সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : রোয়ান বেয়ার্ড
বাংলা অনুবাদ : পিউ শ্রীপর্ণা
২০২১ সালে মেঘা মজুমদার লিখছিলেন এক পান্ডুলিপি, যা পরে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ (A Guardian and a Thief) হয়ে ওঠে। তখনও বইটি জমে উঠছিল না। তিনি বলেন, “চরিত্রগুলো ঠিকভাবে কাজ করছিল না। এই ব্যর্থতার অনুভূতির মুখোমুখি হওয়া খুব কঠিন। একজন লেখক যখন বুঝতে পারে তার এত মনোযোগ আর পরিশ্রম দিয়ে লেখা পাঠকের মনে ধরছে না— তখন এর চেয়ে হতাশার আর কিছু থাকে না ঐ লেখকের।
এর কিছুদিন পর তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। সেই ঘটনার পর শুধু তাঁর জীবনই বদলায়নি, বদলে গেছে তাঁর বইও। আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ মূলত এক মায়ের গল্প—যিনি নিজের সন্তানের জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত। গল্পটি এক ভবিষ্যৎ দুর্ভিক্ষপীড়িত কলকাতায় সাত দিনের মধ্যে ঘটে। সেখানে পাশাপাশি দুটি পরিবারের কাহিনি এগোয়। প্রথম পরিবারে আছেন মা—মধ্যবিত্ত এক নারী। তাঁর স্বামী মিশিগানে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেন এবং তাঁদের জন্য ‘ক্লাইমেট ভিসা’ জোগাড় করেছেন, যাতে পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে পারে। অন্য পরিবারটি বুম্বার। এক দরিদ্র গ্রামীণ যুবক, যিনি শহরে এসেছেন নিজের বাবা-মা আর ছোট ভাইয়ের জন্য নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে।
বইটি এই বছরের National Book Award–এর শর্টলিস্টে আছে। অনেকে মনে করেন, এর চেয়ে যোগ্য উপন্যাস কল্পনা করা কঠিন। এটি একই সঙ্গে তীব্র, আবেগময় এবং প্রশ্নে ভরা একটি বই, যা শেষ পৃষ্ঠা পড়ার পরও পাঠকের মনে দীর্ঘ সময় রয়ে যায়।
এই সাক্ষাৎকারে রোয়ান বেয়ার্ড কথা বলেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়া, নৈতিক জটিলতা, এবং লেখক হিসেবে মেঘা মজুমদার কীভাবে তাঁর গল্প তৈরি করেন, সে বিষয়ে। রোয়ান বেয়ার্ড একজন মার্কিন কথাসাহিত্যিক। তাঁর গল্পসমূহ প্রকাশিত হয়েছে The Kenyon Review, The Southern Review, এবং The Common সহ নানা সাহিত্যপত্রিকায়। তিনি Ploughshares Emerging Writer Award পেয়েছেন, এবং তাঁর রচনাগুলো Pushcart Prize–এর জন্য মনোনীত হয়েছে। তিনি Bread Loaf Writers’ Conference এবং StoryStudio থেকে লেখালেখির বৃত্তিও অর্জন করেছেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস The Divorcées প্রকাশের আগেই Elle, Entertainment Weekly, People–সহ নানা পত্রিকা একে “সবচেয়ে প্রতীক্ষিত বই” হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে ২৩ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে Chikago Riview of Books পত্রিকায়।
রোয়ান বেয়ার্ড :
এই উপন্যাসের প্রেরণার উৎস কী?
মেঘা মজুমদার :
আ গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ–এর প্রেক্ষাপট কলকাতা, আমার নিজের শহর। আমি জানতে চাইছিলাম জলবায়ু পরিবর্তন এই শহরের ভবিষ্যৎকে কীভাবে প্রভাবিত করবে। গবেষণায় দেখলাম, ভবিষ্যতে কলকাতায় আরও ভয়াবহ ঝড়-বন্যা হবে। তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। শহরটা আরও উত্তপ্ত ও অস্থির হয়ে উঠবে। তখন ভাবছিলাম, এই বাস্তবতায় মানুষ কেমন করে বাঁচবে? আমি যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে পড়ছিলাম, দেখলাম মানুষ বারবার বলছে, ‘আমাদের আশা রাখতে হবে’, ‘আমরা হার মানব না।’ কিন্তু আমি ভাবতে শুরু করলাম, সংকটের মধ্যে আশা দেখতে কেমন হয়? যদি আশা কখনও নির্মম হয়ে ওঠে? যদি আমার ব্যক্তিগত আশা সমাজের বৃহত্তর আশার সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তখন আমি কী করব?
২০২১ সালে আমার সন্তান জন্মানোর পর এই ভাবনাগুলো আরও গভীর হয়। তার আগে বইটি এগোচ্ছিল না। গল্প অন্যদিকে যাচ্ছিল, চরিত্রগুলোও প্রাণ পাচ্ছিল না। কিন্তু সন্তান জন্মের পর ভালোবাসার এক প্রবল ঢেউ আমার মধ্যে এলো। মনে হলো, এক নতুন দরজা খুলে গেছে। আমি ভাবতে শুরু করলাম—আমার সন্তানের জন্য আমি কী করতে পারি? কত দূর যেতে পারি? আর যদি এই ভালোবাসা আমার নৈতিকতার সঙ্গে সংঘাত আসে, তখন আমি কী করব?
রোয়ান বেয়ার্ড :
এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, প্রায় সব চরিত্রই নৈতিকতার ধূসর জায়গায় আছে। তারা এমন কিছু করে, যা আমরা হয়তো সমর্থন করি না, কিন্তু তাদের অবস্থাও বুঝতে পারি। দুর্যোগের সময় আপনি নৈতিকতার কোন দিক নিয়ে ভাবতে চেয়েছেন?
মেঘা মজুমদার :
আমি সবসময় নৈতিক দ্বন্দ্বে আগ্রহী। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে ক্ষমতার কাঠামো সব সময় আমাদের পক্ষে কাজ করে না। সেখানে টিকে থাকতে গিয়ে সবাইকে নিজের উপায় খুঁজে নিতে হয়। আমরা প্রতিদিনই ভাবি, সঠিক কাজটি কী? আমি কতটা পর্যন্ত সঠিক থাকতে পারি? যদি আমার মঙ্গল অন্য কারও ক্ষতি করে, তখন কী করব?
এই ধূসর জায়গার মধ্যেই আমি গল্প খুঁজে পাই। আমার বইয়ে কোনো একমাত্র খলনায়ক বা সাধু নেই। আমি দেখতে চেয়েছি, একেবারে সাধারণ মানুষ—একজন মা, একজন দাদু, এক বড় ভাই—যখন চাপে পড়ে নিজের সীমা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তখন সে কী করে। যখন নীতিবোধ ভেঙে পড়ে, আর একটাই তাগিদ থাকে—নিজের সন্তানকে বাঁচানো—তখন মানুষের মানবিকতা কেমন হয়ে ওঠে, সেটাই আমার অনুসন্ধান।
রোয়ান বেয়ার্ড :
আপনি ভবিষ্যতের যে কলকাতার ছবি এঁকেছেন, তা খুবই জীবন্ত। পাঠক যেন একসঙ্গে দুটি শহর কল্পনা করে—একটি বর্তমানের, অন্যটি স্মৃতির। নিজের শহরকে এভাবে বদলে যেতে ভাবা কেমন ছিল?
মেঘা মজুমদার :
নিজের প্রিয় শহরকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবস্থায় কল্পনা করা কষ্টের ছিল। কিন্তু সেই কল্পনাই আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে—কলকাতা খুব দৃঢ় শহর, এর মানুষও দৃঢ়। আমি সেই দিকটাও বইতে রাখতে চেয়েছি। কলকাতার মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবেশীকে সাহায্য করা বা সাহায্য চাওয়া এখানে জীবনের অংশ। এটা দুর্বলতা নয়, বরং ভালোবাসার রূপ।
আরেকটা ব্যাপার—কলকাতায় হাস্যরস আছে। মানুষ জানে কীভাবে হাসির মধ্য দিয়ে বিপদ সামলাতে হয়। তাই আমি বইতে দুঃখের সঙ্গে হাসিও রেখেছি। কারণ এই শহরের মানুষ জানে কীভাবে টিকে থাকতে হয়, কীভাবে একে অপরের দিকে হাত বাড়াতে হয়।
রোয়ান বেয়ার্ড :
এই উপন্যাস যেমন গভীর নৈতিক প্রশ্ন তোলে, তেমনি গল্পের গতি এমন যে থামা যায় না। বইটির কাঠামো কীভাবে গড়েছিলেন? শুরু থেকেই কি এই পরিকল্পনা ছিল?
মেঘা মজুমদার :
আমি গল্পের কাঠামো নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। চাই, পাঠক যেন আমার ভাবা জায়গায় পৌঁছে যায়। প্লট সেই কাজটাই করে। আমি এমন গল্প লিখতে পছন্দ করি, যা একই সঙ্গে টানটান ও ভাবনা-জাগানিয়া। পাঠক যেন একদিকে পৃষ্ঠা উল্টায়, আর অন্যদিকে থেমে ভাবতে বাধ্য হয়।
শুরু থেকেই আমি জানতাম, আমি গল্পটিকে ছোট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব। পুরো এক বছর নয়, বরং সাত দিনের মধ্যে উপন্যাসটির কালসীমা হবে। এই কাঠামো গল্পটাকে গতি দিয়েছে, এবং চরিত্রগুলোর ওপর চাপ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
রোয়ান বেয়ার্ড :
বইয়ের ধনী নারী চরিত্রটি, যিনি ষড়ভুজাকৃতি ভবনে থাকেন, ভয়ানকভাবে স্মরণীয়। তাঁকে কীভাবে গড়েছেন?
মেঘা মজুমদার :
আমি শ্রেণি-বৈষম্য নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি। ভিন্ন সম্পদ ও অবস্থার মানুষ সংকটে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটাই আমার আগ্রহ। একদিকে মা, যিনি মধ্যবিত্ত ও অভিবাসনের পথে। তাঁর হাতে কিছু সংস্থান আছে। অন্যদিকে বুম্বা, যে গ্রামের দারিদ্র্য থেকে শহরে এসে কোনো ভরসা ছাড়াই বেঁচে আছে।
এদের বিপরীতে আমি ভেবেছিলাম অত্যন্ত ধনী কেউ হলে সে কেমন আচরণ করবে? সেই ভাবনা থেকেই ধনী নারী চরিত্রটি তৈরি। তাঁর মধ্যে স্বার্থপরতাও আছে, আবার এক ধরনের উদারতাও। এই নারী শহর ছাড়তে চায় না। কারণ শহর পুনর্গঠনের সময় সে লাভের সুযোগ দেখছে। একই সঙ্গে শহর ও শিশুদের প্রতি তার একধরনের ভালোবাসাও আছে। সে জানে, মানুষ তার কাজকে কীভাবে বিচার করে—সে সাহায্য করলে কিংবা না করলে লোকজন কী ভাবে। তাই তার চরিত্রে স্বার্থ ও আত্মত্যাগ একসঙ্গে মিশে গেছে।
রোয়ান বেয়ার্ড :
শেষের কথা পাঠকদের জন্য গোপন রাখব, কিন্তু বলতেই হয়—শেষটা এত গভীর ছিল যে পড়া শেষ করেও ঘুমাতে পারিনি। আপনি কি প্রথম থেকেই জানতেন, গল্পটি কীভাবে শেষ হবে?
মেঘা মজুমদার :
আমি লেখার শুরুতেই একটা সমাপ্তির ধারণা রাখি, কারণ তা বইকে পথ দেখায়। তবে প্রথমে ভেবেছিলাম, শেষটা অন্যরকম হবে। দীর্ঘদিন সেই সমাপ্তির দিকে কাজ করছিলাম। পরে আমার স্বামী ও সম্পাদক বইটি পড়ে দারুণ কিছু মত দেন। তখন বুঝলাম, শেষটা বদলাতে হবে। আমার সম্পাদক খুবই দক্ষ। তাঁর সাহায্যেই শেষ অংশটি পরিপূর্ণ হয়। তিনি এমন সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনেছিলেন, যা গল্পকে তার যথাযথ জায়গায় পৌঁছে দেয়।
অনেক লেখক লেখার মধ্যেই সমাপ্তি খুঁজে পান। কিন্তু আমি বরাবরই জানতে চাই, আমার চরিত্রগুলোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি, তাদের এবং পাঠকের জন্য কী ধরনের আবেগীয় পরিণতি অপেক্ষা করছে। শেষের কোনো না কোনো রূপ সবসময় আমার মনে থাকে, যদিও পরে তা পরিবর্তিত হয়।
রোয়ান বেয়ার্ড :
আপনি নৃবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। এই বিষয়টি আপনার লেখায় কীভাবে প্রভাব ফেলেছে?
মেঘা মজুমদার :
নৃবিজ্ঞান শেখায় অন্যের জগতে প্রবেশ করতে হয়, তাদের গল্প শুনতে হয়। যাদের জীবন একেবারে আলাদা, তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করতে হয়। এই শোনার মধ্যেই একটা জটিলতা আছে। আপনি যতই বোঝার চেষ্টা করেন, সবটা বুঝতে পারবেন না। এই সীমাবোধ বা বিনয় একজন লেখকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একজন নৃবিজ্ঞানী যেমন মানুষকে বোঝার চেষ্টা করে, তেমনি একজন কথাসাহিত্যিকও চরিত্র বোঝার চেষ্টা করে। গল্প লিখতে গেলে এই বিনয়, এই অসম্পূর্ণ বোঝাপড়ার স্বীকারোক্তিই লেখাকে গভীর করে তোলে।
রোয়ান বেয়ার্ড :
আজকের দিনে অনেকে সাহিত্যকে বেছে নিচ্ছেন বাস্তবতা থেকে পালানোর জন্য। আপনি নিজে সাহিত্য থেকে কী খোঁজেন?
মেঘা মজুমদার :
পড়ার আনন্দ নানা রকম হতে পারে। প্রত্যেকের বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আলাদা। আমি ছোটবেলায় রহস্যকাহিনির ভক্ত ছিলাম—Nancy Drew, The Hardy Boys, Sherlock Holmes। বইয়ের ঘরানা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ যা পড়তে চায়, সেটাই তার জন্য ঠিক। তবে আমি সবচেয়ে ভালোবাসি এমন বই, যেগুলো আমাদের বাস্তব পৃথিবীর কথা বলে। যেগুলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, অথবা কিছু গভীর কথা বলতে চায়।
যখন দেখি, লেখক তাঁর বইয়ের মাধ্যমে আমার সঙ্গে কথা বলছেন, তখন আমি আনন্দ পাই। আমার মনে হয়, বই আসলে এক ধরনের যোগাযোগ। লেখক ও পাঠকের মধ্যে এক নীরব সংলাপ। আর এই সংলাপই সাহিত্যকে জীবন্ত করে রাখে।·


0 মন্তব্যসমূহ