পুরান ঢাকার পটভূমিতে রচিত ‘নীল মাকখির চোখ’ নিয়ে ফরিদ কবির


ফরিদ কবির
। কবি, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক। জন্ম ১৯৫৯ সালের ২২ জানুয়ারি। বড় হয়েছেন পুরান ঢাকার জিন্দাবাহারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর মাস্টার্সে পড়লেও পরীক্ষা দেননি ৷ মুদ্রণব্যবসা দিয়ে শুরু পেশাজীবন। পরে চাকরি করেছেন ব্যাংকে, সেটা ছেড়ে যোগ দিয়েছেন সাংবাদিকতায়। সিনিয়র সহ-সম্পাদক, সহকারী সম্পাদক ও উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন যথাক্রমে দৈনিক ‘জনপদ', ‘আজকের কাগজ’, ‘ভোরের কাগজ’ ও ‘আমাদের সময়'-এ। এখন জনসংযোগ পেশায় ৷ তাঁর সম্পাদনায় বেশ কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে সাপ্তাহিক ‘কাগজ' ও মাসিক ‘নতুনধারা’। তাঁর সম্পাদনায় বেরিয়েছে বেশ কিছু কবিতা, গল্প সংকলন ও প্রবন্ধ সংকলনও। সম্পাদনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ ‘মুজিবপিডিয়া'। কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ ও সম্পাদনাসহ তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৩০টি। গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর উপন্যাস নীল মাকখির চোখ। গল্পপাঠকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে বলেছেন উপন্যাসটির নানা দিক নিয়ে।
গল্পপাঠ
আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘নীল মাকখির চোখ’ কতদিন ধরে লিখেছেন?

ফরিদ কবির :
‘নীল মাকখির চোখ’ লিখতে প্রায় দু’বছর লেগেছে। তবে লেখার ভাবনা ও লেখার বিষয়আশয় মাথার মধ্যে ঘুরছিল প্রায় চার বছর ধরে। দু’বছর ধরে ভেবেছি, তারপর লিখতে শুরু করেছি।

গল্পপাঠ
আপনি কি লেখার পর এডিট করেন, নাকি যা লেখার একবারেই লিখে ফেলেন?

ফরিদ কবির :
পুরো একটা পর্ব লেখার পর অন্তত একদিন রেখে দিই। তারপর আবার পড়ি। পড়তে পড়তে সম্পাদনাও করি। কখনো কখনো আগের লেখা পুরো অংশটা একেবারে বাদ দেয়ার ঘটনাও ঘটে। কোনো কোনো পর্ব তিন-চারবার সম্পাদনা করার ঘটনাও ঘটেছে।

গল্পপাঠ
উপন্যাসটি লেখার ভাবনা কীভাবে আপনার মাথায় এসেছিলো? অর্থাৎ কীভাবে বিষয় নির্বাচন করেছিলেন?

ফরিদ কবির :
পুরান ঢাকাকে উপজীব্য করে খুব বেশি উপন্যাস লেখা হয়নি। এ কারণে দশ-এগারো বছর আগেই এ বিষয়ে একটা উপন্যাস লিখবো বলে ভেবেছিলাম। কারণ আমার মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের কোনো লেখকেরই পুরান ঢাকায় জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা তেমন নেই। ফলে কোনো লেখাতেই পুরান ঢাকা মানুষ ও তাদের জীবনসংগ্রামের কথা সেভাবে পাওয়া যায় না। পুরান ঢাকার বদলে যাওয়ার বিষয়টিও কেউ তেমন জানে না। এখনো অনেকে মনে করেন, পুরান ঢাকার মানুষ আগের মতোই ঢাকাইয়া ডায়ালেক্ট এবং কথায় কথায় স্ল্যাং বলে। আসলে সেই অবস্থা এখন আর নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরান ঢাকার অনেকটাই বদলে গেছে।

উপন্যাস লেখার কথা ভাবলেও তেমন কোনো প্রস্তুতি আমার ছিল না। সে কারণে লেখা হয়ে উঠছিল না। ২০১৭ সালে ‘আমার গল্প’ লেখার পর এবং সে বইটি পাঠক সাগ্রহে গ্রহণ করায় উপন্যাস লেখার একটা সাহস পাই। ২০২২ সালে লিখতে শুরু করি।

তবে, বলে রাখা ভালো, লেখাটি শুরু করতে গিয়ে আমি আসলে ভেবেছি, আমি কি কেবল পুরান ঢাকার একটা গল্প বলতে চাই? নাকি বাংলাদেশের উপন্যাসের যে প্রচলিত ধারা আছে, তা ভাঙতে চাই। আমি এই প্রশ্নের ভেতর একটা জবাব পেয়েছি। আমি কেবল আখ্যানভিত্তিক একটা উপন্যাস লিখতে চাইনি। উপন্যাসেও যে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ আছে, সেই সুযোগও আমি নিতে চেয়েছি। ফলে এ উপন্যাস পুরান ঢাকাকে আশ্রয় করে লেখা হলেও এটি আসলে মানুষের মনোজাগতিক লড়াইয়ের গল্প। এই উপন্যাসে দুই মুস্তাফিজুরের চরিত্র আসলে একজন মুস্তাফিজুরেরই ‘ইগো এবং অল্টার ইগো। এর মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে পাঠক পড়তে পড়তে প্রথম মুস্তাফিজুরের সাফল্য চাইবে, কিন্তু দ্বিতীয় মুস্তাফিজুরের সাফল্যকে মানতে চাইবে না, তাকে খলনায়ক বলেই বিবেচনা করবে। ফলে, এ উপন্যাসে আসলে আছে তিনটি পক্ষ। একটি উত্তম পুরুষের মুস্তাফিজুর, একটি তৃতীয় পুরুষের মুস্তাফিজুর এবং পাঠক নিজে। কোনো কোনো পাঠক দুজন মুস্তাফিজুরকে একজন বলে মনে করবে, কোনো কোনো পাঠক একজন মুস্তাফিজুরকে নায়ক এবং একজন মুস্তাফিজুরকে খলনায়ক বলে মনে করবে।

গল্পপাঠ :
কবি হিসেবে আপনার ব্যাপক পরিচিতি। লিখলেন আত্মজীবনী ‘আমার গল্প’। ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেল। এটা লিখতে গিয়েই কি মনে হলো আপনার পক্ষে উপন্যাস লেখা সম্ভব?

ফরিদ কবির :
সত্যিই তাই। ‘আমার গল্প’ পড়ার পর অনেক পাঠকই আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন উপন্যাস লেখার জন্য। আমার বন্ধুদেরও অনেকে বলেছেন, আমার উপন্যাস লেখা উচিত। আমার নিজেরও তখন কিছুটা সাহস হলো, মনে হলো, অন্তত একটা উপন্যাস আমি লিখতে পারব।

গল্পপাঠ :
‘নীল মাকখির চোখ’ গত বইমেলায় প্রকাশিত হলো। এ পর্যন্ত পাঠক সাড়া কেমন পেলেন?

ফরিদ কবির
বইটা বেশ বড়সড় হয়ে গেছে, দামটাও অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও বইটা অনেক পাঠক পড়েছেন, এমনকি তাদের অনেকে টেলিফোনে, কেউ কেউ ফেসবুকেও বইটা নিয়ে কথা বলেছেন, লিখেছেন।

গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি বেশ বড়। দামও বেশি। এই কারণে আপনার কি মনে হয়েছে উপন্যাসটি পাঠকের কাছে কম পৌঁছেছে? বড় উপন্যাসের পাঠক বাংলাদেশে আছে কিনা? নাকি পাঠক বড়-ছোট বিবেচনায় উপন্যাস পড়েন না?

ফরিদ কবির
বর্তমানে মানুষের পাঠাভ্যাস প্রায় নেই বললেই চলে। উপন্যাসের কলেবর বড় হলে অনেক পাঠকই সেটা পড়তে ভয় পান বলেই আমার মনে হয়েছে। আর বইয়ের দামও একটা ফ্যাক্টর। ক’জন পাঠক আছে একটা বই এক হাজার টাকা দিয়ে ফট করে কিনে ফেলবে! আমরা বেশিরভাগ বই পড়েছি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে। এসব পাঠকের জন্য আমার বই কেনা একটু কঠিন তো বটেই। যেসব পাঠক বড়-ছোট ভেবে উপন্যাস পড়েন না, তারা সংখ্যায় খুবই সামান্য। বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ক’জন পাঠক পড়েছেন? কিংবা, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র ‘কাঁদো নদী কাঁদো’? খুব কম সংখ্যক পাঠক।

গল্পপাঠ
আপনি পুরান ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন। ‘নীল মাকখির চোখ’-এর পটভূমি পুরান ঢাকা। তার মানে ধারণা করা যায়, আপনি উপন্যাসটি অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন। উপন্যাস কি অভিজ্ঞতা থেকে লেখা হয়, নাকি অভিজ্ঞান থেকে?

ফরিদ কবির
উপন্যাসের সবকিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লেখা নয়। কারণ আমার উপন্যাসের একজন মুস্তাফিজুর বাস্তবের হলেও আরেক মুস্তাফিজুর কল্পনার, অভিজ্ঞানের। আমার উপন্যাসের কোন মুস্তাফিজুর বাস্তবের, আর কোন মুস্তাফিজুর কল্পনারÑ এ প্রশ্ন করলে তার জবাব দেয়া অবশ্য আমার জন্য কঠিন।

গল্পপাঠ
উপন্যাস কি কেবলই বাস্তবতার নিরেট বর্ণনা, নাকি কল্পনার বিস্তার? বাংলাদেশের উপন্যাসে আপনি কল্পনার বিস্তার বা উচ্চতা কতটা দেখতে পান?

ফরিদ কবির
বাংলাদেশের বেশিরভাগ উপন্যাসই, তা জনপ্রিয় ধারার হোক বা সিরিয়াস ধারারএক অর্থে সেগুলি আখ্যানভিত্তিক। ফলে গত ত্রিশ বছরে কমপক্ষে ত্রিশ হাজার উপন্যাস লেখা হলেও ত্রিশটি চরিত্রের নাম কেউ বলতে পারবেন না। এদেশে উপন্যাস নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। এমনকি উপন্যাসের কাঠামো ও ভাষা নিয়েও।

গল্পপাঠ :
আপনি তো কখনো ছোটগল্প লেখেননি। নাকি লিখেছেন? উপন্যাস লেখার সময় কি মনে হয় না কখনো ছোটগল্প লিখবেন?

ফরিদ কবির
ছোটগল্প লেখার ইচ্ছে আছে। তবে, তার আগে আরো একটি উপন্যাস লিখতে চাই।

গল্পপাঠ
উপন্যাস ও ছোটগল্প দুটোই তো গল্প। একটি বড়, একটি ছোট। দুটোর মধ্যে আসলে পার্থক্য কী? একজন  ঔপন্যাসিক হিসেবে এ ব্যাপারে আপনার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনতে আগ্রহী।

ফরিদ কবির
উপন্যাস ও ছোটগল্পে সাধারণত গল্প থাকে। আবার নাও থাকতে পারে। পিটার বিকসেলের ছোটগল্পে কোনো গল্প পাওয়া কঠিন। সেখানে পাওয়া যাবে কোনো বিশেষ চরিত্র কিংবা কোনো ভাব বা বিষয়। এমনকি সুবিমল মিশ্রের ছোটগল্পেও নিরেট কোনো গল্প নেই। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সেলিম মোরশেদ, নাসরীন জাহানের অনেক ছোটগল্প পাওয়া যাবে, যাতে কোনো আখ্যান খুঁজে পাওয়া কঠিন।

গল্পপাঠ
বাাংলাদেশের সমকালীন উপন্যাস সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী? উপন্যাসে কি আমরা ভালো করছি, নাকি একটা গিরিখাদে আটকে আছি?

ফরিদ কবির :
বাংলাদেশের উপন্যাস প্রধানত আখ্যানভিত্তিক। তাতে বিষয়বৈচিত্র্য থাকলেও আমি বলবো, এদেশের উপন্যাস প্রধানত ক্ল্যাসিক ধারাই বহন করে চলেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভাঙচূর খুবই কম হয়েছে। এই অর্থে এবং বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে দেখলে একটা গিরিখাদেই তো আমরা এখনো আটকে আছি!

গল্পপাঠ
আপনি সাধারণত কোন সময় লেখেন?

ফরিদ কবির
আমি সাধারণত রাতের বেলা লিখি। গভীর রাতে। তবে, কখনো কখনো সময় পেলে দিনের বেলাতেও লিখি।

গল্পপাঠ
দিনের কোন সময়টায় আড্ডা দেন? লেখকের জন্য আড্ডা কি জরুরি? নাকি লেখক সব সময় তার লেখার কামরায় লেখার ধ্যানে থাকবেন? আপনার কী অভিমত?

ফরিদ কবির :
কখনো কখনো সন্ধ্যায় আড্ডা দিই। তবে, সেটা সপ্তাহে এক কি দুদিন। বাকি সময় পড়ি বা লিখি। লেখকদের জন্য সেসব আড্ডা ভালো যেখানে সাহিত্য নিয়ে আলাপ হয়, তর্ক হয়। নিরর্থক আড্ডা লেখকের কোনো কাজে আসে না।

গল্পপাঠ
এখন কী পড়ছেন? লেখকের জন্য পাঠক কি জরুরি?

ফরিদ কবির :
এখন কবিতার বাইরে উপন্যাসই বেশি পড়া হচ্ছে। এ মুহূর্তে পড়ছি আহমদ বশীরের ‘ত্রিশঙ্কু’ উপন্যাসটি। লেখকের জন্য পাঠ অবশ্যই জরুরি। পাঠ না করলে তিনি জানবেন কী করে, কী লিখতে হবে, কী নিয়ে লিখতে হবে, কীভাবে লিখতে হবে!

গল্পপাঠ
আপনি কী ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন?

ফরিদ কবির
আমি নানা ধরনের বই পড়তে পছন্দ করি। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বই যেমন পড়ি, তেমনি পড়ি ইতিহাস, দর্শন ও ধর্ম সংক্রান্ত বইও।

গল্পপাঠ
শুনেছি আপনি আরেকটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা শুরু করেছেন। সেটার বিষয়বস্তু কী?

ফরিদ কবির
‘নীল মাকখির চোখ’ লেখার পর ভেবেছিলাম, এটাই প্রথম, এটাই শেষ! কিন্তু বইটি পড়ার পর আমার একজন প্রিয় কথাসাহিত্যিক এক আড্ডায় আমাকে বললেন, ফরিদ, এই উপন্যাসেটা তুমি একইসঙ্গে উত্তম পুরুষ ও তৃতীয় পুরুষএই দুই ন্যারেটিভে লিখেছো। এমনকি একই নামে দুটো চরিত্রও তুমি সৃষ্টি করেছো। এক উপন্যাসেই তুমি এতো এক্সপেরিমেন্ট করেছো যে, আমি ভাবছি, এর পরে তুমি আর কী এক্সপেরিমেন্ট করবে? তার এই কথা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে। এই ভাবনাই আমাকে উসকে দিয়েছে আরেকটা উপন্যাস লেখার জন্য। তবে, সেটার বিষয়বস্তু সম্পর্কে আপাতত আগাম কিছু বলতে চাই না। আর, বললেও ঠিক বোঝানো যাবে বলে মনে হয় না। ধরেন, পরের উপন্যাসটা হবে অস্তিত্ব ও অস্তিত্বহীনতা নিয়ে। আমি নিশ্চিত, এতে কিছু বোঝানো গেলো না।

গল্পপাঠ :
উপন্যাসটি লিখতে কতদিন লাগতে পারে?

ফরিদ কবির
গত এপ্রিল থেকে মাথায় লেখা হচ্ছে। আরো কয়েক মাস পর লিখতে শুরু করবো। উপন্যাসের চরিত্রগুলিই ঠিক করে দেবে, কতোদিন লাগবে। ·

সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ