সাক্ষাৎকারে হারুকি মুরাকামি : আমার পাঠকের সংখ্যা বাড়তে দেখলে বিস্মিত হই


অনুবাদ : শাহনাজ রেজা

হারুকি মুরাকামি জাপানি লেখক। জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৯৪৯। তাঁর লেখা উপন্যাস এবং ছোটগল্প কেবল জাপানে নয়, সারা বিশ্বে সমাদৃত। বিশ্বের পঞ্চাশটি ভাষায় তাঁর লেখা অনূদিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু উপন্যাস : নরওয়েজিয়ান উড, দ্য ওয়াইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিক্‌ল, কাফকা অন দ্য শোর। মুরাকামি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর নতুন উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখক জটিলতা, নারী চরিত্র লেখার পদ্ধতি এবং পাঠকদের সঙ্গে দেখা করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর কথা বলেন John Self-এর সঙ্গে। প্রকাশিত হয়েছে The Guardian পত্রিকায়।

জন সেলফ :
 The City and Its Uncertain Walls বইটি আপনি ১৯৮০ সালে লেখা একটি নভেলার ওপর ভিত্তি করে লিখেছেন। এখন এটাকে নতুন পাঠকের সামনে আনা কেন জরুরি হয়ে উঠল?

হারুকি মুরাকামি :
 এই কাজটি ছিল একমাত্র রচনা, যেটিকে আমি কখনো বই আকারে পুনর্মুদ্রণ করতে দিইনি। সহজভাবে বললে, আমি গল্পটি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমি মনে করতাম এর বিষয়বস্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তখন আমার লেখার দক্ষতা সেই ধারণাটিকে ঠিকভাবে প্রকাশ করার মতো পর্যাপ্ত ছিল না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমি অপেক্ষা করব—যতদিন না আমি লেখক হিসেবে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করি—তারপর আমি সম্পূর্ণ নতুনভাবে গল্পটি লিখব।

কিন্তু এদিকে, যেসব কাজ আমি করতে চেয়েছিলাম সেগুলোই আমাকে ব্যস্ত রেখে দিল, আর আমি এই প্রকল্পে হাত দিতে পারলাম না। বুঝতে না বুঝতেই ৪০ বছর কেটে গেল—চোখের পলকে যেন। আমি সত্তর বছরে পৌঁছে ভাবলাম—এটা করতে হলে এখনই করা উচিত, কারণ আর কতটা সময় আমার হাতে থাকবে আমি জানি না। আমি একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার দায়িত্বও গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম।

জন সেলফ :
 আপনি এই বইটি লকডাউনের সময় লিখেছেন, এবং সেই সময়ে প্রায় ঘরের বাইরে যাননি। এইভাবে লিখতে হওয়া কি গল্পের স্বর বা বিষয়বস্তুতে কোনো প্রভাব ফেলেছে?

হারুকি মুরাকামি :
 অবশ্যই। এই উপন্যাস লেখার সময় আমার নীরবতা, শান্তি এবং ভাবার সময় প্রয়োজন ছিল। শহরটি যে দেয়াল দিয়ে ঘেরা—এই চিত্রটি বিশ্বব্যাপী লকডাউনেরই এক ধরনের রূপক ছিল। একই সময়ে কীভাবে গভীর একাকীত্ব এবং উষ্ণ সহানুভূতি পাশাপাশি থাকতে পারে—এই ছিল উপন্যাসটির অন্যতম প্রধান বিষয়। এই দিক থেকে দেখলে, এটি মূল নভেলার তুলনায় অনেক বড় অগ্রগতি।

কিছু জাপানি পাঠক বইটি বুঝতে সমস্যায় পড়েছেন। আবার অন্যরা বলেন, এই রকম অদ্ভুততা এবং অতিপ্রাকৃত উপাদানই আপনার বই পড়ার আনন্দ। আপনি কি চান পাঠকদের মনে কিছু প্রশ্ন অনুত্তরিত থাকুক?

আমি মনে করি, একটি উৎকৃষ্ট উপন্যাস সবসময় এমন প্রশ্ন তুলে ধরে—যেগুলো আকর্ষণীয়, গভীর—কিন্তু যেগুলোর সরাসরি, সোজাসাপ্টা উত্তর দেয় না। আমি চাই পাঠক যখন বই শেষ করবে, তখন যেন তার কিছু ভাবার থাকে। যেমন—এখানে আর কী ধরনের সমাপ্তি সম্ভব ছিল? আমি প্রতিটি গল্পের ভেতরে কিছু সূত্র রেখে দিই। পাঠকের কাজ হলো সেই সূত্রগুলো ধরার চেষ্টা করা, এবং নিজের নিজের মতো করে সমাপ্তি তৈরি করা।

অনেক পাঠক আমাকে লিখে বলেন, “আমি আপনার একই বই বহুবার পড়েছি এবং প্রতিবার নতুন আনন্দ পেয়েছি।” একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর হয় না।

জন সেলফ :
 আপনি যখন The City...–এর বর্ণনাকারী, বা The Wind-Up Bird Chronicle–এর তোরু, বা Kafka on the Shore–এর কাফকার মতো চরিত্র লিখেন, তখন আপনি কতটা নিজেকে লিখছেন?
হারুকি মুরাকামি :
 আমার উপন্যাসের প্রথম পুরুষ বর্ণনাকারীরা প্রকৃত ‘আমি’ নন। তারা সেই ‘আমি’—যে হতে পারতাম। মানুষ হয়তো নিজের বাইরে অন্য কেউ হওয়ার সুযোগ জীবনে খুব কমই পায়। সেই সম্ভাবনাটি অনুসরণ করা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয়।

জন সেলফ :
 আপনি যে সব ইংরেজি ভাষার লেখকদের অনুবাদ করেছেন—যেমন সালিঞ্জার, ফিটজেরাল্ড, চ্যান্ডলার, কারভার, ক্যাপোট—তাদের মধ্যে কার প্রভাব আপনার কাছে সবচেয়ে বেশি?

হারুকি মুরাকামি :
 প্রতিটি লেখকই আমাকে প্রভাবিত করেছেন। আমি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হই ফিটজেরাল্ড এবং ক্যাপোটের উজ্জ্বল, দীপ্তিময় ভাষাশৈলীর প্রতি—যদিও সেটি আমার নিজের লেখার ধারা থেকে বেশ আলাদা। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি চ্যান্ডলারের শৈলী খুব ভালোবাসি।

জন সেলফ :
 আপনি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন। এই সময়ে জাপানের সাহিত্য-পরিসরে কী পরিবর্তন দেখেছেন? আপনি নিজেকে সেই পরিসরের অংশ মনে করেন, নাকি বাইরে?

হারুকি মুরাকামি :
 আমি মনে করি, তরুণ লেখকেরা এখন ‘সাহিত্য বলতে ঠিক এইটিই বোঝায়’—এই ধরনের কোনো কঠোর ধারনা থেকে সরে এসেছে। তারা এখন বেশি স্বচ্ছন্দ ও মুক্তভাবে গল্প লেখে। আমি এটি সত্যিই প্রশংসা করি। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে, আমি আমার নিজের মতো লিখে যাই। আমি বলতে পারি না আমি ঠিক কতটা সেই পরিবর্তনের ভেতরে আছি, বা বাইরে।

জন সেলফ :
 সময় যেতে যেতে পাঠকদের মধ্যে কী পরিবর্তন দেখেছেন? লেখালেখি কি এখন সহজ হয়েছে, নাকি কঠিন?

হারুকি মুরাকামি :
 জাপান এবং বিশ্বের নানা জায়গায় আমার পাঠকের সংখ্যা বাড়তে দেখলে আমি বিস্মিত হই। লাওসে একজন থাই পাঠক আমাকে থামিয়ে কথা বলেছে, ড্রেসডেনে একজন আলবেনীয় পাঠক আমাকে চিনেছে, টোকিওতে একজন ইন্দোনেশীয় পাঠক আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। মাঝে মাঝে আমি ভাবি—আমি যেন আর বাস্তব আমি নই—আমি যেন একটা কাল্পনিক মানুষে পরিণত হচ্ছি।
তবুও, এসবের কোনোটি আমার জন্য লেখালেখিকে সহজ বা কঠিন করেনি। আমি শুধু কৃতজ্ঞ। এত মানুষ আমার বই পড়েন—এটা আমি কখনো ভাবিনি। সবাই এ সৌভাগ্য পায় না।

জন সেলফ :
 যুক্তরাজ্যে এখন অনূদিত কথাসাহিত্যের এক-চতুর্থাংশই জাপানি সাহিত্য। কেন জাপানি সাহিত্য এত জনপ্রিয় বলে আপনি মনে করেন?

হারুকি মুরাকামি :
 আমি জানতাম না জাপানি উপন্যাস ব্রিটেনে এত জনপ্রিয় হয়েছে। কেন এমন হয়েছে—আমি সত্যিই জানি না। বরং আপনি বলুন—আমিও জানতে চাই। জাপানের অর্থনীতি এখন ভালো নয়। তাই সাংস্কৃতিক রপ্তানি যে কোনোভাবে অবদান রাখতে পারছে—এটা ভালো। যদিও সাহিত্য রপ্তানির অবদান অর্থনৈতিক হিসেবে খুব বড় নয়।

জন সেলফ :
 ২০১৭ সালে মিয়েকো কাওয়াকামি আপনার বইয়ের নারী চরিত্রগুলোর সমালোচনা করেছিলেন। এই সমালোচনা কি আপনার লেখায় কোনো প্রভাব ফেলেছিল?

হারুকি মুরাকামি :
 আমার বইকে এত বছর ধরে এতরকম সমালোচনা করা হয়েছে যে আমি মনে করতে পারি না কোন কথা কখন বলা হয়েছিল। এবং সত্যি বলতে আমি এসব বিষয়ে বেশি গুরুত্বও দিই না।
মিয়েকো আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এবং বুদ্ধিমান মানুষ। তাই তিনি যাই সমালোচনা করেছিলেন, আমি নিশ্চিত তা সঠিক ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি ঠিক মনে করতে পারি না তিনি কী বলেছিলেন। যাই হোক, আমার পাঠকরা নারী-পুরুষ সংখ্যায় প্রায় সমান—এটা আমাকে খুশি করে। ·

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ