মুম রহমানের গল্প : দুর্ঘটনা

 


খোলা রিকশাটকে পাল তোলা নৌকা মনে হচ্ছিল। আজ বিকালের বাতাসটা কোন দিক থেকে এসেছে কে জানে, তবে বাতাসে মহুয়ার গন্ধ আছে! এই রকম বাতাসে পাষাণ্ডেরও প্রেমিক হতে মন চায়, অথচ বুবুন বিরক্ত। সে চোখমুখ কুচকে গুগলিং করে যাচ্ছে। মোবাইলের স্ক্রিনে একের পর এক ফ্রি এমপি থ্রি খুঁজে যাচ্ছে।


বুবনের মেজাজ ভালো নেই। ইদানিং বাইরে বেরুলেই রনিকে সঙ্গে জুড়ে দেয় মা। বুবুন বুঝতে পারে না ৯ বছরের এই পিচ্চি ছেলেটা তার কি কাজে দেবে, নাকি মা রনিকে রেখেছে ওর উপর নজরদারি করতে! বুবুনের বিরক্তিটা আরো বাড়ে রনির পা নাচানো দেখে।

বুবুন রিকশায় হুড তোলা পছন্দ করে না। সঙ্গে ফেউ রাখাও পছন্দ করে না। মানুষ কি আর সব পছন্দ-অপছন্দ মানতে পারে? বুবুন তখন রিকশায় হুড তুলে বসা, মোবাইলে গুগলিং করছিল আর ফেউ হিসাবে পাশে বসে থাকা রনি পা নাচিয়ে যাচ্ছিল। মানুষ কেন পা নাচায়, হোয়াই পিপল মুভ দেয়ার লেগ, শ্যাকিং লেগ হেভিট ইত্যাদি লিখে গুগল সার্চ দেয় বুবুন। কিন্তু সার্চ ইঞ্জিনের দিকে মনোযোগ দিতে পারে না। কারণ রিকশাটা চলছিল বেয়ারার মতো। ইদানিং রিকশাঅলাগুলো হয়েছে ট্রাক ড্রাইভারদের মতো বেপরোয়া। বুবুন ইতোমধ্যেই কয়েকবার রিকশাঅলাকে বলেছে, বামে চাপিয়ে চালাতে, সে সমানে ওভারটেক করে যাচ্ছে, একটু জ্যাম দেখলেই রং সাইডে রিকশা ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

পল্টনের বাকটা নিতে গিয়েই ঘটনাটা ঘটল। অনেকক্ষণ আটকে থাকার পর সিগনাল ছেঁড়ে দিতেই রিকশা হুড়মুড় করে টান দিল, আর অন্যপাশে সিগনাল পড়ে যাচ্ছে দেখে মিনিবাসটা টান দিলো চরম তাড়াহুড়ায়। একটা বোম ফাটার মতো আওয়াজ হলো, সম্ভবত রিকশার চাকা ফাটা কিংবা রিকশাঅলার খুলি ফাটার শব্দ। বুবুন ছিটকে পড়ল আইল্যান্ডের ওপর। রনি রাস্তায় পড়ে থাকলো পরিত্যক্ত কলার খোসার মতো।

দুই.
সড়ক দুর্ঘটনা এই ঢাকা শহরে নতুন কিছু না। প্রতিদিনই ঘটে। তবে আজকের দুর্ঘটনাটি এক কথায় মারাত্মক। একদম ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে এত বড় দুর্ঘটনা কমই ঘটে। দুর্ঘটনার ছোট-বড় মাপা হয় আদতে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ দিয়েই।

বাসঅলা পালাতে পারল না। উৎসাহী জনগণের হাতে সে প্রথমেই এক চোট মার খেল। বাসের যাত্রীরা অবশ্য গাইগুঁই করছিল। তারা রিকশাঅলার দোষ দিচ্ছিল। নানা জনের নানা বিশ্লেষণ, মতামত বর্ষণ শুরু হলো। ট্রাফিক সার্জন এগিয়ে এলো। সে ইতোমধ্যেই বাসঅলাকে উদ্ধার করলো মারমুখি জনগণের হাত থেকে। এরমধ্যে একজন বুবুনের পার্স ও মোবাইলটা সরিয়ে ফেললো। একজন রনিকে তুলে ধরলো। সে গলা কাটা গরুর মতো গো গো করছে। বুবুন অবশ্য অজ্ঞান। রিকশাঅলার থ্যাতলানো শরীর আর ছিটকে পড়া মগজের দিকে কেউ তখনও মনোযোগ দেয়নি। যখন মনোযোগ দিলো তখন আবার সবাই বাসঅলার দিকে ছুটে যেতে চাইল। রিকশাঅলার থেতলানো মাথাটা আর বাসঅলার মুখটার মন্তাজ তাদেরকে ক্ষুব্ধ করছিল।

একদল উৎসাহী লোক ধরাধরি করে বুবুন আর রনিকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে গেল। রনির পাঁজরের হাড় ভেঙে গেছে কয়েকটা, পা দুজায়গায় ভাঙা, হাত এক জায়গায়। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে রনিকে পঙ্গুতে নিয়ে যেতে বলা হলো। ঢাকা মেডিক্যালের অর্থোপ্যাডিকে সিট খালি নাই। দুই তরুণ নিজ দায়িত্বেই একটা সিএনজিতে করে রনিকে পঙ্গুতে নিয়ে গেল। আর বুবুনের ইতোমধ্যেই জ্ঞান ফিরেছে। তার কপালে তিনটা আর কনুইয়ের কাছে দুটো সেলাই পড়েছে, আর দুয়েক জায়গায় ছড়ে গেছে। ব্যস, এর বেশি কিছুই হয়নি। জ্ঞান ফিরতেই সে চিৎকার করতে লাগলো, আমার মোবাইল, আমার মোবাইল! একজন ওয়ার্ড বয় ছুটে এলো, আপনের সাথে তো কিছু আছিলো না, আপনের একসিডেন্ট হইছে।
বুবুন বললো, প্লিজ, আমাকে একটা মোবাইল দিন, আমি ফোন করবো।
আপনে নাম্বার বলেন, মিনিট কিন্তু দশ টাকা।
বুবুন নাম্বার বলে।

তিন.
জাকির সাহেব ফোন পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেলেন। প্রথমেই সব রাগ গিয়ে পড়লো বউ মিথিলার উপর। তিনি গাড়িতে বসে বউকে ফোন দিলেন।
কতোদিন বলেছি, মেয়েকে একা বের হতে দেবে না!
কেন, ও তো রনিকে নিয়ে বের হয়েছে।
গাড়ি ছাড়া কেন বের হতে দিয়েছ?
তোমার ড্রাইভার না আসলে আমি কী করবো? কিন্ত হয়েছে টা কি?
বুবুন এক্সিডেন্ট করেছে।
কি!
উত্তেজিত হয়ো না। তেমন কিছু হয়নি। আমি যাচ্ছি।
আমিও যাবো।
আমিন সাহেবের গাড়িটা পাঠিয়েছি। ওটায় আসো।

ফোনটা রেখেই তিনি পিএস নীলাঞ্জনাকে একটা ধমক দিলেন। দাঁড়িয়ে কী দেখছো! হাসান সাহেবকে খবর দাও, তৌহিদ সাহেবকে খবর দেও। হাসান সাহেব তাদের লিগ্যাল অফিসার আর তৌহিদ সাহেব তাদের কোম্পানির নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তার। নীলাঞ্জনা বুঝতে পারছে না, এখানে হাসান সাহেবের কাজ কী!

চার.
ইমার্জেন্সির নোংরা স্ট্রেচারটা আর সহ্য হচ্ছিল না বুবুনের। সে ওঠে এসে পায়চারি করছিল। এখন তার শরীরে কোন ব্যথা নেই। কিন্তু রিকশাঅলা আর রনির কথা মনে পড়ছে তার। কে যেন বলেছে, রিকশাঅলাটা মারা গেছে। রনিকে পাঠানো হয়েছে অন্যত্র। সে কি বেঁচে আছে?
জাকির সাহেব ইমার্জেন্সিতে ঢোকার মুখেই বুবুনকে দেখে ছুটে আসেন।
কী হয়েছে, দেখি মা।
তিনি বুবুনের কপাল আর হাতের ব্যান্ডেজ দেখলেন।
কোথায় ডিউটি ডাক্তার কোথায়? এই তুমি কে?
বাবা ওকে বিশটা টাকা দাও।
এই যে আপনি এইদিকে আসুন। এইটা কি হাসপাতাল? ছিঃ! ডিরেক্টর কোথায় তাকে ডাকুন।

সদ্য অ্যাটর্নি করা ডিউটি ডাক্তার মামুন এগিয়ে আসে। সে জহির সাহেবকে চিনতে পেরেছে। দুর্ঘটনার এই এক সমস্যা। বড় মানুষরা অনেক সময় সরকারি হাসপাতালে চলে আসে। আর তারা আসা মানেই হম্বিতম্বি, হৈচৈ। মামুন মনে মনে আতংকিত হয়। এখনই হয়তো সাংবাদিক, মন্ত্রী ফন্ত্রী চলে আসবে। তার আজ একটু আগে বাসায় যাওয়ার কথা, ছেলেটার শরীর ভালো নেই। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। দুর্ঘটনা হলো ভুল জায়গায় ভুল সময়ে ভুল মানুষের উপস্থিতি। এখন এইসব ভুল জোড়াতালি দিতে হবে তাকে। মামুন মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে।
স্লামালেকুম। আমি ওনার স্টিচ দিয়েছি। আমি ডাক্তার মামুন।
কী স্টিচ দিয়েছেন?
স্যরি?
কসমেটিক স্টিচ দিয়েছেন? ওর কপালে কি দাগ থেকে যাবে?
না, আমরা তো সাধারণত কসমেটিক স্টিচ দেই না, তবে উনার...
সাধারণত! আমার মেয়ের ব্যাপারটি আপনার কাছে সাধারণ মনে হয়েছে!
বাবা, রনি...
হ্যাঁ, ওর সঙ্গে যে আমাদের কাজের ছেলেটি ছিলো সে কোথায়?
ওকে পঙ্গুতে রেফার করা হয়েছে। ওর বাম পাটা হাটুর উপর থেকে একদম ফেলে দিতে হবে, ডান পা’র অবস্থাও ভালো নয়। পাজরের দুটো হাড়ও ইনজিওউরড। ব্লিডিং হয়েছে প্রচুর, লাইফ থ্রেট আছে।
আচ্ছা, সেটা পরে দেখছি। এখন বলুন, আমার মেয়ের পরবর্তী চিকিৎসা কী?
ওকে আপনি বাসায় নিয়ে যেতেন পারেন, শি ইজ আউট অব ডেঞ্জার।
কী বলছেন আপনি? মাথায় আঘাত পেয়েছে! আপনি ব্যাপারটাকে আমল দিচ্ছেন না? সিটি স্ক্যান করিয়েছেন?
জ্বি না।
জ্বি না! মাই গড! কী পাশ আপনি? না, না, আপনার সঙ্গে কথা বললে হবে না। আপনার ডিরেক্টরকে খবর দিন, ইমিডিয়টলি আসতে বলুন। ওকে আমি বামরুগাদে নিয়ে যাব।
স্যার, আপনি শান্ত হোন। উনার তেমন কিছু হয়নি। আমরা যতটুকু করেছি সেটাই উনার জন্য যথেষ্ট...
ডোন্ট ট্রাই টু টিচ মি... যা বলছি তাই করুন। ডিরেক্টরকে আসতে বলুন।

ডিরেক্টরকে আর আসতে বলা লাগল না। কীভাবে যেন তার কাছে খবর চলে গেছে। তিনি সঠিক হাজির হলেন।
এই যে মাজাহার ভাই, হাসপাতালটাকে কী করে রেখেছেন? মেয়েটা মাথায় আঘাত পেয়েছে, অথচ কোন সিটি স্ক্যানই করানো হয়নি। আমি এসে দেখি সে বাইরে হাটাহাটি করছে।

হাসান সাহেব আর তৌহিদ সাহেব দুই কাঁধের পাশে মুনকারনাকিরের মতো দণ্ডায়মান। তৌহিদ সাহেব একটা নিরব সালাম দেন মাজাহার সাহেবকে।
জাকির সাহেব, আমার রূমে আসুন।
না, না, ফর্মালিটির সময় এখন না। আচ্ছা, বল তো, এতো জায়গা থাকতে তুই এখানে এলি কেন?
আমার তো কোন জ্ঞান ছিল না। কারা যেন... পাপা, আমার মোবাইল, ব্যাগ এইসবও...
মিসিং! কী একটা জাত হয়েছি আমরা! যাক, ও সব নিয়ে পরে ভাবলেও হবে, আইজিকে বললেই সব বেরিয়ে যাবে। হাসান সাহেব আপনি একটু আইজিকে ফোন দিন। মোবাইলটা ট্র্যাক করতে বলুন। মাজহার ভাই, আমি ওকে বামরুগাদে নিয়ে যেতে চাই, এয়ার এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে, আপনি কি কোন রেফারেন্স দিতে পারেন।
ব্যস্ত হবেন না। আমি দেখছি, তোমাকে দেখেছে কে মা?

ডাক্তার মামুন পাশেই ছিল। সে বড় বড় বোলচালে একটু বিরক্তই হচ্ছিল। আমাদের দেশের বড়লোকদের একটু হেচকি উঠলেই বিদেশে চেকআপ করার খায়েশ জাগে! দেশের সব ডাক্তার, সব হাসপাতাল, সব চিকিৎসাই তাদের কাছে খারাপ? অথচ তাদের কবর তো দেশেই হয়?
স্যার, আমি উনার স্টিচ দিয়েছি। টোটাল ছয়টা বাইট লেগেছে। লোকাল দিয়ে স্টিচ করেছি।
হোয়াট ডু ইউ থিঙ্ক।
সি ইজ ওকে, কমপ্লিটলি ওকে। আমার মনে হয় না...
আপনার কি মনে হয় না হয়, দ্যাটস নট ইম্পর্টেন্ট এট অল। আই ডোন্ট বিলিভ ইন ইউর ট্রিটমেন্ট প্রসিডিওর। ভেরি আন হাইজিনিক এনভায়রমেন্ট। আয় মা, তুই গাড়িতে ওঠ।

জাকির সাহেব এগুতে নেন। এরমধ্যেই একজন ইন্সপেক্টর এসে সেল্যুট ঠোকে।
স্যার, বাস ড্রাইভারটা ধরা পড়েছে। মালিককেও ধরেছি আমরা। ওরা ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি। দুর্ঘটনার উপর তো আর কারো...
টু হেল উইথ ইউর ক্ষতিপূরণ! আই ওয়ান্ট টু সি দ্য ড্রাইভার হেংগড। এটাকে কোন দুর্ঘটনা বলা যাবে না, এটা হলো একটা হত্যাকাণ্ড। এই ড্রাইভারগুলো একেকটা কিলার।
স্যার, রিকশা ড্রাইভারটা মারা গেছে।
দেখলেন ইন্সপেক্টর! আমি আগেই বলেছি, এটা মার্ডার কেস। আপনার নাম কি?
স্যার, ইমরুল। ইমরুল হুদা।
ঠিকাছে হুদা সাহেব, আমি আপনার কথা বলবো আইজিকে। হাসান সাহেব আপনি আইজির সঙ্গে কথা বলুন। ব্যারিস্টার ইমদাদকেও একটা ফোন দিন। শুনুন ইমরুল সাহেব এ সব নিয়ে পরে কথা হবে, আপাতত আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আই নিড ইউর হেল্প। আমি মামনিকে নিয়ে কেয়ার ক্লিনিকে যাবো, দয়া করে সাইরেন টাইরেন বাজান, রাস্তা ক্লিয়ার করতে করতে এগুন। যে জ্যাম ঢাকা শহরে। ডিজগাসটিং। আয় মা। তুই কি গাড়িতে যেতে পারবি? নাকি এম্বুলন্সে?

মাজহার সাহেব কী একটা যেন বলতে নেন। কিন্তু কাউকে আর দ্বিতীয় কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বুবুনকে নিয়ে জাকির সাহেব গাড়িতে উঠলেন। সেক্রেটারি এবার পুলিশের গাড়িতে উঠলো। ম্যাডামকে ফোন করে সে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে তারা প্রাইভেট ক্লিনিকে যাচ্ছে। পুলিশের হর্নে রাস্তা পরিষ্কার করে তারা এগুতে থাকেন আর এদিকে ডাক্তার মামুন হাপ ছেড়ে বাঁচে। তবু তার একটু নার্ভাস লাগে যখন দেখে ডিরেক্টর মাজাহার স্যার তার দিকে তাকিয়ে আছে।

সে মিনমিন স্বরে বলে, স্যার, আমার মনে হয় না আমরা কোন গাফিলতি করেছি। সিম্পল এক্সসিডেন্ট কেইস। স্টিচটাও যত্ন নিয়ে দেয়া হয়েছে, কোন স্কার থাকবে না। তবে কাজের ছেলেটার অবস্থা ভালো নয়...
ইটস ওকে ড. মামুন, ইউ ডিড ইউর বেস্ট। প্লিজ গো টু ইউর ডিউটি।

ডাক্তার মামুন হাফ ছেড়ে বাঁচে। এইবার হয়তো নিজের ছেলেটার একটু খোঁজ নিতে পারবে।

পাঁচ.
জাকির সাহেবের একমাত্র মেয়ে বলে কথা। তারা কেয়ার ক্লিনিকে পৌঁছানোর আগেই সিটি স্ক্যান থেকে শুরু করে ওটি পর্যন্ত সব রেডি। সৌভাগ্যক্রমে বুবুনের শরীরে আর কোন আঘাত বা বড় কোন সমস্যা কোন পরীক্ষাতেই ধরা পড়ল না। প্রফেসর মর্তুজা অবশ্য বন্ধু জাকিরকে জানালেন, মেয়ে শক পেয়েছে, বড় ধরণের শক, বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে আসলে ভালো হয়।

ইতোমধ্যে মিথিলাও এসে হাজির। তিনি মেয়েকে আগেই বাড়ি থেকে বার হতে দিতে চাচ্ছিলেন না। এখন সে জন্য বকতে নিলেন। কিন্তু প্রফেসর মতুর্জা বললেন, ভাবী, ডোন্ট বি হার্স উইথ হার। লেট হার বি চিয়ার আপ।

হাসান সাহেব বললেন, চিয়ার আপ তো হতেই হবে! শোনো বুবুন, আমার একটা কথা মন দিয়ে শোনো, লাইফ ইজ আ জার্নি। আ বিগ জার্নি। আর চলার পথে দুর্ঘটনা হবে, কেউ আহত হবে, কেউ নিহত হবে...
পাপা, নিহত কি?
নিহত মানে মারা যাওয়া।
পাপা, রনি কি মারা গেছে?
ডোন্ট ওরি এবাউট দ্যাট। রনিকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। হাসান সাহেব আর তৌহিদ সাহেব পুরো ব্যাপারটা দেখবে। যেটা তোমার জানা দরকার সেটা হলো, জীবনে দুর্ঘটনা থাকবে। তোমার কাজ হলো দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলা।
থাক না জাকির, মেয়েটাকে এ সব জ্ঞান পরে দিও।
ঠিক, চলো, আমরা আগে বাড়ি যাই। ইউ নিড টু হেভ সাম ফ্রেস জুস।

মুর্তজা বলল, আরে তাড়া কিসের বন্ধু, বসো! জুস আমি আনাচ্ছি মেয়ের জন্য, এখানে ভালো ফ্রেশ জুস পাওয়া যাবে। একটা অরেঞ্জ জুস খাও মা। জাকির, তুমিও একটু কফি খাও? ভাবী কি খাবেন বলুন? আমার এখানে তো আর আপনারা এমনি এমনি আসবেন না।
না বন্ধু, অন্য সময় আসবোনে। বাসায় যাই। ইউ নিড টু ফ্রেশেন আপ। কাল ক্লাবে এসো। কথা আছে।

জাকির সাহেব মিথিলাকে আর বুবুনকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। আর ডাক্তার তৌহিদ ও লিগ্যাল এজভাইজার হাসানকে নির্দেশ দিলেন পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে রনির খোঁজ নিতে।

ছয়.
পঙ্গু হাসপাতালে তিন জন ডাক্তার থাকলে ত্রিশ জন রোগী থাকে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা যে কোন ব্যাপার না শুধু মাত্র এই একটি হাসপাতালে আধ ঘণ্টা দাঁড়ালেই তা বোঝা যায়। হাত-পা কেটে ফেলা এখানে এতো অবলীলায় হয় যে টুকটাক এম্পুটিউশন নার্স-বয়রাও করে ফেলতে পারে।

তৌহিদ পঙ্গু হাসপাতালের সাথে পূর্বপরিচিত। কিন্তু হাসান সাহেব এখানে ঢুকে দিশেহারা হয়ে যান। ইমার্জেন্সিতে রনি নামে কারো এন্ট্রি নেয়। অন্য আরেক রোগীর আত্মীয় সূত্র ধরে সে জানতে পারে একটি বালককে দুজন লোক এখানে ধরাধরি করে এনেছিল দুয়েক ঘণ্টা আগে। তার অপারেশন হয়েছে, এখন আইসিইউতে আছে।

কিন্তু আইসিইউতেও গিয়ে রনিকে পাওয়া যায় না। নার্স-ডাক্তার সবাই ব্যস্ত। তৌহিদ সাহেব নিজের ডাক্তার পরিচয়টা দিলেন, সেই সঙ্গে জাকির সাহেবের নামটাও শুনিয়ে দিলেন। পরিচয়ের মাহাত্মেই তারা এক মিনিটের ব্রিফিং দিল। যা জানা গেলো তা খবরের ভাষায় এমন‘আজ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা নাগাদ নয়-দশ বছরের অজ্ঞাতনামা একটি বালক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আসে। বাসের চাকায় তার দুটো পা-ই পিষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা কেটে ফেলতে হয়। কিন্তু দুর্ঘটনাকালে এবং পরবর্তী সময়ে রক্তপাত বন্ধ করতে না পারায় তার মৃত্যু হয়। এই লাশের মালিকানা এখনও কেউ দাবি করেনি।’

এই তথ্য জানার পর, হাসান সাহেব ভাবতে বসে, খবরটা এক্ষুণি স্যার কে জানাবে কি না। হাসান সাহেব আর তৌহিদ সাহেব কথা বলে।
কী বলেন হাসান সাহেব, স্যারকে ফোন দিবো?
আমার মনে হয় এখনি ফোন দেয়ার দরকার নেই। দেখলেনই উনার মেজাজ ঠিক নেই। একটু শান্ত হোক। যা ঘটার তা তো ঘটেই গেছে।
ঠিক বলেছেন। তাছাড়া এখানে অনেক ফর্মালিটিজ আছে। ছেলেটার পোস্টমর্টেম হবে। রিকশঅলার লাশ খুঁজে বের করতে হবে। বাস ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
চলুন আমরা বরং দুকাপ চা খেয়ে নেই। ঠাণ্ডা মাথায় একটা প্ল্যান অব একশন করে ফেলি।

শুধু চা নয়, তারা দুজন দুপিস করে ফ্রুট কেকও খেয়ে ফেলল। তারা শরীরে এনার্জি সংগ্রহ করে নেয়। দুটো সিগারেটও ফুঁকে নিলো। চা, সিগারেট আর কেকের কল্যাণে তাদের মনোবল কিছুটা বাড়ল। হাসান সাহেবই একটা ফোন দিলো জাকির সাহেবকে।

জাকির সাহেব অবশ্য ভীষণ দয়ালু মানুষ। তিনি খবর শোনা মাত্রই হাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দেন। নির্দেশনা মোতাবেক হাসান সাহেব বাস মালিক সমিতির সাথে ক্ষতিপূরণের জন্যে যোগাযোগ করেন, তৌহিদ সাহেব লাশ মর্গ থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেন এবং তাদের যৌথ উদ্যোগে রনির লাশ দেশের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, এই সকল ব্যবস্থাই সুষ্ঠুভাবে সমাপ্ত হয় এবং মৃতের চাচা আব্দুল হামিদ ক্ষতিপূরণ বাবদ নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা পেয়ে যায়। এটা ভালো দিক ছিল যে, মরহুম রনির বাবা-মা আগেই মারা গিয়েছিল। আব্দুল হামিদ এতিম শিশুর লাশ জড়িয়ে খুব কাঁদলেন। কিন্তু পঞ্চাশ হাজার টাকার নোটগুলো দেখেই তার শান্তি লাগল। তার একসময় মনে হলো, আহা এতিম ছেলেটাকে তিনি বা তার স্ত্রী কোনদিন এক ফোঁটা আদর যত্ন দেখান নাই। খোদার কি লীলা, সেই এতিম ছেলেটা মরে গিয়ে তাদের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যবস্থা করে গেল। তিনি দু’হাত তুলে ছেলেটার জন্য দোয়া করলেন আর দোয়া করলেন জাকির সাহেব ও তার পরিবারের জন্য। তিনি এমনও ভাবলেন, ঢাকা গিয়ে জাকির সাহেবের মেয়েটাকেও একটু দেখে আসবেন। এরা দিল দরাজ মানুষ, এদেরকে দেখলেও পূণ্য হয়।

সাত.
আব্দুল হামিদ সযতনে রনির দাফন-কাফন শেষ করেই। তার চারদিন পর আব্দুল হামিদ ঢাকায় রওনা দেন। নিজের গাছের এক কাঁদি কলা, দুইটা দেশি মুরগি আর পাঁচকেজি কালিজিরা চাল নিয়ে তিনি ঢাকা চলে এলেন। জাকির সাহেবের গুলশানের বাড়িতে এসে তিনি হতবম্ভ হয়ে গেলেন। তার মনে হলো, বেহেশতের বাড়িঘর নিশ্চয়ই এমনই হবে। দুই দারোয়ানের একজন ছুটে এলো। ধমকের সুরেই জানতে চাইলো, কাকে চায়, কি চায় এইসব। আব্দুল হামিদ কোথায় ঠিকানায় পেয়েছে, কি বিষয়বিত্তান্ত সব জেনে নেয় বিশালদেহি দারোয়ান। ভেতর থেকে ডোবারম্যানটা ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। আব্দুল হামিদ যে রনির চাচা এটুক জানতে পেরে দারোয়ানের দিল ঠাণ্ডা হয়। সে তাদের ঘরে ফ্যানের পাখার নিচে আব্দুল হামিদকে বসতে দেয়। তাকে জানানো হয়, এই দুর্ঘটনার ধকল কাটিয়ে উঠতে গত কালই বুবুন তার বাবা-মা’র সঙ্গে কোন সুইজারল্যান্ডে গেছে। সুইজারল্যান্ড যে এই দুনিয়ার সুন্দর একটা দেশ সেটাও আব্দুল হামিদ দারোয়ানের কাছ থেকেই জানতে পারে।

কলার কাঁদি, চাল, মুরগি দারোয়ানের হাতে দিয়ে আব্দুল হামিদ চলে আসতে নেয়। কিন্তু দারোয়ান তাকে নাস্তা খাওয়ায় যত্ন করে। আব্দুল হামিদ বুঝতে পারে, বড় মানুষের কাজের লোকেরাও বড় হয়। আল্লা তাদের সবাইকে ভালো রাখুনএই দোয়া করতে করতে তিনি আবার গ্রামের পথে রওনা দেন। ফিরতি পথে ভাবতে থাকেন, রনির কবরে একটা বেড়া দিতে হবে। কালই বেড়াটা দিয়ে দিবেন। বেড়া দিতে আর কয়টাকায়ই বা লাগবে। পঞ্চাশ হাজার টাকা তো তার আছেই।·



লেখক পরিচিতি : মুম রহমান মূলত কথাসাহিত্যিক। লেখেন সিনেমা, নাটকসহ বিচিত্র বিষয়ে। অনুবাদক হিসেবেও সমান খ্যাতি। বসবাস করেন ঢাকায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ