সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : ড্যান হোয়াইট
বাংলা ভাষান্তর : শুভশ্রী বিন্তু
পারসিভাল এভারেট (জন্ম. ১৯৫৬) সমকালীন মার্কিন কথাসাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (USC) ইংরেজির বিশিষ্ট অধ্যাপক। ব্যঙ্গ, দার্শনিক ভাবনা, ভাষা-রাজনীতি ও পরিচয়ের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে তিনি তীক্ষ্ণ, বহু-স্বরে কথা বলা উপন্যাস নির্মাণ করেন। সাম্প্রতিক উপন্যাস জেমস (James)-এর জন্য তিনি ২০২৪ সালের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ও ২০২৫ সালের পুলিৎজার পুরস্কার—দুটিই পেয়েছেন। বইটি ২০২৪ সালের বুকার পুরস্কারেও শর্টলিস্ট হয়েছিল এবং কার্কাস প্রাইজ জিতেছিল।
এভারেটের খ্যাতির একটি বড় স্তম্ভ Erasure (২০০১)—যার রূপান্তরিত চলচ্চিত্র American Fiction (২০২৩)। ২০২৪ সালের অস্কারে সেরা অভিযোজিত চিত্রনাট্য জিতেছে। এ কাজটি মূলধারার প্রকাশনা ও ‘স্টেরিওটাইপড’ কৃষ্ণাঙ্গ বয়ানকে কটাক্ষ করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
James–এ তিনি মার্ক টোয়েনের Huckleberry Finn–কে জিম/জেমসের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরাকল্পনা করেন—যেখানে জেমস একজন পাঠক, চিন্তক ও নৈতিক সিদ্ধান্তে দৃঢ় ব্যক্তি; ভাষা, ধর্ম, স্বাধীনতা ও মানবতার প্রশ্নে তিনি নিজস্ব স্বরে কথা বলেন। বইটি ‘অতীতের মুখোমুখি হয়েও অগ্রগতির আশা দেখানো’ এক শক্তিশালী রচনা হিসেবে বিচারকদের উচ্চ প্রশংসা পেয়েছে।
এভারেট দু্ই দফা বুকার শর্টলিস্টেড (২০২২–The Trees, ২০২৪–James), উইন্ডহ্যাম-ক্যাম্পবেল ফিকশন পুরস্কার (২০২৩)–সহ অনেক সম্মাননায় ভূষিত; Telephone (২০২০) উপন্যাসটি ২০২১ সালের পুলিৎজারে ফাইনালিস্ট ছিল।
এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন বার্তামূলক (message) উপন্যাসে তিনি আগ্রহী নন; লিখতে বসে তিনি ‘নিজস্ব বিশ্বাস ভুলে’ কেবল শিল্পের নির্মাণে মন দেন। পড়াকে তিনি সবচেয়ে ‘বিপ্লবী’ কাজ হিসেবে দেখেন। বই নিষেধাজ্ঞা ও সেন্সরশিপকে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ বলেছেন। পারসিভাল এভারেট এমন এক লেখক যিনি বিনোদন, বুদ্ধিবৃত্তি ও ভাষিক পরীক্ষার বিরল সংমিশ্রণে ধারাবাহিকভাবে আমেরিকান সাহিত্যের নৈতিক ও নান্দনিক সীমানা প্রসারিত করছেন।
নির্বাচিত গ্রন্থতালিকা
Erasure (২০০১) — ব্যঙ্গাত্মক মেটাফিকশন; চলচ্চিত্র American Fiction–এর উৎস।
I Am Not Sidney Poitier (২০০৯) — পরিচয় ও সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক রচনা।
The Trees (২০২১) — লিঞ্চিং-ইতিহাসকে ঘিরে নয়ার-ধাঁচের রাজনৈতিক থ্রিল; বুকার শর্টলিস্ট (২০২২)।
Telephone (২০২০) — শোক ও হারানোর ন্যারেটিভ; পুলিৎজার ফাইনালিস্ট (২০২১)।
James (২০২৪) — Huckleberry Finn–এর র্যাডিকাল রিম্যাজিনিং; NBA ২০২৪ ও পুলিৎজার ২০২৫ বিজয়ী, বুকার শর্টলিস্ট ২০২৪।
পূর্বলেখ
এই বসন্তে পারসিভাল এভারেট কথা বলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সান্তা ক্রুজের হিউম্যানিটিজ রাইটার ড্যান হোয়াইটের সঙ্গে। আলোচনার বিষয় ছিল ২০২৪ সালের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত তার উপন্যাস James নিয়ে। মার্ক টোয়েন Huckleberry Finn উপন্যাস লিখেছেন একজন শ্বেতাঙ্গের দৃষ্টিতে দাসদের জীবন নিয়ে। সেখানে দাসত্বকে এক রোমাঞ্চকর বিষয় হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। আর জেমস উপন্যাসটি লেখা হয়েছে দাস চরিত্র জিমের দৃষ্টিকোণ থেকে।একজন দাসের দৃষ্টিকোণ থেকে। দাসটির নাম জিম। এভারেট নিজের লেখালেখি নিয়ে কথা বলেন হোয়াইটের সঙ্গে। অনানুষ্ঠানিক, মুক্ত আলাপে তিনি বলেন কীভাবে তিনি মৃত লেখকদের রচনার সঙ্গে এক চলমান সংলাপে যুক্ত থাকেন, কীভাবে স্ক্রিনরাইটার হিসেবে কাজ করেছেন, এবং কেন তিনি কখনোই পাঠকের জন্য সহজ বার্তাবাহী উপন্যাস লিখতে চান না।
ড্যান হোয়াইট (DW) :
আপনি এখন কোথা থেকে কথা বলছেন?
পারসিভাল এভারেট (PE) :
আমি আমার স্টুডিওতে আছি। আমার পেইন্টিং স্টুডিও কয়েক ব্লক দূরে। এখানে আমি লিখি, কিন্তু মূলত গিটার আর ম্যান্ডোলিন মেরামত করি। কোভিডের সময় আমি এটা শুরু করি—তখন আমি ১৮ ডলারে ভাঙা গিটার পেতাম, একটু সারিয়ে তুললে সেটি হতো এক সুন্দর গিবসন এল মডেলের গীটার। কিন্তু এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে গিটারগুলোর দাম ২০০–৩০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে। কারণ অন্যরাও এই শখ আবিষ্কার করেছে। (হাসি)
DW :
শুনে মনে হচ্ছে ড্যানিয়েল ডে-লুইস এক বছর ছুটি নিয়ে জুতো বানানোর কাজ শুরু করেছিলেন—তার মতোই কিছু!
PE :
(হাসি) দারুণ ধারণা—হয়তো আমার পরের শখ সেটাই হবে।
DW :
শুনেছি আপনি ঘোড়া প্রশিক্ষণও দেন। নিশ্চয়ই এই অভিজ্ঞতাগুলোও আপনার লেখায় কোনো না কোনোভাবে ঢুকে পড়ে?
PE :
এখন আর দিই না। এখন বরং আমার দুই কুকুরই আমাকে প্রশিক্ষণ দেয়। তবে হ্যাঁ, আমি মনে করি, শিল্প সৃষ্টির মূল শিক্ষা সবসময় পশুদের কাছ থেকেই পাই।
DW :
ঠিক বলেছেন। পশুদের উপস্থিতি-বোধ খুব তীব্র—তারা তো ‘এখন’-এই বেঁচে থাকে।
PE :
কোনো ঘোড়া কখনো আমাকে মিথ্যা বলেনি।
লেখালেখি ও সংলাপ
DW :
আপনি বলেছিলেন যে James লেখার সময় আপনি যেন মার্ক টোয়েনের সঙ্গে ‘সংলাপে’ ছিলেন। কারিগরি অর্থে এর মানে কী? অন্য সময়ের কোনো লেখকের সঙ্গে সংলাপে থাকা কেমন অনুভূতি?
PE :
আমি মনে করি আমি সৌভাগ্যবান, কারণ আমি এমন এক চলমান আলোচনায় অংশ নিতে পারছি—ব্যাপারটিকে গল্প বলার চেয়ে বরং ‘অর্থ নির্মাণ’-এর প্রক্রিয়া বলা যেতে পারে। আমি নিজে অর্থ তৈরি করি না, বরং অর্থ গঠনের উপাদান হাজির করি।
আমি কৈশোরে কার্ট ভনেগাটের অনুগামী ছিলাম—চৌদ্দ বছর বয়সেই তার নতুন বইয়ের অপেক্ষায় থাকতাম। যদিও আমি তার মতো কিছুই লিখি না, তবু পৃথিবীকে দেখার ও প্রতিক্রিয়া জানানোর যে ভঙ্গি তিনি ব্যাবহার করেছেন, তা আমার লেখায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি যেভাবে শিল্পের প্রতি একরকম উদারতা দেখাতেন, সেটা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে। লিখতে গিয়ে আমি এসব ভাবি না—বরং লেখার বাইরে থাকলে ভাবি। আসলে আমি লেখার সময় কিছুই ভাবি না—বলার মতো কোনো অর্থবোধক প্রক্রিয়া তখন ঘটে না। জানি না, কথাটা বোঝাতে পারলাম কি না।
DW :
বুঝেছি—কারণ লেখালেখি আপনার কাছে একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।
PE :
একদম ঠিক। লেখায় আমি বার্তা বা ‘মেসেজ’ দিতে ভালোবাসি না। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস ত্যাগ করি না, কিন্তু সেগুলো নিয়েও লিখি না। কারণ রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করলেই তা বার্তামূলক উপন্যাসে পরিণত হয়—আর আমি সে পথে যাই না।
থিম ও দর্শনের ভূমিকা
DW :
তাহলে এই বিষয়গুলো নিজে থেকেই আপনার লেখায় উঠে আসে?
PE :
হ্যাঁ, আমরা এগুলোকে ঠেকাতে পারি না। যেগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো আসবেই। আমি প্রায়ই কোনো বিমূর্ত যুক্তিগত বা অঙ্কসংক্রান্ত সূত্রের ভিত্তিতে লেখার শুরু করি। এগুলো পাঠকের দেখার কথা নয়। সেই ধারণা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গল্প খুঁজে পাই—তা আমাকে ভাবার সুযোগ দেয়। গল্পগুলো আপাতভাবে অসংলগ্ন, কিন্তু আমার কাছে তারা পূর্ণ হয়ে ওঠে।
জেমস লেখার অভিজ্ঞতা
DW :
জেমস তো তুলনামূলকভাবে সরল বর্ণনামূলক উপন্যাস। এটি কি আপনার আগের জটিল উপন্যাসগুলোর (যেমন Dr. No, Glyph) চেয়ে আলাদা ছিল?
PE :
অবশ্যই। এখানে আমি কাজ করেছি একটি বিদ্যমান টেক্সটের সঙ্গে, এবং গবেষণাও আলাদা ছিল। আমার ‘গবেষণা’ বলতে মূল টেক্সটটিকে ভুলে যাওয়া। আমি টোয়েনের শব্দগুলো ভুলে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার সৃষ্টি করা দুনিয়াটা মনে রাখতে চেয়েছিলাম। তাই Huck Finn দশবার পড়ে আমি বইটা বন্ধ করে দিই—লেখা শুরুর পর আর একবারও খুলি না। জেমস-এর যা কিছু আছে তা মূল টেক্সট থেকে আসেনি। সব আমার স্মৃতিতে থাকা সেই জগত থেকে এসেছে।
DW :
শুনেছি আপনি Huck Finn বহুবার পড়েছিলেন প্রস্তুতি হিসেবে?
PE :
ঠিক তাই—পড়ে আমি ক্লান্ত হয়ে যাই। যেমন কোনো শব্দ বারবার বললে তা অর্থহীন লাগে, ঠিক তেমন—দশমবার পড়ার পর পুরোটা বাজে লাগছিল।
পাঠকের আগ্রহ ও লেখকের ক্লান্তি
DW :
এখন James-এর সাফল্যের কারণে Huckleberry Finn-কে ঘিরে নতুন আলোচনাও শুরু হয়েছে। কিন্তু আপনি তো সাধারণত নতুন কাজে চলে যান। এতদিন ধরে জেমস-এর সঙ্গে থাকা কি কঠিন হয়ে পড়ছে?
PE :
না, আমি এখনো কাজ করছি, তবে আলাদা ভাগে। বইটার প্রতি আগ্রহ প্রশংসনীয়, কিন্তু আমি শেষ করেই আগ্রহ হারিয়েছি। মানুষ যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা আমি ভাবিনি—এই কারণেই তো লিখি। কিন্তু হ্যাঁ, আমি জেমস নিয়ে একেবারে ক্লান্ত। (হাসি)
DW :
এখন হয়তো তরুণ পাঠক বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়ারা কিআপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছে?
PE :
হ্যাঁ, করছে। যদিও আমার অন্য বইগুলো সাধারণত পরিণত বয়সের পাঠকরা আবিষ্কার করে। সেক্ষেত্রে জেমস অনেক বেশি সহজ বয়ানে লেখা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সবচেয়ে বেশি চিঠি আসছে ৬০–৭০ বছরের শ্বেতাঙ্গ পাঠকদের কাছ থেকে! প্রতিদিনই কেউ না কেউ লেখে, ‘আমি আশি বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ নারী!’ ইত্যাদি। সত্যিই মিষ্টি ব্যাপার। আমি আনন্দিত, কারণ এটা প্রমাণ করে যে আজও একটি সাহিত্যিক উপন্যাস জনমনে আলোড়ন তুলতে পারে। এটা আমার বই বলে ভালো লাগছে। তবে উপন্যাস হিসেবে এটা অনেক গুরুত্ব পাচ্ছে বলে আরও ভালো লাগছে ।
লেখালেখি ও সময়ের প্রশ্ন
DW :
এত বড় কৃতিত্বের পর জেমস লেখাটা কি আপনার ক্যারিয়ারের এক বিশেষ মুহূর্তে এসেছে? দশ বছর আগে কি এটা লেখা সম্ভব ছিল?
PE :
প্রতিটি বই আলাদা হলেও তাদের মধ্যে ভাবগত বা বিষয়গত সম্পর্ক আছে। তবে প্রথম বই Suder (১৯৮৩) ব্যতিক্রম। সেটাকে কোথায় রাখব জানি না। আমি বিভিন্ন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা করি—কয়েকটি বই ধরে। হয়তো দশ বছর আগে লিখলে জেমস অন্যরকম হতো। কে জানে!
DW :
আপনি তো বিভিন্ন ধরনের বই লিখেছেন। আমি যদি আপনার এজেন্ট হতাম, তবে জেমস–এর সিক্যুয়েল চাইতাম। আপনার মনোভাব কী?
PE :
এই মনোযোগে আমার কিছু আসে যায় না। এটা এমন, যেন হঠাৎ এমন একদিন এল যখন আমি এমন একটা শার্ট পরলাম যা সবাই পছন্দ করল। পরের দিন সেটি ওয়াশিং মেশিনে দিলাম। (হাসি)
DW :
আর একবার ওয়াশিং মেশিনে পড়লে কিছু করার থাকে না!
PE :
একদম। আমি লিখি কারণ পৃথিবীর নানা বিষয়ে আমার আগ্রহ আছে। কখনো জনপ্রিয় হওয়ার আশায় লিখিনি। পরের বইটাও আলাদা হবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে বুঝেছি—সময় সীমিত। তাই এখন কেবল সেইসব বিষয়েই লিখি, যা আমার শিল্প ও দর্শনের কৌতূহল জাগায়। সাফল্যের আশায় লিখি না।
ভবিষ্যৎ কাজ ও দর্শন
DW :
এখন আপনি কী নিয়ে কাজ করছেন?
PE :
(হাসি) বলব না। শুধু বলি, এটা একটা উপন্যাস। যদি এক কথায় বোঝানো যেত, তবে আমি পুস্তিকা লিখতাম, উপন্যাস নয়।
DW :
ভবিষ্যতে এমন কিছু লিখতে চান যা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন? আপনি একবার বলেছিলেন, সম্পূর্ণ বিমূর্ত একটি উপন্যাস লিখতে চান।
PE :
হ্যাঁ, এখনো চেষ্টা করছি লেখাকে ছোট ও সংক্ষিপ্ত করার, এবং বিমূর্ত কাজ তৈরি করার। কিন্তু আমাদের শিল্পের উপাদানগুলো—শব্দ—নিজেই প্রতীকী ও বাস্তবের সঙ্গে যুক্ত, তাই বিমূর্ত রচনা করা কঠিন। তবু মনে হয় সম্ভব। আমি জানি না সেটা কেমন হবে, এমনকি লিখেও বুঝব কি না যে হয়েছে কি হয়নি। হয়তো কেউ বলবে, ‘দেখো, বাসে চাপা পড়ার আগে সে এটা করেই ফেলেছিল!’ (হাসি) তবে এটা মাথায় ঘুরছে সবসময়।
শিক্ষকতা ও তরুণ লেখক
DW :
আপনি শিক্ষকও। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুই ধরনের ছাত্রকেই পড়ান। ক্লাস কীভাবে পরিচালনা করেন?
PE :
আমি আসলে স্নাতক ছাত্রদেরই বেশি পছন্দ করি—তারা বেশি সাহসী। উপন্যাস লেখার কোনো ‘সঠিক’ পদ্ধতি আছে—এই ধারণাটি ভেঙে ফেলার কাজটি হলো স্নাতকোত্তর ছাত্রদের কাজ। আমি তাদের সেই রুটিন থেকে বের করে আনতে চাই। স্নাতকরা তুলনামূলকভাবে খোলামেলা। তাদের লেখা হয়তো অসম্পূর্ণ, কিন্তু অনেক বেশি প্রাণবন্ত। আমি মনে করি, পৃথিবীর কোনো আকর্ষণীয় সাহিত্যকর্মই সম্পূর্ণ সফল নয়। সাহিত্যের মজা তো সেখানেই—একটি গল্প কোথায় ব্যর্থ হয়, সেটাই সবচেয়ে মুগ্ধকর জায়গা। ব্যর্থতা খারাপ কিছু নয়—বরং সেখানেই সাহিত্য জীবন্ত হয়ে ওঠে।
DW :
তাহলে আপনি বলতে চাইছেন, সফল সাহিত্যকর্ম মূলত এমন কিছু থেকে জন্ম নিতে পারে, যেটাকে শুরুতে ব্যর্থ বলা হয়েছিল?
PE :
না, আমি বলছি সব মহান উপন্যাসই কোনো না কোনোভাবে ব্যর্থ হয়—আর সেই ব্যর্থতাই তাদের আকর্ষণীয় করে তোলে। The Adventures of Huckleberry Finn—আসলে যদি ভালোভাবে বিশ্লেষণ করি, খুব নিখুঁত উপন্যাস নয়—কিন্তু নানা কারণে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প এমনই এক জিনিস, যা নিজের অসম্পূর্ণতা থেকেই নতুন কিছু শেখায়। আমি সবকিছু পড়ি, এমনকি যেগুলো আমার ভালো লাগে না, কারণ আমি সেখান থেকেও কিছু শিখি।
টোয়েনের ব্যর্থতা ও পুনর্মূল্যায়ন
DW :
Huckleberry Finn ঠিক কোন জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
PE :
টোয়েন বইটির মাঝপথে কয়েক বছর লেখাই বন্ধ রেখেছিলেন। ফলে সেই ভাঙনের দাগ উপন্যাসে চোখে পড়ে। চোখে পড়ে তার ভাষার পরিবর্তন, গতির পরিবর্তন, বর্ণনার দিক পরিবর্তন। তিনি হাকের নৈতিক সংকটের ধারা কিছুটা ত্যাগ করে আবার টম সয়্যারের মাধ্যমে একরকম ‘অ্যাডভেঞ্চার গল্পে’ ফিরে গেছেন। দুঃখজনকভাবে বলতে হয়, এটা ছিল আর্থিক প্রেরণায় নেওয়া সিদ্ধান্ত—কারণ টম সয়্যার ছিল তার জনপ্রিয় ও আয়-উৎপাদক চরিত্র, আর টোয়েন তখন প্রায়ই ঋণে জর্জরিত। তাই শেষভাগটা ভেঙে পড়ে—আর যে চরিত্রের জন্য আমি সবচেয়ে বিরক্ত, সে টম সয়্যারই।
তবু আমি চেষ্টা করেছি বইটাকে একটু উদার দৃষ্টিতে দেখার। হয়তো বলা যায়, টোয়েনের মধ্যেও একধরনের মানবিকতা ছিল। তিনি পুনর্গঠন-পরবর্তী দক্ষিণে মুক্ত দাসদের দুর্দশা নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতেন। হয়তো টম ও হাক জিমকে যেভাবে ব্যবহার করছে—সেটি প্রতীকীভাবে তুলে ধরছে তখনকার বাস্তবতা। উত্তর ও দক্ষিণ দুই দিকেই মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের খেলনার মতো ব্যবহার করা হচ্ছিল। এটা টোয়েনের সচেতন উদ্দেশ্য নাও হতে পারে, কিন্তু পাঠক হিসেবে আমরা সেভাবে উদার দৃষ্টিতে পড়তে পারি।
একজন লেখিকা আছেন—কেরি ড্রিসকল—তিনি Mark Twain Among The Indians And Other Indigenous Peoples নামে এক অসাধারণ বই লিখেছেন। সেখানে তিনি টোয়েনের নেটিভ আমেরিকানদের চিত্রণ বিশ্লেষণ করেছেন। বইটি পড়ে কেউই খুব ইতিবাচক অনুভূতি পাবে না। টোয়েন আসলে নেটিভদের ব্যাপারে প্রবল পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। আমি সম্প্রতি এই বিষয়টি জেনেছি এবং এখন আফ্রিকান-আমেরিকানদের প্রতি টোয়েনের মনোভাব নিয়েও পুনর্বিবেচনা করছি।
অবশ্যই আমি বুঝতে পারি, আমি টোয়েনের চেয়ে ১৪০ বছর বেশি ‘মানব সভ্যতার বিবর্তন’–এর সুবিধা ভোগ করছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি কেউ নিজের বর্ণবাদী মনোভাব চিনতেই না পারে, স্বীকারও না করে, তাহলে সে কখনোই সেটাকে সৎভাবে মোকাবিলা করতে পারবে না। টোয়েন তার সময়ের সন্তান। তাই কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি তার মনোভাব ছিল অনেকটাই ‘পিতৃসুলভ’—সেটা মূলত একধরনের বর্ণবাদই। সেই কারণেই লক, রুশো ও ভলতেয়ারকে আমি James–এর ভেতরে এনেছি।
জেমস চরিত্রের পিতৃরূপ ও ভাষার প্রসঙ্গ
DW :
Huckleberry Finn-এ টোয়েন যে জায়গাগুলো এড়িয়ে গেছেন—যেমন হাকের প্রতি জিমের পিতৃসুলভ ভূমিকা—আপনি সেগুলো স্পষ্ট করেছেন। এই ধারণাটা লেখার শুরু থেকেই কি আপনার মাথায় ছিল?
PE :
হ্যাঁ, একদম শুরু থেকেই। আসলে টোয়েনের দুনিয়াতেও সেটি আছে, যদিও তিনি জিমকে এমনভাবে দেখিয়েছেন—অন্ধবিশ্বাসী, সরল, চিন্তার গভীরতায় অপারগ—যে পাঠকের কাছে তিনি তেমন জটিল চরিত্র হয়ে ওঠেন না। কিন্তু আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেলি, এই দিকটা আসলে লুকানো অবস্থায় আছে, এবং সেটাই ধরতে চেয়েছি।
DW :
আপনার উপন্যাসে জেমসের এই পিতৃরূপ নিয়েও যেমন আলোচনা চলছে, তেমনি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে তার ভাষার পরিবর্তন—অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে একভাবে, শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে আরেকভাবে কথা বলা।
PE :
সবাই একে ‘কোড-সুইচিং’ বলে। আমি একে বলি ‘মানুষ হওয়া’। টিকে থাকার জন্য ভাষা হলো প্রথম শিক্ষিতভাবে বেঁচে থাকার কৌশল। এর জন্য আলাদা নাম দেওয়ার দরকার নেই। (হাসি) আমি তো খাওয়া-দাওয়া করাকে ‘নিউট্রিশন ইনজেকশন’ বলি না!
DW :
হ্যাঁ, জেমস তো তার পড়াশোনা ও জ্ঞান সম্পূর্ণ গোপন রাখতে বাধ্য ছিল—কারণ পড়তে শেখা মানেই মৃত্যুর ঝুঁকি।
PE :
ঠিক তাই। আর আজও সেটা সম্ভব।
DW :
কীভাবে বলছেন?
PE:
আপনি কি ‘ফ্লোরিডা’ নামে একটি রাজ্যের কথা শুনেছেন? (হাসি)
বই নিষেধ, সেন্সরশিপ ও পাঠের বিপ্লব
DW :
(হাসি) যেহেতু ফ্লোরিডার কথা উঠল—আপনি তো প্রকাশ্যে বই নিষিদ্ধের বিরোধিতা করেছেন।
PE :
হ্যাঁ, কারণ এটা ফ্যাসিবাদের লক্ষণ। ফ্যাসিস্টরা প্রথমেই বই ও শিল্পের ওপর হামলা চালায়—কারণ সেখানেই আমাদের সবচেয়ে মানবিক সত্তা প্রকাশ পায়। আসলে লেখালেখি নয়, পড়াটাই সবচেয়ে বিপ্লবী কাজ। দ্বিতীয় সবচেয়ে বিপ্লবী কাজ হলো বইপাঠের আলোচনা—যেমন কোনো বই ক্লাবে যোগ দেওয়া। কারণ আপনি তখন শিল্পকে জীবিত রাখছেন, চিন্তাকে সক্রিয় রাখছেন—এটাই অসাধারণ ব্যাপার।
DW :
সেই অর্থে দেখলে, ‘Deep Read’ প্রোগ্রাম তো এক বিশাল বিপ্লবী বই ক্লাব!
PE :
ঠিক তাই। আমি যখন এসব অনুষ্ঠানে যাই, বলি—আমরা সবাই সাহিত্য ভালোবাসি, কিন্তু বাস্তবে এই গোষ্ঠীটি খুব বড় নয়। আমার প্রকাশক যদি ৫০ হাজার কপি বিক্রি করে, তারা উৎফুল্ল হয়; কিন্তু যদি আমি ৫০ হাজার অ্যালবাম বিক্রি করতাম, আর রেকর্ডই করতাম না! আমরা পাঠক-সংস্কৃতিতে বাঁচি না—এটাই বাস্তবতা। আমি চাই আমরা আরও বেশি পাঠক হই।
DW :
হ্যাঁ, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন ইতিহাসে এখন মানুষ সবচেয়ে কম বই পড়ছে।
PE :
মজার বিষয় হলো, জনসংখ্যা তো অনেক বেড়েছে! কিন্তু তারা সেই হিসাবটা মাথাপিছু দিচ্ছে না। (হাসি)
DW :
আমি বুঝি না কেন পাঠ করা সবার কাছে সহজাত মূল্যবোধ নয়।
PE :
টিকটকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে এমন একটা উপন্যাস আমি যদি লিখতে পারি লিখতে পারি, তাহলে হয়তো কিছু আশা আছে।
শিল্প, সমাজ ও মানুষের উন্নয়ন
DW :
আজকের এই পড়াহীন যুগে—আপনি কি এখনো বিশ্বাস করেন শিল্প মানুষকে ভালো করে তুলতে পারে, সমাজকে উন্নত করতে পারে?
PE :
যদি আমি তা না বিশ্বাস করতাম, তাহলে শিল্পই করতাম না। আমি সত্যিই আশা করি এটা সম্ভব। ওয়াল্ট হুইটম্যান By Blue Ontario’s Shores–এ বলেছেন (আমি উদ্ধৃতি করছি না, ভাবটা বলছি)—‘যদি ভালো সমাজ চাও, ভালো মানুষ তৈরি করো।’
আমি যখন ‘শিল্প’ বলি, তখন তার পরিসর খুব বিস্তৃত—শুধু সাহিত্য বা চিত্রকলা নয়, সংগীত, গবেষণা, সাংবাদিকতাও শিল্প। এগুলো আমাদের সংস্কৃতি গড়ে তোলে, তাই আমাদের এগুলোর প্রতি সচেতন থাকা উচিত।
পিকাসোর Guernica পৃথিবী বদলে দিয়েছিল—তবু বাস্তবে অল্প কয়েকজন মানুষই চিত্রটি নিজ চোখে দেখেছে।
চলচ্চিত্র অভিযোজন ও লেখকত্বের সীমা
DW :
আপনি নিজেও তো একজন চিত্রশিল্পী। সেখানে পুরো নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে থাকে। কিন্তু এখন আপনি James-এর চলচ্চিত্ররূপের চিত্রনাট্য লিখছেন—এখানে তো আপনি কেবল একটি বৃহৎ যন্ত্রের ছোট অংশ। কেমন লাগছে এই অভিজ্ঞতা?
PE :
এটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। এখন পর্যন্ত বেশ উপভোগ করছি। বুদ্ধিমান মানুষের সঙ্গে কাজ করছি। এমন কিছু লিখছি যার প্রতি ব্যক্তিগত মালিকানা আমার নেই। আমি ভালো কাজ করতে চাই। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণ আসলে উপন্যাস লেখার মতো নয়। চলচ্চিত্র সহযোগিতামূলক শিল্প—আমি চলচ্চিত্র নির্মাতা নই, তাই কোনো নির্দিষ্ট ‘ভিশন’ও নেই। আমি আমার অংশটা করব, কিন্তু চূড়ান্ত ফল হয়তো আমার ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা হবে—আমি সেটার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
DW :
আপনি তো Erasure উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা পেয়েছেন—যেটি পরে American Fiction নামে সিনেমা হয়েছে।
PE :
হ্যাঁ, সেই চলচ্চিত্র তৈরির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না—শুধু কয়েকজন ভালো বন্ধু পেয়েছিলাম। তবে আমি সিনেমাটা বেশ পছন্দ করেছি। আর যদি না-ও করতাম, তবু এটি দারুণ এক অভিজ্ঞতা—নিজের লেখা থেকে এক নতুন শিল্পকর্মের জন্ম হতে দেখা সত্যিই আনন্দের ব্যাপার। ·
সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : এপ্রিল ২৪, ২০২৫



0 মন্তব্যসমূহ