দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কল মি লাইকা’ নিয়ে মোজাফ্ফর হোসেন


মোজাফ্ফর হোসেন কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। কর্মজীবন শুরু করেন সাংবাদিকতা দিয়ে। বর্তমানে বাংলা একাডেমির অনুবাদ উপবিভাগে কর্মরত। তিমিরযাত্রা উপন্যাসের জন্য কালি ও কলম সাহিত্য পুরস্কার, পাঠে বিশ্লেষণে বিশ্বগল্প বইয়ের জন্য ব্রাক ব্যাংক সমকাল সাহিত্য পুরস্কার, অতীত একটা ভিনদেশ গল্পগ্রন্থের জন্য এক্সিম ব্যাংক-অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্য পুরস্কার এবং স্বাধীন দেশের পরাধীন মানুষেরা গল্পগ্রন্থের জন্য আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। তাঁর গল্প ইংরেজি, হিন্দি, ইতালি, নেপালি ও স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। গল্পপাঠকে দিয়ে এই সাক্ষাৎকার তিনি কথা বলেছেন তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস কল মি লাইকার নানা প্রসঙ্গে।

গল্পপাঠ :
‘কল মি লাইকা’ আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস। এই উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা কবে এবং কীভাবে মাথায় এসেছিল?

মোজাফ্ফর হোসেন :
গল্পটা আমার যাপিত জীবনের অংশ হলেও কখনো লিখব, সেটা ভাবিনি। আমি এমনিতেও খুব পরিকল্পনা করে, ছক বেঁধে লিখতে বসি না। লেখাটা আমার কাছে পাঠকের মতোই, পাঠক বই সামনে নিয়ে পাঠ করেন, আমি লিখতে লিখতে পাঠ করি—আমরা দুজনেই জানি না সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে। কল মি লাইকার ক্ষেত্রে সেটা ঘটেছে। একটার পর একটা এপিসোড লিখেছি, কোনোটাই পূর্বপরিকল্পিত না। তবে উপন্যাসটি লেখার বীজ সুপ্ত অবস্থায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে। তখন একটা নিউজে পড়ি, আমেরিকায় একজন নারীকে পাওয়া গেছে যার শরীরের মাঝ বরাবর দুটি অংশে দুই রকম রঙ—একটা অংশ নিগ্রোদের মতো, অন্য অংশ শেতাঙ্গদের মতো। এই ঘটনা নাকি শত বছরে দুয়েকটা ঘটে থাকে। তখন আমার মাথায় আসে, যদি শরীরের মাঝ বরাবর একটা অংশ নারী, আর একটা অংশ পুরুষ হতো, তাহলে কেমন হতো? সেই সম্ভাব্য গল্পটা নিয়ে ভেবেছি। অনেকে কল মি লাইকা পড়ে টিপিক্যালি আলেককে হিজড়া বা থার্ড জেন্ডার মনে করছেন, বা আলেকের বাস্তবতাও তাকে টেক্সটের মধ্যে সেভাবে চিহ্নিত করেছে, কিন্তু আমি আসলে পরিকল্পনা করে থার্ড জেন্ডার বা জিজড়া শিশুকে নিয়ে লিখিনি। সেটা হয়ে গেছে লিখতে লিখতে।

গল্পপাঠ
আপনাকে যারা চেনেন, তাদের মনে হবে এই উপন্যাসের কাহিনি আপনার অভিজ্ঞতাজাত, শৈশবে চরিত্রগুলোকে কাছ থেকে দেখেছেন, উপন্যাসের পটভূমিও আপনার চেনাজানা। এই মনে হওয়াটার কি কোনো যৌক্তিকতা আছে? আসলেই কি সব আপনার চেনাজানা?

মোজাফ্ফর হোসেন
আমরা প্রত্যেকে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে লিখি। আমরা যা লিখি তার অধিকাংশই আমাদের জীবনের অংশ। জীবনের অংশ বলতে আমি যাপিত বলতে চাচ্ছি না। যাপিত জীবনের বাইরেও বৃহত্তর জীবন থাকে, যে জীবন আমরা দেখি, শুনি, গ্রন্থে পাঠ করি, এমনকি কল্পনা করি। আমাদের জীবন এই সমগ্রতা মিলে। এমনকি কালেকটিভ মেমোরিও আমাদের অভিজ্ঞতার অংশ। যেমন : আমরা যারা কোনোদিন শিকারে যাইনি, শিকার করা দেখিওনি। তারাও কিন্তু শিকার করা বিষয়টা ধরতে পারি। ছোটবেলায় মুরবিবদের কাছে শিকারের গল্প শুনে খানিকটা আন্দাজ করেছি, খানিকটা জীবজগতের স্বাভাবিক প্রবণতা দেখে বুঝে নিয়েছি। কিংবা এক্ষেত্রে দেকার্ত যেটা বলছেন, ‘Our innate ideas form the basis of our experience of reality’, সেটাকেও সত্য বলে ধরে নিতে পারি।

বাস্তবতা আসলে দুই প্রকার, জাবজেক্টিভ আর অবজেক্টিভ। সাহিত্য দুটো বাস্তবতাকেই একক বাস্তবতা হিসেবে প্রকাশ করে। সাহিত্য অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের মাঝে যে অস্পষ্টতার প্রজ্ঞা তা থেকেই নিজের প্রজ্ঞাকে বের করে আনে এবং প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে চলে ব্যক্তির সম্ভাবনাকে।

“সাহিত্যের অভিজ্ঞতা” প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, ‘পোস্টমাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।’ অন্যত্র লিখেছিলেন, ‘আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখন ঘটে নি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।’ ফকনার একই কথা একটু ঘুরিয়ে বলছেন: ‘গল্পটা (দ্য রোজ ফর এমিলি) কল্পনা থেকে এসেছে। কিন্তু ওই বাস্তবতা চারপাশে বিদ্যমান। গল্পটা নতুন কোনো বাস্তবতাকে আবিষ্কার করেনি। তরুণীরা কাউকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখে—সংসার চায়, সন্তান চায়—এটা আমার আবিষ্কার নয়। কিন্তু ওই মেয়েটির (এমিলি) যে নির্দিষ্ট ট্র্যাজিক পরিণতি সেটা আমার তৈরি।’

ফকনার বলেছিলেন : ‘আমার মতে তুমি যেটাই অনুধাবন করতে পারো তাই তোমার অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এমন নয় যে, কোনো বইয়ের চরিত্র যা যা করে তা তা করে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। চরিত্রগুলোর কাজগুলো যদি বাস্তবসম্মত মনে হয়, এবং মনে হয় মানুষ এমনটিই করে তাহলে সেটা অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে।

একজন লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি দিয়ে অনেকগুলো জীবন যাপন করেন। তাই যদি দেখা যায়, একজন রিকশাচালকের জীবন ওই রিকশাচালকের চেয়েও ভালো বোঝেন কোনো লেখক, তখন আর আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকে না। ফলে কল মি লাইকা সেই অর্থে আমার নিজের যাপিত জীবনের বাইরের কিছু না।

গল্পপাঠ :
উপন্যাসটির নাম আপনি ইংরেজিতে রেখেছেন। এর আগেও আপনি একটা গল্পগ্রন্থের নাম রেখেছেন ইংরেজিতে—নো ওমেন্স ল্যান্ড। লিখেছেন তো বাংলায়, নাম ইংরেজিতে রাখার কারণ? নাম বাংলায় রাখতে হবে এমন কোনো শর্ত আছে কিনা? যদি শর্ত না থাকে, তাহলে কোনো বাঙালি লেখক যদি তার বাংলায় রচিত বইয়ের নাম ইংরেজিতে না রেখে উর্দু, হিন্দি, আরবি, ফারসি বা চাইনিজে রাখে, সেক্ষেত্রে কোনো সমস্যা আছে কিনা?

মোজাফ্ফর হোসেন
কোনো শর্তই সাহিত্যের চূড়ান্ত শর্ত না। তবে সেটা বলে নিলেও আমি স্বীকার করতে চাই, বাংলা উপন্যাস বা গল্পের নাম ইংরেজিতে রাখা নামকরণের দুর্বলতা। বাংলাদেশের কোনো ইংরেজি উপন্যাসের নাম হয়তো বাংলাতে রাখা হবে না। ইংরেজিতে হয়, কারণ আমরা ধরে নিই সেটা বাংলার মতো সকলে বুঝবে। বোঝার বিষয়টিই তো সাহিত্যের প্রধান শর্ত। কেউ জার্মান ভাষায় নামকরণ করছেন না; কারণ জার্মান ভাষা আমাদের পাঠকরা বুঝবেন না। আমরা জার্মান কলোনি হলে, বা জার্মানি ভাষা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা হলে হয়তো জার্মানি ভাষায় কিছু কিছু বইয়ের নামকরণ হতো। কিন্তু আমি মনে করি, পারতপক্ষে এক ভাষার উপন্যাস অন্যভাষায় নামকরণ না করা ভালো। আমি করেছি সেটাকে আমার এক প্রকার ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। এটাকে আমি ডিফেন্ড করতে গিয়ে অকারণ কোনো যৌক্তিকতা হাজির করতে চাই না। 

তবে কল মি লাইকা নামকরণের মধ্যে একটা লিটারারি অ্যালুউশন আছে। আমি মূলত সেই মোহে পড়ে করেছি। বিশ্বসাহিত্য দুর্দান্ত সূচনা হিসেবে দেখা হয় মবি ডিকের প্রথম লাইনকে—Call Me Ishmael—Ishmael উপন্যাসের প্রটাগনিস্টের নাম না। কিন্তু সে নামে তিনি পাঠকদের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করছেন। তিনি বলছেন, তোমরা আমাকে ইসমাইল নামে ডাকতে পারো। বিশ্বসাহিত্যে অসাধারণ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই অতি সাধারণ একটা বাক্যকে। বাক্যটি সরাসরি হলেও দ্ব্যর্থবোধক। বিবলিক্যাল বা মিথিক্যাল অ্যালুউন একজন অচেনা মানুষের পরিচয় ও সাফারিংস আমাদের সামনে তুলে ধরে। ইসমাইলের সাফারিংস আমরা জানি, যেটা হয়তো বর্ণনা করতে গেলে কয়েক পৃষ্ঠা লেগে যেত, সেটা মাত্র এক লাইনে হয়ে যায়। আমি সেটা অনুসরণ করতে বলতে চেয়েছি, আলেক বলছে, তোমরা আমাকে লাইকা নামে ডাকতে পারো। কোন লাইকা? লাইকা এখানে লিটারারি অ্যালুউশন। লাইকা নামের সেই কুকুর যাকে বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বার্থে মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনেও মহাকাশে পাঠিয়েছিল। ফলে এই নামকরণে আমার কাছে লিটারারি প্লেজার থাকলেও আমি এটাকে খুব উপযুক্ত সিলেকশন বলে মনে করি না।

গল্পপাঠ
‘কল মি লাইকা’ লিখতে কত দিন লেগেছিল?

মোজাফ্ফর হোসেন
এটা অনেকটা ঘোরের ভেতর লেখা। পুরো উপন্যাস চেতনাপ্রবাহ রীতিতে রচিত। অনেকটা মনোলগের মতো কেন্দ্রীয় চরিত্র তার আত্মচিন্তা ও অন্তর্গত জগত তুলে ধরেছে। এই কারণে লিখতে বেশি সময় লাগেনি। তিন মাসের মধ্যে আমার প্রথম ড্রাফট শেষ হয়ে গেছে।

গল্পপাঠ
আপনি কি একবারেই লেখেন, নাকি লেখার পর বার বার এডিট করেন?

মোজাফ্ফর হোসেন
কল মি লাইকার প্রসঙ্গ ধরে বলি, আমি তিন মাসে লিখেছি, কিন্তু সম্পাদনা করেছি টানা ছ’মাস ধরে। সাত থেকে আটবার প্রিন্ট নিয়েছি। সম্পাদনা সাহিত্যের অনিবার্য অংশ। আমাদের দেশে যেহেতু প্রফেশাল সম্পাদক নেই তাই নিজেকেই কাজটি করতে হয়। প্রতি সম্পাদনায় অনেক কিছু বদলে গেছে। সাহিত্য—বা আর্ট ইন জেনারেল—ফিনিশড প্রডাক্ট না, এটা একটা বিকামিং প্রসেস, প্রতি মুহূর্তে হয়ে ওঠার বিষয় থাকে।

গল্পপাঠ
উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে প্রায় এক বছর হতে চলল, পাঠকসাড়া কেমন পেলেন?

মোজাফ্ফর হোসেন
সেই অর্থে না। আমি নিজেও প্রত্যাশা করি না এ ধরনের উপন্যাস সকলে পড়বে। এই উপন্যাস নিয়ে আমার খুব বেশি প্রত্যাশা ছিল না। এই বইটা আমি নিজের জন্য লিখেছি। সব বই একজন লেখক নিজের জন্য লেখেন না। আমি যেমন মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ অনেকটাই পাঠকের কথা ভেবে লিখেছি। চেয়েছি পাঠক সেটা পড়ুক, তার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হোক। কিন্তু এই বই নিয়ে আমার কোনো প্রত্যাশা তৈরি হয়নি। পুকুরে অলস দুপুরে ছোট্ট একটা ঢিল ছুড়ে দিয়ে নিজে আপন মনে দেখার মতো আমি এই উপন্যাসটিকে অনুভব করতে চেয়েছি। এটা আমার আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মজাগরণের অংশ। আমি যে স্পিরিচুয়াল জার্নিটা আমার কৈশোরে করেছি যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আমার ইশ্বরচেতনা, আমার জাগতিক জীবন, সেই জার্নির একটা অংশ এটা। তাই পাঠককে সেই জার্নির অংশ হতেই হবে, এমনটা মনে হয়নি।

গল্পপাঠ
শুনেছি উপন্যাসটি প্রথম যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ছাপতে দিয়েছিলেন, তারা ছাপেনি, শেষ মুহূর্তে এসে তারা না করে দিল। এমনটা কেন করেছিল? উপন্যাসে কি আপত্তিকর কিছু ছিল? নাকি অন্য কোনো কারণ?

মোজাফ্ফর হোসেন
হ্যাঁ, খুবই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। উপন্যাসটি ছাপতে চায়নি কেন্দ্রীয় চরিত্রের জেন্ডার আইডেন্টিটির কারণে। যেহেতু চরিত্রটি হিজড়া বা থার্ড জেন্ডার, প্রকাশক মনে করেছেন এ ধরনের চরিত্র নিয়ে উপন্যাস হলে আমাদের মোল্লারা, ধর্মান্ধরা ক্ষেপে যাবে। সাম্প্রতিক সময়ে মুসলমান ধর্মান্ধদের চাপে পাঠ্যপুস্তক থেকে থার্ডজেন্ডারের প্রসঙ্গটি সরিয়ে ফেলা, থার্ডজেন্ডার ক্রাইসিস নিয়ে একটি নাটক হয়েছিল সেটি ইউটিউব থেকে তুলে নেওয়া—এই ঘটনাগুলোর কথা বলে তারা উপন্যাসটি রিজেক্ট করেছে। সেলফ সেন্সরশিপ আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে নানাভাবে, এটাই সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়।

গল্পপাঠ :
আপনি প্রধানত গল্পকার। উপন্যাস লিখতে কি আপনি স্বস্তিবোধ করেন?

মোজাফ্ফর হোসেন
স্বস্তি আসলে কোনো লেখার মধ্যে থাকে না। তবে গল্প লিখতে যেমন স্বাচ্ছন্দবোধ করি, উপন্যাসে সেটা করি না। এর কারণ হতে পারে প্রায় শতাধিক গল্প লিখে উপন্যাস লিখতে শুরু করা—উপন্যাস ফরমটা ঠিকমতো আত্মস্থ না হওয়া। আমি যে দুটো উপন্যাস লিখেছি, তা আসলে উপন্যাস হয়েছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আমার পক্ষে ট্রাডিশনাল উপন্যাস লেখা সম্ভব হবে না জানি না। গল্প লিখতে পারবো, সেটা একশো শব্দে হতে পারে অথবা চল্লিশ হাজার শব্দে। শব্দ বাড়লেই যে উপন্যাস হবে, তাও তো না। তবে গল্প বলতে পারাটা মূল বিষয়, সেটা উপন্যাস হলো, নাকি অণুগল্প বা ছোটোগল্প তা নিয়ে আর ভাবি না।

গল্পপাঠ :
এখন কী পড়ছেন?

মোজাফ্ফর হোসেন
আলেক্সিস কিভির উপন্যাস সঙসপ্তক’র শেষ পর্বে আছি। অনুবাদ করেছেন প্রবাশ দাশগুপ্ত। বইটির বাংলাদেশ সংস্করণ প্রকাশ করেছে যুক্ত। কিভি আধুনিক ফিনল্যান্ডের প্রধান লেখক। এটাই ফিনিশ ভাষার প্রথম উপন্যাস। ১৮৭০ সালের দিকে লেখা। তিনি মূলত নাট্যকার ছিলেন। এই একটি মাত্র উপন্যাস লিখেছেন। আমরা জানি ঊনবিংশ শতক উপন্যাসের জন্ম ও বিকাশ কাল। বিভিন্ন ভাষায় তখন উপন্যাস লেখা হচ্ছে। সে সময় আলেক্সিস কিভি অভিনব এই উপন্যাসটি লেখেন। সাত ভাই এই উপন্যাসের মূল চরিত্র। তারা প্রথাগত শিক্ষাকে পরিত্যাগ করে বনবাস বেছে নেন। বনে জঙ্গলে শিকার করে জীবনধারণ করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় ফিনল্যান্ড পরাধীন দেশ। রুশ ঔপনিবেশিক। সুইডেনের ৬০০ বছর কলোনি থাকার পর ১০০ বছরের জন্য কলোনি হয় রাশিয়ার। সুইডিশ ভাষায় মধ্যযুগ পর্যন্ত ফিনল্যান্ডের মূলধারার সাহিত্য রচিত হয়েছে। কিন্তু কিভি ফিনিশ ভাষায় উপন্যাসটি লেখেন। সে সময় নানা সমালোচনার জন্ম দেয় এই উপন্যাস। বিশেষত নন-স্ট্যান্ডার্ড ভাষা ব্যবহারের কারণে এবং গ্রামীণ লোকজনকে সহিংসরূপে তুলে ধরার জন্য। তখন রোমান্টিকসদের সময়। তারা এই অপরিশুদ্ধ বাস্তববাদ গ্রহণ করতে চাননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভাষার কারণেই এই উপন্যাস ফিনল্যান্ডের জাতীয় সাহিত্যের ঐতিহ্য হয়ে ওঠে। কিভি হয়ে ওঠেন তাদের জাতীয়তাবাদী জাগরণের লেখক। উপন্যাস একটি জাতির জাতীয় ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতিতে কতভাবে যে প্রভাব ফেলে, সেটা বোঝা যায় এই উপন্যাসটি পাঠ করলে।

গল্পপাঠ :
লেখকের জন্য পাঠ কতটা জরুরি?

মোজাফ্ফর হোসেন
পাঠ শুধু লেখক না, যে কোনো মানুষের জন্য জরুরি বলে আমি মনে করি। যেভাবে গরু জন্মসূত্রে গরু, সেভাবে মানুষ জন্মসূত্রে মানুষ না, মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে হয়। এটা একটা প্রসেস। মানুষ অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা হয়েছে তার সৃজনশীল মানবিক চেতনার কারণে। এটা বাদ দিলে মানুষের সঙ্গে অন্যান্য প্রাণী পার্থক্য থাকে না। তখন মানুষ কেবল জৈবিক জীব হয়ে ওঠে। তাই আমি পাঠ করাটা—সেটা যে কোনো ধরনের বই হতে পারে—সব মানুষের জন্য জরুরি বলে মনে করি। তবে লেখকদের জন্য বিশেষভাবে জরুরি, কারণ একজন লেখক সাহিত্যিক ঐতিহ্যের পরম্পরা। তাকে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষার গতিমুখ প্রভৃতি জেনে-চিনে নিতে হয়। পাঠের মধ্য দিয়ে লেখকের চিন্তা প্রতিনিয়ত পরীশিলিত হয়।

গল্পপাঠ :
কী লিখছেন এখন?

মোজাফ্ফর হোসেন
আপাতত বলার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু লিখছি না। অপেক্ষা করছি। একটা লেখা শেষ করে আরেকটা লেখার জন্য অপেক্ষার সময় খুব মধুর না হলেও উপভোগ্য। এসময় জাল পেতে বসে থাকার মতো চেতনা সজাগ করে বসে থাকতে হয়। আমি জানি না বর্শিতে কোন মাছ উঠে আসবে, কিন্তু জানি আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। লেখকদের জীবন তো জেলের মতোই। এই জীবনকে আমি অভিশপ্ত বলবো না মহিমান্বিত জানি না। হয়তো এর কোনোটাই না। আমার অপেক্ষা করতে ভালো লাগে, আরো ভালো লাগে লেখার সময়টাতে। কিন্তু শেষ হলে সমস্ত শূন্যতা এসে ভর করে। মনে হয় ভেতরটা নিংড়ে বের করে নিয়েছে কেউ। শূন্যতা থেকেই আমার নতুন কিছুর অপেক্ষা শুরু হয়। জেলেজীবনের ভরাট নৌকা আবার খালি হয়ে ভেসে যায় অনন্ত সমুদ্রে...।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের কাল : ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ