মুম রহমানের সাক্ষাৎকার : আমি সাংবাদিক ধাঁচের গল্পকার নই


মুম রহমান কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও অনুবাদক। দেশে এবং দেশের বাইরে উল্লেখযোগ্য পত্র-পত্রিকায় অসংখ্য গল্প-উপন্যাস-নাটক-প্রবন্ধ-অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কাজ করেছেন মঞ্চ ও বেতারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে নাট্য রচনায় এমএ। পত্রপত্রিকা ও বিজ্ঞাপনী সংস্থায়ও কর্মরত ছিলেন। গল্পপাঠকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে বলেছেন নিজের লেখালেখি, পাঠ এবং কথাসাহিত্যের নানা প্রসঙ্গে। 

গল্পপাঠ :
কোন লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এবং কীভাবে প্রভাবিত করেছেন?

মুম রহমান :
এভাবে সুর্নিদিষ্ট করে বলা খুব মুশকিল। একটা বয়সে হুমায়ূন আহমেদ প্রভাবিত করেছে। তারও আগে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলকুমার দারূণ প্রভাবিত করেছিলো। সেলিম আল দীন সরাসরি প্রভাবিত করেছিলেন আমার একটা নাটক ‘‘শেষ পূর্ণিমা” লেখার সময়। তিনি এতোটাই প্রভাব ফেলেছিলেন যে ওই নাটকটা পড়লে মনে হবে এটা সেলিম আল দীনের লেখা। অন্যদিকে ‘‘মায়াবি মুখোশ’ উপন্যাস পড়লে মনে হবে এটা হুমায়ূন আহমেদের লেখা। এক সময় প্রচুর অণুগল্প লিখেছি। তার একশটি নিয়ে বই করেছিলাম, ‘শত গল্প’’ শিরোনামে। সেই বইয়ের কিছু গল্পে বনফুলের প্রভাব থাকতে পারে। আমি সে সময় খুব পিটার বিকসেল পড়ছি। ওর ‘‘কিন্ডারগার্ডেন স্টোরিস’’ আমাকে প্রভাবিত করেছিলো একদম সরল করে লিখতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘‘সহজ কথা যায় না-বলা সহজ’’ ধারায় আমাকে চালিত করেছিলো। বোর্হেস এতোটাই প্রভাবিত করেছিলো যে উপন্যাস লিখতেই আমার আগ্রহ হয়নি। পরে অবশ্য ‘‘মানুষ রতন’’ উপন্যাস থেকে শুরু করে ‘‘পাঁচজন ফজলু’’ প্রর্যন্ত বলা যায় প্রভাব মুক্ত। দুটোই আমার নিজস্ব ঘরানা উপন্যাস। তবে দুটো পড়লেই ভাষা ও আঙ্গিকে নয়া ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। বলা যায় যে, আমি এখন প্রভাব ‍মুক্ত। এখন আর কেউ আমাকে প্রভাবিত করে না। আলোড়িত করে, মুগ্ধ করে, কিন্তু প্রভাবিত করে না আর।

গল্পপাঠ :
এখন কোন বইগুলো পড়ছেন, খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলো এনে রেখেছেন পড়বার জন্য?

মুম রহমান :
এটা আমার জন্য খুবই কঠিন একটা প্রশ্ন। কারণ আমি একটা বা দুটা বই পড়ি না। আমার বিছানার পাশে একটা টেবিল আছে যেখানে অন্তত গোটা পঞ্চাশেক বই জড়াজড়ি করে আছে। এর মধ্যে কিছু বই আছে কাজের। মানে আমি অনুবাদ করার জন্য রেখেছি কিংবা আমার গবেষণার কাজে লাগছে। আবার কিছু বই নতুন কিনেছি। উল্টেপাল্টে দেখছি। কোন বইয়ের খানিকটা পড়ছি। আবার রেখে দিয়ে আরেকটা বই নিচ্ছি। আমার পাঠ অভ্যাস বিচিত্র আর সিলেবাসহীন। বিছানার পাশের অর্ধশতাধিক বইয়ের ভিড়ে অবশ্যই আছেন মনীন্দ্র গুপ্ত। আমি যে কোন গদ্য লেখার আগে তাকে পড়ে নেই দুপাতা। অন্যদিকে আছে মণীশ ঘটক। তার ‘কনখল’ আমার বড় প্রিয় উপন্যাস। সময় পেলেই পড়ি। ছোট বাচ্চা যেমন হাতের কাছে প্রিয় চকলেট আইসক্রিম পেলেই একটু চেটে দেখে, কামড়ে দেখে কিংবা চুষে খায় আমি তেমনি মণীশ ঘটক আর মনীন্দ্র গুপ্ত আস্বাদন করি। তাড়িয়ে তাড়িয়ে, প্রায়শই। অন্যদিকে বিছানার পাশেই, মানে হাতের নাগালে রেখিছি কিছু তার্কিশ আর ফিলিস্তিনি নাটক, রিলকের কবিতা, কাকুজো ওকাকুরার মহান ছোট্ট বই ‘‘দ্য বুক অব টি”, রে ব্রাডবেরি ও আসিমভের গল্প সংকলন, সৈয়দ মুজতবা আলীর “চাচা কাহিনী” ইত্যাদি।

গল্পপাঠ :
সর্বশেষ কোন শ্রেষ্ঠ বইটি আপনি পড়েছেন?

মুম রহমান :
আগেই বলেছি, আমি একসাথে অনেকগুলো বই পড়েছি। শ্রেষ্ঠ, নিকৃষ্ট জানি না। তবে সর্বশেষ যে দুচারটা বই আমাকে খুব আলোড়িত করেছি, পড়ার পর মনে হয়েছে, বইটা গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দদায়ক এবং প্রেরণাদায়ী তার মধ্যে অবশ্যই অরুন্ধতি রায়ের ‘‘মাদার মেরি কামস টু মি”, ঋত্বিক ঘটকের ছোটগল্প, মাৎসু বাসোর “দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ এণ্ড আদার ট্রাভেল স্কেচেস’‘, মুরাকামির ‘‘নভেলিস্ট এজ ভোকেশন”।

গল্পপাঠ :
আপনার প্রতিদিনকার পাঠের অভিজ্ঞতার কথা বলুন, কখন কোথায়, কী এবং কীভাবে পড়েন?

মুম রহমান :
এইটা আমার জন্য মজার প্রশ্ন। মানে আনন্দদায়ক প্রশ্ন। আমি পড়তে ভালোবাসি। আমার প্রধাণ পরিচয় আমি পাঠক। আমি দিন রাত পড়ি। আর আমার পড়ার বিষয় যেমন বিস্তৃত, তেমনি পড়ার জায়গাও অনেক। আরো সোজা করলে বললে, আমি যেখানেই যাই, যখনই অবসর পাই, তখনই পড়ি। একটা দুটা বই আমার সঙ্গে সব সময়ই থাকে। ভ্রমণ করলে নিজের কিন্ডল আর আইপ্যাড আমার প্রিয় সঙ্গী। ওদুটো অসংখ্য ইবুক জমা আছে। আর বাসাতেও আমি বারান্দায় পড়ার জায়গা রেখেছি, আমার ছাদ বাগানে পড়ার জায়গা আছে। নিজের বিছানা তো আছেই। আমার বাসায় আলোয় বিচিত্র ব্যবস্থা। আমি ডিভানে শুয়ে পড়ি। তাই মাথার উপর আলো। বিছানার পাশে জানালা, সেখানেও আলো। আমার পোর্টেবল রিডিং ল্যাম্প, টেবিল ল্যাম্প একাধিক, ঘরেও নানা কোণায় লাইট আছে, যাতে যখন খুশি তখন পড়তে পারি।

গল্পপাঠ :
কোন বইটি আপনার খুব প্রিয় কিন্তু অনেকেই বইটির কথা জানেন না?

মুম রহমান :
আমার অনেক প্রিয় বইয়ের নামই অনেকেই জানে না। আমাদের দেশে লোকে বিচিত্র বিষয়াদি নিয়ে কম পড়ে, নন ফিকশন আরো কম পড়ে। আমার পাঠ বরং বিচিত্র বিষয়ে আর ননফিকশনেই বেশি। একটা বইয়ের কথা আমি বোধহয় একদশক আগেই লিখেছি, যুগান্তর পত্রিকায়। এই বইটা কেউ পড়েনি বলেই আমার ধারণা। কারণ বইটা পাওয়া যায় না আর আমি কারো কাছে শুনিওনি এই বইটা পড়েছে বলে। অথচ এই বইটা প্রত্যেক ভালো পাঠকের, এমনকি লেখকেরও পড়া উচিত। বইটার নাম হলো ‘আ ন্যাচারাল হিস্টোরি অব দ্য সেন্সেস’’। ডিয়ান একারম্যানের লেখা বই। আমেরিকা থেকে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত। কিভাবে যেন এই বইটা আমার হাতে এসেছিলো। এই বইটা হলো আমাদের ইন্দ্রিয় সমূহ নিয়ে লেখা। ঘ্রাণ, স্পর্শ, স্বাদ, শ্রবণ, দর্শন নিয়ে একটা বই। এই বইতে আমাদের পাঁচ ইন্দ্রিয় নিয়ে মজার মজার তথ্য, লেখা আছে। একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক তথ্য সমৃদ্ধ এবং ভীষণ কাব্যিক ভাষা। প্রায় সাড়ে তিনশ পাতার এই বইটাকে আমার কাছে একটা হীরার খনি মনে হয়। মানুষের দেখা, শোনা, স্পর্শ ইত্যাদি নিয়ে এতো বিস্তৃত লেখা আমি আর কোথাও দেখিনি। আমার বিবেচনায় এই বইটা আমাদের অনুভূতি আর ইন্দ্রিয়গুলো আরো ধারালো করে, ধারালো কিন্তু মধুর। এটা বিস্ময়কর বই নোমান!

গল্পপাঠ :
কোন বইটি জীবনে একবার হলেও প্রত্যেকের পড়া উচিৎ?

মুম রহমান :
ওই যে বললাম এই মাত্র, ডিয়ান একারম্যানের ‘আ ন্যাচারাল হিস্টোরি অব দ্য সেন্সেস’’।

গল্পপাঠ :
ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক এবং কবিদের মধ্যে এখনও লিখছেন এমন কাকে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন? কেন করেন?

মুম রহমান :
আমি সবাইকেই শ্রদ্ধা করি। যিনি দূর্দান্ত লিখছেন, যিনি সদ্য লিখতে শিখছেন, যিনি লেখার কথা ভাবছেন, লিখতে চেষ্টা করেছেন তাদের সবাই আমার কাছে শ্রদ্ধেয়। আমি যেহেতু সব কিছুই পড়ি, নিজেও সব মাধ্যমে লিখি কাজেই আলাদা করে ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক বা কবিদের মধ্যে আমি বিভাজন করি না। সবাই লেখক, কেউ সংলাপ লেখে, কেউ গদ্যে লেখে, কেউ পদ্যে লেখে, সবাইকে আমি শ্রদ্ধা করি। এরমধ্যে কম-বেশি বলে কিছু নেই।

গল্পপাঠ :
লেখক হিসেবে তৈরি হতে কোন বইটি আপনার মনকে শৈল্পিক করে তুলেছে এবং কীভাবে?

মুম রহমান :
আমি এখনও লেখক হিসেবে তৈরি হয়নি, আমার মন ও মনন এখনও পুরোটা শৈল্পিক নয়। জাগতিক ধূলোমাটি, কালিমা, জীবনযাত্রার নানা জটিলতা এখনও আমাকে পুরোটা শৈল্পিক করেনি। আর লেখক হওয়া একটা প্রক্রিয়া, দীর্ঘ প্রক্রিয়া, এখনও সে প্রক্রিয়া আমার শেষ হয়নি। আর বইয়ের কথা যদি বলি, কোন একক বই পৃথিবীতে নেই যেটা আপনাকে, আমাকে লেখক বানিয়ে দেবে। একদিকে লঙ্গিনাসের শিল্প তত্ত্ব, অন্যদিকে হিমেনেথের কবিতা, একদিকে নবোকভের গল্প বয়ান, অন্যদিকে অরেয়েলের ভাষা, একদিকে রবীন্দ্রনাথের জীবন-মৃত্যু দর্শন, অন্যদিকে নজরুলের কাব্যে আমপারা- এমন অসংখ্য বই আমাকে নিত্য নির্মাণ করে। লেখক হিসেবে তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অনেক এবং অনেক বই আমাকে সাহায্য করে, করছে...

গল্পপাঠ :
কোন বিশেষ ভাব কিংবা পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতি আপনাকে লিখতে বাধ্য করে?

মুম রহমান :
আমি যেহেতু লেখালেখির বাইরে অন্য কোন কিছু করি না, মানে পেশা হিসেবে এটাই আমার প্রধাণ অবলম্বন সেহেতু আমি কমিটেড। কখনো প্রকাশকের কাছে, কখনো সম্পাদকের কাছে। আমি সচারাচর কথা রাখি। প্রকাশক বা সম্পাদক যে দিন-তারিখ দেয় সেটা আমাকে এক ধরণের বাধ্য বাধকতা তৈরি করে দেয়। মোদ্দাকথায় চাপে পড়লে আমি লিখতে বাধ্য। তবে সামগ্রিকভাবে আমি লেখার পরিবেশ, পরিস্থিতির উপর খুব একটা নির্ভরশীল নই। আমি নিয়ম করেই লিখি।

গল্পপাঠ :
আপনি কীভাবে আপনার বইগুলোকে গুছিয়ে রাখেন?

মুম রহমান :
কবিতা আমার খুব প্রিয়। কবিতার বইয়ের জন্য আমার পুরো বাড়িতেই দুতিনটা বইয়ের তাক আছে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ নিয়ে আলাদা তাক। ইংরেজি এবং অন্য ভাষার বইগুলোও আলাদা তাকে থাকে। বিছানার পাশের টেবিলটা ছাড়া আমার বই মোটামুটি গোছানো। চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, সঙ্গীত, দর্শন, পুরাণ এমন বিষয় ভিত্তিকভাবেও বই গুছিয়ে রাখি আমি।

গল্পপাঠ :
এই বইগুলো পড়ার পর কোন বইগুলো পড়বেন বলে ভেবেছেন?

মুম রহমান :
আমার সত্যজিৎ রায়কে আবার পাঠ করার। ছোটবেলায় পড়েছি। এখনও কিছু কিছু মনে আছে। কিন্তু আমার ধারণা আবার পড়তে বসলে নতুন করে মজা পাবো। এমনকি মাসুদ রানা’র অগ্নিপুরুষ আরেকবার পড়ার ইচ্ছা আছে। সেবা প্রকাশনীর কিছু ক্লাসিকস আর অনুবাদ যেমন প্যাপিলিয়ন, লাস্ট ডেইজ অব পম্পেই আবার পড়তে চাই।

গল্পপাঠ :
শব্দকে আপনি কীভাবে অনুভব করেন? আপনি কি কখনও শব্দের গন্ধ পেয়েছেন?

মুম রহমান :
শব্দই ব্রহ্ম্ম, শব্দই বিশ্ব। শব্দ’র বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ কখনোবা পাই। তবে এই ঢাকা শহরে শব্দকে এখন মাঝে মাঝে অত্যাচার মনে হয়। বিশেষ করে অটোরিকশা বা ম্যাশিনের যে রিকশাগুলো বেরিয়েছে তাদের হর্ন, খিলগাও রেলগেটের ট্রেন আসার আগে পরে একটা হর্ন বাজে। এই শব্দগুলো বাজে, খুউব কানে লাগে। কিন্তু ঠিকঠাক উচ্চারণে কাউকে কথা বলতে দেখলে, তার প্রতিটি উচ্চরিত শব্দের প্রেমে পড়ে যাই আমি। কেউ সঠিক শব্দ চয়ন করলে মনে হয় সেই লেখককে আমি স্পর্শ করতে পারি। কিন্তু নৈঃশব্দও আমার ভালো লাগে।

গল্পপাঠ :
সাম্প্রতিক কোন ক্ল্যাসিক উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন?

মুম রহমান :
আমি উপন্যাস খুব একটা পড়ি না। সব ‍মিলিয়ে হয়তো দুয়েকশ উপন্যাস আমি পড়েছি। রিচার্ড বাখের লেখা জোনাথন লিভিং স্টোন সিগাল নামের ছোট্ট উপন্যাসটি আমার খুউব প্রিয়। ওটা আমি কয়েকদিন আগেও পড়লাম। এই ছোট্ট উপন্যাসটি আমি এক, দ ‘ বসাতেই পড়ে ফেলতে পারি। এমন অপূর্ব তার গদ্য শৈলী। অবশ্য আমি ঠিক জানি না, এটাকে লোকে ক্লাসিক উপন্যাস বলবে কি না! মার্কেজের ‘মেমোরিজ অব মাই মেলানকলি হোর্স’ এবং হেমিংওয়ে’র “দ্য ওল্ড ম্যান এণ্ড সী” আমি প্রায়শই পড়ি। এগুলো আকারে ছোট, কিন্তু দারূণ। পড়তে সময় লাগে না অতো। অথচ পড়ার পর দিব্যি ওই জগতটায় থাকা যায় লাগাতার, কয়েকদিন।

গল্পপাঠ :
আপনি যখন একটি বইয়ের কাজ করছেন, লিখছেন, সম্পাদনা করছেন, কাটাকাটি করছেন, সেই সময়টায় আপনি কোন ধরণের লেখাপত্র পড়েন? আবার ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরণের লেখা আপনি এড়িয়ে চলেন?

মুম রহমান :
খুব ঠেকায় না-পড়লে আমি কঠিন কিছু পড়ি না। জটিল করে লেখা যে কোন জিনিসই আমি এড়িয়ে চলি। আবার অতি তরল লেখাও আমি এড়িয়ে চলি। ভাবনার খোরাক যোগানো লেখা আমার ভালো লাগে। লেখালেখির সময় লেখার প্রয়োজন যেটা পড়ার সেটা তো পড়িই। তার বাইরে আমি সে সময় পত্র-পত্রিকা পড়ি। চিঠি, জীবনী ওগুলোও পড়ি।

গল্পপাঠ :
সম্প্রতি পঠিত বইগুলো থেকে এমন কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার কি জেনেছেন যা আপনার লেখক- জীবনকে ঋদ্ধ করেছে?

মুম রহমান :
না, আলাদা করে তেমন কোন বইয়ের কথা মনে পড়ছে না।

গল্পপাঠ :
আপনি কোন ধরনের লেখা পড়তে আগ্রহ বোধ করেন, আর কোন ধরনটি এড়িয়ে চলেন?

মুম রহমান :
ওই যে বললাম, যে লেখা আমাকে ভাবায়, যে লেখা আমাকে আনন্দও দেয়, সে লেখা আমি পড়ি। খুব বেশি জটিল লেখা আমি এড়িয়ে চলি। আমি সাহিত্যের আঙ্গিকগত নীরিক্ষা পছন্দ করি। কিন্তু অনেক দীর্ঘ বাক্য, অনেক জটিল বাক্য আমি নিতে পারি না। এটা আমার ব্যক্তিগত অক্ষমতা।

গল্পপাঠ :
আপনার জীবনে উপহার হিসেবে পাওয়া শ্রেষ্ঠ বই কোনটি?

মুম রহমান :
খুব সম্ভবত মাহমুদুল হক ও সতীনাথ ভাদুড়ী’র রচনাবলী।

গল্পপাঠ :
ছোটবেলায় কেমন বই পড়তেন? সেই সময়ে পড়া কোন বই এবং কোন লেখক আপনাকে আজও মুগ্ধ করে রেখেছে?

মুম রহমান :
আমার বই পড়ার হাতেখড়ি আসলে সেবা প্রকাশনীর মাধ্যমেই। তাদের তিন গোয়েন্দা, কিশোর ক্লাসিকস, তারপর মাসুদ রানা স্কুলে থাকতেই আমাকে মুগ্ধ করেছে। রাহাত খানের “দিলুর গল্প”, সত্যজিৎ রায়ের প্রায় সব লেখাই আমাকে ছোট বেলায় মুগ্ধ করেছে।

গল্পপাঠ :
এ পর্যন্ত কতগুলো বই অর্ধেক কিংবা পড়া শুরু করে শেষ না করেই ফেলে রেখেছেন?

মুম রহমান :
বলা মুশকিল। অসংখ্য হবে।

গল্পপাঠ :
কোন বইগুলোয় আপনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন?

মুম রহমান :
অসংখ্য বইতে। তবে ওই যে মনীশ ঘটকের কনখল সে আমার নিকটাত্মীয়।

গল্পপাঠ :
কোন বইগুলো জীবনে বারবার পড়েছেন এবং আরও বহুবার পুনর্পাঠ করবেন?

মুম রহমান :
‍রিচার্ড বাখের “জোনাথন লিভিং স্টোন সীগাল”, মার্কেজের কিছু বই, মনীশ ঘটক, মনীন্দ্র গুপ্তের সব বই, কমলকুমারের উপন্যাসগুলো, এমনকি ওর ‘‘লাল জুতা” ছোটগল্প আমি বারবার পড়ি। আর শক্তি, শঙ্খর যে কোন কবিতার বই, বোর্হেসের যে কোন গল্প আমি যে কোন সময়ই পড়তে পারি। বারবার পড়ি, পড়বো এমন তালিকাতে উৎপল দত্ত, সৈয়দ শামসুল হক বিশেষ করে তার কাব্য নাটকগুলো আছে। আরো অনেক। সব বলা মুশকিল।

গল্পপাঠ :
লেখালেখির নিরন্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে একাত্ম থাকেন?

মুম রহমান :
নিরন্তর লিখি। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কোন লেখকই না। কারণ আমার কোন রাইটার্স ব্লক-ফ্লক নেই। এই একটা কবিতা অনুবাদ করছি তো এই একটা প্রবন্ধ লিখছি, এই গল্প লিখছি তো এই নাটক লিখছি। আমি বিজ্ঞাপণী সংস্থায় কাজ করতাম। এখনও কিছু কাজ করি। যাকে ক্ষ্যাপ বলে আর কি! সেখানে সাবান, শ্যাম্পু থেকে শুরু করে সচেতনতা, নারীর অধিকার এইসব বিষয়ও লিখি। টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখেছি, কয়েকশ পর্ব তো হবেই। আমি আসলে লিখতেই থাকি। কখনো বনসাই নিয়ে, কখনো ইরফান খান নিয়ে, কখনো জেমস বন্ড কখনো মাসুদ রানা নিয়ে। আমি লিখতেই থাকি।

গল্পপাঠ :
কে সেই লেখক যাকে আপনি পাঠ করেন গভীর আনন্দের সঙ্গে, যিনি আপনার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন?

মুম রহমান :
মণীন্দ্র গুপ্ত। আমি বড় কোন কাজ শুরুর আগে তার ‘‘অক্ষয় মালবেরি’’ পড়তে শুরু করি। ওটা আমাকে মসৃণ করে।

গল্পপাঠ :
গল্প লিখতে শুরু করেন কীভাবে? একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? আপনি কি নোট নেন?

মুম রহমান :
না। আমি সাংবাদিক ধাঁচের গল্পকার নই। হয়তো ছোট্ট কোন একটা কিছু দেখে, একটা মাছ কি পাখি দেখে আমি লিখতে শুরু করি। একটা গাছও আমার অনুপ্রেরণা হতে পারে আবার পথে হেঁটে যাওয়া একজন কিশোরীও হতে পারে। আমি যে কোন একটা গল্প আমার ভেতরে পুষি। পুষতেই থাকি। ওটার একটা প্র্যাগন্সেসি পিরিয়ড আছে। মানে মা যেমন পেটের মধ্যে সন্তান রেখে দেয়, আমি তেমনি গল্পের কোন ভ্রুণ পেলে রেখে দেই, বুকের মধ্যে বা মগজে, কে জানে কোথায়। তারপর ও আপন মনে বাড়তে থাকে। তারপর হুট করে লিখে ফেলি। লিখে আবার ফেলে রাখি মেলা দিন। মেলা দিন শেষে আবার ওটাকে নিয়ে কাজ করি। গল্পের ভাষা, প্রকরণ আমি খুব পাল্টাই। বোধহয় ছোটগল্পেই আমি সবচেয়ে বেশি সময় দেই। আর ছোটগল্পেই আমি নিজের ভেতরে সবচেয়ে বেশি ডুব দেই। চারপাশে নয়, আমি নিজের ভেতরেই গল্পকে খুঁজে পাই। কখনো বা কোন বিষয় নিয়ে পড়তে পড়তে গল্প লিখতে বসে যাই। আমি খুব রিসার্চ করি। মানে বৃষ্টি যদি আমার গল্পে থাকে তাহলে বৃষ্টি নিয়ে আমি বিশ্বসেরা কিছু কবিতা, গল্প যেমন পড়ি, সিনেমায় বা চিত্রকলায় বৃষ্টি দেখে আসি। তেমনি বিড়াল যদি হয় তো বিড়াল নিয়ে মেতে থাকি। নানা মাধ্যম থেকে আমি উপাদান নেই। সিনেমা, চিত্রকলা, নাটক, কবিতা সবখান থেকে আমি নিজের গল্পের উপাদান বের করি।

গল্পপাঠ :
লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করবেন?

মুম রহমান
নির্মোহ থাকা। আমার মনে হয়, অনেকেই লিখতে আসে যারা লেখাটাকে হারিয়ে ফেলে। চারপাশে এতো পুরস্কার, খ্যাতির সুযোগ রয়েছে যে একজন লেখক স্রোতে হারিয়ে যেতে পারেন। বিভ্রান্ত হতে পারেন। আমি মনে করি, কোন রকম মোহকে বাদ দিয়ে লেখালেখিটা চালিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে কঠিন।·

সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : নভেম্বর ২০২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ