শুভশ্রী বিন্তু
টোয়েনের নদী থেকে এভারেটের নদী পর্যন্ত
২০২৪ সালের ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পাওয়া পারসিভাল এভারেটের উপন্যাস জেমস (James) আজকের আমেরিকান সাহিত্যে এক ঐতিহাসিক পুনর্লিখন। এটি মার্ক টোয়েনের ক্লাসিক The Adventures of Huckleberry Finn (১৮৮৫)-এর নৈতিক ও ভাষিক পুনর্বিবেচনা। কিন্তু কেবল পুনর্লিখন নয়—এটি ইতিহাসের নীরব চরিত্রকে নিজের মুখে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া এক নতুন সাহিত্যিক মুক্তির দলিল। টোয়েনের গল্পে ছিল এক শ্বেতাঙ্গ কিশোর হাকলবেরি ফিন, যার সঙ্গে পালিয়ে যায় এক কৃষ্ণাঙ্গ দাস জিম। সেই উপন্যাসে দাস জিম ছিল কৌতুকের পাত্র, সহজ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, এবং নীরব। হাকের চোখে সে মানুষ নয়, বরং এক আবেগপ্রবণ দাসমাত্র।
পারসিভাল এভারেট এই জিমকেই পুনর্জন্ম দেন ‘জেমস’ নামে। নামের এই পরিবর্তনই তার প্রথম মুক্তি। সে আর কোনো উপন্যাসের পার্শ্বচরিত্র নয়, বরং কেন্দ্রীয় কণ্ঠ। এভারেট তার ভাষা, চিন্তা ও অস্তিত্ব ফিরিয়ে দেন তাকে। জেমস শুধু পালিয়ে যাওয়া দাস নয়, সে শিক্ষিত, দার্শনিক, আত্মজিজ্ঞাসাপ্রবণ মানুষ। সে লক, রুশো, কিয়েরকেগার্ডকে পড়ে, স্বপ্নে তাদের সঙ্গে কথা বলে, আর নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে বেড়ায়।
গল্প শুরু হয় মিসিসিপি নদীর কুয়াশায়। ভেলায় ভাসছে দুই মানুষ—হাক ফিন ও জেমস। হাক পালিয়েছে তার মাতাল, হিংস্র পিতা প্যাপের হাত থেকে, আর জেমস পালিয়েছে দাসত্বের অপমান থেকে। সে চায় একদিন স্ত্রী ও মেয়েকে মুক্ত করে উত্তর রাজ্যে নিয়ে যেতে। নদী তাদের জন্য হয়ে ওঠে এক চলমান পৃথিবী। হাকের কাছে এই ভেলা এক রোমাঞ্চ, জেমসের কাছে এটি বেঁচে থাকার প্রতীক। দিনরাত তারা নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে থাকে, আগুন জ্বেলে রান্না করে, অজানার পথে এগিয়ে যায়। নদী এই উপন্যাসে সময়, গতি, এবং মানব আত্মার স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
হাক ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—জেমস শুধু দাস নয়, সে জ্ঞানী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। সে শ্বেতাঙ্গদের সামনে ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলে, কিন্তু নিজের লোকদের সঙ্গে নির্ভুল, দার্শনিক ইংরেজিতে। কারণ ভাষাই তার বাঁচার অস্ত্র। সে হাককে বলে, “যে ভাষায় তারা হাসে, আমি সেই ভাষায় ভিখারি; যে ভাষায় আমি ভাবি, সেই ভাষায় তারা বধির।” এই এক সংলাপেই ধরা পড়ে জেমস–এর মর্ম। টোয়েন যেখানে দাসের ভাষাকে হাসির উপকরণ করেছিলেন, এভারেট সেখানে ভাষাকে করে তোলেন প্রতিরোধের রাজনীতি।
তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, কিন্তু সেই বন্ধুত্বের ওপর ঝুলে থাকে সামাজিক বিভাজন। হাক ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখে, জেমস রাখে না। হাক বলে, “যিশু আমাদের পথ দেখাচ্ছেন।” জেমস উত্তর দেয়, “তুমি যিশুর কাছে সাহায্য চাও, হাক; তিনি কোনো দাসের কথায় মন দেন না।” এই কথায় স্পষ্ট হয় জেমসের আঘাত—ঈশ্বরও যেন শ্বেতাঙ্গ। তার অপেক্ষা চিরন্তন, এক নীরব ঈশ্বরের কাছে যে কোনো উত্তর দেয় না।
নীরব মুখে কালো রঙ, শব্দে প্রতিরোধ
এক ঝড়ো রাতে নদীর ঢেউ তাদের আলাদা করে দেয়। জেমস ভেসে উঠে পড়ে একদল ভ্রাম্যমাণ মিনস্ট্রেল শিল্পীর দলে। সেখানে শ্বেতাঙ্গরা মুখে কালো রং মেখে কৃষ্ণাঙ্গদের অনুকরণে গান গায় ও মানুষকে হাসায়। জেমসের গায়ের রঙ হালকা, তাই তাকেও দলে নেয়। কিন্তু অভিনয়ের আগে তাকেও নিজের মুখে কালো রং মাখতে হয়। নিজের মুখে নিজের ছায়া মাখার এই পরিহাস তার ভিতর অস্থিরতা তৈরি করে। সে জানে, এই হাসির নিচে লুকিয়ে আছে অপমান। সে লেখে, “আমি এমন মুখ পরেছি, যা তারা দেখতে চায়—যাতে তারা ভুলে যায় আমি মানুষ।”
এই অংশেই এভারেটের ব্যঙ্গ সবচেয়ে তীক্ষ্ণ। মার্ক টোয়েন যেভাবে জিমকে “মজার কালো মানুষ” হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, এভারেট সেই হাসির ভেতর থেকে টেনে তোলেন মানবিক যন্ত্রণা। জেমসের মুখে কালো রঙের মেকআপ আসলে আমেরিকার সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির প্রতীক—এক সমাজ যেখানে কৃষ্ণাঙ্গের মুখ ঢেকে দেওয়া হয় রসিকতার ছলে।
জেমস পরে সেই দল ছেড়ে দেয়। কাজ নেয় এক লোহার কারিগরের দোকানে। সেখানে তার দেখা হয় নরম্যান ব্রাউন নামে এক পালানো দাসের সঙ্গে। নরম্যান তাকে শেখায়, “লোহা যেমন আগুনে গলে, তেমনি মানুষও কষ্টে গড়ে ওঠে।” এই সংলাপ উপন্যাসের দার্শনিক কেন্দ্র। এখানে লোহা ও মানুষ সমার্থক হয়ে যায়—দুজনই আগুনে গলে নিজের রূপ খুঁজে পায়।
গৃহযুদ্ধের ঠিক আগে আবার দেখা হয় হাক ও জেমসের। হাক দেখে, জেমস বদলে গেছে। সে আর ভীতু দাস নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী, গভীর ও শিক্ষিত মানুষ। হাক বলে, “তুমি বদলে গেছ।” জেমস উত্তর দেয়, “না হাক, আমি বদলাইনি—শুধু কথা বলার অনুমতি পেয়েছি।” এই সংলাপই জেমস–এর সারবাক্য। এটি আত্মমুক্তির ঘোষণা।
শেষে জেমস পৌঁছায় দাসবাজারে। সেখানে কালো মানুষদের পশুর মতো বিক্রি করা হয়। ক্রেতারা দাঁত দেখে, পেশি টিপে দাম নির্ধারণ করে। জেমস এই দৃশ্য দেখে ভাবে, স্বাধীনতা কোনো স্থান নয়, এটি এক চিন্তা—যেখানে মানুষ নিজের গল্প নিজে লিখতে পারে। এই ভাবনা থেকেই সে শুরু করে আত্মজীবনী লেখা, এক চুরি করা পেন্সিল ও পুরোনো খাতায়। সেই লেখাই পরিণত হয় জেমস–এর মূল উপন্যাসে—এক গল্পের ভেতর আরেক গল্প, যেখানে ইতিহাসের নিঃশব্দ মানুষ নিজেই নিজের ইতিহাস লেখে।
এভারেটের জেমস এক দার্শনিক বিদ্রোহী। সে জানে, ভাষাই আসল স্বাধীনতা। টোয়েনের জিম ভুলভাল উপভাষায় কথা বলত, যাতে পাঠক হাসে। কিন্তু এভারেটের জেমস সেই ভাষাকে নিজের হাতে ফিরিয়ে নেয়। সে লেখে, “আমি এমন মানুষ, যে নিজের গল্প অন্যের মুখে নয়, নিজের হাতে লিখতে চায়।” এভারেট এই বক্তব্যের মাধ্যমে মার্কিন সাহিত্যের বর্ণভিত্তিক ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
সাহিত্যরীতি, সমালোচনা ও নতুন নৈতিক বিপ্লব
জেমস একটি জটিল, বহুমাত্রিক উপন্যাস। এটি একসঙ্গে রিভিশনিস্ট ঐতিহাসিক উপন্যাস, পোস্টকলোনিয়াল প্রতিরোধের দলিল, মেটাফিকশন, এবং দার্শনিক রচনা। এভারেট মার্ক টোয়েনের ভাষাকে উল্টে দিয়েছেন—যেখানে টোয়েন ব্যবহার করেছিলেন দক্ষিণী উপভাষার হাস্যরস, এভারেট সেখানে ব্যবহার করেছেন একই ভাষার মধ্যে অন্তর্নিহিত বিদ্রূপ। তার লেখায় ব্যঙ্গ, রসবোধ ও নৈতিক স্পষ্টতা একসঙ্গে কাজ করে।
বুকার পুরস্কারের বিচারকমণ্ডলী এই উপন্যাসকে বলেছেন, “একটি নৈতিক ও ভাষিক উচ্চতার অর্জন, যা অতীতের মুখোমুখি হয় এবং ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগায়।” সমালোচকরা একে “towering achievement” বলেছেন—এক এমন সাহিত্যিক কাজ যা একযোগে গভীর ও পাঠযোগ্য। গার্ডিয়ানের ভাষায়, “জেমস এমন একটি বই, যার পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রতিটি বিচারক গর্ববোধ করবেন।”
তবে কিছু পাঠক এই উপন্যাসের শেষভাগকে “প্রচলিত প্রতিশোধমূলক” বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, জেমসের আত্মমুক্তির পথ কিছুটা নাটকীয়। কিন্তু অধিকাংশ সমালোচকই একমত, এই উপন্যাসের সাফল্য কাহিনিতে নয়, তার চিন্তায়। এখানে দাসত্ব, ধর্ম, ভাষা ও নৈতিকতার মতো বড় প্রশ্নগুলো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচিত হয়েছে।
এভারেট নিজে বলেন, “আমি টোয়েনের সঙ্গে সংলাপ করেছি, সংশোধন নয়।” এই সংলাপের ধারণা জেমস–এর মূলে। তিনি ইতিহাসের সঙ্গে বিতর্কে জড়ান, তার বিরুদ্ধে নয়। টোয়েনের উপন্যাসে যেখানে শ্বেতাঙ্গ কিশোর নৈতিক জাগরণে পৌঁছায়, এভারেট সেখানে দাসের চিন্তাকে কেন্দ্র করে নতুন নৈতিক বোধ গড়ে তোলেন। এই পার্থক্যই জেমসকে সমকালীন আমেরিকার আত্মসচেতনতার প্রতীক করে তোলে।
উপন্যাসে নদী একটি পুনরাবর্তিত প্রতীক—গতি, পরিবর্তন, প্রতিরোধের চিহ্ন। জেমস বলে, “নদী সব জানে, হাক। কাকে ভাসাবে, কাকে তীরে ফেলবে, সে নিজেই ঠিক করে। আমি-ও নদীর মতো—থামব না।” এই বাক্যে এভারেট যেন বলছেন, মানবচেতনা থামতে জানে না; সে ইতিহাসের সমস্ত বাধা ভেঙে এগিয়ে যায়।
সাহিত্যকৌশলে এভারেট একধরনের সরলতা বজায় রেখেছেন, কিন্তু সেই সরলতার ভিতরেই লুকিয়ে আছে জটিল ব্যঙ্গ। তার সংলাপ সংক্ষিপ্ত, ছুরির ধার মতো। তিনি পাঠককে কখনো শেখাতে চান না; বরং চিন্তায় উসকে দেন। এ কারণে বিচারকেরা বলেছেন—“জেমস নির্দেশমূলক নয়; এটি এমন গল্প যেখানে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ জীবিত হয় তাদের নিজস্ব ভাষায়।”
এই উপন্যাসের আরেক বিশেষত্ব হলো তার দার্শনিক তলদেশ। জেমসের প্রশ্ন—“দাসের রাগ কোথায় যাবে?”—একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক। তার ঈশ্বরবিরোধী সংশয়, মানবিক আত্মচেতনা ও নৈতিক দ্বন্দ্ব উপন্যাসটিকে এক পরিণত দার্শনিক রূপ দিয়েছে। এখানে স্বাধীনতা কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি নয়; এটি ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি।
শেষে যখন জেমস নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করে, সেটিই এই উপন্যাসের মেটাফিকশনাল পরিণতি। ইতিহাসে প্রথমবার দাস নিজেই নিজের গল্প লেখে—অর্থাৎ, ইতিহাসের লেখক হয়ে ওঠে যে মানুষ এতদিন কেবল বিষয়বস্তু ছিল। এই রূপান্তরই জেমস–এর আসল মুক্তি।
জেমস পড়া মানে আমেরিকার বিবেকের মুখোমুখি হওয়া। এটি এমন এক উপন্যাস যা আমাদের শেখায়, স্বাধীনতা মানে কেবল শৃঙ্খল ভাঙা নয়—স্বাধীনতা মানে নিজের কণ্ঠে নিজের গল্প বলা। পারসিভাল এভারেট এই উপন্যাসে ইতিহাসের সেই অনুচ্চারিত মানুষদের ভাষা ফিরিয়ে দিয়েছেন, যাদের কথা কেউ লিখে রাখেনি।
জেমস হলো মার্ক টোয়েনের নদী থেকে উঠে আসা এক নতুন স্রোত—যেখানে ইতিহাসের নীরব মানুষ প্রথমবার কলম ধরেছে। এটি এক সাহিত্যিক সংলাপ, যেখানে অতীত ও বর্তমান, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ, লেখক ও চরিত্র—সবাই এক নদীর মতো মিলেছে এক অভিন্ন প্রবাহে। এভারেট এই নদীর নাম দিয়েছেন স্বাধীনতা—যার উৎস ভাষা, আর গন্তব্য মানবতার মর্মে। ·


0 মন্তব্যসমূহ