বিপ্লব বিশ্বাসের গল্প : সোঁদরবনে বাঘ-বাঘিনী


কাল সাতটা বিয়াল্লিশের ক্যানিং লোকাল। ১৯ নম্বরে ঠেকতে না ঠেকতেই ষাটোর্ধ্ব বাঘ-বাঘিনীর দঙ্গল হুড়মুড়িয়ে পাঙ্গা নিল অন্যদের সঙ্গে। তখন কোথায় গেল অস্টিয়ো আর্থরাইটিস আর কোথায়ই-বা ফ্রোজেন শোল্ডার। গুঁতোগুঁতিতে আপাতত সে সবের সান নেই। কেউ পুরো বসতে পেল, কেউ, আধা বা পৌনে। দশ জোড়া মোট। বেশিরভাগ বাঘই খাড়িয়ে থাকল। কেউ কেউ আবার সোয়া-দেড় ঘণ্টার মামলা বলে জায়গা ছেড়ে উদার হলো। সামনে একাত্তরের বাঘকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও একষট্টির এক রংচঙা বাঘ ঘাড় কাতিয়ে রইল, আপন বাঘিনীর গা ঘেঁষে। মজে রইল বাইরের দৃশ্যে। শূন্য দৃষ্টিতে। ঢাকুরিয়া রেললাইন বস্তির ছোঁড়া-ছুঁড়িদের লাইন ধরে হাগতে বসার ছবি চোখের আরাম না দিলেও, একাত্তর পানে চোখ ফেলতে ভয় পাচ্ছে। অসৌজন্যের ভয়। মানুষ কত সহজেই যে আলগা হয়ে যায়! ওদিকে অন্য দুই বয়স-মারা, উচ্ছল বাঘিনীর মাঝে পড়ে এক বাহাত্তুরে বাঘ যেন চিড়ে-চ্যাপটা। তবুও সংসারের যাঁতাকল থেকে দুদিনের রেহাই মিলেছে বলে সে-ও খানিকটা আলগা করে নিজেকে, নজরুলের 'খোঁপার বাঁধন'-এর ঢঙে। তবুও খেয়াল রাখতে হয়, বেখাপ্পা কিছু ফসকে না যায়, চামড়ার মুখ ফুঁড়ে। বাঁদিকের উলটোদিক থেকে তার বাঘিনী মধ্যেমাঝেই চোখ ফেলছে তার চোখে। যদিও সে-ও মজে আছে অন্য বাঘ-বাঘিনীর সঙ্গে। তবুও খবরদারির জাতাভ্যাস যাবে কোথায়? এরমাঝেও বাহাত্তুরে বাঘ ফটাস-জল খুঁজতে থাকে। ছাত্রাবস্থায় বাঘাযতীনে থাকা কালে এ পথের নিত্য আনাগোনায় খুবই পরিচিত ছিল এই ফটাস জল। দেখতে পায় না। প্রযুক্তির অগ্রগতি হয়তো তাদেরও গিলে খেয়েছে পুরনো সিঙ্গল স্ক্রিন হলের মতো। সামান্য বেখেয়ালি হতেই ডান পাশের বাঘিনী তার হাতে ধরিয়ে দেয় কটকটে ছোলা ভাজার 'আবার খাব'র প্যাকেট। নড়া দাঁতের কথা ভুলে যেই না দাপট দেখাতে গেছে অমনি…'উউহু, বাপরে বাপ।’

সকালের ট্রেন হলেও গুমোট আছে। সঙ্গে আছে বাঘিনীদের গুমোর। বয়স ছুপানোর গুমোর। যৈবনদিনে ফিরতে চাওয়ার গুমোর। এরমধ্যেই এক তেষট্টির বাঘিনী মধ্যেমাঝেই মাথার এক খামচা চুলে হাত বোলায়। করে আপশোশ। তাড়াহুড়োয় ঠিকভাবে গার্নিয়ার ডলতে পারেনি। আবার হুটোপুটিতে ওঠার পর বাঁ কাঁধেও হাত ডলতে থাকে। সেখানে চাঁড় লেগেছে। ফ্রোজেন শোল্ডারের ব্যথাটা চাগিয়ে উঠেছে। দিনকয় ফিজিয়ো করলেও ঘরে বিরামের অবকাশ কম থাকায় কাজ হয়নি তেমন। তবুও 'যাকগে' বলে বেতোয়াক্কা হয়। এ দুদিন আর ওসব ভাবনা ডলতে মন চাইছে না। আপাত উচ্ছলদের হাহা, হোহো, হিহির মাঝে হারিয়ে যেতে চায়।

শেয়ালদা থেকেই ট্রেন গাদাগাদি। অনেকেই শনি-রোববারের ছুটি পেয়েছে। নানান বয়সের বাঘ-বাঘিনীর দল ছুটছে জল-জঙ্গল পানে। খাঁচা ছাড়া হয়ে। কাছা ছাড়া হয়ে। সঙ্গে এরাও আছে—বেতো বাঘ-বাঘিনীর দল। শেকল ছেঁড়া আঁতের টানে। জমিয়ে আঁট দিয়ে।

মিনিট পনেরো লেট করে সোয়া নটা নাগাদ ক্যানিং স্টেশনে ট্রেন সাফ করে উগরে দিয়ে বগিগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বাঁচল কি? না। তাকে কিছুক্ষণ পরই ফের উলটোপানে চলতে হবে। আর এই বাঘ-বাঘিনীর দলটাকেও প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে খুঁজে নিতে হবে তাদের 'পথ ভোলা' অপারেটরকে।

'ওইতো গোটা ছয়েক অটো নিয়ে দাঁড়িয়ে ভোলানাথ। মাথায় ব্যানার টাঙিয়ে।'

এক বাঘের চিৎকারে অন্যেরা তাকিয়ে দেখলেও মুষড়ে পড়ে। বেশ কিছুটা দূরেই। আরও কিছু অটোর ভিড়ে। সবচে মুষড়ে পড়ে বাঘেদের দল। বেশিরভাগ ট্রলি,ব্যাগ-ট্যাগ তো তাদেরই বইতে হবে। নইলে মুখ ঝামটা। শুধুই খাট্টা।

জিভ বেরোনোর জোগাড় হলেও যুত করে বসার পর কুত্তার ঢঙে শ্রান্তি মারতে থাকে সব। চালু অটোর হাওয়ায় খানিক স্বস্তিও মেলে। আবার ড্রাইভার ছোকরার ঘেমো হাত ঘেঁষে বসতে হয়েছে বলে এক একষট্টির বাঘিনী উসখুশ করে অস্বস্তি বের করতে থাকে।

অটো ছোটে সোনাখালি পানে।

সোনাখালি নেমেই পথভোলার লঞ্চ 'দক্ষিণ রায়'। আসলে লঞ্চ নয়, বোট। বড়ো নৌকোকে দোতলার চেহারা দেওয়া। নিচটা গুমঘরের মতো। হাগা-মোতার আড়াল সবই আছে। মল জলে ফেলা নিষেধ। হয়তো বায়ো-টয়লেটের ঢঙে ব্যবস্থা করা। বাইরেটা বেশ নীল-শাদা বুলিয়ে ছাড়পত্র নিতে হয়েছে। তবে ছাড়-করে ছাড়ান নেই। সেটা সময়মতো ঠেকাতেই হবে। নইলে বাওয়ালের শেষ থাকবে না। এ সবই ভোলানাথ বলছিল। বাসন্তী হাইওয়েতে। চলার ফাঁকে। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি। বাইরের চেহারায় চাকচিক্য বাড়ালে কী হবে। অন্দরের তাকত তো নড়বড়ে। তাই 'দক্ষিণ রায়'এ উঠতে গিয়েই প্রায় ধপাস হচ্ছিল জনাদুই বাঘ-বাঘিনী। বোটের দুই ছোকরা চেপে না ধরলে বিসমিল্লায় কেলো হয়ে যেত।

মিনিটদশ পর ভোলানাথ ঘোষণা দিল, ' আপনারা হাত-টাত ধুয়ে নিন। ব্রেকফাস্ট দেওয়া হবে।'

বাঘ-বাঘিনীর দঙ্গল পড়িমরি বেসিনের সামনে। খিদের পেট চোঁ-চাঁ। কাগজের প্লেটে পুরি,সবজি আর একটি করে ভাজা মিষ্টি। গরমাগরম। পরে কাগজের কাপে কফি।

'তোমার কাছে এফ এম ৪০ হবে?'

এক তেষট্টির বাঘিনী চেয়ে বসে। কথা ফোটার আগেই জোর হে…উ ফুটে বেরোয়। ভাজা মিষ্টির পর কফি মেরে শুরু হয়ে গেছে।

ষাট ছুঁইছুঁই বাঘিনী ঘাড়ের ব্যাগ থেকে অন্য এক অ্যান্টাসিড বের করতেই 'অগত্যা' বলে তেষট্টি জল দিয়ে মেরে দেয়। আসলে ওই নির্দিষ্ট নামের ওষুধটি ছাড়া তার অম্বল মরে না। ওর জেনেরিকে আস্থা নেই। আছে ব্র‍্যান্ডে। তা মুখে মাখা, গায়ে ডলা থেকে শুরু করে ঘাড়ের ব্যাগটি পর্যন্ত।

যাই হোক, দোনামনো করে আরও দু-চারজন হাত বাড়ায়। লজ্জার মাথা খেয়ে। শুরুতেই অম্বল মারতে না পারলে ঘোরাঘুরি বরবাদ হতে পারে।

এরমধ্যেই বোট অনেকটা এগিয়ে। ভরন্ত মাতলা। চারদিকে এলোমেলো হাওয়া। পঁয়ষট্টির সন্ধানী বাঘ গলায় বাইনোকুলার ঝুলিয়ে আসল দক্ষিণ রায়ের খোঁজে তল্লাশি জুড়ে দিয়েছে। টাক ঢাকতে টুপি চাপিয়েছে। ওদিকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে নদীর বুকে চোখ রেখে এক বেতো গুনগুনাচ্ছে : 'মাতাল হাওয়া, কী আমারও মতো তুমিও হারিয়ে গেলে…'। দীর্ঘ অচর্চায় সুবীর সেনের 'পাগল হাওয়া' 'মাতাল' হয়ে গিয়েছে আর ‘কী' কি জায়গা পালটালো? কুছ পরোয়া নেহি। অ্যাদ্দিন পর যে গলা খুলেছে সেটিই তো অনেক। বোট কোথায় ভিড়বে, জানা যায়নি। যেখানে ভিড়ে ভিড়ুক। এ সব হিসেবে আজ কারোরই মন নেই। উড়ুউড়ু মন নিয়ে এক বাঘিনীও গুনগুন করছে, 'পুব হাওয়াতে দেয় দোলা…'। রবিঠাকুরের গানে তার ডিপ্লোমা করা ছিল। রোজকার অসার সংসারের টানাটানিতে তা ছিঁড়েফেঁড়ে গেছে। গলারও বারোটা। সেখানে কাঁসা বাজলেও সে আজ অনিরুদ্ধ। খোলামেলা পরিবেশ তাকে খোলতাই করেছে। এক জায়গায় আবার তিন বাঘিনী জড়ো হয়ে বাড়ির গপ্পো জুড়েছে। সেই যে বলে না, মেয়েরা যেখানেই যাক, সঙ্গে রান্নাঘর যাবেই। তেমনই আরকি।

ঘন্টাদুই এভাবে চলার পর বোট যেখানে ভেড়ে সেখান থেকে রাস্তা অবধি খেবড়ো। সকলকে খুব সাবধানে নামতে বলল ভোলানাথ। এবারে সবাই বেশ সতর্ক। এতক্ষণ ভুলে থাকা বয়সও সাবধান করল তাদের।

কিছুদূর অটোতে নিয়ে গিয়ে ভোলানাথ সকলকে যে লজে এনে ফেলল তা ঠিক যুতের নয়। তবুও খানিক গাঁইগুঁই করে চানটান সেরে নিল সব। বোটেই রান্না হয়েছিল। সে সব ভোলানাথের নন্দীভৃঙ্গীরা বয়ে এনে পাত পেড়ে বসিয়ে দিল সবাইকে। ডন মারা পেটে বিপ্লব অচল। তাই সোনামুখ করে সব চেটেপুটে খায়। বেলা গড়ানের পথে। চিংড়ি, ভোলা-ভরা পেটে টানটান হওয়ার উপায় নেই। তাই যেতে হবে গরানের পথে। কাদাময় পাড় ধরে বাইন, সুন্দরীরাও থাকবে। রংমাখা সুন্দরীদের আবাহন জানাতে।

বাইনোকুলারবালা গভীর চিন্তায় মগ্ন। পাবে কি তার দর্শন! সেই অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, ডোরাকাটা, রাজকীয় প্যান্থেরা টাইগ্রিকের! বাদাভূমির মানুষের কাছে যে ভয়ের প্রতীক? সে শুধু চিন্তিত নয়, অস্থিরও বটে। ইদানীং ফেসবুকে আসল দক্ষিণ রায়েদের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোটের গা ঘেঁষে আসার যে রোমহষর্ক ভিডিয়ো দেখে তা তাকে আসতে বাধ্য করেছে। দেখা যাক।

আসলে এই পঁয়ষট্টির সন্ধানী এক রিটায়ার্ড প্রাণীবিদ। মাস্টারির অভ্যেস থেকে জনাদুইকে জুটিয়ে নিয়ে জুড়ে দিল। উৎস থেকে : ' বে অফ বেঙ্গলের উপকূলে এই বদ্বীপ পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, এই তিন নদীর অববাহিকা।' এটা শুনেই আর এক বেতো কপালে জোড়া হাত ঠেকায়। সে হয়তো ত্রিবেণী সংগমের স্বাদ পেয়েছে। এলাহাবাদ থুড়ি প্রয়াগরাজ যাওয়া হবে কি হবে না, কপালে ঘোল তো জুটল। ওরা শুনতে থাকে, ' মজার কথা হচ্ছে আমরা যে সুন্দরবন নিয়ে মাতোয়ারা থাকি তা মোট এলাকার মাত্র ৩৬ শতাংশ।'
'মানে?'
'সিম্পল। বাকি ৬৪ শতাংশ অর্থাৎ দুই তৃতীয়াংশ এলাকাই বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট জেলার সঙ্গে যুক্ত।'
'বাব্বা, তাতেই এ-ই!' বলেই এক ধোঁয়াধারী বাঘ সিল্ক কাট ধরায়। মাথা খোলসা করতে। তার মধ্যেই, না এবারে কফি নয়। ছোট্ট কাগজ কাপে লাল চা। ওদিকে বাঁধানো, ফোকলা দাঁতের বাহার নিয়ে বাঘিনীদের সেলফি, গ্রুপফি দেদার চলছে। সবাই জানে সে সব গ্যালারিতে জমে ফোন স্লো হয়ে যাবে। তবুও ঝটাঝট ফেসবুক নিউজ ফিডে সাঁটিয়ে তবে শান্তি।

বিকেলের মরা আলোয় বোট গোসাবায় ভেড়ে। সেখানে স্কটল্যান্ড থেকে আগত স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের নানাবিধ কীর্তিকলাপের পরিচয় মেলে। তাঁর হাত ধরে যে এক টাকার নোট চালু হয়েছিল, তাও অবাক হয়ে সবাই জেনে নেয়। আবার রবীন্দ্রনাথকেও যে তিনি এই বাদাবনে টেনে এনেছিলেন, সেটিও জানা যায়।

কথাসব চলছে ঠিকই। কিন্তু তারই ফাঁকে ফাঁকে বোটের গায়ে হেলান দিয়ে বাইনোকুলার ইতিউতি উঁকি মারছে। সন্ধ্যার সূর্য পশ্চিমাকাশে রঙের খেলায় মাতলেও সেই রঙিলাকে চোখে পড়ছে না। বদলে একটি হরিণ ছটফটে পা ফেলে দেখা দিয়েই ফুড়ুৎ করে মিলিয়ে গেল। মায়ামৃগ যেন। দক্ষিণ রায় হয়তো ওকে পাঠিয়েই রসিকতা করল।

আঁধার ঘনায়। আকাশে গোলাকার চাঁদ। ছলাৎজলে নড়েচড়ে চিকচিক করছে। মুক্তোদানা ছড়িয়ে। শহুরে বেতোরা পঞ্জিকার হদিস না রাখলেও এখানে এই খোলামেলায় পূর্ণিমার চাঁদ পেয়ে যায়। অমলদর্শনকে কেউ কেউ ধরে রাখতে উদ্যত হয় মোবাইল ক্যামেরায়। প্রাণভরে দেখা কম। ধরে রাখা বেশি। যদিও খাঁচায় ফিরে গ্যালারি খোঁজার সময় হবে না। তবে ফেসবুক, হোয়াতে শেয়ার করে দিতেই হবে। নইলে গুমোর গুমরে মরবে।

এই উল্লাসে সেই রবিগানের প্রেমী গলা খুলে চেষ্টা করে,' আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে…'। আবার তা শুনে এক খলসে গেয়ে ওঠে 'জোছনা করেছে আড়ি…'।
বাইনোকুলার বলে ওঠে, ' জোছনা নয়, আড়ি দিয়েছে দক্ষিণ রায়।'
রাতের ক্লান্তি দেহে জড়িয়ে সবাই নামে। নতুন এক লজের পথে। নতুন দিনের আশায়।

আজ ঝড়খালি। এখানে দক্ষিণ রায়ের দেখা মিলবেই। ভোলানাথ জোর আশ্বাস দিয়েছে। তবে পুরোটা ভাঙেনি। যাই হোক, বাঘ-বাঘিনীর দল চনমনে হয়ে আছে। সকাল নটার মধ্যেই চান-টান, সাজুগুজু সেরে বোটে উঠে যায়। ব্রেকফাস্ট সেখানেই। বাইনোকুলারবালা যন্ত্রের লেন্স-টেন্স ঝকঝকে করে নিয়ে উঠেছে। কোনও গতিবিধি যেন ফই না যায়। এক বাঘিনী তো বাঘছাল শাড়ি পরে মাত করে দিয়েছে। যে কোনওকালে শাড়ি ছাড়া পরেনি সে-ও আজ চুড়িদার পরে রেডি। সামান্য অস্বস্তি হলেও কোই বাত নেহি। দেখে মনে হচ্ছে, দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে দরকারে পাঙ্গা নিতেও নেমে পড়বে।

প্রাণীবিদের মাথায় এখন শুধুই দক্ষিণ রায়। কফির কাপে চুমুক মেরেই সে ফের শুরু করে : 'দক্ষিণ রায় হল সমন্বয়ের জ্যান্ত প্রতীক।'
'কীরকম?'
'ভারতের শিবসেনা আর পাকিস্তানের মুসলিম লিগ, দুই দলেরই প্রতীক এই দক্ষিণ রায়। কিন্তু তারাও আজ বিপন্ন, সুচতুর পোচারদের নেকনজরে পড়ে। মরা রয়্যাল বেঙ্গলের দাম কোটি টাকা।'
'কোটি! মরা হাতি লাখ টাকাকেও তো ছাড়িয়ে গেল!', একজন অবাকপানা হয়।
'হ্যাঁ তাই। আবার মজার ব্যাপার হল,এখানকার দক্ষিণ রায়েরা যেমন বিপন্ন, তেমনি বাঘ-বিধবাদের অবস্থাও শোচনীয়।'
'বাঘ-বিধবা!'
'অবাক হলে তো? আসলে জঙ্গলে মধু সংগ্রহ, নদীতে মাছধরা, এসব করতে গিয়ে যে সকল পুরুষেরা দক্ষিণ রায়েদের কবলে পড়ে প্রাণ হারায়, তাদের বউদেরই বাঘ-বিধবা বলে। তাদের দিন যে শুধু নিরন্ন কাটে তাই নয়, বনের বাঘ যেমন তাদের ঘরের মানুষকে খায়, তাদের খায় লোলুপ দুপেয়ে বাঘের দল। আবহমান চলতে থাকে শিকার— শিকারির লড়াই।'

শ্রোতারা খানিক থমকে যায়। বোট বিদ্যাধরী বেয়ে ঝড়খালিতে তখন। দুদিকেই নদীর পাড় ঘেঁষে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের গা বেড়ে জাল দিয়ে আটকানো। যাতে করে দক্ষিণ রায়েদের দল ঝাঁপিয়ে বোট-লঞ্চে না পড়ে। এই বাঁধন সকলকে বেশ উত্তেজিত করে। প্রাণীবিদের বাইনোকুলার চোখে আটকে যায়। কিন্তু না, ঘন্টাখানেক চলার পরও দক্ষিণ রায়ের পাগমার্ক বা সামান্য গু-ও দেখা গেল না।

কিন্তু দেখা গেল। ওই যে ভোলানাথ বলেছিল বা সবটা বলেনি। বোটনির্গত হয়ে সে সবাইকে এনে ফেলল ঝড়খালি বাঘোদ্ধার কেন্দ্রে। সেখানেই মিলবে জ্যান্ত দক্ষিণ রায়ের দেখা। তবে টাটকা নয়। ছেঁড়া-খোঁড়া সব। উজ্জীবিত নয়, স্তিমিত। জনাকয় তিরিশ টাকা করে গচ্চা দিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে ঢুকে পড়লেও নীতিগতভাবে প্রাণীবিদ ঢুকল না। তার বাঘিনী কিন্তু ঢুকে পড়ল। ভিন্ন বাঘেদের সঙ্গে। সেন্টারের বাঘেদের মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

মনমরা প্রাণীবিদ রাতের মেনুতে বড়ো সাইজের কাঁকড়া পেয়ে কিছুটা ভোকাল হল। বলল,' এখানে যে বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায় তারা কিন্তু বাঙালি কাঁকড়াদের মতো নয়।'
'কীরকম?'
'এরা সঙ্গীদের প্রতি খুবই বিশ্বস্ত, এই কাঁকড়া দম্পতিরা।'

এ কথা শুনে বাঘিনীরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। আবার চৌষট্টির বাঘ কীভাবে বন্ধুর প্রোমোশন আটকে দিয়ে নিজের জায়গা করেছিল তাও মনে করে সে খানিকটা কুঞ্চিত হল। আসলে তা মনোরম উদার পরিবেশের প্রভাব। শহুরে ঘিঞ্জিতে মন এত খোলামেলা হয় না। পরদিন ফেরা। যে যার কুলায়। তাই রাতের আসরে জনাকয় বসে যায়। ব্যবস্থা ভোলানাথ করেছিল। শুধু লাল,শাদা ওয়াইনের জোগান দিয়েছিল ষাটের ছোকরা। বাহাত্তুরে বলে রেখেছিল। তার বহুদিনের শখ ছিল, মদ নয়, ওয়াইন চেখে দেখবে। সেই মতো আসর শুরু। চাট, চানাচুর কাজু। কেউ সেফ ব্যাকার্ডি, কেউবা টিচার্স স্কচ, আবার কেউ শুধুই ওয়াইন। কেউ ডাবল শট, কেউ ট্রিপল শট আবার বাহাত্তুরে দুরকমই সিঙ্গল শট। জলে মিশিয়ে খেতে দেখে এক রিটায়ার্ড জেল পুলিশ বাহাত্তুরেকে সমঝে দিল, ওয়াইন জল দিয়ে মারতে নেই। তাহলে মজা আসে না। বাহাত্তুরে তারাপদ রায়ের ঢঙে বলল, ' আমি কোনও রিস্ক নিই না।' এরমধ্যেই অন্য ঘরের আড্ডা ভেঙে বাঘিনীরা তেড়েফুঁড়ে আসে। একযোগে বলে: 'আমরাও খাব। চেখে দেখব।'
'বাধা দিলে বাধবে লড়াই…'বলে গানের ডিপ্লোমা একটা গ্লাস নিয়ে বসে যায়। নিরাপদ জিন না থাকায় ব্যাকার্ডিই মেরে দেয়। অন্য শেয়ালও তাই।

রাত প্রায় বারোটা। এদেরও এক দুজনের বারোটা বেজে গেছে। বিশেষ করে জেলপুলিশের। সে উচ্ছল এক বাঘিনীর ঘাড়ে পড়তে গিয়েও সমঝে যায়। এক বাঘিনীও অন্য বাঘের হাত ধরে ঘরে নিয়ে যেতে গেলে বান্ধবীরা টেনে ছাড়ায়। তবুও ঢিলে বাঁধনের চক্কর তাদের মজা দেয় বেশ।

শেষদিন। সকাল থেকেই আকাশের মুখভার। হাওয়াও উত্তাল। বোটে উঠে 'উতল হাওয়া' গেয়ে ওঠে ডিপ্লোমা। কলপিত চুল হাওয়ায় খেলতে থাকে। পঁয়ষট্টির পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। সে দ্বিবিধ বিমর্ষতায় মুষড়ে যায়। তবুও আজ শেষ সুযোগ। দক্ষিণ রায়ের দর্শন পাওয়ার। বনবিবির দয়া কি হবে না?!

মাতাল হাওয়ার টানে বোট এসে পড়ে পঞ্চমুখীর মিলনস্থলে। বোটে লাগে দোলা। সকলের মনেও। এক দুজন 'দোলা'কে সঙ্গী করে গুনগুনিয়ে ওঠে। কেউ আবার হেঁড়ে গলায় ভূপেন হাজারিকা। ভোলানাথের বয়ানে, বিদ্যাধরী, হেড়োভাঙা,পীরখালি,গাজীখালি আর মাতলা—এই পাঁচ নদী একই প্রবাহে এখানে মিশেছে। ঠিক যেমনটি মিশে গেছে দশ জোড়া বাঘ-বাঘিনী। জোট বেঁধেছে বলে নদীর বিশালতা এখানে সমুদ্রের পারা। আজকের মানুষ কেন যে ছাড়া ছাড়া! পঞ্চমুখী দেখে কারও মনে পড়ে যায় 'পঞ্চনদীর তীরে / বেণী পাকাইয়া শিরে / দেখিতে দেখিতে গুরুর মন্ত্রে / জাগিয়া উঠেছে শিখ…'। আবার একজন 'অলখ নিরঞ্জন' বলে হাঁকড়ে ওঠে। প্রাণীবিদ ভাবে, শিখ জেগে উঠলেও দক্ষিণ রায়ের ঘুম ভাঙল কই!

এরপর বোট ভিড়ল সজনেখালি, সুধন্যখালি ইত্যাদি। পরপর। আশা জাগল মনে। টাওয়ারে উঠে দক্ষিণ রায়ের দেখা মিললেও মিলতে পারে। রিপ্লেসড্‌ হাঁটু, মাজার বেল্ট নিয়ে উঠল সব। ইতিউতি চোখ ঠিকরে চাইলেও দুটো বন-শুয়োরের পাছা আর দুচারটে পাখি ছাড়া কিছু মিলল না। আবার মিললও। সজনেখালি পাখিরালয়ের দিকে ভোলানাথের হঠাৎই উদ্ধত আঙুল হা-চোখেদের মিলিয়ে দিল 'অপা-রিসর্ট'- উড়ে আসা পরিযায়ী পাখিদের গুপ্ত আস্তানা। সদ্য বিতর্কিত এই জায়গাটাও দর্শনীয় হয়ে উঠেছে, সোঁদরবনে ঘুরতে আসা বেবাক মানুষের কাছে। মন্দ কী! নেহাতই কেচ্ছার গুয়ে পা পড়েছিল!

ফিরতি পথে এক রসিক বাঘ বলল, 'কীকরে মিলবে! খালি দিয়ে শুরু হয়েছে, খালিতেই শেষ হল।' শুধু খালি গেল না বাষট্টির গুপ্ত। দুপুরের সোঁদরবনের বুনো মোরগের থালি সাবড়ে সুপ্ত সে গোপন ঝোলা থেকে, বিড়াল নয়, বের করে আনল 'সাহিত্য-থালি'—তার লেখা পাঁচ পদের বাঘরঙা মলাটের বইখানা। ঠিক পাকড়াও করল বাহাত্তুরে কলমচিকে। তক্কে তক্কে থেকে জেনে নিয়েছে তার অক্ষরপ্রেমের কথা।

'আমি অবশ্য সবাইকে দিই না। আপনার মতো ধীমান পাঠককেই দিই।'

এরকম অযাচিত উপহার পাওয়ার অভ্যেস বাহাত্তুরের আছে। অনেকেই দেয়, ভালো ভালো দুকথা লিখে দেবার জন্য। কিন্তু তার চোখ কপালে উঠে গেল যখন গুপ্ত আড়াইশো টাকা চেয়ে বসল। হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। তেতো গিলে নিয়েছে। পার্স বের করতেই হল। পাশে বসা শিকার হওয়া অপর বাঘ মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। যাই হোক, সেই থালির মেনু দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ! কী নেই সেখানে! মানিব্যাগ, ডার্কলেডি, শিবনামা, দাম্পত্য সাহিত্য, করোনা,প্রাইভেট টিউটর, মোক্ষলাভ, বানান বিভ্রাট, রাজনীতিবিদদের চুরি, অন্তর্জাল, পরশুরাম, দৃশ্য দূষণ, মাতৃভূমি লোকালে পুরুষ যাত্রী… অ্যান্ড হোয়াট নট? প্রায় একশো রকমের পদ। এমন থালি কেউ খেয়েছে, থুড়ি দেখেছে বলে তো মনে হয় না…!

ফের সোনাখালিতে বোট বিষণ্ণ বাঘেদের উগরে দিল। পেমেন্ট শুরুতেই নিয়ে নিয়েছে। নামার আগে একচোট মাজা ঘুরিয়ে নাচার ফলে বাঘিনীরা আর একা একা নামতে পারল না। নন্দী-ভৃঙ্গী একে একে বগল ধরে নামিয়ে পাড়ে তুলল। ক্যানিংমুখী অটোতে গুঁতিয়ে চাপিয়ে দিয়েই নিমেষে উবে গেল ভোলানাথের পথভোলা দলটি।

বিকেলের মরা আলোয় সব ঘরমুখো। যত এগোচ্ছে, ততই রঙের চটক চটকে যাচ্ছে। অভিনয়শেষে যাত্রাপালার নায়ক-নায়িকাদের মতো। ফিরতি ট্রেনে বসে প্রাণীবিদ মাস্টার মোবাইল খুলে মাতলাতে দক্ষিণ রায়ের ঝাঁপানোর জ্যান্ত ছবি দেখছে। বুঝতে পারছে, আসলে তা ফোটোশপ। ধোঁকা, শুধুই ধোঁকা। বিগত তিনদিনের নকলনবিশির মতো। ·


লেখক পরিচিতি: বিপ্লব বিশ্বাসের জন্ম ১৭ জানুয়ারি, ১৯৫৪। মৌলিক তথা ভাষান্তরিত গল্প-আঙিনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতাপুষ্ট। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি কেন্দ্রীয় সাহিত্য অকাদেমির নথিভুক্ত অনুবাদক। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ