। রসুই ঘরের রোয়াক শৈশবের নির্মল সময়ের কথকথা, আর নিহিত আগুনদিন একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। তাই ঘরানাভেদে লেখার ভাষাও ভিন্ন হয়ে গেছে লেখারই প্রয়োজনে।

গল্পপাঠ : 
আপনার গল্পসংকলনগুলোতে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের দ্বন্দ্ব বারবার এসেছে—মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে এই দ্বন্দ্ব কীভাবে নতুন অর্থে প্রকাশ পেয়েছে?

স্মৃতি ভদ্র : 
আপনি লেখার শৈলীর কথা বলছেন নিশ্চ্যই। তবে সচেতনভাবে আমি খুব একটা লেখার শৈলীতে মনোযোগী হতে পারি না। আপনি যদি আমার লেখায় ব্যক্তিক এবং সামষ্টিক দ্বন্দ্ব খুঁজে পেয়ে থাকেন, তবে তা অবশ্যই এসেছে অবচেতনভাবে। আমি বিশ্বাস করি, লেখকের কাজ কিন্তু ফুরিয়ে যায় লেখাটি শেষ হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে। এরপর সেই লেখা পুরোপুরি পাঠকের। বলতে পারেন লেখক খুব সচেতনতার সঙ্গেই নিজের বিশ্বাস এবং দর্শন পৌঁছে দেন পাঠকের কাছে। আপনি খেয়াল করবেন, লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশেলে একটি লেখা যখন পাঠকের জীবনবোধের সঙ্গে মিলে যায়, লেখাটি ঠিক সেখানেই সামষ্টিকভাবে পরিপূর্ণতা পায়।

গল্পপাঠ :
আপনি যদি আপনার পাঁচটি গল্পসংকলন, রসুইঘরের রোয়াক এবং প্রথম উপন্যাস নিহিত আগুনদিনকে পাশাপাশি রাখেন, তাহলে লেখক হিসেবে আপনার যাত্রাপথে স্পষ্টভাবে কী পরিবর্তন দেখতে পান?

স্মৃতি ভদ্র : 
কঠিন প্রশ্ন! সেই আবার নিজের বিশ্বাসের কাছেই ফিরি। প্রতিটি লেখক যখনই লিখতে বসেন তখনই তার সেরা লেখাটিই লেখার প্রত্যাশা করেন এবং এই প্রত্যাশা থেকে যায় লেখকের শেষ লেখাটি পর্যন্ত—আমি এটা বিশ্বাস করি। তাই লেখকের উত্তরণ কিংবা লেখকযাত্রার পরিবর্তন যেভাবেই বলুন না কেন, তা আসলে প্রতিদিনই ঘটে প্রতিবারই ঘটে। লেখকের কলম লেখকের অগ্রযাত্রার রেখা এঁকে যায় তার বুকের কালির সবটুকু বিন্দু দিয়েই। আর স্পষ্ট পরিবর্তন বলতে হলে বলা যায় আমার প্রতিটি লেখাই লেখক হিসেবে আমাকে আমার সীমা ভাঙতে শেখায়।

গল্পপাঠ : 
আপনার রসুইঘরের রোয়াক বইটিতে আমরা পরিবারের রন্ধনসংস্কৃতি ও নারীদের অভিজ্ঞতার আভাস পাই। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটিতেও কি আমরা নারীর অভিজ্ঞতা বা গৃহভুবনের কোনো প্রতিফলন দেখতে পাবো?

স্মৃতি ভদ্র : 
রসুইঘরের রোয়াক এবং নিহিত আগুনদিন বই দুটোর ঘরানা ভিন্ন। একটি বই নির্দিষ্ট সময়ের সমাজকে বয়ান করে। কথক হিসেবে আছে একজন কন্যাশিশু। কন্যাশিশুর চোখে দেখা জীবনের অন্দরমহলের কথা রসুইঘরের রোয়াক। আর নিহিত আগুনদিন একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। তাই উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে সঙ্গে রসুইঘরের রোয়াক-এর কোনো প্রভাব থাকবে না, এটাই মনে হয় ঠিক।

গল্পপাঠ : 
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য লেখা হয়েছে। আপনার প্রথম উপন্যাস সংশ্লিষ্ট ইতিহাসের কোন দিকটিতে নতুন আলোকপাত করছে বলে মনে করেন?

স্মৃতি ভদ্র : 
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য লেখা হয়েছে। আমি চাই আরও অগণিত লেখা হোক। কারণ মুক্তিযুদ্ধই আমাদের মুক্তির হাতিয়ার। আমি চেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের গতানুগতিক পটভূমির বাইরে গিয়ে একটা ভিন্ন পটভূমি রচনা করতে, যা অবশ্যই বীরাঙ্গনাদের জীবনভর মুক্তিযুদ্ধকে বহন করে যাওয়ার সত্যকে উন্মোচন করে।

গল্পপাঠ :
লেখক হিসেবে আপনি কি মনে করেন, সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ এখনো আমাদের সাহিত্যিক কল্পনায় সম্পূর্ণভাবে উঠে আসেনি, অনেকটাই অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে?

স্মৃতি ভদ্র : 
হ্যাঁ সে তো অবশ্যই। প্রথমেই জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধ আসলে কী। আপনি যদি মুক্তিযুদ্ধকে শুধুই একাত্তরের নয় মাস কিংবা ছেছট্টি, উনসত্তরের ধারাবাহিকতা মনে করেন, তবে তা আংশিক। মুক্তিযুদ্ধ শুধু দেশ নয় জাতিসত্তার জন্য লড়াই। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াই। স্বাভাবিকভাবেই তাই মুক্তিযুদ্ধ বিস্তারের প্রেক্ষাপটও বিপুল। সেই বিপুলতার খুব ক্ষুদ্র একটা অংশই উঠে এসেছে আমাদের সাহিত্য কল্পনায় আজ অবধি।

গল্পপাঠ : 
উপন্যাসের পাশাপাশি এ বছরই ‘জননীর নাভিমূলে গাঢ় হয় লাঞ্ছনার ক্ষত’ শিরোনামে আপনার একটি গল্পসংকলনও প্রকাশিত হচ্ছে। এমন নামকরণের পেছনে কোনো বিশেষ ভাবনা কি আপনাকে আলোড়িত করেছে?

স্মৃতি ভদ্র : 
লেখক মাত্রই সংবেদনশীল—এটা আমি বিশ্বাস করতে চাই। তাই আমার মাতৃভূমির এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমাকে ভাবাবে, কাঁদাবে, আক্রান্ত করবে এটা খুব স্বাভাবিক। আমার গল্প সংকলের নামকরণ এই সময়ের দেশ নিয়ে মূলত আমার মানসিক অবস্থাকেই প্রতিভাত করে।

গল্পপাঠ : 
বর্তমানে আপনি কোন ধরনের লেখায় ব্যস্ত রয়েছেন?

স্মৃতি ভদ্র :
এই সময়ে একটি উপন্যাস লিখছি। মানবিক সম্পর্কের নানা দ্বন্দ্ব নিয়ে উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পটভূমি যখন নব্বই দশক তখন অবধারিতভাবেই বিষয়বস্তুতে নব্বই দশকের পরিবর্তিত সমাজ ও গণঅভ্যুত্থান সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আসলে নব্বইয়ে রাজনৈতিক গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে খুব নীরবে আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায়ও একটা অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিলো। যেটা হয়তো নানাভাবেই অগোচরে থেকে গেছে লেখালিখিতে। আজকের এই বাংলাদেশকে বুঝতে হলে আমাদের অবশ্যই ফিরে দেখতে হবে নব্বইকে। মূলত সেটাই চেষ্টা করছি। লিখছি নব্বই নিয়ে বিস্তারিত। ·


সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : ডিসেম্বর, ২০২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ