অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্প : রেডিও'র সঙ্গে কথা



তুন বাজার পেরিয়ে উত্তর দিকে যেতে যে পুরনো তালাচাবির দোকান তার ঠিক পাশেই দোকানটা। কিন্তু শুধু এইটুকু বললে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। হাঁটবার তোড়ে দোকান নজরছুট হবেই। বলতে হবে, তালাচাবির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, বামদিকে নজর রেখে, দর্জির দোকানের দিকে শামুকপায়ে এগোও। এই দু’য়ের মাঝখানে লোহার গেটওয়ালা যে গ্যারেজ, তার ভিতরের দিকে দোকানটা। অল্প আলোতেও দেখা যাবে দোকানের শিয়রে সাইনবোর্ড—নিরঞ্জন রেডিও রিপেয়ার্স। বাম দিকের দেওয়ালে নীল রঙে লেখা—টিভি ভি বনতা হ্যায়, লেকিন রেডিও জ্যাদা পসন্দ হ্যায়। দোকানের ভেতরে নজর রাখলে দেখা যাবে তাকের ওপর সারিসারি রেডিও—চল্লিশের ফিলকো, বাষট্টির মারফি, সত্তরের ট্রপিকানা...।

ঝিমধরা আলোতেও দেখা যাবে নিরঞ্জন কর্মকারকে। গাত্রবর্ণ তামার পাত্রের মতো, শরীর পেশিবহুল নয় তবে হাত নিশ্চয়ই জানু ছুঁতে পারবে। কব্জি সাধারণের তুলনায় চওড়া, শিরাফোলা। আঙুলগুলোর দিকে ভালোভাবে দৃষ্টি ফেললে নিশ্চয়ই রাংঝালের দাগ দেখা যাবে। খোঁচা খোঁচা গোঁফ-দাড়ি, কাঁচাপাকা; বয়স সম্ভবত ষাট। অবিশ্যি তার বেশিও হতে পারে। কিন্তু ষাট বললে যে ছবিটা চোখের সামনে ভাসে, সত্তর বললে কি অন্যরকম কিছু মাথায় আসে? তাই ষাটের পরের স্টপ আশি! সেই আশি-তে যে এখনও পা রাখেননি নিরঞ্জন, সে-কথা যেমন নিশ্চিত বলা যাবে, ষাট পেরিয়ে গেছে কী না, তা চিৎপুর, নতুন-বাজার এলাকা কারওর পক্ষেই ততটা নিশ্চিন্তে বলা সম্ভব নয়।

পাড়ার সবাই ওকে নিরুদা বলে চেনে। এমনকী নিরঞ্জনের একমাত্র সহকারী গোপাল, সোদপুরের গোপাল সাহা, যে, এই মুহূর্তে চাঁদনি বাজারে গেছে রেডিও’র পার্টস কিনতে, সেও নিরুদা ডাকে। একমাত্র অরুণেশ আচার্যচৌধুরী, নামি কবি, পাথুরিয়াঘাটায় বাড়ি, ডাকেন নেরুদা বলে। পাবলো নেরুদা থেকে নেরুদা। চিৎপুরের নেরুদা! কবি ঠাট্টা করে বললেও নিরঞ্জন একে প্রশংসা হিসাবেই ধরেন এবং অরুণেশের সম্বোধনে অকুণ্ঠচিত্তে সাড়া দেন।

বয়স যাই হোক, সকাল এগারোটায় দোকান খোলবার পর প্রথম আধঘণ্টা নিরঞ্জনবাবুর চলাফেরা একেবারে সেকেণ্ডের কাঁটার মতো। ওইটুকু জায়গার একবার এই রেডিও নাড়ছেন তো পরক্ষণে ওই রেডিওতে হাত বুলোচ্ছেন। একবার টেবিলের উপর পড়ে থাকা রেডিও’র নাড়িভুঁড়ি দেখছেন তো তারপরেই, যে রেডিও থেকে তা খোলা হয়েছে, তাকে দেখে নিচ্ছেন। ঠিক আছিস তো বাবা, হ্যাঁ ঠিক থাক, এখুনি অপারেশন শেষ করছি! নিজের সঙ্গে কথা বলা শেষ করে যখন উনি অপারেশন টেবিলে সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি রাখবার বটুয়া খুলে তার লাগান সোল্ডারিং আয়রন হাতে বসবেন, একেবারে ধীরস্থির, ঘণ্টার কাঁটা। এই সময় কোনও খদ্দের কথা বলতে এলে, ঘাড় ঘুরিয়ে চশমার ভেতর থেকে এমন একটি দৃষ্টি ছুঁড়বেন যে, লোকটি বলবে, ঠিক আছে একটু পরে আসছি। নিরঞ্জন তখন ঘাড় ঘুরিয়ে অপারেশন টেবিলে চোখ রাখবেন। ওর চোখে রেডিও কেবল যন্ত্র না—ওদের প্রত্যেকের একেকটা গল্প আছে, তা শুনতে পেলেই সারানোটা সহজ। যতক্ষণ না ওদের ধাত বোঝা যাচ্ছে, নিরঞ্জনের অপারেশন টেবিলে শোয়ান হবে না সেই রেডিওকে। আগে ওদের ভাষাটা বুঝতে হয়, বুঝলেন কী না! এই হল নিরঞ্জনের বাঁধা বুলি।

নিরঞ্জনের দোকানের তাক ভর্তি রেডিও—একটার পর একটা সারি। ওপরের তাকগুলোতে একটি রেডিও’র সারির মাথায় অন্য সারি! কিছু ২০১০-এর ডিজিটাল টিউনারওয়ালা, আবার, তারই মাথায় চাপান কিছু ভারী বেকেলাইটের বাক্স, ১৯৪০-এর দশকের, যাদের টিউনিং-নব আঙুলের ঘর্ষণে মসৃণ, অ্যান্টেনা মোচড়ানো, যেন আশি বছরের বৃদ্ধার বুড়ো আঙুলের হাড়!

রেডিও যা আছে তার সবই কেউ না কেউ সারাবার জন্য দিয়েছে; যাদের প্রিয় রেডিও সেটটির ওপর টান বেশি, তারা তাগাদা দিয়ে-দিয়ে নিরঞ্জনকে দিয়ে সারিয়ে নিয়েছে ঠিক; আবার অনেকেই দোকানে জমা দেওয়ার পর আর নিতেই আসেনি! সেই জমজমাট হিন্দি কিংবা বাংলা সিনেমায় যেমন দেখায়, বাবা তারা কোনও অবৈধ সন্তানকে অথবা কোনও দয়ালু পাদ্রী পথে পাওয়া করুণ মুখের অনাথ শিশুকে যা করেন, তেমনই ওইসব দাবিদারহীন রেডিও’র থাকবার বন্দোবস্ত হয়েছে নিরঞ্জনের এই ওয়ার্কশপে! ফলে, নিরঞ্জনের দোকানের আর এক নাম হতে পারে রেডিও’র অনাথ আশ্রম!

যদিও ফাল্গুনের শেষ, তবু এক-একদিন যেন প্রকৃতির ইচ্ছে হয় বৃষ্টিস্নাত হয়ে শরৎ সাজবার, আজকের দিনটিও তেমন। এক পশলা বৃষ্টির পরেই বিশুদ্ধ নীল আকাশ, আর সেই জমিতে মেঘগুলো বাউণ্ডুলে কবি’র মতো হেঁটে বেড়াচ্ছে। গ্রামের আবহে এই সময় মাটির গন্ধে বাতাসের আনচান করবার কথা, কিন্তু এ-পাড়ায়, নতুনবাজারের উলটোদিকে যে মিষ্টির দোকান, তার দুধ ফোটাবার গন্ধ! রাবড়ি তৈরি হবে যে।

নিরঞ্জন ওয়ার্কশপে ঢুকলেন সংলাপ বলতে বলতে--কি হল পণ্ডিতমশাই?...অন্যরকম গলায় জবাবি সংলাপও বললেন নিরঞ্জন, নাহ্‌, কিছুই তো হল না, আরে ও কোনও কথাই শুনতে রাজি নয়, কত বুঝিয়ে বললাম যে, বাপু হে, আর এক ঘন্টা বাদে তোমার ফাঁসি হবে, তা এইসময়ে একটু গীতা, একটু চণ্ডী পড়ে শোনাই, শোন, কিন্তু সামান্য একটু মুচকি হেসে সেই যে গম্ভীর মুখে আমার দিকে চেয়ে চুপ করে গেল...। সত্তরের এক বিখ্যাত রেডিও-নাটকের সংলাপ! নাটকের নামটি কিছুতেই মনে পড়ল না তার। লাইটের সুইচ টিপলেন নিরঞ্জন। কয়েকটা পুরোনো বাল্ব্‌ জ্বলে উঠলো টিম টিম করে, হালকা সোনালী আলোয় ভরে উঠল যন্ত্রপাতির ঘর। এ বড় মায়াবী আলো, যেন যীশুখ্রীষ্টের পুনরুত্থান ঘটতে চলেছে!

বাম হাতে চা আর ডান হাতে সরু স্ক্রু-ড্রাইভার নিয়ে টেবিলের সামনের উঁচু চেয়ারটিতে বসে পড়লেন নিরঞ্জন। সংলাপের পরের অংশটি ভাবতে ভাবতে চালু করলেন চল্লিশ দশকের মারফি রেডিও, যাকে গত ক’সপ্তাহ ধরে খুলে দেখার কথা ভাবছিলেন। দেখলেন। একটা দুটো যন্ত্রাংশ বদল করে টিউনিং শুরু করতেই প্রথমে চ্যাঁ....তারপরে কুই-ই-ই...। ঘড়ঘড়। হঠাৎ সম্পূর্ণ অচেনা গম্ভীর গলায় কেউ বলে উঠল,...লালফৌজ যে জার্মানিতে ঢুকে পড়েছিল, সে খবর আগেই জানিয়েছি আপনাদের, এখন জানাই, বার্লিন আত্মসমর্পণ করেছে, মিত্রবাহিনী ইউরোপে জয়লাভের ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রী চার্চিল দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন শিগগিরই...

চায়ের কাপ হাত থেকে পড়ে গেল। ভাঙা কাঁচ আর চা ছড়িয়ে পড়ল অযত্নে মাটিতে পড়ে থাকা পুরোনো ম্যানুয়ালের উপর। যে-কথা রেডিওতে শোনা গেল, তা কোনও আধুনিক ডকুমেন্টারি নয়, কোনো পুরোনো রেকর্ডিং থেকেও শোনান হচ্ছে না, এ তো সাড়ে এগারোটার খবর—কানে গরম লাইভ ব্রডকাস্ট! যেন ঘোষক জানে না যে, যুদ্ধ বহু আগেই শেষ। কী কাণ্ড! নিরঞ্জন কান পেতে শোনেন। নবটা ঘুরিয়ে দেন। সিগন্যাল একটু দুলে ওঠে, তারপর আবার পরিষ্কার হয়।

১৯৪০ দশকের আর একটি রেডিও আছে নিরঞ্জনের আশ্রমে। ফিলিপস হল্যাণ্ড। সেইটার ঢাকনা খুলে একটু টিউনিং করতেই--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মরদেহ নিয়ে এগিয়ে চলেছে উদ্বেল জনতা...আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তা পৌঁছে যাবে নিমতলা ঘাট...। কাঁটা অন্যদিকে ঘোরাতেই--মহাত্মা গান্ধী অনশন ভেঙেছেন, ব্রিটিশ সরকারকে উদ্দেশ্য করে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন…

নিরঞ্জনের বুক ধক করে ওঠে। এইটা স্বাভাবিক না। শরীর ঠিক আছে তো? ওয়ার্কশপে তালা মেরে গিরিশ পার্কের দিক থেকে একটু হেঁটে এলেন। বৃষ্টির পরে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে; ফুসফুস ভরে হাওয়া টেনে নিলেন। মাথাটা ঝরঝরে লাগল। মোড়ের মাথায় শর্মাজির চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ভাইয়া এক ভাঁড় চা...কত দাম?
—পন্দরা টাকা...
—ঠিক আছে, মাটির ভাঁড়ে দেবে কিন্তু...
—হাঁ জি। তব থোড়া জ্যাদা, বিশ রুপেয়া...
—ঠিক আছে, দেব...
চা তৈরি করতে করতে লোকটি নিজের মনে মাথা নাড়ল, ঠিক হ্যায়...

দোকানে ফেরবার পথে দুটো মোটর বাইক হর্ন দিতে দিতে চলে গেল। বাইকের পিছনে ঘনক আকারের ব্যাগ। ওরা ফুড ডেলিভারির ছেলে, নিশ্চয়ই পৌঁছনোর তাড়া আছে। রাস্তায় একটিও রিক্সা নেই, গাড়িতে গাড়িতে ছয়লাপ! তাদের মধ্যে অনেকগুলোই এখনকার ভাষায় অ্যাপ ক্যাব...।

আশপাশের সবই তো ঠিক আছে, চায়ের দাম থেকে দোকানির কথাবার্তা, মাটির ভাঁড় সরে গিয়ে কেমিক্যাল লাগান কাগজের কাপ, রিক্সা বিরল হয়ে গিয়ে মোটরবাইক, হলুদ ট্যাক্সি কমে গিয়ে সাদা অ্যাপ ক্যাব, সবই তো এখনকার চিহ্ন, তাহলে রেডিও এমন করছে কেন?

ওয়ার্কশপে ঢুকতে-ঢুকতে নিরঞ্জন ভাবলেন, হয়তো ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে পেনড্রাইভে রেকর্ড করে রাখা কোনও কিছু ভুল করে ঢুকে গেছে। তন্নতন্ন করে পরীক্ষা করলেন রেডিও’র সমস্ত যন্ত্রপাতি। কিন্তু নাহ, তেমন কিছু তো নজরে পড়ল না। ঘোর এখনও কাটেনি, তাই চালু করলেন পরেরটা—১৯৫৪ সালের বুশ-এর টেবিলটপ সেট। খবর শুরু হয়ে গেল, প্রয়াগের কুম্ভমেলায় পদপিষ্ট হয়ে পুণ্যার্থীর মৃত্যু...

টেলিফানকেন রেডিও সেটটার যা গড়ন, নিশ্চয় পঞ্চাশের মাঝামাঝি তৈরি, সেইটি চালু করতেই এক কাণ্ড—যুক্তরাষ্ট্রের মন্টগোমারিতে, রোজা পার্কস নামে এক ভদ্রমহিলা বাসে এক সাদা চামড়ার ভদ্রলোককে সিট ছাড়তে অস্বীকার করেছেন, যার জেরে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে...

অবিশ্বাস্য লাগছিল! প্রতিটা রেডিও চালু করলেই তার নিজের জন্মের দশকের খবরই প্রচার করে চলেছে! ১৯৬২ সালের বুশ রেডিও দিচ্ছে ভারত চিন সীমান্ত যুদ্ধের খবর। ১৯৬৯ সালের মার্ফি-র খবর, চাঁদে পা রেখেছেন নীল আর্মস্ট্রং

১৯৭৫ সালের জেনিথ জানাল, রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ জারি করেছেন জরুরি অবস্থা। ১৯৮৪-র ন্যাশনাল প্যানাসোনিক দিল, ইন্দিরা গান্ধীর নিহত হওয়ার খবর। ১৯৯২-র সোনি চালু হতেই ভেসে এলো বাবরি মসজিদের ধ্বংসের বিবরণ।

প্রতিটি খবর সঠিক, রেডিও’র জন্মসালের হিসাবে প্রাসঙ্গিক, আর ভয়ানকভাবে জীবন্ত! ওয়ার্কশপটা যেন টাইম ট্র্যাভেলারের ঠাসা ঘর, সবাই একসঙ্গে বলে চলেছে অতীতের কথা!

গোপালকে ছুটি দিয়ে, পরের তিনদিন নিরঞ্জন দোকান বন্ধ রাখলেন। বন্ধ দোকানের ভেতরে বসে দিনরাত শুধু রেডিও শোনা। খাতা-কলমে নোট নিলেন, তারিখ মেলালেন, বারবার টিউন করলেন। প্রতিদিন সেই একই ঘটনা—প্রতিটা রেডিও তার জন্মসালের আশপাশের সময়কার খবরই দিচ্ছে!

ঘুমানো বন্ধ। খাওয়া বন্ধ। মনে হচ্ছিল, রেডিওগুলো যেন তাকেই বেছে নিয়েছে—তাকে এমন কোনও অদ্ভুত জটিল দায়িত্ব দিতে চাইছে, যা নিরঞ্জন বুঝে উঠতে পারছেন না! নিজের বানান একটি তত্ত্বের পরীক্ষাও করলেন নিরঞ্জন—এক বন্ধুর কাছ থেকে বিদেশ থেকে আমদানি করা একেবারে হালফিলের নতুন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স লাগান রেডিও নিয়ে এলেন। ওইটা চালিয়ে পাওয়া গেল শুধু আবহাওয়ার খবর, বাতাসের দূষণের মাপ, ক্রিকেট খেলার ফলাফল আর শেয়ার বাজারের ওঠাপড়া। ব্যস! ওইটুকুই। এতে কোনও ম্যাজিক নেই, টাইম ট্র্যাভেল তো নয়ই! নিরঞ্জন কর্মকার বুঝলেন, এই যাদু শুধু তার দোকানের তাকে রাখা পুরোনো রেডিওগুলোই দেখাতে পারে। আর কেউ নয়।

হওয়ার কথা নয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গুজব ছড়িয়ে পড়ল। এর জন্য দায়ী আর কেউ নয়, গোপাল। ছেলেটার কৌতূহল সাঙ্ঘাতিক। কেন তিনদিন বন্ধ তা যাচাই করে দেখতে একদিন সোদপুর থেকে সোজা চলে এল ওয়ার্কশপে। আলগা করে লাগান কাঠের পাল্লার ফাঁক দিয়ে দেখে ফেলল—নিরঞ্জন ঘরে বসে, চারপাশে আলোকিত বিভিন্ন রেডিও সেট, নানান রকমের কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে! কান পেতে শুনতেই বোঝা গেল, রাজীব গান্ধীর নিহত হওয়ার খবর জানাচ্ছে রেডিও! কী কাণ্ড সেই ১৯৯১ সালের খবর এখন! গোপাল মনে মনে বলল। এ কীরকম ভুতুড়ে ব্যাপার? কর্মকারবাবু তন্ত্রসাধনা করছেন নাকি?

এইসব অলৌকিক খবর রটনা হতে সময় লাগে না। অচিরেই ছড়িয়ে গেল: নিরঞ্জনের রেডিও অতীতের কথা বলে! নিরঞ্জনবাবু মন্ত্রবলে রেডিওতে পুরনো দিন নামিয়ে আনেন।

দলে দলে লোক আসছে। একজন এল, দাদুর পুরোনো ট্রানজিস্টার নিয়ে—যদি কোনওভাবে দাদুর গলা শোনা যায়, সেই আশায়। সবাই এমন সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে আসে না, কেউ আসে নিছক কৌতূহলে, কেউ সন্দেহ নিয়ে, লোকটা মিথ্যে বলে নাম কিনতে চাইছে না তো? কেউ আবার ইতিহাসবিদ, যদি পুরনো কথা জানা যায় সহজে, তাহলে আর লাইব্রেরীতে পড়ে থাকতে হয় না। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যও একইরকম, অবশ্য তারই মধ্যে ওরা খবরের ঝোঁকটিকে বোঝবার চেষ্টা করে। শোনা যাচ্ছে, স্থানীয় সাংসদও নাকি আসবেন!

কিন্তু, মজার ব্যাপার হল রেডিওগুলো সবসময় সবার সামনে কাজ করে না, কখনও চলতে চলতে হঠাৎ নীরব হয়ে যায়! রাজনীতির লোক এলে রেডিও আদৌ মুখ খুলবে কী না, ঘোর সন্দেহ নিরঞ্জনের। ওরা যা খেয়ালখুশির ঘোরে থাকে! কখনও এমনসব তথ্য বলে, যা নিরঞ্জন আগে কখনও শোনেননি—এই যেমন বারাসাত-বসিরহাটের কৃষক বিদ্রোহ, নৌবিদ্রোহে রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা, ভুলে যাওয়া ক্রিকেট ম্যাচ, স্বাক্ষর না হওয়া শান্তি চুক্তি...

মাস তিনেক পরে, নিরঞ্জন দেখলেন, দোকানের সামনে রাখা একটা বাতিল রেডিও’র খোলের ওপর কেউ একজন মোমবাতি আর ধূপ জ্বালিয়ে রেখেছে! এক মাসের মধ্যে, দেখলেন, ধূপ আর মোমবাতির সংখ্যা কিঞ্চিৎ বেড়েছে! কেউ রেডিওর কাছে বসে ফিসফিস করে কোনও প্রার্থনা জানাচ্ছে! একদিন দেখলেন, নির্জন দুপুরে এক বৃদ্ধা চুপিচুপি কাঁদছেন!

এক সন্ধ্যায়, সবাই চলে যাওয়ার পর, সব রেডিও চুপ করে গেলে, নিরঞ্জন চুপচাপ বসে রইলেন; নিঃশব্দে হাতটা রাখলেন মারফি রেডিওর গরম গায়ে। তোমরা আমাকে কী বলতে চাইছ? তিনি ফিসফিস করে বললেন।

রেডিওটা কড়কড় করে উঠল। আগে কখনও হয়নি এমন! পঞ্চাশ সেকেণ্ডের মধ্যে কড়কড় থেমেও গেল। আর তারপরেই শান্ত ধীর স্বর ভেসে এল, তুমি যেসব কণ্ঠ শুনছো, ওগুলো এক সময় হারিয়ে গিয়েছিল, আমরা সব, স-ব মনে রাখি।

ভেতরে ভেতরে নিরঞ্জন উত্তেজিত। উত্তেজিত হলেই তার চোখ পিটপিট করে। তবু তার মধ্যেই জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কে? কিন্তু রেডিওটা আবার নিঃশব্দ।

এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা আর কাউকে বললেন না নিরঞ্জন। কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। সাংবাদিকদের আনাগোনা বেড়ে গেল, সবাই ওপর ওপর খবর নিয়ে, নিরঞ্জনের দুয়েকটি কথা শুনে, খবর করে দেয়! কমিউনিকেশনস পণ্ডিতেরা বলল, মাস অডিটরি ডিল্যুশন, আবার কেউ বলল আরও শক্ত কথা-- কোয়ান্টাম ব্রডকাস্ট অ্যানোমালি!

এত সব পণ্ডিতি কথায় নিরঞ্জনের কিছুই যায় আসে না। ওর কাছে ব্যাপারটা খুব সহজ: এই যন্ত্রগুলো শুধু খবর নয়, ওরা মেমরি সম্প্রচার করছে—সমষ্টিগত, সচেতন স্মৃতি! আর কেমন করে যেন, পুরোনো রেডিওগুলো এমন এক জায়গায় ঢুকে পড়েছে, যেখানে সময় নিজেই ঘুরে যায়, আর সম্প্রচারের শব্দতরঙ্গে ভেসে ওঠে হাজারো হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠ!

সময় গড়ায়। ভিড় পাতলা হয়। শহরের নতুন আকর্ষণ এখন এ-আই—কৃত্রিম মেধা! এ-আই গ্যাজেট আর নিউরাল ইমপ্লান্টের ঝড়ে চাপা পড়ে গেল নিরঞ্জনের দোকানের ম্যাজিক!

নিরঞ্জন, নিরঞ্জনের মতোই রইলেন, সকাল এগারোটায় দোকান খোলা, রেডিও’র অবস্থা বুঝে তাকে সারান এবং টাকা নিয়ে সারান রেডিও ফেরৎ দেওয়া। সেই একই নিত্যকর্ম, একদিন, প্রতিদিন।

মাঝেমধ্যে, কোনও একজন দরজায় টোকা দেয়, জং ধরা রেডিও বাক্স হাতে নিয়ে, প্রশ্ন করে, নিরঞ্জনবাবু, এটাকে ঠিক করতে পারবেন?

রেডিওটা এক ঝলক দেখে, ভদ্রলোকের চোখের তারায় স্থির দৃষ্টি রেখে মৃদু হাসেন নিরঞ্জন, চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু মনের ভেতরে নিরঞ্জন এই সত্য জানেন—সব রেডিও সারানোর জন্য আসে না, কিছু রেডিও আসে, শুধু পুরনো কথা মনে করাবার জন্য। ·


লেখক পরিচিতি : অশোক কুমার মুখোপাধ্যায়ের জন্ম কলকাতায়, ১০ই এপ্রিল ১৯৫৫। তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে : ‘অগ্নিপুরুষ’, ‘আটটা-ন’টার সূর্য’, ‘সূর্য সেন’, ‘প্রথম দিনের রবি’, ‘টেগার্টের আন্দামান ডায়েরি’ প্রভৃতি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ