পারভীন সুলতানার গল্প : একটি প্রতীকি রাইফেলের গল্প



ছির এর নাম শুনলে হুঁকোর ফুটো থেকে পিছলে যায় বৃদ্ধদের নেশালো ঠোঁট। যুবকেরা ভান করে তারা ভীত হয়নি কিন্তু কার্যত সার্টের নিচে তাদের তেজী দিলও ধুকপুক করে। জিন্দা থাকতে যেমন তেমন, মরে গিয়ে তছির যে বাপের বেটা তা ভালো করে বুঝিয়ে দিল।

নিজের গ্রামে থাকলে চেয়ারম্যান আগে কখনো সঙ্গে বডিগার্ড রাখত না ;কিন্তু ইদানিং সে সারাক্ষণ তার সাথে একজন ষণ্ডা মতন লাইঠাল রাখে। নাহ্, তার কাছে কোন আগ্নেয়াস্ত্র নাই। কারণ তছির যখন চেয়ারম্যান এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে; তখন ওর হাতে কলা গাছের পাতা ছাঁচা একটা ডগা ছিল মাত্র। সেটা উঁচিয়েই আসন্ন সন্ধ্যার তরল অন্ধকারে আঁশশ্যাওড়া গাছটার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে চেয়ারম্যানকে হুমকি দিয়ে বলেছিল—
কলা গাছের ডাউগ্যা
ব্যাডা অইলে আউগ্যা..

চোখ পাতলা অন্ধকারেও রাজ্জাক মিঞা স্পষ্ট দেখেছিল,তছিরের হাতের কলাগাছের ডগাটা। ওটা বল্লমের মতো উঁচু করে তছিরের মতো ভদ্রগোচের মানুষটা ক্রোধে ফেটে পড়েছিল। সাধারণত যা ঘটে; ভূতের পা অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে যায়, কখনও ইয়া দশাসই চেহারা ধারণ করে নাকি নাকি স্বরে কথা বলে।

তবে এ সমস্ত ভয়ঙ্কর মূর্তির কোনটাই ধারণ করে আসেনি তছির। জিন্দা থাকতে যেমন দেখা যেত চেক চেক লুঙ্গির সাথে পাঞ্জাবি গোছের কোন পিরহান, তেমন পোশাকই ছিল ওর গায়ে। গলার স্বরও ছিল স্বাভাবিক, তবে তছিরের বগলের নিচে কোন ক্রাচ ছিল না ; এমন কী হুইল চেয়ারেও বসা দেখা যায়নি ওকে, মরে যাবার পর কি বেটার নতুন করে পা গজালো নাকি! এমন ভড়কানো, দাঁত কপাটি লাগা আতঙ্কিত হওয়া পেরেশানি অবস্থার মধ্যেও চেয়ারম্যান এ কথাটা না ভেবে পারে না।

মসজিদে যাবার জন্য সর্ট কার্ট বলে বেতবনের পথ ধরে যাবার সময় মাঝ রাস্তায় হঠাৎ তছিরের গলা- ব্যাডা অইলে আউগ্যা...আউগ্যা... । গায়েবি আওয়াজে রাজ্জাক চেয়ারম্যানের লুঙ্গি নষ্ট হয়ে গেলে মগরেবের নামাজ কাজা হয়ে যায়। খালি কি মগরেবের! এশা, এমন কী পর দিনের ফজরের নামাজও। দাঁত কপাটি লেগে বে-কায়দায় পড়ে বাঁ পায়ে চোট পায় সে। জ্ঞান ফিরলে চেয়ারম্যান নিজেকে বাড়ির রোয়াকে লোকজন পরিবৃত অবস্থায় দেখে। এত লোকজনের ভিড়েও চেয়ারম্যান তারস্বরে চিৎকার জুড়ে। ওর শক্তপোক্ত অবয়ব ভয়ে লাল-নীল হয়—ওই যে তছির আইছে কলা গাছের ডাউগ্যা আতে...। দশাসই চেহারার লোকটার এমন চেঁচামেচি বড় বেমানান ও বিসদৃশ লাগে। উঠানে জটলা করা বৃদ্ধরা পর্যন্ত তাদের গাম্ভীর্যের খোলস ভেঙে ফোকলা দাঁতে হেসে ওঠে। প্রায় দুপুর পর্যন্ত নয়নপুর গ্রামের যুবক,বৃদ্ধ চেয়ারম্যান বাড়ির উঠানে এই তামাশা দেখে। কেউ কেউ বাড়ি গিয়ে দুপুরের আহার পর্ব সেরে বিনা পয়সার এই বিনোদনের লোভে আনন্দ নিতে আবার চেয়ারম্যান বাড়িতে ফিরে আসে । রাতে ঘুমের ওজনে কাবু লোকজন রাজ্জাক মিঞাকে তছিরের ডর দেখানোর বৃত্তান্ত পুঁজি করে বাড়ির পথে হাঁটে।

পরদিন দুপুরের তেজি রোদে চেয়ারম্যান গত সন্ধ্যার ঘটনাকে নেহায়েত চোখের ভ্রম বলে নিজেেকে বুঝ দেয়। স্টিলের আলমারি খুলে তছিরের ডেথ সার্টিফিকেটটা ভালো করে নিরিক্ষণ করে। নাহ্, এইতো তছিরের মৃত্যুর অভ্রান্ত প্রমাণ। বাম পা'টা এখনও ফোলা দেখালেও আমলে আনেনা চেয়ারম্যান। সন্ধ্যার আবছা আন্ধারে কী দেখলো,না দেখলো তা নিয়ে এতো হুজ্জত করায় একা ঘরে শরমিন্দা হয়ে পড়ে মানুষটা। নিজ হাতে সে তছিরকে কে গুলি করেছিল বুকের বাঁ দিক লক্ষ্য করে। সেদিন সে মুখে মুখোশ পরে নিলেও তছির তাকে ঠিক চেনে ফেলেছিলো। গুলি খাওয়ার পরও ঘষা ঘষা অস্পষ্ট শব্দ বেরুচ্ছিল ওর গলা দিয়ে—চেয়ারম্যান... কী কামডা করলাআআআ...! ঘটনাটা গ্রাম্য ডাকাতি বলে ভালো রকম সামলে নিয়েছে সে। জেলা শহরের হাসপাতালে তছিরের পোস্টমর্টেম শেষে গ্রামের গোরস্থানে দাফন করা হয়। ব্যাটাকে অবশ্য শহর থেকে আনার কোন রকম ইচ্ছাই ছিল না চেয়ারম্যানের। গাঁয়ের লোকজন মুক্তিযোদ্ধার লাশ গ্রামের মাটিতে কবর দেয়ার প্রবল দাবি ওঠালে রাজ্জাক মিয়ার বাধা দেয়ার উপায় থাকে না আর।

চেয়ারম্যানের সাথে ঘটে যাওয়া কাণ্ড নিয়ে দিন কয়েক গাঁও গরম থাকলেও সপ্তাহ ঘুরতেই স্বাভাবিক হয়ে উঠে নয়নপুর গ্রামের দুপুর সন্ধ্যা আর রাত।এর পর চেয়ারম্যানের নির্দেশে গ্রামের সব কলাগাছ ঝাড়শুদ্ধ নির্মূল করে দেয়া হয়। তবু রাজ্জাক মিঞার কানে বাজতেই থাকে— 
কলা গাছের ডাউগ্যা
ব্যাডা অইলে আউগ্যা...!

সাত দিন পর চেয়ারম্যান তো চেয়ারম্যান, পুরা গ্রামবাসী অবাক। উপড়ানো মাটিতে আরো সতেজে কলা গাছগুলো বেড়ে উঠতে দেখে তারা। তছিরের কবরের চারপাশে রীতিমতো কলা গাছের একটা জঙ্গল আবিষ্কার করে সবাই। আলিয়া মাদ্রাসার মৌলানা সাহেব জানান কলাগাছ দ্রুত বর্ধনশীল, এটা খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয়; তাছাড়া,তছির ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে কেবল মা,বাবা, স্ত্রী, সন্তানকেই হারায়নি তছির; রণাঙ্গনে গ্রেনেড হামলায় হারিয়েছে দুটো পা। দেশ মাতৃকার জন্য অঙ্গ উৎসর্গ করা নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাম। সে বুজুর্গ ব্যক্তি; বুজুর্গকে কেন্দ্র করে অলৌকিক ঘটনা ঘটতেই পারে।

যুদ্ধের ভয়ংকর দিনগুলোতে যুবক তছির রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালায়। স্ত্রীকে জানিয়ে যায়, সে দেশ স্বাধীন করতে যাচ্ছে।এর পর তছির যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য চলে যায় ভারতে। সীমান্ত পার হয়ে ট্রেনিং নেয় ভারতের মেঘালয়ে। যে সব যুদ্ধ শিবির গড়ে তোলা হয়েছিল তার মধ্যে কুরমাইল মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্প ছিল অন্যতম। তছির ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের যোদ্ধা। কামালপুর বিওপি ৯৩ পদাতিক ব্রিগেডের অধীনস্থ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের যুদ্ধ এলাকার আওতাভুক্ত ছিল এ সেক্টর টি। ১১ নম্বর সেক্টরের হয়ে ফুলবাড়িয়ার লক্ষীপুর অ্যামবুশে গ্রেনেড হামলায় দুটো পা- ই উড়ে যায় তছিরের।

যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে এসে দেখে বাড়ির চিহ্ন মাত্র নাই ;সবকিছু পুড়ে যাওয়া একটা বিরান ভিটা নজরে আসে ওর। মুক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের অপরাধে মিলিটারিরা নির্মমভাবে হত্যা করে ওর মা-বাবা, দশ বছরের ছোট ভাইকে। আর আট মাসের সন্তান সম্ভবা স্ত্রীও নরপশুদের লালসার হাত থেকে রেহাই পায় না। ধর্ষণ শেষে বেয়নেটে পেট চিরে জননী ও অনাগত সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এতো তাণ্ডব করেও ক্ষান্ত হয়নি হায়েনারা।ঘর-দোর জ্বালিয়ে দিয়ে যায়...। গ্রামবাসীর কাছে এ নারকীয় বর্ণনা শোনার পর ক্রাচে ভর করা পঙ্গু দেহটা সে আছরে ফেলে পোড়া ছাই মাখা ভিটায়। বীর মুক্তিযোদ্ধাকে দেখতে সেদিন নয়নপুর গ্রাম আর আশপাশের মানুষের ঢল নামে বানের পানির মতো। মানুষের দরদী হাত তছিরকে সযতনে জড়িয়ে ধরে। তছির আবার উঠে দাঁড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে।

সরকারি সাহায্য আর গ্রামের আরশি-পড়শির সাহায্য সহযোগিতায় পোড়া ভিটায় আবার নতুন ঘর উঠে তছিরের । দরিদ্র চাষী পরিবারের এই ছেলেটা যুদ্ধ শেষে ফিরে শুধু নিজ গাঁ'য়ে নয়; আশেপাশের দশ গ্রামের মধ্যেও বীর হয়ে ওঠে। গরীব বশির উদ্দিনকে কয় জনে আর চিনতো! নিজের সামান্য কিছু আর অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কায়ক্লেশে কোনরকমে দিন গুজরান করতো। কাজের মধ্যে একটা কাজ বশির উদ্দিন করেছিলো,বড় ছেলে তছিরকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করানো। অবশ্য এ কৃতিত্বও সবটুকু বাপের একা নয়। প্রাইমারি বৃত্তি পেয়ে প্রথম অঘটনটা ঘটায় তছিরই। এর পর ক্লাস এইটে বৃত্তি, ম্যাট্রিকে ভালো ফলাফল করার সুবাদে শিক্ষক ও স্বজন,পড়শিদেশের সাহায্যে এক রকম বিনা পয়সায় ইন্টার পাশ দেয় সে। বিএ ক্লাসে ভর্তির পরই দেশের রাজনৈতিক অবস্থা উত্তাল হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় গোটা জাতি। ‘৭১-এর ২৫ শে মার্চের রাতের পৈশাচিক হামলা নীরবে মেনে নেয় না বাঘের বাচ্চা বাঙালি। বাংলাদেশ গর্জে ওঠে। স্বাধীনতা অর্জনের প্রেরণায় সবাই হয়ে ওঠে এক একজন মুক্তিযোদ্ধা। তছিরের মাথায় তখন না লেখা - পড়া, না বাবা- মা। এমন কী আসন্ন সন্তান সম্ভাবনা স্ত্রী রিজিয়া খাতুনও থাকে না তার ভাবনায়। কখনও কখনও যুদ্ধ বিরতিতে অনাগত সন্তানের কথা ভেবে প্রত্যয় জ্বলে উঠতো তছিরের চোখে। বুকের রক্ত ঢেলে হলেও মাতৃভূমিকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। অনাগত সন্তানের জন্য এটা হবে পিতার সেরা উপহার।

যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় আনন্দে তছির বিজয়োৎসবে সামিল হতে পারেনি। প্রায় দুই মাস ভারতের লক্ষ্ণৌ আর্মি হাসপাতালে চিকিৎসাধিন থাকতে হয়েছিল তছিরকে। ১১ নং সেক্টরের অধীনে সে কামালপুর বিওপি যুদ্ধ, নকশী বিওপি যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়। ফুলবাড়িয়া লক্ষীপুর অ্যামবুশে গ্রেনেডে দুই পা হারানো তছিরকে সহযোদ্ধাদের সহযোগিতায় উন্নত চিকিৎসার জন্য লক্ষ্ণৌর আর্মি হসপিটালে পাঠানো হয়। দেশ স্বাধীনের পর প্রিয় স্বজনদের সাথে মিলিত হওয়ার আকুলতায় প্রতিটা দিন অপেক্ষা করতো তছির। দেশে ফিরতেও মুক্তিযোদ্ধারা আন্তরিক সাহায্যের হাত বাড়ায়।মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে হুইল চেয়ার দেয়া হলেও গ্রামের এবড়ো- থেবড়ো সড়কে চলাচলের জন্য ক্রাচ ব্যাবহারে স্বচ্ছন্দ বোধ করে তছির। বাড়ি ফিরে টানা বেশকিছু দিন ওজনদার শোকে মুহ্যমান হয়ে থাকে সব হারানো এ যুবক। একসময় উঠে দাঁড়ায়। ক্রাচ দুটোকে দেহের অবিছিন্ন অঙ্গ বানিয়ে শোককে শক্তির অবয়বে পরিণত করে তছির। নতুন উদ্যমে কাজে লাগে। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি গ্রাজুয়েশনও সম্পন্ন করে।

বিএ পাশের বছরই লোকজন তছিরকে ইলেকশনে দাঁড়াবার অনুরোধ জানায়। প্রথমে আসে গ্রামের মুরুব্বিরা- বাজান তুমি অহন গেরামের আল দর। রাজ্জাক চেয়ারম্যানরে তো মেলা দেকলাম, রেশনের তেল চিনি আর গম মাইরা বাঙ্গা টিনের ঘর দুই তলা তুইল্লা ফেলছে। জুলুমবাজি কইরা যার-তার জমিন দখল করে, এইরম কইরাতো চলে না আর...! যুবকদের জোর দাবি—আর ছাড়াছাড়ি নাই তছির ভাই,এইবার আপনেরে চেয়ারম্যানিতে খাড়ইতেই হইবো...।

দিনটা ছিল মঙ্গলবার। গ্রামের কিছু মুরব্বি আর গণ্যমান্য লোক সহ সেদিন সন্ধ্যায় চেয়ারম্যানের বাড়ি যায় তছির। এদের দেখে ফরসি হুঁকা পানরত রাজ্জাক মিয়ার আয়েশি ভঙ্গিতে অসন্তোষের ছাপ ফোটে। চেয়ারে হেলান দেয়া শরীরটা বেয়াদবের মত আরও ঋজু হয়ে বসে। এতে মুরব্বীরা বিরক্ত হয়ে উঠলেও তছির বিনম্র অবয়বে 'আসসালামুআলাইকুম' জানায়। কিন্তু প্রত্যুত্তরে শান্তির কোন ফেরত বাণী উচ্চারিত হয় না। বসতেও বলা হয় না তাদের। তছির নিজ দায়িত্বে মুরুব্বিদের বসার ব্যবস্থা করে পরে নিজে বসে। এইসব কর্মকাণ্ডের ফাঁকে ফাঁকে তছিরের ক্রাচ দুটো পাকা মেঝেতে বন্দুকের নলের মতো ঠকাঠক শব্দ তুললে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকায় চেয়ারম্যান, কিন্তু কথা বলে না। নিরুত্তর চেয়ারম্যান কে এবার তছির না বলে পারে না—চেরম্যান সাব, এতোগুলা মানুষরে আপন চোক্ষে পড়ে না আফনের?নাকি তামুকের নিশায় ডুইব্বা আছেন?—বেদ্দফ! রাজ্জাক চেয়ারম্যানের গলা সাপের মতো হিস হিস করে ওঠে।—গলা নিচা করেন আফনে! তসবীরের গলা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ক্রাচ দুটো মেঝেতে ঠুকে ফটাস পটাস শব্দ তোলে—দেশ স্বাধীনের যুদ্ধ শেষ,এইবার ঠগবাজি আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু। আপনার জুলুমবাজি আর চলবো না।বহুৎ হইছে! ক্রাচ দুটো দেখিয়ে বলে—আমার নতুন অস্ত্র দুইটা দেইখা রাখেন রাজ্জাক মিয়া! চেয়ারম্যান এক লাফে তছিরের দিকে তেড়ে আসে—ওই ফকিন্নির পোলা কি কইতে চাস তুই?ক্ তছিরের সংগীরা চেয়ারম্যান কে থামায়—কামডা ভালা করলা না চেয়ারম্যান, আমরা তছিররেই ইলেকশনে দাঁড় করামু। তোমারে ভালা কইরা বুঝাইতে আইছিলো তছির আইজ। বছর গরিবের চাউল, চিনি, গম ম্যালা খাইছো। আর না। আমরা গেরামবাসিরা তছিররেই চেয়ারম্যান হিসাবে দেখবার চাই…।

রাজ্জাক চেয়ারম্যানের ঘুম হারাম হয়ে যায় তার। এর কিছুদিন পরেই নিজের ঘরে খুন হয় তছির। প্রমাণের অভাবে গ্রামবাসীরা সব কিছু বুঝেও কিছু করতে পারে না। তবে মৃত্যুর পর তছিরকে গ্রামের মাটিতে সমাহিত না করার অবিসন্ধি না মেনে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে সমস্ত গ্রাম। এর পরে কলা গাছের ডগা হাতে তছিরের আবির্ভাব…।

বেত বোনের কাছে তছিরকে দেখার পর রাতে চেয়ারম্যান আর বেরোয় না। কিন্তু তাতেও নিস্তার পায় না রাজ্জাক মিঞা। এখন নিজের শোবার ঘরেই দেখা শুরু করেছে তছিরকে।এখন আর ক্রাচে ভোর দিয়ে আসেনা সে; সমর্থ্য পায়ে হেঁটে আসে তার বিছানা বরাবর, হাতে থাকে একটা শক্ত কলা গাছের ডগা। ঘরের বিজলীবাতির হলুদ আলোতে ওটা রাইফেলের মত চকচক করে। রাজ্জাক চেয়ারম্যান ভয়ে যতই পিছনে হটে তছিরের গলা মেঘের মতো গর্জে ওঠে—
বেডা অইলে আউগ্যা...আউগ্যা...আউগ্যা...! ·



লেখক পরিচিতি : পারভীন সুলতানা। গল্পকার, ছড়াকার। এ যাবত প্রকাশিত ন’টি গল্পগ্রন্থ, তিনটি উপন্যাস, ছটি ছড়া সংকলন এবং দুটি কিশোর গল্পগ্রন্থ। জন্ম ময়মনসিংহে। শৈশব কেটেছে সেখানেই। এখন ঢাকায় থাকছেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ