জানলার ফাঁকা পাল্লাটি দিয়ে ঝিরঝির বাতাস কিছু বলছে। মা কুপির আগুনে পাটিসাপটার ভেতরে ক্ষীর পুরছে। ছাদের টবে দুটো গাঁদার কলি এসেছে। দাদা শখ করে লাগিয়েছে। প্রথম পাটিসাপটাটি দাদা পাবে। এরপর আমরা সবাই । মা যেন আমাদের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন ।
আমাদের বাড়িতে সচারচর পিঠা হয় না। পিঠা বানাতে মেলা উপকরণ লাগে। এত কিছু মা পাবে কোথায়! আজকের কথা ভিন্ন। বড় চাচী তাঁর নারকেল বাগান পরিষ্কার করিয়েছেন আজ। সেখান থেকেই একটি নারকেল আমাদের ভাগে জুটেছে। মায়ের জমানো চাল থেকে কিছু গুড়া করা হয়েছে। আর বাবাকে অনেক বলে কয়ে কিছু গুড় আনানো গেছে।
মাঝে মাঝে মনে হয় মা হয়ত জাদু জানেন। হঠাৎ হঠাৎ এমন কিছু বানিয়ে আমাদের সবাইকে অবাক করে দেন। আমার মনে আছে মা একবার বানিয়েছিল চিংড়ী মালাই। নারকেল বেটে, সেই নারকেলের দুধ দিয়ে চিংড়ি রান্না করেছিল। আরেকবার করেছিল মালাই চা। একটি কাপে মোটা করে সর দেয়া চা। তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাজা চালের গুড়া দিয়ে কুড়ানো নারকেল মাখানো। এই জিনিসটা মা আর আমি মিলেমিশে বানাই। মা চাল ভেজে দেয়। আমি সেই চালগুলি পাটায় পিষে গুড়া করি। তারপর মা নারকেল কুড়ানিতে নারকেল কুড়াতে বসেন। ওটা আবার আমি পারি না। শুভ তুষারের মত নারকেল জমা হতে থাকে স্টিলের থালাতে। মা আমাকে ওখান থেকে অল্প খেতে দেন। নারকেল এত নরম থাকে যে মুখে দিলেই যেন গলে যায়! এরপর গুড় দিয়ে একসাথে মেখে নেন চালের গুড়া এবং নারকেল। এই তো, ব্যস হয়ে গেল আমার প্রিয় খাবার!
এ পর্যন্ত পড়ে হয়তো আপনাদের খটকা লাগতে পারে আমাদের অবস্থা সম্পর্কে। নাহ, আমরা মোটেও স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবার নই। আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমাদের প্রতিদিনের খাবার সিলভার কাপ মাছ দিয়ে পুঁইশাকের তরকারি। পুঁইশাক মাঝে মাঝে আমিই কেটে পরিষ্কার করে দেই মা কে। মা মাঝে মাঝে সিলভার কাপের একটি টুকরা আমাকে ভেজে দেন।
রোজ রোজ পুঁইশাকের ঝোল আমার গলা দিয়ে নামতে চায় না। আমার ভাজা মাছে বাবা মাঝে মাঝে ভাগ বসায়। খুব মায়া লাগে আমার যখন বাবা বলে, "একটু মাছ ভাজা দিবি আমারে?" ইচ্ছা করে বাবাকে বলি, "তুমি পুরোটাই নাও"। কিন্তু তা বলা হয়ে উঠে না। বাবা যদি ভাবে আমি রাগ করে পুরোটাই দিয়ে দিচ্ছি! আমি চাই না বাবা তা ভাবুক। আমি মাছ ভাজাটি অল্প ভেঙ্গে বাবাকেও দিই। বাবার খুশি মুখে খাওয়া দেখতে ভালো লাগে ।
সবচেয়ে ভালো লাগে মায়ের খাওয়া দেখতে। মা খেতে বসেন সবার পরে। কোনদিন বিকাল পাঁচটা বাজে দুপুরের ভাত খেতে। মা খুব ধীরে সুস্থে খেতে বসেন। অল্প তরকারি নিয়ে অল্প ভাতের সাথে ভালো করে চটকান। তারপরে ছোট ছোট গ্রাস মুখে তোলেন। মায়ের খাওয়ার সময় আমি তাঁর সামনে বসে থাকি। মাঝে মাঝে আমি মায়ের সাথে খেতে বসে যাই যদি আমার দুপুরে খাওয়া না হয়।
আমাদের একটিই ঘর। এই ঘরে দুটো ভাঙ্গা খাট আছে। একটি খাট মায়ের বাবা মাকে তাঁর বিয়ের সময় দিয়েছিল। কালো ফ্রেমের পুরানো ডিজাইনের খাট। খাটের তোশক সেই যে কেনা হয়েছিল এটা আর পাল্টেনি কখনও। দ্বিতীয় খাটটি বাবা কিনেছিল বাবার বিয়ের আগে। এই খাটের মাঝখানটি আধভাঙ্গা। যেকোনদিন তা পুরোপুরি ভেঙ্গে যেতে পারে। এই খাটে আমি, আমার ছোট ভাই, আর মা ঘুমাই আপাতত।
এ ঘরে আরও আছে একটি আলমারি। সেই আলমারির তিনটি কাঁচ ভাঙ্গা। তবু সেখানে সাজানো আছে কিছু কাঁচের আর কাঁসার থালাবাটি। কাঁসার থালাবাটিগুলো আমার জন্মদিনে পাওয়া। সেখানে আমার নাম খোদাই করে লেখা আছে। আমার প্লেট এবং গ্লাস সবার থেকে আলাদা। সেগুলোও কাঁসার এবং সেখানেও আমার নাম লেখা আছে। এগুলো আমার জন্মদিনে বড় মামার কাছ থেকে পাওয়া। হ্যাঁ, আমার জন্মদিন পালন করা হয়। বেশ ধুমাধাম করেই পালন করা হয়। কাজটি করেন আমার বড় চাচাত বোন। আমি তাঁর খুব আদরের কী না !
জন্মদিনের দিন আমাকে দুপুরে খুব ভালো করে গোসল করানো হয়। কাজটি আমার বোন খুব যত্ন নিয়ে করেন। তাঁর সামনে ফ্রক খুলতে আমার কোন লজ্জা লাগে না। গোসল করানো শেষ হলে নতুন একটি জামা পরানো হয় আমাকে। চুল বাঁধার ঝামেলা নেই। কারণ আমার চুল ছোট করে বব করা থাকে। তারপর ফটোগ্রাফার আসেন। বিভিন্ন পোজ দিয়ে তখন আমাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়। কাজটি আমার কাছে রীতিমত ভীতিজনক। তাই কোন ছবিতেই আমার হাসিমুখ দেখা যায়না।
ছবি তুলতে তুলতে বিকাল। এসময় অতিথিরা এক এক করে আসতে থাকেন। আমার জন্মদিনের কেকটিও ততক্ষণে হাজির। সেখানে বড় বড় করে আমার নামসহ হ্যাপি বার্থডে লেখা। কেকের সামনে সবাই জড় হলে আবারও ছবি তোলা হয়। এই ফাঁকে আমার মেঝ ভাই কেকের কোনাটা একটু চেটে পরখ করে নেয়। আমার হাতে লম্বা বড় একটি ছুরি ধরিয়ে দেয়া হয়। ছুরির একপ্রান্ত আমি আর এক প্রান্ত আমার বোন ধরে থেকে। আমি জোরে ফুঁ দিয়ে লাল মোমবাতিটি নিভানোর চেষ্টা করি কিন্তু তা এক ফুঁতে কখনোই নেভে না।
আমার জন্মদিনে পাওয়া থালি, গ্লাস, জলের বোতল সব এই ভাঙ্গা কাঁচের আলমারিতে সাজানো থাকে। প্রতি ঈদে আমার দায়িত্ব এই আলমারি পরিষ্কার করা। আমি সব কিছু নামিয়ে , একটা একটা করে ধুয়ে আবার সব এই ভাঙ্গা কাঁচের আলমারিতে সাজিয়ে রাখি ।
দুই.
আমাদের ঘরে আছে একটি পুরানো ওয়ারড্রব। কাঁঠাল গাছের কাঠ দিয়ে বানানো। এখনও সেটায় ঘুণে ধরেনি। এটি বাবার বিয়ের আগের। হয়ত বিয়ে উপলক্ষেই বানানো। এই ওয়ারড্রবে মোট পাঁচটি ড্রয়ার। কথিত আছে প্রথম ড্রয়ারটিতে ভর্তি টাকা থাকত একসময়। আমার মা হাত মুঠো করে টাকা নিতেন আর যে চাইত তাকেই দিতেন। এখন এই ড্রয়ারে আছে মায়ের বিয়েতে পাওয়া পুরানো কিছু কয়েন, আমাদের স্কুলের রেজাল্ট কার্ড সাথে আরও টুকিটাকি দরকারি কিছু।
দ্বিতীয় ড্রয়ারটি আমার। সেখানে আমার সব ফ্রক এবং স্কার্ট যেগুলো আমার বোন কিনে দিয়েছে সেগুলো গুছিয়ে রাখা আছে। আমার বোনই আমার ড্রয়ারটি গুছিয়ে দেয়। তৃতীয় ড্রয়ারটি মায়ের। সেখানে মায়ের বিয়ের টিয়া রঙের শাড়ির সাথে আরও কমলা, সবুজ হরেক রকমের শাড়ি আছে। কিন্তু এই শাড়িগুলো মা কে কখনও পড়তে দেখি না। শুধু সবুজ রঙের শাড়ি যেখানে ছোপ ছোপ দেয়া বড় বড় কাঁঠালি চাঁপার ফুল আছে, সেটা পড়েছিলেন আমার জন্মদিনে তারপর আমাকে কোলে নিয়ে ছবি তুলেছিলেন আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে।
বাগানটি আমার চাচাতো বোনের মেঝ ভাইয়ের শখের বাগান। সে কৃষি বিশ্ববিদ্যালেয়ের ছাত্র। আমাদের বাড়িটিকে বাগান বাড়ি বলা যেতেই পারে। এই বাড়ির চারপাশে এবং ছাদে বাগান। এই বাগানে কাজ করার দায়িত্ব মাঝে মাঝে আমার উপর পরে। যেমন আগাছা পরিষ্কার করা, শুকনো পাতা পরিষ্কার করা, এবং ছাদের বাগানে পানি দেয়া। তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ হচ্ছে মাটি ভাঙ্গার কাজ। আমাকে একটা পিঁড়িতে বসানো হয়। পিঁড়িটিকে রশি দিয়ে বাঁধা হয়। তারপর একজন সামনে আর একজন পিছন থেকে সেটা ঠেলে নিয়ে যায়। এই পিঁড়ি গাড়িতে চড়তে আমার খুব ভালো লাগে।
মায়ের কোলে চড়ে ছবি তোলার সময় যে ফ্রকটি আমার গায়ে ছিল সেটি আমার চাচাত বোনের বড় ভাই কিনে এনেছেন ঢাকা থেকে। আমার বোন বিচিত্রার পাতায় দেখে ফ্রকটি পছন্দ করেছিল। তাঁর বড় ভাইকে আমি খুব ভয় পাই। আমার ধারণা এই লোক আমাকে খুব অপছন্দ করেন। অবশ্য কেন করেন তার কোন উত্তর আমার কাছে নেই। উনি দুপুর বেলায় আসেন দুপুরেরে ভাত খেতে। তখন পারতপক্ষে আমি আমাদের ঘর ছেড়ে বের হই না । উনি প্রায়ই মজাদার খাবার নিয়ে আসেন। সবাইকে ডেকে ডেকে সেগুলো বিলিয়ে দেন। সবার তার সামনে খেতে হয়। কেউ যেন আমাকে না দিতে পারে। আমার বোন মাঝে মাঝে চিবানোর ভান করে খাবার লুকিয়ে রাখেন মুখে। তারপর সুযোগমত মা পাখী যেভাবে তার বাচ্চাকে খাওয়ায়, ঠিক সেভাবে তিনিও আমার মুখে লুকিয়ে রাখা খাবার তুলে দেন। এজন্য সবাই তাকে পাখী বলে ডাকে। আমরাও এখন থেকে তাকে তাই ডাকব। আমার চাচীও আমাকে অপছন্দ করেন। পাখী যখন আমাকে পুতুলের মত করে সাজায় তার ছোট ভাইয়ের ছোটবেলার পুরানো জ্যাকেট দিয়ে, তখন চাচী ভীষণ বিরক্ত হন। তাই এই লাল জ্যাকেটটি আমার পড়তে ইচ্ছা করে না। কিন্তু শীতের বিকেলে এটা পড়েই পাখীর দলবলের সাথে আমাকে পার্কে যেতে হয়।
তিন.
আমাদের ঘরে আছে একটি আদ্যিকালের মিটসেফ। তার আছে তিনটি তাক। প্রথম তাকে নানা ধরনের শিশি বোতল আর বৈয়ম। এছাড়াও অল্প ফাঁকা জায়গাটিতে আমার খাবারের উচ্ছিষ্ট যা আমি খেয়ে শেষ করতে পারিনি, তরকারি আর ডালের বাটি রাখা হয়। দ্বিতীয় তাকে মা একপাশে রাখেন তরকারির হাড়ি,আরেক পাশে ভাজির বা শাকের কড়াই। নীচের তাকে ভাতের ডেকচি, আর ডালের পাতিল। মিটসেফের পাশে বড় কাঠের বাক্স। সেখানে প্রায়দিন সকালে আমার দায়িত্ব পড়ে কাঁথা এবং মশারি ভাজ করে রাখা। ও আমি ভাজ করতে পারি নাকি! কোনমতে দুমড়ে মুচড়ে গুঁজে দিই বাক্সে। মাঝে মাঝে এ কাজ আমার অসহ্য লাগে। দীর্ঘদিনের না ধোয়া মশারি এবং কাঁথার আঁশটে গন্ধ আমার মোটেও ভালো লাগে না। এগুলো বছরে একবার মা ধোবেন।
বছরে একবার আমাদের বাড়িতে কালো মোটা করে এক মহিলা আসেন। তার কোমরে থাকে একটি ঝুড়ি । সেখানে থাকে কাদার মত দলা পাকানো কিছু বস্তু। মা ঝুড়ি থেকে একটা বা দুইটা নামিয়ে রাখেন। বড় পাতিলে পানি গরম করা হয়। পানি ফুটলে সেখানে কাদার দলাগুলো ছেড়ে দেয়া হয়। সেগুলো গলে গেলে সেই পানি মা বালতিতে রাখা মশারি আর কাঁথার গায়ে ঢেলে দেন।
মাঝে মাঝে আমার ডাক পড়ে কল পাড়ে। আমি ছোট ছোট পায়ে ভারী কাঁথা এর মশারি মাড়াতে থাকি। এতে কতটুকু মায়ের উপকার হয় কে জানে! মাঝে মাঝে এই না ধোয়া মশারী আর কাঁথা দুপুর পর্যন্ত তারা বিছানাতেই থাকে যতক্ষণ না মা ফুরসত পায় রান্নাঘরের কাজের ফাঁকে। তখন আমার মায়ের জন্য খুব খারাপ লাগে। মনে হয় কেন আমি কাজটি করলাম না! এই দুঃখ নিয়ে আমি এপাড়া ওপাড়া ঘুরে দুপুরটা কাটিয়ে দিই।
কাঠের বাক্সটির সাথেই মায়ের বাবার দেয়া কালো খাটটি। কালো খাটের নীচে রাজ্যের জিনিস। কোন কোন ঈদে খাটের নীচটি আমাকেই পরিস্কার করতে হয়। তখন সব জিনিস বের করে , ঝাড়পোঁছ করে আবার সব গুছিয়ে রাখতে হয়। খাটের নীচে যে জায়গাটুকু মিটসেফের কাছে, সেখানে মা একটি হাত ধোয়ার পাতিল আর এঁটোবাসন রাখেন। বিকাল পাঁচটায় মা পিঁড়ি পেতে খেতে বসেন বাক্সটির সামনে আর মিটসেফ এবং খাটের মাঝখানের এক চিলতে জায়গাটিতে। আমি বসি মায়ের সামনে। আমার থালেও দু'তিনটে ভাত থাকে মাঝে মাঝে। খাওয়া নিয়ে আমার দারুণ টালবাহানা। কিছুতেই খেতে চাইনা আমি। ডাক্তার কিছু ওষুধ দিয়েছে। ওগুলো খেলে একটু খিদে পায়। তখন মায়ের সামনে কাঁসার থালাটি পেতে বসি। ওষুধ নাকি মায়ের খাওয়ার দৃশ্য নাকি মায়ের গল্প, কোনটির জোড়ে যে ভাত গিলি তা ঠিক বলতে পারব না। তবে মা ওতেই খুশি।
খাওয়া হয়ে গেলে খাটের নীচে রাখা হাড়িতে গিয়েছিলাম হাত ধুতে। ভুল করে হাত ধুয়ে ফেলি পাশে রাখা বাসি লাউয়ের তরকারির পাতিলে। ভীষণ পাপ বোধ হয় আমার এভাবে খাবার নষ্ট করার জন্য। মা হেসে বলেন, "তোর হাতে তো আর ময়লা ছিলনা, ভাতই তো ছিল"। এই বলে সেই আমার হাত ধোয়া পানিসহ বাসি লাউয়ের তরকারি নিজের পাতে ঢেলে দেন। ওটুকু তরকারিই অবশিষ্ট ছিল যেখানে আমি হাত ধুয়েছি। মায়ের জন্য আমার ভীষণ খারাপ লাগে। কিছুটা অসহায়ও বোধ করি।
চার.
আমাদের ঘরে আছে দু'টি পুরানো ড্রেসিং টেবিল। একটি ছোট আর একটি বড়। ছোটটির আয়না বড় আর বড়টির আয়না ছোট। বড় আয়নাটি নাকি বেলজিয়াম কাঁচের। সেটা কী জিনিস আমি জানি না। তবে সেজন্যই নাকি আয়নাটিতে ভালো দেখা যায়।
আয়নাটির ডান পাশে ছোট একটি ড্রয়ার। সেখানে আবার এক্কা দোক্কা খেলার সব গুটি একটা বোতলে ভরা আছে। আয়নাটির নীচে আর একটি বড় ড্রয়ার। সেটির নব গেছে খুলে। তাই ড্রয়ারটি খুলে এবং লাগাতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। এই ড্রয়ারে আছে মায়ের কিছু পুরানো কাপড়। ওখানে মায়ের ছোটবেলার জামাও আছে! নীল রঙের কাপড়ে গোলাপি রঙের বল। গোল গলা আর পেছনে ফিতা। আমি একদিন পরেছিলাম। আমার একটু ঢিলা হয়। ঠিক হয়েছে আমি আর একটু বড় হলে ওই জামাটি আমি পরতে পারব।
এই ড্রেসিং টেবিলের সামনে একটি লোহার চেয়ার প্লাস্টিকের বেত দিয়ে বোনা। এর তলাটি ছেঁড়া তবে ঠিক পড়ে যাওয়ার অবস্থা নয়। এই মাঝখানে ছেঁড়া গর্তওয়ালা লোহার চেয়ারটি আমাদের সবার প্রিয়। এই চেয়ারে বসে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুতুল খেলি। আমার দাদা এই চেয়ারে বসেই বই পড়েন। আমার মেঝ ভাই এই চেয়ারে বসেই ব্রণ খুঁটে যান অনবরত। রাতে আকলিমার মা যিনি আমার বড় চাচীকে সারাদিন সাহায্য করেন, তিনিও কাজ শেষে রাতে এই চেয়ারটিতে এসে বসেন।
আমাদের দ্বিতীয় ড্রেসিং টেবিলটি ওয়ারড্রবের পাশে রাখা আছে। তার ছোট ছোট দুইটা ড্রয়ার। সেগুলো মোটামুটি ফাঁকা। ড্রয়ারের উপরে হয়ত আমার দুচারখানা বই রাখা হয় কখনও। দুই ড্রয়ারের মাঝাখানে আমরা প্লাস্টিকের খেলনা হাড়ি পাতিল সাজানো। দাদা কিনে দিয়েছে চড়ক পূজার মেলা থেকে।
পড়ার টেবিলটি ভাঙ্গা কাঁচের আলমারির পাশেই। টেবিলের এক পা ভাঙ্গা। সেখানে ইট দেয়া আছে। টেবিলের মাঝখানে ঘুণে ধরেছে। এটি আমার মেঝ দাদার টেবিল। এই টেবিলের ধারে কাছে আমাদের আসা নিষেধ। ওঁর সব বই খাতা এলোমেলো করে রাখা থাকে সবসময়। মায়ের জন্য আমাকে মাঝে মাঝে এই টেবিল ধরতে হয়। বই খাতা গোছাতে হয়। মেঝ দাদা এই টেবিলেই দিনের বেশিরভাগ সময় কাটান। চেয়ার দুলে দুলে পড়া মুখস্থ করেন। আমার ভয় হয় কবে যেন টেবিলটির মত দুলুনির চোটে চেয়ারটিও না খোড়া হয়ে যায়। কোনদিন ইচ্ছা হলে মেঝদা টেবিলে ডেকে নেন। মাথায় দুই বাড়ি মেরে অঙ্ক কষতে বলেন কিংবা হাতের লেখা প্র্যাক্টিস করতে বলেন।
মেঝ দাদাকে আমার পছন্দ নয়। মেঝ দাদাও আমাদের পছন্দ করেন না। মানে আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে। তবে আমাকে বেশি অপছন্দ করেন। আমার ছোট ভাইকে একটু কম। আমি যখন পাড়া বেড়াতে ব্যস্ত থাকি, তখন মেঝদাই আমার ছোটভাইকে দুপুর বেলা দেখাশোনা করেন। মা তখন ব্যস্ত থাকেন রান্নার কাজে। আমার ছোট ভাইকে আমার একদমই পছন্দ নয়। আমি একটি বোন চেয়েছিলাম। কিন্তু এসেছে আর একটি ভাই। সবাই এখন ওকে নিয়েই ব্যস্ত। আমার দিকে কেউ তেমন নজরই দেয়না এখন!
পাঁচ.
এই বাড়ির পশ্চিমের ঘরটি আমাদের ঘর। এই একটি ঘরে আমাদের ছয়টি প্রাণীর বসবাস। ছাদের সিলিঙে কিছু টিকটিকিও আছে অবশ্য। এই বাড়িতে সাতটি ঘর মাঝখানের উঠানটিকে ঘিরে রেখেছে।
আমার মা যখন এই বাড়িতে প্রথম পা রাখেন তখন তাঁকে এই উঠানে এনে দাঁড় করানো হয়। আমার বড় চাচা মা কে প্রশ্ন করেন, "কুন গরডা তুমি লইবার চাও?" মা ঘোমটার ফাঁকে আঙ্গুল উঁচিয়ে এই ঘরটি দেখিয়ে দেন।
মাকে আমার ভীষণ বোকা মনে হয়। এরকম একটি ঘর কেউ পছন্দ করে! একটি জানালার পাল্লাও ঠিকমত বন্ধ হয় না। টিনের দরজা আধফাঁকা হয়ে থাকে। শীতের ঠাণ্ডা বাতাস হুহু করে ঢোকে। ছাদের সিলিঙটি মনে হয় মেঘলা আকাশ। সেখানে ছাতা পড়ে বিচিত্র সব নকশা ফুটে উঠেছে। আমার বার বার মনে হয় মা কেন বাড়িটির অন্য আর একটি ঘর পছন্দ করল না, যার কাঠের দরজা এবং জানালা আছে, যেখান দিয়ে শীতের হাওয়া ঢুকতে পারে না। কীসের জন্য মায়ের এই ত্যাগ স্বীকার? আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। যেমন বুঝে উঠতে পারি না আমার বাবার মত লোকটিকে মা কেন বিয়ে করল। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম। মা এমন হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল যে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
ছয়.
আমার মায়ের বিয়েতে পাওয়া সেই কালো খাটটিতে মা এসে শোন সন্ধ্যাবেলা। বিছানার পাশে লোহার শিক দেয়া জানালা। তার ওপাশে দেয়াল পার হলে কালো কড়ই গাছ। সেখানে হালকা গোলাপি রঙের ফুল হয়। ভীষণ গরম পড়লে ইলেক্ট্রিসিটি চলে যায়। তখন হালকা গোলাপি রঙের ভীড়ে বড় একটি চাঁদ উঁকিঝুঁকি দেয়ার চেষ্টা করে। গাছেদের মন ভালো থাকলে মৃদুমন্দ হাওয়া বইতে থাকে। আমি আস্তে আস্তে মায়ের পাশে গিয়ে শুই। মা মাঝে মাঝে তার পেটে কান রাখতে বলেন। আমি গুড়ুম গাড়ুম আওয়াজ শুনি। এতে নাকি মায়ের পেটের ব্যথা ভালো হয়।
মা তখন তার ছোটবেলার গল্প করেন, বিয়ের গল্প করেন। ভাইবোনদের মধ্যে মা সবচেয়ে বড় এবং আদরের। মায়ের বাবারা দুই ভাই। বড় ভাইয়ের একটি মাত্র ছেলে, তাও আধপাগল। তাঁদের কোন মেয়ে নেই। তাই আমার মা-ই সমস্ত আদর ভাগ করে নিতেন।
মায়ের বেশিরভাগ গল্প খাদ্য বিষয়ক। ছোটবেলায় মা কী কী খেয়েছেন তার একেরপর এক বর্ণনা। এসব খাবারের সিকিভাগও আমি কোনদিন চোখেও দেখিনি। মাকে আমি বলি, খাবারগুলো তুমি একটা কলসিতে ভরে মাটির নীচে পুঁতে রাখতে পারতে। তাহলে আমি এখন খেতে পারতাম। মা মিটিমিটি হাসে আমার কথা শুনে। সেজন্যই হঠাৎ হঠাৎ মালাই চিংড়ি বা মালাই চা খেতে পাওয়া যায় ।
সাত.
মায়ের রান্নাঘরটি এই ঘরের বাইরে। উঠানটি পেরিয়ে আর একটু দূরে। চারপাশে বাঁশের চাটাইয়ের বেড়া। সেখান দিয়ে শীতের হাওয়া হু হু করে ঢুকছে। আমরা সবাই জড়োসড়ো হয়ে মাকে ঘিরে বসে আছি। খুব মনোযোগ সহকারে মায়ের পাটিসাপটা পিঠা বানানো দেখছি।
প্রথম পিঠাটি দাদার পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রথম পিঠাটি ভেঙ্গে গেল। এতে মায়ের মন খারাপ হলেও দাদার তেমন কিছু হলো না। দাদা এসব কিছু গা করে না। আমার দাদা সাত চড়ে রা করে না এমন মানুষ। দাদা স্কুলে যায় না। তার বদলে একটি দোকানে কাজ করে। একটি অন্ধকার ঘরে দাদার সারাদিন কাজ করতে হয়। দাদার খুব অভিমান। বাবা স্কুলের বেতন দিতে পারেনি বলে স্কুলটাই ছেড়ে দিল।
আমার বাবা একজন "ভাদাইম্যা" লোক। এই লোকের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া বুঝি তাঁর ছানাপোনাগুলো। এছাড়া আমি আর কিছু দেখতে পাই না। তাঁর একটি মনোহারীর দোকান আছে। দোকানটি যদিও তাঁর নামে, কিন্তু দোকানটি চালায় বাবার বন্ধু সুরুজ আলী। এই সুরুজ আলী বাবার সাথে ছোটবেলা থেকে আছে, যখন বাবার পনেরটি রিক্সা ছিল। সেই রিক্সার গ্যারাজে সুরুজ আলীর কাজের শুরু। বাবা একেরপর এক রিক্সা বিক্রি করে দিল। গ্যারাজটি উঠে গেল। কিন্তু সুরুজ আলী রয়ে গেল।
এই দোকানের একরকম মালিক এই সুরুজ আলী। সুরুজ আলী দৈনিক পনের টাকা বাবাকে দেন। বাবা সেই টাকা নিয়ে বাজারে যান সকালবেলা। একটি সিলভার কার্প মাছ আর কিছু পুঁইশাকের ডাঁটা কিনে নিয়ে ফেরত আসেন। এই টাকা দিয়ে হয়ত অন্য কিছু কেনা যায় কিন্তু বাবা কিনতে পারেন না। তিনি মোটেও ভালো বাজার করতে পারেন না। তবে কোনো কোনো দিন আমার জন্য বাজারের সবচেয়ে অচেনা ফলটি কিনে নিয়ে আসেন কিংবা হোটেল থেকে একটি গুলগুলি। তারপর বাড়ি এসে আমায় খোঁজেন।
আমার বাবাকে একজন অকর্মন্য লোক বলাই যায়। প্রতিদিন ভোরবেলা দোকানে যান। সকাল দশটায় একবার বাড়ি আসেন। তারপর দুপুর বারোটায়। তখন আমার স্কুল ছুটি হয়। বাবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন আমার জন্য। তারপর আমার পেছন পেছন বাড়ি আসেন। দুপুরে ভাত খাবার সময় আবার আসেন। তখন আমার সাথে আমরা দুজন লুকোচুরি খেলি। আমি আলনার পিছনে গিয়ে লুকাই। বাবা কিছুতেই আমাকে খুঁজে পায় না। মাঝে মাঝে আমি বাবাকে নাম লিখতে শিখাই। বাবা কী আর আমার মত স্কুলে গেছে নাকি! বাবার পালক বাবা স্কুলের হেডমাস্টার ছিল। কিন্তু বাবা স্কুল পালাত।
ও, বাবার গল্পটিই তো বলা হয়নি! বাবার বাবা মানে আমার দাদা মারা যায় বাবার জন্মের আগে। সম্ভবত বসন্ত হয়েছিল। তখন তো এসব রোগের চিকিৎসা ছিল না। বাবার যখন সাতদিন বয়স, তখন বাবার মা ও মারা যায় একই রোগে। মৃত শরীরে ঝুলন্ত অবস্থায় বাবাকে পাওয়া যায়। বাবার ছোট ছোট ভাই বোন বাবাকে দেখাশোনা করতে পারেনি। তাই বাবাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাঁর মামার বাড়ি।
মামারা ছিল সরলকান্দির কুখ্যাত ডাকাত। এই ডাকাতের দল বাবাকে বিক্রি করে দেয় এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে বাবা বড় হলে তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে চুরি করে নিয়ে আসে। বেচারা দম্পতি খুব কষ্ট পেয়েছিল। বাবার পালক বাবা মারা যায় একাত্তরের যুদ্ধের সময়। পাকিস্তানি মিলিটারিরা সেই হেডমাস্টারকে ব্রাশ ফায়ার করেছিল।
আমি অনেকদিন বাবাকে বলছি, "চল, তোমার মাকে দেখে আসি"। কিন্তু বাবা আমার কথা শোনেই না! বাবা খেতে বসে আমাকে এসব গল্প শোনান। আমি খাবার বদলে গল্পই শুনি বেশি। তাই আমার পাতের ভাত কখনওই ফুরোয় না । আমাদের বাবার কাছে আমাদের খুব বেশি কিছু চাওয়ার নেই। কারণ আমরা জেনে গেছি বাবার কিছু দেয়ার সামর্থ্য নেই। তবু মাঝে মাঝে মনে হয় তিনবেলা খাবার, ঈদে নতুন জামা-এটুকুও কি বাবা জোগাড় করতে পারে না! বাবার উপর ভীষণ রাগ হয় মাঝে মাঝে। এই সাদামাটা লোকটির প্রতি শুধু আমার অসীম ধৈর্যশীল মায়ের কোন রাগ নেই। আমার মা পরম মমতার সাথে বাবার পাতে তিনবেলা নিয়ম করে খাবার বেড়ে দেন। বাবা যতক্ষণ খাবে, মা আর আমি পাশে বসে থাকি। বাবার খাওয়া দেখি। বাবার গল্প শুনি।
আট.
কুপির আগুন নিভু নিভু। হয়তবা কেরোসিন ফুরিয়ে গেছে। চুলার আগুনে মায়ের চেহারাটি স্পষ্ট। মায়ের টকটকে ফর্সা চেহারাটি আগুনের তাপে কিছুটা রক্তবর্ণ। মায়ের গাত্রবর্ণ আমি পাইনি। আমার লিকলিকে শরীর। হাত পা সব বাবার মত। মেঝদাও তেমনি। শুধু দাদা আর আমার ছোট ভাইকে দেখলে মায়ের ছেলে বলে মনে হয়। এই শীতেও কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে মায়ের।
কয়েকবারের চেষ্টায় দ্বিতীয় পিঠাটি জোড়া লেগেছে। মা পিঠাটি দাদাকে খেতে দিল। দাদা আমাদের সবাইকে একটু একটু ভাগ করে দিল। এত নরম পিঠা! মুখে দেয়ার সাথে সাথে মাখনের মত গলে গেল। নিজেদের ভাগের জন্য আমাদের তর সইছিল না। এতক্ষণে পেট জানান দিচ্ছে উদরে কিছু পড়া চাই। আজ সারাদিন ভাত হয়নি। বাবা চালের টাকা জোগাড় করতে পারেনি। সুরুজ আলীর মনোহারীর দোকান থেকে ইদানীং কোন আয় হয়নি। গতকালও ভাত হয়নি। কিন্তু কিছু লাল আটার জোগাড় হয়েছিল। মা তা দিয়ে বিকেলে রুটি বানিয়েছিল। আমি সেই শক্ত রুটি চিবোতে চিবোতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।
আমাদের বাড়িরই একজন জিজ্ঞেস করেছিল, "আজ তোমাদের ভাত হয়নি ?" আমি বলেছিলাম, "না, আজ রুটি হয়েছে।" এই কথা শুনে আমার মা আমার গালে ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দিল । আমি এতটাই অবাক হলাম যে কাঁদতে ভুলে গেলাম। আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকল না , আমার অন্যায়টা কী যে হলো! মায়ের এমন অদ্ভূত আচরণের মানে আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না ।
নয়.
ছাদের বাগানে দাদার টবে লাগানো গাঁদাফুলের দুটো কলি ফুটেছে। আমি যত্ন করে তাঁদের গোড়ায় জল ঢালি। যেন কম বেশি না হয়। বেশি জল দিলে গোড়া পঁচে যাবে। তখন গাছ মারা যাবে। গাছ মারা গেলে দাদা ভীষণ কষ্ট পাবে। দাদাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা করে না।
আমার সহজ সরল দাদা। দাদা অনেক ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর ঠান্ডা জলে স্নান করেন। শীত-গ্রীষ্ম একই রুটিন। দাদার স্নান করতে করতে মা নাশতা তৈরি করে ফেলেন। নাশতা বলতে গরম ভাত, আলু ভর্তা আর ডাল। সেখানে ডালের চেয়ে জলই বেশি। ডাল ছাড়া আমার মেঝদা আবার খেতে পারে না। মেঝদার খাওয়া আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। মেঝদা পাতে সবকিছু নিয়ে মাখিয়ে ফেলেন। তারপর এই সবকিছু মাখানো ভাত আস্তে আস্তে গেলেন। প্রতিদিন পাতলা ডাল আর আলু ভর্তা খেতে আমার ভালো লাগে না। তাই হঠাৎ হঠাৎ আমার পাতে ডিম ভাজা পড়ে। এই ডিম ভাজা কোত্থেকে আসে, তা আমার জানা নেই। আমার জানার কোনও কৌতূহলও নেই। আমি আলুভর্তার বদলে ডিম ভাজাতেই খুশি।
তবে আজকের সকালটি অন্যরকম। আমি টের পাই। দাদা দাদার মত স্নান করতে গেছে। সারা বাড়ি এখনো জাগেনি। রান্না ঘরে কোন সারা শব্দ নেই। আমি রান্না ঘরে যাই। তার দরজা এখনও বন্ধ। সেখানে মা নেই। আমি রান্না ঘর হয়ে কলের পাড়ে যাই। সেখানে দাদা ছাড়া আর কেউ নেই। বাথরুম চেক করে আসি। নাহ, দরজা খোলা। কেউ নেই সেখানে। আমার বুঝতে কিছুক্ষণ সময় লাগে যে, মা নেই। প্রথমেই কেমন একটা আতংক কাজ করে। এখন কী হবে! মা ছাড়া আমি কখনও থাকিনি।
বাবা ততক্ষণে উঠে গেছেন। আমার সাথে বাবাও আবার খুঁজলেন সব জায়গায়। না, কোথাও মা নেই। প্রথমেই যে ভাবনাটি আমার মাথায় এলো, তা হলো এই ভাত, ডাল, আর আলুভর্তা এখন আমাকেই রাঁধতে হবে। এ নতুন নয়। এ কাজ আমাকে প্রায়ই করতে হয়। মা মাঝ মাঝেই চলে যান তাঁর বাবার বাড়ি কিংবা কোন আত্মীয়ের বাড়ি। মাঝে মাঝে মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। যেমন আমার ছোট ভাই পৃথিবীতে আসার আগে মা ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। তখন সব কাজতো আমাকেই করতে হয়েছে। আমার ঘরের কাজ, রান্নাবান্না একদম ভালো লাগে না। স্কুল কামাই হয়।
বাবা এসে বললেন, "চল যাই, তোর নানাবাড়ি।" মাকে বাবার সাথে একবারই রাগ করতে দেখেছিলাম। দুপুরবেলা হঠাৎ মা রান্নাঘর ছেড়ে সোজা আমার নানাবাড়ি চলে গেল। বাবা একটু পর আমাকে নিয়ে হাজির। যদি আমাকে দেখলে মায়ের রাগ পড়ে। তা পড়েও ছিল। মা চলে এসেছিল আমাদের সাথে। এবারও নিশ্চয় এরকম কিছু একটা হবে। একটু বেলা পড়লে আমরা নানাবাড়িতে চলে এলাম। আমাদের আশ্চর্য করে দিয়ে জানা গেল, মা সেখানে আসেনি। বাবা সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজে দেখলেন। কোথাও মা যায়নি।
দশ.
মা আর আসেনি। মা হারিয়ে গেছে। জিনিসপত্রের মতো মানুষও হারিয়ে যায় বুঝি মাঝে মাঝে। যে ইচ্ছে করে হারায় তাঁকে খুঁজে পাওয়া ভার। দাদা ছাদের টবে এবারও গাঁদাফুল লাগিয়েছে। এবার আগের বারের চেয়ে বেশি। সবকটা গাছে কলি এসেছে। আমি সযত্নে জল ঢালি গোড়ায়। গাঁদাফুল মায়ের পছন্দ। হঠাৎ করে মা ফিরে আসলে মাকে চমকে দেয়া যাবে এই গাঁদাফুল দিয়ে। কে জানে, মা হয়ত অন্যের উঠানে গাঁদাফুল হয়ে ফুটে আছে। ·
লেখক পরিচিতি : রুবিনা খানম গল্পকার। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহে। বর্তমান নিবাস কানাডার সাস্কাচুয়ান প্রদেশের রিজাইনা শহরে।


0 মন্তব্যসমূহ