দুজন ভরপেট মদ গিলেছে। হরিহরণ ডোম আর তার শিষ্য চ্যাংটা ডোম। খুন করে গলায় ইটের বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দেয়া সাতদিনের মড়া ঘাড়েগর্দানে এক জবরদস্ত নেতা। পানিতে পচে ফুলে আরও ঢোল হয়ে উঠেছে। সেই বডি কেটেকুটে সব জুৎ করে রাখতে আজ বড় কসরৎ করতে হয়েছে। এখন মদ খেয়ে কাঁচা গাঁজা পাতার খিলিতে কটা চাবানি দিয়ে ঘণ্টাখানেক দম বেঁধে রাখলে তবে শরীলে আবার তাকদ আসবে।
হরিহরণের উনিশকুড়ি বচ্ছরের ডোম জীবনে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চ্যাংটা হলো গিয়ে চৌদ্দ নম্বর। কোনো শিষ্য-স্যাঙাতই এই মড়াকাটা ঘরে বেশিদিন থাকেনি। বেশিরভাগই টেম্পোরারি। আজ আসে কাল যায়। কয়েকটা আছিল ডরপুক। লাশের উল্টানো চোখ দেখে ডর খাইতো। নয়তো আছিল ল্যাকপ্যাকা। একশ বচ্ছরের ভোঁতা যন্তরপাতি দিয়ে গরু কাটার মত গায়ের পসিনা ঝরিয়ে তবে মড়া কাটতে হয়। সেই তাকদ সবার থাকত না। দুজন স্যাঙাত পেয়েছিল মুসলমান। দুজনই অল্পবয়সী ছোকরা। একজন তিন বছর কাজ করেছে, অন্যজন বছরখানেক। ওরা চলে গেল সামজিক মর্যাদার ভয়ে। বিয়ে করতে মেয়ে পায় না। বলে লাশঘরের ডোম। অচ্ছুৎ। কে ওদের কাছে মেয়ে দেবে! তয় হরিহরণের এসব কোনো হ্যাপা নেই। কেয়ারও করে না। হরি কখনও কারুর শিষ্যগিরিও করেনি। একবারেই ছুরি-কাঁচি, দা-কুড়ুল, হাতুড়-বাটাল নিয়ে বাপের ব্যাটার লাখান প্রধান ডোম হিসেবে মড়াকাটা ঘরে ঢুকে পড়েছে। জবর তুরন্ত লাশ কাটতে পারে হরি ডোম। চোখের নিমেষে একেবারে চালকুমড়োর মতন ঘ্যাচ করে টুকরো হয়ে যায়। এক ডাক্তার সাব তাকে বলেছিল, তু আগে কা ডাকাত রহেলি নি হরি? চালকুমড়োর ইসন আদমীকের বডি টুকরা টুকরা কইরে ফেলতে পারিস বা! এটা অবশ্য হরিহরণের ভাষ্য। ডাক্তার নিশ্চয়ই হরি ডোমের ভাষায় কথা বলেননি!
হরি ডোম বটে, তবে তার বাপ পরান বাগদির সাত পুরুষেও কেউ কোনোদিন ডোমগিরি করেনি। গাঁয়ে থেকেছে। মাছ ধরেছে। গাছ কেটেছে। ঝুড়ি আর চাঙারি বুনেছে। তবে পরান জোয়ান হয়ে উঠতেই নমশুদ্রপাড়ার বনমালী বাঁশফোরের সুন্দরী মেয়ে সুমোলীকে মনে ধরে যায়। একদিন গোপনে দেবতাকে দুধ নারকেল আর এক ছিলিম তামাকু ভেট দিয়ে সুমোলীকে বিয়ে করে ফেলে। এই অপরাধে পিতামো চৈতন বাগদী ছেলেকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
বাপ স্সালে হামার মরদ আছিল। বউ সুমোলীকে নিয়ে সে শহরে চলে আসে। কিন্তু গাঁয়ের সেসব কাজ কি আর শহরে মেলে! রেল কলোনির বস্তিতে থেকে তার কজন ডোম হাড়ি শিষ্য সাঙাৎ জুটে যায়। তো হামার ডোমনি মা তখন বলেছে, উকনিসন কাম করো না কেনে! কাম তো কামই! সব কামেই ভগবান আছে! তো পেশা বদলে ফেলে পরান। হাসপাতালের গু-মুত ময়লা আবর্জনা সাফাই করতে করতে ধীরে ধীরে মর্গে মড়া নামানোর কাজ নিয়েছে। তারপর কবে কখন কেমন করে মড়া কাটায় পরান বাগদী দক্ষ হয়ে উঠেছিল সে নিজেও জানে না। কাজের ফাঁকে ছেলে হরির কাছে পরান এসব গল্প করত। সেই বাপেরই তো ব্যাটা! ডোম্বী মায়ের দুধ খাওয়া জমাটি শরীল! তো হরি চালকুমড়ার লাখান মড়া কাটবে না তো কাটবে কি ঐ হাড় ডিগডিগ হেঁপো রোগী রমেশ মুচি? হরিহরণ জানে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে বডির কোনখানে কী কারিগরী করতে হয়। প্রথমে লাশের বুকের মাঝখানে তেলতেলে কচি পানপাতার মত কলজে-কড়া জায়গাটাতে ভোজালিটা খাড়া রেখে বাঁটের ওপর ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে খুট করে একটা কৌশলী বাড়ি মারলেই ভস করে ঢুকে যায় আগাটা। তারপর পাঁজরের কয়েকটা জোড় ছাড়াতে গুনে গুনে কয়েকটা বাড়ি। এর পরে তো ভাঁজ করা কাপড় ছেঁড়ার মতই ফড় ফড় করে আপনা-আপনিই নাভিতক ফেঁড়ে যায়। ফাড়া বডির ভেতর থেকে অবাক চোখে বাইরের দুনিয়া দেখে হার্ট, লাংস, কিডনি, লিভার কতরকম যন্তরমন্তর!
হরিও আগে অবাক চোখে দেহের কুঠরিতে লুকোনো এইসব যন্তরমন্তর দেখতো। সে যখন একেবারে ছোট ছিল, দশ কি এগারো বচ্ছর বয়স, বাপ পরান বাগদির সাথে চাঙারি নিয়ে সরকারি হাসপাতালের ময়লা সাফ করতে যেতো। বাপ ঢুকে যেত মড়াকাটা ঘরে। টুকরি আর আঁকশি ছেলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতো, লে স্সালে বাগদীর পো, এইসন তু মুওলের গু সাফ কর, আমি এট্টু ভুতের মুত খাই! বাপ বোতল খুলে ভূতের মুত খেয়ে ঠাং ছড়িয়ে জড়ানো গলায় গানা গাইতো। হরি মড়ার গু সাফ করতে করতে অবাক নয়নে বাপের স্যাঙাৎদের কামকাজ দেখতো। ফড় ফড় করে মরা মানুষের বুক কাটে। বেল ফাটানোর মতন করে বাটাল দিয়ে মাথা ফাটিয়ে যন্ত্রের আগা দিয়ে চাড় মেরে খুলে ফেলে খুলি। মাঝে মাঝে সুইটা সুতোটা জলের ঘটিটা এগিয়ে দিয়েছে। এই করতে করতে হরিহরণ বাগদী একদিন হরি ডোম হয়ে ওঠে।
তো সেই হরি ডোম পাঁইতিরিশ বচ্ছরের মুশকো জোয়ানটা হয়ে উঠলে পরে একদিন মুচিপাড়ার বংশী মুচির ড্যাকরা বউ সতীকে বিয়ে করে ফেলে। সতী সতীলক্ষ্মী বধূর মতই সোয়ামী বংশীকে রাত্তিরে ঘুম থেকে ডেকে তুলে পেন্নাম ঠুকে বলে, হম হরির কনিয়া হবেকসে যায়লেবানী। তু হমনিকে ছোড় দিগল বা। তার বাদে তু আর কাউকে বে করে লিস। তোর জোয়ানকি আমার পুষাবে না বাপু। তিন বচ্ছরে একটা ছ’ল দিতে পারলি না প্যাটত। হামার প্যাট কি খালি শুওরের লাখান ভাত ঢুকানোর জন্যি!
সতী হরির বউ হবার জন্য বংশীকে ছেড়ে চলল। বংশী তাকে ত্যাগ করুক! বংশী দু হাতে ঘুমচোখ ডলে সতীর এসব কথা শুনল। তারপর পাছার জোড়া ফুটবলে দুটো রাম লাথি মেরে সতীকে ঘরের বাইরে বের করে দিয়ে বলে, গোওল! ইবার যা, তুর ভুদাতে কার ধোন ঢুকোবি, ঢুকো মাগি। উহ শুয়োরকে হম দেখ্ লিয়েব্!
একদিন একখানা ইট ভাঙা হাতুড়ি হাতে করে দেখে নিতে গিয়েও ছিল বংশী। তবে সেই ‘শুয়োরকে’ দেখে আর ফিরে আসতে পারে নি। বংশীর হাতের হাতুড়িখানা উল্টে বংশীরই মাথা ছেঁচে দিয়েছে। কীভাবে উল্টোলো কে জানে! অন্ত্যজ পাড়ায় এইসব মারামারি খুনোখুনি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
তবে সতী বিড়বিড় করে বলেছিল, হম তো আচ্ছাসে বাত বোলে তুহকে ছোড় দি আয়লেবানী। উ মরদ তো হমনিকে ভাগায় লি আসেনি! খামুখা জানটো দিলি কেনে বংশী! সবশেষে দু ফোঁটা চোখের জলও ফেলেছিল। আর লাশকাটা ঘরে বড় যত্ন করে বংশীর বুক ফেড়েছিল হরি। পেটের থলি ভরা ছিল পচা চোলাই। থুক করে একদলা থুতু ছুঁড়ে বিকৃত মুখে হরি বলে উঠেছিল, স্সালো, প্যাট তো লয় ভুতের মুতে ভরা এট্টা ডেরাম। কাজেই বংশীর মত বেহেড মাতালগুলো নিজেরা নিজেরা খেয়োখেয়ি করে মরবে এর আর তদন্ত করার কী আছে। বংশী সেলাই হয়ে নগরির আউটফলের ওধারে শ্মশানে চলে যায়।
দুই.
সতীকে নিয়ে হরির জীবন বেশ একরকম চলে যাচ্ছিল। প্রেম নয় সচ্ছলতা নয়, তবে সতীকে নিয়ে সুখ ছিল হরিহরণের। ডোম জীবনে সচ্ছলতা কী জিনিস তারা জানে না। তার জন্য হা-হুতাশও নেই। দু বেলা দুটো দানাপানি পেলে আর মড়া কাটার সময় পেট ভরে মদ, মুখ ভরে পানজরদা খেতে পেলেই হয়ে গেল। তবে সতীর নানারকম খাঁই আর চাই ছিল। তার আঁটসাট দেহটি যেমন জোয়ান মরদ হরিহরণের পেষণ খেতে চাইতো। তেমনি মনখানাও নানা কিছু চাইতো। তার মধ্যে ছিল একটু ভদ্দরলোকের মত বাঁচার খায়েশ। হরিকে লাগাতার খোঁচাতো এই জেলাশহরের প্যাঁচপেচে মড়াঘর আর মুচিবস্তি ছেড়ে রাজধানীতে গিয়ে ওঠার জন্য। ওখানে মেডিক্যাল কলেজ বা বড় কোনো হাসপাতালে কাজ করবে। লোকের কাছে বলতে পারবে সোয়ামি হাসপাতালের স্টাফ। মড়াকাটা ডোমের অন্ত্যজ পরিচয় জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাইতো সতী। ভোটের শুমারি কাগজে অন্ত্যজ সম্প্রদায় লেখা খোপে টিক মারতে বড় রাগ হত। এত খোপ কেনে বাপু! তুলোগসে আদমীসন, হমনিকে আদমীসন। তোমারাও মানুষ আমরাও মানুষ, নাকি! হমনিকের তন কাটলেসন খুন কা বাইরব্ নত্? আমাদের শরীল কাটলে কি রক্ত বেরয় না, নাকি ভূতের মুত বেরয়? তা হলি? এত খোপে খোপে ভাগ করে মানুষ রাখা কেনে?
সতী ইসন বাত বুলওয়ালে পারেক হ। ঠিক! সতী এসব কথা বলতে পারে বটে। জবরদস্ত মাইয়া আছিল সতী! উচিত কথা কইতে ডরাতো না কখুনু। উ তো জবর সুফলা মাইয়ালোকও আছিল! তা না হলে বংশীর বাঁজা বউটা হরির ঘরে আসতে না আসতেই পটাপট তিনখানি ছানাপোনা দিয়ে ফেলেছিল কীভাবে! প্রথম দুটো মেয়ে পরেরটা ছেলে। লোকে বলতো সতীর প্যাটের মাটি এতকাল খরখরে হয়ে ছিল। নিমরদ বংশী রস ঢালতে পারেনি। তাই ফলন হয়নি কো। হরি যেমুন রস খায় তেমুন ঢালতেও পারে। বউটোক লাগাতার গাভিন করে রাখে! তো তিনটা ব্যাটা হইলি না ভালো হইত। তিনগো ডোম পায়লেবারো। সোয়ামির জোয়ানকি আর কদিন!
তিনজন ডোম পাইতি! বটে! ডোম হওয়ার কথা শুনলে সতী চলা ফাড়ার কুড়ুল নিয়ে দৌড়ে আসে। মর মড়াখেগো ডোমের পুতেরা! আমার বাছারা ডোম হতে যাবে কোন দুঃখে। উকনিকে হম ল্যাখাপড়া শিখামো। ডাকদর বানায়েব। উকনিসন মওলে আদমী কাটকে লাগোক জনম লিয়ে নেইখে রেহে। ওরা মরা মানুষ কাটার জন্য জন্মায় নি। অরা মানুষ বাচাইবার জন্যি কাম করবো।
প্রথম প্রথম মুচি পাড়ার লোক সতীকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করতো। পরে বস্তির কাছেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি এনজিও স্কুল চালু হলে অনেকেই তাদের ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিতে শুরু করলো। নিজের ছেলেমেয়ের জন্য জান দিয়ে খাটতে লাগলো সতী। এলাকার শিশু হাসপাতালে সুইপারের কাজ করতো সতী। ফাঁকে ফাঁকে রাস্তাঘাট নির্মাণে বা বিলডিং কনস্ট্রাকশনে যোগালির কাজ করতে শুরু করে। ছোট খোকাটিকে গামছা দিয়ে পিঠের সাথে বেঁধে অনায়াসে গোলানো কংক্রিটের কড়াই বা এক পাঁজা ইঁট মাথায় তুলে নিয়ে বাঁশের মই বেয়ে উঠে যেতো। অন্য যোগালিরা সাবধান করতো। কবে পোলা নিয়ে ধড়াম করে পড়বি। তখন বুঝবি! বাচ্চাটাকে ঘরে রেখে এলেই তো পারিস মাগি!
খেপে যেত সতী। খোকাক ঘরকে থুয়ে আসলে কি মোর দুধ দুটাও কেইটে দিয়ে আসবো, না কোনো দুধাল মাগি গিয়ে উক মাই খিলায়ে আসবে বলো! একটা ছ’ল আমার, উর কোনো অযত্ন হতি দেবো না।
তা অযত্ন হয়নি ঠিক। মায়ের পিঠে গামছার খোড়লে বাঁধা থেকে থেকে আর ঘোঁত ঘোঁত করে বুকের দুধ চুষে ছেলেটা ফনফন করে কলার থোড়ের মত বেড়ে উঠছিল। কিন্তু একদিন বৃষ্টির পরে পিঠে ছেলে আর মাথায় ইঁটের বোঝা নিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে চারতলার পিছলা মই থেকে পা হড়কে নিচে পড়ে গেল সতী। এক বছরের ছেলেটার মাথা ইঁটের ছ্যাচা খেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই থেতলে গেল। সতীর কোঁকসা দিয়ে ঢুকে গিয়েছিল অসমাপ্ত পিলারের দুটো রড। কোমরও ভেঙে চৌচির। মাসখানেক হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কোঁ কোঁ করে কাঁদতে কাঁদতে একদিন সতী মরে গেল। ভবন মালিক সাহায্য হিসেবে সামান্য কিছু টাকা দিয়েছিল। হরি সে টাকা দিয়ে একদিন দুই মেয়েকে নিয়ে কোর্মা পোলাও দই মিষ্টি খেলো। মেয়ে দুটোকে মার্কেটে নিয়ে গিয়ে ভালো জামাকাপড় কিনে দিল, হলে গিয়ে বায়োস্কোপ দেখলো। তারপর দুই বগলে দুটো মদের বোতল আর ঠোঙায় ঝাল চাট কিনে ঘরের পেছনে বুড়ো জাম গাছটার নিচে ‘উ রে সালো সতীর বাচ্চা সতী, তু কাহা গেইল রহল হ! তু কাহে মওলমে গেইল রহলে ও হারামজাদী’ বলে বিলাপ করে কাঁদতে বসে। গলার খোড়লে পচাই ঢেলে গরগর করে হরি, তু মরলি মরলি হামার ছ’লটোক কেনে পিঠে লিয়ে মরলি। তু উক প্যাটে লিয়ে মরতি পারলি না শুয়োর কাহিঁকা...।
লোকে বলতে লাগলো, ঠিক, জরু গেলে জরু মিলে কিন্তু ছেলে গেলে তো ছেলে মিলবে না! হরিকে কাঁদতে দাও।
হরি ছেলের জন্য কেঁদেছিল আবার বউয়ের জন্য একরকম খুশিও হয়েছিল। বউটা আহত হয়ে হাসপাতালে ভুগে মরেছে। তাই ওর কোনো ময়না তদন্ত লাগেনি। সতীর দেহ কোনো ডোম চাড়ালের ছুরির তলায় পড়ে ফালাফালা হবে, এ যেন হরি ভাবতে পারে না। মনে মনে বলে, হাসপাতালের বেডে শুয়ে সুখেশান্তিতে মরেছিস, খুব ভালো করেছিস বউ!
সতী মরার পরে ছোট ছোট মেয়ে দুটোই হরির সংসার সামাল দিতে লাগলো। সবিতা আর রঞ্জিতা। সতীই নাম রেখেছিল মেয়েদের। মেয়েদের নাম শুনে পাড়ার নারীরা মুখ বেঁকিয়েছে। উঁহ! নাটুক নভেলের নাম রাইখ্যাছে। কোথায় মেয়েদের নাম হবে সোনা-গেন্দি-পেঁচি-ধুমালি-সন্দা-নেকু-সতী-লক্কি-পদ্মা-তুলসী, তা না ছবিতা, লঞ্জিতা! তা হোক, সন্তানের নাম রাখার অধিকার বাপমায়ের আছে বটেক। যা খুশি রাখতে পারে। তবে সীতা চেয়েছিল ছেলেমেয়েদের সুন্দর নাম সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ওদের নাম শুধু পাড়ার মানুষের মুখে বিকৃতভাবে ডাকার জন্য নয়, স্কুলের খাতায় ওদের নাম থাকুক। সেখানে শুদ্ধভাবে ওদেরকে ডাকা হোক। লেখাপড়া শিখে বড় হোক ওরা।
প্রকৃতির নিয়মে বড় হতেও থাকে সবিতা আর রঞ্জিতা। বারো ছাড়িয়ে তেরোয় পড়তেই সবিতার পা জোড়া ডাহুকের মত লম্বা হয়ে ওঠে। সারা মুখে কচুরি ফুলের মতো টলমলে রঙের ঝলক। ওকে মনে হয় বিলের জলে দাঁড়িয়ে থাকা এক জলকুহকী কালো পাখি। রঞ্জিতা এখনও ছোট। উঠোনে চাটাই পেতে বসে মাথা দুলিয়ে কয়ে আকার কা খয়ে আকার খা শেখে। হরিও মাঝেমধ্যে বসে মেয়ের পড়া দেখে। আর ধাম করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। লোকে বলে, অরে হরি, তু আর এট্টা বে করে লে না রে! লতুন মা এসে চেংড়ি মেয়ে দুটাক দেখবে। মেয়েরা বড় হচ্ছে। দেখশুন করার জন্যি ঘরে তো এট্টা মা লাগে। না হলে মাস্তান শুয়োরগুলোর নোলা শকশক করবে। শকুনগুলো খাবলা মারবে!
এসব শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যায় হরির। বল্লমের মতো খাড়া হয়ে যায় দেহ। পারে তো ঝাঁপিয়ে পড়ে মন্তব্যকারীর কলজে এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে দেয়। মুখ তেতো করে বলে, হুয়, কনিয়া সে তনমের পিরান। একটা ছিঁড়ে গেলে দুকান থনে আর একটা কিনে লে আসা যাবে! তুগের লেওড়া প্যাচাল শুনে আমার গাও জ¦লে।
আরে গাড়ল হরিটা বলে কী! বউ কি গায়ের জামা নাকি... একটা ছিঁড়ে গেলে দোকান থেকে আর একটা কিনে আনা যাবে...! আরে স্সালা বউ তো তেমনই! একটা গেলে কেন, একটা থাকতেও গায়ের পিরানের মত দুটো কিনে আনা যায়। একটা বউ থাকতেই দুটো বে‘ করা করা যায়, একটা বউ ত্যাগ দিয়েও আর একটা বে’ করা যায়! দুটো ট্যাকা হলে দু খিলি পান দিয়েই তো এট্টা বউ লিয়ে আসা যায়! মেয়ের কি অভাব দ্যাশে? খালি কি বউ? ভাতারও তো একটা ফেলে দিয়ে আর একটাকে বে করা যায়! কেনে সতী করেনি? বংশীকে ছেড়ে হরির কাছে আসে নি?
সতীর কথা শুনলে দুঃখ বেড়ে যায় হরির। সতীর তো হরির জন্যই জন্ম হয়েছিল। ভগবান ব্যাটা ভুল করে বংশীর ঘরে ঢুকিয়ে দিইছিল ওকে। পরে ভুল শুধরে ওকে আবার হরিকে দিয়েছে। সতী-বিনে-পতি হরি দুঃখে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে কদিন। তারপর আবার কাজে নামে। মেয়ে দুটোর কথা তো ভাবতে হবে! সতীর মেয়ে দুটো! সবিতা আর রঞ্জিতা! ইশকুলে সবিতা ভালো লোখাপড়া করে। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়েছে। এবার অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি পাওয়ার লাগি ধুমছে ল্যাখাপড়া করছে মেয়েটো। স্বল্প পাওয়ারের বালবের আলোয় পাঠরত সবিতার কিশোরী মুখটা দেখে হরির বুক থেকে ধাপ করে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়। একেবারে হরির ঠাকমার মুখটা কেটে বসানো সবিতার মুখে। ঠাকমা মীনাক্ষীবালা দাসী ছিল বীরভূমের কোনো এক গাঁওলি প্রধানের নাতনী। চকচকে কালো গাত্রবর্ণ আর পাথর কুঁদে বানানো খাড়া নাকনকশার সাথে কালো দিঘীর মতো এক জোড়া চোখ। সারা মুখ সেই চোখের আলোয় ঝকঝক করে। মেয়েকে নিয়ে ভয়ও পায় হরিহরণ। বয়সের তুলনায় মেয়ের বাড় বেড়েছে। চ্যাংটা খালি বলে, সবিতাক বে দিয়ে দাও গুরু। উ মেয়েকে ঘরে রাখতি তুমার সমস্যা হবে। কেমুন ফনফন করি দামায়া উঠতিছে মেয়েটা। দেবা নাকি? জমি আছে আমার! কেলাশ এইট তক ল্যাখাপড়াও করেছি আমি। এক জোড়া ভেড়াভেড়ি আছে। একখানা টালির ছাপরাও আছে। সব সবিতাক লিখে দেমো। কী বল গুরু?
বিয়ের কথা শুনলে হরি চ্যাংটাকে তেড়ে মারতে আসে।
হামার বেটির দিকে আখ নেইখে দিস, আখ দিবি তো ইসন ভোজালিমে তুহার দুগো আখ হম উখড়ে লিয়েব্ হ। উ হামার বেটি নেইখে বায়, সতীর লেইকী। সতীর বেটি ডাক্তার হবেক্। সতীর বেটি তুহর মতন ডোমের লাগোকে জনম না লিয়ে রহে।
হাতের ভোজালিটা চ্যাংটার কপালের কাছে দুবার ঘূর্ণি তুলে কথা শেষ করে মেঝের ওপর ঝনাৎ করে ছুড়ে মারে হরি। চ্যাংটাই আবার তা কুড়িয়ে আনে।
তিন.
লাশকাটা ঘরটির পেছনেই একটা বাতিল চৌবাচ্চা।
একসময় এটার চারপাশে পানির কল লাগানো ছিল। চাবি টিপে দিলে চারদিক থেকে প্রবল বেগে পানি পড়তো। ভিসেরা কাটা বাছা ধোয়া মোছার জন্য পানি লাগতো। এখান থেকেই পানি নেয়া হত। এখন লাশকাটা ঘরের ভেতরেই এক পাশে সারিবাধা পানির ট্যাপ আছে। পানির চৌবাচ্চাটি এখন শুকনো ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মরা কুকুর বিড়াল ইদুর ছুঁচোর সাথে মানুষের হাতের আঙুল পায়ের পাতা মাথার খুলি ফাটানো চামড়া এমন কি অণ্ডকোষও এই চৌবাচ্চার আবর্জনায় পচেগলে সার হয়। লাশ প্যাচানো হোগলা চট, কাপড়ের ন্যাতা, দড়াদড়ি, গা থেকে ফেঁড়ে কেটে খোলা জামাকাপড়ের বর্জ্যের ডাঁইও এখানে জমে ওঠে। বহুদিন পর পর হয়তো জমাদারের ঠেলা এসে আবর্জনাগুলো নিয়ে যায়। বেশিরভাগ পড়েই থাকে। কাকচিল এসে মচ্ছব করে। এই ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে গিয়ে চ্যাংটা সেদিন চেঁচিয়ে সাত পাড়া এক করে।
রাতের আঁধারে ত্যানা মোড়ানো একটি সদ্যোজাত শিশু ফেলে গিয়েছে কেউ। এই লাশকাটা ঘরটি তেমন সুরক্ষিত না। এখানে কোনো সিকিউরিটি নেই। মেইন গেইটে একটা তালা থাকে বটে তবে সেটা খুলে নেয়া কোনো ব্যাপার না। আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকা শিশুটির নাকেমুখে পিপড়ের মিছিল। নাড়ি কাটাও হয়নি। চ্যাংটা একটা বাঁশের লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শিশুটিকে কাপড়ের পুঁটলি থেকে বের করে ফেলে। ছেলে শিশু। ভিড়ের মধ্য থেকে হঠাৎ হরি আবর্জনা থেকে শিশুটিকে তুলে নিয়ে দৌড়াতে থাকে। সোজা হাসপাতালের শিশু বিভাগে। জান আছে বাচ্চাটির! বাঁশের খোঁচা খেয়ে শিশুটির বুকের মাঝখানে জান-কড়া পিচ্ছিল জায়গাটুকুতে একটা কম্পন জেগেছিল। হরির চোখে পড়েছে। মানব দেহের বুকের মাঝখানে ঐ জায়গাটা বড় দামী, বড় রহস্যময়। ওখানে যেন প্রাণের বীজ লুকোনো থাকে। প্রাণ না থাকলে ঐ জায়গাটি কেমন ধু-ধু করে। লাশ কাটতে গিয়ে বুকের ঐ পিচ্ছিল জায়গাটির আদি অন্ত চেনে হরি। হরির প্রথম বাচ্চা সবিতা জন্মের পর বুকের ঐ জান-কড়া জায়গায় আদর করে হাত বুলোতে গিয়ে দেখেছিল ওখানে একটা লালচে ছায়া। জন্মদাগ ভেবে নিয়েছিল। সবিতা বড় হতে হতে ঐ লালচে দাগ একটা লাল গুবরে পোকার মতো জড়ুুল হয়ে ওঠে। মেয়ে একটু বড় হয়ে বাপকে বুক এগিয়ে দিয়ে আধো আধো গলায় বলতো, নাল দুদু খা বাপু!
শিশুটি বেঁচে গেলো। পত্রিকায় নিউজ হলো। ছবি ছাপা হলো। হরির কোলে মর্গের ডাস্টবিনে ফেলে যাওয়া মৃত শিশু, যে পরে বেঁচে উঠেছে। কদিন হরিকে নিয়ে সাংবাদিকদের বেশ আউতি যাউতি চললো। সাক্ষাৎকার নেয়া হলো। হরি শিশুটিকে বাঁচিয়ে তোলার বিনিময়ে কী চায়। হরি আর কী চাইবে? তার কাজ তো মড়া লিয়ে! মড়াকাটা ঘরটা সরকার ভালো করে দিক! ফিরিজগুলা ভালো করে দিক। মড়া থুবার জায়গা নেই। যন্তরপাতি দিক। দাদা পরদাদার আমলের পুরোনো ছুরি কাচি দিয়ে দিয়ে তো কচু গাছও কাটা যায় না। তায় আবার মড়া! এই তো! আর একটা কথা! কেউ যেন মড়াকাটা ঘরে জ্যান্ত মানুষ থুয়ে না যায়। মানুষ তো মানুষ! তাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে পারে কীভাবে?
কাজের সময় মাঝে মধ্যেই শিশুটির চেহারা হরির চোখে ভেসে ওঠে। সাদা পলিথিনের মতো ফ্যাকাশে চামড়ার ফোলা মুখ। চোখে নাকে ঠোঁটে লাল পিপড়ের মিছিল। চোখের পাতাও খেয়ে ফেলেছিলো পিঁপড়েরা। উকর লেইকাকের মতন ছোওয়ার সুরত। বিড়বিড় করে হরি। হ্যাঁ, তার খোকাটির মতই বাচ্চাটার চেহারা। কার প্যাট খসালো কে বলবে! আহ! কী শকুন গো মানুষগুলা! কা গিদসে আদমীসন! বাচ্চাটার দোষ কী? উক তুরা জ্যান্তই মড়াকাটা ঘরে ফেলে গেলি! মড়া মানুষ আর জ্যান্ত মানুষে কোনো তফাত নাই?
কদিন মাথাটা আউলা হয়ে থাকে হরির। চ্যাংটা বলে, বহুজি মরবার পরে তুমি বাউল হয়ে গেছ গুরু। মনটা নরম হয়ে গেছে। ইরাম হলে তুমি জলদি জলদি বুড়ো হয়ে যাবে! লাশ কাটতে হাত কাঁপবে। বুক কাঁপবে.... কথা শেষ করতে পারেনি চ্যাংটা, একটা রামগদা থাবড়া এসে পড়েছিল চ্যাংটার কাঁধে। হরি ডোমের হাত কাঁপবে লাশ কাটতে! আউর কৌনদিন এইসন বাত বলেলা তো, তুহর জিয়ত হাত হাম কাটল দেইব্।
কিন্তু যতই চ্যাংটার ওপর হম্বিতম্বি করুক না কেন, জোর কমছিল হরিহরণের। হরি সেটা মুখে স্বীকার না করলেও টের পাচ্ছিল। মাঝে মাঝেই পেটে একটা ব্যথা হয়। কাঁকড়ার মতে পেটের নাড়ি কামড় দিয়ে লটকে থাকে ব্যথাটা। একটানা বেশিক্ষণ কাজ করলে হাঁপ ধরে যায়। পানিপানতা আলুপোড়া শুটকিপোড়া খেয়ে শরীরটা যেন আর বশ মানছে না। হেঁদিয়ে পড়ছে। হেঁদিয়ে যে পড়ছে সেদিন ফ্রিজটা টান দিতে গিয়েই বুঝেছে। এখন হরি স্বীকার না করেলও মড়াকাটা ঘরের ফ্রিজটাই তার সাক্ষী।
কম হলেও পনর বচ্ছর আগের এক ধ্যাদ্ধেড়ে ফ্রিজ। প্রায় সময়ই এটা নষ্ট হয়ে যায়। চারটে মাত্র ড্রয়ার তার। এর মধ্যে সবচে নিচের ড্রয়ারে পাঁচ বৎসর ধরে রাখা আছে ফাঁস নিয়ে মরা এক ব্যবসায়ীর লাশ। দুই সংসারের ছেলেমেয়েদের মালিকানা-মামলার প্যাঁচে পড়ে লাশ দাফন করার অনুমতি মিলছে না। বছরের পর বছর ফ্রিজের একটা খোপে শুয়ে আছে মানুষ আকৃতির একটা বরফখণ্ড। আর-একটা ড্রয়ারে বর্তমানে এক বৃদ্ধের লাশ রাখা আছে। দুদিন পরে বৃদ্ধের প্রবাসী ছেলে দেশে আসবে। তখন লাশ বের করা হবে। তিন নম্বরটির তলা ক্ষয়ে গেছে। সেখানে বেশি হলে একটা ছোট শিশুর লাশ রাখা যাবে। সেদিন হরি উপস্থিত না থাকলে হয়তো ডাস্টবিনে পড়ে-থাকা শিশুটিকে জ্যান্তই এই খোপে ঢুকিয়ে ফেলা হত। একনম্বর খোপটি স্পেশাল। ওটা তালা মারা থাকে। হর্তাকর্তা কোনো ব্যক্তির সুপারিশে কারো লাশ রাখার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।
এর মধ্যে একদিন পুলিশ এলো। পাঁচ বছর ধরে মর্গে শুয়ে থাকা লাশটিকে এবার ময়না তদন্ত করতে হবে। ওটাকে বের কর। হরি আগে একটানে ড্রয়ার খুলে একলাই এক লাশ রফা করে ফেলতো। কিন্তু সেদিন বরফ জমে থাকা ড্রয়ারটি টেনে আলগা করতেই হরির ঘাম বেরিয়ে গেল। চ্যাংটা আর হরি দুজন মিলে যখন লাশটি বের করলো তখন হরির হঠাৎ মনে হলো লাশটি বুঝি দাঁত কেলিয়ে তার দিকে চেয়ে ভেংচি কাটছে! এসব আজগুবি হেলুসিনেশন হরিকে কখনও কাত করেনি। এমনও হয়েছে মড়া কেটে পেটের ভেতরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পলিথিনের ভেতর রেখে বুকপেট সেলাই করে ক্লান্ত হরি ফ্রিজে ঠেস দিয়ে বসে বিড়ি ধরিয়েছে। আর ধোঁয়ার খোঁয়ারিতে ড্রয়ারের ভেতর থেকে হালকা পায়ে বেরিয়ে এসেছে ফাঁসলাগানো লাশ। হরি আধ বোঁজা চোখে সেই লাশের সাথে বাতচিত করেছে। মাঝেমধ্যে বিড়িও সেধেছে। লোকটাকে নাকি তার শালা ষড় করে ফাঁসিতে লটকে দিয়েছে। তারপর তার সোনার দোকানের মালিক হয়ে বসেছে। বিড়িতে কয়েকটা লম্বা টান দেয়ার পরে মাথাটা সাফ হয়ে যেতো হরির। তখন দেখতো সব ফকফকা। ঘর জুড়ে একটাই জ্যান্ত মানুষ। সে হল হরি।
যাই হোক, হরি জ্যান্ত হলেও, দিন যত যাচ্ছে তত যেন মড়ার সাপ্লাই বেড়ে যাচ্ছে। গুম খুন বেড়ে যাচ্ছে। রেপ তো বছর জুড়ে চলে। কটা বডি আর এই লাশকাটা ঘরে আসে! গুম হয়ে যায়। ডোবা নর্দমায় পচে গলে মিশে যায় বা চিরকালের মত হারিয়ে যায় কোনো পাহাড়ে জঙ্গলে মাটির নিচে। হরিহরণের মনে হয় এখন যেন জ্যান্ত মানুষগুলোই মড়া। ওদের দেহের ভেতরে দিল বলে জিনিসটা যার সাথে লটকে থাকে, সে জিনিসটাই বোধ হয় নেই! জ্যান্তদের বডি কাটলে দেখা যাবে সেখানে হার্টটাই নেই । হার্ট থাকলে এক মানুষ আর এক মানুষকে এমন নিষ্ঠুরভাবে খুন করে কিভাবে? সেদিন একটা বালকের লাশ এসেছিল। দশ বছরের বাচ্চা ছেলে। রেপ কেস! নির্যাতন করে জ্যান্তই ছাদের পানির ট্যাংকে ঢুকিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দিয়েছিল। কয়েকদিনের গলিত লাশ। পায়ুপথ ছিন্নভিন্ন। সারা শরীরের চামড়া সেদ্ধ আলুর মতো আলগা হয়ে গেছে। দুর্গন্ধে তিষ্ঠোনো যায় না। ডিসেকশনের আগে গায়ের ওপর কন্টেইনার উপুড় করে ফিনাইল ঢেলে দিতেই ছেলেটার শরীর কেমন ফ্যাকাশে নীল হয়ে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বিশাল এক সামুদ্রিক পটকা মাছের মত ছেলেটার পেট যেন একটু নড়ে ওঠে। ছুরি হাতে মুহূর্তের জন্য চমক উঠেছিল হরি। বডিটার পেটের চামড়া ফেড়ে ফেলার পর। গল গল করে পানি বের হতে লাগলো। সারা ঘর ভেসে যাচ্ছে কিন্তু পানি পড়ার বিরাম নেই। হরি কাজ থামিয়ে বলে, কা হো লেইকা! পুরো টাংকি শুষে লিয়েছিলি ব্যাটা! তব্ প্রাণহো নেইখে জিয়ত রহল হ! এইসন মওল ধতরিমাসে তুহর আজাদি হকোল বা! মরণশীল পৃথিবী থেকে বাচ্চাটির নির্বাণপ্রাপ্তির দার্শনিক উক্তি শুনে চ্যাংটা ভালো করে হরিকে নজর করে বলে, ‘গুরু, তুমি তো ডোম থাকছো না, গৌতম বুদ্দু হইয়ে যাচ্ছো!’
তা হয়তো ঠিক। বয়সের সাথে সাথে হরি না চাইলেও তার ভেতরে যেন একটা কেমন-মানুষ ভর করছে। এই হরিই কি না চ্যাংড়া বয়স থেকে বাপের সাথে এসে লাশকাটার তালিম নিয়েছে। এই হরিকেই ডাগদর সাব বলেছিল ডাকাত। চালকুমড়োর মত বডি কাটে! সতীকে নিয়ে এই হরিই বংশীর সাথে লাঢ়াই করেছে! তারপর কীভাবে যেন বংশীর হাতুড়িটা ঠেকাতে গিয়ে ওরই মাথায় তুরন্ত এক ঘা বসিয়ে দিয়েছে! এই হরিই!
চার.
ভরপেট মদ গেলার পর হরির পেটের কামড়টা শুরু হলো।
আজকে চারটে লাশ অপেক্ষা করছে। ভ্যান থেকে একটা লাশ নামাতে গিয়ে ভকভকে দুর্গন্ধে হরির নাড়িভুঁড়ি যেন উল্টে আসছিলো। কবর খুঁড়ে লাশ তোলা হয়েছে। ফের ময়না তদন্ত লাগবে। বাকি তিনটে হোগলা মুড়িয়ে আপাতত লাশকাটা ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখা হয়ছে। এর মাঝে একটা আছে রেপ কেস। গ্যাং রেপ। রেপের পর এসিড ঢেলে মেয়েটার মুখ পুড়িয়ে দিয়েছে পাষণ্ডরা। ভিসেরা ব্যাগের ভেতরে রাখা আছে বডিটা। সবই জলদি লাগবে। জলদি কাটো। জলদি বের কর হার্ট লাংস কিডনি। নয়তো কেটে পলিথিনে ভরতে হবে স্টমাক বা লিভারের কোনো অংশ। আর মেয়ে-লাশটার বুক পেট জঙ্ঘা উরুসন্ধি ভালো করে দেখতে হবে। চিরতে হবে বুক। ওকে কি খাইয়েছে। স্টমাকে কি জমে আছে। ফুসফুস কি ফেটে গেছে! অনেক কিছু পরীক্ষা করতে হবে!
এসব ভাবলেই আজকাল বুক ধড়ফড় করে হরির। দুর্বল হয়ে গেছে হরি! কদিন বাসায়ও ঠিকমত যায় না। দুদিন আগে গিয়ে দেখে ছোট মেয়েটা রং চায়ে ডুবিয়ে শুকনো রুটি খাচ্ছে। সবিতা ঘরে নেই। পাশের ঘরের জগার মা বুড়ি বললো সবিতা ইশকুলের কোন গাড়িতে পিকিনিক করতে গেছে। তার বাদে অখনও আসেনিকো! এদানিং মেয়েটোর এট্টু আট্টু ফুটুনি দেখেছে হরি। দুই বেনি করে আগায় লাল ফিতের ফুল বানায়। ঠোটপালিশ লাগায়। আর বাপকে বলে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিতে। মোবাইল ফোন ছাড়া নাকি লেখাপড়া হয় না। সবিতার আবদার শুনে লাথি মেরে ভাতের হাঁড়ি উল্টে দিয়েছিল হরি। ডোমের বেটির শখ কত? তু ইশকুলমে যাতারো লোগ, যাতা! তার আবার এত ফ্যাচাং কিসের জন্য? মোবাইল কা পানকে বিড়া বা যো মোড়পর দোকানমে দো রূপিয়াসে কিনকেলিয়া হ!
মোবাইল মোড়ের দোকান থেকে দুটাকা দিয়ে পানের খিলির মত কিনে না নেওয়া গেলেও সবিতার হাতে তা চলে আসে! ছোট মেয়ে রঞ্জিতা বলে, দিদিকে তো অ্যাকজন মোবাইল কিনে দিইছে বাপু! মোবাইল লিয়ে দিদি পিকনিকে ছবি তুলবে। তারপর অনেক ছবি তুলে বাড়ি আসবে।
এসব শুনে ঘরের মধ্যে কতক্ষণ চেল্লাচেল্লি করে হরি। কিভাবে মেয়ের খোঁজ নেবে বোঝে না। জগার মা বলে, সবিতা নাকি মাঝেমধ্যেই এমন দিনমান ইশকুলের নাম করে কাটিয়ে আসে। তুর মেয়ের ডানা হইছে হরি! শুননি হই, তোহার বেটিকে দিয়ে কগো জোয়ান সিনিমার শুটিং করাইল বা! কারা সবিতাকে দিয়ে সিনেমার শুটিং করাচ্ছে, কোথায়, কেন, হরি এসব কিছুই জানে না। মেয়েটা কবে এমন উড়া-ছাড়া হয়ে উঠলো। আজ আসুক। সবি হারামজাদির ঠ্যাং যদি না ভাইংছি তো হরির নামে কুত্তায় য্যান গু খায়।
তিন নম্বর লাশটি টেবিলে তুলতে গিয়ে কাঁধের হাড় চড় চড় করে ওঠে হরির। পেটটাও ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। বেলা পড়ে এসেছে। পেটে তেমন কিছু পড়েনিও। মাঝখানে চ্যাংটা মোড়ের দোকান থেকে পাউরুটি আর কলা নিয়ে এসেছিল সেটুকুই পেটের কোনায় পড়েছিল ঘণ্টাখানেক। এখন সেখানে ব্যথার কাঁকড়াটা কামড় দিয়ে লটকে আছে। হঠাৎ হরির মনে হয়, এই ব্যাগের ভেতর যে বডিটা আছে, যাকে গ্যাং রেপ করে মেরে এসিডে মুখ পুড়িয়ে দিয়েছে সে মেয়েটি সবিতা নয় তো! সবিতার খোঁজ নেই দুদিন!
তা নয়! চ্যাংটার কাছে কাগজে মৃতের লিস্টি আছে। মেয়েটির নাম আয়েশা।
সুতরাং মেয়েটি মোটেও সবিতা নয়।
কিন্তু হ্যাঁ, আয়েশাই আসলে সবিতা!
ভিসেরা ব্যাগের চেন টেনে হরি প্রথম হাউ হাউ করে চেঁচিয়ে ওঠে। কা হো চ্যাংটা রে, ইহ ত হামার লেইকী সবিতা! ওরে সবিতা! মড়াকাটা ঘরে চ্যাংটা ছাড়াও আরও কয়েকজন সহযোগী আর তরুণ ডাক্তার সাংবাদিকের ভিড়। তারা চকিত হয়ে ওঠেন। হরি ডোমের মেয়ে কিশোরী সবিতাকে গ্যাং রেপ করে খুন করা হয়েছে!
ব্যাগ খুলে বডিটি টেবিলের ওপর শোয়ানো হয়েছে। সারাটা মুখ এসিডে গলে গিয়েছে। রক্ত স্বেদ গলিত চর্বি দলিতমথিত চক্ষুমণিতে সে মুখ বীভৎস, ভয়ংকর। চেহারা বোঝার একেবারেই কোনো উপায় নেই।
চ্যাংটা হরিকে অভয় দেয়, গুরু এ আমাদের সবি নয়। তুমার মেয়ে নয়। এ হল আয়েশা। অন্য মেয়ে। এ মেয়ের শরীল গোরা। সবিতা তো গোরা নয়। দেখ না কেনে?
তাই? হরি মেয়েটির গলিত বীভৎস মুখটি পরখ করে। এখানে কি কোনো মীনাক্ষীবালা দাসীর মুখের একটু কোনো ছায়া আছে? দীঘির মত কালো চোখজোড়া! চোখ কোথায়! ও তো গলে পুড়ে পচা কাদার পিটুলির মত সারা মুখে ছড়িয়ে আছে!
কা ইহ লেইকী? কৌনঅ বাপ ইসনকে জনম দেলে রহে! সীতার মতন কৌনঅ মা ইহকে দুধ আউর মধু খায়েলেকে বাড়কা কইলে বা?
কে এই মেয়ে? কোন বাপ একে জন্ম দিল, সীতার মতন কোন মা একে দুগ্ধমধু খাইয়ে বড় করলো, এসব কথা বলে হরির বিলাপের সময় এখন না। তাকে কাজ করতে হবে। মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদে এত সময় নিলে চলবে না। আর-একটা লাশ পড়ে আছে। সেটাও কাটতে হবে। হয়তো আরও লাশ আসবে। দেশে এখন খুনের মৌসুম। সামনে ইলেকশন। বিরুদ্ধ পার্টিকে কাত করার জন্য দলের একে তাকে খুন এখন জায়েজ!
দেশে এখন গ্যাং রেপের মৌসুম। মুচিপাড়ার মেয়েরা লেখাপড়া করতে বাইরে ইশকুলে যাচ্ছে। বস্তির কাঠি কাঠি মেয়েরা গার্মেন্টসে চাকরি করে ডালভাতের সাথে দুটো ফলফলাদি খেতে পেয়ে নাদুস নুদুস হয়ে উঠছে। বড় লোকের সুন্দর পরী পরী মেয়েরা ইচ্ছেমত রাতবিরেতে রাস্তায় বেরুচ্ছে। শিশু মেয়েরা বড় বেশি সরল। একটা বিড়াল ছানা বা একটা বল কিনে দেবার লোভ দেখালেই ওদেরকে কব্জা করে ফেলা যায়!
মেয়েটির গায়ের ফুলছাপ জামা খুলে নেয়া হল। নিম্নাঙ্গে ওর কোনো পোশাক ছিলোই না। হরি তীক্ষ চোখে কিশোরীর পা জোড়া দেখে। সবিতার পা ছিলো ডাহুকের মতো কালো আর লম্বা। এর পা দুটিও টেবিলের বাইরে বের হয়ে আছে। নীল শাপলার ডাঁটার মতো এক জোড়া পা! নাকি ডাহুকের পা!
পেটের ব্যথাটাকে দাঁত দিয়ে পিষে ফেলে হরি। শক্ত হাতে ভোজালিটা হাতে তুলে নেয়। হরিকে কাজে নামতে দেখে আপাতত ভিড় সরে যায়। বডি ওপেন হোক। তারপর সব পরীক্ষা করা যাবে।
হরির হাতের ছুরি নতমুখী হয়। এবার বুকের খাঁজে কলজে-কড়ার মাঝখানে পিচ্ছিল মসৃণ স্থানটুকুতে ছুরির অগ্রভাগ রেখে ছোট হাতুড়ি দিয়ে একটা কৌশলী বাড়ি। তারপরই ফড়ফড় করে ফেড়ে যাবে মেয়ে, একেবারে তলপেট পর্যন্ত।
হরির ছুরি থেকে একফোঁটা অশ্রু, কি এক ফোঁটা রক্ত বডিটির দুই পাঁজরের মাঝেখানে পিচ্ছিল জায়গায়টায় ঝরে পড়ে। লাল একটা জড়ুল চিহ্ন হয়ে ওঠে।
সবিতা? হরি হাতের পাতা দিয়ে বারবার জায়গাটা ঘসে। দাগ মুছে গেছে। ওহ! না! সবিতা নয়। আয়েশা।
আবার দাগ জেগে ওঠে। হরি আবার ঘসে। লাল দাগটি ছুরির অগ্রভাগে একটি ছোট্ট স্তনবৃন্তের মত আদর চোখে চেয়ে থাকে।
সবিতা? না আয়েশা! হ্যাঁ সবিতাই তো! হরি ডোম আবার হাতের পাতায় লাল দাগটি ঘসে ঘসে মোছে।
দাগটি আবার জেগে ওঠার আগেই ছুরি বাঁটে হাতুড়ির আঘাত করে। কচি কিশোরী মড়ার বুকে ঢুপ করে ঢুকে যায় ছুরিটা।
এখন মৃতের স্তূপে কর্মরত হরি ডোমই একমাত্র জ্যান্ত মানুষ। ·
লেখক পরিচিতি : ঝর্না রহমান মূলত গল্পকার। পাশাপাশি লেখেন কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক। বসবাস ঢাকায়। ভূষিত হয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে।


2 মন্তব্যসমূহ
চমকিত হওয়ার কিছুই পেলাম না; প্রথম প্লট দেখে মনে হলো নতুন কিছু। তবুও ভালো লেগেছে ডোমের শিশুরক্ষা।
উত্তরমুছুনচমৎকার। যদিও একটা পর্যায়ে গিয়ে উপসংহারটা আঁচ করা যাচ্ছিলো।
উত্তরমুছুন