খবরটা অদ্ভুত। খবরটা জনাকে ভাবাচ্ছে। ভাবনা ব্যাপারটার সঙ্গে এখনও পর্যন্ত অ্যাপ-টার দূর তক্ কোনো সম্পর্ক নেই৷ অ্যাপটা ভাবনার তল পায়নি এখনও। একথা মাথায় আসতেই জনা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে। স্বস্তির। অ্যাপ শ্বাসও গোনে না৷ ভাগ্যিস!
অতএব জনার শ্বাস আর ভাবনা ঢিকির ঢিকির চলতে থাকে। দুপুর যতই খর হোক, মন হোক আনচান, এই যে ওঁয়ারা ভুলে গেছেন এদুটো মাপতে (ভুলে কি আর গেছেন! এখনও পেরে ওঠেননি), তাতে জনার ঠোঁটের কোণে হাসি ফোটে। ঠিক সেই সময় বিপ্ শব্দ। জনার মোবাইলে। ঘড়ি আর ট্যাবেও ঘ্যানঘ্যানে বিপ্ বিপ্। কখন যেন কাপে কফি ঢেলেছিল আরেকবার। অ্যাপের ক্যামেরা চোখ দেখে ফেলেছে। চোখ, অতএব, রাগে লাল। জ্বলছে। নিভছে। বলছে, পেটে বাচ্চা থাকলে ক্যাফাইন থেকে থাকতে হবে দূরে। বাচ্চারাও জানে, আরিয়াস্তানে এখন ‘এ ফর অ্যাপ’। অ্যাপই জীবন চালনা করে। দেশও। অথচ জনার ছোটবেলায় এমন ছিল না৷
তখন এসব অ্যাপ-ট্যাপ নিয়ে ওদের আদিখ্যেতাই ছিল। অ্যাপ ছিল কখনও মানিব্যাগ, কখনও বাজার সরকার, কখনও ফোটো এডিটর, কখনও আড্ডাখানা। তারপর কী যে হল! মাথা, মনে হয়, লাটসায়েবি নিতে পারে না৷ আয়েশি হতে হতে, মাথা ঘুমিয়ে পড়ে৷ অ্যাপ জেগে ওঠে চরাচর জুড়ে।
সেবার যখন যাবতীয় অ্যাপ্লিকেশন সরকারকে হস্তান্তর করে দিতে হল, দেবু, মানে দেবরাজ, জনার বর, তখন এক প্রাইভেট সফটওয়্যার সংস্থার কর্ণধার। বোকা জনা ভেবেছিল, এবার বোধহয় দেবুর চাকরি যাবে! যায়নি। দেবুরা এখনও নতুন অ্যাপ বানায়। পুরোনো অ্যাপগুলোকে আরও জটিল ও জাঁকালো করে তোলে। শুধু, সবই করে কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানে।
বেছেবুছে ডাউনলোডের বালাই নেই। অ্যাপগুলো এখন ডাউনলোড করাই থাকে ফোনে, বারো বছর বয়সে যেটা সরকার থেকে পাওয়া যায়। তারপর থেকে দ্বিবাৎসরিক বরাদ্দ একটি করে। জনপিছু। স্মার্টওয়াচ বা ট্যাব অবশ্য কিনতে হয়। কিন্তু তাতে সবই থাকে প্রি-ইনস্টলড। একেক যন্ত্রে একবারই সাইন ইন করতে হয়। বয়স, লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম, জন্ম, ঠিকুজি, কুষ্ঠি অনুসারে তখন প্রাসঙ্গিক অ্যাপগুলিতে নথিভুক্তিকরণ আপনা-আপনি হয়ে যায়। অ্যাপেরা ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। যদি নথিতে গোলমাল থাকে? তখন যন্ত্র প্রাণহীন। বারোয় যার ডিভাইস সচল না হয়, সে জুভেনাইল ডিটেনশনে যায়। আঠারোতেও যার যন্ত্র জেগে ওঠে না, সে চিরতরে ক্যাম্পবাসী।
চোদ্দ বছর এমনই চলছে। অভ্যাস হয়ে যায়। গেছে। যেমন ফেমিফাই-মি। আগে অন্য নামে ছিল, যখন ছিল বেসরকারি। এখন এটি আর্যসেবিকাদের কেন্দ্রীয় অ্যাপ। সাইন ইন-এর সময় লিঙ্গের জায়গায় ‘নারী’ লিখলে এটি নিজে থেকে সক্রিয় হয়। ফেমিফাই-মি জনার খাওয়া-দাওয়া, হাঁটাচলা, নিত্য ও নৈমিত্তিক সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিয়ন্ত্রণ করে তার কথা৷
কিন্তু এই যে অ্যাপ এখনও ভাবনা ঠাহর করতে পারছে না, এই ফাঁকে জনা ভাবছে: নমি ছিল চিরকাল ঠাণ্ডা। সুস্থিত। কখনও কোনো মাথাখারাপের চিহ্ন দেখা যায়নি তার মধ্যে৷ কোনো বেচাল ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, এত মিতবাক! নির্বাকও বলা চলে। তাহলে?
দুই.
বাবা-মার ইচ্ছে, স্বপ্ন ছেলেমেয়েরা প্রায়শ নামে ধারণ করে। ইচ্ছেপূরণ সবসময় হয় না। নামটা তখন ভ্যাঙায় দামড়া প্রাপ্তবয়স্ককে। নমির ক্ষেত্রে তা হয়নি। নমির নাম তার মা-বাবা রেখেছিল নম্রতা। তার অ্যাপ কখনও লাল বাতি জ্বালেনি৷ এদিকে, হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও, ফেমিফাই-মি মাসে নিদেন একবার বিপ্ বাজাবেই জনার ফোনে। যেমন আজ বাজাল। এর আগে শেষবার বিপ্ বেজেছিল গতমাসের উনিশ তারিখ। উনিশে মার্চ, দু হাজার ছিয়াত্তর। সেদিন কিছু একটা স্থির করতেই হত জনাকে। বাচ্চাটা কি রাখবে? অথচ সে প্রস্তুত নয়।
বিপ্ শব্দটা সুতীক্ষ্ম। কানে সূচ ফুটিয়ে ছাড়ে। জনা সেদিনের কোটার দুশো শব্দ জমিয়ে রেখেছিল রাতের জন্য। সারাদিন ধরে কথা জমায় জনা। দেবরাজের সঙ্গে বলবে বলে। ছোটবেলায় গল্পে যেসব কৃপণের কথা শোনা যেত, তাদের মতো। প্রতি কথা হিসেব করে খরচ করে৷ আরিয়াস্তানে মাসিক দশ হাজার শব্দ বরাদ্দ হয়েছে মেয়েদের। অতি-উচ্চবর্ণ হলে পাঁচশ শব্দের গ্রেস আছে। দলিত বা বিধর্মীর জন্য পাঁচশ কম।
অভ্যেস হয়ে গেছে। সকলেরই। এতে সংসারে অশান্তি কমেছে। কাজের সময় বেড়েছে। কেন্দ্রীয় বাজেট বলেছে, পুরুষ এখন বেশি প্রোডাক্টিভ। মেলা দায়ভার তাদের ঘাড়ে। মেয়েরা মোটামুটি ঘরে সেঁধিয়েছে। একদিনে নয়। ক্রমশ। শেষ যে প্রজন্ম এখনও বাইরে কাজ করে, তাদের মাসিক বরাদ্দ দশ নয়, পনের হাজার শব্দ। তারা ঘরে একেবারেই কথা কয় না৷ কোথায় কী বাজে খরচ হয়ে যায়! যেমন জনার মা। এখনও ইস্কুলে পড়ান৷ মাপা কথা, যেটুকু বলার, ক্লাসেই বলেন। বাড়ি ফিরতে ফিরতে কোটা শেষ৷ বাবা বলেন, ‘উফ! শান্তি। খিটখিট নেই।’ জনার মা দৃষ্টিতে আগুন নিয়ে সুইচ টেপেন৷ মাইক্রোওয়েভের থালাটা ঘোরে। গোঁ গোঁ শব্দ নৈঃশব্দ্য ভরাট করে৷
উনিশে মার্চ জনা পরম সতর্ক ছিল, কথা বাজে খরচ না হয়। রাতে একটা বোঝাপড়ায় পৌঁছতে হত। সবিনয়ে জানিয়েছিল, তার সময় চাই। দেবুর মুখ কালো হয়ে গেছিল। অন্তত চারটে সন্তান, অ্যাপ অনুসারে, তাদের আপডেট করতে হবে ক্রমে। জনার এখন পঁচিশ। আগামী পনের বছরের মধ্যে চার চারটে সন্তান— কাজ ফেলে রেখে লাভ কী? তারা যদি প্রান্তধর্মী হত, তবে গড়িমসি করতে পারত। একের বেশি সন্তান ওদের নেওয়া মানা। সেই এক সন্তান তুমি ছাব্বিশেও নিতে পারো, ছত্রিশেও। দ্বিতীয় জন আসে যদি, তবে তার মোবাইল বা ঘড়ি বা ট্যাব সচল হবে না কখনও। তাকে জুভেনাইল খাঁচায় পুরে দেওয়া হবে অন্য বেওয়ারিশদের সঙ্গে।
অন্যদিকে, দেবু আর জনাকে চার চারজনের পিতামাতা হতে হবে। চার চারবার দেবুকে লক্ষ্যভেদ করতে হবে। চার চারবার স্ফীতোদরা হয়ে হাঁসের মতো থপথপিয়ে চলাচল করবে জনা। ধকল আছে। বয়স বাড়লে ধকল নেওয়ার ক্ষমতা কমবে। যদি এক-আধবার মিসক্যারেজ হয়ে যায়, তবে আবার শূন্য থেকে শুরু। আর জনা বলছে, পঁচিশেও প্রস্তুত নয়? জনা কি জানে না, চারটি প্রাণ আপডেট না করলে অ্যাপ তাদের ক্যাটকেটে সবুজ কালিতে মার্ক করবে?
জনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটছিল। সে চেঁচিয়ে যা বলেছিল, তা ভাবলেও এখন অবাক হয়। কোন্ মুখে বলেছিল, তার সন্দেহ হয় যে সে ভাল নেই? কেন বলেছিল, আরিয়াস্তান কি আদৌ স্বর্গের চেয়ে সুন্দর? বলেছিল, সবই তার ধোকার টাটি মনে হয়। আরও বলেছিল, এর চেয়ে বিধর্মী হয়ে জন্মালে ভাল হত। এবং এই জায়গায় এসে তার দৈনিক শব্দের কোটা শেষ হয়েছিল।
মাসিক বন্দোবস্ত দশ হাজার হলেও, দৈনিক সীমা সর্বোচ্চ সাড়ে তিনশ। মহান সরকারের দরদী ও বিচক্ষণ নজর প্রতিটি খুঁটিনাটিতে। কেউ যদি এক দিনে দশ হাজার খরচ করে ফেলে? বেচারি কি বাকি মাস বেবাক বোবা হবে? তা অবদমনের মতো দেখায়। এ দেশে সবাই স্বাধীন। কথা বলা যায়। কিন্তু মাপমতো। সেদিন কোটা পেরোতে, ভাগ্যিস অ্যাপের লাল চোখ জ্বলে উঠেছিল। সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল জনা। লজ্জা করেছিল।
তিন.
কিন্তু, জনা ভাবছিল, নমি তো এরকম নয়! দশ হাজারও খরচ করত না সারা মাসে। এতটাই বাকহীন। বাধ্য। ভাল। তখন, ওঁয়াদের নিয়ম অনুযায়ী, অবশিষ্ট শব্দগুলোর পঞ্চাশ শতাংশ ‘ক্যারেড ফরোয়ার্ড টপ আপ’ হিসেবে পরের মাসের শব্দের সঙ্গে যোগ হত। তার উপর, অতিরিক্ত আরও পাঁঁচশ শব্দ পেত সে, ভাল পার্ফর্ম্যান্সের জন্য। বোনাস। তাতে যে ও আনন্দ পেত, তার ঝিলিক অবশ্য জনা দেখেছে ওর চোখে। কিন্তু জনা বুঝতে পারত না, চিপ্পুসের মতো শব্দ জমিয়ে নমির লাভ কী, যদি কখনই না কথা বলার প্রয়োজন হয়? বারো থেকে ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত, কখনই ওর কাজে লাগেনি ওইসব বোনাস বা টপ আপ।
নমিকে নিয়ে ইদানীং সমস্যা, ও কথা বলতে চাইছে। কিন্তু যা বলতে চাইছে, তা না বেরিয়ে, অন্য কিছু বেরোচ্ছে। যেন কথাগুলো দীর্ঘদিন দুয়োর-আঁটা সোঁদা ঘরে ডাঁই হয়ে পড়ে থাকতে থাকতে, গলে পচে গেছে। ফাঙ্গাস ধরেছে তাদের গায়ে। যখন বেরুচ্ছে, তখন তারা বিকৃত, অচেনা শব্দজঞ্জাল। সামান্যই কথা। নমি হয়ত বলতে চাইছে ‘আলো আসতে দাও।’ বেরুচ্ছে, ‘মুখে নুড়ো জ্বেলে দেব।’ বলতে চাইছে, ‘আইসক্রিম খাব।’ হয়ে যাচ্ছে ‘সবকটাকে বরফে পুঁতে ফেলব।’ নমি মুখ চেপে ধরছে নিজের। স্বকণ্ঠজাতকে সে নিজেই চিনতে পারছে না৷ মুখ খুললেই, আবার! নমি ক্রমে সংসারে বাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠছে। তার সন্তানরা অপ্রয়োজনীয় শব্দ শিখছে।
নমির বর নিজের শ্রম ও বুদ্ধির কত শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে দেশের জন্য দিতে পারছে, তা মাপার আলাদা অ্যাপ আছে। সে হল আর্যপুরুষদের অ্যাপ। আশি শতাংশের কম যদি হয় পার্ফর্ম্যান্স রেট, তবে সে চিহ্নিত হতে পারে না-পুরুষ হিসেবে। বাজেয়াপ্ত হতে পারে তার জমানো সম্পত্তির একাংশ। আশঙ্কায় দিন গুনছে নমির বর। এদিকে, আরেক মুশকিল হল, নমির বরের, হয়ত টেনশনেই, লিংগ উত্থিত হচ্ছে না।
এটা অবশ্য গুপ্ত খবর। কাকপক্ষীতেও টের না পায়! এ কথা নমির বর গোপনে বলেছে জনার বরকে। এ কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে, যদিও ভাবনা এখনও পড়তে পারে না কোনো অ্যাপ বা ডিভাইস, তবু জনা চারদিক দেখে নেয়। জানাজানি হলে নমির বর এমনিতেই না-পুরুষ ঘোষিত হবে। উত্থানের প্রতি নিবেদিত আলাদা সেকশন আছে পুরুষ-অ্যাপে। উত্থানের ইতিবৃত্ত সেখানে নথিভুক্ত করতে হয়। সেখানে ভুয়ো তথ্য দেয় এখন নমির বর। কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে?
পাগল নমিকে বাতিল করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই তার। নমি দূর হলে চাপ কমবে, লিংগ জাগবে, এমনটা সে আশা রাখে। দেখেশুনে আরেকটা বিয়ে করবে। মাঝের সময়টায় কেন্দ্র যেন বিকল্প যন্ত্র দিয়ে তার সংসারে পরিষেবার ব্যবস্থা করে— এই মর্মে মেয়রকে চিঠি লিখবে নমির বর, এমনটা দেবু বলল।
কিন্তু নমির জন্য মন খারাপ করে জনার। ও কি ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবে? না অ্যাসাইলামে? নমি অকেজো, পরিষেবাহীন জেনেও, জনার মন আর্দ্র হয়। এ কি করুণা? না ভয়?
চার.
ঠাণ্ডা কফি সিংকে ঢেলে, জনা খবরের পোর্টাল খোলে। ফেমিফাই-মি ওর জন্য খবর কাস্টমাইজ করে দেয়। সেলিব্রিটিরা মা হওয়ার পর কত সহজে ওজন ঝরিয়েছেন, সেসব দেখানো হয়। এই এক আপদ! সারাক্ষণ টিকটিক করছে অ্যাপ। বাচ্চার জন্য এটা ভাল। সেটা খারাপ। অ্যাপ জানে না, জনার রাজি হওয়ার গূঢ় কারণ আছে। কেউ জানে না। দেবুও না।
প্রসব-পরবর্তী সময় থেকে বাচ্চার দু বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত গল্প বলার জন্য, ঘুম-পাড়ানিয়া গাওয়ার জন্য, মাসিক আরও চার হাজার শব্দ দেওয়া হয়। মাদারস প্রিভিলেজ। জনা অনেকদিন গান গায়নি। নরম তুলতুলে শরীর বাহুতে জড়িয়ে গান গাওয়া তত মন্দ হবে না হয়ত। সামান্য বেশি বকবক করতে পারার ও মূলত গাইতে পারার লোভে, আপাতত জনার রাজি না হয়ে উপায় ছিল না।
কিন্তু এখন জনা দেখতে চাইছিল একটা খবর। পাহাড়তলি নাবালিকা ধর্ষণ মামলার শুনানি ছিল আজ। এখনও ফয়সলা হল না। পোর্টালকে আড়াল করে ফেমিফাই-মি নোটিফিকেশন পাঠাল :
‘এ খবর শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ভাল না। মাকে থাকতে হয় হাসি-খুশি। আপনি কি তাও এগোতে চান?’
‘হ্যাঁ’ টেপে জনা। অ্যাপ আরও জানে না, গর্ভবতীর বুঝে নেওয়া দরকার, কোন উপত্যকায় সন্তানকে সে আনতে চলেছে। জনার যদি মেয়ে হয়?
আজও শুনানি শেষ হয়নি। নাবালিকার বরাদ্দ শব্দ আজও ফুরিয়ে গেছে। সাড়ে তিনশ পেরোতেই বিপ্ বিপ্ আর জজসায়েবের হাতুড়ি একসঙ্গে বেজেছে। মহামান্য আদালতকে দিনমান অনেক শব্দ শুনতে হয়, নিঃসন্দেহে। কিন্তু জনার ভয়, নির্যাতক তো মেয়েমানুষ নয়! তার শব্দের ছাড় বেশি। সে যদি ভুল বোঝাতে পারে? শব্দবন্যায় ভাসিয়ে দেয় বিচার?
অবশ্য কেন্দ্রীয় ওঁয়ারা মহান। পরমুহূর্তে জনার মনে পড়ে, উকিলরা সকলে পুরুষ। মেয়েটির ভয় নেই, কারণ পুরুষ উকিল উপযুক্ত সংখ্যক শব্দে মেয়েটির কথা বোঝাতে চাইবেন আদালতকে। পারবেন? পারবেন হয়ত। ভরসা রাখা যায়। রাখা ছাড়া উপায় নেই। পোর্টাল থেকে বেরিয়ে আসে জনা। টিভিতে একটা তরজা শুরু হল। সেদিকে মন দেওয়ার চেষ্টা করে। সরকার বেশ কিছু সুবিধে দিচ্ছেন মেয়েদের। তা নিয়ে আলোচনা। ম্যানেল-টিতে বেশ কিছু দামী পুরুষকে দেখা যায়। জনার ছোটবেলায়, একে ‘প্যানেল’ বলত।
কেউ অধ্যাপক পুরুষ। কেউ কবি পুরুষ। কেউ রাজনীতিবিদ পুরুষ। কিন্তু সঞ্চালক বলেন, কি আশ্চর্য, ম্যানেলে উপবিষ্ট বিদ্বজ্জন বাদে, মেয়েদের মুখেও শুনে নেওয়া দরকার, তাদের কেমন লাগছে! তিনি আরও বলেন, তাঁদের চ্যানেলই প্রথমবার এ বিষয়ে কোনো নারীর বক্তব্য শোনাবে। জনা নড়েচড়ে বসে।
ফোনে এক মেয়েকে নেওয়া হয়। তার কাছে প্রশ্ন ছিল নির্দিষ্ট ও সূচীমুখ। তাকে বিশ্লেষণ করতে হবে না। স্রেফ অনুভূতি ব্যক্ত করতে হবে। বেশ কিছু বিশেষণ জোগান দেন সঞ্চালক নিজে: ‘আপনি কি উচ্ছ্বসিত? উদ্বেলিত? আপনি কি আত্মহারা হয়ে পড়ছেন না?’
এই সব প্রশ্নের উত্তরেই মহিলা ‘হ্যাঁ’ বলতে পারতেন। বস্তুত, সঞ্চালক সেরকম ভাবেই প্রশ্ন সাজিয়েছেন। তাঁর বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।
কিন্তু ভদ্রমহিলা মনে হয় শব্দ হাতড়াচ্ছেন। হয় অব্যবহারে শব্দের গায়ে মরচে ধরেছে। অথবা ওঁর বলার ইচ্ছে আছে ষোল আনা, কিন্তু আজকের কোটা ফুরিয়ে এসেছে। আপাতত গাঁইগুঁই করছেন। অবশেষে বললেন :
‘ভাল লাগছে। কিন্তু..’
‘কিন্তু’ শুনে ম্যানেলের ভ্রু কুঞ্চিত হয়। বিশিষ্টজনের বিস্ময়ের বিস্ফোরণে টিভির স্ক্রিনে টুকরো হয়ে যাবে এখনই, জনার মনে হয়। কী বলে ফেলল ওই অদেখা মেয়ে? ‘কিন্তু’?
‘কিন্তু’। তার মধ্যে আছে সংশয়ের বীজ। অবিশ্বাসের সারজল। প্রশ্নের বাতাস। ‘কিন্তু’ দেওয়াল ফুঁড়ে মাথা তুললে যে দালান ধ্বসিয়ে দিতে পারে, তা কি সে মেয়ে জানে না? না জানার কথা নয়। ইস্কুলে তা পইপই শেখানো হয়। অথচ মেয়েটি বলল, ‘কিন্তু’!
দশ সেকেন্ড বিরতি নিয়ে, দশ দশটা সেকেন্ড ম্যানেলকে থিতোতে দিয়ে, সে মেয়ে তারপর সত্যি এক প্রশ্ন করল :
‘…কিন্তু আমাদের শব্দের কোটা তো বাড়ল না! ভোটের আগে ওঁয়ারা কথা দিয়েছিলেন! আর ইয়ে, একটা প্রশ্ন ছিল। আমরা যদি কোটা পেরিয়ে যাই, ধরুন খুব ইচ্ছে করছে, ধরুন মুখ শুলোচ্ছে, পেট খলবল করছে, ধরুন চেষ্টা করেও থামাতে পারছি না, ধরুন জরুরি কথাও বটে…ওদিকে বিপ্ বেজে গেল। তখন, ধরুন, কথা চালিয়ে গেলাম৷ বিপ্ বাজতে লাগল। কথাও চলতে লাগল৷ ধরুন যদি এমন হয়, তবে কী হবে? কেউ কি জানে, কী হবে?’
সঞ্চালক দৃশ্যত ঘাবড়ে গেছেন। রাজনীতিবিদ বললেন, এমন কখনও ঘটেনি, এ ভাবনাই অ্যাবসার্ড। অতএব এ নিয়ে ভাবার প্রয়োজন দেখেননি তাঁরা। কবি বললেন, নিঃসন্দেহে সর্বনাশ হবে। অধ্যাপক বই হাতড়ালেন।
কী হবে, তা কেউ জানে না দেখে, জনা আমোদ পেল। কী হতে পারে? বড়জোর কী হতে পারে? সবচেয়ে ভয়ানক কী?
বিপ্ উপেক্ষা করে ব্যক্তি আপন ঘরের কোণে বিড়বিড় বকে গেলে, তাতে সামগ্রিক ব্যবস্থার খুব কিছু যাবে-আসবে না— কেন্দ্রীয় ও অদৃশ্য ওয়াঁরা হয়ত এমন ভেবেছিলেন। হয়ত শাস্তিবিধি রাখেননি তাই। ওঁয়ারা মহানুভব। কিন্তু কিছু একটা হবে নিশ্চয়! প্রয়োজনে শাস্তির প্রজনন হবে। বিশেষত, এক-আধদিন না, ক্রমাগত এ বেয়াদপি চালিয়ে গেলে৷ কী হতে পারে সেই শাস্তি?
নম্রতার মতো অ্যাসাইলামে পাঠাবে? বা ক্যাম্পে? ঠিক তখনই জনার মনে হয়, ক্যাম্পে বা অ্যাসাইলামে গত চোদ্দ বছরে কে জানে কত বেখাপ্পা পাগল জুটেছে! সেইখানে লাগামহীন কথা বলা যায়? গান গাওয়া যায় কোরাসে? পাগলে কী না বলে!
সে পেটে মৃদু লাথি অনুভব করে। যে-ই আসুক, যে লিংগেরই হোক, তার নাম ‘স্পর্ধা’ রাখা যায়? চার সন্তান নাহয় হল। কিন্তু স্বপ্নের তুলো যদি অবাধ্য ওড়াউড়ি করে তাদের নামকরণে, তার জন্য শাস্তি নেই? নামকরণ ওঁয়ারা এখনও বাবা-মার উপর ছেড়ে রেখেছেন, এও আশ্চর্য!
দুর্ঘটনা আশঙ্কা করেননি? ওঁয়ারা কি এ দিকটাও ভাবতে ভুলেছেন? অথচ যখন তখন যা খুশি ঘটে যেতে পারে! ‘যা খুশি’ শব্দবন্ধে একটা অমিত সম্ভাবনা আছে। জনা শিহরিত হয়।·
লেখক পরিচিতি : শতাব্দী দাশের জন্ম ও বসবাস কলকাতায়। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশায় শিক্ষক৷ প্রকাশিত ছোটগল্পের বই : অ-নান্দনিক গল্পসংকলন।


0 মন্তব্যসমূহ