অংশুমান কর কবি, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলের সচিব। কবিতা ও উপন্যাসের পাশাপাশি অংশুমান লিখেছেন বেশ কিছু ছোটোগল্প ও কয়েকটি নাটক। বিনয় মজুমদারের জীবন অবলম্বনে রচিত উপন্যাস আমি বিনয় মজুমদার ইতিমধ্যেই পাঠকের সমাদর পেয়েছে। অংশুমান ধারাবাহিকভাবে যুক্ত থাকেন অনুবাদকর্মে। অনুবাদ করেছেন মালয়ালাম কবি কে. সচ্চিদানন্দনের নির্বাচিত কবিতা। ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার প্রতিনিধি-স্থানীয় কবিদের কবিতা অনুবাদ করেছেন ভারতবর্ষের কবিতা শীর্ষক গ্রন্থে৷ দীর্ঘদিন ছিলেন কৃত্তিবাস পত্রিকার সহ-সম্পাদক। বর্তমানে সম্পাদনা করেন উল্লেখযোগ্য সাহিত্যপত্র গভীর নির্জন পথের গদ্যপদ্যপ্রবন্ধ, নাটমন্দির ও ভারতীয় কবিতার ইংরেজি অনলাইন পত্রিকা পোয়েট্রি ইন্ডিয়া। কবিতার জন্য পেয়েছেন বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রভৃতি পুরস্কার। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ঐতিহাসিক মরিচঝাঁপির ঘটনাকে ভিত্তি করে পাখিমানুষের ঘর উপন্যাস। গল্পপাঠকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারের কথা বলেছেন উপন্যাসটির নানা দিক নিয়ে।
গল্পপাঠ :
আমার জানামতে মরিচঝাঁপি নিয়ে ইতোপূর্বে উপন্যাস রচিত হয়েছে। আপনার কেন মনে হলো এ নিয়ে আরও একটি উপন্যাস লেখা দরকার?
অংশুমান কর :
উত্তর: অবশ্যই মরিচঝাঁপি নিয়ে এর আগে উপন্যাস লেখা হয়েছে। এর মধ্যে দু-টি উপন্যাস আমি পড়েছি। কিন্তু দু-টি উপন্যাসই মরিচঝাঁপির ঘটনাটিকে একরৈখিকভাবে দেখেছে। যাঁরা পড়েছেন তাঁদের কাছে শুনেছি যে, তৃতীয় উপন্যাসটিও একই ধরনের। কিন্তু মরিচঝাঁপির ঘটনাটির আছে বহু মাত্রা, বহু স্তর। আমি যে দু-টি উপন্যাস পড়েছি তার কোনোটিই কিন্তু আসলে কী হয়েছিল মরিচঝাঁপিতে, তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেনি। বিশ্বাস রেখেছে প্রচলিত ন্যারেটিভটিতেই। সেই জায়গা থেকেই আমার মনে হয়েছিল যে, আসলে কী ঘটেছিল মরিচঝাঁপিতে সেটি উপন্যাসের আকারেই অনুসন্ধান করার এবং বাঙালির সামনে নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। এটাও মনে হয়েছিল যে, এই বিষয়ে নীরস একটি প্রবন্ধর বই পড়ার চেয়ে হয়তো একটি উপন্যাস পাঠকের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য অভিজ্ঞতা হতে পারে। আরও একটি কারণও আছে। পাঠক হিসেবে যে-দুটি উপন্যাস আমি পড়েছি তার কোনোটিই আমাকে তৃপ্তি দিতে পারেনি। শৈলীর দিক থেকে দু-টি উপন্যাসকেই আমার মনে হয়েছে দুর্বল। সে কারণেই আমার মনে হয়েছিল এই ঘটনাটির ওপর একটি ঠিকঠাক উপন্যাস লেখার খুবই প্রয়োজন রয়েছে। সত্যি বলতে কি, ঘটনাটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, আমার উপন্যাসটির পরেও আরও উপন্যাস লেখা হতেই পারে।
গল্পপাঠ :
আপনি তো মূলত কবি। এই পরিচিতিই আপনার সর্বাধিক। কেন মনে হলো উপন্যাস লেখা দরকার?
অংশুমান কর :
আমার পরিচিতি কবি হিসেবে তৈরি হয়েছে এটা সত্যি। কিন্তু, আমার লেখালেখি শুরু হয়েছিল ছোটোগল্প দিয়ে। ক্লাস ইলেভেনে পড়ার সময় বাঁকুড়ার একটি পত্রিকাতে আমি একটি ধারাবাহিক উপন্যাসও লিখতে শুরু করেছিলাম। তবে সেই উপন্যাসটি আমার শেষ করা হয়ে ওঠেনি। মনে রাখা ভালো যে, ‘পাখিমানুষের ঘর’ উপন্যাসটির আগে আমার কিন্তু দশটি ছোটো-বড়ো উপন্যাস প্রকাশ পেয়েছে। যার মধ্যে অনেকেই পড়েছেন বিনয় মজুমদারের জীবন অবলম্বন করে লেখা উপন্যাস ‘আমি বিনয় মজুমদার’। কাজেই উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে আমি একেবারে নতুন নই। সেই ছোটোবেলা থেকেই আমার উপন্যাস লেখা প্রয়োজন মনে হয়েছে তার কারণ এমন অনেক কথাই থাকে যা কবিতায় সম্পূর্ণ ধরে ওঠা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে। কিছু বিষয় হয়তো কবিতাতে সম্পূর্ণভাবে, সামগ্রিকতায়, ধরে রাখা যায় না। তখন উপন্যাসের প্রয়োজন হয়।
গল্পপাঠ :
কীভাবে, কত দিন বা কত বছর আগে এ বিষয়ে উপন্যাস লেখার ভাবনাটি আপনার মাথায় এসেছিল?
অংশুমান কর :
মরিচঝাঁপি নিয়ে আমি গবেষণা করছি প্রায় দশ বছর ধরে। বিভিন্ন আলোচনা সভায় গবেষণাপত্র পাঠ করেছি এ বিষয়ে। এর মধ্যে প্যারিসে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভাও আছে। কিন্তু গবেষণা করার সময়ে প্রাথমিকভাবে কখনোই আমার মনে হয়নি যে, এই বিষয়টি নিয়ে আমি উপন্যাস লিখতে পারি যতদিন না আমি দীপ হালদারের লেখা দা ব্লাড আইল্যান্ড বইটি পড়ছি। মূলত প্যারিসে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভাটিতে একটি গবেষণাপত্র পাঠ করবার জন্যই আমি এই বইটি পড়েছিলাম। বইটি মরিচঝাঁপির একটি ওরাল হিস্ট্রি। এই বইটিতেই আমি মানা গোলদারের একটি সাক্ষাৎকার পড়তে পড়তে বুঝতে পারি একটি উপন্যাসের প্লট আমার মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। এই বইটি আমি প্রথম পড়ি ২০২৩ সালে। তখন থেকেই আমি মরিচঝাঁপি নিয়ে উপন্যাসটি লেখার প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। অবশেষে দু-বছর পরে লেখা শুরু করি ২০২৫-এ।
গল্পপাঠ :
‘পাখিমানুষের ঘর’ একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। উপন্যাসটি লেখার প্রস্তুতি কেমন ছিল? ইতিহাসের বইপুস্তক পড়ে প্রস্তুতি নিয়েছেন, নাকি মাঠপর্যায়ে গিয়েও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন?
অংশুমান কর :
এটি অবশ্যই একটি ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। এটি লিখতে গিয়ে আমি কোনো ফিল্ডওয়ার্কই করিনি। আমার আগে যাঁরা এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন, যেমন নিরঞ্জন হালদার, জগদীশচন্দ্র মণ্ডল বা মধুময় পাল, তাঁরা ক্ষেত্র সমীক্ষা করে বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে এই বিষয়ের ওপর তথ্যের একটি আর্কাইভ তৈরি করে গিয়েছেন। উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে তাই আমি মূলত বই-ই পড়েছি। মরিচঝাঁপি নিয়ে একাধিক বই, গবেষণাপত্র, সন্দর্ভ এতই তথ্যসমৃদ্ধ যে, আমি নতুন করে ক্ষেত্রসমীক্ষা করার প্রয়োজনই অনুভব করিনি। প্রয়োজন বুঝলে ক্ষেত্রসমীক্ষা অবশ্যই করতাম।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি লিখতে কত দিন লেগেছে? যখন লিখছিলেন, লেখক হিসেবে সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? চরিত্রগুলো কি ঠিকঠাকমতো ধরা দিচ্ছিল? গল্পটা ঠিকমতো এগুচ্ছিল? নাকি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন?
অংশুমান কর :
আমি খুব দ্রুত লিখে থাকি। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি লিখি ভয়েস টাইপিং-এর মাধ্যমে। এই উপন্যাসটিও সেভাবেই লেখা। এতে সময় বাঁচে। উপন্যাসটি লেখার প্রস্তুতি অনেক দিনের হলেও লিখতে আমার তাই বেশি সময় লাগেনি। দু-মাসের মধ্যেই আমি উপন্যাসটি লিখে ফেলি। লেখার সময় অবশ্যই আমি বেশ উত্তেজিত ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল চরিত্রগুলো ঠিকঠাকই আমার কাছে ধরা দিচ্ছে। গল্পটা এগোনো নিয়ে কোনো সমস্যাই ছিল না। তার কারণ আমি যখন কোনো উপন্যাস লিখি, তখন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত গোটাটাই থাকে ভীষণ পরিকল্পিত। উপন্যাসে মূল কোন কোন বিষয়গুলি আমি গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করতে চাই তা নিয়ে প্রথমে আমি নোট নিতে থাকি। সেই নোটগুলিকে মাথায় রেখেই উপন্যাসকে এগিয়ে নিয়ে চলি। এক্ষেত্রেও আমি একইভাবে এই লেখাটি লিখেছি। আমাকে একবার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন যে, এইভাবে উপন্যাস লিখলে আমি দীর্ঘদিন উপন্যাস লিখতে পারব না। জানি না শীর্ষেন্দুদার কথা সত্যি হয়ে যাবে কি না। কিন্তু, মুশকিল হল, লিখতে শুরু করলাম আর গল্প তার নিজের গতিতেই এগিয়ে চলল–এই প্রক্রিয়ায় আমি কিছুতেই উপন্যাস লিখে উঠতে পারি না। কারণ উপন্যাসের প্লটটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। লেখা শুরু করার সময় উপন্যাসের শেষটা আমাকে স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেতে হয়। আমার প্রতিটি উপন্যাসই এভাবেই লেখা। এভাবে লিখি বলেই উপন্যাসটি লেখার সময় কোনো জটিলতারই মুখোমুখি হইনি। তার কারণ জটিলতা যা ছিল তা উপন্যাসটির লিখন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমি যখন নোট নিচ্ছিলাম তখনই সমাধান করেছিলাম।
গল্পপাঠ :
পাখিমানুষের ঘর’ কি একটানা লিখে গেছেন, নাকি বার বার সম্পাদনা করেছেন? আপনার উপন্যাস লেখার প্রক্রিয়া কেমন? আপনি কি সাধারণত একটানা একবারই লেখেন, নাকি লেখার পর বার বার এডিট করেন?
অংশুমান কর :
না, পাখি মানুষের ঘর একটানা লিখে যেতে পারিনি। একটা কারণ হল এই যে, আমাকে আরও নানা ধরনের লেখাই লিখতে হয়। এই উপন্যাসটি লেখার সময়ও আমাকে অন্য কিছু ধরনের লেখা লিখতে হয়েছে। বিভিন্ন শারদ সংখ্যার জন্য একাধিক কবিতা, গদ্য, ছোটোগল্প লিখতে হয়েছে। তবে উপন্যাসটি লেখার সময় আমি চেষ্টা করছিলাম প্রায় প্রতিদিনই যেন উপন্যাসটির খানিকটা অংশ লিখতে পারি। যাতে এই উপন্যাসটি যে-ঘোর আমার ভেতরে তৈরি করেছিল সেই ঘোরটি নষ্ট না হয়ে যায়। বারবার কাটাছেঁড়া ছাড়া কখনোই উপন্যাস লেখা যায় না। আমি যেটা করি সেটা হল এই যে, খানিকটা লিখে আমি আমার ঘনিষ্ঠ দু-তিনজন বন্ধু-বান্ধবকে লেখাটি পড়তে দিই। তাঁরা ফিডব্যাক দেন। এই ফিডব্যাককে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি এবং উপন্যাসের পরের অংশ লিখতে থাকি। এতে আমার মূল পরিকল্পনার কোনো বদল আজ পর্যন্ত কখনও ঘটেনি। কিন্তু, ছোটো ছোটো কিছু পরিবর্তন অবশ্যই আমার লেখায় হয়েছে। হয়তো কোনো একটি চরিত্রকে আরও একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে আঁকার প্রয়োজন বোধ করেছি। এবং আমি যেহেতু নিজে কবিতা লিখি, প্রতিটি শব্দের গুরুত্ব আমার কাছে যেহেতু অপরিসীম, তাই আমি একটি লেখা বারবার সম্পাদনা করে থাকি উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। খুব পৃথুল, দীর্ঘ উপন্যাস লিখতে আমার ইচ্ছে করে না। আমার এটাও সবসময় মনে হয় উপন্যাসে একটা গতি যেন থাকে। পাঠক যেন টানা পড়ে যেতে পারেন উপন্যাসটি। কবিতার মতোই উপন্যাসের গঠনটিও খুবই ঘনসঙ্ঘবদ্ধ এবং মেদহীন হলে আমি স্বস্তি পাই।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসের নাম ‘পাখিমানুষের ঘর’ কেন? এই নামকরণের মাহাত্ম্য কী? মরিঝাঁপির সেই মানুষগুলোকে কি আপনি পাখির সঙ্গে তুলনা করতে চেয়েছেন? পাখির মতো যাযাবর বলতে চেয়েছেন? একটু বিস্তারিত বলবেন প্লিজ।
অংশুমান কর :
অবশ্যই আমি পাখিদের সঙ্গে তুলনা করেছি মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তুদের। কিন্তু, ওঁদের পাখিদের মতো ঠিক যাযাবর বলিনি। সব পাখিই কিন্তু যাযাবর নয়। অনেকেরই নির্দিষ্ট ঘর থাকে। উপন্যাসটিতে পাখিমানুষের ইমেজ ব্যবহার করে আমি বলতে চেয়েছি যে, পাখিরাও সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে দিনের শেষে নিজেদের একটা বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করে। এই মানুষগুলো সারা জীবন সেই চেষ্টাই করেছিলেন। নিজেদের একটা দেশ, একটা ঘর নির্মাণের।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসের নামকরণ কেমন হওয়া উচিত? অভিনব, নাকি গতানুগতিক? অনেকে উপন্যাসের গতানুগতিক নাম রাখেন। অনেকে আবার জটিল নাম রাখেন। বইয়ের নামকরণ প্রসঙ্গে আপনার অভিমত কী?
অংশুমান কর :
উপন্যাসের বিষয়ে যেমন তার ওপরেই উপন্যাসের নামকরণ নির্ভর করে। আমি কখনও উপন্যাসের নাম অভিনব রেখেছি, যেমন ‘কান্না কেনার লোক’, আবার কখনও উপন্যাসের নাম রেখেছি ভীষণই গতানুগতিক। যেমন, এখন ধারাবাহিকভাবে যে-উপন্যাসটি লিখছি তার নাম ‘হিরণবালা’। মূল চরিত্রর নামেই এই উপন্যাসটির নাম। কাজেই বিষয়ই আমার ক্ষেত্রে উপন্যাসের নামকরণ ঠিক করার মাপকাঠি।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসের কোন চরিত্রটি ঠিকঠাক দাঁড়িয়েছে? লেখক হিসেবে আপনার কি মনে হয়েছে, আপনি যে চরিত্র সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, তা ঠিকঠাক পেরেছেন? আর কোন চরিত্রটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল মনে হয়েছে?
অংশুমান কর :
এই উপন্যাসটি সম্পর্কে আমার মনে হয়েছে সব ক-টি চরিত্রকেই আমি যত্ন নিয়ে আঁকতে পেরেছি। কোনো চরিত্রকেই আমার মনে হয়নি অপেক্ষাকৃত দুর্বল। তবে আমার নিজের প্রিয় চরিত্র পাগলদাদা। এই চরিত্রটি সম্পূর্ণতই একটি কাল্পনিক চরিত্র। আমি বড্ড ভালোবেসে এই চরিত্রটিকে এঁকেছি।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি লিখে আপনি কি তৃপ্ত? আপনার কি মনে হয়েছে যা লিখতে চেয়েছেন, যেভাবে লিখতে চেয়েছেন, তা সম্পূর্ণ সফলভাবে লিখতে পেরেছেন?
অংশুমান কর :
একটি জায়গা নিয়ে আমার একটু আক্ষেপ আছে। পরবর্তী সংস্করণে আমি হয়তো সেই জায়গাটা একটু মেরামত করতে পারি। এই কথাটা উপন্যাসটি পড়ে আমাকে আমার বন্ধু মন্দাক্রান্তা সেনও জানিয়েছে। মরিচঝাঁপির মানুষদের দুর্গতির জন্য তৎকালীন কেন্দ্র সরকার যতখানি দায়ী ছিল, কেন্দ্র সরকারের ততখানি দায় হয়তো আমি দেখাতে পারিনি। এই বিষয়টি আরেকটু গুরুত্ব দিয়ে দেখানো উচিত ছিল বলে আমার নিজেরই এখন পড়তে গিয়ে মনে হল।
গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি প্রকাশের পর অনুভূতি কেমন ছিল?
অংশুমান কর :
উত্তর: সত্যি বলতে কি, তেমন কিছুই নয়। উপন্যাসটি প্রকাশ পেয়েছিল নাটমন্দিরের ১০০তম সংখ্যা প্রকাশ উপলক্ষ্যে আয়োজিত কবিতা উৎসবে। কবিতা উৎসবের আয়োজন নিয়ে আমি নাটমন্দিরের প্রধান-সম্পাদক হিসেবে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে, উপন্যাসটির প্রকাশ নিয়ে সেভাবে আলাদা করে কোনো অনুভূতিই হয়নি। লেখার সময় বরং আমি অনেক বেশি উত্তেজিত ছিলাম।
গল্পপাঠ :
পাঠকসাড়া কেমন পাচ্ছেন?
অংশুমান কর :
অসম্ভব ভালো সাড়া পাচ্ছি। ইতিমধ্যেই আমাকে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন যে, তাঁদের ভীষণ ভালো লেগেছে এই উপন্যাস। অনেকেই সমাজ মাধ্যমেও লিখেছেন। মধুময় পালের মতো একজন মানুষ এই উপন্যাস নিয়ে তাঁর ভালোলাগা সমাজ মাধ্যমে জানিয়েছেন। আশা করি যাঁরা এই উপন্যাসটি পড়বেন, তাঁরা মরিচঝাঁপিতে আসলে ঠিক কী হয়েছিল সে সম্পর্কে এক স্বচ্ছ ধারণা পাবেন।
গল্পপাঠ :
পশ্চিম বাংলায় এখন উপন্যাসের পাঠক কেমন? আগের তুলনা বেড়েছে, না কমেছে?
অংশুমান কর :
উপন্যাসের পাঠক অবশ্যই বেড়েছে। আমার নিজের উপন্যাসের বিক্রি দিয়ে যদিও দেখতে পাই সেটা মোটামুটি একটা জায়গাতে স্থিরই আছে। তবে সামগ্রিকভাবে উপন্যাসের পাঠক বেড়েছে কারণ প্রচুর উপন্যাস প্রকাশ পাচ্ছে। পাঠকরা না কিনলে সেসব বই যাচ্ছে কোথায়? দুঃখের একটা দিক অবশ্য আছে। যে- উপন্যাস লেখা হচ্ছে, তার একটা বড়ো অংশই হচ্ছে থ্রিলার, ভৌতিক গল্প, তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে লেখা কাহিনি। মধ্যবিত্তের নরম-সরম প্রেম নিয়েও একাধিক উপন্যাস লেখা হচ্ছে। এই ধরনের লেখা কম প্রকাশ পেলে পাঠক হিসেবে আমি একটু স্বস্তি পাব। লেখক হিসেবেও।
গল্পপাঠ :
পশ্চিম বাংলায় উপন্যাস-সাহিত্য চর্চা কেমন হচ্ছে? তরুণ লেখকরা কি উপন্যাস-সাহিত্য চর্চায় এগিয়ে আসছে? সমকালীন উপন্যাস ও ঔপন্যাসিকদের সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ণ কী?
অংশুমান কর :
তরুণরা অবশ্যই এগিয়ে আসছে। বেশ কিছু তরুণ ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য উপন্যাস লিখেছে। এরা সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছেন মূলত থ্রিলার লেখকরাই। তরুণদের অনেকের উপন্যাসই আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ি। এদের মধ্যে আমার মনে হয়েছে উল্লেখযোগ্য হল সাদিক হোসেন, কণিষ্ক ভট্টাচার্য, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য, শমীক ঘোষ, সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়, সায়ন্তনী ভট্টাচার্য। এরা ঠিক গতানুগতিক লেখা লিখছে না। অল্প কিছুদিন লিখতে এসেই আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছে সৌরভ হোসেন আর মৃত্তিকা মাইতি।
গল্পপাঠ :
‘পাখিমানুষের ঘর’ তো প্রকাশিত হল। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? আবার কবিতায় নিমগ্ন হবেন, নাকি নতুন কোনো উপন্যাস রচনার প্রস্তুতি নেবেন?
অংশুমান কর :
আমি এখন ধারাবাহিকভাবে আমার ঠাকুমার জীবন নিয়ে ‘হিরণবালা’ উপন্যাসটি লিখছি। এটিরও কেন্দ্রে রয়েছে দেশভাগ। আর আমি একই সঙ্গে অনেক রকমের লেখা লিখতে থাকি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, উত্তর-সম্পাদকীয়, এসবই একইসঙ্গে লিখতে থাকি। এর মধ্যে আমার কবিতা লেখার কাজ প্রায় রোজই চলতেই থাকে। কবিতায় আমি নিমগ্নই থাকি বলা যায়। নতুন করে আর নিমগ্ন হতে হবে না। একজন কবি আসলে ২৪ ঘণ্টাই কবি। প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত একটা কথা বলেছিলেন যে, একজন কবি জুতোর ফিতে বাঁধতে বাঁধতেও কবি। আমি এই কথাটায় বিশ্বাস করি। এরপরে যে-বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখব, সেটিও কিছুটা ভেবেছি। এটিও একটি ঐতিহাসিক উপন্যাসই হবে। তবে এক্ষুনি এর বেশি আর কিছু বলছি না। ·
সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : ৩রা নভেম্বর, ২০২৫



0 মন্তব্যসমূহ